ইলার পরিবেশন খুব গৃহিণী টাইপের। পাকা গৃহিণীর মতো প্লেটে পোলাও গোস্ত সালাদ সুন্দর করে সাজিয়ে রাখে। মোবারক খুবই আগ্রহ নিয়ে খায়। রান্না খুবই ভালো হয়েছে। অথবা এখনো হতে পারে। ক্ষুধা হয়তো বেশি লেগেছে। যে রান্না করেছে তার হাত খুব পাকা। একবার ধন্যবাদ দেয়া দরকার।
ইলা রান্না তো খুবই ভালো হয়েছে। রান্নাটা কার হাতের?
আমার দূর সম্পর্কের এক মামার হাতের রান্না।
হাত খুবই পাকা।
আমাদের বাসায় মামা দীর্ঘদিন। বিয়েশাদি করে নাই। মামা না থাকলে না খেয়েই মরতে হতো।
কেনো, না খেয়ে মরতে হতো কেনো?
কারণ মা তো রান্না-বান্নার ধারে কাছে নেই। ঘুমানোর সময় ছাড়া এনজিও, ব্যবসা, রূপচর্চা নানা ধরনের পার্টি। আমাকে নাচ গান শেখানো। বছরে আবার দু’একবার আমার বিদেশী বাবার কাছে যাওয়া, আর আমাকে তো রান্নাই করতে দেন না। রান্না করলে আমি নাকি কালো হয়ে যাবো। কালো মেয়ে আর নোংরা ময়লা নাকি এক।
কালো মেয়ের সাথে ময়লার তুলনা তো খুবই বর্ণবাদী টাইপের কথা। দুঃখজনক বটে। খালার এভাবে বলা উচিত না। মানুষ তো মানুষ, বর্ণের সাথে মর্যাদা খাটো করা খুবই আপত্তিকর। আমাকে এমন নীতিকথা শুনিয়ে কি লাভ? মাকে বলুন। কিন্তু আমি তো জানতাম এনজিও করা লোকরা মানবতাকে খুব শ্রদ্ধা করে।
মানবতাকে শ্রদ্ধা করা হলো সোস্যাল দৃষ্টিভঙ্গি। অধিকাংশ এনজিওই হলো মূলত ব্যবসায়ী। মানুষের সমস্যা নিয়ে ব্যবসা। আমি তো আমার মাকে খুব কাছ থেকে দেখি। মাবে বলবেন না, সেই শর্তে একটা কথা বলি। মায়ের অত্যাচারে আমাদের বাসায় কোন কাজের মেয়ে এক মাসও থাকতে পারে না। অথচ মার কাজই হলো সমস্যাপীড়িত মহিলাদেরকে নিয়ে। আমি ঘরের কথা আপনাকে বলে দিলাম, এখন বুঝতে পারছেন আমি কি টাইপের মেয়ে?
কিন্তু অনেক এনজিও আছে, যারা সত্যি সত্যি মানুষের উপকার করে।
তা থাকতেও পারে। তবে আমার জানা নাই। আমার জানার বাইরেও অনেক কিছু আছে। ইদানিং কথাটা বিশ্বাস করি।
আগে কেন করতে না।
কম জ্ঞানের ফল।
এখন বুঝি খুব জ্ঞান।
খুব না হলেও আগের তুলনায় বেশি। এখন তো পুরুষের দৃষ্টি দেখেও অনেক কিছু বুঝতে পারি।
আমার ব্যাপারে তোমার কি ধারণা। মানে আমার দৃষ্টি দেখে কিছু বুঝতে পারো।
আপনি তো আমার চোখের দিকে ভালোমতো তাকানই না। কিভাবে বুঝবো। আচ্ছা মোবারক ভাই, আমি যদি কিছুক্ষণ কথা না বলি তাহলে কি আপনি মাইন্ড করবেন?
না, তা করবো কেনো।
ঠিক আছে, তা হলে শুরু করছি। তবে আপনি আমাকে একটু সাহায্য করবেন। সাহায্যটা হলো আমি মুখে কথা বলব না, কিন্তু আপনি আমার ইন্টারভিউ নেবেন। নানা ধরনের প্রশ্ন করবেন।
মানে তুমি বোবার অভিনয় করবে।
হ্যাঁ, শুরু হলো, এক দুই তিন।
মোবারক ছোটখাটো সমস্যায় পড়লো। কি প্রশ্ন করবে, বুঝতে পারছে না। অথচ ইলা পাকা বোবা মেেেয়দের মতো অভিনয় করছে এবং তার অভিনয়ের মাধ্যমে বারবার প্রশ্ন করার তাগিদ দিচ্ছে। অনেক অনুরোধ করেও ইলাকে কথা বলানো যাচ্ছে না। মোবারকের হঠাৎ করে বিশ্বাস হয় ইলা আসলেই বোবা। জলজ্যান্ত একটা মেয়ে চোখের সামনে বোবা হয়ে গেলো? ইলা আকারে ইংগিতে দেহের বিশেষ মুদ্রায় প্রশ্ন করার অনুরোধ করে। মোবারক প্রশ্ন খুঁজে পায় না। উপায়ন্তর না পেয়ে প্রশ্ন করে তোমার নাম কি?
ইলা বেশ বিরক্তি নিয়ে অথচ অভিনয়ের সূক্ষ্মতায় জবাব দেয়। আপনি আমার নাম জানেন।
দেহের মুদ্রা এতটাই স্বাভাবিক যে, মোবারক খুব সহজেই সব ইংগিত বুঝতে পারছে।
ইলা আবারো প্রশ্ন করার তাগিদ দেয়। মোবারক অসহায় হয়ে ওঠে। গতানুগতিক প্রশ্ন করে।
তুমি কি কাউকে ভালবাসো?
