জামিমা পাশ ফিরে দেখলো, তামিম বিছানায় নেই। মধ্যরাতে গেলো কোথায়!
বাথরুমে গেলে তো সাধারণত আলো জ্বালিয়ে যায়!
অস্পষ্ট আওয়াজে ডাক দিলো, কয়েক বার, না কোন সাড়াশব্দ নেই।
নিজেও আলুথালু উঠে পড়লো। বাথরুমের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলো, না, সেখানে তামিম নেই। খচখচ করে উঠলো মনটা। গেলো কোথায়?
ডিম লাইটের আলোয় সব কটি রুমে চক্কর দিয়ে বেলকনির দিকে পা বাড়ালো জামিমা।
দেখলো বেলকনির দরজাটা আধাআধি খোলা, তামিম গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে! ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের লালচে আবিরে মনে হচ্ছে বাহিরে আকাশ জুড়ে আগুন লেগেছে!
জামিমা কিছু না বলে, চুপিচুপি তামিমের পিঠে আড়াআড়ি হাত রাখলো। আর এক হাতে পেঁচিয়ে ধরলো তার কোমর। না, তামিমের কোনো ভাবলেশ নেই। যেভাবে ছিলো, ঠিক সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো। এবার জামিমা নিজের মাথাটাও তামিমের গায়ের উপর এলিয়ে দিলো, সেও চুপচাপ, কোন কথা বলছে না! এভাবে বেশ কিছুক্ষণ কেটে যায়!
তামিমের এবার যেন সম্বিৎ ফিরে আসে, ঘুরে দাঁড়িয়ে জামিমার মাথাটা বুকে তুলে দুহাতে জড়িয়ে ধরে!
জামিমার ততক্ষণে দুচোখে অঝোরধারায় জল গড়িয়ে নামছে! তামিম কিছু বলে না, মাথার চুলে বিলি কাটতে থাকে আলতো করে! এভাবে আরও কতক্ষণ থাকার পর তামিম টের পায় তার বুক ভিজে উঠেছে, তার বুঝতে আর বাকী নেই
জামিমা কাঁদছে। সে জোরে চেপে ধরলো জামিমাকে বুকের সাথে!

দুপুরে প্রচন্ড ঝগড়া হয়ে গেল তাদের মধ্যে সামান্য একটি বিষয়কে নিয়ে! আর্থিক টানাপোড়েনের জের ধরে প্রায়শ
নিজেদের মধ্যে খটরমটর লেগে থাকে। কিন্তু জামিমা আজ হঠাৎ অপমানজনক শব্দবাণে আক্রমণ করে বসলো তামিমকে। তামিম সাধারণত এসব গায়ে মাখে না! কিন্তু আজ আর এড়িয়ে যেতে পারলো না, যেন তার মাথায় একটি বাজ এসে পড়লো! সে তড়িতাহত হয়ে গেল। কাঁচের ঘরে ঢিল ছুঁড়লে যেমন ঝনঝন করে মূহুর্তে পুরো ঘর ভেঙ্গে পড়ে তেমন কথিত সম্মান ও ইজ্জতের প্রশ্নে তামিমের মধ্যবিত্ত মনটাও অযাচিত আঘাতে ধুমড়ে মুছড়ে যেতে থাকে।
বিশ বছরের সাংসারিক জীবনে বহুবার জামিমা তার আর্থিক অনটন নিয়ে বহু কথা শুনিয়েছে, তাৎক্ষণিক খারাপ লাগলেও নিজেকে এই বলে প্রবোধ দিয়েছে সত্যিই তো স্ত্রী কিংবা মেয়ে দুটিকে খাওয়া পরা আর লেখাপড়ার খরচ চালানো ছাড়া তো স্বাদ আহ্লাদ করার কোন উপায় উপকরণ বলতে যা লাগে, তার কিছুই দিতে পারেনি।
সবচেয়ে পীড়াদায়ক হলো চাকুরি থেকে যা রোজগার ‘হাতে তুলে মুখে দেয়া’ অবস্থা থেকে নিজেদের আর টেনে তুলতে পারলো না তামিম। এই টানাটানির সংসারে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিয়ের সময় যৌতুক বলি কিংবা উপহার, যা পেয়েছিলো এখনও বাসার আসবাবপত্র বলতে তাই আছে। নতুন তেমন কিছুই যোগ করতে পারেনি তামিম। জামিমা শখ করে নয়, বাস্তব প্রয়োজনেই খাটটি বদলানোর বহুবার আবদার করেছ। দুজন থেকে তিনজন থাকতে গেলেই ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি অবস্থা হয়, মেয়ে দুটি যখন ছোট ছিলো আড়াআড়ি করেই থাকতে হতো, তখন স্বামী স্ত্রীর পা চলে যেতো খাটের বাইরে! না হয় কোন রকমে কৌণিকভাবে শুতে হতো!
তবুও তামিম একটি নতুন খাট সংসারে জোড়া লাগাতে পারে নি। এই গ্লানি তামিমকে খুঁড়ে খুঁড়ে খায়, কিন্তু সে নিরুপায়।

