দুই শালিক

মীরার কলেজে যাওয়া নিয়ে কি একটা যেন হয়ে গেছে। ওর মা ওকে একা একা কলেজে যেতে দিচ্ছেন না। তিনি নিজেও যে নিয়ে যাবেন সেটাও পারছেন না। মীরাও বিষয়টা মেনে নিয়েছে। অথচ মীরা এত সহজে এসব কিছু মেনে নেয়ার কথা না। কোথাও নিশ্চয়ই ঘাপলা হয়েছে কিছু। তার পরিবারের লোকজন একটা জটিলতার মধ্যে পড়েছে বলেই মনে হয় নাইমের কাছে। খালাম্মা যখন তাকে ফোনে জরুরী তলব করলেন তখনই বিষয়টা নাইম টের পেয়েছিল।
সকাল বেলা নাস্তা না করেই নাইম চলে আসে মীরাদের বাসায়। খালাম্মার রুমে যাওয়ার সময় দেখে মীরা কাঁথা মুড়ি দিয়ে ফুল স্পীডে ফ্যান ছেড়ে শুয়ে আছে। এই একটা বাজে অভ্যাস মেয়েটার। ইচ্ছা করে ধরে পেটায়। ফ্যানটা কমিয়ে কাঁথাটা বুক পর্যন্ত নামিয়ে দিলেই তো হয়, যত্তসব। নাইম নিজের মনে মনে গজরাতে গজরাতে খালাম্মার রুমে ঢোকে।
খালাম্মা ওকে দেখেই হেসে ওঠে- ‘নাস্তা তো খাইয়া আয়ো নাই তাই না’
নাইম বোকার মতো হাসে, কিছু বলে না।
খালাম্মা গলা চড়িয়ে ডাক দেন, ‘বিন্তির মা, নাইমরে নাস্তা দেও আমার ঘরে।’
নাস্তার অর্ডার দিয়েই তিনি নাইমকে মোড়া টেনে খাটের পাশে বসতে বলেন। কোন ভূমিকা না করেই বলে ওঠেন, ‘তোমার তো এখন ক্লাস-পরীক্ষার কোন ঝামেলা নাই? রেজাল্ট হওয়ার আগে তো তুমি একদম ফ্রি, ঠিক না?’
‘জ্বি খালাম্মা, তা ঠিক। আপনি তো জানেনই সব।’
‘হ্যা, সেইজন্যই তোমাকে একটা দায়িত্ব দিতে চাইছিলাম।’
‘জ্বি বলেন, সমস্যা নাই।’
‘শোন, আজকে থেকে মীরাকে কলেজে আনা-নেওয়ার দায়িত্ব তোমার। পারবা না? অন্তু আর বড় দুইটার সাথেও আলাপ করছি। সবাই তোমার কথা বললো। সমস্যা থাকলে কও। শিপলু একটা নোয়া পাঠাইতাছে জাপান থেকে। আসতে যত দিন লাগে। তার আগ পর্যন্ত রিক্সায় যাইবা আইবা। কি পারবা তো?’