ইলা দারুণ চমকে ওঠে এবং দেহের প্রতিটি অংশই যেন কথা বলে। উত্তরের সারমর্ম দাঁড়ায়। একটি মেয়েকে এমন প্রশ্ন না করে, গভীর কোন প্রশ্ন কি করা যায় না। ভালোবাসা, না বাসা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না, তাই অন্য বিষয়ে প্রশ্ন করার বিনীত অনুরোধ করছি।
মোবারক প্রায় হাঁফিয়ে ওঠে। ইলা, বার কয়েক বোবা মেয়েদের মতো চিৎকার করে। এরপর হাসে, সবশেষে কান্না করে। ইলার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি বের হয়। মোবারকের ইচ্ছে জাগে চোখের পানি মুছে দিতে। কিন্তু বিশেষ অজ্ঞাত কারণে সম্ভব হয় না।
ইলা স্বাভাবিক হয়ে মোবারককে প্রশ্ন করে। বোবা মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় কেমন করলাম?
খুবই চমৎকার, যাকে বলে সিরিয়াস। এতো ভালো অভিনয় আর দেখিনি এখন একটা ম্যাজিক দেখাই মোবারক ভাই।
দেখাও।
ইলা একটা কাগজ এগিয়ে দেয়। তাতে লেখা। আমি বোবার অভিনয় করলে মোবারক ভাই প্রথমে নাম জিজ্ঞেস করবে। দ্বিতীয় প্রশ্নে কাউকে ভালো বাসো কিনা এমন প্রশ্ন করবে। পরবর্তীতে বাড়ি কোথায়, লেখাপড়া ইত্যাদি প্রশ্ন থাকবে।
মোবারক খুবই অবাক হয়। আসলেই তিন নাম্বার প্রশ্নটা করতে চেয়েছিলো বাড়ি কোথায়। এমন অগ্রিম বুঝে ফেলা খেলাটা বেশ ভাল লাগলো।
মোবারকের অবাক হওয়া দেখে ইলা খুবই মজা পায়। সে রহস্যটা গোপন রাখার চেষ্টা করে না। সামান্য ব্যাখ্যা দিয়ে বুঝিয়ে দেয়। কন্যা দেখতে গেলে পাত্রপক্ষরা কিন্তু সবাই প্রথম নাম জিজ্ঞেস করে কন্যাকে। অথচ সবাই কিন্তু ঐ কন্যার নাম জানে। ওইসব নাম জাতীয় তথ্য নিয়েই কিন্তু কন্যা দর্শনে সবাই যায়। কিন্তু মোবারক ভাই আপনি ঐ গদবাধা প্রশ্নের ভেতরেই থাকবেন বলে আমি ধারণা করেছিলাম। আমার ধারণা সত্য হয়েছে।
তোমার ধারণা কি, সবসময়ই সত্য হয়।
না সবসময়ে সত্য হয় না। তবে প্রায়ই সত্য হয়। আজকের ধারণা যে সত্য হবে এ ব্যাপারে একশো পার্সেন্ট সিউর ছিলাম। সিউর ছিলাম এই জন্য যে, আপনি যখন প্রশ্ন করবেন, তখন আপনি এবং আমি থাকবো। শুধুমাত্র দুই জন থাকার কারণে আপনি গদের বাইরে যেতে পারবেন না। ব্যাপারটা সত্য হয়েছে। আপনি গদের বাইরে যেতে পারেননি।
আর যদি অন্য আরেকজন থাকতো?
আপনার বন্ধু থাকলে প্রশ্ন কিছুটা কঠিন টাইপের হতো। আর যদি আমার কোন বান্ধবী থাকতো, তাহলে প্রশ্নের তেমন হেরফের হতো না।
তাহলে আমি আবার তোমাকে প্রশ্ন করি, তুমি বোবার অভিনয় করো।
প্রথমবারের মতো হবে না। কারণ এবার আপনি প্রশ্ন করবেন সচেতনভাবে। অতএব ঐ খেলাটা আর হবে না।
তাহলে বাদ দাও, চলো তোমাকে নিয়ে আই আর মন্ডলের অফিসে যাই।
না আজ যাব না। আজ আপনাকে আমি আমার প্রতিভা দেখবো।
বোবার অভিনয়ের ভেতর, আমি কান্না ও হাসির ব্যাপারটাও দেখিয়েছি এবার আমি আপনাকে নৃত্য দেখাবো। বলেন কি নাচ দেখবেন। মনিপুরী, কথন, ভারত নাট্রম, কথাকলী ক্লাসিক নাকি প্রচলিত ধারার।
আমি তো নাচ বুঝি না।
না বুঝলেই মজা, আমার মুদ্রার কোন ভুল ধরতে পারবেন না। আমি যেমন ইচ্ছা নাচতে পারবো।
ঠিক আছে, তোমার প্রতিভা দেখাও। কিন্তু সমস্যা হলো আমি নাচ প্রতিভাটা বুঝিই না। এবং দেখেও কোন মজা পাই না।
বোঝার দরকার নাই। মানুষ না বুঝেও অনেক কিছু দেখে। অনেক কিছু বলে। এখন বলেন, কারেন্টের হোল্ডার কোন দিকে। হোম থিয়েটার সাথে নিয়ে এসেছি। গান-বাজনার তালে তালে নাচবো।
ইলা খুব দ্রুত পায়ে ঘুঙ্গুর বাধে। হোমথিয়েটারে লাইন দিয়ে সিডি প্লে করতেই শব্দের এমন বাহাদুরি ছড়িয়ে পড়ে, মনে হয় এক্ষুণি ইটের গাঁথুনী খসে খসে পড়বে। কানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে শব্দের প্রতিটি বিট তরঙ্গ তোলে। মিউজিকের কোন একটি শব্দই বৃথা যায় না। শরজের কোন একটি তার সামান্য উহ্ করলেও তা কান শুনতে পাচ্ছে। ডিজিটাল হোম থিয়েটার যন্ত্র সংগীতের সুরকে প্রবল সতেজতায় প্রাণবন্ত করে তোলে।
ইলা বেশ সিরিয়াস। সে এক্ষুণি নৃত্য শুরু করবে। সিডি প্লেতে জনপ্রিয় হিন্দি সিনেমার গান বাজছে। ইলাকে প্রায় চিনতেই পারে না মোবারক। গানের এবং যন্ত্রের তালে তার শরীর নৃত্য করছে। কখনো কখনো চোখও নাচছে। শরীরের বিশেষ বিশেষ অঙ্গগুলো আশ্চর্য রকম কাঁপছে। ইলা নাচে এতোটাই মগ্ন, মনে হয় তার সামনে কেউ নেই। নৃত্যটা শিল্প ও নন্দনকলায় ভরা থাকলেও মোবারকের দেখতে কিছুটা লজ্জা বোধ হয়। হঠাৎ করেই মনে হয়। ইলা একজন বাঈজী, আর অভিসপ্ত সে বাঈজী পাড়ার মাতাল একমাত্র দর্শক মোবারক নিজে। তার মনোরঞ্জনের জন্য একটি নিাপ মেয়ে নাচছে। আর কষ্টে মেয়েটির চোখ ফেটে পানি বেরুচ্ছে।
হিন্দি গানটার ভেতর এরাবিয়ান এবং পাশ্চাত্যের মিউজিক কম্বিনেশন এমনভাবে এড করা প্রথমে বোঝাই যায় না। একটু খেয়াল করলেই ধরা পড়ে। ছয় মিনিট পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের এই গান শংকর বৈচিত্র্য কম্বিনেশন থাকায়, নৃত্যে শরীরের কসরতটা বেশি লাগছে। ইলা ঘেমে নেয়ে উঠছে। হাঁফাতে হাঁফাতে ইলা পানি খায়।
মোবারক ভাই, নৃত্যশিল্পটা কেমন দেখলেন?
