আমরা রমযানের মাসে রোযা রাখি। মুসলিম হিসেবে রোযা ঈমানের ৫টি ভিত্তির ৩য় ভিত্তি। আল কুরআনও সুরা রাকারাহ-র ১৮৩ নম্বর আয়াতে জানিয়েছে, ‘‘হে মুমিনগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরয করা হয়েছে যেমনি ফরয করা হয়েছিলো তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে সক্ষম হও।’’

তাকওয়া অর্জন করার জন্য রোযা ফরজ করা হয়েছে। ‘তাকওয়া’ শব্দটির মূল অর্থ ‘রক্ষা করা।’ এর অনুবাদ করা হয়েছে নানাভাবে। যেমন পরহেজগারি, আল্লাহর ভয়, দ্বীনদারি, সৎ কর্মশীলতা, সতর্কতা প্রভৃতি। আবার আরেক অর্থে বল যায়- ‘‘আল্লাহর নির্দেশমতো তাঁর আনুগত্য করা ও তাঁর কাছে ‎সাওয়াবের আশা রাখা এবং তাঁর নির্দেশ মতো তাঁর নাফরমানী ত্যাগ করা ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করাই তাকওয়া।”

তেমন তাকওয়ার চাইতে আমরা রোযা পালন করি অনেকটা‎ উৎসবীয় আমেজে। হোটেল-রেস্তোরায় বাহারি ইফতারের পসরা আমাদের রোযাদারদের জন্যই থাকে সাজানো। সাহরির জন্য এ মাসে থাকে উত্তম ও রকমারি খাবারের আয়োজন। মসজিদে মসজিদে ঘটা করে তারাবিহর আয়োজন। এর সাথে সারা রমযান জুড়ে থাকে শপিংয়ের মতো লোকদেখানো আনন্দায়োজনের। ‘ইফতার পার্টি’- আরেক সংস্কৃতি আমাদের রোযায়। বাড়ি, এলাকা, মহল্লা, অফিস, রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে কর্পোরেট ইফতার পার্টির বিশাল আনন্দায়োজন। রমযানের এমন ধারাবাহিকতা আমরা ছোটবেলা থেকেই বংশপরম্পরায় দেখে আসছি। তাহলে তাকওয়া কোথায়?

কিন্তু এবার? এবার এর ব্যতিক্রম। এবার নেই ইফতারের পসরা। নেই সাহরির জন্য বাহুল্য বাজারের সুযোগ। নেই শপিংয়ের আনন্দায়োজনের। আমরা সবাই আজ গৃহবন্দি। গৃহবন্দি পুরো বিশ্বের জনপদ। মসজিদে এবার তারাবিহ হবে না। ইফতারের উৎসবও হবে না। কর্পোরেট ইফতার পার্টির কোন তোড়জোড়ও নেই। এবার এক অন্য রকম রমযান। আমাদের জীবনে এমন ব্যতিক্রমী রমযান আমরা আর পাইনি কখনো। আমাদের পূর্বাপর কেউ পেয়েছন- তাও জানাতে পারেননি কেউ।

