পাখির বাসা

কাক ডাকা ভোরে মগভর্তি চা হাতে করে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় রাসু। সকালটা খুব ভালো লাগে তার। ঝিরঝিরে শীতল বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। এমন সকালে কখনো বিছানায় থাকে না সে। ছোট ভাই বাবলুটা মটকা মেরে ঘুমায়। রাত জেগে পড়ার নেশা আছে ওর, তাই সকালে না ঘুমালে চলে না। আর রাসু রাত এগারটার পর কখনো জেগে থাকে না। সকালের এই সৌন্দর্য তার কাছে স্বর্গীয় বলে মনে হয়।
চায়ের মগে চুমুক দিতে দিতে কৃষ্ণচূড়ার ডালে চোখ যায়। দু’টো কাক বসে আছে পাশাপাশি। কিছুক্ষণ পর পর একটি কাক আরেকটি কাকের গলায়-পিঠে ঠোঁট দিয়ে বিলি করে দিচ্ছে। অন্য কাকটিও তাই করে একটু থেমে থেমে। হুট করে একটি কাক উড়ে চলে যায়, অন্যটি বসে থাকে। রাসু একমনে দেখতে থাকে কাকটিকে। মনে হয় কাকটি অপেক্ষা করছে অন্যটির। ধীরে ধীরে কাপে আরেকটি চুকুম দেয় রাসু। তার অপেক্ষার পালা শেষ হয়। অন্য কাকটি তার ঠোঁটে করে চিকন লোহার তার নিয়ে এসেছে কোত্থেকে যেন। আগেরটার কাছে এসে বসে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে যায় গাছের একটু ভিতরে তিন ডালের সংযোগ স্থলে বানানো বাসায়। সেখানে তারটি রেখে ঠোঁট আর পা দিয়ে গুছিয়ে আবার চলে আসে আগের জায়গায়।
রাসু ভাবতে থাকে, এরা কি নতুন সংসার পাতছে? এই বাসায় কি ডিম পাড়বে ওরা? আগে তো খেয়াল করে নি এদের। আহারে পাখি, তোদেরও নতুন সংসার হয়! একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুকের গহীন থেকে। এমন একটা পাখির বাসা তো আমারও প্রয়োজন। ছোট্ট একটা বাসা, দু’জন মিলে সাজিয়ে গুছিয়ে নেব। ভালো-মন্দ যেমনই হোক অসুবিধা নেই। কিন্তু মনের মতো সাথীই তো পেলাম না। কবে যে পাবো, কে জানে?
আনমনে আরো অনেক কিছু ভাবছিলো সে। হঠাৎ তার খেয়াল হয় পাশে মা এসে চুপচাপ দাঁড়িয়েছে, কিছু বলছে না। ‘মা, কখন উঠলা তুমি?’ বলে তাকায় মা’র দিকে। মা তখনো তসবিহ জপছেন। তিনি কিছু বলেন না মেয়েকে। রাসু একটা মোড়া টেনে এনে মাকে বসিয়ে দিয়ে বলে, ‘তুমি বস, আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি।’
সালেহা চৌধুরী তসবিহ জপতে জপতেই মুচকি হাসেন। রাসু ভিতরে চলে যায়। একটু পর এক মগ চা নিয়ে এসে মাকে দেয় এবং নিজে একটি মোড়া টেনে বসে। ততক্ষণে মা’র তসবিহ পড়া শেষ। তিনি দু’হাতে ফুঁ দিয়ে মেয়ের মাথায় গায়ে হাত বুলিয়ে দেন। রাসু মায়ের আদর উপভোগ করে চোখ বুঁজে।
চা খেতে খেতে মা বারবার তাকান মেয়ের দিকে। রাসু বিষয়টা লক্ষ্য করে বলে, ‘কিছু বলবা মা?’
মাথা ঝাঁকান মা। চায়ের মগটা রাসুর হাতে দিতে দিতে বলেন, ‘নাইমের বাসার নাম্বারটা আমারে একটু দিবি?’
‘কেন মা? ওর নাম্বার দিয়া তুমি কি করবা?’ কৌতুহলী প্রশ্ন রাসুর।
‘না, তেমন কিছু না। ওর মা’র সাথে একটু কথা বলতে চাইছিলাম।’
‘কি কথা বলবা মা? আমার আর নাইমের বিষয় নিয়া কিছু?’
