আহলান ওয়া সাহলান রহমত, বরকত, মাগফেরাত ও নাজাতের মাস রমজান। মূলতঃ রমজান মহাগ্রন্থ কুরআন নাজিল, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাস, কদর ও বদরের মাস। রমজান আরবি সকল মাসের সেরা মাস। মক্কা বিজয় এবং জুমাতুল বিদার মাসও বটে। যাবতীয় প্রবৃত্তি দমন করে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের মাস। এ রমজান মাসটি খাস করে মু’মিনদের জন্যই আবশ্যক করা হয়েছে। ইচ্ছে করলেই যে কেউ সিয়াম সাধনা করতে পারবেন না, যতই বড় শক্তিশালী হোন না কেন! ডোনাল্ড ট্রাম্প, পুতিন, মোদীদের জন্য রোজা আবশ্যক নয়। তবে উপবাসব্রত পালন করতে পারবেন, যার সাথে মু’মিনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত দয়াপরবশ হয়ে মু’মিনদেরকে এ মাসে কিছু স্পেশাল অফার দান করেছেন। আমরা সাধারণত দেখি মোবাইল কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার জন্য রাতের বেলায় অনেক অফার/ডিসকাউন্ট ফ্রি দিয়ে থাকেন। রোজার এ অফার, প্রণোদনা বা মোটিভেশন যে নামেই অভিহিত করুন না কেন সব ইবাদতই রাতের সাথে রিলেটেড। আসুন মহান প্রভু রমজানে কি কি অফার মু’মিনদেরকে দিয়েছেন।

প্রণোদনা বা অফারসমূহ:

১. কিয়ামুল লাইল:
মাহে রমজানের একটি গুরুত্ববহ নফল ইবাদত হচ্ছে কিয়ামুল লাইল বা রাত্রি জাগরণ।’ হযরত আবু হুরায়রা (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সওয়াবের লাভের আশায় পূর্ণ ঈমানের সাথে রমজান মাসের রাতে ইবাদত করে, তার পূর্ববতী সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়।’ (বুখারি ও মুসলিম)
শায়খ আবদুল্লাহ বিন বায (রহ) বলেন, ‘এশার সালাতের পর যে সালাত আদায় করা হয় তা-ই কিয়ামুল লাইল। তারাবিহ, তাহাজ্জুদ ও বিতরের সালাত সাধারণার্থে কিয়ামুল লাইলের অন্তর্গত।’
তারাবিহ সালাত-
তারাবিহ অর্থ বিশ্রাম করা বা বিরতি দেয়া। বিশ রাকা’আত সালাতে চার রাকা’আত পর পর বিশ্রামের জন্য বসা হয়, তাই একে তারাবিহ সালাত বা বিশ্রামের সালাত বলে। তারাবির সালাত সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ। বিনা ওজরে তারাবির সালাত ত্যাগ করলে সে গুনাহগার হবে। যে রাত থেকে রমজানের চাঁদ দেখা যাবে সেদিন থেকে তারাবির সালাত পড়তে হয় এবং ঈদের চাঁদ দেখা গেলে আর পড়তে হবে না।

রাসূল সা. কখনো ৮ রাকাআ’ত, ১২ রাকাআ’ত ১৬ রাকাআ’ত বা ২০ রাকাআ’ত আদায় করেছেন। নির্দিষ্ট করে দেননি। এর কারণ ছিল তিনি নিয়মিত তা করলে উম্মতের জন্য তা ওয়াজিব হয়ে যেত। অবশ্য আমিরুল মোমেনিন হযরত উমর ফারূক রা.এর আমল থেকেই ২০ রাকাআ’ত তারাবিহ সালাত পড়া শুরু হয়। উম্মতে মোহাম্মদি সা.এর মধ্যে ২০ রাকা’আত তারাবিহ সালাতের ব্যাপারে ঐক্যমত আছে।

তারাবির সালাত দেশের প্রায় সকল মসজিদেই হাফেজগণ কর্তৃক কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে মুসল্লিগণ আদায় করে থাকেন। একেক মসজিদে তারাবি সালাতের ধরন একেক নিয়মে হয়ে থাকে। কোথাও ৮ দিনে, কোথাও ১০, ১৪, ২০, ২৬ দিনে খতম তারাবিহ সালাত পড়া প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হচ্ছেন। অতি তাড়াতাড়ি কিরআন পাঠের ফলে মুসল্লিগণ পাঠ বুঝতে পারেন না। অবশ্য এজন্য হাফেজদেরকে মসজিদ কর্তৃপক্ষ বাধ্য করে থাকেন। কুরআন তেলাওয়াতের এই মৌসুমে না বুঝে ‘থ্রি জি/ফোর-জি’ গতিতে তেলাওয়াত করায় আমরা কুরআনের আসল প্রাণসত্তা অনুধাবন করতে পাচ্ছি না। আল্লাহ কি জন্যে কুরআন নাজিল করেছেন তার উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশের সকল মসজিদে একই পদ্ধতিতে তারাবিহ সালাত আদায় করলে সবার জন্য ভালো হতো। ২৬শে রমজান খতম করার লক্ষ্যে প্রথম ৬দিন দেড় পারা করে ৯ পারা, ৭ম দিন থেকে ১ পারা করে পড়লে খতম আদায় হয়ে যায়। ফলে মুসল্লিদের সবাই যে যেখানে যাই না কেন একই পদ্ধতিতে হলে একজন লোক যেখানে যাক না কেন তার মাঝখানে কুরআন শুনা থেকে বাদ পরার সম্ভাবনা থাকে না। আশাকরি বিষয়টি সচেতন মুসল্লি ভাইগণ ভেবে দেখলে সবার জন্য কল্যাণকর হবে।

