পাত্র-পাত্রী

মীরাই তার মা জলি আক্তারের কাছে শিলা-নাইমের বিষয়টি তোলে। তিনি শুনে তো অবাক! নাইম যে কোন মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়াতে পারে তা তিনি বিশ্বাস করতে পারেন না। বিষয়টা পরিষ্কার হওয়ার জন্য তিনি নাইমকে ডেকে পাঠান। বিকেল বেলা আসে নাইম। জলি আক্তার ছাদে বসেছিলেন। নাইম এসে মোড়া টেনে বসে তার সামনে। রহস্যময় হেসে তিনি বলেন, ‘কি ব্যাপার, কি শুনতাছি?’
‘কই, কি হইছে খালাম্মা?’ নাইম একটু অবাক হয়ে বলে।
‘তুমি নাকি ডুইবা ডুইবা পানি খাইতাছ? হ্যা।’
নাইম বিষয়টা বুঝতে পারে। কাছেই ছিল মীরা। এক ঝলক তাকায় তার দিকে। তার মুখে কৌতুক লক্ষ্য করে সে। কথা টেনে নিয়ে মীরা অভিনয়ের সুরে বলে ওঠে, ‘আম্মা তুমি বিশ্বাস করবা না, উনি কি সুন্দর কইরা বলেন, ‘শিলা মানে কি জানো? শিলা মানে পাথর। শিলা থেকেই ঝরনার উৎপত্তি। তাই ঝরনা এত চঞ্চল আর উচ্ছল। তুমিও তেমন। হা হা হা।’
নাইম লজ্জায় লাল হয়ে যায়। মীরা যে এমন হুবহু কোট করতে পারে তার ডায়ালগ তা সে ভাবতেই পারে নি। সেই কবেকার কথা! অথচ হুবহু তার মনে আছে, আশ্চর্য! লজ্জা পেয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে সে। পা দিয়ে খুঁটতে থাকে ফ্লোর। জলি আক্তার তার চুল মুঠো পাকিয়ে ধরে হালকা ঝাঁকি দেন, ‘শিলারে কি তোমার খুব পছন্দ?’
নাইম মাথা ঝাঁকায়। খালাম্মা মিষ্টি করে হেসে বলেন, ‘তোমার লাগি তো পাত্রী খুঁইজা হয়রান সবাই। তোমার মারে বলমু আমি? কি কও?’
এবারো মাথা ঝাঁকায় সে। ধীরে ধীরে মুখ খোলে, ‘তবে আমার পছন্দের কথা বইলেন না। মা আমারে খারাপ মনে করবো। মা’র পছন্দ না হইলে আমি শিলারে চাই না খালাম্মা।’
মীরা অবাক হয়ে বলে ওঠে, ‘ও আল্লা, এইডা কয় কি? শিলাও তো একই কতা কয়, বাপ-মায় পছন্দ না করলে কিছু হইব না। এই যে ভাই, আপনেরা কি যুক্তি কইরা লইছেন?’
জলি আক্তার মধুর হাসেন। অনেক ¯েœহ করেন তিনি নাইমকে। ছোট ছেলে অন্তুর সব আদর উজাড় করে দেন তাকে। তার কথায় খুশি হয়ে বলেন, ‘ঠিকই কইছো তুমি। বাপ-মা’র পছন্দ না হইলে না করনই বালা।’
তিনি কিছু একটা ভাবেন গভীরভাবে। তারপর বলেন, ‘তুমি কিচ্ছু ভাইব না। কয়দিন পর মীরার বার্থ ডে। সেদিন তোমার মারে আর শিলার মারে দাওয়াত দিমু নে। ওইদিনই কথা পাকা কইরা ফালামু দেইখ। ঠিক আছে?’
নাইম ঘাড় নাড়ে, কিছু বলে না মুখে।

খুব ঘটা করে মীরার বার্থ ডে পালন করা হচ্ছে এবার। উপলক্ষ একসাথে দুটো। মীরার জন্মদিন, আর নতুন গাড়ী। মীরার বাড়ি অতিথিতে পরিপূর্ণ। মীরা যেন এমন কিছু একটাই চাচ্ছিল। আত্মীয় স্বজন সবাইকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। তার বান্ধবীরাও কেউ বাদ পড়ে নি। নাইমের মা এসেছে জুলিকে নিয়ে। শিলা তার মা-বাবাকে নিয়ে এসেছে। তাদের দোতলা বাড়ি কানায় কানায় পরিপূর্ণ।
আপ্যায়ন নিয়ে মহা ব্যস্ত নাইম। কত কিছুই সামলাতে হয় তাকে। বাবুর্চি তদারকি, কেক অর্ডার করা-নিয়ে আসা ইত্যাদি সব। আপ্যায়নের এক পর্যায়ে শিলার বাবা শওকত হাওলাদার তাকে ডেকে যেচে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার নাম যেন কি?’