‘না রে মা। এমনিই, ওনাকে একদিন বাসায় দাওয়াত দিমু ভাবতাছি।’ বলে মুচকি হাসেন তিনি। হাসিতে নির্ভেজাল সরলতা ছাড়া আর কিছু নেই।
রাসু একটু নিরাসক্ত ভঙ্গিতে বলে, ‘উর্মির কাছে আছে মা। যখন ফোন করবা তখন ওকে বললেই তোমাকে ধরিয়ে দেবে।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, এখন যদি ফোন করি উনি কি বিরক্ত হবেন?’
‘না না বিরক্ত হবেন না। উনারা তো খুব সকালেই ওঠেন। তবে উর্মিদের বাসায় একটু পরে যাও ফোন করতে। ওরা তো একটু দেরিতে ওঠে। আর ফোন করে ফোনের পাশে রাখা বাক্সে দশটা টাকা ফেলে দিও কিন্তু, হাতে দিতে যেও না।’
‘না না ঠিক আছে, ওইটা শিখাতে হবে না। উর্মির বাবার অফিসে যাওয়ার সময় তো প্রায় হয়েই এলো। তারপর না হয় যাবো। ও ভালো কথা, তুই কি আজ বেরুবি কোথাও?’
‘হ্যা মা ক্যাম্পাসে যাব একটু, কিছু কাজ আছে ডিপার্টমেন্টে।’
‘ও আচ্ছা, তাইলে আমি নাস্তা বানাইতে যাই। তুই একটু মিমিরে রেডি কর, ওর স্কুলের সময় হইয়া যাইব।’ বলে মা চলে যান রান্নাঘরে আর রাসু ব্যস্ত হয়ে পড়ে মিমিকে নিয়ে।

  কিছুক্ষণ পর নাস্তা সেরে মিমিকে নিয়ে বেরিয়ে যায় রাসু। বাবলু তখনো ঘুমায়। টেবিলে ওর নাস্তা রেডি করে মা চলে যান পাশের ফ্ল্যাটে উর্মিদের বাসায়। উর্মিকে বলতেই সে ডায়েরি বের করে ডায়াল বাটন চাপে। ফোন ধরেন নাইমের বাবা প্রফেসর আফজাল হোসেন। উর্মি সালাম দিয়ে রাশিদা বেগমকে চায়। তিনি ফোন ধরলে সালেহা চৌধুরীর হাতে রিসিভার তুলে দেয় সে। তিনিই কথা বলা শুরু করেন, ‘আসসালামু আলাইকুম আপা, আমি রাসুর মা সালেহা বলছি’।
  ‘ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছেন আপা? নাইমরে কত বলছি আপনার সাথে কথা বলাইয়া দিতে, দেয় নাই। আপনে ফোন না দিলে তো কথাও বলা হইত না।’
  ‘জ্বি আপা। ছেলেমেয়েরা যেন কেমন, খালি নিজেদেরটাই চিন্তা করে। বাপ-মা’রও যে শখ-আহ্লাদ আছে বোঝে না।’
  ‘একবারে ঠিক বলছেন আপা। ওরা এমনই। নিজেদেরকে মহা প-িত মনে করে। আপনের শরীরটা কেমন আছে এখন? ওদিন রাসুর কাছে শুনলাম বাতের ব্যথায় নাকি খুব কষ্ট পাইতাছেন?’
  ‘এই তো বয়স হইছে, আমাবশ্যা-পুর্ণিমাতে একটু কষ্ট পাই আর কি, আবার ঠিক হইয়া যায়। ছেলেটা ডাক্তারের কাছে নিতে চায়, আমি বলি আগে তুই ডাক্তার হ, তারপর তুইই আমার চিকিৎসা করিস।’
  ‘আপনার ছেলে মেডিকেলে পড়ে তা তো জানি না! কোন কলেজে পড়ে?’
  ‘আপনার সাথে তো আলাপই হয় নাই কোনদিন, জানবেন কিভাবে। ও তো ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। এইবার থার্ড ইয়ার চলতাছে।’
  নাইমের মা মনে হয় খুব আপ্লুত হন। হাসতে হাসতে বলেন, ‘এই তো আর কয়দিন আপা, আপনের আর কষ্ট থাকব না। দেখতে দেখতে পোলায় ডাক্তার হইয়া যাইব। হা হা হা।’
  ‘হ আপা দোয়া করবেন। আসেন না একদিন আমাদের বাসায়, এক কাপ চা খাইয়া যান।’
  ‘আসবো একদিন, নাইমরে কত বললাম সে তো নিতেই চায় না। আর আমিও তো চিনি না। চিনলে ঠিকই চইলা যাইতাম। আপনেরে দেখনের খুব শখ আমার।’
  কথাটা শুনে খুব খুশি হন সালেহা চৌধুরী। হেসে দিয়ে বলেন, ‘আমার সৌভাগ্য। সময় থাকলে আজকেই আসেন না আপা?’
