নিশিকন্যা

নাইম শুয়ে শুয়ে ডাইরী লিখছিল। শিলাকে নিয়ে মুগ্ধতায় ভরা ক’দিনের ডায়েরীর পাতা। ইদানিং প্রায় প্রতিদিনই শিলার সাথে দেখাসাক্ষাৎ ও আড্ডা হচ্ছে। লিখতে লিখতে পাঁচ-ছয় পাতা লিখে ফেলেছে কখন, খেয়াল করে নি। ক্রিং ক্রিং শব্দে তন্ময়তা ভাঙে তার।
টেলিফোনটা প্যারালাল কানেকশন করা। মা-বাবার রুমের সেটের সাউন্ড মাইনাসে সেট করা। রাতে সব সময় তাই থাকে, যাতে বাবার ঘুমের ব্যাঘাত না হয়। নাইম হাত বাড়িয়ে টেশিসের নতুন সেটটি টেনে নেয়। এটা বাটন ডায়াল, আর বাবার রুমেরটা এনালগ ডায়াল সেট। রিসিভার কানে চেপে ধরে আনমনে বলে, ‘হ্যালো নাইম বলছি, কে বলছেন?’
টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে মিষ্টি হাসির সুর লহরী ভেসে আসে। হাসতে হাসতে বলে, ‘এত দ্রুত রিসিভ করলেন! অপেক্ষায় ছিলেন কারো?’
নাইম সচকিত হয়। অচেনা কণ্ঠ, কিন্তু মনে হয় কত চেনা। বুঝতে পারে না সে। আমতা আমতা করে উত্তর দেয়, ‘রাত তো অনেক হলো, রিং বাজতে থাকলে অন্যদের ঘুম নষ্ট হবে তাই একেবারেই ধরে ফেললাম।’
‘ও তাই। এত রাত জেগে কি করছেন? উপন্যাস পড়ছেন, নাকি ডাইরী লিখছেন?’
নাইম অবাক হয়ে যায় ওপাশের কথা শুনে। তার এই স্বভাবের কথা তো ঘণিষ্ঠজন ছাড়া কেউ জানে না! কি উত্তর দেবে বুঝতে পারছে না। কথা শুনে মনে হচ্ছে নাইমকে ভালো করেই চেনে মেয়েটি। কিন্তু নাইম একদমই চিনতে পারছে না। আড়ষ্ট কণ্ঠে বলে, ‘ডাইরী লিখছি। কিন্তু আপনি কে?’
‘আমাকে আপনি চিনবেন না। কিন্তু আপনাকে আমি চিনি।’
‘আশ্চর্য, আপনি আমাকে কিভাবে চেনেন? কেন ফোন করেছেন?’
‘আপনার সাথে আলাপ করার জন্য।’
‘কি! আমি তো আসলে অত আলাপের মানুষ না। তারপরও! আচ্ছা বলুন। তবে আগে পরিচয়টা দিয়ে নিন দয়া করে।’
মিষ্টি করে হাসে মেয়েটি। একটু সময় কি যেন ভাবে। বলে, ‘আজ কয় তারিখ বলুন তো?’
ক্যালেন্ডারের দিকে তাকায় নাইম। নিশ্চিত হয়ে বলে, ‘১৫/০৩/৯৫, কিন্তু কেন বলুন তো?’
‘কারণ তো আছেই। বিনা কারণে তো আর তারিখ জিজ্ঞেস করি নি।’
বলে একটু থামে মেয়েটি। আবার বলে, ‘মাস্টার্সের রেজাল্ট বেরুচ্ছে কবে আপনার?’
‘এই তো জুলাই-আগস্টে, যদি সব ঠিক থাকে।’
‘রেজাল্টের পর কি করবেন? চাকরি-বাকরি না ব্যবসা-বাণিজ্য?’
‘দেখি কি করা যায়? তবে কখনো চাকরির চিন্তা করি নি।’
‘ও আচ্ছা, ভালো। সুযোগ বুঝে যেটা ভালো সেটাই করুন।’
একটু থেমে আবার বলে, ‘তা প্রেম-ট্রেম করেন নাকি?’
‘আরে ধ্যাৎ। আচ্ছা আপনি কে বলছেন বলুন তো? কেবল বকবক করেই যাচ্ছেন। আপনার পরিচয়টা দিতে অসুবিধা কোথায়?’
‘এত অধৈর্য হবেন না, পরিচয় দেব, তবে সাক্ষাতে।’
‘মানে কি?’
