ইলা, পাঁচ বাটিবিশিষ্ট টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে মোবারকের বাসার সামনে এসে নামে। ইচ্ছে করেই ট্যাক্সি ক্যাব নিয়ে এসেছে। মা বারবার বলছিল অফিসের গাড়ি নিয়ে আসতে। প্রয়োজনে গাড়ি সারাদিন রাখলেও সমস্যা নেই। কিন্তু ইলার ইচ্ছা হয় না। ভালো লাগে না। সারাদিন একজন ড্রাইভার তার জন্য গাড়িতে বসে অপেক্ষা করবে।
কিন্তু ট্যাক্সি ক্যাব ছেড়ে দেবার পর খেয়াল করে। বাড়ির কেচি গেইট এবং ভেতরের দরজায়ও তালা। এখন এই টিফিনক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নিয়ে কই যাবে। মোবারক ভাইকে যে ফোন করবে সে নাম্বারও জানা নেই। ইলা মাকে ফোন করে। মার ফোন রিটার্ন মেসেজ দিয়ে বলছে। এখন মিটিং একটু পরে করুন। সামান্য অস্থিরতা কাজ করে। ইদানিং ইভটিজিং বেড়ে গেছে। ছেলেরা এখন সিনিয়র জুনিয়রও মানে না। আস্কারা বাড়ার আরো একটা কারণও হতে পারে। সম্প্রতি পিরোজপুরের জিয়ানগরে পর্দানশীন তিন তরুণীকে ইভটিজিং করার পর বখাটে ছেলেগুলো ভালো পুরস্কার পেয়েছে। প্রতিবাদ করার কারণে মেয়েগুলোকে জেলে যেতে হয়েছে জঙ্গি অপবাদ নিয়ে। সরকারের সরল বিচারে বখাটে ছেলেরা আরো বেপরোয়া হবে এটা বোঝাই যায়।
ইলা স্বস্তিবোধ করে, সে বোরখা পরে নেই। তাকে অন্তত জঙ্গি অপবাদ দিতে পারবে না। তবে বোরকা পরা ওই নির্যাতিত মেয়েগুলোর জন্য খুবই পরানপোড়ে। দুই হাজার নয় সাল যুগটা ভালো যাচ্ছে না।
ইলার মোবাইলে একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন আসে। ধরবে না ধরবে না করেও ধরে। ওপাশ থেকে ইলার নাম ধরে জিজ্ঞেস করে- ইলা ভালো আছো?
হ্যাঁ, কিন্তু আপনি কে?
আমি মোবারক। তোমার দূর সম্পর্কের খালাতো ভাই।
ইলার খুবই ভালো লাগছে। একটু আগের ফাপোর মুহূর্তেই কেটে যায়। স্কুল পড়ুয়া বালিকাদের মতো লাফাতে ইচ্ছে করে। হাঁফাতে হাঁফাতে প্রশ্ন করে মোবারক ভাই আপনি কোথায়?
আমি কাকরাইল। পরিচালক আই আর মন্ডলের অফিসে। তোমার ব্যাপারে আলোচনা করতে এসেছি। কিন্তু সমস্যা হলো আই আর মন্ডল এখনো অফিসে আসেনি। অথচ গতকাল আমাকে সকাল নয়টার ভেতর থাকতে বলেছে। এখন বাজে এগারোটা পঁচিশ। কি করবো বুঝতে পারছি না।
মোবারক ভাই আপনি এক নিঃশ্বাসে এতো কথা বলছেন কেনো।
ও আচ্ছা সরি।
আহা… আবার সরি বলার কি আছে।
না, মানে খালাআম্মার দেয়া বিশ হাজার টাকা আমি ফেরত দেবার ইচ্ছা করছি।
কেনো, বলুন তো?