  সালেহা চৌধুরী’র কথা শুনে রিসিভার ধরা অবস্থায়ই নাইমের বাবার সাথে কথা বলেন রাশিদা বেগম। তারপর বলেন আবার, ‘হ্যালো আপা, আজকে বিকালেই আসবো আমি, ঠিক আছে।’
  ‘আচ্ছা, ঠিক আছে আপা। খুব খুশি হবো আপনারা আসলে।’
  ‘ঠিক আছে আপা, রাখি এখন। খোদা হাফেজ।’

  মা’র কথা শুনে প্রথমে এড়িয়ে গিয়েছিল নাইম। কিন্তু বাবার কথা আর ফেলতে পারলো না। আসরের নামায শেষ হতে না হতেই পাজেরো জিপ চলে এলো বাবার অফিস থেকে। এটা ওনার পার্টি অফিসের গাড়ি। ব্যক্তিগত প্রয়োজনে বুকিং দিলেই পান। মাস শেষে বিল যা হয় দিয়ে দেন। একটা আদর্শিক দলের কেন্দ্রিয় নেতা তিনি। সারা দেশে খুব নামডাক। কিন্তু তিনি একেবারে সাধারণ একজন মানুষ। গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে ঢাকার জমি কিনেছেন, টিনশেড বাড়ি করেছেন। অফিস থেকে যে ভাতা পান তা দিয়ে গাড়ির বিল, ঔষধ-পত্র আর পার্টির জন্য খরচেই চলে যায়। বিভিন্ন জায়গায় সফরে যাওয়ার সময় অনেক বই নিয়ে যান সাথে। সেই বই কাউকে দিয়ে বিক্রি করান। এই বই বিক্রির টাকা দিয়েই মূলত তার সংসার চলে। অফিসের গাড়ি তার নামে বরাদ্দ থাকায় তিনি যাতায়াতের কষ্টে ভোগেন না কখনো। কিন্তু খাওয়া-পরায় বিলাসিতা করার সুযোগ পাননি কোনদিন। বরং এতেই তিনি খুশি। পরিবারের সবাইও এতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
  রাশিদা বেগম, ছোট বোন জুলি আর নাইম রওয়ানা দেয় মতিঝিল এজিবি কলোনিতে রাসুদের বাসায়। দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সালেহা চৌধুরী অপেক্ষা করছিলেন ওদের জন্য। গাড়ি থেকে নেমে সিঁড়ি ভেঙ্গে উঠে দরজায় পৌঁছতেই তিনি অভ্যর্থনা জানান ওদের। রাশিদা বেগম ঘরে ঢুকে জড়িয়ে ধরেন সালেহা চৌধুরীকে। রাসু মিমিকে নিয়ে গেছে উর্মিদের বাসায়। বলেছে চলে আসবে, কিন্তু আসছে না। ওনারা কথা বলছিলেন ড্রইং রুমে বসে। নাইম জুলিকে নিয়ে ব্যালকনিতে বসে আছে মোড়া নিয়ে। পুটুর পুটুর করছে জুলি। বারবার দৌড়ে মা’র কাছে যাচ্ছে আবার ফিরে আসছে তার কাছে।
  দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ফিরে তাকান সালেহা চৌধুরী। খোলাই ছিল ওটা, দেখেন উর্মি এসেছে। সালেহা চৌধুরী তাকে বলেন, ‘রাসুকে আসতে বলো তো মা। আমি একা বাসায় ও জানে না।’
  বলতে না বলতেই রাসুও মিমিকে নিয়ে ঘরে ঢোকে। লাজুক ভঙ্গিতে সালাম দেয় রাশিদা বেগমকে। রাশিদা বেগম ওকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরেন। কপালে চুমু এঁকে দেন আলতো করে। থুতনি তুলে ধরে স¯েœহে জিজ্ঞেস করেন, ‘সেই যে শরিফের বিয়ায় গেলা আর একবারও তো গেলা না খালাম্মারে দেখতে? কেমন আছ মা? কোন চাকরি-বাকরি শুরু কর নাই তো আবার?’