‘একেবারে সোজা। আগামীকাল আপনার সাথে দেখা হচ্ছে আমার। রমনায়।’
‘রমনার কোথায়? কখন?’
‘গ্রীন স্কয়ারে। বিকেল বেলা।’
‘আপনাকে চিনব কি করে?’
‘আপনার প্রিয় রঙের পোশাক পরে আসবো।’
এবার নাইম অস্থির হয়ে পড়ে। খেই হারিয়ে ফেলে ভাবনার। মেয়েটি তার প্রিয় রঙের কথাও জানে। আশ্চর্য! নাহ্, গুল মারছে মেয়েটি। মিথ্যে বলছে। ও আসলে চেনেই না আমাকে। এটা ভেবে নির্ভার মনে হয় তার। সে প্রায় চ্যালেঞ্জের সুরেই বলে, ‘আচ্ছা বলুন তো আমার প্রিয় রঙ কি?’
মেয়েটি ঝরনার মতো হেসে ওঠে, ‘পরীক্ষা নিচ্ছেন? তা নিতে পারেন। কিন্তু একটা কথা বলুন তো-’
‘কি কথা।’
‘আপনি এত চটুল হলেন কি করে? তাহলে কি আপনি সত্যি সত্যিই প্রেমে পড়েছেন কারো? মীরার প্রেমে যে পড়েন নি তা আমি জানি। তাহলে কার প্রেমে পড়েছেন?’
নাইম কেঁপে ওঠে এবার। মীরার কথাটাও জানে এই মেয়ে! এ তো তার একান্ত গোপন কথা! সে তো কাউকে এ প্রসঙ্গে কোনদিন কিছু বলে নি, বলবেও না কোনদিন। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মতো মীরার ভালোবাসা তার বুকের গহীনে ধিকি ধিকি জ্বলে জ্বলে স্নিগ্ধ আলো ছড়াবে শুধু। আরো কি সব ভাবছিলো সে। মেয়েটির কলহাস্যে ধ্যান ভাঙ্গে তার। মেয়েটি জিজ্ঞেস করে, ‘কি থেমে গেলেন যে, সত্যি করে বলুন তো, আপনি কারো প্রেমে পড়েছেন?’
নাইম আস্তে ভেবেচিন্তে বলে, ‘না।’
‘আপনার ভার্সিটিতে তো অনেক মেয়ে বন্ধু ছিল তাদের কারো সাথে প্রেম হয় নি?’
এবার নাইম হেসে ওঠে হো হো করে, ‘কি যে বলেন, সহপাঠীদের সাথে প্রেম হয় নাকি? হয় বন্ধুত্ব। আপনি আসলে ভার্সিটির পরিবেশটাই বুঝলেন না। একসাথে চলাফেরা করলেই বুঝি প্রেম হয়ে যায়?’
‘তা হয় না মানলাম। কিন্তু বন্ধুত্বের ঘণিষ্ঠতা তৈরি হয় নি কারো সাথে?’
‘হ্যা, তা তো হয়েছেই। অন্তত গোটা চারেক বান্ধবী তো এ রকম পর্যায়ে পড়ে।’
মেয়েটি এবার হেসে ওঠে। তবে আগের মতো আর প্রাণোচ্ছলতা নেই এ হাসিতে। মনে হয় যেন মেয়েটিও কিছু একটা মিলাতে ব্যর্থ হয়েছে। কথায় একটু ভাটা পড়ে তাদের। নাইম এবার চেপে ধরে, ‘কাল তাহলে আমাদের দেখা হচ্ছে রমনায়, বিকেল বেলা, তাই তো। ঠিক আছে?’
মেয়েটি কি যেন ভাবে। একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলে, ‘আচ্ছা কাল বাদ দিন। দু’একদিনের মধ্যেই আমরা আবার দিনক্ষণ ঠিক করে নেবো।’
নাইম হো হো করে হেসে ওঠে। বলে, ‘সব মর্জি আপনারই। এই বললেন কাল দেখা হবে, আবার এখন বলছেন কাল না, আর কোন দিন। ব্যাপারটা কি বলুন তো? আমাকে একটু বাজিয়ে দেখলেন, তাই তো।’
রিসিভারের অপর প্রান্তে থমকে যায় মেয়েটি। নাইম অপেক্ষায় থাকে কিছু শোনার জন্য। কিন্তু আর শোনা হয় না। ক্রাডলেতে রিসিভার রাখার শব্দে কেটে যায় লাইন।