আড্ডা

হরতালে হরতালে সপ্তাহ পার হয়ে যায়। বিরোধী দল একাট্টা হয়ে লেগেছে সরকারী দলের বিরুদ্ধে। আজ অর্ধবেলা হরতাল তো কাল পূর্ণ দিবস। তারপরের দিন বিক্ষোভ সমাবেশ। অস্থির অবস্থা! ধুন্ধুমার হরতাল পালিত হয় দেশজুড়ে। শহরের পয়েন্টে পয়েন্টে পুলিশের সাথে তুমুল লড়াই চলে পিকেটারদের। আবার পুরো শহর জুড়ে নেমে আসে শুনশান নীরবতা। রাজপথে মাঝে মাঝে দু’একটা রিক্সা দেখা যায় হুটহাট করে এদিক ওদিক চলে যাচ্ছে তাড়াহুড়া করে। মনে হয় যেন পেছন থেকে ধেয়ে আসছে কোন বিপদ! সাংবাদিকের দু’একটা মটর সাইকেল অলস ভঙ্গিতে চলে যায় মাঝ সড়ক ধরে।
এ রকম এক অলস দুপুরে মতিঝিল এজিবি কলোনীর পূর্ব সীমানা লাগোয়া এক ভবনের তৃতীয় তলায় জমিয়ে আড্ডায় মেতে ওঠে রাসু ও বান্ধবীরা। সবাই এজিবি কলোনীর বিভিন্ন ফ্ল্যাটের বাসিন্দা। রাসুকে সবাই সমীহ করে। ভয়ংকর ঠোঁটকাটা মেয়েটা। কাউকেই ছেড়ে কথ কয় না। টিংটিংয়ে হ্যাংলা পাতলা একহারা গড়নের দেহ। লম্বায় সাড়ে পাঁচ ছুঁই ছুঁই বলে তাকে আরো লম্বা মনে হয়। অত্যন্ত মুখরা সে। কথায় কথায় হেসে গড়াগড়ি যাচ্ছে মেয়েরা। একই ব্লকের স্বপ্না হাসতে হাসতে রাসুকে চেপে ধরে-
‘আচ্ছা রাসু, তুই শেষ পর্যন্ত কাকে বিয়ে করছিস? তোর খালাত ভাই নয়নকে না তো?’
‘আরে ধুর কি যে বলিস না। এই ভ্যাবলা পোলাডারে বিয়া করমু আমি! দেখলি না কেমনে অর বড়টারে দুই বছর ঘুরাইলাম নাকে দড়ি দিয়া। নয়নও এক বছর ধইরা ঘুর ঘুর করতাছে আমার পিছে। মানি এই পোলাডা মেধাবী, কিন্তু ভ্যাবলা। ওর সাথে আমার যাইব না।’
‘তাইলে তুই অপেক্ষা করছিস কেন? মাস্টার্স পাশ করেছিস বছর হয়ে গেলো। সংসারি হবি না?’
বড় একটি নিঃশ্বাস ফেলে রাসু। বলে, ‘হু, সংসারী হবো, কিন্তু বরই তো খুইজা পাই না। কেমনে কি করি বল তোরা? মুরুব্বীরা একটা রাম ছাগল ধইরা আইনাও যদি কইতো কলমা পড়, তাইলে কবুল বইলা ফালাইতাম। হা হা হা।’
সবাই হাসতে হাসতে এ ওর গায়ে লুটিয়ে পড়ে। পাশের ফ্ল্যাটের ঐশী এতক্ষণ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, বলছিল না কিছু। বয়সে ও সবার ছোট। সে হুট করে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘আচ্ছা রাসু আপু, তোমার ক্লাসমেট একটা বন্ধু আছে না ক্যাম্পাসে সারাক্ষণ একসাথে থাকো তোমরা, কি যেন নাম ভাইয়াটার!’
‘কার কথা বলছিস, নাইমের কথা?’
‘হ্যা, হ্যা ঠিক তাই। তোমার বাসায়ও তো প্রায়ই আসে। তার খবর কি? তোমাদের রিলেশন তো খুব ভালো ছিল। ওনাকে পটালে না কেন?’
