আশির দশক। শব্দটা মনে এলেই মনটা কেমন অন্যরকম হয়ে য়ায়। কত বেদনারা গুমরে মরে মনের গহীনে। আনন্দরা হেসে যায় ঝর্ণার কলতানের মত। অর্জনগুলো দেখলে ভাল লাগে এই ভেবে, একদিন এই শুভ প্রয়াসের সাথে আমিও ছিলাম। আবার যা যা স্বপ্ন ছিল, তা বাস্তবায়িত করতে না পারার মনোবেদনাও কম নয়। এরই নাম জীবন। জীবনের সকল চাহিদা পূরণ করে মারা গেছে এমন লোক পাওয়া যেমন কঠিন, তেমনি কোন সাধই পূরণ হয়নি এমন লোক পাওয়াও দুষ্কর।
অধিকাংশ মানুষকেই অতৃপ্তি নিয়ে চলে যেতে হয়, এটাই বাস্তবতা। আশির জ্যোতিজোস্নার কবিকন্ঠ হয়ে যারা একদিন একত্রে হাঁটতে শুরু করেছিলাম, আজ আর সে যুথবদ্ধতা নেই। আমাদের সিপাহসালার কবি মতিউর রহমান মল্লিক প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন ওপারে। আমাদের অনুজপ্রতীম বন্ধু কবি গোলাম মোহাম্মদের মত সরল মানুষটিও আমাদের এক যাতনাময় বিশ্বে রেখে বিদায় নিলেন। যেন না পারার কষ্ট তিনি আর বইতে পারছিলেন না। চলে গেলেন আমাদের মুরুব্বী একেএম নাজির আহমদ। আমাদের গুরু জনাব আবদুল মান্নান তালিবও চলে গেলেন না ফেরার দেশে। মনে কি পড়ে কথাশিল্পী জামেদ আলীর নাম? যিনি হঠাৎ করেই এসে লালশাড়ি ও মেঘলামতির দেশে উপহার দিয়ে আমাদের চমকে দিয়েছিলেন। কয়জনের নাম বলবো? আমরা কি ভুলে গেলাম দরদী প্রিয় মানুষ সিদ্দিক জামালকে? যার দরদী হাতের ছোঁয়া না পেলে অনেক ফুলই হারিয়ে যেতো সংস্কৃতির এ ময়দান থেকে। মনে পড়ে বাংলা সাহিত্য পরিষদের জন্মলগ্নে যে হাসিমাখা মুখটি আমাদের অভয় দিয়ে বলেছিল, যারা কাজ করে ভুল তাদেরই হয়। সব কাজে অনুমতির দরকার নেই, কাজ করে যাও। ভুল হলে আমরাই ডেকে বলে দেবো, কোন পথে হাঁটবে। সেই অভয়বানী শোনার জন্য কোথায় পাবো মোল্লা ভাইকে?
