ইরাবতী-উপাখ্যান

তিনবার ধর্ষিতা হবার পর বোল্লো ইরাবতী:
এ দেশে ধর্ষণ নির্যাতন নিপীড়ন ছাড়া
আর কি আছে বলো তো!

আমি: অনেক কিছুই আছে- রাজা আছে
প্রজা আছে জনগণমনোঘন- উন্নয়ন আছে।

ইরা: আমি কিন্তু একবারও বিচার পাই নি-
সে কথা ভুলে গেছো বুঝি!

আমি: ভুলিনি তবে মানুষেরা ভুলে গেছে,ভুলে যায় যেভাবে ভুলে গেছে নুসরাত তনু
এবং অসংখ্য ধর্ষিতাকে!

ইরা: আমি আজ কোথায় দাঁড়াবো তবে?

আমি: তুই দাঁড়াবি না,তোর উপর দাঁড়িয়ে থাকবে অন্য কেউ!

ইরা: তাহলে তুমিই বলো- এ দেশে
মাতৃহন্তারক ছাড়া আর আছে টা কী!

আমি: সব আছে, শুধু এ দেশটাই আমাদের নেই!
…………………………………………..

ইচ্ছে

জলেরা বৃষ্টিতে ভিজে গ্যালো
রোদ্দুর পুড়ে হলো ছাই
ইচ্ছে করে চৈত্রের খরতাপে
আগুনবৃষ্টি হয়ে তোমাকে পোড়াই
…………………………………………..

জননী

আমার এ শরীর আর সমস্ত হৃদয় জুড়ে
কষ্ট বানিয়েছে দ্যাখো কী নিপুণ ক্ষত!
শুনেছি যে যতো বড়ো প্রেমি
কষ্ট তার ততো বড়ো- সেইমতো।
অথচ কষ্টে কষ্টে আর কবিতা আসে নি
যদিও শুনেছি – কষ্ট নাকি কবিতার জননী
…………………………………………..

পরপুরুষ

তুমি এলে বহুদিন পর
বৃষ্টি এলো
তুমি বৃষ্টিতে ভিজে গেলে!
বৃষ্টি ও বৃষ্টিভেজা তুমি- আগুনধরানো এই দৃশ্যটি আপাতত দেখে যাওয়া ছাড়া এখানে আমার
অন্য কোনো ভূমিকা নেই।
বৃষ্টি ও তোমাকে ছুঁয়ে দেবার অধিকার
ছিনিয়ে নিতে পারে যে-পুরুষ
শাস্ত্রীয় ভাষায় সে হলো- নিজস্ব পুরুষ।
একজীবনে সারাটা জীবন আমি যে অপবাদ
কাঁধে বয়ে বেরিয়েছি তার নাম- পরপুরুষ
তাই ছুঁয়ে দেবার অধিকার আমার কখনোই
ছিলো না,
নেই!
যেরকম প্রাক্তন স্বামী পারে না ছুঁয়ে দিতে
প্রাক্তন বধুকে তার।
…………………………………………..

সীতা, রাম ও তুলসিতন্ত্র

চৈতি: চিরদিন সীতাকেই কেনো দিতে হয় অগ্নিপরীক্ষা
পরীক্ষা দিতে হয় সতীত্বের!
রাম কেনো রয়ে যায় পরীক্ষা বহির্ভুত দেবতা কিংবা প্রাণী!

আমি: আসলে প্রকৃতি নিজেই নারীবিদ্বেষী!

এমন সময় খুড়িমা আমাদের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি সম্ভবত আমাদের কথা
শুনে ফেলেছিলেন।
বোল্লেন: কী বোলছিস এসব! ধম্মের গলায়
ফাঁসি লটকাচ্ছিস নাকি রে!

