সুলেখক, গবেষক, ইতিহাস চিন্তক মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের ভাষার নিজস্বতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকেফহাল। তাঁর স্বতন্ত্র গদ্যভাষা ও বর্ণনাভঙ্গি সুদীর্ঘ প্রক্রিয়ায় বাংলা গদ্য সাহিত্য ও গবেষণা ক্ষেত্রে স্বমহিমায় স্থান করে নিয়েছে। ইতঃপূর্বে তাঁর অনেকগুলো সুখপাঠ্য গ্রন্থ আমরা অবলোকন করেছি। তার মানস কাঠামো ও সৃজনচিন্তার আঙিনায় প্রবেশের সুযোগ হয়েছে নানাভাবে। তার চেতনার গভীরে রয়েছে অদম্য এক শেকড় সন্ধানী বর্ণনাধারা। ইতিহাস গবেষক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে প্রসিদ্ধি পেলেও একজন সফল সাংবাদিকও ছিলেন তিনি। বর্তমানে পেশায় ব্যাংকার হওয়ার সুবাদে তিনি একজন অর্থনীতি গবেষকও। ব্যাংকিং জগৎ ও অর্থনীতি ক্ষেত্রেও আমরা লক্ষ করি তার বেশ কিছু গ্রন্থ। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সাময়িকিতে তিনি উপস্থিত থাকেন স্বমহিমায়। ইতিহাস গবেষণায় তিনি তৈরি করেছেন স্বতন্ত্র ভিন্নধারা। এর পাশাপাশি তার ভ্রমণকাহিনীগুলো প্রাণবন্ত ও সাবলীল। তার রচিত ‘পারস্যের পথে-প্রান্তরে’ পাঠ করেছিলাম ছাত্রাবস্থায় একটি জনপ্রিয় সাপ্তাহিকে ধারাবাহিকভাবে। আর এবার পড়ার সৌভাগ্য হলো ‘কালো গেলাফ’। পড়ে ফেললাম একনিঃশ্বাসে। বলা যায় আত্মস্থ করলাম। পুলকিত হলাম।

মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের ভাষা পাঠককে টানে ব্যাপকভাবে। ছোট ছোট বাক্যে তিনি গড়ে তোলেন ভাবের চাঞ্চল্য ও অনুভবের শব্দতরঙ্গ। এ তো গদ্য নয়, অন্তর্নিহিত অন্তমিলের সফল কবিতা। মলাটবদ্ধ দীর্ঘ কবিতা যেন এটি। তাঁর ভ্রমণলিপি কোনো গদবাঁধা বিবরণ নয়, এক ভ্রমণোপন্যাস। তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে থাকে ইতিহাস, থাকে প্রতিবেদন, থাকে স্মৃতিকথা, থাকে বিশ্বাস, থাকে নিজস্ব শিল্পিত অনুভূতি ও সতীর্থ সহযোদ্ধাদের মনোভাবের বহির্প্রকাশ। আর তাঁর সকল শিল্পের মূলে বয়ে যায় মানবতাবাদের নির্মল চেতনাধারা।

কালো গেলাফকে সাহিত্যের কোন ফর্মে ফেলা যায় তা নিয়ে সাহিত্যবিশারদগণকে মাথা ঘামাতে হবে। মনে হবে, এটা কবিতা নয় কিন্তু কাব্যের অধিক। মনে হবে যেন ইতিহাস উঠে আসে প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো হৃদয়পটে। মনে হবে কোন মহাকবি হৃদয়ের মাধুরী মিশিয়ে রচনা করেছেন শাহনামার মতো জীবন্ত ইতিহাসকাব্য। মনে হবে শেখ সাদীর মতো কোন এক মহাকবি আল্লাহর রাসূলের শানে রচনা করেছেন যুগান্তকারী নাতে রাসূল। আবার মনে হতে পারে, কোন এক মরমি সাধক হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা ও প্রেম দিয়ে কাবার কালো গেলাফ ধরে রচনা করে চলেছেন পৃথিবীর সেরা পঙক্তিমালা। আবার কারো কাছে মনে হতে পারে, কোন এক জগদ্বিখ্যাত ঔপন্যাসিক জীবনের সব বর্ণিল ও বিচিত্র চিত্রকল্প একত্র করে রচনা করেছেন জীবনঘনিষ্ঠ উপন্যাস।

কাব্যবোদ্ধাদের দৃষ্টি আকৃষ্ট করবে ভাষাশৈলীর মাধুর্যে ম-িত নিচের উদ্ধৃতি। মনে হবে, মুক্তক গতিতে দ্যুতি ছড়াচ্ছে আবদুল মান্নানের কলমে :