ভালো, তবে নাচের ব্যাপারে আমি তেমন আগ্রহী না। মানুষের মানস বিকশিত করার জন্য নাচ খুব জরুরি শিল্প নয়।
নাচের ইতিহাস জানেন মোবারক ভাই?
ইতিহাসটা তোমার থেকেই শুনি, তবে তোমার পারফর্মিং কিন্তু খুবই সুন্দর হয়েছে।
পারফর্মিং বাদ দেন, আগে বলেন। বিনোদন হয়েছে কিনা?
বিনোদনের প্রশ্ন আসছে কেনো।
কারণ নৃত্যটা হচ্ছে আদি কামযুক্ত বিনোদন মাধ্যম। নৃত্যের মাধ্যমে এক সময় দেবতাদের মনোরঞ্জন করা হতো, পরবর্তীতে ঠাকুর পুরুত হয়ে, আয়েশী রাজা-বাদশাদের জলসা ঘরে প্রবেশ করে এক সময় সাধারণ লোকজনের জন্যও বাঈজীরা নাচতে থাকলো। তবে সে সময় আর বর্তমান সময়ের অর্থাৎ দুই হাজার নয় সালের পার্থক্য হলো, তখন বাঈজীদের জোর করে নাচতে বাধ্য করা হতো, আর এখন স্বেচ্ছায় নাচে। কি মজা তাই না।
এতে মজার কি দেখলে। আমি তো দেখছি মূল্যবোধের ধস।
আমার খুব খারাপ লাগছে মোবারক ভাই। এতো কষ্ট করে নাচলাম। অথচ আপনি বিনোদনই পেলেন না। ইচ্ছে করে নাচলাম তো, তাই।
ইলা কিশোরী মেয়েদের মতো হাসে। হাসলে মেয়েটাকে কেমন দুখি দুখি মনে হয়। এতোটা বিপুল আদরে বড় হওয়া, অগাধ টাকা পয়সা থাকা একটি মেয়ের কি এমন দুঃখ। মোবারকের বুঝে আসে না। হাসি তামাশার ভেতরও ইলার নীলকান্ত দুঃখগুলো বেশ বোঝা যায়। মোবারক অনেকটা বিব্রত, তবে ইলাকে বুঝতে দেয় না। বার কয়েক ঘড়ি দেখে। সন্ধ্যা নেমে আসছে। এক্ষুণি বিদ্যুৎ চলে যাবে। আসবে এক ঘণ্টা পর। অথচ যুগটা বাংলাদেশে চলছে ডিজিটাল। ঘরে মোমবাতি নেই। দোকান থেকে মোমবাতি আনা দরকার। ইলার মেজাজ বোঝা যাচ্ছে না। সে বাসায় যাবে, নাকি যাবে না।
মোবারক নিজের প্রতি বিরক্ত হয়। এটা কেমন ভাবনা, একটা যুবতী মেয়ে বাসায় যাবে, নাকি যাবে না। অবশ্যই যাবে, না যেতে চাওয়ার কোন কারণ নাই। আচ্ছা যদি সত্যি সত্যি না যেতে চায়, তাহলে কি জোর করে বের করে দেয়া যাবে?
ইলার মোবাইল বাজছে। ফোন রিসিভ করে কিছটা খুশি হয়। ফোনটা উত্তরা থেকে তার মা করেছে।
মা গাড়ি পাঠানোর কথা পাঁচটার সময়। এখন রাত ক’টা বাজে, খেয়াল করেছো।
কি বলছো, নতুন গাড়ি নিয়ে আসছো?
ইলার মুখ হাসি হাসি। সম্ভবত নতুন গাড়ি কেনার সংবাদে সে খুশী। অল্প কিছুক্ষণের ভেতরই খালাআম্মা চলে আসেন। নতুন গাড়ির দরদাম জানার আগে খালাআম্মা দুঃসংবাদ জানান। এজিওর চেয়ারমান পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে। অফিসের গাড়ি ক্লোজ করেছে। হারামখোররা সব একজোট হয়েছে। একটি বনি আদমও পাওয়া গেল না যে পক্ষে কথা বলবে।
খালাআম্মা হাইকোর্টে গেলে কেমন হয়?