‘নাইম, মীরা আমার ছোট বোন।’
‘কি বলেন, আমি তো জানি ওর ভাইরা সবাই জাপান থাকে।’
‘হ্যা ঠিক তাই, আমি মীরার ছোট ভাই অন্তুর বন্ধু। আর আপনি আমাকে তুমি করে বললে খুশি হবো।’
‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে বাবা। কি করছো তুমি? পড়ালেখা কতদূর করেছ?’
‘মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে রেজাল্টের অপেক্ষায় আছি আঙ্কেল। আপনাকে ঠিক চিনলাম না আমি।’
‘আমি শওকত, মীরার বান্ধবী শিলার বাবা । ইস্কাটনে থাকি আমরা।’
পরিচয় শুনে পুলকিত হয় নাইম। শিলার সাথে কয়েকবার চোখাচোখি হয়েছে। কিন্তু কথা বলতে সাহস পায় নি সে। কে কি মনে করে বসে আবার! শওকত সাহেবই আবার বলেন, ‘কিছু করছ আর? নাকি বসে আছো এখনো?’
‘হ্যাঁ আঙ্কেল, মগবাজারে ডি.এইচ ইন্ডেন্টিং-এর একাউন্টস সেকশন দেখছি।’
‘ও আচ্ছা! আমি তো চিনি মনে হয়। রাশমনোর আশেপাশে অফিস, তাই না?’
ভিতর থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে। শওকত সাহেবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নাইম ভিতরে চলে যায়। জলি আক্তার ডাকছেন তাকে। রুমে ঢুকতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায় সে। ভিতরে তার মা সহ আরো বেশ ক’জন মহিলা বসে বসে গল্প করছে। দু’একজন বাদে প্রায় সবাইকেই চেনে সে। তারপরও সে সঙ্কোচ বোধ করে। দরজায় দাঁড়িয়েই গলা খাকারি দিয়ে বলে, ‘খালাম্মা কি আমাকে খোঁজ করছিলেন?’
‘হ্যা, তোমারে কতক্ষণ ধইরা খুজতাছি, কই আছিলা? এদিকে আসো।’
ভিতরে ঢুকে পরিচিত সব মহিলার সাথে কুশল বিনিময় করে নাইম। মা’র পাশের চেয়ারে বসা অপরিচিত মহিলাকেও সালাম দেয়। তিনি সালামের জবাব দিয়ে হেসে বলেন, ‘তোমার মা’র কাছে অনেক প্রশংসা শুনলাম তোমার। শুনলাম তুমি নাকি নতুন চাকরিতে ঢুকেছো, কিন্তু কি কাজ করতে হয় বলতে পারলেন না।’
নাইম মার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকিয়ে বলে, ‘আমার ছোট চাচার অফিস তো তাই মাকে কিছু বলি নি। আসলে অফিসের সবকিছুই দেখতে হয়, তবে একাউন্টসটা বিশেষভাবে দেখছি এখন।’
‘তুমি কি একাউন্টিং নিয়ে পড়াশোনা করেছ নাকি?’
‘জ্বি না খালাম্মা, আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেছি। তবে হিসাব কিতাব ভালো লাগে আমার। রাজনীতি অত পছন্দ করি না।’
‘হ্যা বাবা ঠিকই বলেছ। এখনকার রাজনীতি পছন্দ না করাই ভালো। রাজনীতির কোন চরিত্র নেই। তবে হুজুরদের রাজনীতি কিন্তু ওই রকম না কি বলো!’
‘জ্বি খালাম্মা ঠিকই বলেছেন।’ বলেই মা’র দিকে তাকায় সে। মিটিমিটি হাসছেন রাশিদা বেগম। মায়ের এই রকম সুখী সুখী চেহারা নাইম আগেও একদিন দেখেছিল, প্রথম যেদিন রাসুর কথা বলেছিলেন সেদিন। আজও সেইরকম সুখী সুখী লাগছে তাকে। নাইম ঠিক বুঝতে পারে না ব্যাপারটা।
রাশিদা বেগম এবার মুখ খোলেন, ‘বাবারে দেখ্্ তো উর্মি কই গেলো? অনেকক্ষণ হয় এই আপার মেয়ের সাথে গেছে, দেখতো বাবা কই?’ বলে মা তার পাশের মহিলাকে দেখান। নাইম এবার একটু ভালো করে খেয়াল করে মহিলাকে। তার কথা বলার ভঙ্গিতে স্পষ্ট তিনি শিক্ষিত মহিলা। নাইমকে তাকাতে দেখে তিনি বলেন, ‘হ্যা বাবা আমার মেয়ের সাথে গেছে। ওর নাম শিলা, মীরার বান্ধবী। মনে হয় ওরা ছাদে টাদে হবে।’
নাইমের কাছে এবার স্পষ্ট হয় সবকিছু। সে তাকায় জলি আক্তারের দিকে। তিন মহিলা একইভাবে রহস্যময় হেসে ওঠেন। জলি আক্তার বলেন,
