কবি হাসান আলীমের একটা বইয়ের নাম, আশির দশক : জ্যোতিজোস্নার কবিকন্ঠ। বইটিতে তিনি আশির দশকের কয়েকজন কবির সাহিত্যকর্মের সামান্য মূল্যায়ন করেছেন। এই আশির দশকে এসে বাংলা সাহিত্য যে ছোট্ট বাঁকটি নিয়েছিল, সে বাঁকটি এখন আর ছোট নেই, যত দিন যাচ্ছে, সাহিত্যে শুদ্ধস্বর ততই বাড়ছে।
বাংলা সাহিত্য দুর্বোদ্ধতা ও যৌনতা আক্রান্ত হওয়ার ফলে ক্রমেই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। তিরিশ থেকে সত্তর পর্যন্ত এ ধারা বেগবান ছিল। মানুষ কবিতা ও সাহিত্য বিমুখ হয়ে পড়ছিল। কিন্তু সৃজনশীলতা কখনো থেমে থাকে না। কবিরা যখন বুঝতে পারলো কবিতা কেন জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তখন তারা এর উত্তরণের উপায় চিন্তা করতে লাগলো। এর সমাধানের উপায় খুঁজতে গিয়ে একদল তরুণ কবি হঠাৎ করেই যেন হাতে সোনার খনি পেয়ে গেল। তারা বাংলাদেশের সমাজ জীবন বিশ্লেষণ করে দেখলো, এত বিরূপ প্রচারণার পরও বাংলাদেশের মানুষ ধর্মকেই পছন্দ করে। হতে পারে তারা মুসলিম, হতে পারে হিন্দু, হতে পারে বৌদ্ধ বা খৃস্টান। সমাজের মানুষ নাস্তিক হওয়ার চাইতে নিজ নিজ ধর্মের প্রতিই অধিক ভালবাসা পোষণ করে। ফলে যেসব লেখকরা নষ্ট জীবনের প্রতি আসক্ত নবীন লেখকদের ঘৃণা তাদের জড়িয়ে ধরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণ ছাত্র এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মিয়া মুহাম্মদ আইয়ুর, মাসুদ মজুমদার, মাহবুবুর রহমান মোরশেদ, মতিউর রহমান মল্লিক এরা প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে নতুন আশার বানী উচ্চকিত করে বিপরীত উচ্চারণ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। কিন্তু মিয়া মোহাম্মদ আইয়ুব ও মাহবুব মোরশেদ সরকারী আমলা ও মাসুদ মজুমদার সাংবাদিকতায় ঢুকে গেলে মল্লিক অনেকটা নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন।
তিনি ছিলেন অসম্ভব গুণী একজন মানুষ। নিজে গান লিখতেন, সুর দিতেন, গাইতেন। তিনি কবিতা লিখতেন, ছড়া লিখতেন, সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণের চেষ্টা করতেন। তার বাড়ি ছিল বাগেরহাটের বারুইপাড়া গ্রামে। একবার মরহুম মীর কাসেম আলী বাগেরহাট গিয়ে এ রত্নের সন্ধান পান। মানিকে মানিক চেনে। তিনি দেখেই বুঝলেন, এ পাথরের ভেতর বারুদ আছে। সময়মত ঘসা দিলেই জ্বলে উঠবে আগুন। তিনি তাকে ঢাকায় নিয়ে এলেন। বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গন পেল এক বিস্ময়কর অমর প্রতিভা। মূলতঃ মতিউর রহমান মল্লিককে কেন্দ্র করে মীর কাসেম আলী যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তার ফলেই বাংলা সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়। আজকে আমরা বাংলা সাহিত্যে যে ইসলামী ধারা দেখছি, একবাক্যে বলা যায় এর স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন মীর কাসেম আলী ও সিপাহসালার ছিলেন কবি মতিউর রহমান মল্লিক।
এখানে খুব স্পষ্ট করে আমি বলতে চাই, আকাশে সূর্য একটাই থাকে। পৃথিবী আলোকিত হয় এক সূর্যের তাপেই। চাঁদ তারা যেটুকু আলো দেয় তা সূর্যের কাছ থেকে নিয়েই আলো দেয়।
না, আমি চাঁদ তারার আলোকে খাটো করে দেখছি না। প্রেমিক জুটি চাঁদের আলোতেই অভিসারে বেরোয়। চাঁদের আলোর টানেই নদীতে জোয়ারভাটা হয়। জোনাকীর আলোরও একটা গুরুত্ব আছে। সব আলো দিয়ে সব কাজ হয় না। চাঁদের জোসনা কখনো সূর্য দিতে পারে না।
