চল্লিশ সেকেন্ড ধরে পৃথিবীর সাথে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। ঠিক বিচ্ছিন্ন বলাও যায় না; মাটিতো আসলে পৃথিবীরই অংশ, মানুষের হাতের মাপা সাড়ে তিনহাত মাটির তলাকে পৃথিবী বিচ্ছিন্ন বলা যায় কি?
মানুষ তো এখন পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে অন্য গ্রহে গিয়েও পৃথিবীর সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে; অথচ সে মাত্র মানুষের হাতের মাপা, সাড়ে তিন হাত মাটির তলায় এসেই পৃথিবীর সব রকম সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত! গড়গড় করে ক্রোধের বুদবুদ উঠানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার সমস্ত ক্রোধ ঠা-ঠা হাসিতে তাকেই বিদ্ধ করে। নিজেকে বড়ই গুরুত্বহীন বলে মনে হয়।
প্রতাপ সিকদার কিছু বোঝার আগেই দু পাশের মাটি ক্রমেই এগিয়ে আসছে, একবার ভাবে হয়ত দেখার ভুল, আবার মনে করে হয়ত পায়ের দিককার মাটিই বুঝি সামনের দিকে আসছে। কিন্তু তার ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত করে মাথা ও ডান-বাম উভয় দিক হতেই মাটি ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে আসছে।
সিকদারের অবাক হবার মত অবস্থা, মাটির সাড়ে তিন হাত নিচে ঘন ও নিকষ কালো অন্ধকারে কিছুই দেখা যাবার কথা নয়। অথচ সে দেখতে পাচ্ছে, এই যে এখন এ দেখতে পাওয়া বড়ই ভয়ংকর ব্যাপার। সে এখন যেই দিকে তাকায় নিজের চোখ থেকে বিচ্ছুরিত প্রজেক্টর মেশিনের মত এক ধরনের ক্ষীণ ও দুর্বল কিছু আলো, সামনে পায়ের কাছে মাটির দেয়ালে গিয়ে পড়ছে, সেখানে বেশ বয়স্ক বড় বড় সাড়াশী ওয়ালা অগণিত বিচ্ছুরা কিলবিল করছে। বাম পাশের দেয়ালে চোখ রাখতে ক্ষীণকায় দু’টুকরো অতি দুর্বল আলো এসে থমকে দাঁড়ায়, সেখানে মাথায় কাস্তে লাগানো এক ধরনের বীভৎস কিট… অন্য সময় হলে শরীর প্রচণ্ড ঝাঁকুনী দেয়ার কথা, কিন্তু তার অসাড় শরীর শুধু অনুভবই করতে পারছে। প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে পারছে না। যার দরুন কষ্টটা আরো বেড়ে যাচ্ছে, বমি করতে পারলে হয়ত ভাল লাগতো, কিন্তু তাও সম্ভব নয়। সম্ভবত এখানে বমি করা নিষিদ্ধ।
প্রতাপ সিকদারের চোখ থেকে বেরিয়ে আসা বিরক্তিকর আলোয় ভীতিকর অন্ধকারের অট্টহাসি। রাত যে অট্টহাসিতে মানুষকে ভয় দেখায়, প্রতাপ সিকদারের তা ছিল ধারণার বাইরে, আর চারদিকে হতে মাটি যে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে তার মানে কি?
রাতের সাথে মাটিও মনে হয় হাসছে। সিকদার অবাক হতে পারে না। অন্ধকার, মাটি, ওদের আজ কিসের এত আনন্দ? মাটি, তাও আবার হাসে?