  ‘না খালাম্মা, চাকরি করার ইচ্ছা নাই। আপনার শরীর কেমন? খালু ভালো আছে তো?’
  ‘হ্যা, ভালো আছে মা। সবাই ভালো।’
  ‘জুলিকে আনেন নি? জুলি কোথায়?’
  ‘ও তো ব্যালকনিতে, যাও তুমি কথা বলো ওর সাথে।’ বলে রাসুর মা’র সাথে কথা বলা শুরু করে দেন আবার।
  রাসু আর উর্মি দু’জন আপ্যায়ন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মিমি জুুলিকে খেলার সাথী বানিয়ে মত্ত হয়ে পড়েছে খেলায়। নাইম ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছে। নাইম ঠিক সহজ হতে পারছে না। কেমন যেন অস্থির লাগছে তার, মনে হচ্ছে মাকে রেখেই বেরিয়ে যায় সে। কিন্তু পারছে না। অস্বস্তি যখন খুব বেশি চাউরে ওঠে তখনই দুই কাপ চা হাতে রাসু এসে ঢোকে ব্যালকনিতে। নাইম এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নেয় বাইরের দিকে। রাসুই কথা বলা শুরু করে, ‘চা নাও। আমি নিজ হাতে বানিয়েছি। আমার চা তো তোমার ভীষণ পছন্দ তাই না।’
  নাইম মৃদু হেসে চা নেয়। এই মুহূর্তে তার অস্বস্তি দূর হয়ে গেছে। ভালো লাগতে শুরু করেছে আবার। আসলে রাসুর সঙ্গই এমন, অল্পতেই ভালো লাগে। দু’জনই চা হাতে বাইরের দিকে মেেনাযোগ দেয়। নাইমই জিজ্ঞেস করে, ‘মাকে তোমাদের বাসায়ে এনেছ কেন? তোমার সাথে তো আমার শেষ কথা হয়ে গেছে। তুমি কি মত পাল্টেছ? নাকি আগের অবস্থানেই আছ?’
  মৃদু হাসে রাসু। বলে, ‘আমার মায়ের বহুদিনের শখ খালাম্মার সাথে কথা বলার। মুরুব্বিদের শখ মুরুব্বিদেরই থাকুক। তাতে তোমার আমার কি? আমাদের বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যায় নি তো?’
  নাইম সচকিত হয়। বোঝে, প্রচ- ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন রাসুকে এভাবে জিজ্ঞেস করা উচিত হয় নি তার। একটু সঙ্কুচিত হয়ে বলে, ‘না আমি তা বলতে চাই নি। ওনারা যা নিয়ে ষড়যন্ত্র করছেন সে বিষয়টা বোঝাতে চাচ্ছি।’
  অস্ফুটে হাসে রাসু। চায়ে আরেক চুমুক দেয়। খুব আয়েশ করে বলে, ‘রাজনীতিকের ছেলে তুমি, অথচ রাজনীতিতে একদমই কাঁচা। হা হা হা। এ জন্যই তোমাকে আমার ভালো লাগে। তুমি খুব সরল এবং একরোখা। নিজের সাথে আপোষ করতে জানো না তুমি।’
  নাইম হাসে মৃদু, আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। ধীরেসুস্থে বলে, ‘আপোষ তো তুমিও করতে চাও না। আপোষ করলেই তো অনেক হিসাব মিলে যায়, কি বলো। আব্বার সাথে বাজারে যেতাম। আব্বার যদি কোন মাছ পছন্দ হয়ে যেতো তখন দেখতাম তিনি বেশি দাম মনে হলেও কিনে নিতেন। আমি উসখুস করলে বলতেন, বেশি পছন্দ হইয়া গেলে দামের চিন্তা করবি না। পছন্দেরও একটা দাম আছে বাবা।’
  রাসু বেশ গম্ভীর হয়ে যায় তার কথায়। সে বুঝতে পারে, একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ কি ভাবে তার সন্তানদের মানুষ করেন। ধরে ধরে শিখিয়ে দেন জীবন জটিলতা এবং তা থেকে মুক্তির উপায়। কিন্তু তাঁর সেই দর্শনের সাথে রাসুর দর্শন মেলে না একেবারেই। নাইম যদি তার ফ্যামিলি ট্রেডিশন থেকে বের হয়ে আসে তাহলে ক্ষতি কোথায়, সে কিছুই বোঝে না। তাহলে কি আমাকে তার খুব বেশি পছন্দ নয়? সে কি আমাকে অন্যদের মতো সাধারণ কিছু বলে মনে করছে? তা না হলে তো সে আপোষ করতে চাইতো!
