আই আর মণ্ডল খুবই ব্যস্ত। বিশেষ বিশেষ ইন্টারভিউতে ইলোরা, নূরী, আফসানা, দিলারা, ঝিলিক, সুইটি একশ’তে একশ’ দশ নিয়ে পাস করেছে। এই মেয়েগুলোকে হিন্দি গানের সাথে নাচের রিহার্সেল দিতে হচ্ছে। বেছে বেছে প্রায় কুড়িটা গান বাছাই করা হয়েছে। এই গানগুলো খুবই জনপ্রিয়, নাচের মুদ্রা পুরোপুরি না আসলে দর্শকরা মজা পাবে না। দর্শকদের মনোরঞ্জনের জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আই আর মণ্ডল, প্রযোজকদের কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা এডভান্স পেয়েছেন, তার পকেট পারমাণবিক চুল্লির মতো উত্তপ্ত।
মণ্ডল পাকা কাজের লোক। মূল হিন্দি সিনেমার নায়িকারা গানে যেই পোশাকে সেই রং এবং ডিজাইন কার্টে তার প্রজেক্ট গার্লদের পোশাক তৈরি করে দিয়েছে। স্টেজে সিডি গানের সাথে মেয়েরা যখন নাচবে দর্শকরা অবশ্যই উদ্বেলিত হবে। বাঙ্গালী মেয়ে হিসেবে চিনতেই পারবে না। পোশাকে, নাচে এবং গানের কম্বিনেশনে এতটাই মিল। এক সাথে এতোগুলো মেয়ের ভিসা হওয়া না হওয়া নিয়ে প্রথমে কিছুটা সমস্যা হয়েছিল। কয়েকটা মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বিনিময় এবং আই আর মণ্ডলের দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ভিসাও কনফার্ম করা হয়েছে। এয়ার লাইন্সের টিকেট কনফার্ম হওয়ার শত ব্যস্ততা খাটাখাটুনির ভেতরও মণ্ডলের মেজাজ উড়ন্ত বলাকা। মেজাজ বেশ স্মুথ। বোতল স্পর্শ না করেও কেমন শান্তির ফিলিংস। প্রজেক্ট সাকসেস হলে লাখ পঞ্চাশেক টাকা হাতে আসবে। মণ্ডল বার কয়েক খবর নেয়। মেয়েগুলোর সর্বশেষ প্রস্তুতি কেমন।
ম্যানেজার দিনেশ অভয় দেয়। বস অহেতুক ভাবনার কোন কারণ নেই। সব কিছু প্রস্তুত। এখন বিমানে উঠার ব্যবস্থা করেন। আগামী আঠারো তারিখে ফ্লাইট। তিন মাসের ট্যুর। দুবাই জুড়ে তিন তারকা পাঁচ তারকা হোটেলে প্রোগ্রাম সিডিউল সম্পূর্ণ প্রস্তুত। প্রযোজক গ্রুপের শাহরিয়ার, ইমরুল, তানভিরসহ সবাই একটু আগে ভাগে চলে গেছে। ওখানে স্পন্সর এবং বিলিত্তনিয়ার প্রস্তুত করার বিষয় আছে। গ্রুপের সব ডায়মন্ড ললনাদের, বিভিন্ন এ্যাংগেলে নজরকাড়া ফটোগ্রাফ দিয়ে, চার রঙ্গের সুভ্যেনির তৈরি করা হয়েছে। ফটোগ্রাফের সাথে ফিগার ফাইটাল স্টাটিসটিক্স দেয়া আছে। ভাষা হিসেবে ইংরেজিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, যাতে সব ভাষার লোকরা বুঝতে পারে। ব্যবসার সর্বশেষ কার্যক্রমটা এখন শুধু মার্কেটিং প্রযোজক তানভির এবং শাহরিয়ার কয়েক দফা ফোন করে কোন রকম চিন্তা না করার জন্য বলেছেন।