ধ্রুবতারা খুবই ম্রিয়মান একটি তারা। কিন্তু দিক নির্ণয়ে তাকেই আমরা টার্গেট করি। আমাদের কারো কারো মাঝে মুই কি হনুরে একটা ভাব লক্ষ্য করি। সে জন্যই এ কথাটা বললাম।
যে কোন সৃষ্টির বেলাতেই দেখা যায়, কাজটা একজন করে, কিন্তু তাকে সাহস যোগায়, প্রেরণা দেয়, উদ্দীপ্ত করে অন্যরা। মল্লিকভাই নিঃসঙ্গ থাকার মানুষ নন। তার চারপাশে সব সময় ভক্তের ভীড় লেগেই থাকতো। এ সময় কয়েকজন বিরল কাব্য প্রতিভা মল্লিক ভাইয়ের আরাদ্ধ বিপ্লবের সহযোগী হয়। তারাও মল্লিক ভাইয়ের মত বাংলা সাহিত্যের গতি ঘুরিয়ে দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। তারা বয়সে সবাই নবীন। একটা দুটো করে কাঁচা হাতের কবিতা ছাপা হচ্ছে মাত্র। আমরা চিনিনি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যের অমর প্রতিভা কবি আল মাহমুদ সেই নবীন কবিগোষ্ঠীর মাঝেই অযুত সম্ভাবনা লক্ষ্য করলেন। তিনি তার বখতিয়ারের ঘোড়া কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করলেন চার তরুণকে। কবি মতিউর রহমান মল্লিক, আসাদ বিন হাফিজ, সোলায়মান আহসান ও বুলবুল সরওয়ার। এরাই যে নতুন বিপ্লবের অগ্রসৈনিক হবেন কবি আল মাহমুদই তাদের প্রথম শনাক্ত করেন। বইটি বাংলা সাহিত্য পরিষদের প্রথম কবিতার বই। এরই মধ্যে এ কাফেলায় শামিল হন আরো তিনজন। সিলেটের কবি মুকুল চৌধুরী, কবি হাসান আলীম ও যশোর থেকে কবি মোশাররফ হোসেন খান। বাংলা সাহিত্যে এ সপ্তরথীর অবদান পরবর্তীতে ইতিহাস হয়ে যায়।
এ সপ্তরথীর সাথে পরবর্তীতে আরো অনেকেই যুক্ত হলেও এ সাতজন দীর্ঘকাল একসাথে কাব্যান্দোলন করেন। মূলত, এদেরকে বলা যায় আশির দশকের জ্যোতি জোসনার কবিকন্ঠের পাইওনিয়ার। এদের মধ্যে মতিউর রহমান মল্লিক, আসাদ বিন হাফিজ, হাসান আলীম ও মোশাররফ হোসেন খান এ চারজন শপথের কর্মী হিসাবে অনন্য ভূমিকা পালন করেন। বাকী সোলায়মান আহসান, মুকুল চৌধুরী ও বুলবুল সরওয়ার নানা কারণে শপথ নিতে না পারলেও তাদের কমিটমেন্ট ও অবদান কোন অংশে কম ছিল না। বুলবুলের মিশর চলে যাওয়া, মুকুলের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরী তাদের শপথের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
সোলায়মান আহসান উঠে আসেন চাকসুর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বুলবুল ও সোলায়মান দুজনেই সোনার বাংলার সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
হাসান আলীম আশির বিশ্বাসী বলয়ের কবিদের একটি বৃহৎ কাব্য সংকলন করেন আশির কবিতা নামে। যা প্রকাশ করে সাহিত্য সংস্কৃতি কেন্দ্র।

একসময় আমাদেরও মনে হতো কাব্যচর্চা করা একটি বেহুদা কাজ। কিন্তু কোরান হাদিস পড়ে আমাদের এ ভুল ভেঙে যায়।
বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং। আমাদের সম্মানিত আলেমগণ সুরা আশ শোয়ারা পড়েছেন। শোয়ারা মানে কবিগণ। এ সুরার যে আয়াতটি সবচে মশহুর সেখানে বলা হয়েছে, আর কবিদের কথা, তারা বিভ্রান্তির উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায়। আর নিজেরা যা বলে তা করে না। এটুকু পড়েই কবিদের সম্পর্কে আলেমগণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে চলে আসেন, কবিরা পাগল। তারা বিভ্রান্তির উপত্যকা ঘুরে বেড়ায়। তারা যা বলে তা করে না। অতএব, কবিরা পরিত্যাজ্য। কী অবাক কান্ড। আল্লাহর বানীরও ভুল ব্যাখ্যা? তারা কি ইসলামের কথা বলার স্টাইলটাও জানে না?
