ভালোবাসি

এক ঘন্টা হয়ে গেলো তবু মীরার কোন পাত্তা নেই। ইডেনের গেটে মেয়েদের ভীড়ে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায়! যদিও এ রকম পরিবেশে সে অভ্যস্ত। কিন্তু অপেক্ষা বলে কথা! ঘড়ি দেখে আবার, পৌনে তিনটা বাজে, অথচ মীরার আজকের ক্লাস শেষ হওয়ার কথা দেড়টায়। তাই তো সে জানে। মীরার ক’জন বান্ধবীকেও চেনে সে, কিন্তু তাদের কাউকেই তো দেখা যাচ্ছে না। তাহলে কি মীরা বাসায় চলে গেলো একা একা! কথাটা মাথায় আসতেই সে মনে মনে ভাবে, একবার ফোন করে দেখি বাসায়।
ফোন করতে নীলক্ষেতের পথ ধরে নাইম। কিছুদূর যেতেই শিলার সাথে সাক্ষাৎ হয় তার। সে তড়িঘড়ি করে এদিকেই আসছিল। নাইমকে দেখেই থমকে যায় সে। নাইম কাছাকাছি হতে ইশারায় থামায় তাকে।
‘আপনার সাথে জরুরী কথা আছে নাইম ভাই। এক্ষুনি চলুন আমার সাথে।’
‘কোথায় যাবো? আমি তো মীরার জন্য অপেক্ষা করে করে অস্থির। এখনই ফোন করতে হবে ওর বাসায়।’
‘প্রয়োজন নেই, আমার সাথে চলুন।’
ওরা রিক্সা নিয়ে যেতে থাকে সায়েন্স ল্যাবরেটরির দিকে। একটু সুস্থির হয়েই ফিক করে হেসে ফেলে শিলা। তাকায় নাইমের দিকে। নাইম অস্থিরতা লুকাতে পারে না, ‘আরে আমি আছি মীরার টেনশনে, আর তুমি হাসছ’।
‘আজ না হয় আমিই মীরা’র প্রক্সি দিলাম, অসুবিধা আছে?’ বলে রহস্যময় হাসে শিলা। ‘আমার অনেক দিনের শখ ছিল আপনার সাথে রিক্সায় চড়ার।’
‘তাই নাকি, কেন এমন শখ হল?’
‘এমনি, প্রতিদিন তো আপনি মীরাকে আনা-নেওয়া করেন। কিন্তু মীরা তো আপনার না?’
শিলার কথায় একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায়। বোকাটে চোখে তাকায় শিলার দিকে। মুচকি হাসে শিলা। চোখে রহস্যময় ইঙ্গিত টেনে বলে, ‘কি ঠিক বলি নি?’
‘তা তো ঠিক বলেছ। কিন্তু তোমার এখনকার আচরণ ঠিক পছন্দ হচ্ছে না আমার। কি চাও তুমি? আমি মীরার টেনশনে আছি এখন। কি জবাব দেব ওর মাকে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না। তুমি কি কিছু জানো?’
বলে আকুল দৃষ্টিতে তাকায় শিলার দিকে। শিলা হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে। ততক্ষণে রিক্সা নীলক্ষেত মোড়ে চলে এসেছে। শিলা রিক্সা থামায়। নাইমকে কর্তৃত্বের সুরে বলে, ‘আমি রিক্সায় বসলাম। আপনি ওপারে গিয়ে মীরা’র বাসায় ফোন করে বলুন মীরাকে পাওয়া যাচ্ছে না। আর আপনি মগবাজারে আপনার চাচার বাসায় যাচ্ছেন।’
নাইম রাস্তা পার হয়ে ফোন করে মীরার বাসায়। মীরা তখনো বাসায় ফেরেনি, কলেজেও তাকে পাওয়া যায় নি। তাহলে গেল কোথায়? সবাই এই সংবাদে অস্থির হয়ে পড়ে। নাইম তার অপারগতার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মগবাজার চাচার বাসায় যাচ্ছে বলে ফোন রেখে দেয়।
রিক্সা আবার চলতে শুরু করে। এলিফ্যান্ট রোডে একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টের সামনে এসে রিক্সা থামায় শিলা। শিলাকে অনুসরণ করে রেস্টুরেন্টের ভিতর ঢুকতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে যায় নাইমের। একটা টেবিলে মীরা বসে আছে প্রায় সমবয়সী একটা ছেলের সাথে। ওদেরকে বেশ হাসিখুশি মনে হচ্ছে। ছেলেটাকে ভালো করে লক্ষ্য করে নাইম, নাহ্, তাকে চেনে না। কে সে? মীরার সাথে ওর সম্পর্ক কী? শিলা তাকে এখানে নিয়ে এলো কেন? তাহলে কি সব ওদের পূর্ব পরিকল্পিত?
