বিপরীত উচ্চারণ থেকে কি করে বাংলা সাহিত্য পরিষদ এলো, কেন এলো, এটা নিশ্চয় আঁচ করতে পেরেছেন আমার আগের লেখায়। এটা ছিল সময়ের দাবী। আর এই বাংলা সাহিত্য পরিষদ আমাদের মনে যে আশার আলো জ্বালায় তাতে আলোকিত হয়েছিল আমাদের হৃদয়, সাহসে উচ্চকিত হয়েছিল নবীন কাফেলা।
সাহিত্যে সুবাতাস বইয়ে দেয়ার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়েছিল তরুণ লেখক সমাজ। আরবে যেমন আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগের অমানিশা দেখে ইসলামে এসে আশ্রয় নিয়েছিল পাপবিদগ্ধ সমাজ তেমনি মন্দের ভয়াবহতা আঁচ করে শুভ ও কল্যাণের প্রত্যাশায় আমাদের সমাজও ছিল উন্মুখ। ফলে আশির জ্যোতিজোস্নার কবিরা অনুকূল জোয়ারেই নৌকা ভাসিয়েছিল। আর সে জন্যই তাদের আশা ও স্বপ্ন ছিল আকাশ সমান। বাংলা সাহিত্য পরিষদ ছিল তাদের সে স্বপ্নের আলোঘর।
আল মাহমুদের বখতিয়ারের ঘোড়া বাংলা সাহিত্যের প্রচলিত ধারার কোন কাব্য ছিল না। এর বানী, সুর, বলার ধরণ সবটাই ছিল প্রচলিত ধারার সম্পূর্ণ বিপরীত। আমরা এতদিন কবিতায় শুনেছি, ইসলামকে কিভাবে গালি দিতে হয়, এবার শোনলাম মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার উদাত্ত আহবান। কবিতায় কিকরে সত্য ও সুন্দরের আহবান জানাতে হয়, তা আমাদের শিখিয়ে দিলেন বাংলা কাব্যের মুহাম্মদ বিন কাসিম কবি আল মাহমুদ। সপ্তরথীর সাথে লাব্বাইক বলে শামিল হলেন গোলাম মোহাম্মদ, শরীফ আবদুল গোফরান, নাসির হেলাল প্রমুখ। এরাই হলেন তার বখতিয়ারের ঘোড়া। বাংলা সাহিত্যে জ্বলে উঠলো নতুন আলোর মশাল।
এরপর কোরান ও হাদীস মন্থন করে আবদুল মান্নান তালিব ইসলামী সাহিত্য মূল্যবোধ ও উপাদান গ্রন্থে বললেন, যা অনৈলামিক নয় তাই ইসলামিক। যা হারাম নয় তাই হালাল। আমরা জেনে গেলাম ইসলামী সাহিত্যের পরিধি। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি আমরা যা করি সবই হালাল, শুধু আল্লাহ যা করতে নিষেধ করেছেন সেটুকু হারাম। কি উদার ও ব্যাপক দৃষ্টিভঙ্গি। প্রেম করবেন, করেন। প্রেম করার জন্যই তো আল্লাহ মা হাওয়াকে বানিয়ে ছিলেন বাবা আদমের জন্য। আপনার ভাষা ব্যবহার ও বর্ণনাভঙ্গি কেমন হবে তা জেনে নেন কোরআন থেকে। পড়ুন সুরা ইউসুফ।
এভাবেই আমরা পৃথিবী সমান বড় কর্মক্ষেত্র পেলাম সাহিত্য চর্চার জন্য। এলেন কথাশিল্পী জামেদ আলী। আমাদের হাতে তুলে দিলেন লাল শাড়ি। বললেন, এই হচ্ছে তার নমুনা। তুমি চাইলে এই লাল শাড়িকেও নিশান বানাতে পারো। এরপর আমরা বের করলাম আল্লাহর পথের সৈনিক। মিশরের নাজিব কিলানী অসামান্য উপন্যাসের অনুবাদ।
এভাবেই আমরা আমাদের স্বপ্নের স্বপক্ষে সাহিত্যের উদাহরণ তুলে ধরলাম জাতির সামনে। জাতি বিস্মিত, অভিভুত। আমরা আনন্দিত। আমাদের পাঠক ও পৃষ্ঠপোষকরা উল্লসিত।
