মৃৎময় মানবিক বোধ

একদিন মখমল হয়ে উঠবে এই সব মাটি,
আর মখমলে ছড়াবে পুরাণ দিনের মতো
শিল্পীরা তাঁদের গোপন বিলাস।
আমি কৈশোরের সেই আমাকে নিয়ে
আল ধরে হেঁটে যাবো
মৃৎপাড়ায় শিল্পীরা স্বপ্ন পোড়ালে যে
মেঠো গন্ধটুকু উঠে আসে তা শুঁকে নিতে।
আহ্!পরান পোড়া দগদগে ক্ষত
আহ্! সারি সারি স্বপ্নের টেরাকোটা
এই জীবন রেখে কৈশোরে মৃৎপাড়ার
বাসিন্দা হতে চেয়েছিলাম,
হতে চেয়েছিলাম মৃৎশিল্পীর ঘামার্ত
কাদায় মাখা শত কষ্ট লেহন করা মুখ,
তাই তো পালিয়ে ছুঁতে চেয়েছি মৃৎপাড়া,
মুগ্ধতা রেখে গেছি শাঁখা সিঁদুর
রমণীদের কোমল মনে।

পারিনি কখনোই কি ভীষণ যন্ত্রণা
রোজ রোজ প্রতিহত করে এটুকু বলতে,
বলতে চেয়েও থমকে গেছি
মাটি মেখে বেঁচে থাকার মধ্যে যে সুখ
সে আমার অট্টালিকায় মেলেনি।
তাই স্বপ্নের আবাস ভূমি বড় ফাঁকা,
এই ফাঁকা আবাস দেখলেই
বাসনারা ফালি ফলি করে সব অবসর,
খন্ডিত হয় পৌরানিক ইচ্ছের মতো ইচ্ছের তৈজস।

আজও পুব আকাশে সোনালি আলো
বিচ্যুরিত হলে ছুটে যাবার টানে মনটা
খাঁ খাঁ করে, ইচ্ছ করে ভোঁকাট্টা ঘুড়ি হয়ে
আমার সেই মোহন শাঁখা পলার শব্দ গহনে
বেঁচে থাকা প্রতিটি প্রাপ্তির মতো
কন্টকহীন শিল্পগুলো ছুঁয়ে আসি,
ছুঁয়ে আসি সরল মানুষের আদল।

ইচ্ছে সিঁড়ির যে ধাপগুলো
কিছুদিন আগেও বরষায় ছিলো টলটলে,
কারো পদধ্বনি শুনবার তীব্রতা ছিলো
ওমরের তলোয়ারের মতো সুতীক্ষ্ণ,
অনর্গল উঠে আসা সেই সিঁড়ি ছুঁলে মনে হয়
এই পথটুকু পেরুলেই মৃৎশিল্পীদের ক্ষীণ আলো ঘর।

শুধু এক ছুট, শুধুই এক ছুট, তারপর আমি ফের
এক মুঠো কাদা থেকে জন্মানো মানব।
আমার পূর্ব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ
অবগুন্ঠন, কঠিন বলয় সব তছনছ,
আর সব শিল্পকর্মগুলো শত শত বছর
পুরানো ময়নামতির গহিন থেকে তুলে আনা
ক্ষয়ে ক্ষয়ে বিকৃত অথচ অমূল্য সম্পদ।
…………………………………………..

আবেদন

আমায় তুমি লিখতে পারো শহর ভাঙা গান
ঠাণ্ডাপনির দেয়াল তোলা ন্যায়ের অভিমান।

আমায় তুমি দিতে পারো কড়াইশুটির ঘ্রাণ
কারাবক্ষে আগলে নিও বারান্দার এই প্রাণ।
…………………………………………..

ডুব

অনেকটা পথ এগিয়ে এসে হঠাৎ দেখি নেই
আঁধার জোড়া অন্য আঁধার শব্দ খুঁজি সেই।

আসবো না আর যায়নি বলে প্রাপ্য অপেক্ষা
গলির পরে শ্যাওলা জুড়ে নিরব উপেক্ষা।

যাবার পরে অনেক মুখে নৃত্য করে ঢেউ
দু’জোড়া চোখ একপকেটে বুঝেনি তা কেউ।

অনেকটা পথ এগিয়ে এসে হঠাৎ দিলে ডুব
আলোর পথে যাবার বুঝি তাড়া ছিল খুব?
…………………………………………..