শিলা নাইমের গা ঘেঁষে ঘণিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। হতভম্ব নাইমের ডান হাতের পাঁচ আঙ্গুল ওর বাম হাতের পাঁচ আঙ্গুল নিয়ে আঁকড়ে ধরে। মীরার দিকে পূর্ণ মনোযোগ থাকায় বিষয়টা তার মাথায় ঢুকতে একটু সময় নেয়। যখন খেয়াল হয় তখন সে ছাড়াতে চায়, কিন্তু খুব জোড়ে আঁকড়ে ধরে থাকে শিলা। শিলা মুখ বাড়িয়ে নাইমের কানে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘ওরা আমাদের দেখে নি, চলেন আমরা ওপরে চলে যাই।’
নাইম সম্মোহিতের মতো শিলার সাথে পাশের সিঁড়ি ধরে ওপর তলায় একটা টেবিলে গিয়ে বসে। নাইমের বিস্ময়ভাব তখনো কাটেনি। টেবিলে মুখোমুখি বসে আছে ওরা। ঘোরে পাওয়া নাইমের কেবলই মনে হতে থাকে মীরা কি করছে এসব? ছেলেটার সাথে ওর সম্পর্ক কি? ওকে না জানিয়ে মীরা এভাবে ফাঁকি দিতে পারলো? আরো কি সব ভাবছিলো। হঠাৎ তার ধ্যান ভাঙ্গে শিলার কথায়, ‘কি ভাবছ অমন করে? আমার দিকে একটু খেয়াল করতে পারো না?’
বিস্মিত নাইম আরো বিস্মিত হয় শিলার তুমি সম্বোধনে। শিলার সাথে তো তার এমন কোন সম্পর্ক হয়ে যায় নি যে সে তাকে তুমি করে বলবে! নাইম হঠাৎ মুগ্ধ হয়েছিলো সত্য, কিন্তু তার মানে তো এ নয় যে সে শিলার প্রেম পিয়াসি? মুগ্ধতা আর ভালোবাসা এক নয় এটা তো শিলার বোঝা উচিত! এ সবের মানে কি? সে গভীর দৃষ্টিতে তাকায় শিলার দিকে।
শিলা রাজ্যের মুগ্ধতা আর আকুলতা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নাইম কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে যায়। নিজের ভেতর সেঁধিয়ে যেতে থাকে আর উপায় খুঁজতে থাকে এখান থেকে পালানোর। কিন্তু সে পথ বন্ধ। নিচে মীরা বসে আছে তার বন্ধু কিংবা প্রেমিককে নিয়ে, হয়তো লাঞ্চ করবে, হয়তো স্যুপ খাবে, হয়তো তারা এখান থেকে বেরিয়ে রিক্সায় হাওয়া খেতে থাকবে। তারপর একসময় বাসায় ফিরে গল্প ফাঁদবে, ক্লাস শেষে নাইম ভাইকে পাইনি তাই এক বান্ধবীর বাসায় গিয়েছিলাম।
এর মধ্যে ওয়েটার আসে। মেনু টেনে নিয়ে শিলা বাড়িয়ে দেয় নাইমের দিকে, ‘নাও আইটেম চয়েজ করো। ভরপেট খাবো কিন্তু। দেখি তোমার রুচির সাথে আমার বনে কেমন।’
ওয়েটারের সামনে নাইম কিছু বলতে পারে না। মেনু খুলে চিকেন ফ্রাই, মাটন কারি, ভেজিটেবল, স্পেশাল সালাদ, ফ্রাইড রাইস আর কোল্ড ডিংকস এর অর্ডার দেয়। শিলার মুখে ছড়িয়ে পড়ে মুগ্ধতার হাসি। হাসতে হাসতে বলে, ‘স্যুপ অর্ডার করলে না কেন?’