তার পরের কথা বলার আগে বুদ্ধিমান জামাইয়ের গল্পটা বলে নেই। জামাই অনেক বড়লোক। আলীশান বাড়ি। প্রচুর চাকর বাকর। বিয়ে করেছে গ্রামের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। জামাই শুধু বড়লোক না, পন্ডিত মানুষও। রাতে খাওয়া দাওয়ার পর তিনি গেলেন শুইতে। জামাইকে শোয়ার ঘরে দিয়ে বউ নিজে খেতে গেল। এটাই দেশের নিয়ম। আগে পুরুষরা খায়, পরে মেয়েরা।
বউ খাওয়া দাওয়া করে একটু সেজেগুঁজে শুতে গেল। গিয়ে দেখে জামাই বাবু তখনো বিছনায় যাননি। একটা চেয়ারে বসে বসে ঝিমুচ্ছেন। বউ বললো, একি, তুমি এখনো শোয়নি? বসে বসে ঝিমুচ্ছ কেন? জামাই মিয়া বললো, শুই কেমন করে। দেখ না খাটের চারদিক ঘেরাও দেয়া, ঢুকবো কোথা দিয়ে? বউতো হেসেই খুন। বললো, চলো আমার সাথে ঢুকবে। বউ গিয়ে মশারি তুলে ফাঁক করে আগে নিজে ঢুকে এরপর বললো, এসো, এবার ঢুকো।
এবার জামাইও হেসে দিল। বললো, এত সোজা? বউ বললো, তুমি মশারি চেনো না? এটা না টানালে তো মশা খেয়ে ফেলবে তোমাকে। জামাই বললো, ও, তাই বুঝি। আমরা তো মশার উপদ্রব থেকে বাঁচতে ঘরে এরোসল দেই।
বেশী বুদ্ধিমানদের এরকম হয়। রবি ঠাকুরের জুতা আবিষ্কারের কথা মনে নেই? দেশের তাবৎ বুদ্ধিজীবীরা যা পারেনি সেই সমস্যার সমাধান করে দিল সামান্য এক মুচি।
সাধারণ মানুষ বোঝে, পাহাড়ধ্বস শুরু হলে সেই পাথর আটকাতে যেতে হয় না। তাতে নিজেরই চিড়েচেপ্টা হতে হয়। যখন প্রবল বন্যা শুরু হয়ে যায় তখন সেই পানি বুক দিয়ে আটকাতে হয় না। তাতে নিজেরই ভেসে যেতে হয়। গণজোয়ার শুরু হলে সেখানে বাঁধা দিতে হয় না। দিলে তাকে ইরানের রেজা শাহ পাহলভীর ভাগ্য বরণ করতে হয়। বুদ্ধিমান ও সাধারণ মানুষ এ জন্যই আলাদা।
আশির দশক নিয়ে আমরা যাত্রা করেছি। এগিয়ে যাচ্ছি সাঁই সাঁই করে। আমাদের অগ্রগতি দেখে সবাই খুশী। এসময় কোত্থেকে একদল বুদ্ধিজীবী এগিয়ে এলো। তারা মুরুব্বিদের বুঝালো, করছেন কি? দেখছেন না এদের পপুলারিটি দিন দিন কেমন বাড়ছে। এ তো বাঁশের চেয়ে কঞ্চি বড় হবার দশা। আপনারা করেন রাজনীতি। ওরা আপনাদের দয়ার ভিখিরি। আটকান এদের। এরপর কি করে আশির এ অগ্রযাত্রা রোধ করা যায় সে বুদ্ধি বাতলে দিল।
আমরা এসব বুদ্ধির কিছুই জানলামও না, বুঝলাম না। বুদ্ধিমানরা বুদ্ধি দিল, আগে বড় হও, ধনী হও। টাকা ছাড়া ভর্তুকি দিয়ে এ হাতি কয়দিন পালা যাবে? আমাদের কোন কোন মুরুব্বি মনে করতো, সাহিত্য ও সংগীত চর্চা, এসব ফালতু কাজ। তারাও এই মত সমর্থন করলো। আমরা বড় বড় ভাষণ শোনলাম, সাহিত্য সংস্কৃতি সমাজ বিপ্লবের হাতিয়ার। কোন জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার সংস্কৃতি ধ্বংস করে দাও। তাহলে যুদ্ধ ছাড়াই তোমরা জিতে যাবে। তাই এ অঙ্গনকে কোনভাবেই হেলা করা যাবে না।
সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের এ কাজকে আরো জোরালো করতে হবে। কিন্তু একটা জনসভা করতে যে পরিমাণ খরচ হয়, একটা পত্রিকা চালাতে যে পরিমাণ খরচ হয়, সাহিত্য সংস্কৃতি দুটো বিভাগকে সারাবছর চালানোর জন্যও সে পরিমান বাজেট বরাদ্দ হয় না। এ ব্যর্থতা আমাদের। এটা স্বীকার করতে এখন আর কোন লজ্জা নেই।
জানি, সফলতা ব্যর্থতা দুটোই আমাদের আছে। কাজ করতে গেলে ভুল মানুষের হবেই। মুমীন যখন বুঝতে পারে তার ভুল হয়েছে তখনি সে তওবা করে ভুল থেকে ফিরে আসে। আর যে তা স্বীকার করে না, সে হয়ে যায় শয়তান। মানুষ ও শয়তানের মধ্যে এটাই পার্থক্য। কিন্তু আমরা ভুল বুঝতে বুঝতে পঞ্চাশ বছর পার করে ফেলেছি। ফলে, তওবা করারও মওকা পাইনি, ভুলের থেকে বের হওয়াও হয়ে উঠেনি।
মনে পড়লো ইমাম সাহেবের নসীহতের কথা। তিনি বলছিলেন, শয়তান যখন বুঝে এ ব্যক্তিকে আর পাপের পথে নেয়া যাবে না, সে পূণ্য কাজ করবেই, তখন শয়তান তাকে পাপের পথে আর ডাকে না। বলে, আহ, কয়দিনই বা হায়াত, পূণ্য বাড়াও। তাফসীর পড়া বাদ দিয়ে তেলাওয়াত করো। প্রতি হরফে দশ নেকী। বেহেশতে যেতে চাইলে এই দোয়াগুলো আমল করো। তোমার বেহেশতে যাওয়া একেবারে নিশ্চিত। আপনি তখন মসজিদে বসে দোয়া দরুদে ডুবে যাবেন আর আপনার ছেলে সেই সুযোগে অন্য মেয়ের সাথে প্রেম করবে।
আসলে আমাদের এবাদতের কনসেপশন বদলাতে হবে। এবাদত হচ্ছে দায়িত্ব পালন। মসজিদে মসজিদে চিল্লা দেয়ার নাম এবাদত না। নামাজের সময় নামাজ পড়বেন, স্ত্রী সহবাসের সময় সহবাস করবেন, এটার নাম এবাদত। আপনি ততটুকু দায়িত্বই নেবেন, যতটুকু আপনি পালন করতে পারবেন। আপনি যখন ছিলেন না তখনও দুনিয়া চলেছে, আপনি যখন থাকবেন না তখনো দুনিয়া চলবে। পৃথিবীর সব কাজের দায়িত্ব আপনাকে দেয়া হয়নি। আপনার ওপর জুলুম করার দায়িত্বও আপনাকে দেয়া হয়নি। তাহলে দশটি কোম্পানীর চেয়ারম্যান আপনাকেই হতে হবে কেন? এসব ভাবার বিষয়। আপনি জানেন, আল্লাহ মজলুমের পক্ষে, জালিমের বিপক্ষে। তাহলে আপনি কোন সাহসে অধীনস্তদের ওপর জুলুম করেন? আপনি যতবড় নেতা, পীর বা আলেম হোন না কেন, আল্লাহর ইনসাফের রশি আপনাকে পাকড়াও করবেই।
আমাদের প্রথম ভুল ছিল, নেতার অন্ধ আনুগত্য। ওমর রা. লম্বা জোব্বা বানানোর কাপড় কোথায় পেল, এই প্রশ্ন করা আপনার শুধু অধিকার নয়, দায়িত্বও। যদি আপনার নজরদারীর দায়িত্ব আপনি ঠিকভাবে পালন না করেন, তবে সমাজে যে পাপ অনুষ্ঠিত হবে তার দায়ভাগ আপনাকেও নিতে হবে। কারণ আপনার গাফলতির সুযোগেই এ পাপ সংগঠিত হয়েছে। আপনার কর্মচারী চুরি করলে সে দায়িত্বও আপনাকেই নিতে হবে। কারণ চুরি রোধের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আপনি নেন নি।