আমি বোধহয়, কিছুই করতে পারবো না।
ঠিক আছে দেখা যাবে। এখন এক কাজ করেন আপনি তাড়াতাড়ি আপনার বাসায় চলে আসেন। আমি বাসার সামনে বসে আছি। আমার হাতে চিকেন বোম। খুবই মারাÍক, পুলিশী ঝামেলার আগে তাড়াতাড়ি আসেন।
কি বলছো তুমি?
ঠিকই বলছি, ক্যানো দেখেন না, ইদানিং পর্দানশীন মেয়েদেরকে পুলিশরা গ্রেফতার করছে।
কৈ আমি কিছু জানি না তো।
বলেন কি, পিরোজপুর জিয়ানগরের ঘটনাতো সবাই জানে।
আচ্ছা সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু তুমি তো আর পর্দানশীন নও। তোমার তো আর ভয় নেই।
ওখানেই তো সমস্যা। আমি আজ মাথায় স্কার্ফ পরে এসেছি। আমাকে দেখলে আপনার মনে হবে আমি ইরানী সিনেমার নায়িকা।
হঠাৎ বাংলা সিনেমা রেখে ইরানী সিনেমার নায়িকা হবার ইচ্ছা কেন?
আসলে ইরানী সিনেমার নায়িকা নয়, আমি পর্দানশীন বোনগুলোর অপমানের প্রতিবাদে স্কার্ফ পরা শুরু করেছি। মা খুব বকাঝকা করছে। আপনি মাকে বুঝিয়ে বলবেন। স্কার্ফ পরার কারণে নায়িকা হতে কোন বাধা নেই।
তোমার মাকি আমার কথা শুনবে?
শুনুক না শুনুক বলবেন।
ঠিক আছে বলবো। কিন্তু তুমি কতক্ষণ বাসার বাইরে বসে থাকবে?
যতক্ষণ আপনি না আসছেন।
ঠিক আছে আসছি।
কাকরাইল থেকে ধানমন্ডি আসার রাস্তা খুব একটা বেশি না। কিন্তু ডিজিটাল যানজটের মেজাজ একটা আলাদা জিনিস। কতক্ষণ লাগবে কেউ জানে না। অতএব এতক্ষণ তো আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। একটা রিকসা নিয়ে কতোক্ষণ ঘোরাঘুরি করা যায়।
কিন্তু এখানেও ঝামেলা। রিকসা ওয়ালাদেরকে নির্দিষ্ট জায়গা না বললে কেউ রাজি হচ্ছে না। বরং কোন কোন রিকশাওয়ালা সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়।
জায়গার নাম কইবো না, আবার রিকশায় উঠতে চায়। শেষ পর্যন্ত একজন রিকশাওয়ালা অতি দয়া করে। ইলাকে রিকশায় ওঠায়। রিকশা ধানমন্ডি মাঠ হয়ে আট নাম্বার ব্রীজের ওপর দিয়ে এনাম র‌্যাংগস প্লাজার সামনে দিয়ে রাইফেলস স্কয়ারের কাছে আসার সাথে সাথে শ্রাবণের বৃষ্টি হঠাৎ করেই শুরু হয়। পলিথিন পেপার বের করার সুযোগ আর হয়ে ওঠে না। ইলা উপায়ন্তর না দেখে হাল ছেড়ে দেয়। ভিজুক সব কিছু ভিজে যাক।
বাসার সামনে আসার আগে সামান্য ভাবনাও পেয়ে বসে। এখনও যদি মোবারক ভাই না আসে। ভেজা কাপড়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে? রিকশাওয়ালা লোকটাও বলতে পারে। আপা আমি আর চালাতে পারবো না। গন্তব্য ছাড়া এতক্ষণ চালাইছি এটাই বেশি।
কিন্তু দেখা গেলো বৃষ্টি হবার কারণে রিকশাওয়ালা কিছুটা খুশি। সে প্রাণ খুলে কথা বলছে।
আফা, বৃষ্টি অইলো আল্লার খাশ নেয়ামত। শরীরে ঘামাচি অইলে বৃষ্টির পানি লাগলে তো ব্যাস, ঘামাচির গোষ্ঠী শ্যাষ।
তাতো আমি জানতাম না। তাহলে ভালো মতো ভিজি কি বলেন?
