আমরা থামিনি

রক্ত-পাথারে ভেসেছি কত জীবনের কথা ভাবিনি
এসেছে ঝড়ঝঞ্ঝা বজ্রবৃষ্টি, তবুও আমরা থামিনি।

আমরা থামিনি আগুনের হলকায়
সমুদ্র-গর্জন হারিকেন দমকায়
বুলেট-বোমায় কামানের শাসানিতে-
বরং কেটেছি সাঁতার নতুন পানিতে।

থামাতে চেয়েছে বৈরী-ঝড় বারবার
ছিঁড়তে চেয়েছে পাল বহু-শতবার
কতবার যে উঠেছি জেগে রক্ত নেয়ে
তবুও চলেছি বন্ধুর সুড়ঙ্গ বেয়ে।

সামনে চলেছি সদা পর্বত মাড়িয়ে
আবক্ষ রক্তসাগরে রয়েছি দাঁড়িয়ে
কখনো কাঁপেনি বুক হায়েনার জয়ে
আমরা ফিরিনি কখনো ভীরুতা-ভয়ে।

এইতো দাঁড়িয়ে আছি, এভাবে দাঁড়াবো
স্বপ্ন-জয়ে বারবার সম্মুখে বাড়াবো
সামনেই চলা ছাড়া আরতো মানি না
আমরা থামিনি কভু- থামতে জানি না ॥
…………………………………………..

সবুজ পৃথিবীর কম্পন

এ আমার সবুজ মানচিত্র-
শত ঝঞ্ঝার প্রতিকূলে রয়েছে স্থির, অবিচল
কখনো হেলে পড়েনি প্রবল ঘূর্ণিতেও।

এ আমার সবল স্বদেশ-
তস্করের শেকড় উপড়ে, বাজের নখর আর শকুনের ছোবল
উপেক্ষা করে বুক টান করে দাঁড়িয়ে আছে।

এই পতাকা আমার সম্রাট শাহজাহানের তাজমহলের চেয়েও
প্রশস্ত, দীপ্তিমান।

এ আমার হাজার বছরের পথ চলার পদচিহ্ন।
এপথে মিশে আছে বখতিয়ার, ঈসা খাঁর পায়ের ধুলো।
তাদের অশ্বের হ্রেষাধ্বনি এবং গগন কাঁপানো খুরের শব্দে
এখনো কেঁপে ওঠে শৃগালের হৃৎপিণ্ড।
এই তো, আমার হাতের মুঠোয় পাক খাচ্ছে বৈশ্বিক আকাশ।
সুনীল আকাশে উড়ছে আমার পতাকার সাথে স্বপ্নীল ঘুড়ি।
পাখির ডানার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে মেঘের রাজ্য।
সকল সীমানাকে তারা নিয়ে এসেছে ডানার আয়ত্তে।

এক সময় ভাবতাম, কবিদের কোনো ঘরের প্রয়োজন নেই।
এখন বুঝেছি, শুধু ঘর কেন-কবির জন্য একান্ত জরুরি
একটি আন্তর্জাতিক, বৈশ্বিক মানচিত্র।
আমার হাতের তালুতে খেলা করছে বিশাল পৃথিবী।

এই তো, এখানে সুদৃঢ় দুর্গের ভেতর সঞ্চিত রয়েছে
আমার বিশ্বাস আর ঐতিহ্যিক রত্ন-ভান্ডার।
কোনো দস্যুর সাধ্য নেই সেখানে হাত বাড়ায়। এ আমার
একান্ত নিজস্ব সম্পদ।

হে মালিক!
আমার স্বপ্নের মানচিত্র আর প্রশস্ত না হলেও
কখনো যেন সংকুচিত না হয়,
যেন থেমে না যায় এই সবুজ পৃথিবীর কম্পন!
…………………………………………..

