আকবর যখন ‘অধঃপতন ও ধ্বংসের প্রতীক’

আগেই লিখেছি, ইয়োরোপীয় বণিকদের মেযায-প্রকৃতি ‘ব্যবসায়ী’র মতো ছিলো না। নিজ দেশে এগারো-বারো-তেরো শতকে মুসলমানদের সাথে লড়াই করে তাদের একটা মুসলিম বিরোধি বিশেষ মনস্বত্ব তৈরি হয়েছিল। সে স্বভাব নিয়ে তারা ‘নাইট-এরেন্ট’ বা দুঃসাহসি অভিযাত্রীর মতো ভারতীয় উপকূলে নোঙর করে। তাদের মানস ছিল উগ্র খৃস্টান জাতীয়তাবাদী। সে মানসিকতা নিয়ে এই ‘টেম্পলার-ক্রসেডার’রা ‘এক হাতে বাইবেল ও অন্য হাতে তরবারি’ নিয়ে এখানে প্রবেশ করে।
সুলতান সিকান্দার লোদীর (১৪৮১-১৫১৭) শাসনকালে এই নব্য ক্রসেডারদের অগ্রবর্তী দলের পুরোধা হয়ে আসেন পর্তুগীজ ভাস্কো ডা গামা। তিনি ১৪৯৮ সালে মালাবার উপকূলে পৌঁছেন। তাকে অনুসরন করে দেড় হাজার লোক-লশকর নিয়ে ১৫০৫ সালে হাজির হন ফ্রান্সিককো দ্য আলমেডিয়া। সে ধারায় আল ফানসো দ্য আল বুকার্ক ১৫০৯ সালে মাদ্রাজের গোয়া দখল করে সেখানে প্রথম উপনিবেশ কায়েম করেন।
এই তাতপর্যপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে মঙ্গোল তাতারী হালাকু খানের হাতে আব্বাসীয় খলিফাদের রাজধানী বাগদাদের পতনের আড়াইশ বছরের মাথায়। ১৫১০ থেকে ১৫১৫ সালের মধ্যে পর্তুগীজরা দক্ষিণ উপকূলীয় বিচ্ছিন্ন স্থলভূমি কোচিন, দমন, দিউ দখল করে। তারা ‘তরবারি হাতে’ স্বভাবসুলভ জলদস্যুতার মাধ্যমে সাগরের বানিজ্যপথ অন্যদের জন্য অনিরাপদ করে তোলে। স্থলভূমিতে তারা ‘খৃস্টের রাজ্যবৃদ্ধি’র জন্য ‘বাইবেল হাতে’ অভিযান চালায়।
এই সময় দিল্লীর শাসনকেন্দ্রে একটা বড় পালাবদল ঘটে। মামলুক (১২০৬-১২৯০) থেকে লোদী বংশ (১৪৫১-১৬২৬) পর্যন্ত সোয়া চারশ বছর ভারতীয় মুসলিম সুলতানগণ বাগদাদের খলিফাদের অনুগত হয়ে ভারতে শাসন করেছেন। শাসন ও বিচার ব্যবস্থায় তারা মুসলিম জাহানের কেন্দ্রীয় শাসনপ্রণালীর সাথে যুক্ত ছিলেন। মোগল যুগ থেকে সে সম্পর্কটি ছিন্ন হয়। এ সময় অতি দ্রুত অনেকগুলি বড় মৌলিক পরিবর্তন ঘটে। এই সব ঘটনা পলাশীর পটভূমি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে।
পাঠান সুলতান ইবরাহিম লোদিকে পরাজিত করে জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর (জ ১৪৮৩-মৃ ১৫৩০) ভারতে মোগল শাসনের (১৫২৬-১৮৫৮) সূচনা করেন। তুর্কি ও পারস্য সংস্কৃতি প্রভাবিত উজবেক ভূমি সমরকন্দের ফারগানা রাজ্যের তৈমুরলঙ-এর বংশের মির্জা ওমর বেগ এর ছেলে বাবর মায়ের দিক থেকে ছিলেন চেঙ্গিজ বংশের উত্তরাধিকারী।