  আরো কি সব ভাবছিলো সে। সবই এলোমেলো। নাইম তার প্রিয় বন্ধু নিঃসন্দেহে, কিন্তু আরো প্রিয় হতে তার বাধা তো সে নিজেই। জীবনে জীবন মেলাতে হলে নারীকে অনেক কিছুই বিসর্জন দিতে হয়, পুরুষকে না। কিন্তু রাসু তা মানতে নারাজ। আমি বিসর্জন দিলে নাইমকেও বিসর্জন দিতে হবে। নয়তো এ পরিণয় অসম্ভব। কিন্তু নাইম কিছুতেই কোন কিছু বিসর্জন দেবে বলে মনে হয় না। সুতরাং ও পথ না মাড়ানোই ভালো। মায়েরা কষ্ট পায় পাক। কিচ্ছু আসে যায় না তাতে। ভাবতে ভাবতে তার চোখে জল এসে জমা হয়। ঝাপসা হয়ে যায় সবকিছু। জল টলমল চোখ সে লুকাতে চেষ্টা করে না। নাইম তা দেখে অনুচ্চ স্বরে আকুল হয়ে বলে ওঠে, 
  ‘রাসু, মায়েরা তোমাকে এভাবে দেখে ফেললে কি ভাববে বলো? আমি ছোট হয়ে যাব। চোখ মোছ প্লিজ।’
  ওড়নার খুঁট দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে হেসে ওঠে রাসু। হাসতে হাসতেই বলে, ‘মায়েরা মানে কি, মা কি দুইটা হয় না কি?’
  নির্ভার হয়ে যায় নাইম। যাক, ওর মনের মেঘ কেটেছে। সেও হাসতে হাসতে বলে, ‘হুম, দুটো মা হওয়ার সময় হয়ে গেছে তোমার আমার। মায়েদের ষড়যন্ত্র ওখানেই।’
  ‘হা হা হা, তুমি কবি হলে খুব ভালো করতে। কেন যে হলে না! কবি হলে খুব গর্ব করে বলতে পারতাম কবি নাইম আমার জানেমন দোস্ত, হি হি হি।’
  ওদের অনুচ্চ হাস্যকলরবে মায়েরা উন্মুখ হন। জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করেন ওদের। রাসু বিষয়টা খেয়াল করে লজ্জা পেয়ে যায়। নাইমের হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে চলে যায় ভিতরে।
  রাশিদা বেগমের জন্য পান সাজিয়ে নিয়ে আসতেই রাসুকে নিজের পাশে বসতে ইঙ্গিত করেন তিনি। রাসু একটু জড়োসড়ো হয়ে বসে। কি বলবে না বলবে ভেবে পায় না। রাশিদা বেগম রাসুর পিঠের ওপর হাত রেখে ওর মাকে বলেন, ‘আপনের মেয়েটারে আমি নিয়া যাইতে চাই আপা, যদি আপত্তি না থাকে।’
  রাসুর মাথা ঝাঁ ঝাঁ করে ওঠে। এ কি কথা বলছেন খালাম্মা? কি হবে এখন? এই সর্বনাশা কা- থামাবে কিভাবে সে? ব্যালকনিতে দাঁড়ানো নাইমও কথাটা শুনতে পায়। সেও বিষম খায় মা’র কা-কারখানায়। এত চটজলদি মা এমন কিছু শুরু করে বসবেন ভাবতে পারে নি সে। সে অবোধ ক্রোধে ব্যালকনির রেলিংয়ে ঘুষি মারে কয়েকটা। মোড়া টেনে মাথার চুলে দু’হাত ঢুকিয়ে বসে পড়ে।
  সালেহা চৌধুরী যেন আসমানের চাঁদ হাতে পান। তিনি গদগদ কণ্ঠে বলেন, ‘আমার কোন আপত্তি নাই। আপনের যেভাবে খুশি নিয়ে যান। আপনের ছেলেরেও আমার খুব পছন্দ। এই দুইটায় মানাইবোও ভালো।’
  রাশিদা বেগম এক হাত দিয়ে রাসুর থুতনি তুলে ধরেন। ওর চোখ দু’টো জলে ভেজা। চাইতে পারে না সে, চোখ বন্ধ। তার চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে রাশিদা বেগমের হাতে।
  সালেহা চৌধুরী উৎকণ্ঠিত হয়ে রাসুর পাশে এসে বসেন। ওর মাথা টেনে নেন নিজের বুকে। আদর করে জিজ্ঞেস করেন, কিরে মা কোন সমস্যা? তোর আপত্তি আছে কোন?