খুড়িমাকে বোঝানোর সুযোগই পেলাম না–
খুড়িমা,আমরা কিন্তু তোমাদের মানে নারীদের পক্ষেই কথাগুলো বোলছিলাম।
আসলে প্রকৃতি বোলতে কিছু নেই।প্রকৃতি হলো পুরুষতন্ত্রের একটি সমার্থক শব্দ।

দেখলাম- খুড়িমা গুটি গুটি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে উঠোনের কোণায়- তুলসি গাছের দিকে।

মনে হলো- প্রকৃতি বা কোনো ঈশ্বর নয়,
পুরুষতন্ত্রই খুড়িমাকে অন্ধের মতোন
হাঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তুলসিতলায়
যেখানে খুড়িমা খুঁজে ফেরেন এক অস্পষ্ট স্বর্গের আলোছায়া – রোদ- রোদ্দুর- রৌদ্রহীনতা!
…………………………………………..

তাসান বোলছে সিঁথি-কে

প্রতিদিন প্রতিটিক্ষণ তোমার কথাই মনে পড়ে যায়।ভুলে যাই- এখন যেনো আমার কী করবার
কথা ছিলো! এমনও হয়েছিলো একদিন- স্নান অর্ধেক সেরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলাম। change হতে গিয়ে লক্ষ্য করে নিজেই
হেসে ফেলি- ‘দ্যাখো কী কাণ্ড- এই, শুনছো!’ পরক্ষণেই মনে পড়ে- শোনার মতো তো কেউ নেই।তাহলে কাকে ডাকছি আমি! এভাবে এরকম
ভুল বার বার হয়ে যায়। প্রায়শ ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে থেকেই বলি- এই পাগলি,
শুনতে পাচ্ছো, আমার বেড টি কোথায়!
তুমি হয়তো তখোন রান্নাঘরে- ভাবি।
আসলে তখোন রান্নাঘরে কেউ নেই।

আমার এ ঘরের সবকিছুতেই তোমার ছোঁয়া। সবকিছুই আমি কী মিহিন আর মায়াবীভাবে
ছুঁয়ে দিই- তোমার স্পর্শের ঘ্রাণ পাই অবিকল আগের মতোন। কিন্তু এরকম কিছুই
তোমার হবার কথা নয়, হবেও না।
কীভাবে হবে বলো! আমাদের বাংলাদেশিরা তো চিরদিনই বিদেশি প্রোডাক্টের প্রতি মোহমুগ্ধ।
মনে করে- বিদেশিদের সবকিছুই অন্যরকম। এমনকি ওদের… ও মনে হয় খুব টেস্টি হবে!
তুমি থাকো এখন ওরকম বিদেশি প্রাসাদে।চাকচিক্যময় সমস্ত অনুষঙ্গ নিয়ে স্বর্গ ওখানে নিজেই যেনো হাজির। লিমুজিন, ভি-সিক্স- আজ লন্ডন তো কাল ম্যায়রিকা।আমি সামান্য
আদার ব্যপারি, ওসব বুঝবো কী করে বলো! আমার না হয় লিমুজিন ছিলো না
কিন্তু ছোট্ট একটি জলের নৌকো তো ছিলো!
যে- নৌকোয় তোমাকে নিয়ে পাড়ি জমাতাম ঝাউবন পাড় হয়ে বনদিঘি- যমুনার কাছে।সারাটাপথ আমার একেকটি গান শুনে
তুমি যেনো প্রতিবারই পুনর্জন্ম পেতে- এ কথা তো তোমার মুখ থেকেই শোনা আমার।
একদিন বাতাবিনেবু ছুরি দিয়ে কাটতে গিয়ে আমার আংগুলে লেগে ছরে গিয়ে
গল গল করে রক্ত বের হতে লাগলো।
তুমি শাড়ির আঁচল দিয়ে আমার আঙুল
ব্যান্ডেজ করে দিতে দিতে বোল্লে:’ তোমার
এক ফোঁটা রক্তের জন্য আমি আমার
শরীরের সমস্ত রক্ত বিসর্জন দিতে পারি।’
হ্যাঁ,তুমি বিসর্জন দিয়েছিলে
তবে রক্ত নয়, নিজেকেই।বিসর্জন দিয়েছিলে
অন্য কারো কাছে- জৌলুসমাখা জীবনের কাছে।