আই আর মণ্ডল তাই কোন চিন্তা করছেন না। তার মন বেশ ফুরফুরে এমন নর্মাল মেজাজে যে কাউকে এপয়েনমেন্ট দেয়া যায়। মোবারক কিছুটা পাগল টাইপের, ঠিক পাগল টাইপের বলা ঠিক হচ্ছে না। ছেলেটা আসলে সিরিয়াস, সব কিছুকেই একটু বেশি সিরিয়াসলি নেয়। যুগটা বুঝতে চায় না। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার মজাটা ঠিক বুঝে না। মোবারক চায় প্রচলিত যুগটাকেই বদলে দিতে। আই আর মণ্ডলের হাসি পায়। হাসির ভেতরেও মোবারকের প্রতি সমিহ হয়। একদিন হয়ত, এমন সিরিয়াস মনের কোন তরুণই এই দেশের চলচ্চিত্রকে মূল থিমের উপর নিয়ে আসবে। আমরা আপাতত যুগের জলে সাঁতার কাটি। যুগের জলে সাঁতার কাটার মজা খুবই স্বাস্থ্যকর অর্থবান্ধব।
মোবারকের সময় জ্ঞান ভালো। সময় মতো চলে আসার কথা। কিন্তু আধঘণ্টা দেরি হবার পরও না আসার ব্যাপারটা বুঝে আসে না। একবার মনে করে বনানী গেলে কেমন হয়। আবার মনে হয় না, থাক, আর একটু দেখা দরকার। মোবারক তো না জানিয়ে প্রোগ্রাম বাতিল করার লোক না। আই আর মণ্ডল বার কয়েক পায়চারি করে। একবার মোবারকের মোবাইলে রিং করে। কাউকে রিং করা মণ্ডলের অভ্যেস না। মোবারকের ফোন করার বিশেষ কারণ আছে। ছেলেটা কর্মঠ এবং ত্যাগী মানসিকতার। এছাড়া অন্য কারণটি হলো, একটি মেয়ে নিয়ে আসার কথা। মেয়েটি নাকি মেধাবী, নাচ, গান, অভিনয়ে যেমন, তেমনি নাকি সুন্দরী। চলচ্চিত্রে নতুন মুখের কন্যাদের প্রতি মণ্ডলের আলাদা মোহ। এই মোহটিই হয়ত বিশেষ কারণ। নইলে এতক্ষণ অপেক্ষা করা এবং মোবারককে ফোন করা মণ্ডলের মেজাজ বিরোধী। অভ্যাসের খেলাপ। মোবারক পাঁচ মিনিটের মধ্যে অফিসে ঢুকবে। মণ্ডল এয়ার ফ্রেসনার স্প্রে করে ঘরের বাতাস সুগন্ধীযুক্ত করে। আজেবাজে গন্ধে ঘরটা ঝাঁঝালো হয়েছিল।
আই আর মণ্ডলের অফিসে আসে। মোবারকের মা কোন ধরনের অস্বাভাবিক আচরণ করে না। বরং সুবোধ গোবেচারা টাইপের বাচ্চাদের মতো চারদিক দেখে। আই আর মণ্ডল কিছুটা থতমত খায়। এতো সুন্দর ও সাবলীল একটি মেয়ের সাদা শাড়ী পরে আসার কারণ বুঝতে পারে না। মেয়েটির চেহারায় কমনীয়তার আভা যেমন ঝিলিক ছড়াচ্ছে। তেমনি আভিজাত্যের লাবণ্য। সেখানে অভাব অনটনের চিহ্ন নেই। তাহলে এমন সাদা শাড়ী পরে আসার রহস্যটা কি?