ওয়েটার চলে যাচ্ছিল। কিন্তু শিলার কথা শুনেই মনে হয় একটু থমকে দাঁড়ায়। নাইম একটু অগোছালোভাবে কৈফিয়তের মতো করে বলে, ‘আমরা মাত্র দু’জন, স্যুপ খেলে এইসব খাবার খাবো কিভাবে? আর তাছাড়া’
‘তাছাড়া বলতে হবে না। বিল দেবো আমি। তোমাকে ভাবতে হবে না।’ বলেই ওয়েটারকে লক্ষ্য করে বলে, ‘এই যে ভাই, একটা কর্ন স্যুপ উইথ শ্রিম্প’। আবার নাইমকে লক্ষ্য করে বলে, ‘শোন, আমরা যা খাই খাবো, বাকিগুলো প্যাক করে দেবে, নিয়ে যাবে বাসায়, সমস্যা আছে?’
‘না, সমস্যা নেই, কিন্তু তুমি বিল দিতে চাচ্ছো কেন? আমার কাছে যা আছে তাতে মনে হয় হয়ে যাবে।’ একটু বাধো বাধো কণ্ঠে বলে নাইম। সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না সবকিছু। শিলার কর্তৃত্বপরায়নতার কাছে সে কেমন যেন অসহায় আত্মসমর্পন করছে। ওর ঠিক ভাল্লাগে না বিষয়টা, কিন্তু এড়িয়েও যেতে পারছে না।
শিলা মুগ্ধ হাসে। নাইমের চোখে চোখ রাখে। তার চোখও যেন হাসছে। নাইমও হাসে। তবে সে হাসিতে প্রাণ নেই, আছে আড়ষ্টতা, ভীরুতা, জড়তা। ঠিক এমন করে কখনো কোথাও আটকে যায় নি সে। রাসুর সাথে দীর্ঘ সাত বৎসর এক সাথে চললো, কখনো এমন অবস্থায় পড়তে হয় নি তার।
এটাকে কি বলে, মোহমুগ্ধতা? না, তা নয়, সে তো মোহগ্রস্থ নয় কিংবা মুগ্ধও নয়। শিলার পরিশীলিত রূপে সম্মোহন আছে, ক্ষণিকের মুগ্ধতা ছিলো, কিন্তু মোহাবেশ তো নেই। কিন্তু এখন কেমন করে আটকে যাচ্ছে বলে মনে হয় তার। মনে হয় যেন শিলা তাকে অজগরের মতো পেঁচিয়ে ধরছে, অনিচ্ছা স্বত্তেও সে আবিষ্ট হচ্ছে।
আবার সবকিছু ভাল্লাগতে শুরু করে নাইমের। মীরার জন্য দীর্ঘক্ষণ বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, মীরাকে অনভ্যস্ত সঙ্গসহ দেখা, এসব কিছুই তার ভালো লাগতে শুরু করে। শিলা যেন কিছু একটা বুঝতে পারে। টেবিলে রাখা নাইমের হাতে মৃদু টোকা দেয় সে। নাইম বাস্তে সে। শিলার দিকে তাকিয়ে দেখে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছে শিলা। নাইম অজান্তেই জিজ্ঞেস করে বসে, ‘কি ব্যাপার এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?’ শিলা কোন উত্তর না দিয়ে নিচু স্বরে গাইতে শুরু করে-
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?
চাঁদেরে হেরিয়া কাঁদে চকোরিণী
বলে না তো কিছু চাঁদ।।

চেয়ে চেয়ে দেখি ফোটে যবে ফুল
ফুল বলে না তো সে আমার ভুল
মেঘ হেরি ঝুরে চাতকিনী মেঘ
করে না তো প্রতিবাদ।।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?

জানে সূর্যেরে পাবে না
তবু অবুঝ সূর্যমুখী
চেয়ে চেয়ে দেখে তার দেবতা্ের
দেখিয়াই সে যে সুখী।।

হেরিতে তোমার রূপ-মনোহর
পেয়েছি এ আঁখি, ওগো সুন্দর।
মিটিতে দাও হে প্রিয়তম মোর
নয়নের সেই সাধ।।
তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়
সেকি মোর অপরাধ?

নাইমকে অবাক করে দিয়ে পুরো গানটাই সে গেয়ে ফেলে নিচু স্বরে। নাইম অবাক বিস্ময়ে শিলার দিকে তাকিয়েই থাকে শুধু। মুগ্ধ হয়ে যায় সে। এত সুন্দর গান গাইতে পারে শিলা। মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলে, ‘তুমি তো খুব ভালো নজরুল গীতি জানো? চর্চা করো নাকি নিয়মিত?’