আরে দ্যাখো তো কী সব বকছি আমি
পাগলের মতো! আসল কথাটাই তো
জানা হলো না- আমাদের ক্ষুদে পরিটা
কেমন আছে? সরি, একটা ভুল হয়ে গেছে-
এখন তো আর পরিটা আমাদের নয়- তোমাদের। বলো না, তোমাদের পরিটা লক্ষী পুতুলটা
কেমন আছে? আমি গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে
না দিলে লক্ষীটা ঘুমোতোই না।যখোন
ওকে কোলে নিতুম, আমাকে কী মিষ্টি সুরে
গান শোনাতো- “মন্দ হোক ভালো হোক, বাবা আমার বাবা
পৃথিবীতে বাবার মতো আর আছে কে বা!” কখনো জেমসদা’র
সুরে গাইতো- “বাবা কতোদিন কতোদিন
দেখি নি তোমায়”। কতোদিন নয়রে খুকি,
তুই আমাকে আর কোনোদিনই দেখতে পাবি না।আমি যে এখন তোর মিথ্যেমিথ্যি বাবা! না না
বাবা নই, আমি এখন তোর আংকল! হা হা কী মজা কী দারুণ মজা! লক্ষী মা লক্ষী সোনা আমার এখন থেকে চিরদিন তোকে এক মিথ্যে বাবার কাছে থেকে যেতে হবে! তবু মিথ্যে অই বাবাকে নিয়েই ভালো থাকিস তুই,মিষ্টি পরি আমার।

তুমি চলে যাবার পর একদিন অবিনাশ
এসে হাজির। কথায় কথায় বোলছিলো:’ এরপরও বোলবি- অই মেয়েটা তোকে ভালোবেসেছিলো!”
আমি বোলেছিলাম: হ্যাঁ বোলবো। হৃদয়ে হৃদয় গেঁথে নিয়ে বেঁচে থাকা আর আর শরীরে শরীর মিশিয়ে বেঁচে থাকা এক নয়। দেখিস একদিন সিঁথি সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে দিয়ে আমার কাছেই ফিরে এসে ভীষণ জড়িয়ে ধরে বোলবে:” আমি শুধু তোমাকেই ভালোবেসেছিলাম, আজীবন তোমাকেই ভালোবাসি শুধু। আর মাঝখানের অই দুর্ঘটনাগুলো ভালোবাসা নয়, ওসব অন্যকিছু যা আমার
মুখ ফুটে বেরুবে না। তুমি আমায় ক্ষমা করে দাও। জানি, তুমি তো সেই তুমি যার কাছে আমার
সহস্র ভুলও ফুলের মতো ক্ষমা পেয়ে যায়।বলো, ঠিক বলিনি আমি?

তারপর অবিনাশকে বলেছিলাম: তোর তো এসব বোঝার কথা- তুই কবি মানুষ।
“আমি কবি!” বোলে অবিনাশটা হো হো করে
হেসে উঠেছিলো। হাসলে অবিনাশকে দেখে মনে হয়- এই ছেলের পক্ষে পাপ স্পর্শ করা সম্ভব নয় অথচ তবুও সুদর্শনা ওকে ক্ষমা করতে পারে নি। সুদর্শনা এখন কোথায়- এ কথা আমি আর কোনোদিন অবিনাশকে জিজ্ঞেস করি নি প্রচন্ড এক অভিমানে।

সিঁথি এ কথা তোমার জানবার কোনো মানেই
হয় না যে- ৪ দিন হলো আমি covid19- এ
আক্রান্ত হয়ে কোয়ারেন্টিনে আছি। অবস্থা তেমন সুবিধের নয়।কয়েকদিনের মধ্যেই হয়তো শুরু হবে তীব্র শ্বাসকষ্ট। সেই দুঃসহ শ্বাসকষ্টের সময়- যখোন মৃত্যু মাত্র কয়েক মিনিট দূরে- তখনও
বোলবো আমি: সিঁথি, তুমি শুধু আমাকেই ভালোবেসেছিলে। অন্য কাউকে কিছুতেই নয়। এখনও আমি তোমার চোখের তারায় তাকিয়ে নিশ্চিত বোলে দিতে পারি- তোমার হৃদয়ে
লেখা আছে যে-নাম, সে হলো – আমি,
কেবলি আমি, অন্য কেউ কিছুতেই নয়।
নইলে যে ঈশ্বরও মিথ্যে হয়ে যাবে!