আমার সবুজ বাংলা

এসো, এইখানে ঘন হয়ে বসি-
ছায়া তরু হিজল তমালের নিচে
অনেক সূর্য আর সন্ধ্যার রঙ মিলেমিশে গড়েছে যেখানে
বহু বর্ণিল এক চিত্রল প্রাণবন্ত ছবি। যে ছবি
আঁকতে পারে না কেউ।

এসো, এইখানে বসি-
যেখানে আকাশ নুয়ে পড়ে কখনো
সাতরঙা রঙধনুর টানে
যেখান থেকে বয়ে গেছে আলপথ দিগন্তবিদারী মাঠের দিকে
সবুজাভ প্রান্তরে।

যেখানে নদীগুলো বয়ে যায় কুলুকুলু অবিরত
যেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে মায়ের স্নেহের মতো জোসনার দ্যুতি
পাখির কলরবে কখনো বা সরব হয়ে ওঠে
ঘন পল্লবিত আম কিংবা বটের শাখা।

এসো এইখানে বসি-
ঝির ঝির নিটোল বাতাস যেখানে উপশিত তালপাতার হাতপাখা
কৃষকের ভারী পা যেখানে এঁকে যায় নন্দিত শিল্পকর্ম
যেখানে হালের বলদ দিনভর স্বপ্ন এঁকে যায়
রুক্ষ মৃত্তিকায় সুকঠিন বুক চিরে,

এসো, এইখানে বসি-
এ আমার শান্ত দিঘির মতো হৃদয় জুড়ানো মায়াবী দেশ-
শিশির ধোয়া মায়ের কোমল আঁচল
অগণিত স্বপ্ন আর প্রগাঢ় প্রশান্তির প্রস্রবণ
মুহূর্তের চাতকী শিহরণ

এ আমার দেশ—
বৈশাখের প্রথম বৃষ্টির মতো প্রতীক্ষিত সঘন দৃষ্টির কাঁপন
শত স্মৃতি বিস্মৃতির ইতিহাসে মোড়ানো এক বর্ণিল আকাশ
সবুজ ঘাসের গালিচাসমৃদ্ধ এদেশ যেন আমার
পবিত্র জায়নামাজ।

এসো এইখানে বসি-
সরল মানুষের মায়া মমতা আর ফুলের সৌরভ
মায়ের শীতল চাহনি, পিতার স্নেহ আর বোনের আদর
নির্মল বাতাস, সবুজ সোনালি ধানের ক্ষেত
অজস্র পুকুর, দিঘি হাওড় বিল খাল নদী-
সব মিলে আমার এদেশ—

বহু মোহনার সংযোজন
গর্বিত সম্ভার-
শ্রেষ্ঠ চিত্রশিল্পীও যে ছবি আঁকতে অক্ষম-
সে আমার দেশ-
এসো, এখানে আরও ঘন হয়ে বসি-
দেখো, কি এক মোহনীয় ভঙ্গিতে বয়ে চলেছে
সহস্র স্বপ্ন বুকে
সুমধুর কলগুঞ্জনে
বহমান কপোতাক্ষ আর বঙ্গোপসাগরের মতো!…
এসো, এইখানে-
এসো আরও ঘন হয়ে বসি।
…………………………………………..

জাগ্রত বর্ণমালা

এ আমার হাজার বছরের প্রবীণতম
সদা জাগ্রত বর্ণমালা-
শস্যভার ক্ষেতের সৌরভ, সবুজের সমরোহ
গন্ধরাজ সন্ধ্যার তন্ময়, জোনাকির উৎসব
স্রোতস্বিনী নদীর কলতান, ঢেউ টলোমল পদ্মদিঘি
মৃত্তিকার সুতীব্র অহংকার।

এ আমার গৌরবান্বিত বর্ণমালা-
অশেষ সংক্ষোভ, সংগ্রাম আর
অনিঃশেষ স্বপ্নের প্রান্তর।
এ আমার সবুজ পল্লবে ঢাকা দোয়েলের শিস
রাখালের মুক্তকন্ঠের সুর, ভাটিয়ালি মুখর সংগীত,
পাখির প্রশান্ত নীড়,
এ আমার লাঙলের ফলা, হাওয়ায় ফেঁপে ওঠা
গহনা নৌকার বাদাম,
কুমোরের সুনিপুণ কারুকাজ;
আমার প্রিয় বর্ণমালা-
কখনো শালবৃক্ষের মতো সুদৃঢ়
আবার কখনো বা মায়ের মায়াবী আঁচল।
এ আমার নিত্যকার উচ্চারিত দীপ্ত বর্ণমালা-
যেন তারাখচিত অনেক আকাশ,
অগণিত শুভ্র মহাদেশ।
প্রতি মুহূর্তের অনুভবে ঐশ্বর্যমণ্ডিত
এক নান্দনিক শিল্প সম্ভার,
আমার প্রিয় বর্ণমালা-
সর্বকালের অবিনাশী গর্বিত অলংকার।
…………………………………………..