মোঙ্গলরা তাদের ধ্বংসকান্ড চালানোর সময়ই ইসলামের সংস্পর্শে আসে। অনেকে তখন বদলেও যায়। বেশ দ্রুত তাদের মাঝে ইসলামের বিস্তার ঘটে। সেই দ্রুত বিস্লেতারের কারণে তাদের সাংস্কৃতিক জীবন গঠনের নিবীড় পরিচরযার ফুরসত ও পরিবেশ অফগানিস্তানের গজনী বা হেরাতের মতো ছিল না। সে অবস্থায় কিংবদন্তীতূল্য বীর বালকরূপে বাবর তুর্কি-খোরাসানী বারলাস উপজাতিতে বেড়ে ওঠেন। মাত্র বারো বছর বয়সে ১৪৯৪ সালে ফারগানার শাসক হন তিনি। এর পর রাজ্যহারা হয়ে কিছু দিন পথে পথে ঘোরেন।
১৫০৪ সালে বাবরি তুষার-ঢাকা হিন্দুকুশ পর্বতমালা পেরিয়ে কাবুল দখল করে বাদশাহ হন। হেরাতের উন্নত সাংস্কৃতিক পরিবেশ তখন বাবরের সাংস্কৃতিক মানসে পুষ্টি যোগায়। তিনি সেনাদলে তুর্কি-পার্সি-পাঠান-আরব যোদ্ধাদের সমবেত করে ১৫১১ সালে সমরকন্দ পুনর্দখল করেন। এই সফলতাকে তিনি তার ‘বাবরনামা’য় বলেছেন ‘আল্লাহ্র সেরা উপহার’।
এ সাফল্যে বাবরের আত্মবিশ্বাস বেড়ে যায়। তিনি তৈমুরের উত্তরাধিকারী হিসাবে দিল্লীর সালতানাত ফেরত চেয়ে ইবরাহিম লোদিকে চিঠি লেখেন। ১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে লোদীকে পরাজিত করে তিনি প্রবেশ করেন দিল্লীতে। দিল্লীর জামে মসজিদে তার নামে জুমার খোতবা প্রচার করা হয়। এভাবে বাবর ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা করেন।
বাবর নিজেকে গড়েছিলেন জননায়ক, যোদ্ধা ও পন্ডিতরূপে। তিনি যুদ্ধকে আল্লাহর পথে জিহাদ আর সাফল্যকে বলতেন আল্লাহর দয়া। ইনসাফের নীতিকে মুসলিম শাসকের কর্তব্য মনে করতেন তিনি। সে কর্তব্য পালনে তিনি নিষ্ঠাবান ছিলেন। বাবর মধ্যযুগের সেরা শাসকদের একজন ছিলেন। দিগ্বিজয়ী হিসাবে তাকে তুলনা করা হয় জুলিয়াস সিজার ও নেপোলিয়নের সাথে। তবে বড় মাপের কবি হিসাবে সবার মাঝে তার ছিল বাড়তি দ্যোতি।
মাত্র চার বছর ভারত শাসন করেন বাবর। তিনি বিশ্বের সবচে বড় সাম্রাজ্যের ভিত নির্মাণ করেন। ১৫৩০ সালে সাতচল্লিশ বছর বয়সে তার ইনতেকালের ঘটনার সাথে যোগ হয়েছে ছেলে হুমায়ুনের রোগ মুক্তির মর্মস্পর্শী কাহিনী। সে কাহিনীতে মূর্ত হয়েছে বাবরের মানবিক চরিত্রের আরেক বিশেষ দিক।
বাবরের পর তার বড় ছেলে মির্জা নাসিরুদ্দিন মুহম্মদ হুমায়ুন (১৫০৮- ১৫৫৬) বাইশ বছর বয়সে ১৫৩০ সালে দিল্লীর মসনদে বসেন। বাংলায় পাঠান শাসনের প্রতিষ্ঠাতা শের শাহ সুরি তাকে দশ বছর পর একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত করেন। ১৫৩৯ সালে বখশারের কাছে গঙ্গা তীরের চৌসারে পরাজিত হয়ে হুময়ুন আগ্রা চলে যান। সেখানে ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে পরাজিত হন। রাজ্যহারা হুময়ুন তখন মরুপথে সিন্ধু রওনা হন। হুমায়ুন বা সৌভাগ্যবান নামের পরাজিত ভারত সম্রাটের পলায়নের পথ ছিল কন্টকাকীর্ণ। সে অবস্থায় মরুভূমিতে আকবরের জন্ম হয়।