আমার মৃত্যুর পর তোমার কাছে যখোন
সংবাদ পৌঁছুবে- ‘বাংলাদেশের বিখ্যাত তারকা তাসান আর নেই!” আমি জানি ইংরেজিতে তোমার স্ট্রেইট বাক্যটি হবে:” Who is Tasan?” বিশ্বাস করো – এর চেয়ে বেশি কিছু আমি
মোটেই প্রত্যাশা করি না।সেই বিখ্যাত
বাক্যটির মতো- “ক্ষমার অধিক দণ্ড
দিও না আমায়”। তুমি আমাকে চিনতে পারলে যে আমার যন্ত্রণা দ্বিগুন বেড়ে যাবে।
ভুলে যাও আমাকে, স্রেফ ভুলে যাও। ভুলে যাও- জলনৌকো বনদিঘি যমুনা শরীরের সমস্ত রক্তের বিসর্জন…

শুধু একটি প্রশ্ন তবুও যে থেকে গেলো- তুমি কি কখনোই আমাকে চিনতে পেরেছিলে?

কিছুক্ষণ পর ডাক্তারবাবু আসবার কথা যদিও বাংলাদেশে ৯ টার ট্রেন ক’ টায় আসবে যেমন ঠিক নেই- কিছিক্ষণ পরের ডাক্তার যে কখোন আসবে নাকি আদৌ আসবে না- তারও কোনো ঠিক নেই!
পাশের বেডে- একাদশ শ্রেণিতে পড়ে-
একটি ছেলে ভর্তি হয়েছে।ডাক্তারবাবু আসবেন-
এ কথা শুনলেই তার ধারণা হয়- সে বুঝি
মারা যাবে! আর সাথে সাথেই সে একটি গান
বার বার একটি গানই শুনতে শুরু করে: “দূরে তুমি দাঁড়িয়ে / সাগরের জলে পা ভিজিয়ে/ কাছে
যেতে পারি না/ হাতটা ধরতে পারি না…”
তখোন কেনো যেনো কোনো এক বিচিত্র কারণে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে ছেলেটা। দেখে- আমার দু’চোখ বেয়ে ঝরে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের মতো এক অবিশ্রান্ত জলের ধারা…
…………………………………………..

আধিপত্যবাদ ও অনান্য দুর্ঘটনা

এখানে কোনো স্টেশন নেই,শুধু ট্রেন আসছে
আর যাচ্ছে কোথাও চলে।
দূরে হয়তো অনন্তকাল দূরে একটি স্টেশন
রয়ে গেছে যেখানে একমাত্র অপেক্ষমান
যাত্রীর নাম ঈশ্বর যার বস্তুত অপেক্ষার কোনো দায় বা তাড়া কোনোটাই নেই।
সেই ঈশ্বর নিয়ে প্রাগৈতিহাসিক কাল ধরেই কতোইনা শুনে এসেছি গল্পকথা শাস্ত্রকথা পুরাণকথা। -সেসব অন্য বিষয়।
এখানে যেখানে স্টেশন নেই
তবু দেখতে পাওয়া গেলো একটি পুরুষ
ও অপর এক নারী।
এই দু’জন নির্জন অন্ধকারে একসংগে ঘুমোলেই পৃথিবী মানুষে মানুষে ভ’রে যাবে।
স্বাভাবিক প্রবণতাবশত ওরা শুতে চাইছে
কিন্তু মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি হায়েনা!
জীবন অনিশ্চিত হবার সম্ভাবনা সুতরাং
থেকেই গেলো- তাহলে আপাতত বাঁচা,
তারপর শোয়া।
এই পৃথিবী মানুষে মানুষে ভ’রে গেলে
হায়েনার কী এমন ক্ষতি- বোঝা মুশকিল!
তবে হায়েনাটি অনন্তকাল দূরের স্টেশনের মতোই ওদের শুতে যাওয়াকে আটকে রেখে দেবে অনন্তকাল- অবস্থাদৃষ্টে এ কথা
বুঝে নিতে কষ্ট হলে তা লেখা রয়ে যাবে বেদনাপ্রধান অধ্যাদেশে।
এবং তাই, এই ঐতিহাসিক সংগমকার্যটি পরিচালিত হতে হলে একজন সাহায্যকারী
ঈশ্বর প্রয়োজন যিনি থাকেন অনন্তকাল দূরে।
নারী ও পুরুষ অনন্তকাল দূরের স্টেশনে অপেক্ষমান যে-ঈশ্বর তার জন্য অপেক্ষা করছেন।
তিনি চাইলেই কেবল মুক্তি সম্ভব
হায়েনার থাবা থেকে।
দূরবর্তী ঈশ্বরের অনিশ্চিত আগমন, নারী ও পুরুষ এবং হায়েনা- এই দৃশ্যপট কল্পনা ক’রে
হায়েনার সহজ সংজ্ঞা হতে পারে- ‘হায়েনা
নিজে সংগম ক’রে থাকলেও অন্যকে
তা করতে দিতে সে কখনোই রাজি নয়!

