রঙিন জামা

একটি জামা দিতে পারো
যে জামাটি অনেক গাঢ়!
বুনতে হবে নিজের হাতে
জোসনা মাখা শরৎ রাতে।

জোগাড় করো বোনার আগে
কোথায় কোথায় সেসব থাকে!

পাহাড় থেকে পাথর নাও
গভীর বনে ছুটে যাও
গুল্ম লতা কুড়িয়ে নাও
সবুজ পাতা যত্ত পাও
তারই সাথে চুমকি তারা
আর কিছু নাও ঝর্ণাধারা
ঘুঘু পাখির চোখের মত
বোনের ফুল কোড়াও শত
বন মোরগের ঝুঁটি নাও
প্রজাপতির ডানা দাও
হরিণ চোখের কাজল নিও
বন বাদুড়ের ডানা দিও।
নকশী কাঁথা সামনে রাখো
সেই জামাটির নকশা আঁকো।

সেলাই করো এসব নিয়ে
বুনো গাছের কাঁটা দিয়ে।
সেই জামাটি শেষ হলে
ধুয়ে নিও শিশির জলে।

হয় যেন গো চমকদার
দেখতে লাগে চমৎকার!
দেবেই যখন দিও আমার
শখ যে বড় এমন জামার!

রঙিন জামা বাকুম বাক
হোক না সবাই হতবাক!!
……………………………………………

পুষ্পকলি

দিন দুপুরে ঝিল পুকুরে
গা ছমছম করে
পাহাড়ি এক ছোট্ট মেয়ে
ঝরনা হয়ে ঝরে!

জোছনা ধোয়া দেহ আর
তারার মতো চক্ষু তার
পা দুখানা তুলতুল,
দুই পায়ে জমাট বাঁধে
হাজার বনফুল।
সবুজ পাতার বসন তার
স্বর্ণলতার রঙিন হার।
বনফুলের ঝুমকো কানে
ছুটে বেড়ায় বান্দরবানে।

বন- পাহাড়ের নয়ন তারা
তারই জন্য পাগল পারা।
খরস্রোতা নদীগুলি
তারই নামে ওঠে দুলি।

বন পাহাড় ঝর্নার বাঁকে
সেই মেয়েটি ছুটতে থাকে।
খোঁপায় গোঁজে গন্ধরাজ
বুনোফুলেই সকল সাজ।

গন্ধে আকুল করে প্রাণ
বন বাদাড়ে ছড়ায় ঘ্রাণ।
নাইক্ষ্যংছড়ি কতদূর?
সেখানেও যে তারই সুর!

ও পাহাড়ি মেয়ে গো—
ও পাহাড়ি ঝরনা গো—
নামটি তোমার কি?
বন-পাহাড়ি হেসেই খুন,
নামটি জানোনি?

কমল কোমল ওই মেয়েটির
নাম বলে না কেউ
চোখ রাঙিয়ে বলে আমার
গুনতে থাকো ঢেউ!

সবাই যেন লাজে ভার
কেউ বলে না নামটি তার।

আস্তে করে আমি বলি,
বন-পাহাড়িঐ মেয়েটির
নাম দিয়েছি ‘পুষ্পকলি’!
……………………………………………

বনের মা

কেমন আছো কোথায় আছো
জলদি করে বলো
বনের পাখি দেয় না উড়াল
চক্ষু টলোমলো!

মা হারানো বন পাখিরা
ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে
করুণ সুরে সকাল থেকে
মা মা বলে ডাকছে!
দেখতে পাচ্ছ তাদের কান্না
শুনতে কি পাও ডাক?
ডাকতে ডাকতে বন পাখিরা
নিচ্ছে হাজার বাঁক!

কেউ দেয় না মায়ের খবর
কেউ দেয় না কেউ
সাগর নদী ঝরনা ধারাও
তোলে শোকের ঢেউ!

মা কি তাদের হারিয়ে গেছে?
পাহাড় তাকে টানছে!
মা হারানো বন পাখিরা
তাইতো বসে কানছে!

কোথায় আছো বনের মা
থামাও তাদের কান্না
তাদের জন্য বসাও হাঁড়ি
জলদি করো রান্না।
……………………………………………

বিজয়ের পতাকা

বিজয়ের পতাকা উড়ছে বাতাসে
পত্ পত্ করে
আমার পতাকা উড্ডীন থাকুক
লক্ষ বছর ধরে ॥
আমার পতাকা উর্ধ্বে রেখেছে
উঁচু করে শির
লাল-সবুজে জানান দিয়ে দেয়
আমরা কত বড় বীর,
আমার পতাকা এদেশের কেবল,
মাথা নোয়ানোর নয়
লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাওয়া
তরতাজা রক্তের জয়!
এই পতাকার গৌরব অনেক
অনেক বেশি দামি
বহু ত্যাগের বিনিময়ে পেয়েছি
বিজয়ের পতাকা আমি।
……………………………………………

