বর্তমান বাংলাদেশে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের পরিচয় দান একান্ত নিঃপ্রয়োজন বলে আমি মনে করি। কারণ এই উত্তর-আধুনিক যুগে এসেও মুসলিম জাতি অতিশয় সংকটকাল অতিক্রম করছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে মুসলমানরা বেশ খানিকটা পথ অতিক্রম করতে পারলেও জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে মুসলিম জাতি অনেক অনেক দূর পিছিয়ে পড়েছে। আর বর্তমান বাংলাদেশে ডানধারার ঐতিহাসিক ও গবেষক খুঁজতে হলে তো রীতিমতো উল্টোপথে আর একটা গবেষণাকর্ম শুরু করতে হবে। মহাজ্ঞানের আলো মুসলমানদের হাতে থাকা সত্তে¡ও তারাই আজ সবচেয়ে অন্ধকারে নিমজ্জিত। যুগে যুগে সাধারণ মুসলিম আশায় বুক বেঁধে ছিল যে, অচিরেই তারা হেরার রাজতোরণ দেখতে পাবে। আজ মনে হচ্ছে তা সুদূরপরাহত। যেখানে আজ মুসলিম জাতিকে নতুন করে টিকে থাকার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান বা ইতিহাস গবেষণার মতো কঠিন কাজে আত্মনিয়োগ করার মতো লোকের অভাব দেখা দেবে এটাই স্বাভাবিক। মোহাম্মদ আবদুল মান্নান এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন একজন ঐতিহাসিক হিসেবে। ইতিহাস চর্চা তাঁর নেশা। তবে বরাবরই দেখা গেছে তাঁর নেশার সাথে পেশার একটা দূরত্ব তৈরি হয়েছে। জানি না বর্তমানে প্রবাসে তিনি কোনো পেশায় নিয়োজিত আছেন কিনা।

দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন পেশায় একজন ব্যাংকার। আমরা জানি ব্যাংকিং খুবই জটিল ও গবেষণাধর্মী একটা পেশা। সেটা যদি হয় আবার ইসলামি ব্যাংকিং তাহলে একজন সফল ব্যাংকারকে কী পরিমাণ সময় ও শ্রম দিতে হয় তা অন্তত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তারা সহজেই আঁচ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে মোহাম্মদ আবদুল মান্নানের অবদান সত্যিই ঈর্ষণীয়। আমি তাঁকে যেভাবে পরিশ্রম করতে দেখেছি তা ভাবতে গেলে অবাক লাগে! একজন নিরলস ব্যক্তি ছাড়া এই দুর্লঙ্ঘ পথ পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়। তিনি যখন যশোর ছেড়ে ঢাকায় এলেন তখন সত্যি সত্যিই ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড, মৌচাক শাখা বলে কোন কিছুই ছিল না। অনেকটা ঢাল নেই, তলোয়ার নেই… এর মতো! অফিস নেই, লোকবল নেই তার মধ্যেই তিনি ইসলামী ব্যাংক, মৌচাক শাখার কার্যক্রম শুরু করে দিলেন! অনেকেই হয়তো মনে মনে আমার কথা শুনে মুখ টিপে হাসছেন! কিন্তু যা সত্যি আমি তাই বলছি। যশোর থেকে অনেকটা জেদের বশে তিনি ঢাকায় চলে এসেছিলেন। ঢাকাতে এসে বলা যায় সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায় ইসলামী ব্যাংক, মৌচাক শাখা গড়ে তুলেছিলেন। নিতু মিতু এই দুই মেয়ে আর ভাবী পরিবারের এই কজন সদস্যসহ এসে উঠলেন বাংলা সাহিত্য পরিষদের অফিসের একাংশে সাবলেট নিয়ে। আর এখান থেকেই তিনি কার্যক্রম শুরু করে দিলেন ইসলামী ব্যাংক, মৌচাক শাখার। প্রথমেই তিনি আমাদেরকে বললেন, একটা করে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্যে। আমারা বাংলা সাহিত্য পরিষদের অফিসে বসেই একশ টাকা করে জমা দিয়ে একটা করে ফরম পূরণ করে দিলাম। অ্যাকাউন্ট খোলার সময় আমরা প্রায় সবাই দাবি করেছিলাম এক নম্বরে আমাদের নাম থাক। কিন্তু তিনি আমাদের বললেন, হ্যাঁ, তা অবশ্যই তোমরা দাবি করতে পার এবং এটা যুক্তিসংগতও। তবে এক থেকে একশ দশ পর্যন্ত আমাকে ভিআইপিদের জন্য সংরক্ষণ করে রাখতে হচ্ছে। কারণ এমন অনেক লোক আছেন যারা এই নম্বরের কারণেই ইসলামী ব্যাংকে হিসাব খুলবেন। এরপর তিনি ডোর টু ডোর ঘুরে ঘুরে মানুষকে ইসলামী ব্যাংকে হিসাব খোলার জন্য মোটিভেশন শুরু করেন। কিছু দিনের মধ্যেই সিদ্ধেশ্বরী মসজিদের পাশে দেড় রুমের একটা অফিস ভাড়া নিয়ে ইসলামী ব্যাংক, মৌচাক শাখার কার্যক্রম শুরু করে দিলেন। এটা ভাবতে গেলে অনেকেরই হয়তো চোখ কপালে উঠবে! যা হোক, একক প্রচেষ্টায় যিনি এ ধরনের একটা বৃহr কাজ আঞ্জাম দিতে সক্ষম তিনি জীবনে অনেক বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে মনজিলে পৌঁছবেন এটাই বাস্তবতা।

