কোন এক অকস্মাৎ ঝড়ে আমার পুরো বাগান লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছে! যে মানুষটার প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি কাজ ছিলো শেখবার মতো, যার অবস্থান ছিলো আমার মায়ের পাশাপাশি, কখনোবা তার উপরে!
সে মানুষটা এভাবে ফাঁকি দিয়ে হঠাৎ চলে যাবে স্বপ্নেও ভাবি নি। সারাজীবন শিখিয়েছেন উদ্ধত না হয়ে কিভাবে বিনয়ী হতে হয়, দুঃখ পেলেও কিভাবে ক্ষমা করে দিতে হয়, আঘাতে ভেঙে পরলেও কিভাবে টিকে থাকতে হয়, থৈ থৈ দিশেহারাতেও কিভাবে পাল তুলে সামনে এগোতে হয়, সর্বনিম্ন অস্ত্র দিয়েও কিভাবে সর্বোচ্চ নিরাপদের দূর্গ গড়তে হয়,
ছোট্ট একটা বুলি দিয়েও কিভাবে সমগ্রটা বুঝিয়ে দিতে হয়, অনেক কণ্টকাকীর্ণ পরিস্থিতিতেও কিভাবে মনুষ্যত্বের মুকুট পরে থাকতে হয়, কিভবে মানুষকে ভালোবাসতে হয়, কাছে রাখতে হয়, কিভাবে পরিবার-পরিজন স্বরূপ বাগানকে আগলে রাখতে হয়, পরিবারকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিতে হয়, তাঁর সমস্ত শিক্ষাটা ধারণ করার চেষ্টা করেছি, করবো।
যে একজন অপরিপক্ব কিশোরীকে করে তুলেছিলেন…
চৌকস গৃহিনী।
যে অকারণে মানুষকে উপকার করার মাঝে নির্মোহ আনন্দের উৎস খুঁজে পেতেন। তাঁর বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে মায়ের পরে স্থান দিতে ইচ্ছে হয় নি। মা আর শ্বাশুড়িমা ছিলেন আমার জীবন খেয়ার এপার-ওপার।
আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সহধর্মিণী, শ্রেষ্ঠ রমণী, শ্রেষ্ঠ মা, আমার শ্বাশুড়িমা (আম্মু) রওশনারা চৌধুরী।
মহিয়সী বেগম রোকেয়া, নবাব ফয়জুন্নেছা বা সুফিয়া কামালকে দেখার সৌভাগ্য হয় নি, কিন্তু সৌভাগ্য হয়েছিল এমন গুণিনের সান্নিধ্যে একুশ বছর পার করবার।তার বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তন আমাকে জলের মতো পাহাড়া দেবে।
তিঁনি আমাকে কতোটুকু ভালোবাসতেন কখনো প্রকাশ করতেন না আর সেজন্যেই সারাজীবন মনে হতো আমাকে আরো সঠিক হতে হবে।
সত্যি বলতে কী আমার ভেতরে যদি নূন্যতম ভালো কিছু সৃষ্টি হয়ে থাকে তার সমস্ত ক্রেডিট তাঁর।
তিনি তাঁর চার সন্তানকে বড় কোন আমলা বা বুদ্ধিজীবী বানাতে পারেন নি, যা পেরেছিলেন তা ছিল সত্যিকারের মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।
যা বর্তমান সমাজে অনেক ধনবান বা গুণবানরা পারে না।
আমার শ্বশুর (আব্বু) শফিউদ্দীন চৌধুরী খুব সহজ-সরল, আল্লাহভক্ত মানুষ ছিলেন। তাঁর ছোট মায়ের আবদারে বাবার প্রাপ্য সমস্ত সম্পত্তি দান করে দিয়েছিলেন তার অনুজ ভাইবোনদের।
ভাবতে পারেন, যেখানে আপন ভাইবোনেরা আজকাল সম্পত্তি নিয়ে হুলুস্থুলে মেতে ওঠে তিঁনি কতোটা উদারতার পরিচয় দিয়েছিলেন!
কে পারবে, খু্ঁজলে এক শতাংশ ও পাওয়া যাবে নাহ!
জীবনে এমন মহৎ ঝুটি জগতে বিরল! তারা সাধারণের মধ্যে ছিলেন অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী।
পৃথিবীর সমস্ত মেয়েই কোন এক সময় অন্য ঘরের বৌমা হয়, কিন্তু বিগত একুশ বছর তাঁদের সান্নিধ্যে থাকা জীবন আমাকে বিচিত্রভাবে সমৃদ্ধ করেছে। শ্বশুর-শ্বাশুড়ি কিভাবে আমার সত্যিকারের বাবা-মা হয়ে উঠলো সে গল্প করবো ধীরেধীরে।
আব্বু মারা যায় ২০১৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর, আর আম্মু গেলেন ২০২১ সালের ৩ আগস্ট।
আজ আর লিখতে পারছি নাহ! আমার কান্নাভেজা ভারী কণ্ঠশুনে আমার আম্মু(শ্বাশুড়িমা) কেমন করে যেনো বুঝে যেতেন!
আমার কিছু একটা হয়েছে!
আমি তাঁদের নিয়ে কতোটুকু লিখতে পারবো জানি না, তবে আমি জগতের সেই সৌভাগ্যময়ী বৌমা যাঁদেরকে নিজের বাবা- মায়ের উপর স্থান দিয়ে রাখবে আমৃত্যু।
মা আমাকে জন্ম দিয়েছেন, বড় করেছেন।কিন্তু আমাকে প্রকৃত মানুষ করেছেন আমার শ্বাশুড়িমা। আমার যতোগুণ, যতো অর্জন তাঁর সমস্তটাই তাঁদের আশীর্বাদ। আমি আসলে আব্বুর মৃত্যুতে অনেক কষ্ট পেলেও আবার কিছুদিন পর দাঁড়িয়ে উঠতে পেরেছিলাম।জানতাম যে ডালে আমার বাসা সে গাছটা তো আছে! কিন্তু এখন সে গাছটা আর নেই, সুতরাং আমি একটা ডানা ঝাপ্টানো পাখি ছাড়া আর কিছুই নই।
সবাইকে তাঁর মৃত্যু সংবাদটা সাথে সাথে দিতে পারি নি, দুঃক্ষিত, ক্ষমাপ্রার্থী। কারণ আমি পাথর ছিলাম!
মানুষটা নেই জেনেও এখনো তাঁর সাম্রাজ্য আমার ভেতরে আসীন!
সেই মহান আত্মাদ্বয়ের জন্যে প্লিয একটু দোয়া করবেন!
আমিও করবো কারণ ওইটুকু উপহার পাবার জন্যে তারা অধীর আগ্রহে বসে থাকবেন।

১১/০৮/২০২১