‘তুমি যাও, দেখো ওরা কি করে! একটু গল্প-টল্পও করো তোমরা। এদিকটা সেলিমই দেখতে পারবে। যাও তুমি।’
নিজের অজান্তেই নাইমের হাত চলে যায় তার মাথায়। চুলকাতে শুরু করে। সে ভাবতেও পারে নি এত সফল একটা চিত্রনাট্য তৈরি করতে পারবেন মীরার মা। তাদের সবার হাসিই বলে দিচ্ছে তারা সবাই এই চিত্রনাট্যের সহযোগী। নাইম মাথা চুলকাতে চুলকাতে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।

ছাদের এক কোনে মুখোমুখি চেয়ার পেতে জুলিকে নিয়ে খেলা করছে শিলা। পুরো ছাদ জুড়েই এলোমেলো চেয়ার পেতে বসে গল্প করছে আরো অনেকে। দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখে নাইম। খুব মনোযোগ দিয়ে খেলা করছে শিলা, খেয়াল করছে না কোনদিকে। নাইম ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়। জুলির পেছনে দাঁড়িয়ে গভীরভাবে তাকায় শিলার দিকে। শিলা থমকে যায় হঠাৎ। কি বলবে না বলবে ভেবে পায় না।
খেলা থামতেই বিরক্ত হয়ে পেছনে তাকায় জুলি। ভাইয়াকে দেখে বিরক্ত হয়ে প্রায় শাসনের সুরে বলে, ‘আমরা এখানে খেলা করছি, আর তুমি এসে ডিস্টার্ব করছ! যাও এখান থেকে যাও। তুমি একটা পচা।’
জুলির শাসনে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে ওরা দু’জনই। নাইম ওকে জড়িয়ে ধরে বলে, ‘ওরে দুষ্টুরে একদিনেই পটে গেছিস। বাড়িতে এসে পড়লে তো ঘাড় মটকে খাবি দেখা যায়। এই শোন, তোকে মা ডাকছে, জলদি যা।’
মা’র কথা শুনে দৌড় দেয় জুলি। চেয়ার টেনে বসে নাইম। দু’জন দু’জনের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ। হঠাৎ কারো কলহাস্যে ধ্যান ভাঙ্গে ওদের। ওরা বোঝার চেষ্টা করে ওদের উদ্দেশ্যেই এই হাসি কিনা। না, আশ্বস্ত হয় ওরা। নাইমই কথা বলে ওঠে, ‘কি, পছন্দ হয়েছে পাত্র?’
শিলা মজা করে জবাব দেয়, ‘পছন্দ হয়েছে এত তাড়াতাড়ি কি বলা যাবে? এখনো তো কথাই বলা হলো না। কথা শেষ হোক আগে, তারপর না হয় ভেবে দেখব পছন্দ-অপছন্দ।’
‘হু, এ তো দেখি গালভরা অভিমানের বুলি। তাহলে কি পাত্রের সাথে আগে থেকেই জানাশোনা ছিল নাকি, এত দ্রুত পছন্দ হয়ে গেলো? এত অনুরাগের বীণা বেজে উঠলো যে, হুঁ।’
‘আরে নাহ্্, পাত্রকে আজই প্রথম দেখলাম আমি। আপনার নাম যেন কি জনাব?’
‘আমার নাম’। বলে একটু গলা খাকারি দেয়, ‘নবাবজাদা সয়ফুল মুলক ওরফে মজনু ওরফে ফরহাদ ওরফে আবুল কালাম বিন আফজাল বিন ফয়সাল শেখ বিন হবি মুন্সি ওরফে নাইম।’
নাইমের নাম বলার ভঙ্গিমা দেখে হেসে কুটি কুটি হয় শিলা। নাইম সেই প্রথম দিনের মতো গম্ভীর হয়ে বলে, ‘শিলা মানে কি জানো? শিলা মানে পাথর। শিলা থেকেই ঝরনার উৎপত্তি। তাই ঝরনা এত চঞ্চল আর উচ্ছল। তুমিও তেমন।’
গল্পে পেয়ে বসে নাইম আর শিলাকে। এমন প্রাণখোলা গল্প আর কোনদিন কারো সাথে করেছে বলে মনে পড়ে না তাদের। দু’জনই ভুলে যায় স্থান-কাল-পাত্র। ছাদ যখন খালি হতে শুরু করে তখন উঠতে যাবে এমন সময় দেখে দূরে সিঁড়ির গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন তাদের জননীগণ। তারা কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছেন কে জানে! লজ্জা পেয়ে উঠে যায় তারা। শিলা আগে আগে চলে যায়। ওকে নিয়ে নেমে যান তার মা। নাইমের মা এগিয়ে আসেন তার কাছে। তার মাথায় ¯েœহের হাত রেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘কিরে পছন্দ হইছে এইবার?”
নাইম মুখে কিছুই বলে না, পায়ের দিকে চেয়ে মাথা নেড়ে সায় দেয় শুধু।