এতো সেই জিকির, যেখানে বলা হয়, লা ইলাহা, লা ইলাহা। ইলাহ নাই, ইলাহ নাই। এই জিকির করে কি মুসলমান হওয়া যায়? না, যায় না। আপনাকে বলতে হবে ইল্লাল্লাহসহ। তখন অর্থ হবে, আল্লাহ ছাড়া ইলাহ নাই। আল্লাহ এ আয়াতের পরবর্তী অংশে বলেছেন, তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎ কাজ করেছে ও নির্যাতীত হলে প্রতিবাদ করে।
এ বিষয়টি আমার বলার দরকার নেই। এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর সাহাবী কবিরা রাসুলের দরবারে যেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ইয়া রাসুলাল্লাহ, আমাদের কী হবে? আমরাও তো কবিতা লিখি। রাসুল সা বললেন, আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়ো। তোমরা শেষোক্ত দলের।
তার মানে, কেউ যদি আল্লাহর প্রিয়ভাজন কবি হতে চায়, তবে তাকে তিনটি কাজ করতে হবে। এক, ঈমান আনতে হবে। দুই, সৎ কাজ করতে হবে। তিন, নির্যাতীত হলে প্রতিবাদ করতে হবে। ব্যাস, কবির ডিউটি শেষ।
আপনি মুসলমানও হবেন, আবার আল্লাহর হুকুমের ভুল ব্যাখ্যা করবেন, এটা তো হতে পারে না। আল্লাহর হুকুম কোন খেলতামাশার বিষয় নয় যে, এটা নিয়ে আপনি মজা করবেন, অপব্যাখ্যা করবেন, উল্টো ব্যাখ্যা করবেন।
কাউকে যদি আল্লাহ কবিতা লেখার দক্ষতা দিয়ে থাকেন তার দায়িত্ব হচ্ছে সেই নেয়ামতের শোকর আদায় করা। কবিতা লেখা। যেই কবিদের নিয়ে মহান প্রভু সুরা নাজিল করে তাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন সেই কবিদের নিয়ে আপনি তামাশা করার কে?