না, হাইকোর্টে গিয়ে লাভ হবে না। কাগজপত্রে এবং ডকুমেন্টে ওরা খুব স্ট্রং, লড়াই করে সুবিধা হবে না। ল’ ইয়ারের সাথে আলাপ করে এসেছি। মেয়ে দীর্ঘদিন থেকে গাড়িতে চলে অভ্যস্থ। তাই কম দামের ভেতর প্রোবক্স নিয়ে নিলাম।
মা তুমি গাড়ি না কিনলেও পারতে। আমি রিকসায় ভালো চলাফেরা করতে পারি।
মোবারক তুমি শোনলা ও তোমার খালাতো বোন কি বলছে? যে আজবাদে কাল শেলিব্রেটি পার্সন, সে কিনা রিকসায় চলাচল করবে।
মোবারক কিছু বলে না। সে বরং বিব্রত। খানিক শংকিতও বলা যায়। কারণ খালার চেয়ারম্যানের পদ চলে গেছে। হয়ত এক্ষুণি বলবে মোবারক কিছু মনে করো না। হাত খালি তোমাকে যে কুড়ি হাজার টাকা দিয়েছিলাম সেটা ফেরত দাও। আমার মেয়েকে ভালো কোন চান্স দিতে পারলে এক সাথে পঞ্চাশ হাজার দেব। কোন অসুবিধা নাই, দাও টাকাটা, ভালোমতো গুনে দাও। ইদানিং নকল টাকায় দেশ ছেয়ে গেছে। কাজটা ইন্ডিয়ানদের, তুমি কি বলো মোবারক।
কিন্তু দেখা গেলো তেমন কিছুই না। ইলা এবং খালা কেউই তেমন কোন বিশেষ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে না। বরং ইলাকে আরো খুশি খুশি দেখা গেলো। খালার কপালে খুব বিরল হলেও দুশ্চিন্তার ছায়া দাপাদাপি করছে।
বুঝলে মোবারক। বিশেষ কিছু কারণে সব আÍীয়স্বজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ভেতরে ভেতরে আমি খুব দুর্বল। আগামী সপ্তাহের মধ্যে, আমি গ্রীসে যাচ্ছি। তুমি একটু বিশেষ খেয়াল রেখ ইলার প্রতি। আমার আসতে একটু দেরি হবে। ওখানে অনেক ঝামেলা আছে। এখন তুমি আমাকে একটা বুদ্ধি দাও। ইলাকে কৈ রাখি।
কেন, বাসায় থাকলে সমস্যা কি?
ওর চাচারা এসে ক্ষতি করতে পারে। তাছাড়া অফিস অডিটে বিরাট কোন দোষ আমার ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা চলছে। মামলা টামলাও করতে পারে।
মা আমাকে মহিলা হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করো।
হোস্টেলে থাকতে পারবি তো?
খুব পারবো, তুমি ব্যবস্থা করো। আর না পারলে মোবারক ভাইয়ের একটা রুম দখল করবো।
তা হলে, ফ্লাটটা ভাড়া দেবার ব্যবস্থা করি। কিছু জিনিসপত্র বিক্রি করবো। কিছু মোবারকের খালি রুমগুলোতে রাখবো। মোবারক কিছু বলার সুযোগ পায় না। খালা ইলাকে নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। তার অনেক কাজ।
মোবারক নতুন একটা গল্প লেখায় হাত দেয়। এই গল্পটাকে চিত্রনাট্যে রূপ দিতে হবে। গল্পটা তার পরিচিত পরিমণ্ডলের। খুব সাবধানে চরিত্র সাজাতে হবে। নাম ধাম যতেœর সাথে এড়িয়ে যেতে হবে। যাতে কেউ বুঝতেই না পারে। মোবারকের আবারো বিরক্ত লাগে। এতো ডিফেনসিভের কি আছে। সত্য ঘটনাতো সত্যের মতো লেখা উচিৎ। না হলে মানুষ কিভাবে গল্পে সত্যের অনুরণন পাবে। মোবারক বেশ ক্লান্ত। তার ঘুম পাচ্ছে। ঘুমের দারুণ আদরে শুয়ে পড়ে লাইন বন্ধ করার কথা মনে থাকে না। ঝলমলে আলোকিত ঘরে মোবারক বেভোরো ঘুমায়। ঘুম ভাঙ্গে ফজরের আজান শুনে। মোবারক নামাজ পড়ে। কি এক অজ্ঞাত কারণে বন্ধু বান্ধবের কাছে নামাজ রোজার কথা গোপন রাখে। বন্ধু বান্ধবের তুলনায় অনেক আগে মোবারকের দিন শুরু হয়। একটি ভালো কাজের প্রতিযোগিতা চলুক মন্দ কি?
ইলোরা গুলশান নেমে কিছুটা অস্থিরতা অনুভব করে। বলা কওয়া নেই, হঠাৎ করেই এভাবে একা একা চলে আসা। তাছাড়া গুলশান এলাকা ভালোভাবে চেনা জানাও নেই। সব গলি পথগুলো একই রকম মনে হয়।
দিনেশ ভাইকে আরেকবার ফোন করে জানবে কিনা, আসলে এক নাম্বার নেমে কোন দিকে টার্ন নেবে। লোকেশানটা আরো ভালোভাবে লিখে আনা উচিৎ ছিল।
দিনেশকে ফোন দিবে, ঠিক তখন ইলোরার মোবাইলে ল্যান্ড ফোন নাম্বার থেকে ফোন আসে। ইলোরা ফোন রিসিভ করে। অপর প্রান্ত থেকে আহ্লাদী কণ্ঠে প্রশ্ন করে।
ইলোরা বলছো?
ইলোরার খানিকটা বিরক্ত লাগে। বলা কওয়া ছাড়াই তুমি সম্বোধন ভালো লাগে না। খানিক বিরক্তি নিয়েই প্রশ্ন করে।
কে?
আমি শাহরিয়ার বলছি। প্রযোজক শাহরিয়ার। আমি কি ইলোরাকে ফোন করছি?