একসাথে এত্তগুলো কথা বলেও কোন ক্লান্তি আসে না খালাম্মার। অন্তু নাইমের বন্ধু, এ বাড়ির ছোট ছেলে। অন্তুর বড় দুই ভাই জাপান থাকে বহু বছর যাবত, অন্তু মাত্র কয়েক বছর হলো গেলো। ওরা জাপান যাওয়ার পর এই বাড়ির অলিখিত ছেলে হয়ে গেছে নাইম, সুখে দুখে সবকিছুতেই জড়িয়ে আছে। সে কি উত্তর দেবে ঠিক বুঝতে পারে না। সবাই তার ওপর এত ভরসা করছে, পারবে তো তাদের ভরসার সম্মান রাখতে? ভাবতে গিয়ে একটু সময় কেটে যায় তার। খালাম্মা আবারো বলে ওঠে,
‘অত কি ভাবতাছ। সব খরচ আমি তোমারে দিয়া দিমু। তোমার কোন চিন্তা নাই।’
শুনে নাইম লজ্জা পায়। হেসে ফেলে বলে,
‘না খালাম্মা, আমি ওইসব ভাবতাছি না। সমস্যা নাই, আমি ওকে ইডেনে ঢুকাইয়া দিয়া ক্যাম্পাসে চলে যাব। ওর ছুটি হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্যাম্পাসেই থাকব, তারপর আবার নিয়ে আসবো ওকে।’
‘এই তো আমার বাপের মতো কথা কইছ তুমি।’
খালাম্মা হেসে ফেলেন আত্মবিশ্বাসের সাথে। ইতিমধ্যে নাস্তা এসে যায়। নাইম নাস্তা খেতে শুরু করে। খালাম্মা বিন্তির মাকে দিয়ে মীরাকে ডাকিয়ে আনে। মীরা কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। ওড়না ঠিক করতে করতে এসে নাইমকে নাস্তা করতে দেখেই খোঁচা মারে,
‘আমি কলেজে যামু অহনো নাস্তা করতে পারলাম না, আর তুমি নাইম ভাইরে ডাইক্কা আইনা নাস্তা করতে দিলা। বলো, কি বলবা। আমি রেডি হইতাছি।’
খালাম্মা হেসে ফেলেন মীরার কথায়। ‘আরে তর লাইগাই তো নাইম আইছে। শোন আজকা থেইকা তুই নাইমের লগে কলেজে যাইবি আইবি।’
‘কে রে গো আম্মা তুমি কি নাইম ভাইরে আমার বডি গার্ড বানাইতাছ নাকি?’
খালাম্মা এবার ধমকে ওঠেন, ‘নাইমরে তুই গোবাইজ্যা পাইছছ? যা তাড়াতাড়ি রেডি অইয়া ল।’
নাইম এক মনে করে নাস্তা করছিল। মীরা মাথা নীচু করে নাইমের মুখের কাছে মুখ এনে বলে, ‘আমারে একটা লোকমা দেন খাইতে খাইতে রেডি হই।’
নাইম হাসতে হাসতে রুটির একটা বড় টুকরা ডিম দিয়ে মুড়ে মীরার মুখে তুলে দেয়। এতবড় টুকরা মুখে নিতে গিয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলে মীরা। রুটির টুকরো মুখে তুলেই পড়িমড়ি করে দৌড় দেয় নিজের রুমে। খালাম্মা এবার একটু ফিসফিসিয়ে বলে,
‘একটা সমস্যা হইছে তোমারে পরে বলব। তুমি কিন্তু একটু চোখ-কান খোলা রাইখো।’
নাইম পানি খাওয়া শেষ করে মুখ মুছতে মুছতে বলে, ‘আপনি কিছু ভাববেন না খালাম্মা।’

দয়াগঞ্জ ব্রীজ পার হয়েই রিক্সা পেয়ে যায় ওরা। নাইম আনমনে কি সব ভাবছিল। হঠাৎ করে মীরা উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘দুইটা।’
নাইম বোকার মতো অবাক হয়ে তাকায় মীরার দিকে। মীরা নাইমকে ডান হাতের দুই আঙ্গুল দেখিয়ে মিষ্টি হেসে বলে, ‘দুইটা’।
‘দুইটা কি? বুঝলাম না।’
‘দুইটা শালিক দেখলাম।’
‘মানে কি? তাতে কি হয়েছে?’
মীরা যেন নাইমকে নিয়ে একটু খেলতে চায়। ঘাড় নেড়ে বলে, ‘দুইটা শালিক দেখলাম। আমার ভাল্লাগছে।’
‘ও, আচ্ছা পাগল তো! এই হইছে টা কি তোমার, হইছে টা কি, এ্যা? এমন পাগলের মতো কথাবার্তা বলো কেন?’