সদ্যভূমিষ্ট ছেলেকে রেখেই তাকে ছুটতে হয় সিন্ধুর দিকে। সেখানে থেকে সিন্ধী ও বালুচ সৈন্য সংগ্রহ করে প্রথমে কান্দাহার ও পরে তিনি কাবুলে যান। পনেরো বছর পথে পথে ঘুরে হুময়ুন পারস্য সম্রাট তাহমাসপের সহায়তায় ১৫৫৫ সালে শের শাহর এক দুর্বল উত্তরাধিকারীর কাছ থেকে দিল্লীর মসনদ পুনরুদ্ধার করেন।
এর মাত্র কিছু দিন পর ১৫৫৬ সালে দিল্লীর দ্বীনপানাহ দুর্গের গ্রণ্থাগারে পড়াশুনা শেষে কিছু বই হাতে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আজানের শব্দ শুনে তিনি মাথা নিচু করেন। অসাবধানে পা পিছলে পড়ে আহত হন। সে আঘাতে হুমায়ুন বা ভাগ্যবান নামের দ্বিতীয় মোগল সম্রাট তার জীবনের বাধা-সংকুল পথ চলা শেষ করেন।
হুমায়ুন বাবরের মতো ক্ষীপ্র গতির ‘ঝলসানো তরবারী’ ছিলেন না। তবে তার দয়া ও সুবিবেচনার স্নিগ্ধ গুণাবলী সকলের প্রশংসা পেয়েছে। পরবর্তি বংশধরের জন্য তিনি বর্তমান আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও উত্তর ভারতজুড়ে দশ লাখ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সাম্রাজ্য রেখে যান। পশ্চিম এশীয় বংশোদ্ভূত হুমায়ুনের মাধ্যমে মোগল সাম্রাজ্যের ভাষা-সংস্কৃতি-স্থাপত্যে পারস্য-প্রভাব বাড়ে।
হুমায়ুনের পর সম্রাট হন তার ছেলে জালালুদ্দিন মুহাম্মদ আকবর। তিনি ১৫৫৬ সালে সিংহাসনে বসেন। হুমায়ুনের পলায়নের পথে মরুভূমিতে জন্ম ও এর পর তার বেড়ে ওঠার ঘটনা অন্য সব শাহজাদার মতো ছিল না। সম্রাট হিসাবে তার বেশ কিছু বড় সিদ্ধান্ত তার সেই দুরন্ত ও অনিয়ন্ত্রিত বেড়ে ওঠার অবস্থার দ্বারা প্রভাবিত। সে প্রসঙ্গ তাই বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
হুমায়ুন আগ্রা থেকে মরুপথে অজানা ভবিষ্যতের পথে সিন্ধুর দিকে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে ছিলেন আট মাসের গর্ভবতী স্ত্রী হামিদা। পথে খাদ্য ও পানি আর যানবাহনের সংকট ছিল। মরু প্রান্তরে হামিদার একমাত্র ঘোড়াটির মৃত্যু হয়। হুমায়ুন স্ত্রীকে নিজের ঘোড়া দিয়ে চলেন উটের পিঠে। এক সময় হামিদা চলার সামর্থ হারান। তারা তখন সিন্ধুর দুস্তর মরুভূমির অমরকোটের মরুদ্বানে প্রসাদ রাওয়ের আশ্রয়ে ওঠেন। সেখানেই ১৯৪২ সালের ১৫ অক্টোবর জন্ম হয় আকবরের। সদ্য ভূমিষ্ট শিশু-সন্তানকে রেখে রাজ্যহারা হুমায়ুন ছোটেন সামনের অজানা ভবিষ্যতের দিকে।