লাজুক হাসে শিলা, ‘হ্যা কিছুটা। কিছুদিন বাসায় মাস্টার রেখে শিখেছিলাম। এখন আর শিখি না। তবে যেগুলো শিখেছিলাম সেগুলো মনে আছে আজো। আপনি কি রবীন্দ্র পছন্দ করেন না নজরুল?’
‘দুটোই, তবে নজরুল গীতি বেশি পছন্দ।’

নাইম হঠাৎ খেয়াল করে সে মীরা আর ছেলেটা এগিয়ে আসছে এদিকেই। ওরা এসে চেয়ার টেনে বসে পড়ে তাদের টেবিলে। নাইম বিব্রত বোধ করে। মীরাই কথা শুরু করে, ‘এই ছেমড়ি অর্ডার দিছস নাকি দিবি?’
নাইম বোকা বনে যায়। সে এখন বুঝতে পারছে, এ সবই তাদের পূর্ব পরিকল্পিত। কিন্তু হেতুটা কি? সে কিছু বুঝে উঠতে পারে না। মীরার দিকে তাকিয়ে তার খুব রাগ হয়। এভাবে তাকে কষ্ঠ দেয়ার কী মানে থাকতে পারে? সে তো তার ইচ্ছার দাস নয়! বন্ধুর ছোট বোনকে নিজের ছোট বোন ভেবেই তো সে এই গুরুদায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছে। তাহলে অপেক্ষায় না রেখে বললেই হতো আগেভাগে। তাহলে শুধু শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কষ্ট করতে হতো না তাকে। তার ভেতর অভিমান এসে জমা হয়। সে মুখ ভার করে বসে থাকে।
মীরা বুঝতে পারে সব কিছু। মনোযোগ দেয় নাইমের দিকে। তার কাঁধে হাতে রেখে নরম সুরে বলে, ‘নাইম ভাই রাগ করছেন?’ নাইম কোন কথা বলে না। ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয় ওর হাত। এবার মীরা একটু সিরিয়াস হয়ে বলে, ‘ওই যে আমি দুইটা দুইটা বলতাম না, যেইটা শুনলেই আপনি খেপেন, আর আমার লগে মাস্টারি করেন, সেই দুইটার একটা হইল এইটা’। বলে আঙ্গুল দিয়ে ছেলেটাকে দেখায়।
নাইমের খেয়াল হয় মীরাকে নিয়ে কলেজে যাওয়ার পথে দুই শালিক দেখলেই সে খুশি হয়ে উঠতো। তাহলে এইটাই হলো বিষয়, দুই শালিক মানে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হবে। কি আজব কুসংস্কার! নাইম এবার তাকায় ছেলেটার দিকে। ছিপছিপে সুন্দর ছেলেটা সলজ্জ ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। নাইমের তাকানো দেখে সে নিজের দু’হাত বুকের সাথে লাগিয়ে বলে, ‘আমি সুমন নাইম ভাই। ভালো আছেন?’
নাইম বুঝতে পারে সব কিছু। লুকিয়ে লুকিয়ে এই ছেলেটার সাথেই প্রেম করছে মীরা। কী দরকার ছিল এত লুকানোর? আমাকে বললেই পারতো ছেলেটাকে ভালো লাগে তার। হাত বাড়িয়ে দেয় সে, ‘ভালো আছি। তোমরা খুব কষ্ট দিয়েছো আমাকে। কাজটা ভালো করনি।’ বলে মীরাকে লক্ষ্য করে বলে, ‘যাই হোক মীরা, কাল থেকে আমি আর আসছি না তোমার সাথে। তুমি একা একাই আসবে কলেজে। খালাম্মাকে বলে দেব আমার জরুরী কাজ পড়ে গেছে। পারছি না আর।’
মীরা নাইমের দুই হাত জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে। ‘এমন করবেন না নাইম ভাই। তাইলে আমার কলেজে আসাই বন্ধ হইয়া যাইব। আর আপনে না আসলে শিলার কি হইব ভাবছেন একবার? ও তো মইরা যাইব দম বন্ধ হইয়া। প্লিজ ভাই, এমনটা করবেন না।’
নাইম লজ্জা পেয়ে মাথা নীচু করে ফেলে। শিলার বিষয়টা সে এত সিরিয়াস ভাবে নেয়নি কখনোই। কিন্তু আজ এত আয়োজনের কারণে বুঝতে পারছে মীরা কেন তার কাছে উন্মুক্ত হলো! সে শিলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। তার হাসি পেলো। মীরা তাকে এত দুর্বল ভেবেছে কেন? আসলেই কি সে শিলার প্রতি দুর্বল? কি জানি, ওপরওয়ালাই জানেন সব, ভেবে আপন মনেই হেসে ফেলে সে। মীরা আশ্বস্ত হয়ে তার হাত ছেড়ে দেয়।
শিলা লজ্জায় কেমন যেন হয়ে যায়, কারো দিকেই তাকাতে পারে না ঠিকমত। মীরাই খোঁচা দেয়, ‘এই ছেমড়ি, এত শরম পাওন লাগবো না। আমি ভাও কইরা দিমু নে সব।’ বলে নাইমের দিকে তাকায়। ‘কি নাইম ভাই, ঠিক আছে তো? ঘটকালি শুরু করলাম, কি কন? আপনের তো বিয়ার বয়স পার হইয়া যাইতাছে। খালাম্মাও শুনছি মাইয়া খুঁজতাছে। কি কন ভাই, শুরু করমু নাকি?’