আমরা একটি অনিশ্চিত সংগমের অপেক্ষায়
রয়ে গেলাম যেহেতু ঈশ্বর সংক্রান্ত বিষয়টি
আমরা এখনও নিশ্চিত নই!
…………………………………………..

সুদর্শনা, কোনো এক রূপালি নদীর তীরে

মানুষের ভাবনাগুলো প্রায়শ এরকম হয়: মনে হয়- অনেক বছর পর যখোন মৃত্যু খুব কাছাকাছি- এসেছে দাঁড়িয়ে দুয়ারে,লোডশেডিং শেষে হঠাৎ ইলেক্ট্রিসিটি চলে আসবার মতোন একদিন সুদর্শনা ফোন করে বোলবে: দাদা,আমি তোমার সেই সুদর্শনা,আমাকে ভুলে গেছো নিশ্চয়ই!
মনে পড়ে- সেই যে বোলতে তুমি: সমুদ্রতীর জোছনা রাত ঝিরিঝিরি বাতাস একটি নারী মানে তুমি প’রে আছো সাদা জর্জেট, আকাশ থেকে জোছনা নেমে এসে ভর করেছে তোমার
সাদা জর্জেটে- মনে হচ্ছে একটি জোছনা
হেঁটে হেঁটে হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ দূরত্ব মাড়িয়ে
অন্য কোনো দূরে… আর এই দৃশ্যটি পেছন থেকে অসহ্য যন্ত্রণামাখা অনুভূতি নিয়ে
দেখে নিচ্ছে ভস্মাধার পরিবৃত এক যুবক যে- যুবক জন্ম নিয়েছিলো শুধু এই আশ্চর্য সুন্দর আর হাহাকারময় দৃশ্যটি দেখে নেবে বোলে।বোলেছিলে: জীবনে অন্তত একবার হলেও আসবে আমাদের বাড়ির পাশের রূপালি নদীটির পাড়ে। এসে আমার হাতে হাত রেখে বোলবে- এই পৃথিবীতে আমার কাছে একমাত্র সত্য ও একমাত্র সুন্দর- তুমি, শুধুই তুমি। এছাড়া আমার জীবনে আর কোনো সত্য নেই, আর কোনো সুন্দর।

দাদা, সেতো বহুদিন হলো কিন্তু তুমি আসোনি কোনোদিন।সেই যে সমুদ্রতীর জর্জেট শাড়ি জোছনা রাত রূপালি নদী- সবকিছুই না দেখা
রয়ে গেলো। দাদা, আজ তোমাকে ডাকছি।
তুমি কি একবার এসে দেখে যাবে
তোমার সেদিনের সেই ছোট্ট বোনটা দাঁড়িয়ে আছে কীরকম এক অরন্তুদ ধ্বংস্তুপের উপর!