অনেক দিনের অনেক কথা, অনেক স্মৃতি আজ আমাকে আপ্লুত করছে। একদিন আমি, কবি গোলাম মোহাম্মদ ও আবদুল মান্নান ভাই বাংলা সাহিত্য পরিষদের অফিসে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বসে আছি এমন সময় আট দশজন আওয়ামী সন্ত্রাসী অফিসে ঢুকে গাল-মন্দ শুরু করে দিল এবং বই-পত্র ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হম্বিতম্বি করতে লাগলÑ অফিস না সরিয়ে নিলে আগুন ধরিয়ে দেবে ইত্যাদি। দেখলাম সন্ত্রাসীদের প্রায় সবার কাছেই অস্ত্রশস্ত্র আছে। আমরা তিনজনই এক রুমের মধ্যে আটকা পড়েছি। বিশেষ কি একটা কাজের কথা বলে সহসা মান্নান ভাই বের হয়ে গেলেন। ভাবলাম, মান্নান ভাই তো কেটে পড়লেন, আমরা কী করি! আমি আর কবি গোলাম মোহাম্মদ একদম প্রস্তুত হয়ে গেছি এসপার না হয় ওসপার! কবি গোলাম মোহাম্মদ পেপার ওয়েট হাতে নিয়েছেন আর আমি সংঘাত এড়াতে চেষ্টা করছি। কিন্তু কোন ফল যে হবে না তা ভালই আঁচ করতে পারছিলাম। সন্ত্রাসীরা বই-পত্র ছুঁড়ে ফেলছে আর গালাগালি করছে। ফোনও হাতে নিতে পারছিনে। প্রায় দশ মিনিট পর মান্নান ভাই ফিরে এসে বললেন, ওরা আসছে। আমরা ঠিক বুঝতে পারলাম না ওরা কারা। মান্নান ভাইয়ের কথা শুনে সন্ত্রাসীরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলে চলে গেল। তবে হুমকি দিয়ে গেল এক সপ্তাহের মধ্যে অফিস বন্ধ করে দেয়ার জন্যে। তা না হলে আগুন ধরিয়ে দেবে।

যা হোক, অনেকটা শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেলাম। মান্নান ভাই বললেন, এখন আর কোন কথা নয়, দ্রুত বাসায় চলে যাওয়া দরকার। আমি বললাম, আমরা না হয় বাসায় চলে গেলাম কিন্তু আপনার বাসা তো এখানেই…? বললেন, ভেব না, সব দরোজায় বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে যাও, বাকি আল­াহ ভরসা! তবুও জিজ্ঞেস করলাম, ওরা আসছে! এই ওরা কারা? বললেন, তোমরা তো ভেবেছিলে তোমাদের বিপদের মধ্যে ফেলে আমি পালিয়ে গেছি! কিন্তু বাস্তবতাটা কি? আমরা তিনজন খালি হাতে কখনোই ওদের মোকাবেলা করতে পারতাম না। আমি বাইরে যেয়ে কেন্দ্রীয় অফিসে ফোন করে বলেছি, দ্রুত দশ বিশজন লোক পাঠাতে এবং সেই সাথে থানায় খবর দিতে। এই যে বিচক্ষণতা! এর তুলনা শুধু তিনি নিজেই।