দুঃস্বপ্ন ও একটি মৃত্যু

কে ওই পড়ে আছে জীবনের সীমানা ভেঙে
পথের পাখনায় যেতে যেতে ঠেলে ধরে চোরাই বাতাস
বৃষ্টিটা বুঝি বা ঝাপটে ছিল স্বপ্ন চোখের চৌকাঠ,

আহ্! পথ ভোলা ওকি মিলিয়ে নিচ্ছিলো
প্রণয়ের সূত্রগুলো গাণিতিক নিয়মে?
অথবা, স্বজনের করুণ মুখ ঝলসে উঠেছিল
বিভিষিকা রাতের জঠরে?
কেন সে জীবনের সীমানা ভাঙে ঝড়ের উৎসবে?

সকালেই লাশ! লাশ! খবরের ভিড় ঠেলে
পাড়াটা জেগে ওঠে দুঃস্বপ্নের ভেতরে।
…………………………………………..

পাঠ পরিক্রমা

পাঠ করো তৃণ থেকে ড্রাগনের শহর
রাত্রি চুরি করে নির্জনতায় জিইয়ে রাখি
নামটি মনের খুন করেই, আমিও পাঠ করেছি
লোহার ডগায় ঝড়ের মাতম
ভেতরে দৌড়েছে বিশ্বাসে তেজি অশ্ব,

সমাজের যতো পথ মাড়িয়েছি সব নিজের নয়
জেনেই গিয়েছি অনেক পুরনো নাম মুছে দিতে,
একবিংশ শতাব্দীর আঁজলায় জলের তিয়াস
গোপন করতে করতে বিকেল এসে
হানা দিল রূপলি রোদের আভায়,
জৈবিক টেবিলে সাজানো প্রয়োজনগুলো
বিস্ময়ে ছুঁয়ে যায় একচল্লিশতম পৃষ্ঠা,
হলো না প্রান্ত থেকে মুছে দেয়া পুরনো নাম,

পাঠ করো, পাঠ করো তোমরা,
সুগভীর পাঠেই উদ্ধার হোক
কবির অপমান, উপেক্ষা আর
আর দুপুরের ফুসফুস ভরা বিষাক্ত হাওয়া।
…………………………………………..

শব্দহীন অস্বীকার

ফিরে আসা নয়, নয় দেখতে আসাও
এ অনর্গল ভুলতে না পারার ব্যথা,

ভুল করো না দিতে চেয়ে কিছু
ভুল করো না সৌখিন বিছানা পেতে
পরিচ্ছন্নতাই টেনে আনে রোজ।

নরম পাতার বয়সদাগ
ক্ষমাতে মেনে নেয়ার তীব্র বাসনা
শীতল চোখের পর শব্দহীন অস্বীকার,

এ নয় ফিরে আসা আশ্রয়হীনের আশ্রয়ে
এ এক গলিত প্রেম মোহে নির্গত দ্রোহ।

একূলে জল ওকূলে অনল, দু’কূল পোড়ায় ক্রিয়ায়
অদৃশ্য অমিয় টানে ফেরা নয় পড়ে থাকা।
…………………………………………..

চোখ

চোখে বহুকাল মানুষ চেনার তৃষ্ণা
চোখ দুটি রাখি চোখে- গভীর শীতল
চোখ দুটি ফিরিয়ে নেই- দ্রোহ বিপ্লব
আহ্ মরণ!
বহুকাল মানুষ চেনার তৃষ্ণায়
ভিজে যাচ্ছে সোহাগের তানপুরা।

পথে-প্রান্তরে সকাল বিকেল চোখ খুঁজি
শিকারী পৃথিবী সূর্য ছাড়া কিছু বোঝে না
চোখ খুঁজি চাঁদের পিঠে, মঙ্গল গ্রহে
চোখের ভেতর মানুষ
চোখের ভেতর চোখ
খোঁজার তৃষ্ণা মিটে না।

অবশেষে চোখ রাখি চোখে
গভীর শীতল দ্রোহ বিপ্লব
মানুষ চেনার তৃষ্ণা মিটে না।
…………………………………………..

একটু সময় ধার দিয়ে যাও

একটু সময় ধার দিয়ে যাও; ধার দিয়ে যাও;
চাইলে পারো ধার নিতেও; পায়ের নখও পথ বাড়িয়ে;
ধার দেনাতে উঠুক ভরে সুঠাম দিন আর রাতের দুয়ার।

ঋণ রয়েছে একটা সাদা ধ্রুপদ হাতের;
ফসলীবীজ গন্ধ মাখা একটা মাঠের;
ঋণ রয়েছে তোমার মাগো শুকান রোদের। একজীবনের দরিদ্রতার কে পেরেছে যত্ন নিতে,
ঠিক যতটা নিজের চাওয়া; ঠিক যতটা নুনের ক্ষত?

