আমি শহিদ স্যার

মগবাজারে চাচার বাসায় কেন যেন জরুরী ভিত্তিতে ডাকা হয় নাইমকে। রাশিদা বেগম রুটি বানাতে বানাতে নাইমকে বলেন, ‘তোর ধলু চাচা সকাল সকাল তরে যাইতে কইছে। নয়টার মধ্যে থাকতে হইব। কি নাকি জরুরি কাজ আছে তোর সাথে।’
নাইমের এই চাচার আসল নাম ধলু না। তার গায়ের রং দুধে-আলতা মেশানো সুন্দর। এ জন্য তার মা তাকে ধলু বলে ডাকেন ছোটকাল থেকেই। সেই থেকে সবাই তাকে ধলু বলে ডাকে। এই নামের আড়ালে তার আসল নাম ঢাকা পড়ে গেছে। তিনি বিয়ের আগ পর্যন্ত তাদের বাসায়ই ছিলেন। বিয়ের পর চাচিকে নিয়ে মগবাজারে ভাড়া থাকতে শুরু করেন।
ডিগ্রি পাশ করে তিনি ইন্ডেন্টিং ব্যবসা শুরু করেন তাদের বাসায় থাকতেই। এই চাচাকে নাইম খুবই ভালোবাসে। সময় পেলেই চাচার বাসায় গিয়ে কাটিয়ে দেয় কয়েক দিন।
ধলু চাচার ইন্ডেন্টিং ফার্মে চাচা বেশ কয়েকবার কাজ করতে বলেছিলেন। কিন্তু সে কেন যেন আগ্রহ বোধ করে নি। তবে মাঝে মাঝে সেখানে গিয়েও সে অনেক সময় কাটায়। অফিসের ম্যানেজারের বয়স তার থেকে একটু বেশি হলেও তার সাথে বন্ধুর মত ভাব। নাইম বেশ উপভোগ করে তার সঙ্গ।
নাস্তা সেরেই নাইম চলে যায় মগবাজার। চাচি তাকে খুব ¯েœহ করেন। কুশল বিনিময় করে চা খাইয়ে চাচি তাকে পাঠিয়ে দেন চাচার অফিসে। সেখানে গিয়েও সে চাচার দেখা পায় না। ম্যানেজার আসিফ সাহেব তাকে বসিয়ে রেখে গল্প-গুজব শুরু করে দেন। এগারটার দিকে চাচা অফিসে এলে নাইম চাচার মুখোমুখি হয়। চাচা জড়িয়ে ধরেন ভাতিজাকে। বলেন, ‘শোন বাবা, তোমার তো এখনো রেজাল্ট বের হয় নি। কাল থেকে তুমি আমার অফিসে কাজ শুরু করবা, ঠিক আছে। আসিফ সাহেব তোমাকে সব কিছু বুঝিয়ে দেবেন। আর আসিফ সাহেব, আপনাকে যেভাবে বলেছি, এখুনি ওকে নিয়ে বনানী চলে যান। শহিদ সাহেবের বাসায় যাবেন।’
নাইম কিছুই বলতে পারে না। সে মাথা নীচু করে মেনে নেয় সবকিছু। আসিফ সাহেব ওকে নিয়ে রওয়ানা দেয় বনানীর উদ্দেশ্যে।
স্কুটারে উঠেই নাইম জিজ্ঞেস করে, ‘আসিফ ভাই, ব্যাপার কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কোথায় যাচ্ছি আমরা?’
আসিফ রহস্যময় হাসে। মজা করে বলে, ‘মিয়া আপনে হইলেন কুরবানীর গরু। জবাই হইতে হইব, বুঝলেন। হা হা হা।’
‘মানে কি? বুঝলাম না।’
‘চলেন আগে, জায়গামত যাই। তারপর সবই বুঝতে পারবেন।’ বলে রহস্যময় হাসে আসিফ। নাইম যেন কিছুটা আঁচ করতে পারে ব্যাপারটা। হয়তো কোন পাত্রী দেখার ব্যাপার-স্যাপার হবে! যাই হোক দেখি কি হয়!