আকবর কী অবস্থায় বেড়ে ওঠেন? কীভাবে তার শৈশব ও বাল্যকাল কাটে? তখনকার মুসলিম শিক্ষা-ব্যবস্থার সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। মুসলিম শাসক পরিবারের সন্তানদেরকে শৈশব থেকেই ভবিষ্যতে বড় দায়িত্ব নেয়ার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার নিবীড় পরিচর্যা করা হতো। কিন্তু আকবর সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।
অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও তীক্ষ্ণ মেধা নিয়ে আকবর আদৌ লেখাপড়ার কোন সুযোগ ছাড়াই বড় হন। তিনি মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতি-দর্শন-ইতিহাস-ঐতিহ্যের বোধ-বিবেচনা লাভে বঞ্চিত হন। প্রতিবেশি সমাজ-সংস্কৃতি-মানস সম্পর্কে তার ধারণা হতে পারেনি। বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে গত শতাব্দীগুলিতে ঘটে যাওয়া পরিবর্তন আর সমসাময়িক বিশ্বের সমাজ-সংস্কৃতি-সভ্যতার নতুন ঢেউ সম্পর্কে আকবর ছিলেন পুরা বেখবর।
সে শূণ্যতা নিয়ে আকবর বাবার রেখে যাওয়া বিশাল সাম্রাজ্যে হঠাত সার্বভৌম অধিপতি হয়ে বসেন।
ভারতে মুসলিম শাসন গড়ে উঠেছিল সাহাবী আবূ ওয়াক্কাস থেকে নিয়ে হাজার-হাজার ইসলাম প্রচারকের ত্যাগ ও সাধনার বুনিয়াদের ওপর। সোয়া চার শ বছরের সে শাসন ব্যবস্থার উত্তরাধিকারী ততহয়েছিলেন বাবর। জননায়ক, যোদ্ধা ও পন্ডিতরূপে তিনি বিখ্যাত হয়েছেলেন।
বাবর তার তলোয়ার চালনাকে জিহাদ, সাফল্যকে আল্লাহর দয়া, আর কর্তব্যকে ইনসাফের মূলনীতির আলোকে বিবেচনা করতেন। সেই ভিত্তির ওপর আকবরের পিতা হুমায়ুন দশ লাখ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের সাম্রাজ্য রেখে যান। মৃত্যুর আগে তার হাতে ছিল কিতাব।
সেই পূর্বপুরুষদের কাজের তাতপর্য সম্পর্কে আকবর ছিলেন উপলব্ধিহীন। শাসনকাজে অনভিগ্য তীক্ষ্ণ ধীসম্পন্ন আকবর হঠাত বিশাল সাম্রাজ্যের সার্বভৌম অধিপতি হয়ে বসেন।
প্রথম চার বছর বৈরাম খাঁ সম্রাটের পক্ষে সাম্রাজ্যের বিভিন্ন বিষয় দেখতেন। আকবর ১৫৬০ সালে তাকে অপসারণ করেন। শুরু হয় ‘অবিশ্বাস ও সন্দেহের পথে’ একা ভ্রমণ। ‘দুঃসাহসিক কাজের নেশায়’
আকবর একের পর এক অভিনব সিদ্ধান্ত নেন। সাম্রাজ্যের বিস্তারের নেশায় ‘ভারতকে এক করা’র নামে সহসাই তিনি সব ‘পুরনো স্মৃতি’ মুছে ফেলতে চাইলেন। (ম্যালেসন, ইন্ডিয়ান মিউটিনি অফ ১৮৫৭)
আকবর তার রাজত্বের নিরাপত্তা তালাশ করলেন ‘সংখ্যাগরিষ্ঠে’র আত্মীয়তার মাঝে। তাদের সমর্থন লাভের আশায় আকবর একের পর এক হিন্দু রাজকুমারীকে ঘরে তোলেন। ভরমল্লের মেয়ে জোধাবাঈ মোগল হেরেমের রাণী হয়ে শাসনকাজে বিশেষ প্রভাবশালী হন।