স্বপ্নের সানুদেশ

বাতাস কি দেখা যায়? কেবল তার উষ্ণ কিংবা শীতল অস্তিত্বই অনুভব করা যায়।
ঠিক তেমনি হৃদয়ের শোক তাপ কিংবা বেদনাও থেকে যায়
স্পর্শের অতীত।
একমাত্র আদগ্ধ ব্যক্তি ছাড়া সেটা অনুভব করতে পারে না কেউ
এমন কি রং বর্ণ এবং গন্ধহীন বলে
তার খরদাহ থেকে যায় অন্যের অনুভবের বাইরে।

হৃদয়হীন মানুষ আর পাথরের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই।

যাদের হৃদয় আছে তাদের বুকের ভেতর থেকে উত্থিত
তাপদগ্ধ হাহাকার ধ্বনি বাতাস ভেদ করে পৌঁছে যায়
অসীম গোলকে।

এ আমার স্বপ্নের দেশ।
ঠিক যেন আমারই হৃৎপিণ্ড!
এখন আমি অনুভব করতে পারছি তার বুকের তড়পড়ানি
আর এক বেদনার্ত গোঙানি।
তাহলে আমি কীভাবে সুস্থির থাকতে পারি!
কীভাবে লিখতে পারি প্রেম কিংবা বিলাসী কবিতা?

না, আমার দেশ যখন আমারই হৃৎস্পন্দন তখন সে কেনই বা আমাকে এমনি দাহন বেলায়
সুস্থ মানুষের মতো নির্বিঘ্নে ঘুমুতে দেবে!

বস্তুত স্বদেশ এবং কালই এখন আমাকে মরু প্রান্তরের
যাযাবরের মতো দাবড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
আর আমি শত ছিন্ন অনিশ্চয়তার তাঁবু থেকে আমার
হরিৎ ফসলে ঘেরা সবুজ প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে
কী এক সুতীব্র স্বপ্নাবেগে উচ্চারণ করছি-
হে সবুজ প্রান্তর-সাক্ষী থাকো-
হে বঙ্গোপসাগর, কপোতাক্ষ-সাক্ষী থাকো-
হে বিহঙ্গ ও পতঙ্গরাজি-সাক্ষী থাকো-
হে নভোম-ল ও গ্রহানুপুঞ্জ-সাক্ষী থাকো-
আমি এই সবুজ মৃত্তিকারই এক অধঃস্তন কবি-
যে মাতৃদুগ্ধের ঋণের মতো স্বদেশের দায়ভারও সমান বয়ে বেড়াচ্ছে।

আর আমার সকল উচ্চারণ তো এখন কেবল তাঁরই জন্য সমর্পিত-
যিনি এমন একটি শস্যময় পলি-ঊর্বর ভূ-খ-ের অধিবাসী করেছেন।
অতএব কেবল সেই মহান শাহেনশা’র জন্যই আমার তাবৎ কৃতজ্ঞতা এবং অঙ্গীকার।
তবে কেন একজন অনুগত বান্দার মতো আমার ঠোঁটেও উচ্চারিত হবে না-
“ইন্নাস্ সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়ায়া
ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন।”
হে প্রভু!
আমি তো আপনার কাছে আত্মসমর্পণ করেছি-
অতএব এর বিনিময়ে আপনি আমার স্বদেশ ভূমিকে
বাজের নখর থেকে রক্ষা করুন এবং
স্বপ্নের সানুদেশে পরিণত করুন।

এর বেশি আপনার কাছে আমার আর কিছুই চাইবার নেই।

২৫.১২.২০০৬
…………………………………………..