ঐশীর কথা শুনে রহস্যময় হাসে রাসু। উর্মীর দিকে তাকায় প্রশ্নবোধক। উর্মি চোখের ইশারায় ওকে আশ্বস্ত করে- ঠিক আছে সব কিছু।
রাসু একটু থমকে যায়। গম্ভীর হয়ে ওঠে হঠাৎ। আনমনে তাকায় বাইরের দিকে। কৃষ্ণচূড়া গাছটায় নতুন পাতা গজিয়েছে। চৈত্রের তীব্র রোদের সাথে বাতাসও আছে প্রচুর। ঝিরঝিরে বাতাসে দোল খাচ্ছে কৃষ্ণচূড়ার ডালপালা। দুলে ওঠে রাসুর হৃদয়। তার দু’চোখ স্বপ্নালু হয়ে ওঠে, ফিরে যায় ক্যাম্পাসের দিনগুলোয়।
ফার্স্ট ইয়ারের প্রথম দিকের ক্লাস। কলাভবনের তৃতীয় তলার পূর্ব ব্লকের দক্ষিণের ক্লাসরুম। জাফর স্যারকে দূর থেকে আসতে দেখেই সবাই হুড়মুড় করে ক্লাসরুমে ঢোকে। দুই বেঞ্চের মাঝখানে দাঁড়িয়েছিল নাইম। মুখভর্তি দাড়ি ছেলেটার। ওকে ক্ষেপাতে ইচ্ছা হয় রাসুর। মুহূর্তের মধ্যেই কড়ে আঙ্গুলের বড় নখ দিয়ে নাইমের পিঠে খোঁচা দেয় সে। খোঁচা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না, যথেষ্ট জায়গা ছিল পাশ কাটিয়ে পিছনে যাওয়ার। নাইম ক্ষেপে গিয়ে পেছন ফিরতেই রাসুর কৌতুকপ্রবণ চেহারা দেখে প্রথমে একটু দমে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই তেড়ে ওঠে, কিছু বলার আগেই স্যার এসে ঢোকেন ক্লাসে।
রাসু পেছনে বসে টুকরো কাগজে লেখে- ‘ব্যাথা পেয়েছ? ক্লাস শেষে চা খাওয়াবো, থেকো।’
নাইম কাগজটা হাতে পেয়ে চোখ গরম করে তাকায় একবার রাসুর দিকে। তারপর মনোযোগ দেয় স্যারের লেকচারে। ঠিক তখনই স্যার তাকে ইশারা করে বলেন, ‘এই ছেলে দাঁড়াও, বলো তো হ্যাঁকোচ হোঁকোচ মানে কি?’
জাফর স্যার কি একটা নাট্যদলের সাথে যুক্ত আছেন। তাঁর কথায়ও নাটকীয়তা লক্ষ্য করা যায় সব সময়। তাঁর প্রশ্নে ভ্যাবাচেকা খেয়ে যায় নাইম। সে দাঁড়িয়ে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। আমতা আমতা করে বলে, ‘মানে স্যার, মানে স্যার বুঝতে পারছি না স্যার।’
‘এদিকে এসো, আমার কাছে এসো।’
নাইমের হাতে তখন মুঠ করে ধরা চিরকুটটা। নাইম বেঞ্চ থেকে বেরুবার সময় ওটা ফেলতে চেষ্টা করে। স্যার তীক্ষè চোখে চেয়ে থেকে বলেন, ‘হাতে যা আছে তা ফেলবে না, ওটা নিয়ে এসো’।
নাইম পুরো বোকা বনে যায়। কি করবে না করবে ভাবতে ভাবতে চিরকুটসহ ধীরে ধীরে যায় স্যারের সামনে। স্যার চিরকুট নিয়ে পড়েন। নাইম একবার ঝট্ করে তাকায় রাসুর দিকে। রাসু তখন কপালের দুই পাশে দুই বুড়ো আঙ্গুল টিপে ধরে বসে আছে চোখ বন্ধ করে। স্যার চিরকুটটা দেখে ফিক করে হেসে ফেলেন। চিরকুটটা ওর হাতে ফেরত দিতে দিতে বলেন, ‘ঠিক আছে যাও বসো।’ নাইম বেঞ্চে ফিরতে ফিরতে শোনে স্যার মজা করে বলছে, ‘কিছু না, ওর বান্ধবী ওকে চায়ের দাওয়াত দিয়েছে।’ স্যারের রসালো কথায় পুরো ক্লাস জুড়ে হাসির রোল পড়ে যায়।
রাসু হঠাৎ করে হেসে ফেলে খিলখিলিয়ে। কিন্তু বাস্তবে ফিরেই সবার দিকে তাকিয়ে লজ্জা পায়, তারপরও হাসে।
বান্ধবীরা সবাই চেপে ধরে, ‘কি এমন হাসির কথা মনে পড়লো তোর হঠাৎ করে?’ আরেক বান্ধবী জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কিরে তুই কি সত্যি সত্যি ওর প্রেমে পড়ে গেছিস?’ আরেকজন ফোঁড়ন কাটে, ‘কয়জনরে নাকে দড়ি দিয়া ঘুরাইব? সব কি ওর খালাত ভাই?’ আরেকজন ফোঁড়ন কাটে, ‘ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে’। একজন ধমকে ওঠে, ‘এই তোরা থামতো, রাসুর কাছেই শুনি বিষয়টা। এই রাসু সত্যি করে বল তো ব্যাপারটা কি? আসলেই কি তুই পড়ে গেছিস?’