সম্ভবত উনিশশ তিরানব্বই সালের ঘটনা। সাপ্তাহিক বিচিত্রায় ইসলামী সংস্কৃতির উত্থান নিয়ে একটি কভারস্টোরি প্রকাশ পায়। তাতে আশংকা প্রকাশ করা হয়, জনৈক মীর কাসেম আলীর তত্ত্বাবধানে দেশে যে ইসলামী সাংস্কৃতিক তৎপরতা চলছে, তা বড় ভাবনার বিষয়। দিন দিন তাদের তৎপরতা বেড়েই চলেছে। মতিউর রহমান মল্লিক ও আসাদ বিন হাফিজের মাধ্যমে এ কাজ চললেও এর নেপথ্য নায়ক মীর কাসেম আলীগং। একদিন এ চারাগাছ মহীরুহ হয়ে উঠতে পারে। আজ সে মীর কাসেম আলীও নেই, মল্লিকও নেই কিন্তু তাদের চারাগাছ ঠিকই মহীরুহ হয়ে উঠেছে।

ইসলামী সংস্কৃতির এ বিস্তার ছিল সময়ের দাবী। এ দেশের সাধারণ মানুষ নষ্টামীর সয়লাব দেখে আতংকিত হয়ে পড়েছিল। তাই সত্য ও সুন্দরের স্বপ্ন তারা দেখা শুরু করেছিলেন। নষ্টামীর বৃক্ষ এখন ফল দিতে শুরু করেছে। সেই ফল ভোগ করছি আমরা। কিন্তু এটাই পৃথিবীর শেষ ঠিকানা নয়। একদিন বুড়ো বটবৃক্ষ ম্রিয়মান হবে। তরতর করে বেড়ে উঠছে যে বৃক্ষ তাতে নতুন ফল ধরবে। শান্তি ও সুবাতাসে ভরে উঠবে দুনিয়া জাহান।
সময়ের এ কাজ কেউ না কেউ করতোই। এ মীর কাসেম আলী নাই, অন্য মীর কাসেম আলী আসবে। এ মল্লিক নাই, হাল ধরবে অন্য কোন মল্লিক। পৃথিবী তার পথে এগিয়ে যাবেই। সময়ের গতি কেউ রোধ করতে পারে না।
মনে রাখবেন, মানুষ মারা যায়, স্বপ্ন মরে না। স্বপ্ন কাল থেকে কালান্তরে ঘুরে বেড়ায়। সে শুধু অপেক্ষা করে উপযুক্ত সময়ের। সময় হলে কেউ কাউকে আটকে রাখতে পারে না। তিরানব্বই হাজার সৈন্য যেমন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আটকাতে পারেনি। তেমনি কোটি জনতার কান্না দিয়ে আটকানো যায় না গৌরবের শাহাদাত। যা অবধারিত তা ঘটবেই।

আশির জ্যোতিজোস্নার কবিকন্ঠের বড় অর্জন সঠিক সময়ে সময়কে ধারণ করতে পারা। তারা নিজেরা শপথদীপ্ত হতে পেরেছে। নিজের সময়কালের লেখকদের আশান্বিত করতে পেরেছে। প্রবীণদের মনে সাহস বুনতে পেরেছে। আর নবীনদের দিতে পেরেছে অভয়।
তাদের সবচে বড় অর্জন সুন্দরের স্বপ্ন আঁকড়ে ধরতে পারা। আমরা যে খুব বড় কিছু নই, আমরাও জানি, আপনারাও জানেন। কিন্তু আমরা আমাদের চাইতে ভাল যারা লেখেন তাদেরও আপন করতে পেরেছি, আমাদের লেখা দিয়ে প্রতিপক্ষকেও চমৎকৃত করতে পেরেছি, আমাদের পাঠকদেরও আকৃষ্ট করতে পেরেছি। আমরা কবিতা দিয়ে যাত্রা করলেও কবিতার মাঝেই আটকে থাকিনি। আমরা ছড়িয়ে পড়েছি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায়। বুলবুল সরওয়ারের মত ভ্রমণ কাহিনী বাংলা সাহিত্যে কয়টা পাবেন? গোলাম মোহাম্মদের মত হৃদয়কাড়া গান?
