যেতে হবে আরো বহু দূর, মানে আমরা অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। কিন্তু আমরা যে যাচ্ছি এটাই কি ঠিকানায় যাওয়ার সঠিক পথ? নাকি ভুল পথে হাঁটছি? কখনো কি পথিকের মনে এমন দ্বিধাদ্বন্দ্ব জাগতে পারে না? যদি আপনি মনে করেন, পারে, তবে পথিকের চলার গতি সামান্য হলেও শ্লথ হয়। চলার পথে প্রতি পদক্ষেপে এমন সতর্ক থাকাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।
কথাটা এ জন্য বললাম, আপনিও জানেন মানুষমাত্রই পাপী। নবী রাসুল ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না, আমি পাপী না। আমি জানি, আমিও পাপী, আপনিও পাপী। কিন্তু সেই পাপের কথা আমরা জনে জনে বলে বেড়াই না। ইসলামের নির্দেশও তাই। রাসুল সা. আমাদের জানিয়েছেন, আপনি যদি কারো দোষ গোপন করেন তবে আল্লাহও আপনার দোষ গোপন করবেন।
আবার পবিত্র কোরআনে আল্লাহ নিজেই সত্য গোপন করতে নিষেধ করেছেন। এর ফলে অনেক কম বুদ্ধিমান মানুষই দ্বিধায় পড়ে যান। কারো গীবত করাকে আল্লাহ প্রচন্ড অপছন্দ করেন। তিনি এটাকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। এখন আপনি কি করবেন? আপনি কি সত্য গোপন করবেন, নাকি সব বলে বেড়াবেন?
আসলে আমি এতই কম বুদ্ধির মানুষ, এরকম সমস্যায় পড়লে আমি হতবুদ্ধি হয়ে পড়ি। চালাক মানুষরা এমন সুযোগ কাজে লাগিয়ে তরতর করে এগিয়ে যায়, আর ভাবে কী অর্জনটাই না সে করলো?
এ রোগ মানুষের আদি রোগ। ইসলাম অনুসারীদের মধ্যেও এ ধরণের চালাক লোকের কখনো অভাব হয়নি। এটা ইসলামের প্রাথমিক জামানায়ও ছিল, আজো আছে। এর মধ্য দিয়েই আমাদেরকে হেঁটে যেতে হয়।
এ ক্ষেত্রে পর্যায়ক্রমে সাধ্যমত সংশোধনের প্রচেষ্টা চালানো দরকার। কোন সামষ্ঠিক বিষয়, যা প্রকাশ করলে সমাজের কোন কল্যাণ হতে পারে, তা প্রকাশ করে দেয়াই সঙ্গত। অবশ্য এ কথাটা বুঝতে আমার বহুদিন সময় লেগেছে।
আশির দশকের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি নিয়ে কথা বলছিলাম। জ্যোতিজোস্নার কবিকন্ঠ হয়ে কাজ করতে গিয়ে তিন ধরনের লেখকের সাক্ষাৎ পেয়েছি। আপনার এর যে কোনটি বেছে নেয়ার স্বাধীনতা আছে, কারণ এ স্বাধীনতা আপনি আপনার প্রভুর কাছ থেকে পেয়েছেন। মহান আল্লাহ এর কোনটা ভাল সেটা বুঝার জন্য আপনাকে বিবেক দিয়েছেন।
এ তিন দলের একদল হচ্ছে তারা, যারা মন্দ কথা বলতে আনন্দ পায়। তারা মন্দ কথা বলে এবং নিজেও মন্দ কাজে নিজেকে জড়িয়ে রাখে।
আরেকদল হচ্ছে তারা, যারা মনে করে পৃথিবীর সব মানুষের ভাল হয়ে যাওয়া উচিত। তাতে সমাজে শান্তি ফিরে আসবে। শুধু আমার জন্য মন্দের রাস্তাটা খোলা থাক। আমার মত দুয়েকজন মন্দের মাঝে ডুবে থাকলে সমাজের তেমন ক্ষতি হবে না।
আরেকদল মনে করে, লেখকরা হচ্ছে সমাজে ফুলের বাগান। তারা তাদের রূপলাবন্য ও সুবাস দিয়ে যদি পৃথিবীকে আনন্দময় করে তুলতে না পারে তবে লেখক হয়ে লাভটা কি?