সুদর্শনার এই কথাগুলো শেষ হলে আমি বোলবো: সেই যে তুই হারিয়ে গিয়েছিলি আমার বিমর্ষ আর- অসতর্ক মুহুর্তের একটি ‘ভুল’ ক্ষমা করতে না পেরে- আমিও পারি নি নিজেকে ক্ষমা ক’রে দিতে মনের অজান্তেই তোকে কষ্ট দিয়েছিলাম বোলে। তারপর একটু একটু ক’রে নিজেকে সম্পুর্ন শেষ ক’রে দিয়েছি। শেষ হয়ে যাবার এক ভয়ংকর
নেশা যেনো আমাকে চেপে ধরেছিলো। আজ আমি পুরোদস্তুর শয্যাশায়িত কৃত্রিম মেডিকেটেড বেডে। আমাকে সারাক্ষণ কেবলি শুয়ে থাকতে হয়।
নাকে নল লাগানো, বিশেষ অঙ্গে লাগানো আছে ক্যাথেটার। আমার এখন ” এখন- তখোন অবস্থা” – ডাক্তারবাবু বোলে দিয়েছেন স্ট্রেইট!
সত্যিই খুব ইচ্ছে ছিলো জীবনে একবার অন্তত একবার দেখা হোক কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে বোন।তোর একটা ফোনের জন্য আমি অনন্তকাল অপেক্ষা ক’রে থাকবো- বোলেছিলাম।গুণে গুণে অনন্তকাল পরেই ফোন দিলি তুই।কী অপুর্ব আর বেদনাপ্রধান অভিমান তোর!
তোকে দেয়া কথা রাখবার আর কোনো সুযোগ রইলো না আমার।সেদিনের মতোন আজকেও করজোরে ক্ষমা চাইছি।ক্ষমা করে দিস
অক্ষম এই অবিনাশদাকে যে- অবিনাশ
কবিতার মতোই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিলো একদা সুদর্শনার করুণার কাছে।

কিন্তু, কিন্তু – অই যে একটা কথা আছে না- Man proposes God disposes! এই পড়ন্ত বেলায় এসেও ঘটে যাচ্ছে ঠিক তাই।পৃথিবীর কোনো সুদর্শনাই ফোন করে নি অবিনাশদাকে- যে- সুদর্শনা চিরদিন থেকে যায় কোনো এক
রূপালি নদীর তীরে!
…………………………………………..

বিপ্লব

নালি বেয়ে
জাইগোট ভেঙে
ন্যাপকিন ছিঁড়েখুড়ে
সালোয়ার রক্তাক্ত ক’রে দিয়ে
আমি বের হয়ে আসি
জেলভাঙা দাগী আসামীর মতো
আমাকে আটকে রাখা যায় না কিছুতেই
আটকে রেখে দিলে
বন্ধ্যা হয়ে যাবে সমগ্র পৃথিবী তোমার
…………………………………………..

নারীকাব্য

কবি তার এক জীবনের সমগ্র কবিতার খাতা টুকরো টুকরো ক’রে ছিঁড়ে ভাসিয়ে দিলেন
পুকুরের জলে। যে- নারীর জন্য সে
কবি হয়ে উঠেছিলেন সেই নারী
হারিয়ে যাবার পর (যেভাবে নারীরা হারিয়ে যায় নতুন কোনো ইশারায়) তার কাছে সমগ্র কবিতাই
মিথ্যে মনে হলো। তাই পুকুরের জলেই ওগুলো ভেসে ভিজে ডুবে গেলো। সেই নারী এসবের কিছুই জানতে পারলো না। জানলেও তার কিছু আসবে না যাবেও না কারণ নারীর কাছে কবিতার
কোনো মুল্য নেই। নারীর কাছে যে কিসের
মুল্য আছে কবির কাছে তা অজানাই রয়ে গেলো।

কবি- ভুল
নারী- ভুল
ভুল- নারীকে নিয়ে লেখা কবিতার
প্রতিটি রক্তাক্ত পাতা!