প্রেম ও প্রার্থনার মঞ্জিলে বসে তোমাকে লিখছি।
চোখের সামনে কালো গেলাফ-মোড়ানো কাবা;
হাজরে আসওয়াদ, হাতিম ও মাকামে ইবরাহিম।
অদূরে জ্বলজ্বল করছে কাবার দরোজা।
হাজির-হাজির…!
অল্প দূরে কালো বৃত্ত বরাবর জমজম কুয়া
রহমতের চিরায়ত ধারার পাশে
সাফা মারওয়ার অবিরাম কুচকাওয়াজ।
হাজেরার অবিশ্রাম দৌড় আর অনিশ্চিত জিজ্ঞাসা:
কেউ কি শুনতে পাচ্ছো?
কেউ কি সাহায্যকারী আছো?
এ নগরীর পথে পথে কতো অশ্রু, কতো
ইতিহাস! সেই আহাদ-আহাদ এখনো ধ্বনিত হচ্ছে
পৃথিবীর নানা প্রান্তে!
তোমরা কবে আসবে এ আবর্তনে?

কালো গেলাফের ভাষাশৈলী বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে প্রফেসর আসকার ইবনে শাইখের কথা মনে পড়ে। তিনি আবদুল মান্নানের ‘সোনার দেশ বাংলাদেশ’-এর রচনাশৈলী সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘এমনি রচনা-রীতি, এমনি শব্দচয়ন আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় দু’জনকে-সুকুমার রায় আর কাজী নজরুলকে। তাঁদেরও ছিল শব্দচয়নে এমনি বশ্য-ক্ষমতা। এ ক্ষমতা আল্লাহর দান। সবার কপালে জোটে না। শ্রদ্ধেয় আবদুল মান্নানের কপালে জুটেছে।’

মানবতা হচ্ছে মানুষের সহজাত গুণ, যা সত্য-সুন্দরের পক্ষে সারিবদ্ধ করে সকল মানুষকে। কাবার কালো খেলাফ থেকে যে আলো ছড়িয়ে পড়ে জগয় তা দূর করে দেয় ভেদ-বিদ্বেষের কালো। ঐক্য-সম্প্রীতির আলো বেড়িয়ে আসে কালো গেলাফের ভেতর থেকেই।

‘কালো গেলাফ’-এর কেন্দ্রে রয়েছে মহান পবিত্র কাবা। আল্লাহর ঘর। যে ঘরের পাশে রাত্রিদিন ‘লাব্বায়িক লাব্বায়িক’ বলে ছুটে আসে সারা পৃথিবীর প্রান্ত থেকে বিশ্বাসী মানুষেরা। কি সে আকর্ষণ? আর কালো পাথর, যাকে স্পর্শ ও চুম্বন করার জন্য এতো ব্যাকুলতা।
‘কাবাঘর তো ইট পাথরের গৃহ ছাড়া আর কিছু নয়/আর কালো পাথরও অন্যসব পাথরের মতোই একখ- পাথর/ কেবল আল্লাহর আদেশেই হয়েছে মহিমান্বিত।’

কাবঘর দলমত দেশ-ভাষা, বর্ণ, মাযহাব, তরিকা নির্বিশেষে সকল বিশ্বাসী মানুষের ঐক্যের প্রতীক। যা অটুট থাকবে কিয়ামততক। আল্লাহর আরশের ছায়াতলে তাওয়াফরত ফেরেস্তাদের মসজিদ বায়তুল মামুরের অবিকল প্রতিকৃতি অনুযায়ী আল্লাহর এক মহান নবী ইব্রাহিম আ. কর্তৃক পুনর্নিমিত এই খানায়ে কাবা। এটি পুনর্নির্মাণের পর আল্লাহ আদেশ দিলেন, ‘ইব্রাহিম তুমি আহ্বান করো কাবা যিয়ারতের।’ তখন তিনি বললেন, ‘পৃথিবীর মানুষের কাছে আমার কণ্ঠস্বর পৌঁছুবে কি?’ মহান আল্লাহ বললেন, ‘সে দায়িত্ব আমার।’ আল্লাহ যে দায়িত্ব স্বয়ং নিয়েছেন তা অসম্পূর্ণ থাকতে পারবে না কখনও। তাই কাবা কখনও তাওয়াফবিহীন থাকে না একমুহূর্তওÑ কেবল নামাযের সময় ছাড়া।

কাবা পৃথিবীর প্রথম ঘর। এটি পৃথিবীর নাভী। এটি হেদায়েতের কেন্দ্র। একে ঘিরে রয়েছে যুগ-যুগান্তরের নানা কাহিনী, নানা ইতিহাস। হযরত আদম আ. থেকে শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ স. পর্যন্ত আর তার উম্মতের চলমান প্রজন্ম পর্যন্ত অদ্যাবধি আটুট অভিন্ন অনুভূতি।

কালো গেলাফে সর্বকালের সকল সত্যাগ্রহীকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়েছে। মানুষের অধিকার, সম্মান ও সাম্য প্রতিষ্ঠায় তাদের নিষ্ঠার স্বীকৃতি ও মক্কা-মদিনাকে মানবসভ্যতার স্মৃতির বন্দর হিসেবে তুলে ধরার প্রয়াস আছে এ গ্রন্থে।