তোমরা তরুণ

বাধার দরিয়া পেরিয়ে চলো
দিকনা তুফান হানা
স্বপ্ন-জয়ের সাহস নিয়ে
ঊর্ধ্বে মেলো ডানা।

বিশ্বটাকে গড়তে হলে
স্বপ্ন-সাহস থাকতে হবে
এমন মানুষ হতে হবে
জগৎ মাঝে অমর রবে।

শত কষ্ট স্বীকার করে
আজকে সফল হইছো যেমন
সকল বাধা পেরিয়ে জগৎ
গড়তে হবে সামনে তেমন।

তোমরা নবীন ফুলের কুঁড়ি
ফুল ফোটাবে ভাই
জ্ঞান-গরিমায় জগৎটাকে
সাজিয়ে তোলা চাই।

তোমরা জাতির স্বপ্ন-সাহস,
তোমরাই নব জোয়ার
সবার জন্য রইছে খোলা
সম্ভাবনার সকল দুয়ার।

যে আগুন জ্বলছে সদা
হৃদয় গভীরে
সে আগুন ছড়িয়ে পড়ুক
ভেতর-বাহিরে।

নামছে আঁধার নামবে আরও
ঘোর কুয়াশায় ঢাকছে ভোর,
তাই বলে কি বন্ধ হবে
সূর্য ওঠার সকল দোর?

তোমরা তরুণ কালবৈশাখ
তোমরাই জানি ঝড়
নতুন করে তোমরাই পার
গড়তে স্বপ্নের ঘর।
……………………………………………

অভিযাত্রী

নামছে আঁধার নামবে আরও
ঘোর কুয়াশায় ঢাকছে ভোর,
তাই বলে কি বন্ধ হবে
সূর্য ওঠার সকল দোর?

ঝড় উঠেছে তাই বলে কি চক্ষু টলোমলো?
পথের ভয় পথেই থাক এগিয়ে শুধু চলো।

নদী কি আর থেমে থাকে কিংবা ঝরনাধারা?
বুকে যাদের সাহস ভরা ভয় পায় না তারা।

পাহাড় গিরি পর্বত শৃঙ্গ শির উঁচিয়ে আছে,
মনের ভয় দূর করতে যাওনা তাদের কাছে।

দু’চোখ ভরে সাগর দেখো, দেখো উত্তাল ঢেউ
উথাল-পাতাল রাতে দেখেও ভয় পায় না কেউ।

নাবিক যারা তারাই কেবল দুঃসাহসী হয়
ভয়কে ভুলে নতুন জগৎ তারাই করে জয়।
……………………………………………

মা

মাগো তোমার আঁচলখানি মায়ার জালে ঘেরা
মাগো তোমার আদর সোহাগ লক্ষ আঁধার চেরা ॥

চাঁদের চেয়েও মিষ্টি তোমার হাসি
তোমার মায়ায় ঝরে পড়ে ফুল যে রাশি রাশি।
স্বপ্নলোকের চাবি তুমি ভালোবাসার ডেরা ॥

তোমার কোলে মাথা রেখে স্বপ্ন দেখতে চাই
তোমার বুকের সকল সুধা পেতে আমি চাই।
দূর-দূরান্তে আছি একা
মাগো তোমার পাইনা দেখা
বলো মাগো তোমার ছোঁয়া কেমন করে পাই।
তোমার জন্য মাগো আমি কেবল পাগল পারা ॥

পাখির কাছে জানতে চাই কোথায় কেমন আছো
আজও কি মা পথের দিকে তাকিয়ে তুমি আছো?
বুকের ভেতর ব্যথার নদী
বয়ে যায় নিরবধি-
জানি সকল কিছুর চেয়ে মাগো আমায় ভালোবাসো
সকল কষ্ট ভুলে মা আমার চোখে ভাসো।
তবু যে মা সাঁঝের কালে হয় না আমার ফেরা ॥
তোমার ভালোবাসার ঋণ
শোধ হবে কি কোনো দিন
বিশ্বময় ছড়িয়ে আছে তোমার মুখের ছবি
যে ছবিটা যায় না আঁকা, ব্যর্থ শিল্পীÑকবি।
সেই ছবিটা সকল ছবির চেয়েও অনেক সেরা ॥

মাগো তুমি জগৎ আলো
আমার বুকে সাহস জ্বালো
দূরে কিংবা কাছে থাকি ভুলে যেওনা,
তোমর আঁচল সকল সময় বিছিয়ে রেখো মা।
তুমি যে মা আমার কাছে সেইযে পাহাড় হেরা ॥
……………………………………………