পিতার পাঠশালা

চাঁদনী রাত এলেই মনে পড়ে যায় শৈশবে পাওয়া পিতার কথা।
নিকোনো উঠোনে বিছানা পেতে মাঝখানে বসে আছেন তিনি।
শুরু হয় বৈঠকী দরবার-
আমরা কয় ভাই-বোন তার মগ্ন শ্রোতা।
বহুদশী আমার পিতা!
ত্রিকালের অজস্র স্মৃতির ফসলে ভরে আছে তার হৃদয়ের গোলা।
ভাটিয়ালী, জারি, আর ধুয়ো গানের এক অবাক কিংবদন্তি!
শরতের শিশিরি, চৈত্রের দাবদাহ কিংবা বৈশাখের তাণ্ডব-
তারই সাথে মিশে একাকার হয়ে গেছে কত যে মন্বন্তর, মহামারী,
দুর্ভিক্ষ আর ভয়- শিহরিত কত যে কালের স্মৃতি!
এসবের মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছেন
বিশাল শালবৃক্ষের মতো দুঃসাহসী আমার পিতা।
চাঁদটা ঝুলে আছে হেলে পড়া মিষ্টি কুলের ঘন শাখা- প্রশাখার ওপর।
প্রাজ্ঞ পিতা বলেন- জানো, এই কুল গাছের সাথে মিশে
আছে তোমাদের পিতামহ রহিম বকসের অমলিন স্মৃতি।
আর এই উঠোনটুকুর প্রতিটি ধূলিকণার সাথে এখনো ঝিলিক
দিয়ে ওঠে তোমাদের দাদি বিলকিস বেগমের
মায়াবী মুখ!
বলতে বলতে গাঢ় হয়ে আসে পিতার কন্ঠ।
চারপাশের অবারিত ফসলের ক্ষেত, বৃক্ষরাজি এমন কি
নোচুরকুড়, এদোর বিলও তখন দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

সূক্ষ্মদর্শী পিতা আমার ফিরে যান প্রাচীন গৌরবগাঁথা
ইতিহাসের দিকে।
বলেন- জানো! নীলকর আর বর্গীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের
আগুন জ্বালিয়েছিলেন আমার ঊর্ধ্বতন বংশধর। ঘুমের ভেতর
এখনো শুনতে পাই আবদুল্লাহ আর ইদু কবিরাজের
দুরন্ত অশ্বের দুঃসাহসী হ্রেষা ধ্বনি।
তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠ আর সুদৃঢ় পায়ের ছাপ এখনো ঝড় তোলে
কপোতাক্ষ, বাঁকড়াসহ ভাটি বাংলার প্রতিটি পথ ও প্রান্তরে।
একটা দম নিয়ে চলে যান পিতা আমার
বখতিয়ারের অশ্ব বাহিনীর ভিড়ে-
নবাব শায়েস্তা খাঁ, আন্তরঙ্গজের, নবাব সিরাউজদ্দৌলা,
মীর কাসিমের সাথে উঠে আসেন মওলানা মুহাম্মদ আলী’।
শওকত আলী ভ্রাতৃদ্বয়। উঠে আসেন- বায়েজিদ বোস্তামী, আবদুল কাদের জিলানী
তারপর-তারপর, ইসা খাঁ তিতুমীর, খান জাহান আলী, শাহজালাল, হাজী শরীয়তুল্লাহ।
মুনশী মেহেরুল্লাহসহ কত অসংখ্য মহাপ্রাণ!
আবার কখনো বা ফিরে আসেন-
ফেরদৌসী, শেখ সাদী কিংবা রুমীর কাব্য জগতে।
কৈশোর না ছোঁয়া আমার শ্রোতা-
পিতার প্রজ্ঞার পদ্মপুকুর যেন টলমল করছে। তিনি আবৃত্তি করে
যাচ্ছেন মাইকেল, নজরুল, গুলিস্তা, পন্দেনামা। আবার
কখনো বা আমীর হামযা, বীরাঙ্গনা সোনারভান।
আমরাও পিতার বলার ভঙ্গিতে কেমন ভুলে যেতাম
আমাদের বয়সের কথা। সুস্বাদু দুধের ঘন সরের মতো
মুখে লেপ্টে থাকতো তার প্রতিটি বর্ণনা, কথা কিংবা বাচনভঙ্গি
আর বর্ণমালা প্রতিটি বর্ণের মতো সেসব গেঁথে যেত কচি প্রাণ হৃদয়।