সিকদারের সাথে হাসাতো দূরের কথা, আনন্দে উদ্বেলিত আশরাফুল মাখলুকাতের সেরা জীব মানুষও কখনোই হাসতে পারেনি, আর সামান্য পায়ের তলার মাটিই কিনা আজ হাসে।
সিকদার কিছুই বুঝতে পারছে না। তার হঠাৎ করে কী হয়ে গেল? কিছু মনে করার চেষ্টা করে। কী যেন একটা ব্যাপার? মাছ মাংস অতিরিক্ত তৈল চর্বি খাওয়ার দরুন নাকি শরীরে অতিরিক্ত তৈল চর্বি জমে গেছে; যেই যন্ত্রটা রক্ত ছুঁড়াছুড়ি করে, সেই হার্টে ও নাকি কী সব সমস্যা। উত্তেজিত হওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ, ডাক্তার ডি এফ রহমানের পরামর্শ মান্য করে চলা হয়নি পুরোপুরি; ঠিক নয় আসলে মান্য করা সম্ভব হয়নি।
রাস্তায় সকালে রিক্সার সাইড দিতে দেরি হওয়ায় শুকনা করে রিক্সাওয়ালার গালে কয়েকটা চড় মেরে ছিলাম। শালা দু-তিন বার ভেঁপু বাজানোর পরও সাইড দিতে দেরি করলো। থাপ্পর বেখাপ্পা লাগায় দাঁতের সাথে লেগে গালের চামড়া কেটে দুরন্ত বেগে রক্ত বের হয়ে গায়ের গেঞ্জি মাখামাখি। রাগটা চড়ে যাবার আরো কারণ, যে জিনিসের বিশ্বাস নেই তার কসম দেয়ায়, অবশ্য রক্ত পুষিয়ে দিতে একটা একশো টাকার নোট মুখের উপর ছুঁড়ে দেয়। মাসাল্লাহ রিক্সাওয়ালা হলেই কি মার খাওয়ার বদলে টাকা গ্রহণ করা বড় ছোটলোকি, টাকাটা জেদের বশে উপেক্ষা করতেই আরো কয়েক ঘা, অবস্থা বেগতিক দেখে বয়স্ক হয়েও অবোধ শিশুর মত টাকাটা তুলে নিয়েছে, তবে চোখের ভাষায় ছিলো অভিসম্পাত। প্রতাপ সিকদার রাগটা মাথায় নিয়েই ঘরে ঢুকে। চোখ কপালে উঠে, চোখ দুটো গর্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে চায়, তারই ঘরে এই কীর্তি?
হাজবেন্ড থাকার পরও মেয়ে তার অন্য পুরুষের সাথে উত্তেজিত হবার এই ব্যাপার কিভাবে উপেক্ষা করা যায়, তা ঐ গর্দভ ডাক্তারকে কে বোঝাবে?
সিকদারের হাত কাঁপে, শরীরে বর্ষার মত ঘামের বৃষ্টি শুরু হয়। ব্রেন ঠিক মত কাজ করছে কিনা কে জানে; বুকের ভিতর তার দ্রুত চলা বুলেটট্রেনের শব্দ শোনা যায়। তার জীবনে সে যে অপরাধ করেনি তা নয়, কিন্তু মেয়ের ব্যাপারটা যে মেনে নিতে পারছে না।
কাঁপা শরীরে পিস্তলটায় গুলি লোড করার আগেই বুকের মধ্যে দ্রুত চলা বুলেট-ট্রেনটা সম্ভবত এ্যাকসিডেন্ট করলো, ব্যথায় লুটিয়ে পড়ে সিকদার, জিহবার নিচে এনজিস্ট টেবলেট নিটরোমিন্ট স্প্রে অক্সিজেন মাস্ক দিয়ে দ্রুত হাসপাতাল। জ্ঞান ফেরার পরই মনে হলো মূল পর্ব শুরু-কষ্টের জলোচ্ছ্বাস।
পায়ের তলা হতে কয়েক টন ওজনের লোহার রোলার রুটি বানানোর মত বেলে বেলে উপরের দিকে উঠে আসছে। অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে এই প্রথম মৃত্যু নামক বস্তুটার কথা মনে হয়। সেই দুর্ঘটনাটা এখনই ঘটে যাবে না তো?