শৈশব স্মৃতি

ছেলে বেলার কত স্মৃতি মনে পড়ে যায়
মন ছুটে যায় পাখির মতো আমার সবুজ গাঁয়।

গাঁয়ের পাশে কপোতাক্ষ তার পাড়ে হাট
তিন দিকে তার গাছাগাছালি তেপান্তরের মাঠ।
মাঠ পেরুলে পদ্মদিঘি শান্ত নদীর তীর
চৈত্র মাসে মাট ফেটে হয় শত চৌচির।
তারই বুকে লাঙল ফালায় স্বপ্ন বোনে চাষি
পাখ-পাখালির কিচির-মিচির ভালো বাসাবাসি।

ডাংগুলি আর হাডুডু নিত্য দিনের খেলা
তারই মাঝে গরু নিয়ে মাঠে কাটে বেলা।
পাখির বাসা কাঠ বিড়ালি কেবল খোঁজাখুঁজি
বাউড়ি হাওয়ায় যায় উড়ে যায় গায়ের গামছা বুঝি!
রঙবেরঙের খেলনা নিয়ে কেউবা সাজে সং
কাসার থালায় বাজনা বাজে ঢং ঢঙা ঢংঢং।

গাজীর পুকুর ঝাঁপিয়ে দুপুর চোখটা করে লাল
কখনো বা কোচড় ভরা আম জামরুল তাল।
সেসব নিয়ে ঘরে ফিরতেই মায়ের বকুনি
সুদূর থেকে বাবার শাসন ভারী গলা শুনি।
জোছনা রাতে পুকুর পাড়ে বসে চাঁদের হাট
মিটির-মিটির জোনাক জ্বলা শান বাঁধানো ঘাট।
তারার সাথে সখ্য ভারি, জোছনার সাথে বেশ
ঘুমের মাঝেও থাকে যেন তাদের ছবির রেশ।
ঘুম আসে না সেসব ফেলে, ঝিঁঝি পোকার ডাকে
রাত দুপুরে পিঠা খেতে ডাকি শুধু মাকে।

সাত রাজ্যির গল্পকেচ্ছায় রাত কেটে হয় ভোর
ভোরের লাল সূর্য দেখতে আস্তে খুলি দোর।
দোরটা খুলে বাইরে এলাম পা বাড়ালাম যেই
সামনে শুধু মরু ধু-ধু শৈশব কালটা নেই!
চড়ই পাখির মতোই আমি, নেইতো নিজের বাসা
বিশ্ব ঘুরে পাই না কোথাও একটু ভালোবাসা।

এখন আর নেই যদিও অনেক চেনা প্রীতি
টুপটাপ ঝরে তবু শৈশবেরই স্মৃতি।
ছেলেবেলার কত স্মৃতি মনে পড়ে যায়
উথলে ওঠে সেসব কথা চেপে রাখা দায় ॥
……………………………………………

জোছনা রাতে

ঘন কুয়াশায় যায় না দেখা নদীর দু’কূল
কী যে শোভা গাছে গাছে আমের মুকুল!
তারাদের বাড়ি কই?
অবাক হয়ে চেয়ে রই!
টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি বকুল ॥

পরীদের ঘুম নেই
নূপুরের ধুম যেই

উঠলো বেজে রুমঝুম কাঁপলো আমূল ॥

 বুঝি রাত দুপুরে
 শান বাঁধা পুকুরে

পরীদের হাট বসে গল্পে অতুল ॥

 জোছনার ছাদ ফুঁড়ে 
 আকাশের সীমা ঘুরে

নেচে-গেয়ে পাড়ি দেয় রঙিন শিমুল ॥
মিটি মিটি জোনাক জ্বলে
আমিও তাদের দলে
চকচকে দোলে সোনা দেদুল দুল ॥

 ভুত-পেতের ভয় নেই
 জানালাটা খুলে দেই

তারপর দেখি শুধু জোছনার চুল ॥
……………………………………………

অদ্য দিনের পদ্য

অদ্য আমার জন্মদিন, পদ্য লেখা ভার
ছড়া-ছন্দে আজকে আমি মিলটা দেব কার?

পাখির বাসা হয় না খোঁজা সাতরাজ্যির বনে
ঝুমকো লতা মেঠো ফুলের দৃশ্য জাগে মনে।
ঝিঁঝির সাথে হয় না কথা টিয়ার সাথেও না
দুধের বাটি বাড়িয়ে ধরে আর ডাকে না মা।

ভাবটা তখন ছিল এমন মুক্ত পাখি যেমন
স্বপ্ন ডানার উড়াল এখন আর হয় না তেমন।
নদীর পাড়ে বসে বসে যে কাটাতো দিন
তার যে এখন বেড়েই গেছে কলস ভরা ঋণ।

ঋণ নয়গো ঋণ নয়গো বলো গুপ্তধন
সাগর বলে, তোমার মতো হয়বা কতজন?

মা বলতেন মানুষ হতে যাও বেরিয়ে যাও
বড় হবার স্বপ্ন দিত পদ্ম-দিঘিরাও।
বাবার কথা-ছন্নছাড়া হবেই বুঝি কবি
কীযে হলাম বুঝি না ছাই, সবই এখন ছবি।