আমার অযোগ্যতা, অপারগতার কোন সীমা নেই। কি কি আমি পারিনা, কি কি করার সাহসও করি নাই এবং কি কি করতে গিয়েও পারি নাই সে ফিরিস্তি লিখলে তিনশ বছরেও শেষ হবে না। কিন্তু এতদিন কেউ বাঁচে না, তাই আমারও সম্ভাবনা নেই, সে জন্য রক্ষা। আপনাদের সে সব শুনতে হবে না।
তবে আমি যা করতে পেরেছি তা শুধুমাত্র আল্লাহর রহমতের জন্যই হয়েছে। আমি তো ছার, কোন বান্দার পক্ষেই সম্ভব নয়, তার শুকরিয়া আদায় করা।
আমাকে দিয়ে আমার প্রভু কিছু কাজ আঞ্জাম দিয়েছেন, এটা তাঁর মেহেরবানী, এখানে আমার কোন কৃতিত্ব নেই। আমার কৃতিত্ব একটাই, আমি আমার প্রভুর ভালবাসায় ধন্য এবং আনন্দিত। অবশ্য এটাও তাঁরই দান।
আপনারা অনেকেই জানেন, আমি একসময় দেশে বিদেশে জনপ্রিয় ইসলামী সাংস্কৃতিক সংগঠন সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠীর সভাপতি ছিলাম। কিন্তু কোনদিন পারফর্মার হিসাবে আমাকে মঞ্চে উঠতে হয়নি। আমিই একমাত্র সভাপতি যে গান না জেনেও সাইমুমের মত মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সভাপতি ছিলাম।
এই যে গান না জানা, এটা আমার অযোগ্যতা। আর এই যে না জেনেও দায়িত্ব পালন, এটা তার মেহেরবানী।
আমি কি কি পারি না, তা তো আপনারা জানেনই। ফলে এটা কোন ঢোল পিটানোর বিষয় নই। কিন্তু আমি বা আমরা করতে চেয়েও পারি নাই, এটা আমার বা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের ব্যর্থতা দেখিয়ে দেয়। কেন পারিনি, সে প্রশ্ন উঠলে নানাজন নানাভাবে ব্যাখ্যা করবেন। হতেই পারে, আমার সাথে আপনি একমত না। কিন্তু কেন পারিনি তার একটি বিশ্লেষণ তো আমার থাকতেই পারে।
হয়তো আমি অতীতে ভুল করেছিলাম, অথবা এখন করছি। অথবা কেউ না কেউ ভুল করেছে, যে কারণে আমাদের ঝুলিতে ব্যর্থতা জমা হয়েছে। সফলতা যে আমাদের নেই, তাও নয়। সেই কৃতিত্ব আমাদের অর্জন। অবশ্য, এটাও ঠিক নয়। আমরা বিশ্বাস করি, সকল প্রশংসার মালিক আল্লাহ। অতএব, এই কৃতিত্বের মালিকও আল্লাহ।
যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আর যারা নতুন এ কাজে নামবে, এসব ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে তারা যেন এ ভুলের উর্ধে উঠতে পারে সে তৌফিক দান করুন।
দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের অভিজ্ঞায় আমি বলতে চাই, আমরা আমাদের টার্গেট স্পষ্ট করতে পারিনি। ফলে করনীয়ও ঠিক করতে পারিনি। একবার মনে হয়েছে, এটা করলে ভাল হবে, আবার মনে হয়েছে, না, ওটা করলেই মনে হয় ভালো হতো। এই দোদুল্যমানতা আমাদের অগ্রযাত্রাকে ব্যহত করেছে।
আমরা একটি আদর্শের জন্য লড়াই করছি। অমানবিক একটা সমাজে মানবতা জাগিয়ে তোলার কাজ করছি। কোরান আমাদের একটা মধ্যমপন্থী জাতি বলে অভিহিত করেছে। তার মানে আমরা একটি সহনশীল সমাজ নির্মাণ করতে চাচ্ছি।