জ্বি আমি ইলোরা বলছি। স্যার স্যরি চিনতে পারিনি।
ঠিক আছে? আমি কিছু মনে করছি না। এখন বলো তুমি কি অফিস চিনে আসতে পারবে, নাকি লোক পাঠাবো।
স্যার আমি চেষ্টা করছি।
চেষ্টা করা দরকার নেই। তুমি বলো, এখন তুমি ঠিক কোন জায়গায়।
জ্বি আমি এক নাম্বার নেমে উদয়ন-টাওয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।
ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো। আমি একটি ছেলেকে পাঠাচ্ছি। ওর হাতে আমার ভিজিটিং কার্ড থাকবে, তুমি ওর সাথে চলে এসো। আর আমি যে ছেলেকে পাঠাচ্ছি। ও তোমাকে ঠিক চিনে ফেলবে। ছেলেটির স্পেশাল একটি গুণ আছে। তা হলো ও মুহূর্তে মানুষ চিনে ফেলে। অতএব তুমি অপেক্ষা করো।
জ্বি স্যার থ্যাংকূ।
কথা শেষ না হতেই। চৌদ্দ পনেরো বছরের একটি ছেলে ইলোরার নাম ধরে প্রশ্ন করে।
ম্যাডাম আপনি কি ইলোরা?
ইলোরা চমকে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে প্রশ্ন করে।
তুমি কে বাবা?
ছেলেটি তার পকেট থেকে শাহরিয়ার সাহেবের ভিজিটিং কার্ডটি বের করে দেয়।
ইলোরা স্বস্তিবোধ করে। কপাল থেকে বিরক্তির রেখা মুছে যায়। ছেলেটিকে অনুসরণ করে।
মেট্রো টাওয়ারে ঢুকেই ভালো লাগে। সেন্ট্রাল এয়ারকুলার সিস্টেম। শীতের পরিবেশ সৃষ্টি হয়ে আছে। আহ মুহূর্তেই গা জুড়িয়ে যায়। দ্রুতগামী লিফ্টে এগারো তলায় আসতে সময় লাগে না। আহা… চারদিক কেমন ঝকমক পরিষ্কার। কোথাও কোন রকম নোংরা লেগে নেই, নেই শব্দের অসহ্য সন্ত্রাস। মোহন পরিবেশে গুণগুণ করে গান গাইতে ইচ্ছে করে।
শাহরিয়ার সাহেবের অফিসে ঢুকে, আরো ভালো লাগে। ইরানী ঘিয়ে রংয়ের নরম তুলতুলে কার্পেটে পা রাখতে মায়া লাগে। জুতোর হিল দেবে যায়। হাঁটতে গিয়ে শরীরে টাল ওঠে। রিসিপসানে টাইপরা ছেলেটি দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়। প্রায় সাত আটজন স্টাফ, যার যার মতো কাজে ব্যস্ত। কমন ফ্লোরে চারফিট উঁচু থাই দিয়ে একেকটি টেবিল সেপারেট করা। ফ্লোরের পূর্ব উত্তর কোণায়, শাহরিয়ার সাহেবের খাস কামরা। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতে চোখ আশ্চর্য হয়। মনে হয় বিশাল রুমটি ছোটখাটো একটা জাদুঘর। বিশ্বের সেরা দর্শনীয় জিনিসের শোপিস। অধিকাংশ শোপিস ক্রীশটাল কাঁচের তৈরি। কায়দা করে সাজানো জিনিসগুলোর উপর ইলেকট্রিক আলোর পশরা ছড়িয়ে পড়ে মায়া সৃষ্টি করেছে। প্রয়োজনের চাইতে ঘরটিতে আলো কম। এজন্য কিছু রহস্য মনে হয় হাঁটাহাঁটি করছে। বিশাল রুমের এক কোণায় শাহরিয়ার সাহেবের টেবিল। টেবিলটি সম্পূর্ণ মর্মর পাথরের। টেবিলের ওপর কোন ফাইলপত্র নেই। শুধুমাত্র শ্লিম, কালো রংঙের একটি লেপট এপেল কম্প্যূটার। ইলোরা দ্বিধায় পড়ে। কিভাবে শুরু করবে। সালাম করলে কিছু মনে করে কিনা।
শাহরিয়ার কম্প্যূটারের স্ক্রীনে চোখ রেখেই ইলোরাকে প্রশ্ন করে।
ইলোরা… তোমার নামের মানে কি জানো?
ইলোরা নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দেয়।
স্যার জানি না।
কি বলছো জানো না। আচ্ছা ঠিক আছে, আগে বসো।
শাহরিয়ার চেয়ার দেখিয়ে দেয়। যদিও টেবিলের সামনে একটি চেয়ারই রাখা।
ইলোরা আস্থার সাথেই চেয়ারে বসে।
কি খাবে বলো?
স্যার কিছু খাবো না।
নিজের নামের মানে জানো না, কিছু খাবে না। তা হলে তুমি আমার এখানে আসছো কেনো? বলো কেনো আসছো? আর এসেই তুমি স্যার স্যার বলছো।
রাগ করবেন না স্যার।
তাহলে কি করবো?