মণ্ডল চালাক লোক, সে তার এমন ভাবনাটা কাউকে বুঝতে দেয় না। বেশ শান্ত স্বভাব মুডে কথা বলে। ভাবটা এমন যেন ইলার সুন্দর তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। মেয়েদের এখন সৌন্দর্যে সে যেন ভ্রুক্ষেপহীন। এ পদক্ষেপটা মণ্ডলের শিকার ধরার দু’ধারী তলোয়ার। জীবনে যতবার প্রয়োগ করেছে, সফলতা এসেছে হাতে হাতে।
ইলা নামের মেয়েটাকে খুবই ভাল লাগছে। কিন্তু বিষয়টা মেয়েটাকে বুঝতে দেয়া যাবে না। অবহেলা এবং কঠিন প্রতিযোগিতার কথা বলে মন ভেঙ্গে দিতে হবে। মন ভেঙ্গে যখন মোমের মতো নরম হবে, তখন যেমন ইচ্ছে তেমন আঙ্গিকে ইলাকে পুতুল বানাতে হবে। পুতুলটাকে তখন যেমন ইচ্ছা তেমন করে নৃত্য করানো যাবে। একটি আÍতৃপ্তির হাসি মণ্ডলের ঠোঁটে ক্রীড়ায় মেতে ওঠে …।
মোবারক কি খাবেন?
রঙ চা খাওয়া যায়। তার আগে আরেক বার পরিচয় করিয়ে দেই। এই যে শান্ত হয়ে বসে আছে যে, ইনি আমার মা। আর এই হলেন আমার মার দূরসম্পর্কের বোনের মেয়ে ইলা। খুবই মেধাবী। অসাধারণ প্রতিভা। আমার ক্ষমতা থাকলে ওকে নিয়ে একটি সিনেমা নির্মাণ করতাম। টাকার সংকুলান করতে পারছি না। তেমন কোন প্রযোজকদের সাথে পরিচয়ও নেই।
আহা- ওরকম আক্ষেপ করার কি আছে। আমি তো কথা দিয়েছি। তাছাড়া মেয়েদেরকে সুযোগ দেয়া আমি কর্তব্য মনে করি। কিন্তু কথা হলো এ মাধ্যমে শুধু মেধা থাকলেই চলে না। ত্যাগের মানসিকতা থাকতে হবে। তা কি ওর আছে?
ইলা, তুমি কথা বলো।
হ্যাঁ, ত্যাগের মনোভাবতো অবশ্যই আছে।
তুমি এক কাজ করো, আগামীকাল একবার আসো। আর হ্যাঁ, আমাদের একটা টিম দুবাই যাচ্ছে, ওখানে স্টেজ প্রোগ্রাম হবে। ফ্যাশন শো’ হবে, মঞ্চে নাচ গানের ব্যবস্থাও থাকবে। ইলা রাজী হলে আগামীকাল সকাল দশটার ভেতর পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে ভেরী আর্জেন্ট পাসপোর্ট করতে হবে। দিনে দিনেই পাসপোর্ট দিয়ে দেয়। আমারতো পাসপোর্ট আছে। ইন্ডিয়া, নেপাল ঘুরে আসা। দুবাই যাবার ভিসাও লাগানো আছে, তবে দুবাই যাওয়া হয় নাই। বলো কি, তাহলো তো খুবই ভালো। ভিসা কতোদিনের?
ভিসা গত বছর জুলাই মাসে লাগানো হয়েছিল, ভিসার মেয়াদ নেই। সমস্যা নেই, ভিসা লাগানো কোন ব্যাপার না। তুমি পাসপোর্ট জমা দাও। তবে পাসপোর্ট জমা দেয়ার আগে, ভালোমতো আজ রাতে ভাববে। গার্জিয়ানদের সাথে আলোচনা করবে। মিডিয়ায় কাজ করতে হলে মন থাকতে হবে বিশাল। যাকে বলে মুক্ত মন। সংস্কার থাকলে বড় আটিস্ট হওয়া যায় না।
ইলা বুঝতে পারে, মণ্ডল স্কর্ফ মেনে নিতে পারছে না। বড় মাপের আটিস্ট হতে স্কার্ফ খুলতে হবে। ভেতরে ভেতরে নিজের সাথে নিজে ফাজলামো করে। ইলা গো, তুমি কি বড় আটিস্ট হতে চাও? হ্যাঁ চাই। তাহলে তোমাকে স্কার্ফ খুলতে হবে। জামা কাপড়ে আরো শিথিল হতে হবে। মন থাকতে হবে খোলা। আচ্ছা, কতোখানি শিথিল হতে হবে? আহা মাপজোকের কথা না। তাহলে কিসের কথা? তুমি বুঝতে পারছো না?