বেশী কথা বলে ফেলছি। কিন্তু জীবন এমনই। জীবনকে সহজ করুন, জীবন হবে আনন্দময়। কঠিন করুন, কষ্টের পর কষ্ট আপনাকে জড়িয়ে ধরবে। আপনার গাড়ি নেই, মানে আপনার গাড়ি হারাবার ভয়ও নেই। অঢেল সম্পদ নেই, দারোয়ান রাখার ঝক্কি ঝামেলাও নেই। যতই আপনার সম্পদ কম, ততোই কষ্টও কম। যে মানুষ বেহুদা কষ্ট করে সম্পদ বাড়ায়, সে পয়সা দিয়ে দুশ্চিন্তা কেনে। সাথে কেনে কষ্ট ও বেদনা।
আপনি এসব জানেন। তবু সম্পদের পেছনে দিনরাত ছুটে বেড়ান। এ অসুখের নাম আধুনিকতা। এই আধুনিকতা করতে গিয়ে আপনি আপনার সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। ক্লান্ত শরীরে স্ত্রীসঙ্গও ভাল লাগে না। এত লোভ কেন? কাফনের তো কোন পকেট থাকে না। একদিন চোখ বন্ধ হয়ে যাবে, আর আপনিও রওনা দেবেন আপনার প্রভুর কাছে, সারা জীবনের কাজের হিসাব দিতে।
এরই নাম জীবনচক্র। ইমলাম চায় আপনার জীবন সহজ করতে, আর আপনি চান কঠিন করতে। ইসলাম বলে, পড়শিকে অভুক্ত রেখে যে পেট পুরে খায় সে আমার উম্মত না। আপনি জানেন না, আপনার পাশের ফ্লাটে যিনি থাকেন তিনি হিন্দু না মুসলমান। এইতো আপনার ইসলাম।
বলছিলাম আমাদের অপারগতার কথা। আমরা ইসলামের নামে এখন যে ভন্ডামী করছি, তা মোটেও ইসলাম নয়। অথচ আমরা বুঝতেই পারছি না, আমরা ভুল করছি।
রাস্তাটা পূর্ব পশ্চিমে। আপনি যাচ্ছেন সোজা পূব দিকে। ভাবছেন, বাম দিকে এক ইঞ্চি এঙ্গেল করে দিলে এমন কি আর ক্ষতি। আপনি গাড়ির চাকা এঙ্গেল করে দিলেন। কয়েক মিনিট পরে দেখবেন, রাস্তার জায়গায় রাস্তা আছে, আপনার গাড়ি পড়ে আছে রাস্তার পাশে, খাদে।
কত যে ভুল করেছি, সে জানে কেবল আল্লাহ। আমরা ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশের লক্ষ্যে পরিষদের পক্ষ থেকে কী ধরনের নমুনা নিয়ে প্রকাশনা শুরু করেছিলাম আপনাদের মনে আছে। আমাদের নিয়ত ভুল ছিল না, কাজও ভুল ছিল না। ভুল ছিল চিন্তা। আমরা অচিরেই আমাদের টার্গেট থেকে সরে এলাম। পরিচ্ছন্ন ইসলামী সাহিত্যের বদলে আমরা ডিটেকটিভ বই ছাপায় ব্যস্ত হয়ে গেলাম। যারা আমাদের মনে এ সুন্দর স্বপ্ন বুনে দিয়েছিলেন তারা আমাদের ওপর যে আস্থা রেখেছিল সে আস্থার জায়গাটা যে আমরা নষ্ট করে ফেলেছি তাও আমরা বুঝিনি। যেটা একটা পকেট কাজ ছিল, তাকেই আমরা মূল কাজ বলে ধরে নিলাম। আমাদের পুঁজির সিংহভাগ চলে গেল এ খাতে। ফলে আশির স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হলো। আমাদের স্বপ্ন ও শপথ থেকে যে আমরা সরে এসেছি, এটা বুঝে উঠার আগেই তেমন একটি ঘটনা ঘটে গেল। ফলে সৃজনশীল ও ক্লাসিক লেখা প্রকাশ এক প্রকার থেমেই গেল। এভাবে যারা আমাদের মনে ও মননে নতুন স্বপ্ন বুনেছিল, তারাই যে আমাদের স্বপ্নকে বালিশ চাপা দিল, এটা কি তারা বুঝতে পেরেছেন?

৩০/৭/২০