গ্যাসের চুলা ধরানোর জন্য, লাইটার ও খুঁজে না পেয়ে, বিরক্ত হয়। ইলার একবার ইচ্ছে করে, চেঁচামেচি করতে। কিন্তু পরক্ষণেই তার এই গৃহিণীপনা তাকে লজ্জায় ফেলে। এই সংসারের সাথে তার কি সম্পর্ক। তার আচরণ বাড়াবাড়ী পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। তাকে নিয়ন্ত্রিত হতে হবে। ঠিক এ মুহূর্তে তার মায়ের উপর বেশ বিরক্ত লাগে, মায়ের কারণেই-ফুফু, খালা দাদা-দাদী সব আত্মীয়স্বজন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আত্মীয়স্বজন ছাড়া একা একা কি জীবন চলে কি সংঘাতিক ক্লান্তি! মা বলেছিল টাকাই সব। কিন্তু টাকা অনেক দরকারী হলেও সব কিছু না, তা এখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করে ইলা। মায়ের দূরসম্পর্কের বোন, মোবারক ভাইয়ের মাকে অনেক আপন মনে হয়। মাথা সামান্য গরম। মুখটা কিছু বেফাস, কিন্তু এরপরও মানুষটার অন্তর খুবই সাদা। চালাকী নেই বুকে।
রান্না-বান্নায় পরিশ্রান্ত ইলা। অনভ্যাসের কারণে রান্নার চিহ্ন শরীরে ছড়িয়ে আছে। ক্রীম কালারের ড্রেসটার বেশ কয়েক জায়গায় হলুদ মরিচের দাগ লেগে আছে। এই ড্রেস পরে আর বাইরে বের হওয়া যাবে না।
ইলার রান্না-বান্নার কষ্ট দেখে, মোবারক বিব্রত। মেয়েটার মাথায় সামান্য সমস্যা আছে। কখন কি করে বোঝাই যায় না। দেখা যাবে, এক্ষনি হয়ত বলে বসবে। মোবারক ভাই চলেন, আই আর মন্ডলের অফিসে। মা আপনাকে বিশ হাজার টাকা অগ্রিম দিয়েছে। সিনেমায় সুযোগ করে দেবার চুক্তিতে। মূল নায়িকা না হোক সাইট নায়িকা হিসেবে সুযোগ দিলেও চলবে। তাড়াতাড়ি চলেন। বিশ হাজার টাকা কম না। আর একটা কথা, আপনার মার কথায় রান্না করে দিলাম, জানেনতো রান্না-বান্না করলে শরীর কালো হয়ে যায়। বাংলা সিনেমায় শরীর সুন্দর এবং নাদুস নুদুস থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু মোবারকের ধারণা মোটেও সত্যি হলো না। ইলা তেমন কোন কিছুই করলো না। বরং নিয়মিত গৃহিণীদের মতো রান্না শেষে গোসল করে এবং মেঝেতে খানা সাজিয়ে খাবার জন্য আহ্বান করে। মোবারক আরো আশ্চর্য হয়। তার মা আবোল কোন কথা বলছে না। সুবোধ বালিকার মতো মত খানা খাচ্ছে। ইলার সাথে নিচু গলায় ফিঁস ফিঁস করে কি যে বলছে এবং মাঝে মধ্যে সামান্য হাসছে। মোবারকের একবার মনে হয় তার মা যেন তাকে চিনতে পারছে না। ইলা যেন তার অনন্তকাল ধরে পরিচিত।
মোবারক আরো অবাক হয়। খাওয়া দাওয়া শেষ হবার পর ইলা এবং মা দরজা বন্ধ করে দেয়। মোবারক ইলাকে কিছু বলারও সুযোগ পায় না। কে জানে মা হঠাৎ করে কি বেফাঁস কথা বলে বসবে। অথচ সন্ধ্যা ছয়টার ভেতর কাকরাইলে আই আর মন্ডলের অফিসে যেতে হবে। সাথে ইলাকে নিয়ে যেতে হবে। অথচ মেয়েটা আধা পাগল মার সাথে শুয়ে আছে। কে জানে কখন ঘুম ভাঙে।
মোবারকের ভেতর সামান্য অস্থিরতা কাজ করে। নতুন চিত্রনাট্য লেখার জন্য ভালো একটা গল্প লেখা দরকার। নানা ঝামেলায় শুরু করা যাচ্ছে না। রাত নয়টার ভেতর আবার দুই ঘণ্টা টিউশানিও সামাল দিতে হবে। টিউশানিও ইদানিং কম ঝামেলা দিচ্ছে না। ছাত্রদের পড়ানোর জন্য, নিজেকেও নিয়মিত পড়তে হয়। কাল রাত থেকে বহু চেষ্টা করেও একটা সরল অংক মিলছে না। ইলার সাহায্য নিয়ে সরল অংকটা মিলানো যায়। ইলা অংকে নাকি খুবই পাকা। কিন্তু মেয়েটা শুয়ে আছে। কে জানে কখন উঠবে। অংকটা নিয়ে আরেকবার চেষ্টা করা যেতে পারে।