আমার মনে হয়, আগামীকাল থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট, আর টিশার্ট পরে মণ্ডলের অফিসে আসি। আর মণ্ডলের অফিসে ঢুকে দরজা বন্ধ করে মণ্ডলের সামনে বিবস্ত্র দাঁড়িয়ে থেকে বলি, হে মহান সংস্কৃতির প্রতিপালক, দেখুনতো আমাকে দিয়ে অভিনয় জগতের কিছু হবে কি না?
এমন হলেতো খুবই ভালো হয়। দুইটি মন পরস্পর হাসাহাসি করে। এই হাসির দৃশ্যটি কেউ দেখতে পায় না। ইলা এক একা আরেকজন কাল্পনিক ইলাকে দাঁড় করিয়ে কথা বলে। মাঝে মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও করা হয়।
ইলা, আরেকটি বিষয় লক্ষ্য করে। মোবারক ভাই দু’টানার ভেতর মণ্ডলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। একটি আক্ষেপও প্রকাশ করে। টাকা পয়সা থাকলে একটি সিনেমা নির্মাণ করতেন। কিন্তু এমন ইচ্ছার কথা কোনদিনতো প্রকাশ করলো না। মোবারক ভাইয়ের সম্ভবত কোন সমস্যা হয়েছে। সমস্যাটা চিহ্নিত করা দরকার। চাপা স্বভাবের মানুষ কষ্ট করে গেলেও বুকের কথাটা বলতে চায় না। মণ্ডল বেশ কয়েকটাইপের ফাস্ট ফুড এনেছে। ইলার খাদ্য তালিকার পিজাও আছে। ইলা খুব আগ্রহ নিয়ে খায়। মোবারক ভাই চা ছাড়া মুখে কিছুই দিল না। খালা বললো সে পান খাবে। তার পান আনার জন্য অফিস বয়কে বাইরে পাঠানো হয়েছে। মোবারক ভাই এবং খালার সামনেই মণ্ডলের দৃষ্টিযুগল ইলাকে নানাভাবে নাড়াচাড়া করে। পুরুষের এই দৃষ্টিটা ইলা ভালভাবেই চিনে। এই দৃষ্টিতে অবশ্য সব পুরুষরা তাকায় না। আলাপ পর্ব শেষে সবাই যখন অফিস থেকে বের হয়। ইলাকে আরেক বার মণ্ডল ডেকে পাঠায় একা। ইলা ভেতরে প্রবেশ করে।
ইলা, দুবাই যেতে তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?
না, অসুবিধা আবার কি?
মোবারকতো আবার রক্ষণশীল, এই জগতের মূল বিষয় বুঝতে চায় না।
এই দিকে আসো।
ইলাকে কাছে যাবার ইশারা করে। ইলা কোন রকম দ্বিধা না করে মণ্ডলের কাছে যায়। মণ্ডল হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়।
ইলা বিমুখ করে না। মণ্ডলের সাথে হাত মেলায়।
মণ্ডল ইলার হাতটা খানিক ধরে রাখে। ফিসফিস করে সাবধান করে। মোবারকের কথা শুনলে বড় মাপের নায়িকা হতে পারবা না। কাল আর্লি এসো তোমাকে নিয়ে মার্কেটে যাবো।
আচ্ছা আসবো, এখন আসি।
ওকে…।
ইলার এতোক্ষণ ভেতরে কি কাজ, মোবারকের ভালো ঠেকে না। টিউশানিতে যেতে হবে। ছাত্রের পরীক্ষা। ছটফটানি একটা ভাব মোবারকের চোখে মুখে। খানিক রাগও লাগে। ইলা বুঝতে পেরে প্রশ্ন করে। মোবারক ভাই কি, কোন ব্যাপারে রাগ করছেন? না রাগ করবো কেন? আসলে আমার ছাত্রের পরীক্ষা। পড়াতে যেতে হবে।
আমারতো মনে হয়, অন্য কোন ব্যাপার।
তোমার এমন মনে হবার কারণ কি?