তাইতো কেবল যাচ্ছে দেখো ধূলিমাখা সুবোধ বলয় বয়সীদের দেখতে জোয়ার, ঝড়ের মাতম গানের মতো;
যাচ্ছে অকুল; যাচ্ছে দহন; যাচ্ছে শিরার ঐ শিহরণ।

একটা জীবন ধার-দেনাতে উঠুক না হয় দুকূল ছেপে;
একটু সময় ধার দিয়ে যাও; ধার দিয়ে যাও;
চাইলে পারো ধার নিতেও; পায়ের নখও পথ বাড়িয়ে।
দেখো কেবল বৃত্ত ভেঙে শূন্যতা চায় স্বরূপ ছায়ার;
ধার পেলেই চর্চা হবে,চর্চা হবে,চর্যাপদের পাঠশালাটার।
…………………………………………..

গ্রহণের কাল কেটে যাক

গ্রহণের কাল কেটে যাক;
ধীরে ধীর আঁধার মুড়িয়ে নিক তার সব সুতো,
বাদুড়েরা ভোররাতে চলে যাক, চলে যাক নিজস্ব চত্বরে।
সব ছুটি ভোগ করে আমিও চলে আসি ফুলের নগরে।

তারপর একদিন গ্রহণের সুদীর্ঘ যাত্রা শেষ হলে
দেখবো বিকেলের হাওয়া আনছে বকুলের ঘ্রাণ;
অনেকের মন থেকে মুছে যাবে ছায়া,
কেউ তো অকাতরে ঝরাবে তখনও হিরক।

তুমি কি হিরক কণা নাকি বকুলের বিষণ্নতা,
দুর্ধর্ষপীড়িত চাঁদ?চুপি চুপি বলো,
যদিও আলতো ছুঁয়ে আছে সব অনুভব।

কেন আতরের ঘ্রাণ দুঃখের কাছে বন্ধক রেখে গেলে?
কেন গণতন্ত্রেররাষ্ট্রে আগুন ঝলসানো আত্মারাও আমারে কাঁদায়। কেন বারংবার মর্তের মেঘমালা
তোমাকে ভুলতে স্নেহের পরশ মাখায়?
লুণ্ঠিত বিবেকের শয্যায় ঘুমোতে চায় না
কেন কোন বীর? হারাতে হারাতে আজ ভালো জানি।

গ্রহণের কাল কেটে যাক ক্ষুধিত অবসাদ আমন্ত্রণ
করে আনুক পরিপক্ক বার্তা, অনুগত স্বপ্ন; শববাহকের কাঁধে চেপে চলে গেছে যে সত্য রূপসীস্বদেশ ছেড়ে।
…………………………………………..

দলিলের বুকে লিখতে চেয়েছো নাম

একদিন চেয়ে দেখি একটা বিপর্যয়
গর্বিত পদক্ষেপে ভাঙছে পৌরপথ;
তারপর বিবর্ণ ইতিহাস লিখে দিলো।
সব মেনে নিয়ে বললে-
কদাচিৎ জীবন হয় স্বর্গীয়, গমনকালে বেঁকে যাবে পথ,
নিজস্ব স্বপ্ন আঁকা সুবর্ণ গম্বুজে ওড়াও শৌখিন বাস্তব,
নান্দনিকতার পেছনেও হারায় গল্প,
সাধাসিধে জীবনের জন্য বিহ্বল ক’জন আজ,
তোমার নামে নিভে যাক আমার পৃথিবীর ঘৃণা, ক্রোধ।

সেই থেকে আমারও অসত্য মাড়িয়ে জাপন,
সন্ধ্যার বারান্দা প্রশস্ত হয় পূর্ণ চাঁদের অবিকল;
একের পর এক নেমে আসে রঙিন উদ্যান,
সুগন্ধি সবুজে মিশে সফেদ পালক।

হঠাৎ তোমার জন্য নিরুৎসাহিত হলো প্রকৃতি,
রোজ কেবিনের সাদা বিছানায় শুয়ে
যে চোখ তুমি খোঁজ, যে হাতের স্পর্শ তুমি চাও,
সে দুরন্ত মরুর সোনালি তাপে পুড়ে পুড়ে
অন্তক্ষরণের পরও অপেক্ষায় আছে
তুখোড় দাউ দাউ শেষে ঈশ্বরের কৃপা যদি হয়।

স্বজনেরা জানে না এখনও কারে তুমি চাও,
কার জন্য ভাবছো রোগের হোক পরাজয়,
কার জন্য দলিলের বুকে লিখতে চেয়েছো নাম।
না জানুক কিছু কেউ, জমে থাকুক বরফের ক্ষতে সব,
সমস্ত গড়মিলও পড়ে থাক; শুধু একবার ভালো হয়ে
এসো, অজস্র স্বপনের গায়ে রঙধনু জেগে আছে।