অনুরাগ

ইস্কাটনের অভিজাত এলাকায় প্রায় দশ কাঠার ওপর সুনসান দ্বিতল বাড়ির দোতলায় একমনে পড়ছিল শিলা। এত বিশাল বাড়িতে প্রাণি বলতে পাঁচজন। বাবা-মা, ছোট ভাই, সে আর গৃহকর্মী ময়না। ছুটা কাজের বুয়া তিনবেলা এসে কাজকর্ম করে দিয়ে চলে যায়। গাছপালায় ভরা বাড়িটা। একেবারে রাস্তা লাগোয়া মেইন গেট। সীমানার একেবারে ভেতরের প্রান্তে দোতলা বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে মৌনতার প্রতীক হিসেবে। বাবা তার ব্যবসার কাজে সারাদিনই বাইরে থাকেন। ফেরেন রাত করে। ময়নাকে নিয়ে মা একা হাতে সামলান সবকিছু। একমাত্র দারোয়ান গেটের পাশেই ছোট্ট একটি রুমে বসবাস করে। আশেপাশের বাড়িগুলো সব প্রায় একই রকম। একবারেই কোলাহলমুক্ত এই এলাকা।
পড়তে পড়তে হঠাৎ শিলার মন ছুটে যায় পড়া থেকে। কি যেন ভাবতে থাকে মনে মনে। এমন সময় শিলাকে ডাকতে ডাকতে মা উঠে আসেন দোতলায়। তার হাতে কর্ডলেস টেলিফোন। শিলা টেবিলে বসেই গলা উঁচু করে বলে, ‘কি মা, কেন ডাকছ?’
‘এই নে, মীরা ফোন করেছে।’
খুশি হয়ে ওঠে শিলা। ফোনটা হাতে নিয়েই মাকে বলে, ‘মা তুমি যাও খাবার রেডি করো, আমি আসছি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি আয়।’ বলে মা চলে যান। এটাই চেয়েছিলো শিলা। মা সামনে থাকলে প্রাণ খুলে কথা বলা যায় না। পড়ার টেবিল ছেড়ে রকিং চেয়ারে বসে দোল খেতে খেতে কানে ফোন লাগায় সে, ‘কিরে মীরা, কেমন আছিস? করছিস কি এখন?’
‘কিছু না, তুই কি করছিস?’
‘পড়ছিলাম, কিন্তু ভাল্লাগছিল না।’
‘তোর আবার কি হলো? ভাল্লাগবে না কেন?’
‘কি জানি, মনটা ছটফট করছে। খালি খালি লাগে কেন যেন?’
‘হু, বুঝতে পারছি, ভুতে ধরেছে তোকে।’
‘মানে কি, কিসের ভুত রে? বুঝিয়ে বল।’ হাসতে হাসতে বলে শিলা।
‘হু, পিরিতের ভুত। কি ঠিক বলছি না?’ খিলখিলিয়ে হাসে মীরা।
‘আরে না, ঠিক তা না। তবে তোর ওই নাইম ভাইয়ের কথা বার বার মনে পড়ে। কি সুন্দর করে কথা বলেন উনি। আচ্ছা সত্যি করে বলতো, উনি কি প্রেম করেন কারো সাথে?’
খিলখিল করে হেসে ওঠে মীরা। হাসতে হাসতেই বলে, ‘এই দেখ আমি ঠিকই ধরে ফেলেছি তোর মনের রোগ। কেন রে তুই কি প্রেম করবি ওনার সাথে?’