কে জানে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। আচ্ছা মোবারক ভাই, দুবাই গেলে কোন সমস্যাতো হবে না?
আমি কখনো যাইনি। বলতে পারছি না।
সমস্যা আর কি, আরো পাঁচ সাতটা মেয়েতো যাচ্ছে। তাছাড়া আই আর মণ্ডল লোকতো খারাপ না। আপনি কি বলেন?
আমি কি বলবো, তা ছাড়া তোমার মাওতো অনুমতি দিয়েছে।
মা অনুমতি না দিলে আপনি কি আমাকে নিষেধ করতেন?
না ঠিক তা না।
আচ্ছা বুঝলাম তা না, কিন্তু আপনি কি চান না, আমি নামকরা মডেল হই। নায়িকা হই …।
আচ্ছা এ ব্যাপারে পরে কথা হবে। এখন আমাকে একটু নামিয়ে দাও। আমার ছাত্রের কাল পরীক্ষা।
আমি কিন্তু দুবাই যাচ্ছি এবং সবাই না বললেও আমি যাবো।
তুমি যাও, কিন্তু জেদ করছো কেন?
আমি জেদ করছি আপনাকে কে বললো।
ঠিক আছে, আমিই হয়ত ভুল বুঝছি। আমাকে এবার সাইন্সল্যাবের পাশে নামিয়ে দাও।
ড্রাইভার সাইন্সল্যাবের উল্টাপাশে গাড়ি থামায়। মোবারক রাস্তা পার হয়ে সাইন্সল্যাবের ধার ঘেঁষে হাতির পুলের দিকে চলে যায়। মনে একটা ভাবনা বারবার খোঁচা দেয়। ইলা হঠাৎ করে এমন আচরণ করছে কেনো? নিজেকে নিয়েও খানিক ভাবে। ইলা দুবাই যাবে। সেখানে স্টেজ প্রোগ্রাম করবে। ফাইভ স্টার হোটেলে থাকবে। তার আলাদা টাইপের কোন সমস্যা হতে পারে, কিন্তু শংকা নিয়ে সে কেন ভাবছে। ইলা তার কে? দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। এই কিছুদিন আগেও পরিচয় ছিল না। ইলার মা ইলাকে নায়িকা হিসেবে কোন সিনেমায় সুযোগ করে দেবার জন্য নিয়ে আসে এবং কুড়ি হাজার টাকার দিয়েছে, যাতে আগ্রহ নিয়ে কাজ করি। মেয়েটাকে সুযোগ সৃষ্টি করে দেই। এখন সুযোগ পাওয়া গেছে। এই সুযোগ নষ্ট করা ঠিক হবে না। ইলা বুদ্ধিমতী মেয়ে। সমস্যা হলে মোকাবিলাও করতে পারবে। না পারলেও মোবারকের কিছু যায় আসবে কেন? মোবারক এমন একটি দুশ্চিন্তা নিয়েই ছাত্রের বাসায় যায়। প্রতিদিনের মতো একাগ্রতা পায় না। বারবার বুকের ভেতর কচকচ করে। আর মণ্ডল তেমন লোক ভালো না। চরিত্রগত সমস্যা। নায়িকা বানাতে গিয়ে মেয়েদের বিপদে ফেলে। চলচ্চিত্র জগতে মণ্ডল খুব শক্তিশালী। তাকে কেউ স্পর্শ করতে পারে