২. এতেকাফ:
এতেকাফ আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম উপায়। এতেকাফ অর্থ অবস্থান করা, কোনো স্থানে থেমে যাওয়া। ইসলামি শরিয়তে পরিভাষায় এতেকাফের অর্থ হল, জাগতিক সকল কর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরিবার-পরিজন থেকে আল্লাহর উদ্দেশ্যে একান্তভাবে ইবাদত করার জন্য মসজিদে অবস্থান করা। একজন মুসলিম তার যাবতীয় কার্যক্রম, চিন্তা-চেতনা, কামনা-বাসনা, মেধা ও শ্রমের ব্যবহার এবং নিজ যোগ্যতাকে কিছু দিনের জন্য মহান প্রভুর স্মরণে নিয়োজিত করে ঈমান ও আমলকে বৃদ্ধি করবে। এভাবে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ধন্য হবে, বিশুদ্ধ নিয়তে যথাযথ আমলের মাধ্যমে। এতেকাফের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আল্লামা ইবনুল কায়্যিম বলেন, “গায়রুল্লাহর মোহময় বেড়াজাল থেকে মুক্তি লাভ করে আল্লাহর সাথে গভীর ও প্রেমময় সম্পর্ক স্থান করে।”

মাহে রমজানের শেষ দশক খুবই গুরুত্বপূর্ণ সিয়াম পালনকারীদের জন্য। আল্লাহর রাসূল সা. শেষ দশককে খুবই গুরুত্ব দিতেন। মাহে রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া (সুন্নাত)। একটি মসজিদের মুসল্লিদের মধ্য থেকে কাউকে না কাউকে এতেকাফ করতেই হবে, নয়তো সবাইকে গুনাহগার হতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা রা. বলেছেন, রাসূল সা. প্রতি রমজানে শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন। কিন্তু যে বছর তিনি ইন্তেকাল করেন, সে বছর বিশ দিন এতেকাফ করেন। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

৩. লাইলাতুল কদর:
লাইলাতুল কদর অর্থাৎ মহিমান্বিত রজনী সাধারণভাবে শবে কদর নামেও অভিহিত। আরবি শব্দ ‘লাইল’ ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘কদর’ অর্থ মর্যাদাপূর্ণ, মহিমান্বিত, সম্মানিত। সুতরাং লাইলাতুল কদর এর অর্থ সম্মাণিত বা মহিমান্বিত রাত। বৎসরের এই রাতটি আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জতের কাছে সর্বাপেক্ষা মর্যাদাপূর্ণ রজনী। উম্মতে মোহাম্মদি সা.এর নিকট এটিও আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে বিশেষ অফার। আমাদের দেশে ২৬শে রমজান দিবাগত রাত তথা ২৭শে রমজানকেই নির্ধারণ করে পালন করা হয়। ইসলামি চিন্তাবিদ ও গবেষকগণও বেশির ভাগ ঐ দিনকেই সমর্থন করেন। উবাদা ইবনে সামেত রা. হতে বর্ণিত আছে, রাসূল সা. বলেছেন, “কদরের রাত হল রমজানের শেষ ১০ রাতের মধ্যে এক বেজোড় রাত। অর্থাৎ হতে পারে তা ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯-এর মধ্যে যে কোনো রাত।” (মুসনাদে আহমাদ)
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন, “লাইলাতুল কদরকে তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতের মধ্যে বেজোড় রাতে তালাশ কর।” (বুখারি, মুসলিম ও তিরমিযি) তাই আমাদেরও উচিত শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে ইবাদত করা।

রাসূল বলেছেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও আখেরাতে মুক্তির আশায় এ রাতের ইবাদত করবে আল্লাহ তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেবেন।” (বুখারি)
রাসূল সা. নিজের পরিবারবর্গকে রাতে ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগিয়ে দিতেন এবং সাহাবারাও তা ইত্তেবাহ করতেন। তাই আমাদেরও উচিত রাসূল সা.এর যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমে কুরআন নাজিলের এই মাসে বেশি বেশি কুরআন পাঠ, দান-সদকা, তওবা-ইস্তেগফার, যিকির-আযকার এবং নফল ইবাদত করা।
হযরত আয়েশা রা. বর্ণনা করেন, “আমি একদা রাসূল সা.কে জিজ্ঞেস করলাম? আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কি দোয়া করব? তিনি বললেন,
“আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি।’’
অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি মহীয়ান, ক্ষমাশীল। ক্ষমা করতেই তুমি ভালোবাসো, আমাকে ক্ষমা কর। আসুন আমরা সবাই এই মহিমান্বিত রাত এবং পুরো রমজান মাসের অফার সমূহকে কাজে লাগাই। ইবাদত বন্দেগি করে, আল্লাহর দরবারে খালেস তওবা করে অতীতের কৃত গুনাহ থেকে ক্ষমা চেয়ে জীবনকে পুত-পবিত্র করে তুলি এবং আল্লাহর নিজের হাত থেকে সরাসরি পুরষ্কার গ্রহণ করে চিরকাঙ্ক্ষিত জান্নাত লাভ করি।