: সিকদার নিজেই প্রলাপ বকে।
না… না… এই সময় মৃত্যু ভাবনা ঠিক নয়।
ডাক্তাররা প্রাণপণ চেষ্টা করছে, আমার মত একজন শিল্পপতিকে তারা মরতেই দিবে না। এখন তো তেমন কোন অসুবিধা নেই, শুধু ঐ লোহার রোলারটা সরাতে পারলেই তো সে বেঁচে যায়। কিন্তু গাধারা করছে কি!
রোলারটা না সরিয়ে কি সব ইনজেকশন বুকের বিভিন্ন জায়গায় এত সব তার-টার দিয়ে কি করছে?
সে চিৎকার করে বলতে চায়। এ সব কি হচ্ছে? সিকদার তার সব ক্রোধকে একত্রিত করে ধমক দিতে চায়। কিন্তু সেই চিৎকারের কোন আওয়াজ বের হয় না। শুধু চোখ জোড়া বিস্ফারিত হয়ে আর্তনাদ করতে থাকে।
সিকদার নিজেকে অসহায় ভাবতে পারে না, কী নেই তার? শুধু এই মুহূর্তে লোড করা অটোমেটিক পিস্তলটা থাকলেই হতো, টাক মাথার ঐ ডাক্তার আর মোটা-সোটা নার্সসহ সবগুলোকে গুলি করে মারা যেত। শালা অন্ধের বাচ্চারা ঐ লোহার রোলারটা চোখে দেখছেনা না কি?
হাড় ভাঙার ঢুসঢাস শব্দ হচ্ছে, সিকদার কোকিয়ে উঠে শব্দহীন। ওহ! সব কিছু চুরমার হয়ে যাচ্ছে অথচ কী আশ্চর্য! চিৎকার করতে পারছে না। মুখে অক্সিজিন মাস্ক পড়া আছে তার জন্য নয়, ঐ যে পায়ের দিক হতে লোহার যে রোলারটা আবারো রুটি বেলার মতো বেলে উপরের দিকে আসছে। ঐ রোলারটা সম্ভবত চিৎকার দেবার কণ্ঠ ধ্বংস করে দিয়েছে, এর মানে কথা বলার ক্ষমতা শেষ? সিকদার নিজেকে বোবা ভেবে কিছুটা ভড়কে যায়, বোবা বিষয়টা না হয় থাকলো, এখন যে জীবনটাই বের হবার উপক্রম…
রোলারটা ময়দা বেলার মত পায়ের তলা হতে উপরের দিকে আসছে, সেই সাথে কাঁচ ভাঙার মত চুরচুর করে মনে হচ্ছে হাড়গুলো ভাঙছে… রোলারটার দুই পাশে যুতসই ধরার হাতলে এত বড় শক্ত সামর্থ হাত কার? আজরাইলের নয় তো? সিকদার নিজেই প্রবোধ গুণে।
না-না- এসব নীচু ক্লাসের ভাবনা করা ঠিক নয়। বিপদে এই ধরনের ভাবনা অবশ্য… বিপদ।
চমকে উঠে সিকদার। কিসের বিপদ তার? তবে কি ডাক্তার, নার্সরা মিলে এই রুমে তাকে হত্যা করার জন্যই এনেছে?
একি! মুখোশ পড়া ঐ নার্সটাকে কাজের মেয়ে শাহিদার মত মনে হচ্ছে না? ওর হাতেই বা কি?
ঐ সিরিজে ঐগুলো ঔষধ নাকি জহর?
ও এমন রাগী চোখে এগুচ্ছে কেন?
মেয়েটা ভাল কাজের ছিল, চা চাওয়ার সাথে সাথেই। জি, খালুজান আনতে আছি। ঝড়ের বেগে ও কাজ করতো। তারপর কী যে একদিন হয়ে গেল, ঐ কমবয়সী মেয়েটাকেই কি না… কবুতরের মত মেয়েটা ছটফট করছিল। চিকিৎসা ছাড়াও ঈদের সময় দুই হাজার টাকা দিয়েছি। মেয়েটা সেই দিন থেকে আর ‘খালুজান ডাকেনা; ওর কাজের গতিও গেল থেমে। মিসেস সিকদারের মার খেয়ে তার গতি আর বাড়েনি। কিন্তু শাহিদা এখানে আসবে কি করে? আ… বুক যে ছিঁড়ে যাচ্ছে, সব বাতাস বন্ধ কেন? লোডসেডিং চলছে? কিন্তু কি শুরু হলো আজ? সিকদারের সাথে এত নিম্ন ব্যবহার করার দুঃসাহস। সিকদার আবারো তার অটো রিভলবারটার কথা মনে করে। ব্রাস করে অন্ধকার, লোড সেডিং, ডাক্তার নার্স সবাইকে হত্যা করবে… কাজের মেয়েটা সামনে এগিয়ে আসছে, হাতে দেড় ইঞ্চি ডায়মিটার চোখা রড না সিরিঞ্জ?