না। অমন একজন সামর্থ্যবান লোকের হাত থেকে ইলা কি নিজেকে রক্ষা করতে পারবে, সুদূর দুবাই শহরের পাঁচ তারকা হোটেলে? মোবারকের মাথা ব্যথা করে। মাথার সূক্ষ্ম ভেইনগুলো হঠাৎ যেন অধিক রক্ত প্রবাহ বাড়িয়ে দিচ্ছে। খুব ব্যথা! ব্যথায় চোখ লাখ হয়ে ওঠে। দু’টো প্যারাসিটামল একসাথে খেয়েও লাভ হলো না। ব্যথা আরো বাড়লো। চোখ লাল মাথা ব্যথা নিয়ে মোবারক বাসায় আসে।
ইলা খুব স্বাভাবিকভাবে মার সাথে কি বিষয় নিয়ে কথা বলছে সে কথা শুনে মোবারকের মা কিশোরী মেয়েদের মতো হেসে কুটি কুটি। মন খারাপ, মাথা ব্যথা নিয়ে মোবারক লাইট বন্ধ করে শুয়ে পড়ে।
দরজার খটখটানিতে মোবারকের ঘুম ভাঙলো। মোবারক খানিক আশ্চর্য হয়। এতো রাতে মেইন দরজায় কে আসলো। গুরুত্ব না দিয়ে আবার শুয়ে পড়ে। ঠিক তখন, আবার দরজায় খটখটানি শুরু হয়। মোবারক মোবাইলের স্ক্রীনে চোখ রাখে। রাত তিনটা পনেরো মিনিট। এতো রাতে কে এলো? সামান্য চিন্তা করে। ধানমন্ডি রমনা এলাকায় পোস্টিং হয়ে আসা এসি মাইনুল নাতো। বাল্যবন্ধু, যে কোন সময় এসে হাজির হয়। গভীর রাতে হাজির হওয়া ওর ছোটবেলার রোগ। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে এসে ভয় পাইয়ে দেয়। এসে প্রথমে বলবে, সর্বনাশ হয়ে গেছে। এই দ্যাখ রিভলবার, গুলী করে একটা বদমাস মেরে ফেলেছি। এখন আই জি স্যার ডেকে পাঠিয়েছে, স্যারের সামনে যাওয়া যাবে না। কয়দিন তোর এখানে পালিয়ে থাকবো। তারপর ধর ইন্ডিয়া চলে যাবে ব্যস। এমন কথায় যখন গভীর রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। তখন হাসতে হাসতে বলে, দোস্ত ঘুম আসতে ছিল না। বার বার তোর কথা মনে পড়লো, তাই চলে আসলাম। রাগ করিস না।
কিন্তু প্রথমে মিথ্যে বললি কেন?
তোর ঘুম পুরোপুরি ভেঙে দেয়ার জন্য। ঘুম পুরোপুরি না ভাঙলে তোর সাথে কথা বলে মজা পাওয়া যাবে না। পদ্ধতিটা অবশ্য পুলিশী স্টাইল। পুলিশরা রিমান্ডে নিয়ে আসামীকে প্রথমেই একদফা মারপিট করে। এই মারের কারণে আসামীর ব্যক্তিত্ব ভেঙে পড়ে, এই সুযোগে যা ইচ্ছে তাই করানো যায়।
তাই বলে ঐ নোংরা পদ্ধতিটা আমার উপর প্রয়োগ করবি?