শিলা ওর মতো উচ্ছল হতে পারে না। একটু হিসেবি কথা বলে, ‘ঠিক তা না, আমি তো ওনার সম্বন্ধে ভালো জানি না, তুই জানিস সবকিছু। উনি কেমন ছেলে? ভালো না মন্দ। স্বভাব চরিত্র কেমন, এ সব তো তুই ভালো জানিস। তাছাড়া ওনার ফ্যামিলি কেমন সেটাও জানা দরকার। সিরিয়াসলি।’
‘ও বুঝছি, তুমি হিসাব মিলাইতাছ। ঠিক আছে মিলাইতে পারো। ছেলে হিসেবে উনি মন্দ না। খুব মিশুক, সত্যবাদি, নামাজি আর মেয়েদের ব্যাপারে খুবই ভীতু প্রকৃতির। ওনার মতো মানুষ যে কি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লো ভাবতেই পারি না।’
একটু চুপ মেরে যায় শিলা। ভাবতে থাকে এ ক’দিনের পরিচয়ের বিভিন্ন সময়ের কথা। প্রথম দিনই যা একটু প্রগল্ভ ছিলেন উনি। তারপর কত দেখা হলো, এই কেমন আছ-টাছ ধরণের কথা ছাড়া আর কোন কথাই বলেন না উনি। মনে হয় সামনে থেকে সরে যেতে পারলেই বেঁচে যান। আরো কি কি ভাবছিলো সে। মীরাই আবার বলে,
‘কি রে চুপ মেরে গেলি যে, আরে শোন ওনার মতো ছেলেই হয় না। সুমনের সাথে আমার পরিচয় না হলে তো ওনার গলা ধরেই ঝুলে পড়তাম আমি, হা হা হা।’
‘আহ মরণ, ঝুলে পড়লি না কেন যদি এত ভাল ছেলে হন উনি?’ কপট বিরক্তি প্রকাশ করে শিলা।
মীরা এবার একটু সিরিয়াস হয়ে বলে, ‘আসলে সেই ছোট থেকেই তো ওনাকে দেখছি। ছোট ভাইয়ের বন্ধু, ওনাকেও ভাই বলে মনে করেছি। আর উনিও আমাকে ছোট বোনের মত স্নেহ করেন। এই জন্যই ওসব কিছু কখনো ভাবি নি। মানুষ হিসেবে তিনি অসাধারণ। ভার্সিটিতে ওনার এক বান্ধবী ছিলো, রাসু আপা। ওনার সাথে খুব ভাব, তবে যতদূর জানি প্রেমট্রেম কিছু হয় নি ওনাদের। তবে সুযোগ পেলে আমরা খুব ক্ষেপাই ওনাকে, হা হা হা।’
শিলা একটু থমকে যায়। বাধো বাধো কণ্ঠে বলে, ‘সত্যিই কি ওনাদের কোন সম্পর্ক নেই? বলতে পারিস।’
‘আমি তো তেমনটাই জানি। আর উনি ওভাবে প্রেম করার মানুষ না। তুই একটু ট্রাই করে দেখ, যদি তোর পছন্দ হয়।’
‘তুই যদি মত দিস তাহলে ট্রাই করবো। কি বলিস?’
‘আমার পূর্ণ সমর্থন আছে, তুই কোন চিন্তা করিস না।’
‘কিন্তু ব্যাপার আছে একটা। বাবা-মা এসব পছন্দ করেন না। ওনারা যদি জানেন আমার পছন্দ এটা তাহলে কিছুতেই এখানে কিছু হবে না। আমাকে ওনারা বিয়ে দিয়ে দেবেন অন্য কোথাও।’
‘এইটা তুই আমার উপর ছাইড়া দে। তোর পছন্দ হয় কি না আগে ট্রাই কর। তুই যদি পজিটিভ থাকিস, তাইলে বাকিটা আমি দেখব। পাকা ঘটকালি করবো আমি। যা কথা দিলাম।’ খুব মনোবলের সাথে বলে মীরা।
শিলা খুশি হয় খুব। খুশি খুশি গলায় বলে, ‘আচ্ছা রাখি রে, কালকে ক্যাম্পাসে কথা হবে আবার। ও ভালো কথা, তুই কি রাকিব স্যারের নোটটা রেডি করেছিস?’
‘না রে, সুমনের কথা ভাবতে ভাবতে আর গান শুনতে শুনতে সব ভুইল্যা গেছি। তুই করেছিস তো?’
‘হ্যা, আমি করেছি। কালকে নিয়ে আসবো, কেমন। ভালো থাকিস।’
‘ওকে, বাই, কাল দেখা হচ্ছে কলেজে। আর কালকেই কিছু একটা, হা হা হা’। হাসতে হাসতে লাইন কেটে দেয় মীরা।
শিলা খুব থ্রিল ফিল করে। ধীরে ধীরে ছক আঁকতে শুরু করে সে সবকিছুর। এমনিতেই গোছালো সে। অগোছালো কিছুই তার পছন্দ নয়। এখানেও সে তাই করতে চায়। যা কিছুই হোক সুন্দর আর গোছালো হতে হবে।