শহিদ সাহেবের বাসা খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট হয় না তাদের। ত্রিতল একটি বাড়ির নীচতলার দরজায় নক করতেই দরজা খুলে দেন চাচার বয়সী এক ভদ্রলোক। আসিফ সালাম দিয়ে পরিচয় দেয়, ‘আমি আসিফ, মগবাজার থেকে এসেছি। আর এ হচ্ছে স্যারের ভাতিজা নাইম।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা, আমি শহিদ স্যার।’ বলে হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দেন ভদ্রলোক। নাইম পুলকিত হয়, আরে নিজেই নিজেকে শহিদ স্যার বলে পরিচয় দিচ্ছেন ভদ্রলোক! অন্যরা স্যার বলে বলুক, কিন্তু নিজেকে নিজে স্যার বলে পরিচয় দেয় কেউ! হা হা হা, মজার মানুষ তো!
শহিদ স্যার তাদেরকে খুব সমাদর করে ড্রইং রুমে নিয়ে যান। মজা করে গল্প করতে শুরু করেন। কয়েক মিনিটের জন্য একবার ভিতরে যান, হাসতে হাসতে ফিরে আসেন আবার। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খুব মজা করে আলাপ জমিয়ে ফেলেন তিনি। নাইম একেবারে সহজ হয়ে যায়। সে তার কৌতুহল দমাতে পারে না। ফুট করে সে জিজ্ঞেস করে বসে, ‘আমার একটা কৌতুহল আছে, যদি কিছু মনে না করেন, বলব?’
‘আরে বলুন বলুন, কৌতুহল কখনো দমিয়ে রাখতে নেই। বলুন শুনি।’
বলাটা ঠিক হবে কি হবে না ভাবতে ভাবতে বলেই বসে নাইম, ‘একটা ব্যাপার, আপনি নিজের পরিচয় দিলেন শহিদ স্যার বলে। কেউ তো নিজের পরিচয়ে নিজেকে স্যার বলে না সাধারণত। আপনি বললেন কেন?’
হো হো করে হেসে ফেলেন ভদ্রলোক। একেবারে প্রাণখোলা হাসি, নাইমের ভালো লাগে।
‘আসলে ব্যাপার হলো কি।’ বলতে শুরু করেন তিনি, ‘প্রথম থেকেই শুরু করি। আমার চাকরি জীবন শুরু হয় বিমান বাহিনীতে কমিশন্ড অফিসার হিসেবে। আমার বস ছিলেন বেশ সজ্জন লোক। ট্রেনিং এর সময় একদিন তিনি খুব আফসোস করে বললেন, ‘আমার মেয়েটা গণিত একেবারেই বোঝে না। কত টিচার চেষ্টা করলো কিছুতেই কিছু হলো না। ও দু’দুবার ফেল করলো ইন্টারে। কি যে করি বুঝতে পারছি না।’ আমি আবার সেই ছেলেবেলা থেকেই গণিতে খুব ভালো। আমার কেন জানি মনে হলো আমি একবার চেষ্টা করে দেখি না কেন! স্যারকে বললাম, ‘স্যার আপনি কিছু মনে না করলে আমি একবার চেষ্টা করে দেখি।’ স্যার রাজি হয়ে গেলেন। আমি স্যারের মেয়েকে গণিত পড়ানো শুরু করতেই সে অবাক করা ফলাফল শুরু করলো। স্যারের মেয়ের সাথে তার আরো ক’জন বান্ধবী এসে জুটলো। গণিতের সাথে সাথে ফিজিক্স, ক্যামিস্ট্র, বায়োলজিও পড়াতে শুরু করলাম। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় এরা সবাই খুবই ভালো রেজাল্ট করলো। আর যায় কোথায়। আমার কাছে প্রাইভেট পড়ার জন্য লাইন পড়ে গেলো। স্যার আমাকে সুযোগ করে দিলেন যাতে ব্যাচ পড়াতে পারি। এভাবেই ব্যাচ পড়াতে পড়াতে কখন যে আমি শহিদ স্যার হয়ে গেলাম নিজেও টের পেলাম না। বিমান বাহিনীর চাকরী ছেড়ে শুরু করলাম শিক্ষকতা। সবাই আমাকে শহিদ স্যার বলে ডাকতো, আমিও তাদের সাথে নিজেকে পরিচয় দেওয়া শুরু করলাম শহিদ স্যার বলে। হা হা হা।’