দোস্ত কি করবো বল, পুলিশ বলে কথা। পদ্ধতিতো পদ্ধতি, প্রয়োজন হলে প্রয়োগতো করতেই হবে।
কিন্তু, রিমান্ডে এনে মানুষ পেটানো অনৈতিক। পদ্ধতিটা পাল্টানো দরকার। দোস্ত দেশের নিয়মতো আর পাল্টানো যাবে না। ভাবছি চাকরি ছেড়ে দেব। খুব খারাপ লাগে। স্বাধীনমতো ইদানীং কাজ করতে পারছি না। মন খুবই খারাপ, তাই তোর কাছে চলে এলাম রাগ করিস না।
সেই মাইনুলটা আজ আবার এলো কিনা কে জানে।
মোবারক আলসেমী ঝাড়তে ঝাড়তে দরজা খোলে। দরজা খুলে হতভম্ব, দরজায় পাশের বাসায় চাচা দাঁড়িয়ে আছে। চাচার চোহারায় আতংকিত ভাব। মোবারক স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন করে, কি ব্যাপার চাচা, কোন সমস্যা? চাচার চোখ থেকে দরদর করে পানি বের হয়। এমন দৃশ্য দেখে মোবারক বিব্রত হয়। পুনরায় প্রশ্ন করে, চাচা খুলে বলেন কি সমস্যা। বাবা গো, আমার মেয়ে মুক্তি কি যেন খেয়েছে। সম্ভবত বাঁচবে না। তারপরও শেষ একটা চেষ্টা করতে চাই। তুমি সাহায্য করো। আমার সাথে হাসপাতালে চলো। প্লিজ …।
মোবারক দ্রুত বেরিয়ে পড়ে। এমন বিপদে সব কিছু ভাবলে চলবে না। একটা মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা।
মুক্তিরা তিন বোন। কোন ভাই নেই। তিন বোনের মধ্যে মুক্তিই বড়। অনার্স ফোর্থ ইয়ারের ছাত্রী। ছোট দুই বোনের মধ্যে একজন ইন্টার পরীক্ষা দিবে। অন্যজন মেট্রিক দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে। চাচা ছোট্ট করে ব্রিফ দেয়। মোবারক, বাবা খুবই লজ্জার কথা। সংসারের বড় মেয়ে বিষ খেয়েছে। বাকী দুইজনও যে খাবে এতে কোন সন্দেহ নেই। আচ্ছা চাচা, মুক্তি বিষ খেতে গেলো কেনো?
কেন আবার বুঝনা, প্রেমটেম কিছু হবে। ভালো রেজাল্ট করার জন্য কোচিংএ পাঠিয়েছি। মেয়ে শিখছে প্রেম করা। প্রেম করে বিষ খাবি, তা হলে আর লেখাপড়ার কি দরকার। প্রেম করে বিষ খাওয়ার জন্যতো এতো লেখাপড়া করতে হয় না। আমি কি বেঠিক বললাম বাবা মোবারক?
মোবারক লক্ষ্য করে, চাচা মানসিক চাপ থেকে, একটু এলোমেলো কথা বলছে। কন্যাকে অত্যধিক ভালোবাসে বোঝাই যায়। একটু পর পরই রুমাল দিয়ে চোখ মোছে।
ওয়াস রুম থেকে মুক্তিকে ওয়ার্ডে পাঠায়। ওয়ার্ডে কোন বেড খালি নেই। ফ্লোরে শুইয়ে দিয়েছে এ ছাড়া উপায় নেই। ডাক্তার, মুক্তির হার্টবিট, চোখের মণি, ইত্যাদি দেখে বললেন ভয় নাই। পয়জনিংটা তেমন মারাÍক ছিল না। এক ঘণ্টা পর বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন।
এতক্ষণে মুক্তির বাবা কিছুটা শান্ত হয়। তবে নিুস্বরে গাল দিচ্ছে, বদ মাইয়া মরলেই ভালো ছিল। আরে বদ, ভালো কোন কোম্পানির বিষ খেতে পারলি না।
মোবারক দৌড়ে রিলিজ পেপার যোগাড় করে। মুক্তিকে বাসায় নিয়ে আসার অল্পক্ষণ পর ফজরের আজান হলো। মোবারক ভালোমতো গোসল সেরে নেয়। হাসপাতাল থেকে আসার পর শরীরে ফেনাইলের গন্ধে দম বন্ধ হয়ে আসতে ছিল। গোসল করার পর ভালো লাগছে।
নামাজ পড়ার আর ঘুমুতে ইচ্ছে করে না। অভ্যাস নাই, তারপরও রাস্তায় বের হয়। লেকের পাড় ধরে হাঁটে। অনেক মানুষ হাঁটছে। কারো কারো হাঁটার ধরণ খুবই অদ্ভুত। কেউ কেউ আবার খুব জোরে জোরে হাঁটছে। মনে হয় খুব তাড়া।