ইলোরা নিজেকে মুখরা বলেই জানে। অথচ আজ মুখ থেকে কথাই বের হয় না।
স্যার, নামের মানেটা আমি সত্যিই জানি না। জানতে হবে তাও কখনো ভাবি নাই। স্যার দুই দিন সময় দিলে নামের মানেটা মনে হয় বলতে পারবো।
থাক তোমাকে কষ্ট করতে হবে না। এবার বলো আমার কাছে কি সহযোগিতা চাও।
স্যার দুবাই প্রোগ্রামে যেতে চাই।
শুধু দুবাই প্রোগ্রামেই যেতে চাও, নাকি আরো বড় কিছু হতে চাও।
স্যার মডেল এবং নায়িকা হবার খুব ইচ্ছে।
যদি তিনটে ইচ্ছেই আমি পূর্ণ করে দেই। তুমি আমার জন্য কি করতে পারবে। খুব ভেবে চিন্তে বলবে। আর হ্যাঁ আমার কিন্তু টাকা পয়সার সমস্যা নেই। বরং আমার খাস চেম্বারে কেউ আসলে আমি তাদেরকে গাড়ি ভাড়া দিয়ে দেই। ইলোরা…
জ্বি স্যার।
তুমি খুব ভেবে চিন্তে বলবে। ভাবার জন্য তোমাকে আমি হেলপ করছি। তুমি ড্রয়ার থেকে তোয়ালে নিয়ে বাথরুমে যাও। ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করো এবং ফ্রেশ হয়ে এসো। এক সাথে খাবো। আ হ্যা, আরেকটি কথা। তুমি কিন্তু এখনো সহজ হতে পারোনি সহজ হও। তুমি মিডিয়াতে কাজ করতে এসেছো। কোন উপাসনালয়ে আসোনি। বাথরুম হলো অন্য জগত। যেখানে সবাই খুব স্বাভাবিকভাবে আদিরূপে প্রকাশিত হয়।
শাহরিয়ার সাহেব হাসে। হাসিটা স্বাভাবিক হওয়ার সহায়ক। ইলোরা বাথরুমে প্রবেশ করে আশ্চর্য হয়। বাথরুমের বাথটাবে স্বচ্ছ পানি রাখা। দেয়াল জুল সুকেচে নানান ব্রান্ডের সেম্পু, কন্ডিশনার, বডি লোশন। লিকোইড সোপ, দামি ব্রান্ডের সাবান রাখা। বিশাল গ্লাসের সামনে রাউন্ড টুল, যা রিভোলিং হয়। এমন একটি বাথরুমে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলেও খারাপ লাগে না। লোকটার রুচিবোধ সত্যিই চমৎকার। ইলোরা বেশ সময় নিয়ে বাথরুম থেকে বের হয়।
ইলোরা, তুমি কি চিন্তা করতে সক্ষম হয়েছো। আমি তোমাকে নায়িকা, মডেল, দুবাই স্টেজে পারফর্মিং এসব সুযোগ সৃষ্টি করে দিলে, তুমি আমার জন্য কি করতে পারবে?
আপনি যা করতে বলবেন তাই।
যদি বলি আÍহত্যা করো।
আÍবিকোশিত হওয়ার জন্য, আমি মডেল হতে চাই। কিন্তু আÍহত্যা করলে মডেল হয়ে আর লাভ কি?
তা ঠিক, কিন্তু চরিত্রের প্রয়োজনে, তুমি কতোখানি খোলামেলা হতে প্রস্তুত।
যা প্রয়োজন, তার সব খানি।
তা হলে একটি পরীক্ষা হয়ে যাক। আমি দেখতে চাই তুমি কতখানি মডার্ন এবং ত্যাগের ব্যাপারটাও। তুমি কি মানসিকভাবে প্রস্তুত?
জ্বি আমি প্রস্তুত।
গুড, চলো এর আগে আমরা জুস খেয়ে নেই। তুমি নিশ্চই মালটার জুস অপছন্দ করো না। হলুদ ফলের একটা গুণ হলো তোমার স্ক্রীনের উজ্জ্বলতা বাড়াবে। এছাড়া দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি এবং এন্টিঅক্সিডেন্টের কাজও করে।
একটি নিরস টাইপের ছেলে, জাম্বু গ্লাস ভর্তি মাল্টার জুস দিয়ে যায়। ইতোমধ্যে টেবিলে খানাও দেয়া হয়েছে।
ইলোরা, তোমাকে আমি আরেকটা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। তা হলো তুমি আমাকে আর স্যার বলবে না। ভাই বলবে। আর আমাদের সম্পর্কটা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। এখন এক কাজ করো। তুমি একটু কষ্ট করো ঐ ড্রয়ারটা খুলো। ওঠো এবং জলদি করো। ইলোরা ড্রয়ার খুলে অবাক হয়। নতুন একাধিক টাকার বান্ডেল। হ্যাঁ, ইলোরা তুমি ওখান থেকে একটা বান্ডেল আমাকে দাও। ইলোরা একটি বান্ডেল এনে শাহরিয়ার সাহেবের সামনে রাখে। শাহরিয়ার সামান্য হাসে এবং একবার ইলোরার মুখের দিকে তাকায়। ইলোরা সামান্য অপ্রস্তুত হয়।
আহা অমন অপ্রস্তুত হচ্ছো কেন?
না, স্যার অপ্রস্তুত হচ্ছি না।
তা হলে, টাকাটা তোমার ভ্যানিটি ব্যাগে রাখো। আর আশা করছি, তুমি স্যার স্যার বলবে না। আমাদের সম্পর্ক হলো বন্ধুত্বপূর্ণ।
ইলোরা দ্বিধা ভেঙে ভাই উচ্চারণ করে।
ভাইয়া, এতোগুলো টাকার কোন দরকার নেই।
ওকে, তাহলে টাকাটার অর্ধেক তুমি নাও। এটা তোমাকে গাড়ি ভাড়ার জন্য দিলাম।
শাহরিয়ার পঁচিশ হাজার টাকা ইলোরার হাতে গুঁজে দেয়। টাকাটা ব্যাগে রাখার সাথে সাথেই ইলোরা যেন কেমন বিক্রি হওয়া প্রাণির মতো চিন্তাশূন্য হয়ে পড়ে।
তোমার কোন তাড়া নেইতো ইলোরা?