মোবারক অংকটার সাথে লড়াই শুরু করে। ঠিক তখনই ইলা রাজহাঁসের মতো গলা বাড়িয়ে মোবারককে ডাকাডাকি করে।
মোবারক ভাই। ও মোবারক ভাই, জলদি আসেন।
ইলার চোখে মুখে সামান্য কৌতুক। ইলা আবারো উচ্চকণ্ঠে ডাকাডাকি করে, কি এক অজ্ঞাত কারণে ইলার তর সইছে না। মোবারক তার মুখে বিব্রত একটি ছবি ঝুলিয়ে রুমের দিকে যায়। ভেতরে সামান্য ভয় ভয়ও লাগে। কে জানে মা কি দুর্ঘটনা করে বসে আছে।
মোবারক রুমের ভেতরে উঁকি দিয়ে অবাক হয়ে যায়। মা স্যালোয়ার কামিজ পরেছে। মাথায় ইরানী স্টাইলের স্কার্ফ, মুখে পাউডার এবং ঠোঁটে হালকা স্ক্রীন কালারের লিপিস্টিক। মা, সামান্য হাসি হাসি মুখ করে বসে আছে। মোবারক লক্ষ্য করে তার মার চোখের নিচে স্থায়ী যে কালো দাগ বসে ছিল তা নেই বললেই চলে। অবশ্য ব্যাপারটা মেকাপের কারসাজিও হতে পারে। তবে ইলার স্যালোয়ার কামিজ পরার কারণে মার বয়স বেশ কম লাগছে। মা বেশ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে।
মোবারক বাজান, তুমি এইখানে বসো। তুমি আমাকে এমনভাবে দেখছো কেনো। স্যালোয়ার কামিজ তো মঙ্গলগ্রহের বাসিন্দাগো পোশাক না যে এমনভাবে দেখতে হবে। তুমি স্বাভাবিকভাবে আমার দিকে তাকাও। আমি তোমার মা হাজেরা বেগম। আর শোন, এই ইলা মাইয়াডারে তোমার বিয়া করতে অইবো। কথা বুজে আইছে। মোবারক আশ্চর্য হয়। তার মা প্রথমে শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে, হঠাৎ করে আবার গ্রাম্যভাষায় কথা বলছে কেনো। সম্ভবত প্রথম কথাগুলো ইলার শিখিয়ে দেয়া। পরের বিয়ে
প্রসঙ্গে বলা কথা মার নিজের মনের কথা। কারণ পরের কথাগুলো বলার সময় ইলার মুখের অভিব্যক্তি এমন একটি সম্ভাবনার চিহ্ন বারবার উঁকি দিচ্ছিল। শোন মোবারক, আরেকটা কথা বলি। ইলার সাথে আমিও সিনেমায় অভিনয় করবো। সিনেমায় আমার মতো বুড়িরা মার ভূমিকায় অভিনয় করে। তুমি কি সিনেমা টিনেমা দেখো না। সিনেমায় দেখবা আমার বয়েসী মহিলারা চানাচুর, জর্দা, সরবত এসবের মডেলিং করে, আমি মডেলিং করলে কোন অসুবিধা আছে?
না মা, আমার অসুবিধা আবার কি?
তা হলে চলো, তোমাদের সাথে আমিও যাবো। কইলো ইলা তাড়াতাড়ি কর।
ইতোমধ্যে ইলা পরিপাটি করে সেজেছে। মার নামাজ পড়া সাদা শাড়ি পরায়, ইলাকে হিন্দি সিনেমার বিধবা নারীদের মতো লাগছে। ইলাকে মন্দ লাগছে না। মনে হচ্ছে স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ইলা যেমন খুশি তেমন সাজের ভূমিকায়। বেশ প্রাণবন্ত অভিনয় করছে।
মা এবং ইলার আধিপত্যে মোবারকের তেমন আর কিছু করার নেই। তবে ইলার কর্মকাণ্ডে হতবাক। কি করে প্রায় অর্ধপাগল অসুস্থ একজন মানুষকে ইলা প্রাণবন্ত করে তুললো। এই মেয়েটা কোন সাধারণ মেয়ে না। এই অসাধারণ মেয়েকে আই আর মণ্ডলের অফিসে গিয়ে কি লাভ?
মোবারক ভাই। এই এলবামটা দেখুন। এলবামে আমার অনেকগুলো ছবি আছে। সব ছবিগুলোই আমি বিশেষ মুডে তুলেছি। মানে অভিনয় করে পোজ দিয়েছি। বিখ্যাত সব ফটোগ্রাফার দিয়ে সেশন করেছি। নববধূর সাজে একটা ছবি আছে। ঐ ছবিটায় সামান্য ভুল আছে। আমাকে বলা হয়েছিল কান্না কান্না ভাব করতে। আমি বারবার হাসি হাসি ভাব করেছি। বিয়ের প্রথম দিন কেন কাঁদতে হবে। আমার বুঝে আসে না। আপনি কি মনে করেন? বিয়ের দিন নববধূকে কি কান্না করা উচিৎ?