আমরা চাই না, পুঁজিবাদের মত অবাধ স্বাধীনতার আড়ালে পাশবিকতায় জড়িয়ে পড়ি। বা স্বাধীনতা সম্পূর্ণ হরণ করে সমাজবাদের নামে মানুষকে স্বাধীনতাহীন করে যন্ত্রে পরিণত করি। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা যেমন প্রাণহীন যন্ত্র না, তেমনি বিবেকহীন পশুও না। আমাদের বিবেক আমাদেরকে মমত্ববোধ শিখায়, প্রেম ও ভালবাসতে শিখায়। ঘৃণা, লোভ ও নিষ্ঠুরতা বর্জন করে মানুষকে মানবিক ও দয়াবান হতে বলে।
একদিকে আদর্শ ও নৈতিকতা অন্যদিকে সুবিধাবাদ। আদর্শবান হতে হলে সুবিধাবাদ বাদ দিতে হবে, আর সুবিধাবাদী হতে হলে আদর্শ বাদ দিতে হবে। এ দুটো কখনো এক সাথে চলতে পারে না যেমন রাত আর দিন এক সাথে চলতে পারে না। অন্ধকার ও আলো এক সাথে থাকতে পারে না। যদি কখনো এক হতে যায়, তখন তা হয়ে যায় আলোআঁধারী। প্রাণ থাকতে মানুষ মরে না, মরে গেলে সে আর মানুষ থাকে না। হয়ে যায় লাশ। অথচ বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ এই সংকর প্রজাতির। একদল মন্দের সাথে ভালো মিশায়, অন্যদল ভালোর সাথে মন্দ মিশায়। কোথাও মন্দের পরিমান বেশী, কোথাও কম।
মন্দরা হঠাৎ দুএকটা ভাল কাজ করে বলে, এইতো আমি ভাল কাজ করেছি। আর ভালোরা মন্দ কাজ করে বলে, আমি তো একটা ভাল কাজ করার জন্যই এই মন্দটা করেছি। আমার নিয়ত ভালো। হুজুর ধরলো, খাঁ সাব, মাদ্রাসায় একটা মসজিদ দরকার। সবাই বলেছে, আপনি একটু নড়েচড়ে বসলেই হয়ে যায়। খাঁ সাহেব বললেন, সবাই কে কে? হুজুর বললেন, আরে, ওটাতো কথার কথা। মানে, ইমাম সাহেব মিথ্যে বললে তা আর মিথ্যা থাকে না, হয়ে যায় কথার কথা।
জানি, আমার কথা আপনাদের অনেকেরই ভাল লাগছে না। এ জন্যই আমি কবিতা লিখি, কথা বলি কম। বাঙালি কথা বলায় ওস্তাদ। কিন্তু সত্যটা গাঁয়ে লাগলেই তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে।
তাই আমি কিছু না বলে আপনার কাছেই প্রশ্ন করছি, যার দিন কাটে খোদার অসংখ্য হুকুম অমান্য করে তাকে কি মুসলিম বলা যায়?
নামাজ হচ্ছে প্রধানত মানসিক এবাদত। আপনি আমি প্রতিদিন পাঁচ বার আল্লার দরবারে হাজিরা দিয়ে নামাজ পড়ি। নামাজে আমরা আমাদের প্রভুর সাথে কথা বলি। কিছু ওয়াদায় আবদ্ধ হই। কিছু জিনিসের স্বীকৃতি দেই। রুকু, সেজদা, কিয়ামে যে ব্যায়াম হয় তা অস্বীকারের উপায় নেই। আমরা নামাজের রুকু সেজদা শিখি, কিন্তু রুকু সেজদায় কি বলি তা শেখা যে জরুরী তা আমরা ভুলে যাই। ফলে, আমরা আল্লাহর সাথে কি ওয়াদায় আবদ্ধ হই তাই আমরা জানি না, আর যে চুক্তির বিষয় আমরা জানি না তা পালন করার তো প্রশ্নই উঠে না। তাহলে আমাদের নামাজ থেকে সমাজ কি করে উপকৃত হবে। একজন নামাজ পড়ে না, আরেকজন পড়েছে তবে তার নামাজ কবুল হয়নি, এতে কি কোন পার্থক্য আছে? একজন পড়েনি, আরেকজন পড়েছে কিন্তু তা কোন কাজে লাগেনি, তার মানেতো একই দাঁড়ালো। দুজনই ব্যর্থ। যে পড়েনি, সে নামাজ নিয়ে কোন সময়ও ব্যয় করেনি, আর যে পড়েছে সে পরীক্ষা দিয়েও ফেল করেছে। পাসের খাতায় কারোরই নাম যায়নি।