না তাড়া কিসের? তা ছাড়া, আমিতো আমার কেরিয়ার শুরু করছি। ভাইয়া আমি কি দুবাই যাচ্ছি।
আটজন মেয়ের ভেতর, যদি কেউ যায় সে হবে তুমি এবং তুমি।
আর মডেল…
আমি তোমাকে দুবাইতে, একটি বৃটিশ কোম্পানির মডেল হওয়া প্রায় সম্পন্ন করে ফেলেছি। তুমি কি প্রমাণ দেখতে চাও। ডায়মন্ড জুয়েলারীর মডেল। তোমার হাতের আঙ্গুলগুলো আমাকে দেখাওতো।
ইলোরা দুই হাতের দশ আঙ্গুল শাহরিয়ার সাহেবের সামনে মেলে ধরে।
ইলোরার দশটি আঙ্গুল শাহরিয়ার নাড়াচাড়া করে। বার কয়েক কাউন্ট করে। মনে হয় আরো কতগুলো আঙ্গুল থাকা উচিৎ ছিল এবং আর আঙ্গুল না থাকার কারণে ইলোরা বেশ দুঃখিত।
ভাইয়া, ডায়মন্ডের জুয়েলারী এড কি আমাকে দিয়ে হবে না?
আমি চাইলে কেন হবে না।
তাহলে আমাকে আশ্বস্ত করছেন না কেন?
আমি তোমাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি এবং জুয়েলারী মডেলের রূপে তোমাকে ইমাজিন করছি। ইলোরা তুমি তোমার আঙ্গুলগুলো দিয়ে আমার ঠোঁট ছুঁয়ে দাও। পাকা একটি আর্ট রাখার চেষ্টা করবে। যে আর্টে ক্রেজি, সেক্সী এক্সপ্রেশন থাকবে। যেহেতু এডটা বিশেষ এক জনগোষ্ঠীর খুব পরিচিত সিম্বল, অতএব তোমাকে আলাদা ড্রেসে উপস্থাপন হতে হবে। তুমি এক কাজ করো। তোমার জামাটা খুলে ফেলো। তোমার রিহার্সেল হচ্ছে। ইটস্ ইউর ক্যারিয়ার।
ইলোরা, খুব স্বাভাবিকভাবে কাজগুলো করে। কোন নৈতিকতার বালাই কাজ করে না। তার মা ইংরেজির অধ্যাপিকা, জ্ঞানি। মা বলেছে, ত্যাগের মাধ্যমে বিসর্জন করার মাধ্যমে নিজেকে বিল্ডাপ করতে হবে। ইলোরা নিজেও সংস্কার মানতে রাজি না। ত্যাগ ও বিসর্জন করার মাধ্যমে দুবাই যাওয়ার টিকিট কনফার্ম করে। উপরে উঠতে হলে এতো কিছু দেখলে চলে না। তাছাড়া শাহরিয়ারের মতো ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছে আÍসমর্পণ কোন দোষের না। এমন বিবেচনায় ইলোরা আÍতৃপ্তিতে হাসি হাসি মুখ করে শাহরিয়ার সাহেবের অফিস থেকে বের হয়। কি যেন পোশাকে লেগে আছে। এমন একটি অহেতুক ধারণায় বারবার পোশাক ঝাড়ে। অথচ ভালো করেই জানা তার পোশাকে পরিচ্ছেদে কোন ধুলোবালি বা নোংরা লেগে নেই। নতুন একটি অভিজ্ঞতা নিয়ে ইলোরা ঘরে ফেরে। অভিজ্ঞতার সবটুকু মাকে ব্যক্ত করা যাবে না। সবকিছু ব্যক্ত করার নিয়মও নেই। মানব জীবনের নিয়মেই হলো এমন। সবকিছু ব্যক্ত না করা।
মোবারক ভাই, মহিলা হোস্টেলে আমার একদম ভালো লাগে না। তাহলে কি করতে চাও।
আপনার ওখানে চলে আসি। আমি পাঁচ রুমের একটিতে থাকবো।
শোন, তোমাকে খালা আম্মা হোস্টেলে রেখে গেছে। তাছাড়া আমি একা থাকি।
আমি জানি না, আমি মাকেও বলে দিয়েছি। মা ফোন করেছিল ওখানকার খবরও ভালো না। আমার বিদেশী সাদা চামড়ার বাবার অন্য ঘরের সন্তানাদি আছে। তারা মামলা করেছে। মা সম্ভবত ব্যর্থ হবে। অর্থাৎ মা ছালা আম দু’টোই খোয়াবে।
আচ্ছা তুমি এখন কোথায়?
আমি এখন আপনার বাসার সামনে। সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছি। মাথায় স্কার্ফ পরা। পুলিশ গ্রেফতার করলেও করতে পারে।
তো সন্দেহজনকভাবে তোমার ঘোরাঘুরি করার দরকারটা কি। আবার বাসার সামনে এসে ফোনে কথা বলো। তোমার কি মাথা খারাপ হচ্ছে?
মোবারক ভাই, আমারও সন্দেহ হচ্ছে। সম্ভবত খুব দ্রুত আমি পাগল হয়ে যাবো। নেংটা হয়ে বাবার মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো। চেনাজানা লোকেরা বলাবলি করবে। পাগল বাবার পাগল কন্যা। খুব ভালো হবে তাই না। আমি কি বাসায় ঢুকবো?
আসো, এতো অনুমতি নেয়ার কি আছে।
অনুমতি নেয়া দরকার আছে। অনুমতি নেয়া সুন্নত।
আহা- সুন্নত প্রেকটিস করা শুরু হয়েছে। ফরজ টরজের খবর কি আছে।
কেন থাকবে না। তবে ফরজের সাথে টরজ মেলানো আপনার ঠিক হয়নি।
স্যরি, আর মেলাবো না। এখন দয়া করে বাসায় প্রবেশ করো।
আমার মা আছে, গত পরশু নিয়ে আসছি। বেশিদিন বাঁচবে না। আমাকে বলেননি কেন?