উচিৎ অনুচিতের কোন বিষয় না। আসলে গল্পের উপর নির্ভর করবে পাত্রীর কি আচরণ করতে হবে। ধরো তোমার অপছন্দের কেউ তোমাকে জোর করে বিয়ে করলো, এমন গল্পে তুমি কি অভিনয় করবে?
মোবারক ভাই, আমিতো এভাবে চিন্তা করি নাই। গল্পটা আসলে গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্যই, গল্পটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মোবারক ভাই, একটু উঁকি দিয়ে দেখুন তো। গেটের সামনে গাড়ি আসছে কি না।
গাড়ি?
হ্যাঁ, গাড়ি। হেলিকপ্টার নামার হেলিপ্যাড তো নাই। তাই গাড়ি আসবে। আমরা গাড়িতে করে মণ্ডলের অফিসে যাবো। আজ বাদে কাল আমি সেলিব্রেটি, গাড়ি ছাড়া চলাফেরা করলে লোকজন কি বলবে?
ইলা হাসে, ইলার হাসিটা খুবই প্রাণবন্ত। সুখী সুখী এবং রহস্যময়। শোনেন মোবারক ভাই। মা আমাকে নতুন গাড়ি কিনে দিয়েছে। গাড়ির সব কাগজপত্র আমার নামে। কোন ব্যাংক লোন নেই। রেন্ট-এর কারে, গাড়ি দিয়ে রাখছি। প্রতিদিন যা আয় হয় তার শতকরা ষাট ভাগ আমি পাই। ড্রাইভারকে বলেছি, যখন আমার গাড়ি লাগবে, তখন অবশ্যই দিতে হবে।
আচ্ছা ইলা, খালা কি ফোন করেছিল?
হ্যাঁ, করেছিল। সে খুব আপসেট, আমি তোমাদের বাসায় থাকবো এ জন্য।
না থাকলেই হয়। খামাখা খালাকে আপসেট করে কি লাভ?
আপনি চিন্তা করছেন কেনো? আমি মাকে ম্যানেজ করে ফেলবো। ইলার মোবাইলে মিস কল। ড্রাইভার মিস কল দিচ্ছে। মোবারক ভাই, গাড়ি চলে আসছে চলেন বের হই। ইলা চিৎকার করে ডাকাডাকি করে। খালা, ঐ খালা তাড়াতাড়ি আসেন।
মোবারকের মা কিশোরী মেয়েদের মতো আনন্দচিত্তে বেরিয়ে আসে। মোবারক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার মা, কি সুন্দরভাবে হাঁটছে। হেঁটে হেঁটে সে গাড়িতে ওঠে।
অথচ একদিন আগেও তার মা পাঁচ কদম হাঁটলেই হাঁফাতেন। ইলার স্পর্শে হঠাৎ করে কেমন বদলে যাচ্ছে সব। মোবারক নিজেও সম্ভবত বদল যাচ্ছে। মোবারকের বদলে যাওয়াটা মোবারক নিজে স্বীকার করতে চায় না।
এসি গাড়িতে মনটা ফুরফুরে লাগে। নজরুলের গান ফুরফুরে মেজাজে বেশ লাগে। রেডিওতে কবি নজরুলের গান বাজছে। মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী। দেবো খোঁপায় তারার ফুল।
মোবারক তন্ময় হয়ে গান শোনে। আর আশ্চর্য হয়। বর্তমান এই সময়ে রেডিওতে নজরুলের গান বাজে? নজরুলকে ভুলিয়ে দেবার এমন মহা আয়োজন যুগে। বেসরকারি রেডিওতে নজরুল এখন জীবিত? গলা নিচু করে অনুরোধের সুরে, ইলার কাছে ক্ষমা চায় মোবারক। ইলা অবাক হয়ে উল্টো প্রশ্ন করে। কি বিষয়ে ক্ষমা করবে মোবারক বিষয়টা উত্থাপন করতেও লজ্জা পায়। ইলা পুনরায় প্রশ্ন করে। কি বিষয় ক্ষমা করবো বলেন।
ঐ যে মার ঐ কথাটার। মাতো আর বুঝে বলেনি। তোমাকে বিয়ে করার কথাটা মা না বুঝেই বলেছে। প্লিজ কিছু মনে করো না। ঠিক আছে মোবারক ভাই। বিষয়টা নিয়ে আমি ভাববো, দেখি ক্ষমা করা যাবে কিনা। ইলার মুখে রাজ্যের রহস্য খেলা করে। মোবারক চেষ্টা করেও আন্দাজ করতে পারে না।