এটাও সত্য, আমরা একজন শাহজাহান পেয়েছিলাম। সে জন্যই আমরা তাজমহল বানাতে পেরেছি। তিনি যেমন মতিউর রহমান মল্লিকের মত হীরকখন্ড দিয়ে এ সৌধ নির্মাণ করিয়েছেন, তেমনি সে সৌধের আসবাবগুলো ঝকঝকে তকতকে করার জন্য আবদুল হাই শিকদারের মত কারিগরও জোগাড় করেছিলেন। আমাদের আশার দিক হচ্ছে, আমরা আমাদের সামনে কিছু উজ্জ্বল তারকা দেখতে পাচ্ছি। যদি তারা নিবিষ্ট মনে লেগে থাকেন, তবে তারা আমাদের চাইতেও ভালভাবে এ স্বপ্ন এগিয়ে নিতে পারবেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কতটুকু লেগে থাকতে পারবেন।
বেশী উজ্জ্বল তারকা ধুমকেতুর মতই আসে এবং হারিয়ে যায়। ধ্রুবতারা জ্বলে মিটমিট করে কিন্তু সে থাকে অনড় অটল। তেমনি সাহিত্যেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। বেশী প্রতিভাবানরা প্রতিভার দেমাগে নষ্ট হয়ে যেতে পারে আবার আরো দীপ্তিমান হয়ে উজ্জ্বল আলোও বিকিরণ করতে পারে।
আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে ইশাররফ হোসেনের কথা। কী সপ্রতিভ ছেলে। এখন পড়ে আছে বিদেশে। জানি না, সে আমাদের কি দেবে? বগুড়ার সাজ্জাদ বিপ্লব। তুখোড় ছড়াকার। উচ্চতর স্বপ্ন নিয়ে এখন বিদেশে।
আশির দশকের সূচনাপর্বের কথা। প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য সভা করে যাচ্ছি। আজিমপুর থেকে তিনটি রত্ন আসে। তাদের দেখি আর মুগ্ধ হই। খন্দকার নজরে মওলা, হোসেনুজ্জামান আল আমীন, খন্দকার রাশিদুল হাসান তপন। যদি আমাদের মত কম প্রতিভাধর হতো তবে হয়তো তারা দেশেই পড়ে থাকতো। কিন্তু না, প্রতিভা তাদের বড় পরিসরে নিয়ে গেল। যেমন সুখে আছে নাসির মাহমুদ, শাকিল রিয়াজ এবা।
একজন সৃষ্টিশীল মানুষ দিনের পর দিন ঘুমিয়ে থাকতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু এরকম ঘটনাও ঘটে। জিলিপি সম্পাদক আহমদ মতিউর রহমান, একদার বুদ্ধিজীবী মীযানুল করীম, সিলেটের নারী লেখিকা রোকেয়া খাতুন রুবী, এরকম কতজনই তো দেশে থেকেও ডুব মেরে আছেন। অথচ আশার বাতি জ্বালিয়ে এখনো আমরা তাদের খুঁজি।
এরকম দুঃখ খুঁজলে কত দুঃখ আশেপাশে ঘুরতে দেখি। আশির কাব্যান্দোলনের সবচে বড় ব্যর্থতা নিজেদের লোকচক্ষুর সামনে আনতে না পারা। মায়ের জমানো পয়সায় হাসান আলীর বই বের করার পর প্রায় পঞ্চাশ হয়ে গেল। তারপর সবাই সাধ্যমত বই বের করেছে, কিন্তু কেউ বউয়ের জমানো টাকা হাতিয়ে, কেউ ভাবীর মানিব্যাগ কেটে, নানা ভাবে, নানা ধান্ধায়। যে স্বপ্নের পিছনে আমরা ছুটে চলেছি সেই স্বপ্ন আমরা কখনো জাতিকে দেখাতে পারিনি।
লেখকরা লেখে নানা বিষয়ে। সব লেখাই কি স্বপ্ন পূরণের সহায়ক হয়? ব্যক্তিগত বিষয়াবলী, সামাজিক বিষয় কতকিছুইতো থাকে কবিতায়। পাঁচমিশালী লেখা দিয়ে তিন ফর্মার ২০০ বই ছেপে আমরা কবিত্ব জাহির করি। তারপর সে বই মামারে, খালারে, নেতারে সৌজন্য না দিলে কবি হয়ে যায় কিপ্টা, বেয়াদপ। গত পঞ্চাশ বছরের অর্জন এতটুকুই।