হিন্দু পন্ডিতেরা আকবরের সাথে হিন্দু রাজকুমারীদের বিয়ে অনুমোদন করে তার বিনিময়ে সম্রাটের ‘ধর্মীয় মজলিসে’ প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। টোডরমল, বীরবল ও মানসিংহ দরবারের সভাসদ বা ‘নবরত্ন-সভা’র সদস্য পদ পেলেন। টোডরমলকে অর্থমন্ত্রী করা হলো। ভগবানদাসের ছেলে মান সিংহকে করা হলো প্রধান সেনাপতি। বীরবল হয়ে উঠলেন আকবরের সবচে প্রিয়পাত্র।
ভারতের পশ্চিম উপকূলে উপনিবেশ গেড়ে বসা পর্তুগীজদেরকেও আকবর বিশেষ মর্যাদা দিলেন। পর্তুগীজ খৃস্টান পাদ্রীরা আকবরের দরবারে রাজকীয় ধর্মীয় আলোচনার আসরে সমাদর পেলেন। এ ধরনের মত বিনিময় একেবারে নতুন ছিল না। অতীতেও পাল আমলের দরবারে বৌদ্ধ ও মুসলিম পন্ডিতগণ আন্ত-ধর্মীয় সংলাপ ও মত বিনিময় করেছেন।
কিন্তু আকবরের সময় হিন্দু-মুসলিম-খৃস্টান ধর্মশাস্ত্রবিদদের ‘প্রাণখোলা আলোচনা’র নামে ইসলামের আকিদা-বিশ্বাস ও অনুষ্ঠানসমূহ নিয়ে বিরূপ আলোচনাই বেশি উতসাহ পায়। খৃস্টান পাদ্রীরা সম্রাটের আচরণ দেখে মনেি করে ফেলেছিলেন যে তিনি বুঝি যীশুখৃস্টের ধর্ম কবুল করেছেন। আকবর তার শাহজাদাদের লেখাপড়ার দায়িত্বও পর্তুগীজ ক্যাথলিক খৃস্টান পাদ্রীদের হাতে তুলে দেন।
বিপুল ক্ষমতার অধিকারী আত্মবোধবিমুখ আকবর অদ্ভুত কৌতুহল নিয়ে ধর্মীয় ব্যাপারে একের পর এক উদ্ভট হস্তক্ষেপ করেন। ১৫৬৩ সাল থেকে তার এ ধরনের ভূমিকা সব সীমা ছাড়াতে থাকে। তিনি গরু জবাই ও ছেলেদের খতনা করা নিষিদ্ধ করেন। সীমিত মাত্রায় মদপানকে বৈধতা দেন। এমনি সব বিষয় নিয়ে আলেমদের সাথে আকবরের মতবিরোধ বাড়ে।
আকবর নিয়ম বা ঐতিহ্য মানার পাত্র ছিলেন না। তিনি আলেমদের শত শত বছরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছেদ টানতে চাইলেন। বাদায়ুনীর মতো শীর্ষ আলেমদের বাধা অগ্রাহ্য করে তিনি দরবারের দুই পোষা ‘ওলামায়ে ছু’র স্বাক্ষরে দলীল তৈরী করে নিজেকে ‘ইমাম-ই-আদিল’ বা ধর্মীয় বিষয়ে ‘অখন্ডনীয় রায়’ দেয়ার অধিকারী ঘোষণা করেন।
পথের বাধা সরিয়ে আকবর এবারে ইসলাম বৈরিতায় চরম স্বেচ্ছাচারি হয়ে ওঠেন। তিনি ‘সংস্কৃতির সব দুয়ার’ খুলে দেয়ার নামে এক রাজকীয় আদশবলে ‘সব ধর্মের সত্য নিয়ে’ তথাকথিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ নামে এক অদ্ভুত ধর্মমত ‘প্রবর্তন’ করলেন। ভিনসেন্ট স্মিথের মতে আকবরের এই ‘ঐশ্বরিক বিশ্বাস’ কোন ধরনের ‘উইজডম’ বা প্রগ্যার পরিচায়ক ছিল না। বরং এটি ছিল তার ‘বোকামীর স্মৃতিচিণ্হ’। (ভি এ স্মীথ: আকবর দ্য গ্রেট মোগল)।
‘দ্বীন-ই-ইলাহী’তে খৃস্টান ও হিন্দু ধর্মের সমন্বয়ে চিন্তার মহা বিভ্রাট ও বিশৃংখলা প্রকাশ পায়। এক দিকে খৃস্টানদের ‘ঘন্টা’ আর ‘ফাদার গড’, ‘মাদার গড’ ও ‘সান গড’ মিলিয়ে ‘তিন প্রভু’র ত্রিত্ববাদকে ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র অঙ্গ করা হয়। অন্য দিকে বাদশাহী হেরেমে হিন্দু ধর্মীয় দেওয়ালী, দশোহরা, রাখী, পুণম, শিবরাত্রি, হাওয়ান প্রভৃতি অগ্নিপূজা ও মূর্তিপূজা চালু হয়।