মুশকিল হচ্ছে, আমরা কোরান পড়ি, কিন্তু বুঝি আমাদের বুদ্ধি অনুসারে। একজন ওয়াজ করছেন, ভাইসব, রাসুল যা করেছেন, যা করতে বলেছেন, যা করার অনুমতি দিয়েছেন সবই সুন্নত। আমাদের নবী ঘোড়ার পিঠে চড়ে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করেছেন, অতএব ঘোড়ার পিঠে চড়ে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করা সুন্নত।
আরেকজন ব্যাখ্যা করছেন, ভাইসব, রাসুলের জামানায় ঘোড়া ও তলোয়ার ছিল যুদ্ধের সেরা অস্ত্র, রাসুল তাই ব্যবহার করেছেন, অতএব রাসুলের সুন্নাত হচ্ছে, আপনিও আপনার জামানার সেরা অস্ত্রটি ব্যবহার করবেন।
ব্যাখ্যা কিন্তু কোনটাই ভুল নয়। আপনি কোন ব্যাখ্যা নেবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার বুদ্ধির ওপর।
কোরান পড়াটা বড় কথা নয়, আপনি কিভাবে বুঝলেন সেটাই বড় কথা।
মনে রাখবেন, অর্ধেক কলেমা পড়ে কাফের হওয়া যায়, মুসলমান নয়। মুসলমান হতে হলে আপনাকে পুরোটাই পড়তে হবে।
আমরা ইসলাম বুঝেছি, উদার মানসিকতা নিয়ে। মনের মধ্যে কোন বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে আমরা ইসলাম বুঝতে যায়নি। কোরানের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পড়েছি অন্তত আট দশটা তাফসীর। বুঝতে চেষ্টা করেছি কোরান কি বলতে চায়। এই কোরআনের কিছু আয়াত নাজিল হয়েছে মুমীনদের লক্ষ্য করে, কিছু রাসুলকে সম্বোধন করে। আপনি খেয়াল করলে দেখবেন, কোরানের বিশাল অংশ নাজিল হয়েছে ইয়া আইউহান্নাস বলে। মানে, হে মানবজাতি বা হে মানুষ বলে। তার মানে কোরআন কেবল মুসলমানের নয়, মানবজাতিরও। যেখানে আল্লাহ নিজে মানবজাতিকে লক্ষ্য করে কিছু বলছেন, সেটা আপনি আপনার ঘরে আটকে রাখার কে? মানুষকে জানতে দিন, আপনার আল্লাহ সবার জন্য কি বলছেন। তিনি হাবিলেরও স্রষ্টা, কাবিলেরও। অতএব তার আইন তো সবার জন্যই। কোরান মানুষের সম্পদ, কেবল মুসলমানের নয়। কোরান কেবল আমার বা আমার পরিবারের জন্য আসেনি। আমার বংশের জন্যও না। এর কল্যাণের ভাগ সবাই পেতে পারে। আপনি কেন অন্যদের বঞ্চিত করবেন?
আরও একটি বিষয় এখানে প্রনিধানযোগ্য।
আমি চাই আমার সন্তান মন্দ কাজ থেকে দূরে থাকুক। আপনি আমার প্রতিবেশী। আপনার সন্তান আমার সন্তানের বন্ধু। আপনার ছেলে মন্দ কাজে জড়িয়ে পড়লে আমার ছেলেও জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। আপনিও নিশ্চয়ই চান আপনার ছেলে ভাল থাকুক। তাহলে সমাজকে ভাল রাখার জন্য আপনার ও আমার একজোট হয়ে কাজ করতে হবে। কবি সাহিত্যিকরা সে স্বপ্নই এঁকে দেবে সবার মনে। আমাদের সন্তানরা হবে তাদের স্বপ্নের সমান বড়।
সাহিত্যে সুবাতাস বইয়ে দেয়ার যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা যুথবদ্ধ হয়েছিলাম সে স্বপ্ন রূপায়নের জন্য আমরা বেছে নেই ইসলামকে। আমরা মনে করি, ইসলাম একটি সার্বজনীন জীবন বিধান। যে বিধানের ছায়ায় সকল মানুষ নিজস্ব স্বাধীনতা নিয়ে বসবাস করতে পারবে। কারণ এ বিধান কোন মানুষের তৈরি নয়। বিশ্বের যিনি স্রষ্টা তিনি সবার প্রয়োজনের দিকে নজর রেখে এ বিধান বানিয়েছেন। ইসলাম বলে, তুমি যদি জানো একটু পরেই এ বিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবে তবু সুযোগ থাকলে একটি বৃক্ষ রোপণ করো।
অর্ধ পৃথিবীর শাসক ওমর রা বলেন, ফোরাতের কুলে একটা কুকুরও যদি না খেয়ে মরে আমি ওমরকে জবাবদিহী করতে হবে। আর মহানবী সা প্রতিবেশী অমুসলিম অসুস্থ মহিলাকে যে সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলেছিলেন এ ঘটনা কে না জানে! তার মানে, অমুসলমানকে ভালবাসা, সেবা করাও রাসুলের সুন্নাত। আমরা সে ইসলামের জাগরণ চাই, যেখানে শুধুই কল্যাণ বাস করে।