না বলার যথেষ্ট কারণ আছে। মা উল্টা পাল্টা কথা বলে। বয়স বেশি হলে যে রকম হয় আর কি। তোমাকে উল্টা পাল্টা প্রশ্ন করতে পারে। কিছু মনে করো না।
কথা শেষ না হতেই। ইলা দরজা ঠেলে বাসায় ভেতর প্রবেশ করে। হাতে বিশাল সপিং ব্যাগ।
মোবারক খেয়াল করে। ইলার নাক মুখ ঘেমে আছে। ঘামের বিন্দুগুলোর উপর ইলেট্রিক লাইটের আলো পড়ে ঝিলিক ছড়াচ্ছে। মনে হচ্ছে, এক মুঠ পাকা মুক্তা। ইলার মুখে নাকে বিছিয়ে আছে।
মোবারক ভাই। দৃষ্টি অবনত রাখুন। জানেনতো দৃষ্টির ব্যাপারেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তুমি কি বিশেষ কোনো অসুখে ভুগছো?
হ্যাঁ, রোগটির নাম হলো রিলিজিয়াস ফোবিয়া। রোগটি কিন্তু খারাপ না।
তুমি রোগটির নামও মুখস্ত করে ফেলছো।
কৈ খালা আম্মা কোথায়?
ঐ ঘরে শুয়ে আছে। তুমি তার কাছে যাওয়ার দরকার নাই। আজেবাজে কথা বলবে।
সমস্যা নাই, আজেবাজে কথাও শোনা দরকার। দেখি কি ধরনের কথা বলে।
যাও, সমস্যায় পড়ে আমাকে আবার দোষারোপ করো না। আর শোন মার কিন্তু তোমার ঐ রোগটাও আছে। দেখবা সব সময় হাতে তজবী। আর ব্যাগ ভর্তি এই সব কি? চিকেন বোম নাতো?
হ্যাঁ, আসার আগে এগোরা থেকে কেনাকাটা করলাম। আপনিতো শুধু আলু ভর্তা ডাল দিয়েই খাদ্যপর্ব সারেন।
কিন্তু তাওতো আর কপালে জুটছে না। আলু এখন ছাব্বিশ টাকা কেজি ডিম বত্রিশ টাকা হালি। মইন ইউটাকে ধরে প্যাদানি দেয়া দরকার। ভাত রেখে আলু খান। বেড্ডিশান পাঁচ তারা হোটেলে আলু কেকের উৎসব। এখন তরকারী খেতেই আলু পাওয়া যায় না।
এত দরদামের বাজার থেকে তুমি এতো কিছু কেনো আনলে?
সমস্যা নেই। অতিরিক্তগুলো ফেলে দিব। এখন নির্দিষ্ট করে বলুন খালা কোন ঘরে।
ঐ ঘরটায়।
মোবারক পশ্চিমের রুমটা হাত দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
ইলা ঘরে প্রবেশ করে, বেশ চমকে যায়। কতো দিন পর সত্যিকার মাটির একজন মানুষ দেখতে পেলো। মানুষটার সারা চেহারায় অবসাদের ছাপ নেই। কপালে নেই কোন চিন্তার লেশ। চোখ বন্ধ করে ঠোঁট নেড়েচেড়ে কি যেন পড়ছে। ডান হাতে অফ-হোয়াইট তজবী। মানুষ দেখেও চোখ জোড়ায় কথাটা ইলার বিশ্বাস হলো। ইলা কি করবে, কিছু বুঝে ওঠতে পারে না। হঠাৎ করেই খালা চোখ খুলে। ইলাকে দেখে তেমন চমকে ওঠে না। বরং খুবই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করে।
কিরে ছেমরি, তুই কে?
আমি ইলা। আপনার দূর সম্পর্কের চাচাত বোনের মেয়ে। তোর মা কি বিদেশী লাংয়ের লগে বিয়া বইছিলো?
হ্যাঁ…
তোর মাতো, মানুষ ভালো না। কিন্তু তুই এতো ভালো অইলি কেমনে।
খালা আমিও তেমন ভালো না। নাচ, গান ছাড়া আমি আর ভালো কিছুই শিখতে পারি নাই।
কিন্তু তোর বাবাতো ভালো বংশের পুরুষ। তার মতো অইতে পারলি না?
খালা চেষ্টা করছি।
চেষ্টা কর, চেষ্টাই অইলো আসল। তোর কি বিয়া শাদি অইছে।
না হয় নাই।
দেখতে তো রূপবান। কিন্তু বিয়া অইবো না ক্যা?
তাতো জানি না খালা।
তুই এক কাজ কর। বদমাইশ মোবারকের কাছে বিয়া ব। বদমাইশটা অকাজের, তবে লোক খারাপ না। ওর বাপও ভালো আছিল কিন্তু … মোবারক ভাইতো, আমার দিকে সরাসরি তাকায় না। ওর বাপের মতো অইছে। তোর মনে ধরলে বিয়া অইবে। আমি চেষ্টা তদ্বীর করমু। দয়াল আল্লারে বুজাই কমু। তুই রান্দন বাড়ন জানোছ-নি।
হ্যাঁ…
তাইলে এক কাম কর, তুই রান্না-বান্না কর। তোর আতের রান্দন খাই আইজ।
ইলা খুশিতে কেঁদে ফেলবে অবস্থা। সে দৌড়ে রান্না ঘরে ছুটে যায়। দারুণ একটি উত্তেজনা ভেতরে কাজ করছে। এমন মাটির একজন মানুষ তার হাতের রান্না খেতে চেয়েছে। কে জানে রান্নার অবস্থা কেমন হয়।
ইলা রান্না-বান্না নিয়ে দারুণ ব্যস্ত। রান্নাঘরের অবস্থা মোটেও ভালো না। দরকারি কোন কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। পাওয়া যাচ্ছে না, কথাটা ঠিকানা আসলে রান্না করার দরকারি জিনিসগুলো নেই। মোবারক রান্নাঘরের চাইতে হোটেলের উপর বেশি নির্ভরশীল বোঝা যায়। টিউশানী আর সিনেমার গল্প লেখা ছাড়া কি এমন কাজ যে হোটেলে খেতে হবে। অল্পদিনে আলসারে আক্রান্ত হবে সন্দেহ নেই। হোটেলে আজেবাজে কি সব খাওয়ায়, লোকটা মনে হয় খবরই রাখে না।