এ গ্রন্থে বিশ্বসাহিত্যের মহান কবি-সাহিত্যিক, জ্ঞানীগুণী ও দার্শনিকদের আত্মিক সংস্পর্শে নিজেকে শানিত করার সুযোগ রয়েছে, আছে বোদ্ধা পাঠকের মনের খোরাক।

‘আজ রাতেই ছেড়ে যেতে হবে বাক্কা! আদম হাওয়া ইবরাহিম ইসমাইল হাজেরা ও মুহাম্মদ সা.-এর স্মৃতির বন্দর। এক অব্যক্ত বেদনা আমায় আঁকড়ে ধরে। নিজেকে দেখি কালো গেলাফের আয়নায়। কী আমার পরিচয়? কিসে সাফল্য? কী আমার পুঁজি? আত্মজিজ্ঞাসায় ক্লান্ত আমি।’

মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ভ্রমণ বৃত্তান্তের পরতে পরতে ব্যক্ত করেছেন সেইসব অনুভূতি। এবং বহির্প্রকাশ ঘটিয়েছেন দীর্ঘ সময় তার সৌদি প্রবাস জীবনের উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতার ঝুলি। এরি মাঝে বর্ণিত হয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস, মহাসাধকগণের জীবনের সুখ-দুঃখ, নবীগণের সিরাত, নবীজীবনের অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতির ইতিবৃত্ত। নানা দেশের নানা মানুষের লাইফস্টাইল, সৌদি প্রবাসী স্বদেশি ভাই- বোনদের সুখ-দুঃখের কাহিনী এ গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে নান্দনিকভাবে। আরবের খাওয়া-খাদ্য, পোশাক-আশাক, ভূপ্রকৃতি ও আবহাওয়ার জীবন্ত বিবরণের পাশাপাশি সেখানকার বৃষ্টির বর্ণনা হৃদয়-মন কেড়ে নেয়।

বৃষ্টিভেজা আরবভূমির বিচিত্র বিবরণ দিতে গিয়ে লেখক তাঁর শৈশব-কৈশোরের বৃষ্টিভেজা দিনের অভিজ্ঞতার স্মৃতিচারণ করেছেনÑ সত্যিই এই আবদ্ধ যান্ত্রিক জীবন ‘ছেড়েছুঁড়ে ‘ফিরে যেতে মন চায় গ্রামে।’

লেখক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বারবার ফিরে যান কালো গেলাফের আয়নায়, নিজেকে চেনার গ্রন্থাগারে। তিনি লিখেছেন : ‘নিজেকে দেখি কালো গেলাফের আয়নায়। কি আমার পরিচয়? কিসে সাফল্য? কি আমার পুঁজি? আত্মজিজ্ঞাসায় ক্লান্ত আমি।’

সত্যিই বাংলা ভ্রমণ সাহিত্য ভা-ারে বইটি অনন্য সংযোজন। ভ্রমণানন্দের সাথে সাথে এর প্রতিটি পর্বে বর্ণিত নৈতিকশিক্ষা মজবুত করে বিশ্বাসের পাটাতন। বাস্তবে যারা কাবাদর্শন করেছেন এই বইটি পাঠে স্মৃতি রোমন্থনে হবেন পুনঃআপ্লুত আর অন্যান্য পাঠকও পেয়ে যাবে ভ্রমণের অলৌকিক তৃপ্তি। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের ভাষায় গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করবে- ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারি পথ/এই পথে মোর হেঁটে যেতেন নূরনবী হযরত/মা ফাতেমা খেলতো এসে আমার ধূলি লয়ে/আমি পরতাম তার পায়ে লুটিয়ে ফুলের রেণু হয়ে/হাসান হোসেন হেসে হেসে/ নাচতো আমার বক্ষে এসে/’…

নবী-রাসুলগণের স্মৃতিবিজড়িত, সাহাবীগণের পদধূলিতে ধন্য, ঐতিহাসিক স্থানসমূহের প্রতিচ্ছবি আত্মার স্ক্রিনে ভেসে উঠবে এবং চেতনার গভীর থেকে উঠে আসা এক সাবলীল বর্ণনাধারায় পাঠককে বিমোহিত করা এ অমূল্য গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘সবুজপত্র’ থেকে। শিল্পি সবিহ-উল আলমের অঙ্কিত প্রচ্ছদ, শিল্পি, কার্টুনিস্ট ও ক্যালিগ্রাফার আরিফুর রহমানের অলঙ্করণে কালার ক্রিয়েশনের ঝকমকে মুদ্রণে উজ্জ্বল গ্রন্থটির পুনরাবির্ভাব ঘটলো ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। যার প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ২০১৫ সালের অক্টোবরে। উন্নত ও রঙিন কাগজে উদ্ভাসিত মুদ্রণে মান অনুসারে গ্রন্থটির মূল্য ২৮০ টাকা। আমরা বইটির বহুল প্রচার কামনা করছি।