বিশটা বছর খেয়ে পরে বেঁচে থাকার নামই সংসার। মেয়ে দুটি বড় হচ্ছে, কয় বছর যেতে না যেতে বিয়ে শাদির আয়োজন করতে হবে, কিন্তু কী আছে তামিমের। মাস শেষে বেতনের নামে যা পায় আগে মাসটা টেনেটুনে কাভার করা গেলেও এখন মাসের অর্ধেক শেষ না হতেই শেষ হয়ে যায় টাকা। জোড়াতালি দিয়ে বাকী দিনগুলো চলতে হয়।
একজন বীমা কোম্পানীর কর্মীর প্ররোচনায় দুটি পলিসি খুলেছিল তামিম। বছর দশেক চালিয়েছিলো ঠিকঠাক মতো। নানাভাবে খরচ যে হারে বেড়েছে, বেতন তার সাথে পাল্লা দিতে না পারার কারণে বীমার কিস্তি আর দিতে পারছে না বেশ কয় বছর ধরে! কোম্পানি লোন হিসাবে দেখিয়ে এডজাস্ট করে নিচ্ছে। মেয়াদকাল শেষ হলে হয়তো দুটো হারিকেন ধরিয়ে দিবে তারা! কী বা করার আছে!

তামিম, জামিমাকে বলল,
-চলো, রুমে চলো।
জামিমা নড়লো না, আরও জোরে তাকে জড়িয়ে ধরে থাকলো। বুকে মাথা যেরকম করে ছিলো, সে রকম রেখে অস্ফুট স্বরে বলল,
-সরি, আমার ভুল হয়ে গেছে! আমাকে ক্ষমা করে দাও, আর কখনও এভাবে বলবো না!
-তোমার কী দোষ! আমিই তো অক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রীটা নিয়েও বেঁচে থাকার নূন্যতম সংস্থান করতে না পারার দায় তো আমারই। তুমি, অন্যায় কিছু বলোনি। আমার ব্যর্থতার দায় একান্তই আমার।
-প্লিজ, প্লিজ এভাবে আর নিজেকে কষ্ট দিয়ো না! আমি রাগের মাথায় কথাটা বলে ফেলেছি। আমাকে ক্ষমা করে দাও, প্লিজ!
-যাও, ক্ষমা করে দিলাম!
-চলো, তাহলে ভাত খাবে।
-বলো কি? এখন আর খাবো না।
ঝগড়ার জের ধরে দুপুরে ডাইনিং টেবিল ছেড়ে আধা খাওয়া থেকে তামিম উঠে গিয়েছিল। বিকেলে কিংবা রাতে আর কিছুই মুখে তুলেনি, মেয়েরা অনেক ডাকাডাকি, অভিমান করেও তামিমকে খেতে রাজি করাতে পারেনি। মেয়েরা খুব ভাল করেই জানে তাদের বাবা ভোতাগোসসা। ধীরে ধীরে কালো মেঘ কেটে যাবে। তাই তারা বেশি পীড়াপীড়ি করলো না। জামিমা সরাসরি না বললেও মেয়েদেরকে বারবার ঠেলে পাঠিয়েছে। কিন্তু তামিম গলেনি। না খেয়ে শেষপর্যন্ত শুয়ে পড়েছিল।

এখন প্রথম সুযোগেই জামিমা, তামিমকে খেতে ডাকলো!
জামিমাও যখন এভাবে রাগ কিংবা অভিমান করে, খায় না। তখন নিজ হাতে লোকমা তুলে খাইয়ে দিতে হয় তামিমকে।
জামিমা আড় চোখে তাকায়, মিটমিট হাসে আর খাবার চিবাতে থাকে! আবার কখনও কখনও চোখ দিয়ে পানিও গড়িয়ে পড়ে!

তামিম রাতদুপুরে খেতে রাজি হয় না। কিন্তু জামিমা নাছোড়বান্দা! অনেকটা জোর করে টানতে টানতে এনে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে দিলো।এভাবেই কেটে যায় তাদের ক্লেদাক্ত যাপনের গ্লানি।

এক প্লেটে ঝটপট তরকারি ও ভাত নিয়ে এলো জামিমা।
তামিম বিনা বাক্য ব্যয়ে হাত ধুয়ে এসে প্রথম লোকমাটা তুলে ধরলো জামিমার মুখের কাছে!
-নাও,
-না, তুমি খাও!
-আমি জানি, তুমিও খাওনি।
-হুম, হা করে গ্রাসটা নিয়ে নিল।
জামিমাও হাতে একটি লোকমা তুলে তামিমের মুখে তুলে দিলো।