সিরিঞ্জ কি দেড় ইঞ্চি মোটা হয়; মেয়েটা গায়ে হাত রাখার সাথে সাথেই মনে হলো এ শুধু হাত- ই না, অন্য কিছু… ঐতো হাতের আঙুলগুলো ক্রমেই বড় হচ্ছে… মানুষের আঙ্গুল যে এভাবে বড় হতে পারে এই প্রথম দেখতে পাওয়া, নাকি সব ভুল দেখছি? দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায় সিকদার; ভুল দেখলেই ভাল, সত্য যে আমার জন্য বড়ই করুণ। সিকদার চিৎকার করতে পারলে আকাশ ভেঙ্গে চিৎকার করতো। সে যা দেখছে তাতো সত্য… ও… হো-কি ভয়ংকর। আঙুলগুলো সাপের শরীরের মত কি শীতল। আর কিলবিল করছে।
আঙুলগুলো ক্রমেই বড় ও ভারি হয়ে বুকের ওপর চেপে ধরছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে কয়েক-টন ওজনের লোহার রোলারটা ওপরের দিকে উঠে আসছে। সিকদার প্রচণ্ড চিৎকার করে আর ঠিক তখনই পরনের কাপড় নষ্ট হয়ে গেল। অথচ চিৎকারের কোন শব্দ বের হলো না। তারপর থেকেই অবহেলার পাত্র হয়ে গেল প্রতাপশালী সিকদার, তার কোনো প্রতাপই আর ফলছে না, নাষারন্ধ্র দিয়ে মাছি ঢুকছে, বের হচ্ছে। সিকদার দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছে না। এ কি! পা ছড়ানোর জায়গা যে আর নেই। মাটি যে ক্রমেই চেপে আসছে, কী কাণ্ড ভূমিকম্প শুরু হলো না তো? আগের মতো মাটি এখন ধীরে ধীরে চেপে আসছে না, এখন দ্রুত চলা রড বোঝাই সাত টনি ট্রাকের মতো ধেয়ে আসছে; মাটির দেয়ালে দেয়ালে এমন গর্জন হলো যে হাড়গুলো পোড়ানো বাঁশের ফালির মত আওয়াজ করে করে ফেটে যাচ্ছে… অথচ মৃত্যু হচ্ছে না। এই প্রথম সিকদারের মরতে ইচ্ছে করে অথচ তার মৃত্যু যে আরো আগেই হয়ে গেছে সে তাও বুঝতে পারে না, কিন্তু মরে যাবার পর এই অসহ্য যন্ত্রণা অনুভূত হচ্ছে কী করে? তা হলে এই কি গোর আজাব? সর্বনাশ! তা হলে তো সামনে আরো বিপদ, কেয়ামত তাহলে সত্যি সত্যিই হবে? বিচার ফয়সালা হলে যে ফেসে যাবো… আ… খোদা… আর কিছু বলার আগে তুলো ধুনার মত আজাব চলছে, সিকদার মৃত্যু বলে চিৎকার করে, তার ডাকে মৃত্যু সাড়া দিচ্ছে না… সে আরো জোরে মৃত্যুকে আহবান করতে থাকে, তার চিৎকারের ধ্বনি-প্রতিধ্বনিত হয়ে আরেক নতুন যন্ত্রণা সৃষ্টি করে। যার নাম আজাব…