ভিজেন, আফা, আমি কি রিকশা জোরে চালাবো?
না থাক, জোরে চালানোর দরকার নেই। বাসার কাছে চলে আসছি।
আফা কিছু মনে না করলে প্রশ্ন করতাম।
করো।
ধানমন্ডি এলাকার মানুষের কিছুটা সমস্যা আছে। ব্যাপারটা কি আপনি জানেন?
কি সমস্যা?
আফা রাগ করবেন না তো?
না রাগের কি আছে।
ধানমন্ডি এলাকার প্রায় বাড়িতেই দু’একজন করে পাগল আছে। বিষয়টা কি আপনি লক্ষ্য করছেন।
কি বলছো, ব্যাপারটা তো আমি ভালোভাবে লক্ষ্য করিনি। আমি খুবই মনোযোগের সাথে জিনিসটা লক্ষ্য করছি। আফা রিকশাওয়ালা কিন্তু হরেক কিছিমের। কেউ কেউ চিন্তাবিদ কিছিমের। আমি হইলাম চিন্তাবিদ কিছিমের। খুব কাছ থেকে সব লক্ষ্য করি। বুঝলেন আফা, রিকশায় বসে কে কি বলে খুব মনোযোগের সাথে লক্ষ্য করি।
ও আচ্ছা।
আফা, আরেকটা বিষয় বলি। আপনারে পরথমে পাগল কিছিমের মনে করছিলাম। পরে দেখি না। আমার ধারণা ভুল। ধারণা আসলে সবসময় ঠিক হয়না।
ইলা সাবধান হয়ে যায়। লোকটার আর কোন কথার উত্তর দেয়া ঠিক হবে না। উত্তর দিলে কথা বলতেই থাকবে। লোকটার কথা অথবা বৃষ্টির কারণেই হোক মাথা ধরেছে। সম্ভবত জ্বরও আসবে।

মোবারক বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আসার সময় তাড়াহুড়ো করার কারণে চাবিটা সম্ভবত আই আর মন্ডলের অফিসে ফেলে আসছে। তবে বুকের ভেতর যে একটা ধুকধুকানি ছিল তা এখন নাই। কারণ বৃষ্টির কারণে হোক অথবা অন্য কারণে হোক ইলা সম্ভবত চলে গেছে। এখন আর ঝামেলা নেই। মন্ডলের অফিসে গিয়েও চাবি আনা যাবে, নইলে নিউমার্কেট থেকে মিস্ত্রী এনে তালা খুলতে হবে। মাঝে মধ্যেই মোবারকের এই অবস্থা হয়। টিপ তালার নানা ঝামেলা। মাঝে মধ্যে চাবি ভেতরে রেখে দরজায় তালা বন্ধ করার পর মনে পড়ে চাবি ভেতরে। তালাচাবি বিষয়ক এমন একটি চিন্তাযুক্ত মুহূর্তে ইলা এসে হাজির। ইলার শরীর ভেজা। হাতে টিফিন কেরিয়ার। লম্বা চুলগুলো ভিজে বিশেষভাবে বিন্যস্ত হয়ে আছে। মাথায় স্কার্ফে আলাদা সৌন্দর্য লেপ্টে আছে।
মোবারক ঘাবড়ে যায়। প্রবল একটি অপ্রস্তুত ভাব মুখে ঝুলে পড়ে।
ইলা রিকশাওয়ালাকে ভাড়া দিতে দিতে প্রশ্ন করে। মোবারক ভাই কি চাবি হারিয়ে ফেলছেন?
ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। মন্ডলের অফিসে ফেলে আসলাম, নাকি ঘরের ভেতরে। দুটোর সম্ভাবনাই সমান। কি করি বলতো? ইন্ডিয়ান গ্লোব তালা, খোলা কোন ব্যাপারই না। আপনি টিফিন কেরিয়ারটা ধরুন। আমি কয়েক মুহূর্তে খুলে দিচ্ছি।
কি ভাবে?
এই দেখুন, কি ভাবে খুলি।
মোবারক অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এই মেয়ে দেখা যায় সাংঘাতিক টাইপের। মাথার ক্লিপ এবং ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে নেইল কাটার দিয়ে দক্ষ তালা খোলার মিস্ত্রিদের মতো অল্প সময়ের ভেতর দুটি তালাই খুলে ফেললো, তবে একটি তালার সাইড অপারেশন করতে হয়েছে। তালাটার বাম পাশের শিশা সরিয়ে। ফুটোর ভেতর থেকে লোহার বল এবং স্প্রিং বের করে দরজার তালাটা খুলতে হয়েছে।
মোবারক ভাই, মন খারাপের কিছু নাই। তালাটা নষ্ট হয় নাই, আবার মেরামত করে ব্যবহার করতে পারবেন। তালাটা ভালো মানের, তাই সিজারিয়ান লাগলো। স্বাভাবিক ডেলিভারি না হলে সিজারিয়ান তো লাগবোই, কি বলেন?
আমি তা ভাবছি না। আমি ভাবছি, তুমি এমন দক্ষতার সাথে তালা দুটো খুলে ফেললে। মনে হয় তালা খোলাই তোমার পেশা।
ইলা তৃপ্তির এবং বিজয়ীর হাসি হাসে। দশ বছরের ওপর হবে আমি তালা খুলি। ঘরের সব তালা আমি নিমিষেই খুলে ফেলতে পারি। বিশ্বাস না হলে মাকে জিজ্ঞেস করুন।
জিজ্ঞেস করার কি দরকার। আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি।
মোবারক ভাই। ঘটনাটা আপনাকে খুলে বলি।
কি ঘটনা।
তালা খোলার ঘটনা। কিভাবে প্রথম তালা খুলি এবং ধীরে ধীরে তালা খোলার বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠলাম।
না থাক, তালা খোলার ঘটনা বলার দরকার নাই। যখন সুপার ডুপার নায়িকা হবে, তখন এইসব কথা বলবা। পত্রিকার বিনোদন পাতায় ছাপা হবে।
কিন্তু আপনি তো বললেন আপনি আমাকে নায়িকা বানাতে পারবেন না।
এখন মনে হচ্ছে আমি সহযোগিতা না করতে পারলেও তুমি নায়িকা হতে পারবে।
কেন এমন মনে হচ্ছে।
তুমি নাচ, গান, অভিনয় জানো এবং সাহসও আছে। এই জগতে সাহসটা খুবই জরুরি।
কিন্তু, আমি তো নায়িকা হতে চাই না। শুধু এই চিত্রজগতের অন্ধকারটা একটু দেখতে চাই।
অন্ধকারটা দেখার কি দরকার। অন্ধকারটা অন্ধকারেই থাকুক। তোমার আগ্রহটা বরং ভালো কোন কাজে লাগাও।
সিনেমা জগতের কথা বাদ, মা আপনার জন্য হাসের গোস্ত পোলাও এবং গরুর গোস্ত ভুনা করে দিয়েছে। এখন আগে খাওয়া দাওয়া করা দরকার, সাড়ে তিনটার মতো বাজে। ও হ্যাঁ মুরগির রেজালাও আছে। কিন্তু তোমার কাপড় চোপড়তো ভেজা, আগে এইগুলো শুকানের ব্যবস্থা করো। ঐ রুমে আয়রন আছে। সুবিধা মতো সমাধা করো।
আরো আগে বললেন না কেনো। এখনো মনে হয় আমার জ্বর আসবে।
বলার সুযোগ কোথায় পেলাম। যাক এখন তাড়াতাড়ি করো প্লিজ।