বাংলাবাজারে এক ধরণের প্রকাশক আছেন যারা আসলে প্রকাশকও না, প্রেস মালিকও না। প্রকাশনা ব্যবসা আসলে রাজকীয় ব্যবসা। এর জন্য প্রচুর বিনিয়োগ দরকার হয়। এসব প্রকাশকদের প্রেস করার সামর্থ্যও নাই, প্রকাশনা করার সামর্থ্য নাই। তারা এক ধরনের দালাল। লেখকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তারা লেখকের বই করে দেয়, মাঝখান থেকে কিছু কমিশন পায়।
প্রকৃতপক্ষে কোন জেনুইন প্রকাশক এটা করে না।
টাকার অভাবে বাংলা সাহিত্য পরিষদ একসময় কমিশন ব্যবসায় নেমে যায়। এতে করে আমরা আমাদের কমিটমেন্ট থেকে আরেক ধাপ সরে আসি। লাভ হয় কম্পোজের পযসা আমরা পাই, প্রুফ দেখার পয়সাও আমরা পাই, আর ছাপানোর লাভের কমিশন। আমরা তখন স্বপ্নবাজ থেকে পুঁজি প্রেমিক হয়ে উঠি। যারা বই ছাপতে আসে তারা আমাদের স্বপ্নের খবর জানে না। তারা পুঁজির বিনিময়ে বই চায়। আমরা তাদের স্বপ্ন পূরণ করি। এভাবেই আমরা একসময় হয়ে যাই পুঁজিদাস। পুঁজির বিনিময়ে আমরা আমাদের শ্রম ও স্বপ্ন বিক্রি করি। এখন আর বই ছাপতে আমাদের পুঁজি বিনিয়োগ করতে হয় না। কৈয়ের তেলে কৈ ভাজি। পুঁজিবাদের হাত থেকে জাতিকে রক্ষা করতে গিয়ে আমরা নিজেরাই হয়ে গেলাম পুঁজির দালাল।
এর ফলে যা হলো, আমরা যারা পরিষদের সদস্য আমাদের বই বের করার আর সুযোগ রইলো না। আমরা বুঝে গেলাম, বই বের করতে গেলে টাকা লাগবে। সে টাকা জোগাড় করতে হবে নিজেকেই। আমাদের যারা যতটুকু পারলো নিজের টাকায় বই বের করলো, বাসাপ দয়াপরবশ হয়ে প্রকাশকের জায়গায় পরিষদের নাম লেখার অনুমতি দিল। আর আমার মত যারা টাকা জোগাড় করতে পারেনি, তাদের কোন বই পরিষদ থেকে অদ্যাবধি বের হয়নি। এভাবেই কেটে গেল প্রায় পঞ্চাশ বছর।
দোষটা আমারই। আমিও কখনো মুখ ফুটে আমার বই করার কথা বলতে পারি নাই, আর আমি যে লেখক এটাও কেউ বুঝতে পারে নাই। এতে অবশ্য আমার কোন দুঃখ নাই। কারণ আল্লাহর ফয়সালা ছাড়া কিছুই ঘটে না।
শাহাদাত বুলবুল, মহিউদ্দিন আকবর, নাসীমুল বারী, সোহরাব আসাদ, নয়ন আসরার, সালেহ মাহমুদ, রফিক মোহম্মদ লিটন, শাহীন হাসনাত, নুরুর রহমান বাচ্চু, নুরুজ্জামান ফিরোজ, শিকদার মোহাম্মদ কিব্রিয়াহ, মানসুর মুজাম্মিল এরকম কত লেখকের সাথে যে আমাদের সখ্যতা গড়ে উঠেছিল তার ইয়ত্তা নেই। নাজিব ওয়াদুদের গদ্য, সরদার আবদুর রহমানের পবেষণা, আতা সরকারের কথা সাহিত্য কোথায় আমরা যাইনি। এদের মাধ্যমে সারাদেশের লেখক ও নবীন লেখকদের সাথে আমরা নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলাম। এসব এখন স্বপ্ন। আমাদের সৌভাগ্য, সুন্দরকে সবাই ভালবাসে। তাই ব্যক্তিগতভাবে অনেকেই আজো আমাদের স্বপ্ন তাদের নিজের স্বপ্ন বানিয়ে নিয়েছে। সাহিত্যে সুবাতাস বইয়ে দেয়ার এ স্বপ্ন অনেকেই পোষণ করে বলেই এখনো আমরা নিঃসঙ্গ নই।
সাম্প্রতিক সময়ে আরো একটি শুভ দিক আমাদের স্বপ্নের সাথে যুক্ত হয়েছে অথবা বলা যায় তাদের স্বপ্নের সাথে আমরা একাত্ম হয়েছি। এটি ঘটেছে ফেবুর কল্যাণে। অনেক বোন বেশ ভাল লিখছেন। একসময় হাজেরা নজরুল, চেমন আরা, জুবাইদা গুলশান আরা, রাজিয়া মজিদ, মাফরুহা চৌধুরী, ঝর্ণাদাশ পুরকাযস্থ, সোফিয়া হুসনে জাহান, ফরিদা মজিদ, কবি লিলি হক, সাবিনা মল্লিক, শামীমা চৌধুরী এদের সাথে আমাদের বেশ যোগাযোগ ছিল। কিন্তু এরপর বোনদের সাথে আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এখন অবশ্য ফেবুর কল্যাণে কারা জাতিকে শুদ্ধতার পথে নিয়ে যেতে চায় আমরা সেটা দেখতে পাচ্ছি। সেই সাথে অনেক প্রতিভাবান ভাইদের লেখাও আমাদের আনন্দ দিচ্ছে। অনলাইন সাহিত্য সংগঠনগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে। একদিন আমরা থাকবো না। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সুন্দরের পথে এ অভিযাত্রা অব্যাহত থাকবে। সবার সম্মিলিত চেষ্টায় আমাদের সন্তানরা থাকবে এক আনন্দময় বিশ্বে।

৩০/৭/২০