‘ধর্ম-প্রবর্তক’ আকবর কপালে চন্দন তিলক এঁকে, রুদ্রাক্ষের মালা পরে সকাল-সাঁঝে সূর্যের বন্দনা করেন। ‘ভগবান’ বা অবতার সেজে রাজ দরবারে বসেন। চাটুকাররা হাঁটু গেড়ে তাকে সিজদা করে। ‘দিল্লীশ্বরো-জগদিশ্বরো’ ধ্বনি দেয়। নতুন কালেমা হয় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আকবর খলিফাতুল্লাহ’। সরকারী মুদ্রায় কালেমার বদলে ‘আল্লাহু আকবর– জাল্লা জালালাহু’ এমনভাবে লেখা হয় যে ক্যালিগ্রাফির কায়দার ফলে সেটির পাঠ দাঁড়ায় ‘জালালুদ্দীন আকবর’।
‘দ্বীন-ই-ইলাহী’তে প্লেটোবাদ, বৈরাগ্যবাদ, বেদান্তবাদ, মহানির্বাণবাদ একাকার হয়। ইরানী ‘মুলহিদ’রা ধর্মীয় উপদেষ্টা হয়। তখন বাহাই মতবাদের জন্ম হয়। বলা হয়, হাজার বছর পর মুহাম্মদ সা.-এর দ্বীনের বদলে নতুন ধর্ম প্রয়োজন।
ইসলামকে হামলার নিশানা বানিয়ে ‘সব ধর্মের সত্য নিয়ে’ আত্মবোধহীন আকবর সংস্কৃতির ‘সব দুয়ার’ খুলে দিয়ে ইসলামের নবী-ওহী, বেহেশত-দোজখ, মিরাজ-জেহাদকে বিদ্রুপের নিশানা বানান। সালাম-আজান, গরু জবাই, শাহী দীওয়ানখানায় নামাজ আদায় নিষিদ্ধ হয়। ইসলাম বিরোধী আইন ও ফরমান জারি হয়। দ্বীনি শিক্ষা ও আরবীভাষার ব্যবহার কিংবা দাড়ি রাখা, আহমদ ও মুহাম্মদ নাম রাখা নিরুৎসাহিত হয়। চাচাতো- মামাতো ভাই-বোনের বিয়ে নিষিদ্ধ আর পুরুষদের রেশম ও স্বর্ণের ব্যবহার বৈধ হয়। সিংহ ও বাঘের গোশত বৈধ আর শুকর হয় পবিত্র প্রাণী। লাশ পুড়িয়ে ফেলতে উতসাহ দেয়া হয়। একান্ত কবর দিতে হলে লাশের পা কেবলামুখি করে শোয়াতে বলা হয়। আকবর নিজে কেবলার দিকে পা রেখে ঘুমাতেন।
ইসলাম থেকে তওবা করে মুসলিমদেরকে ‘দীন-ই-ইলাহি’তে দাখিল হতে বলা হয়। আকবরের সে হুকুমে মুসলিম সমাজ পুরা খারিজ করে দেয়। দরবারের কিছু ‘ওলামায়ে ছু’ আকবরকে ‘ইমাম-ই-আদিল’ ‘ইমাম মাহদি’, ‘যুগের মুজতাহিদ’ মানে। তারা আকবরের বিভ্রান্ত চিন্তার গায়ে মুসলমানী লেবাস জড়ানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।
এ দিকে আকবর যাদের খুশির জন্য এত কিছু করলেন তারা তাদের বিশ্বাস ও আত্মপরিচয় থেকে নড়লেন না। মানসিংহ ও টোডরমলদের বুকে টানতে আকবর কপালে তিলক আঁকেন। গলায় পরেন রুদ্রাক্ষের মালা। তাতেও আকবরের ‘রাজপুত আত্মীয়’দের মন গলে না।