ফিরে দেখি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম রমযান। রমযান মাসে রোজা রাখার বিধানের আদেশ হয় রাসুলাল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার দ্বিতীয় বছর। শা’বান মাসে আল্লাহ্ জানিয়ে দিলেন পরের মাসে রোজা রাখতে হবে। সেসময় মদিনার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ছিল খুবই সংকটাপন্ন। মদিনায় সেসময় আওস আর খাজরাজ নামে দুই গোত্রের বাস ছিল। শতবছরের গৃহযুদ্ধে তারা লিপ্ত ছিল। মদিনায় ইসলাম আসার পর তাদের সেই বহুবছরের গৃহযুদ্ধ থেমেছে মাত্র; কিন্তু এই গৃহযুদ্ধে মদিনার অর্থনীতি বলা যায় পুরোপুরিই ধ্বংস হয়ে গেছে। এই সময়ে মক্কা থেকে হিযরত করে আসা একদম নিঃস্ব মুসলমানদের দায়িত্ব নিতে হয়েছে এই মদিনাবাসীদেরই। এরই সাথে রয়েছে মক্কার শক্তিশালী আর সম্পদশালী কুরাইশদের নানা হুমকি। এমনি সংকটাপন্ন সময়ে আসে রমযানের হুকুম। মুসলমানদের জীবনের প্রথম সিয়াম সাধনা। ঠিক সেসয়েই মধ্য রমযারে এলো ইসলামের ইতিহাসে প্রথম যুদ্ধ- ‘বদর যুদ্ধ’। প্রচণ্ড শক্তিশালী কুরাইশদের বিরুদ্ধে নিঃস্ব মুসলমানদের অসম এক লড়াই। অর্থনৈতিক দূর্যোগ, নতুন একটা জাতির অনিশ্চিত যাত্রা আর এক প্রবল পরাক্রমশালী শত্রুর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ নিয়েই ইসলামের প্রথম রমযান এসেছিল ঈমানের আরেক পরীক্ষা নিতে। সেদিন ‘তাকওয়া’ আর আল্লাহর নৈকট্য লাভের অদম্য বাসনাই সেই রমাযানে ছিল মুসলমানদের পথ দেখানো প্রথম রোযা। বিজয়ী হয়েছিল মুসলমান আর সেদিনের রোযা।

প্রায় ১৫০০ বছর হয়ে গেছে সেই ‘তাকওয়া’ আর আল্লাহর নৈকট্য লাভের রোযা।

আজ এ বছর ১৪৪১ হিজরি তথা ২০২০ সালের মনে হয় তেমনি অর্থনৈতিক দূর্যোগ, বিশ্বজাতির অনিশ্চিত যাত্রা আর এক প্রবল পরাক্রমশালী অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধ নিয়েই রোযা হাজির হয়েছে। এখন দরকার ‘তাকওয়া’র সাথে রোযা পরিপালন। আসলে রমযান ইফতারপার্টি আর শপিংউৎসবের মাস নয়। এই মাস আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের মাস। এ মাস আমাদের মুত্তাকি হবার মাস। এ মাস কুরআন নাযিলের মাস। আল্লাহ্ এভাবেই রমযানের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়েছেন। আর আমরা সে শিক্ষা থেকে দূরে সরে গিয়েছি চেতন কিংবা অবচেতন- যেভাবেই হোক।

এবারের রমযানে কোনো চাপ নেই ইফতারপার্টি কিংবা শপিংয়ের। নেই ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। ইসলামের প্রথম রমযানের মতই আজ আমরা প্রচণ্ড সংকটে আছি সর্বদিক থেকে। ঘরে আবদ্ধ এ সময়ে আসুন আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য তাকওয়া অর্জনের উপলক্ষ করি এবারের রোযাকে ইসলামের প্রথম রোযার মতই।

আসুন এবারের রোযায় কুরআন অধ্যয়ন ও চর্চা করি। নফল ইবাদতের মাধ্যমে নিজেকে পরিশুদ্ধ করার আন্তরিক চেষ্টা চালাই। লোক দেখানো কাজ পরিহার করে একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টিবিধানে হুক্কুল ইবাদ করি। আল্লাহ্ এখন এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে অসাধারণ এই সুযোগ দিয়েছেন আমাদের অতীতের সকল সীমালঙ্ঘনের জন্য ক্ষমা চেয়ে নিয়ে তার নৈকট্য লাভের জন্য। এবারের রমযান তেমন তাকওয়া অর্জনের উপলক্ষ হোক সকলের জন্য।

[সংগৃতি ও নামহীন একটি স্ট্যাটাসের কিছুটা ভাব অবলম্বনে]
২৫ এপ্রিল ২০২০