পিতার কাছ থেকে সাহস, দেশপ্রেম আর মহত্ত্বের ইতিহাস শুনতে শুনতে
কখনো বা আমরাও হয়ে উঠতাম উপমিতি নক্ষত্র।
আমাদের জন্য পিতাই ছিলেন শৈশবের প্রধান পাঠশালা
আর তার বুকের মাত্র দশ ইঞ্চি জমিন
চলমান এক বিশ্বকোষ এবং বিশাল অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।

চাঁদটা ক্রমশ হেলে পড়ছে পশ্চিমে। ক্রমশ…
কিন্তু এখনো চাঁদনি রাত এলেই ফিরে যেতে হয় সেই শৈশবে-
যেখানে রয়ে গেছে আমার প্রথম পাঠশালা-
প্রাজ্ঞ পিতার বুকের সুবিশাল ক্যাম্পাস।…
…………………………………………..

বিপুলা পৃথিবী

পৃথিবী, এই বিপুলা পৃথিবী-
এই সবুজ সমতোল, নদী সমুদ্র সমতোট
এই বিপুল বিশাল ঊষার আকাশ
চিত্ত-চপল স্বস্তির বাতাস
সহস্র কলগুঞ্জন, স্রোত আগণন,
গভীর-গভীরতর প্রশান্তির রাত
নিদাঘ দুপুর, উদাস বিকাল, সুস্থির প্রশ্বাস-
তারই ভেতর আমার অন্তহীন বিচরণ
নিত্য সন্তরণ
পৃথিবী, এই বিপুলা পৃথিবী-
নীল ও নীলিমার মতো, বিহঙ্গের পালকের মতো
অরণি ও অরণ্যানীর মতো
বৃষ্টির মতো, বসন্তের মতো
শরতের শিশিরের মতো, হেমন্তের মাঠের মতো
শীতের দিন ও দিগন্তের মতো
কুসুম ও কুমুদের মতো, সঘন সৌরভের মতো
গাঢ় থেকে গাঢ়তর-
বহু বর্ণিল রঙ ও রঙধনুর সমারোহ
অজস্র তারকা খচিত
এই দেশ, মহাদেশ, ভূ-স্বর্গ, বিশ্বপ্রভা-
অনুপম ঐশ্বর্যমণ্ডিত
পৃথিবী, এই বিপুলা পৃথিবী-
সে তো আমার হৃৎপিণ্ডের মতো
প্রার্থনার দৃপ্ত উচ্চারণ
প্রাণাবেগের গভীরতম আলিঙ্গন
পৃথিবী, এই বিপুলা পৃথিবী-
আমার প্রথম এবং শেষতম উচ্ছল
সকল প্রেম ও প্রণয়ের প্রবলতম
উন্মুখর উৎপল…

২৮.৬.২০০৯
…………………………………………..

ঝরে পাতা বিষণ্নতার

শরৎ মানেই তো পাতা ঝরার কাল!
ঝরে, ঝরে পাতা বিষণ্নতার
ক্রমাগত!

কিন্তু তারপরই কচি পত্রপল্লবে সেজে ওঠে বৃক্ষ
নির্জীব থেকে সজীব হয়ে ওঠে
আরও বেশি ঘন হয়ে বসে বৃক্ষের জীবন
যা দেখে আমার মতো কবি কেন-
বিহঙ্গরাজিও বিস্ময়ে হতবাক!

এরই নাম কি মৃত্যু থেকে ফেরা
অনিঃশেষ জীবনের দিকে!

এখন নিম্নে নয়, ঊর্ধ্বে তাকাও।
দেখো বৃক্ষ ও বিহঙ্গের ভ্রুভঙ্গি বিচিত্র বুনন
দেখো তাদের কুশলী জীবন তরঙ্গ
আর কান পেতে শোনো তাদের
নৈঃশব্দিক কলগুঞ্জন।

মূলত মানব-বৃক্ষও এর ব্যতিক্রমী নয়!

মৃত্যুও যে হতে পারে জীবনের চেয়ে দামি
এমনটি আগে কখনো ভাবিনি!…

৮.৩.২০১১
…………………………………………..