আকবরের দ্বীন-ই-ইলাহীর খাতায় আঙ্গুলে গণা ক’জনের নাম পাওয়া যায়। আকবরের দুই ছেলে সেলিম ও মুরাদ আর আরেক পরিবারের তিন জনসহ মোট আঠারো জন মুসলমান আকবরের ‘চেলা’ হন। সেখানে নবরত্ন সভার সদস্য বিরবল ছাড়া কোন হিন্দুর নাম নেই। মেবারের রাজপুতরা আকবরের জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই চালিয়ে গেছেন।
আকবরের কথিত ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’র বিরুদ্ধে সারা ভারতে আলেমদের নেতৃত্বে প্রতিবাদ জোরদার হয়। জৌনপুর প্রদেশের কাজী বা প্রধান বিচারপতি মোল্লা মোহাম্মদ ইয়াজদী ১৫৮০ সালের শুরুতে এই ফিতনার বিরুদ্ধে ফতওয়া জারী করে আকবরকে ধর্মত্যাগী ঘোষণা করেন। সাম্রাজ্যের কয়েকটি প্রদেশে বিদ্রোহ দেখা দেয়।
পূর্ব ভারতের বাংলাদেশ, বিহারে ও জৌনপুরে এবং কাবুলে বিদ্রোহ তীব্রতর হয়। বাঙলার মুসলিম শাসক, সামন্ত প্রধান ও জনগণ বিদ্রোহে অংশ নেন। বারো ভূইয়াদের মোগল বিরোধি প্রতিরোধ সংগ্রাম এ সময় জোরদার হয়। পাঠান কররানীদের সামন্ত মসনদে আ’লা ঈসা খানের নেতৃত্বে স্থানীয় বারো ভূঁইয়াগণ আকবরের যমানায় পূর্ব বাঙলার বিস্তীর্ণ এলাকায় মোগল কর্তৃত্বের বাইরে স্বাধীন অস্তিত্ব বজায় রাখেন।
আকবরের মতিভ্রষ্ট ‘দীন-ই-ইলাহি’ সফল হয়নি। তবে ইয়োরোপীয় পর্তুগীজ খৃস্টান নব্য ক্রসেডাররা আর এ দেশীয় যারে এ কাজের ‘সক্রিয় উস্কানি’দাতা ছিলেন তারা কিন্তু আকবরের কাঁধে বন্দুক রেখে তাদের লক্ষ হাসিল করতে সফল হয়। ‘শক্তিমান মূর্খের হঠকারী চিন্তা’ সমাজে সীমাহীন বিভ্রান্তি ও বিশৃংখলা সৃষ্টি করে। সে বিশৃংখলা ‘ভারতীয় মুসলমানদের জন্য পতন ও ধ্বংসের সিঁড়ি’ তৈরি করে।
সাহাবী আবূ ওয়াক্কাসের হাত ধরে ভারতীয় সমাজে ইসলামের আলোর বিকীরন শুরু হয়েছিল। হাজার হাজার ইসলাম প্রচারক এদেশকে শির্কের অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে জীবনপাত করেছেন। মুহাম্মদ বিন কাসিম-সবুক্তিগীন-মাহমুদ-মুহাম্মদ ঘুরীর পথ বেয়ে শত শত বছর ধরে মুসলিম শাসকগণ এখানকার সভ্যতা ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ সৌধ নির্মাণ করেন। ঈশ্বরী প্রসাদ ‘ইসলামের শক্তি দ্বারা ভারত বিজিত হওয়া’ প্রসঙ্গে লিখেছেন: ‘এই শক্তি একাধিক শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্রের স্থলে একক রাজকীয় ঐক্য স্থাপন করে। উপরন্তু জনগণকে শ্রদ্ধা করতে শেখায় একক কর্তৃত্বকে। জাতীয় শক্তিতে নতুন উপাদানও যোগায়, তাছাড়া সূচনা করে একটা নতুন সংস্কৃতির। এই ব্যাপারটা আমাদের অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। মুসলমানদের রীতিনীতি উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের অত্যন্ত প্রভাবিত করে এবং আধুনিক সমাজে যে সুরুচির পরিচয় তা মুসলমানদেরই একক অবদান। এই দেশে তারা একটি নতুন ভাষার সূচনা করে, সঙ্গে সঙ্গে সূচনা করে নতুন ভাষায় রচিত সমৃদ্ধ সাহিত্য। এতদ্ব্যতীত সুন্দর সুন্দর অট্টালিকা নির্মাণ করে ভারতীয় সংস্কৃতিতে নবজাগরণ ঘটায়। হিন্দুরা রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে চ্যুত হলেও… জাতীয় সংস্কৃতির ধারাবাহিক প্রবাহ এতে বিঘ্নিত হয়নি।