আমাদের অবস্থা হয়েছে তাই। একজন অমুসলমানও ঘুষ খায়, একজন মুসলমানও
ঘুষ খায়। একজন রেনামাজিও ঘুষ খায়, একজন নামাজিও ঘুষ খায়। এই চারজনের মধ্যে ভাল কে? কেউ না। চারজনই ঘুষখোর। তবে তুলনামূলক ভাবে নামাজির অপরাধ বেশী। কারণ, সে জানতো ঘুষ খাওয়ার পরিনাম কি? আর বেনামাজি জানতো না। জেনেও যে পাপ করে সেই বড় অপরাধী।
এরকম হাজারো অসঙ্গতিতে ভরা আমাদের জীবন। ইসলামও থাকবে জুলুমও থাকবে এর নাম ইসলাম প্রাকটিস হতে পারে না। ক্রমাগত শুদ্ধ মানব হওযার চেষ্টার নাম ইসলাম।
ইসলাম এসেছে মানব সমাজ থেকে অশান্তি ও অকল্যাণ দূর করতে। যে সমাজে অশান্তির চাষ হও সেটা ইসলামী সমাজ নয়। ইসলাম নারীর সাথে কি আচরণ করবেন, চাকরের সাথে কি আচরণ করবেন, অমুসলমানের সাথে কি আচরণ করবেন, পড়শীর সাথে কি আচরণ করবেন, বুড়ো পিতামাতার সাথে কি আচরণ করবেন এসেছে সেই আচরণ শেখাতে। ইসলাম বলে বাপ মায়ের সাথে ভাল আচরণ করো। আমরা আল্লাহর সাথে এবাদতের সুবিধার্থে বাপ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসি। বাপ মাকে গ্রামের বাড়িতে রেখে আমরা চলে যাই শহরে, বিদেশে। অনেক সন্তান আছে বাপ মাকে দাফন করার ফুসরতও হয় না তার। আমরা বিশ্ব চষে বেড়াই সুখ ও শান্তির খোঁজে, জানি না, মায়ের হাতের এক লোকমা ভাতের ভেতর ঘুমিয়ে আছে সুখ ও শান্তি। যে মানুষ বাপমায়ের সাথে আচরণই শিখতে পারলো না, তাকে আপনি কি করে ইসলাম শেখাবেন?
আপনার পরিবারকে সুখী করা আপনার দায়িত্ব। অথচ পরিবারকে সঙ্গ দেয়ার সময়ই আপনার হয় না। এর নাম ইসলাম নয়।
আপনি ইসলাম শিখতে পীরসাহেব, দরবেশ ও বুজুর্গানে দ্বীনের কাছে যান, যারা আপনাকে কতিপয় দোয়া শিখিয়ে দেন। পৃথিবীতে কোরআন কি দোয়া শিখানোর জন্য এসেছিল? আপনি জানেন না, কিন্তু হুজুরও কি জানেন না কোরআন কি শিখাতে অবতীর্ণ হয়েছে?
প্রিয় নবী বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দুটো জিনিস রেখে যাচ্ছি, তা আকড়ে ধরে থাকলে তোমরা কখনো বিভ্রান্ত হবে না, বিপথগামী হবেনা। আর তা হচ্ছে আল কোরআন ও সুন্নাহ।
অথচ আমরা ইসলাম শিখতে যাই, নেতার কাছে, পীরের কাছে, হুজুরের কাছে। আমরা যাই খানকায়, মাজারে। কোরান থাকে তাকের ওপরে।
এভাবে ভুলে ভুলে কেটে যায় আমাদের জীবন। এই ভুল করাটা কোন অপরাধ নয়, অপরাধ হচ্ছে ভুলের ওপর বসে থাকা। ওখান থেকে না সরা। আর ইসলাম হচ্ছে, ভুল বুঝার সাথে সাথে তওবা করে ফিরে আসা।
মানুষ ভুল করবেই। এটাই স্বাভাবিক। শয়তান ভুলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, মানুষ সরে আসে।