আলহামদুলিল্লাহ। সমাজে যে নৈতিকতাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ আছে তাতে শেষোক্ত দলের লেখকই সমাজে বেশী। এখনো শিক্ষক ও লেখকদের মধ্যে সামাজিক কল্যাণ চিন্তাই বেশী।
এবার আমাদের কথা বলি। আমরা যারা আদিতে এ আন্দোলনে শরীক হয়েছিলাম, আমাদের সবার মেধা, যোগ্যতা, প্রতিভা, মনন ও বোধের মাত্রা সমান নয়। আমি এ আন্দোলনকে ততটাই বুঝেছি, যতটুকু বোঝার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। যার প্রতিভা ও বোধশক্তি আমার চাইতে বেশী তিনি হয়তো অন্যভাবে বুঝেছেন। যার ডেলিভারী পাওয়ার বেশী তিনি সমাজ ও আন্দোলনকে বেশী দিয়েছেন।
কিন্তু এ ব্যাপারে সবাই একমত হবেন, আমরা কেউ নিজের সাথে প্রতারণা করিনি। কেউ আমাদের তুলে ধরবে এ আশায় কেউ বসে থাকিনি। রাগ বা অভিমান করে স্বপ্ন ভুলে গালে হাত দিয়ে বসে থাকিনি। কে কতটা কি দিল সে দিকে তাকিয়ে থাকিনি। আমরা আমাদের যোগ্যতা অনুযায়ী, সামর্থ্য অনুযায়ী সর্বোত্তমটা দেয়ার চেষ্টা করেছি, এখনো নিরন্তর করে যাচ্ছি।
চলার পথে আমরা কত জনের সহায়তা পেয়েছি তার ইয়ত্তা নেই। আমরা কবি গোলাম মোস্তফার পরিবারের সহায়তা পেয়েছি, কবি তালিম হোসেনের পরিবারের সহায়তা পেয়েছি। সৈয়দ আলী আহসান, ড. আশরাফ সিদ্দিকী, মোহাম্মদ মাফফুজউল্লাহ, কবি আবদুস সাত্তার, জাহাঙ্গীর ফিরোজ, শাহীন রেজা, এরকম কতজন কতভাবে সহায়তা করেছেন। ইনকিলাবের মাওলানা রুহুল আমীন, মসউদ উশ শহীদ, খালেক বিন জয়েনউদ্দিন এভাবে অনেকের নামই বলা যায়। আসলে গণসমর্থন ছাড়া কোন বিপ্লবই সফল হয় না। আমরা লেখক, পাঠক, বুদ্ধিজীবী সবারই সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েছি। জয়নুল আবেদীন আজাদ, মাহবুবুল হক, অধ্যাপক মতিউর রহমান, বাংলা একাডেমীর সিরাজউদ্দিন এরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমাদের সাথে কাজ করেছেন। কবি আবদুল হাই শিকদার, রেজাউদ্দিন স্টালিন এবং তাদের বন্ধুরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে আমাদের ধন্য করেছেন। কিশওয়ার ইবনে দিলাওয়ার, নূরুল আলম রইসী, নয়ন আহমদ, শেলী নাজ, জোবায়দা গুলশান আরা, আল মুজাহিদী, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মুকীত চৌধুরী, নামের কি আর শেষ আছে?
আমাদের সবারই স্বপ্ন এবং প্রত্যাশা ছিল, আমরা সাহিত্যে সুবাতাস বইয়ে দেবো। আমরা সমাজের জন্য ক্ষতিকর, অন্যায় ও মন্দকে প্রমোট করবো না। ভালোর স্বপক্ষে হবে আমাদের অবস্থান
আগেই বলেছি, এ স্বপ্নটা উদ্বোধন করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল ছাত্র। তাদের গড়া বিপরীত উচ্চারণ ছিল এ স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। তারা অল্পসময়ের মধ্যে এটিকে জাতির মধ্যে রোপন করে দিয়ে বিদায় নেয়।
হয়তো তারা এখন গায়, “কফি হাউজের সে আড্ডাটা আজ আর নেই। ” ছাত্রদের এ সাফল্য দেখে এটাকে বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে যাওয়ার জন্য গঠিত হয় বাংলা সাহিত্য পরিষদ। এটা ছিল এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। বছর বছর ছাত্রদের ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যায়। এ ধরনের একটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও অবকাঠামো সমৃদ্ধ আয়োজন দরকার। কেন্দ্রের তত্ত্বাবধানে বাংলা সাহিত্য পরিষদ সেই সুদূরপ্রসারী স্বপ্নের ফসল। প্রবীণের চিন্তা ও নবীনের উদ্যম কাজে লাগিয়ে শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির ময়দানে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানোর স্বপ্নবোনার নেপথ্য কারিগরদের এই শুভ উদ্যোগ আল্লাহ কবুল করুন।

২৯/৭/২০