‘ (মধ্যযুগের ভারতের ইতিহাস–সুলতানী আমল, ১ম খন্ড, পৃ ২০-২১, দিব্যপ্রকাশ, ২০০৩)
ঈশ্বরী প্রসাদ লিখেছেন: ‘জীবনের রুঢ় বাস্তব দিকটা’ চরমভাবে উপেক্ষা করে’ আর্যরা ভারতীয় সভ্যতাকে ‘কমজোর’ করে ফেলেছিল। ‘নানা জাতি থেকে উদ্ভূত ভারতীয়দের মধ্যে প্রকট সামাজিক ও ধর্মীয় বিভেদ ছিল। ফলে তারা তাদের নিজেদের প্রয়োজনে ইসলামের ‘ধর্মীয় ভ্রাতৃসংঘের কাছে’ সহজে সমর্পিত হয়েছিল। ১১৯২ সালের ঐতিহাসিক তরাইনের যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরীর অশ্বারোহীরা বিশাল রাজপুত বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
সেই রাজপুতদের কাছে বাবুরের নাতির সাংস্কৃতিকভাবে আত্মসমর্পন কোন স্বাভাবিক ও সরল ঘটনা ছিল না। মুসলমানরা এখানে এসে গ্রীক-হুন—শক ও অন্যান্য আক্রমণকারী জাতিগোষ্ঠীর মতো তাদোর সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র গুলিয়ে ফেলেননি। বরং তাদের সংস্কৃতির শ্রেয়ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের কারণে ভারতীয় সমাজ সেই দান সহস্র ধারায় আত্মসাত করে নিজেদের জীবনকে নতুনভাবে সাজিয়েছে। বড় বড় শহরগুলি ছিল মুসলিম শাসকদের অধিকারে। আর পল্লী সমাজেও ত্যাগী ইসলাম প্রচারকদের সাধনায় জনজীবনে বড় পরিবর্তন আসে। সব মিলিয়ে ভারতের ইতিহাসে মুসলমানরা নবযুগ সৃষ্টি করেন।
আর সেখানে আত্মবোধহীন আকবর কী করলেন? চেঙ্গীজ খানের বংশধর হালাকু খানের ধ্বংসকান্ডের মুখে মধ্য এশিয়া থেকে এসে অনেক মুসলমান এই মুসলিম শাসিত ভারতে শান্তি খুঁজেছিলেন। তারা দেখলেন চেঙ্গীজের বংশধারার এক ‘মুসলিম’ উত্তরাধিকারীর আত্মবিনাশি মহড়া। রাষ্ট্রশক্তির স্বৈরাচারী প্রয়োগের মাধ্যমে মসজিদ-মাদ্রাসাসহ মুসলিম সমাজের বহু প্রতিষ্ঠান ধ্বংস বা দুর্বল হলো। মুসলমানদের শিক্ষার ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্রগুলি ছাত্রশূণ্য হয়ে পড়লো। বহু আলেম হিজরত করে আকবরের প্রভাব সীমার বাইরে চলে গেলেন। এভাবে আকবর শুধু মুসলমানদের জন্য ‘পতন ও ধ্বংসের সিঁড়ি’ তৈরি করেননি। ভারতীয় জনসমাজের সংস্কৃতির সীমানাও পাহারাহীন করে ফেলেন। উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি নড়বড়ে করে দেয়ার পথ বেয়ে আসে ‘পলাশি’।