এই আন্দোলনের যারা অগ্রসেনানী তাদেরই যখন এই অবস্থা তখন তাদের ডাকে যারা এগিয়ে এসেছিল তাদের মনে ভীতি দেখা দেয়। যদি জিজ্ঞেস করি, ভাই কতদিন দেখা নেই, কেমন আছেন? তিনি এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখেন কেউ দেখে ফেললো কিনা, তারপর, কানের কাছে মুখ এনে বলেন, ভাই আপনি জানেন, আপনাকে আমি কত ভালবাসি। এভাবে প্রকাশ্যে দেখা হোক এটা চাই না, কারণ আপনাদের সাথে মেলামেশা করলে নানা পত্রিকা আমাকে ব্ল্যাকলিস্ট করে ফেলবে। তখন তারা আর আমাদের লেখা ছাপবে না।
নবীনরা আমাদের স্বপ্নের কথা শুনে খুব আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে আসে। কিছুদিন গেলে আমাদের দুরাবস্থা যখন বুঝতে পারে, তখনি চম্পট দেয়। বলি, পালাও কেনো? তখন ইনিয়ে বিনিয়ে যা বলে তার মর্ম দাঁড়ায় এই, আপনাদের পত্রিকা তো আমাদের চেনে না। আপনারা আছেন আপনাদের স্বপ্ন নিয়ে, তারা আছে তাদের জগত নিয়ে। আপনারা তো সেই যোদ্ধা যারা অস্ত্র বাড়িতে রেখে ময়দানে যায় যুদ্ধ করতে। আপনি যে ময়দানে এলেন, আপনার অস্ত্র কই?
আবদুল মান্নান সৈয়দ ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা বের করে শিখিয়ে দিয়ে গেলেন, স্বপ্ন যদি ছড়াতে চাও, এভাবে স্বপ্নগুলো জমা করে ছড়িয়ে দাও সারাদেশে। মানুষ তখন বুঝতে পারবে, মল্লিকের স্বপ্ন কি, আলীমের স্বপ্ন কি। মানুষ বুঝতে পারবে আশির দশক এ জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে চায়? কিন্তু বিগত পঞ্চাশ বছরে মল্লিক, আসাদ, আলীম, বুলবুল, সোলায়মান, মুকুল বা মোশাররফ হোসেন খান কারো একটা “শ্রেষ্ঠ কবিতার ” সংকলন কি আপনারা দেখেছেন? না, দেখেননি।এটাও আমাদের অর্জন। আপনি যদি চান, এভাবেও আশির দশককে মূল্যায়ন করতে পারেন।
মল্লিক নেই, গোলাম মোহাম্মদ নেই, বুলবুল সরওয়ার থেকেও নেই, সোলায়মান আহসান খালি বড় বড় কথা বলে, মুকুল মফস্বলে, আলীম বেশী সাদাসিধা, আসাদ অসুস্থ। আছে এক মোশাররফ হোসেন খান। সে গেলে আশির ঘরে ধোঁয়া দেয়ারও কেউ থাকবে না।
কে হাল ধরবে তখন? তাদের গড়ে তোলার কোন ব্যবস্থা কি হয়েছে? তাদেরকে মাঠে ছেড়ে দিলে তারা কি গন্ধ শুঁকে শুঁকে নিজের ঘরে ফিরতে পারবে?
না, এতটা নিরাশ হওয়ার সময় এখনো আসেনি। মুমীন কখনো নিরাশ হয় না। বললে এরকম অনেক কথাই বলা যায়। কি দরকার। এটুকু বললাম এ জন্য, যাতে আমাদের ভুল থেকে পরবর্তীরা শিক্ষা নিতে পারে। শুনেছি, মুমীন একই গর্তে বার বার পা দেয় না। ইতিহাসই বলবে আমরা কোথায় যাবো। সিলেটের রাগিব হোসেন চৌধুরীর কথা দিয়ে আজকের পর্ব শেষ করি। তিনি একটি উপন্যাস লিখেছিলেন, মুক্তির ময়দান কখনো নিরব থাকে না। আমরাও বিশ্বাস করি, মুক্তির ময়দান কখনো নিরব থাকে না।
আসুন আমরা প্রার্থনা করি, আল্লাহ, তুমি আমাদের জন্য আরেকজন মীর কাসেম ও মল্লিক পাঠাও।

২৮/৭/২০। ১.০০টা।