উপমহাদেশ

বিপুল বিস্ময় নিয়ে একদা এসেছিলাম এখানে
শুনেছিলাম নদীর কলতান, বিহঙ্গের কলরব
এইতো এইখানে, এশিয়ার সবুজ উপপল্লবে!

এইখানে, এশিয়ার এই স্বর্ণদ্বীপে
সীমাহীন স্বপ্ন নিয়ে এসেছিলাম একদা
আর হৃদয়ে ছিল এক বিশাল উপমহাদেশ।

সময় বদলে গেছে। কালের পিঠে জমেছে বহুস্তর ধুলো।
এশিয়ার আকাশে এখন বাজপাখির ওড়াউড়ি
আর সমুদ্র তটরেখায় হাঙরের দল রোদ পোহাচ্ছে
সীমানার মতোই অরক্ষিত এশিয়ার আকাশ!

এশিয়া কখনো বন্ধ্যা হতে পারে না।
কখনো ছিল না নিষ্ফলা, অনুর্বর
তবুও আজ শুনতে হচ্ছে তার আর্তবিদারী ক্রন্দন!

একেই বলে দুর্ভাগ্য!
এশিয়ার এক কোণে নির্বাসনে আছি
আমি এক ভাগ্যবিড়ম্বিত কবি-
একাকী, নিঃসঙ্গ!

হায় উপমহাদেশ!
কে ভেঙে দিল তোমার উদার প্রশস্ত বিশাল পেখম!

১০.১২.২০১১
…………………………………………..

তোমার শহর

এক.
তোমার শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি
নিয়ে যাচ্ছি সাথে করে ধুলাই মাড়ানো কিছু কষ্ট,
রেখে দেবো যত্ন করে
যাতে না হয় নষ্ট।

ভালো থেকো তুমি
আরও ভালো থেকো
তোমার শহরে একদিন এসেছিলাম মনে রেখো।

এই শহরে যেখানেই দেখবে তুমি পানির ফোঁটা
মনে করো বুকের গভীর থেকে
উঠে আসা
আমার দীর্ঘশ্বাসের অশ্রু ওটা!

দুই.
যে শহরে তোমাকে পেলাম না
সেটা শহর কেমন করে হয়?
নাকি সেখানে আছে কেবল
অদৃশ্য কোনো বরাভয়!

তিন.
নিজেকে আড়াল করার জন্য
অদৃশ্যে, কোথায় লুকিয়ে আছো?
নাকি কোনো বনভূমিতে ঘুমিয়ে পড়েছো?

তুমি ডাকোনি বলে আজ আর ফুল ফোটেনি
পাখিরা জাগেনি
সাগরে জোয়ার আসেনি
আজ আর কোনো জাহাজও ভাসেনি
সমস্ত শহর ডুবে আছে কালো মেঘে
কোথায় চলে গেছো এই শহরকে
একলা রেখে?

কীসের এত কষ্ট, বুক ভরা কীসের এত জ্বালা!
তোমার জন্য বৃক্ষ পল্লব
গুটিয়ে নিয়েছে ডালপালা।
তোমাকে না পেয়ে এই শহরের
সকল সড়ক আরও সরু হয়ে গেছে
পাহাড় ধসে কত ঘরবাড়ি ভেঙে
চুরমার হয়ে গেছে
শোকের বন্যায় ভেসে গেছে
কত শস্য দানা!
তোমার শূন্যতায় বন্য বরাহ
অবিরত দিচ্ছে হানা।
তোমার নাম ধরে কে ডাকে বারবার?
তোমার শূন্যতায় এই শহরে
নেমে এসেছে হাহাকার!
তোমার শূন্যতায়
সকল পাখি গুটিয়ে নিয়েছে ডানা
তোমার শূন্যতায় এই শহর হয়ে গেছে কানা!

তোমার নাম ধরে এই শহর ডাকছে বারবার
আড়াল থেকে বেরিয়ে এসো
সামনে দাঁড়াও একবার।

চার.
আমি তো দূরের যাত্রী,
ঠিকানা নেই যার
শূন্যে ভাসা কবির খবর
কে রাখে আর?

২৮.৯.২০১৯