আমরা যারা আশির দশকে জ্যোতিজোস্নার কবিকন্ঠ হয়ে যাত্রা করেছিলাম, আমাদের স্বপ্ন পুরোপুরি সফল না হলেও অনেক পথ আমরা পেরিয়ে এসেছি। বিপরীত উচ্চারণের মাধ্যমে এই জ্যোতিজোস্নার নিশান উড়িয়েছিল কতিপয় স্বর্ণতরুণ। এ আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার জন্য অচিরেই গড়ে তোলা হল বাংলাসাহিত্য পরিষদ। এটিকে রূপ দেয়া হলো, কেন্দ্রীয় সাহিত্য সংগঠনের। আমরা যারা ইসলামী সাহিত্য গড়ার প্রত্যয়ে জোটবদ্ধ হয়েছিলাম আল্লাহ আমাদের আশা পূরণ করলেন। আমরা পেলাম অভিজ্ঞ মুরুব্বী, বাংলা সাহিত্যের প্রথিতযশা সাহিত্যিকদের স্নেহমমতা, সময়ের আনুকূল্য, তারুণ্যের উচ্ছ্বলতা, আশাবাদী নবীনের স্বপ্নভূবন।
আমরা আমাদের সভাপতি হিসাবে পেলাম দৈনিক সংগ্রামের বিজ্ঞ সম্পাদক জনাব আবুল আসাদকে। যার নেতৃত্বে আমরা কাটিয়ে দিলাম প্রায় পঞ্চাশটি বছর। পরিচালক, ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী পরিষদে বিভিন্ন সময় পরিবর্তন এলেও প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসাবে যাকে পেয়েছিলাম সেই আবুল আসাদ আজো পরিষদের সভাপতি। এর মাঝে নতুন করে যারা বিভিন্ন সময়ে পরিষদের সদস্য পদে এসেছিলেন তাদের তালিকাটা একেবারে ছোট নয়। কষ্ট করে সর্বশেষ ব্যবস্থাপক তৌহিদুর রহমান যদি এই তালিকাটা জাতিকে জানান, জাতি অন্তত জানতে পারবে, কারা এর সাথে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন সময়ে একে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
এবং বর্তমান পরিষদে কারা আছেন এটাও তো একটা ইতিহাস হতে পারে।
একটা জাতীয় সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে বাংলা সাহিত্য পরিষদ নিয়ে আমাদের স্বপ্নটা ছিল এরকমঃ
শিশুদের জন্য জাতীয় শিশু কিশোর সংগঠন আছে, শ্রমিকদের আলাদা সংগঠন আছে, কৃষকদের আলাদা সংগঠন আছে, ছাত্রদের নিজস্ব সংগঠন আছে, ছাত্রীদের নিজস্ব সংগঠন আছে, একই ভাবে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ সবারই নিজস্ব সংগঠন আছে, তেমনি লেখকদেরও একটি জাতীয় সংগঠন থাকবে, তার নাম হলো বাংলা সাহিত্য পরিষদ। যেটি এরই মধ্যে আমরা করে ফেলতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের একটি টেবিল, একটি চেয়ার ও একটি আলমিরা আছে। সময়ের সাথে সাথে এ অফিস বড় হবে। নবীন প্রবীণের কলকাকলিতে ভরে উঠবে। আমাদের থাকবে নিজস্ব অফিস, ক্যাম্পাস, হল কত কিছু। সম্ভব হলে আমরা গড়ে তুলবো লেখক পল্লী। এরকম কত স্বপ্ন।
প্রথমে বিভাগীয় শহরে, তারপর জেলা শহরে আমাদের শাখা হবে। এরপর মহকুমা ও থানা সদরেও পৌঁছে যাবো আমরা। আমাদের বই হবে। জেলায় জেলায় সাহিত্য সভা ও বিক্রয়কেন্দ্র থাকবে।
স্বপ্নটা ভাল না?
কিন্তু আমরা পারিনি। আমাদের পরিকল্পনার পরী উড়িয়া যাওয়ার পর কল্পনাগুলো মাটিতে পড়িয়া গড়াগড়ি খাইতে লাগিল।
কি পারিনি আমরা? পঞ্চাশ বছরেও ঢাকার বাইরে কোন শাখা করতে পারিনি। না বিভাগীয় শহরে, না জেলা শহরে। আমরা এখন সগৌরবে বলতে পারি, সারাদেশে আমাদের আর কোন শাখা নেই। এই না থাকাটা আমাদের অর্জনও হতে পারে, ব্যার্থতাও হতে পারে। অর্জন হলো, আমাদের মধ্যে কোন ভেজাল নেই। ব্যর্থতা হলো, বিকাশ কাকে বলে আমরা আজো জানি না।

৫/৮/২০