রাসু এতক্ষণে একটু প্রকৃতিস্থ হয়। বলে, ‘আসলে তোরা যা ভাবছিস তেমন কিছু না। নাইম ছেলেটা খুব ভালো নিঃসন্দেহে। ও আমার খুব ভালো বন্ধু এটাও ঠিক আছে। কিন্তু ওর সাথে আমার কোন কিছু হয় নি রে। তবে…’
‘তবে কি? বল না, সত্যি করে বল্।’
‘আসলে ঘটনা হলো কি, ও আমার খুব ভালো বন্ধু। একই টিউটোরিয়াল গ্রুপে ছিলাম আমরা। ছেলেটা অনেক মেধাবী। টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, কোর্স ফাইনাল পরীক্ষার প্রস্তুতি সব সে-ই করতো। আমি শুধু ওর নোট মুখস্ত করে পরীক্ষা দিতাম। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো কি, সেই নোটগুলো সে করতো শুধু আমার জন্য। নিজের পরীক্ষা সে দিতো নোট ছাড়াই। আর আশ্চর্য, ও ঠিকই আমার চেয়ে বেশি নাম্বার পেতো। ফার্স্ট ইয়ার, সেকেন্ড ইয়ারে তো সে রীতিমতো হাইয়েস্ট নাম্বার পেয়ে বসলো। কিন্তু থার্ড ইয়ারে এসে সে আর তাল মিলাতে পারলো না আমাদের সাথে। পরীক্ষার সময় পক্স হলো ওর, পরীক্ষাই দিতে পারলো না। পিছিয়ে পড়লো। মাস্টার্সেও আমি ওর করে দেয়া নোট দিয়েই পাশ করলাম গতবার। আর সে পরীক্ষা দিলো এবার। অদ্ভূত ছেলে একটা। নিজের জন্য কিছুই করে না। আমি রেফারেন্স বই সাপ্লাই দিতাম, আর ও করতো নোট। পরীক্ষা দিতাম আমি। হা হা হা।’
বলে থামে রাসু। ওর কণ্ঠে কেমন হতাশার সুর। সবার উৎসাহ কেমন যেন থিতিয়ে যায়। আড্ডাটা ধরে আসে হঠাৎ। ঊর্মি আবার আড্ডাটা জমিয়ে তোলার জন্য বলে, ‘শোন তোরা, মজার ব্যাপার ঘটেছে কাল রাতে’।
ঊর্মির কথা শুনেই রাসু একটু মুডি ভঙ্গিতে বলে, ‘কিরে তুই কি হাটে হাঁড়ি ভেঙ্গে দিতে চাস নাকি? শেষ না দেখে কিছু বলতে মানা করেছি না তোকে?’
‘আরে ধুর হাঁড়ি ভাঙ্গার কি আছে। তুই ফোন করতে বললি, করলাম। বাজিয়ে দেখলাম গতকাল রাতে। কিন্তু ও তো খুব কঠিন মানুষ। কিছুতেই ধরা দিলো না। উল্টো পার্কে আমার সাথে ডেট করতে চাইলো!’
‘মানে? কি রে ঊর্মি ঘটনাটা কি বল তো?’ সমস্বরে সবাই উৎসুক হয়ে উঠলো।
‘মানে তেমন কিছু না। রাসুর কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে কাল মাঝরাতে ফোন দিলাম। এক রিং-এই ধরলো। তারপর এই কথা সেই কথার ফাঁকে জিজ্ঞেস করলাম কারো সাথে প্রেম করে কি না। ছেলেটা বাইম মাছের মতো খালি পিছলে গেলো। স্বীকারই করলো না। শেষে পার্কে আমার সাথে দেখা করতে চাইলে আমি লাইন কেটে দেই। এই আর কি।’
এক বান্ধবী এবার ধরে বসলো রাসুকে, ‘আচ্ছা রাসু তোর দুর্বলতা আছে ওর প্রতি, এ জন্যই উর্মিকে দিয়ে কল করিয়েছিস, তাই না? বিষয়টা স্বীকার করতে দোষ কি তোর? আমরাও তো চাই এমন কিছু একটা হোক। তোরা কি বলিস, ঠিক না?’
রাসু এবার সত্যি সত্যি নির্বাক হয়ে যায়। অসহিষ্ণু হয়ে যায় সে। রণে ভঙ্গ দিয়ে আড্ডা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ‘এই রে সেরেছে, ঘরে অনেক কাজ পড়ে আছে, যেতে হবে রে। তোরা থাক, আমি গেলাম।’ বলেই শশব্যস্ত হয়ে আড্ডা ছেড়ে চলে যায় রাসু।