নাইম বোকা বনে যায়। মীরা যে এত পাকনামো করতে পারে, তা তার মাথায়ই আসে নি কখনো। আর এই মেয়েকেই কি না পাহারা দেয়ার কাজ পেয়েছে সে! আহ্হারে কপাল, কি না কি সর্বনাশ করে বসে মেয়েটা কে জানে! নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে গভীর ভাবনায় ডুবে যায় সে। চোখ মুদে ভাবনাকে আরো গভীর করে তোলে। কি যেন ভাবে আনমনে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে চোখ খুলে তাকায় শিলার দিকে। শিলার চোখে চোখ রেখে বলে, ‘তোমার সাথে একান্তে কিছু কথা বলতে চাই’।
কথাটা শুনেই মীরা আর সুমন টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। অন্য কোণের টেবিলে গিয়ে বসে ওরা। নাইম একটু ঢোক গেলে। তারপর শুরু করে, ‘তুমি কি আমাকে ভালোবাস?’
‘হ্যাঁ, খুব, খুব বেশি। আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না।’
‘কেন ভালবাস? কি এমন দেখেছ আমার মাঝে? আর আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো তুমি?’
‘জানি না কেন, তবে ভালোবাসি। প্রথম যেদিন তোমাকে দেখি সেদিনই ভালোবেসে ফেলেছি তোমাকে। তুমি কি বোঝনি কিছু? আর তোমার সম্পর্কে মীরার কাছে যতটুকু জেনেছি ততটুকুই আমার জন্যে যথেষ্ট।’
নাইম কেমন হাঁসফাঁস করে ওঠে। মনে হয় যেন কেউ তার গলায় কিছু একটা পেঁচিয়ে ধরেছে। সে মুক্তি পেতে চায় এই বন্ধন থেকে। শেষ চেষ্টা করে সে, ‘আমার পরিবার খুব রক্ষণশীল জেনেছ নিশ্চয়ই। আমার পরিবার যেভাবে চায় সেভাবে চলতে হবে তোমাকে। পারবে তো মানিয়ে নিতে? খুব রক্ষণশীল আমার পরিবার, বোরকা না পরে উপায় নেই। পারবে?’
হ্যাঁ সুচক মাথা নাড়ে শিলা। ধরা গলায় বলে, ‘হ্যাঁ পারব, তোমার জন্য আমি সব কিছু পারব।’
নাইমের কেন যেন হাসি পায়। একটু খেলতে ইচ্ছে করে এই বোকা মেয়েটাকে নিয়ে। বলে, ‘আব্বু- আম্মুর পছন্দ না হলে কিন্তু কিচ্ছু হবে না। আমি সবকিছু সামলে চলতে চাই।’
ফিক করে হেসে ফেলে বোকা মেয়ে। বলে, ‘আমিও মা-বাবার কথা ছাড়া কিচ্ছুটি করবো না। হলো তো এবার। নাকি আরো কিছু জানবার আছে তোমার?’
নাইমের বুকটা নির্ভার হয়ে যায়। মনে হয় যেন কতকাল তার বুকের ওপর চেপে বসেছিল এক দুর্বহ বোঝা। সেই বোঝা থেকে যেন মুক্তি মিললো তার। নির্ভার হয়ে ঝকঝকে হাসিতে উচ্ছল হয়ে ওঠে তার মুখ। মীরাকে ইশারা দেয় টেবিলে আসার জন্য।
হাসতে হাসতে মীরা-সুমন টেবিলে এসে বসে। খাবার পরিবেশন শুরু করে ওয়েটার।