মজা করে হাসলেন তিনি। আমরা সবাই তার সাথে যোগ দিলাম। ইতিমধ্যে বেশ সেজেগুজে একটি মেয়ে নাস্তা নিয়ে আসলো। স্যার পরিচয় করিয়ে দিলেন নিজের মেয়ে বলে। তাকে বসিয়ে রেখে ভেতরে চলে গেলেন। বললেন, ‘আপনারা কথা বলুন, আমি একটু আসছি।’
নাইমের বুঝতে কিছুই বাকী রইলো না। নাস্তা খেতে খেতে গল্প করলো তারা। মেয়েটি অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে তিতুমীর কলেজে। নাইম খুব ভালো করে খেয়াল করলো মেয়েটিকে। গড়পড়তা ধরণের মেয়ে। চেহারায় জৌলুস নেই, তবে মায়া আছে। কিন্তু মোটের ওপর তেমন আকর্ষণীয় নয়।
কিছুক্ষণ পর শহীদ স্যার এলেন। তার হাতে চক-ডাস্টার। তিনি এসেই কৈফিয়তের সুরে বললেন, ‘কিছু মনে করবেন না, একটু মাস্টারী করে এলাম। ছাত্ররা বসেছিলো অনেকক্ষণ।’ বলে টি টেবিলের দিকে নজর যেতেই হা হা করে উঠলেন, ‘আরে আরে আপনারা তো কিছুই নিলেন না। সব পড়ে রইলো। কি রে মা, তুই কি ওনাদের জোর করতে পারলি না!’
আসিফ উৎসাহের সঙ্গে বলে উঠলো, ‘আমরা যথেষ্ট নিয়েছি স্যার। কিন্তু আপনার মেয়ে তো কিছুই মুখে তুললো না। আপনিও নিন।’
তিনি বসলেন। চা-নাস্তা এগিয়ে দিলেন, নিজে নিলেন। কথায় কথায় বললেন, ‘আমার মা, মানে ওর দাদু খুব অসুস্থ। না হলে আপনাদের সাথে এসে গল্প করতেন। খুব মিশুক তিনি। মেহমান পেলে গল্প করতে করতে সময় পার করে দেন। চলুন, আপনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেই।’
আসিফ-নাইম বাবা-মেয়ের পিছু পিছু পাশের রুমে যায়। রুমের দরজায় যেতেই ধাক্কা খায় নাইম। দাদুর পাশে খাটে বসে আছে অপূর্ব সুন্দরী এক বালিকা। রূপ-লাবণ্য যেন ছিটকে ছিটকে বেরুচ্ছে তার চেহারায়। সাজগোজহীন কিন্তু অপূর্ব লাস্যময়ী বালিকা। নাইম থমকে যেয়ে তাকিয়ে থাকে বালিকার দিকে। তাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শহিদ স্যার পরিচয় করিয়ে দেন, ও হলো আনিকা। আমার ছোট মেয়ে। এসএসসি পাশ করলো কেবল।’
আনিকা ওদের সালাম দিলো। তার কণ্ঠ শুনে মুগ্ধ হয়ে গেল নাইম। মনে হচ্ছিল যেন কোকিল ডেকে উঠলো কোন। ঝরণার মতো উচ্ছল মনে হলো তার কণ্ঠস্বর। মুগ্ধ হয়ে গেল নাইম। আজকের দিনটি সার্থক বলে মনে হলো হলো তার।
দাদুর সাথে কুশলাদি বিনিময় করে তারা বেরিয়ে এলো বাসা থেকে। ফেরার পথে আসিফ বারবার তাকে জিজ্ঞেস করলো, কেমন লাগলো পাত্রী? নাইম কিছুই বললো না। তার চোখে কেবলই আনিকার চেহারা ভেসে বেড়াতে লাগলো। আসিফের চাপাচাপিতে শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেললো, ‘পাত্রী পছন্দ হয়েছে ছোটটা, বড়টা নয়।’
আসিফ স্কুটারের ভেতরই হেসে গড়িয়ে পড়লো তার গায়ে। হাসতে হাসতেই বললো, ‘না রে ভাই, না। তোমারে দিয়ে হবে না। বুড়োটাকে রেখে বাচ্চা মেয়েকে কখনোই বিয়ে দেবেন না ভদ্রলোক। যাহ্ শালা ক্যানসেল এই পাত্রী।’