  রাসু কোন সাড়াশব্দ করে না। গভীরভাবে মাকে জড়িয়ে ধরে দু’হাতে। মা পিঠে হাত বুলিয়ে আবার জিজ্ঞেস করেন, ‘কিরে আপত্তি থাকলে বল। তোর মতের বাইরে কিছুই করবো না আমরা। বল মা, খোলাখুলি বল, এ সময় লজ্জা পাইতে হয় না। আর তুই তো এখন এমএ পাশ মেয়ে। তুই মুখ খুলে না বললে বুঝবো কি করে। বল্ মা বল্।’
  মায়ের পীড়াপিড়িতে রাসু মা’র বুকে মুখ ঘষে ধীরে ধীরে বলে, ‘তোমরা যা ভালো বোঝ কর, আমার কোন সমস্যা নেই। আগে ওকে জিজ্ঞেস করো ঠিক আছে কিনা।’
  রাশিদা বেগম আঁচ করতে পারেন কিছু একটা। তিনি ভাবেন, নাইমের হয়তো মত নাই। নাইলে রাসু এভাবে কথা বলতো না। নিজের উপর রাগ হয় তার। আগেভাগে ছেলের মতামতটা জানা দরকার ছিলো। কিন্তু এখন কি হবে ছেলে যদি না চায় তবে তার নিজের মুখ ছোট হয়ে যাবে! কি বড় মুখ করেই না চাইলেন রাসুকে, এখন?
  তিনি উঠে ব্যালকনিতে যান। নাইম তখনো দু’হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বসে আছে। তিনি ভালো করে দেখেন ছেলেকে। কিছুই বুঝতে পারেন না। তবে এটুকু বুঝতে পারেন বড্ড ভুল করে ফেলেছেন তিনি। নাইমের মাথায় ¯েœহের হাত রেখে জিজ্ঞেস করেন, ‘কিরে, আমারে ছোট করবি তুই? আগে বললি না কেন কিছু আমারে? তাইলে তো আমি কিছুই বলতাম না। এখন কি হইব বল? রাসু তো রাজি, তুইই তো এখন বড় জ্বালা। আমার মরণ।’
  নাইম এক হাত দিয়ে মায়ের পা ধরে বসে, ‘আমাকে ক্ষমা করো মা। যা বলার পরে বলবো। এখন সময় চেয়ে নাও।’
  একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে তার বুকের গহীন থেকে। কত দিনের স্বপ্ন তার, এই মেয়েটিকে ঘরের বউ করে নেয়ার। ছেলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলেই এমনটা ভেবেছিলেন। কিন্তু তাকে বিয়ে করতে ছেলে নারাজ! আশ্চর্য! এমন হবে কেন? এসব ক্ষেত্রে তো মা-বাবাকেই বেঁকে বসতে দেখা যায় নাটক সিনেমায়। বাস্তবেও এমনটাই ঘটে প্রায় ক্ষেত্রে। কিন্তু ওদের বেলায় এর ব্যতিক্রম কেন? এটা কেমন বন্ধুত্ব? তাহলে ওদের মাঝে কি কোন আন্তরিকতা নেই? না থাকলে রাসু রাজি হলো কেন? কিছুই বোঝেন না তিনি। ছেলের মাথায় শান্তনাসূচক ¯েœহ দিয়ে ড্রইং রুমে ঢোকেন। 
  রাসু ততক্ষণে ভেতরের রুমে চলে গেছে। ড্রইং রুমে শুভকাঙ্খী দুই নারী মুখোমুখি বসে থাকে কিছুক্ষণ। নিশ্চুপ কয়েক মুহূর্ত পার করে এক নারী অত্যন্ত দুঃখিত কণ্ঠে বলে ওঠে, ‘আমি কিছুই বুঝতে পারতাছি না আপা। আপনের আর মেয়ের মত আমি পাইয়া গেছি। কিন্তু ছেলেরই তো মত পাইলাম না। আমাকে কয়েকটা দিন সময় দেন।’
  রাসু ভেতরের রুমের জানালা দিয়ে বাইতে তাকিয়ে দেখে সকালের সেই কাক দম্পতি। বাসার ওপর বসে একটা কাক বাসা ঠিক করছে, অন্যটি দেখছে চেয়ে চেয়ে।