‘আইচ্ছা মাস্টার সাব। আমি দুইটা শালিক দেখছি উইড়া যাইতে, আমার ভাল্লাগছে, তাই আমি দুইটা বইলা আনন্দ প্রকাশ করছি, এতে আফনে পাগলামির কি দেখলেন কইনত দেহি আমারে? নাকি আমার মায় আমারে মুহের বুলি হিগানের লইগ্যা লাগাইয়া দিছে আফনেরে।’
নাইম লজ্জা পায়। একটু থতমত খেয়ে যায় মীরার লাগামছাড়া কথায়। ও বুঝতে পারে মীরা খুব ক্ষেপে আছে কিছু নিয়ে। ওকে এই মুহূর্তে আর কিছু নিয়ে ঘাটাতে মন চায় না। চুপ মেরে যায় সে। মীরা একটু অপেক্ষা করে কপাল কুঁচকে নাইমের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে ভেংচি কাটে। নাইম লাজুক হেসে সামনে তাকায়। রিক্সা ততক্ষণে ঠাটারি বাজার পেরিয়ে সিদ্দিক বাজারের গলিতে ঢুকে পড়েছে।

মীরার ক্লাস শেষ হওয়ার কথা সাড়ে বারোটায়। নাইম সোয়া বারোটা থেকে কলেজ গেটে অপেক্ষা করছে। আশেপাশে অনেক অভিভাবক এবং ছেলেরাও অপেক্ষায় আছে। সাড়ে বারোটা বেজে গেছে সেই কখন, কিন্তু মীরার আসার নামগন্ধ নেই। সে অধৈর্য হয়ে ঘড়ি দেখে বারবার। সময় যেন ফুরাতে চায় না। অবশেষে একটার দিকে আরো দুই বান্ধবীর সাথে হাসতে হাসতে মীরা আসে। একজন বিদায় নিয়ে চলে যায়। আর এক বান্ধবী সহ এসে মীরাই পরিচয় করিয়ে দেয়- ‘নাইম ভাই, আমার বান্ধবী শিলা। ইস্কাটনে থাকে।’
শিলা সালাম দেয়। নাইম স্বভাবসুলভ লাজুক হেসে জবাব দেয় সালামের। মীরা কলকলিয়ে ওঠে, ‘আরে শিলা তোরে তো বলিই নাই। নাইম ভাই কিন্তু ভার্সিটিতে পড়েন। এখন পরীক্ষা শেষের ছুটি চলছে, তাই ওনারে আমার বডিগার্ড বানাইয়া দিছেন আম্মা।’
কথাটা বলেই ঝরনার মতো হেসে ওঠে ওরা দু’জন। শিলা যেন একটু বেশি উচ্ছসিত। নাইম মুগ্ধ হয়ে দেখে ওদের কলহাস্য। শিলার হাসি থামতেই নাইমের মুগ্ধ দৃষ্টিতে লজ্জা পেয়ে যায়। নাইম বলে ওঠে, ‘শিলা মানে কি জানো? শিলা মানে পাথর। শিলা থেকেই ঝরনার উৎপত্তি। তাই ঝরনা এত চঞ্চল আর উচ্ছল। তুমিও তেমন।’
মীরা অবাক হয়ে যায় নাইমের কথা শুনে। শিলার দিকে তাকায়। শিলা তখন লজ্জায় মরে যায় আর কি। মীরা উচ্ছসিত কণ্ঠে বলে, ‘নাইম ভাই আপনি এত্তো সুন্দর করে কথা বলতে পারেন! ও আল্লাগো, এতদিন কই ছিলো এই সোনামুখটা।’
নাইম একটু আড়ষ্ট হয়ে যায়। আড়ষ্টতা কাটাতে বলে, ‘ধুর কি যে বলো। তোমার এই বান্ধবীটা অনেক সুন্দর। প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধ হওয়ার মতো। তাই মুখ ফসকে কি না কি বলে ফেললাম।’
‘তাই নাকি তাইলে তো আর আপনেরে ছাড়ন যায় না। চলেন, আমাদের আজ পেট ভরে খাওয়াবেন। এই শিলা ঠিক আছে তো! না করবি না তো আবার?’
শিলা মাথা নাড়ে, না করবে না।