বলতে বলতে রমযান এসেই পড়ল। তবে এবছর খুব ধুম একটা নজর কাটছেনা। মানুষের মুখে সেই আগের রমযানের ইমেজ দেখা যাচ্ছে না। মাস খানেক আগে থেকে কর্ম অচল আগের সেই পরিকল্পনা; কোনদিন কোন তরকারি রান্না হবে তা মেন্যু নেই। সামনে যা আছে তা নিয়ে চলতে হবে।রমযান শুরু হতে না হতেই মার্কেটিং এর অলিগলিতে ঘুরাঘুরি। কাপড় কোনটা রেখে কোনটা চয়েজ করবো। দু একবার মার্কেটে না গেলে মনে হয় ঈদটাও ফিকে হয়ে যেতে পারে।পকেটে টাকা থাকুক বা না থাকুক শখ বলে কথা আছে। এবার সেরকম পরিবেশ দেখবো বলে মনে হয় না। নিরামিষ ভাবে ঈদটা কেটে যাবে। হয়তো আল্লাহপাক আমাদের পরিক্ষা নিচ্ছেন। তারপরেও হয়তো কোন দুঃখ বোধহয় থাকবে না। যদি করোনা থেকে মুক্তি পেয়ে পাখিগুলো মুক্ত আকাশে উড়াল দিবে। আবারো মুক্তঘোড়া প্রান্ত থেকে প্রান্তর দাপিয়ে বেড়াবে। কোয়ারেন্টাইনে কাটাচ্ছেন তো অনেকদিন হয়ে গেলো। অনেকে কিছু একটা করবেন করবেন ভাবছেন ; ভাবতেই আছেন কার্যতঃ কিছুই করা গেলো না। দ্বীন দুনিয়া উভয় দিক থেকে মনে হয় অবসাদ ক্লান্তিতে আছেন। কিভাবে দুর করবেন ভেবে কুল পাচ্ছেন না। রমযান মাস হলো মহাপবিত্র মাস আরবি’ রময’ শব্দের অর্থ ভস্ম করে দেয়া, জালিয়ে দেয়া। কারণ রমযান মাসের সিয়াম সাধনা আমাদের অন্তরকে কলুষমুক্ত করে পাপসমুহকে জালিয়ে দেয়। আত্মসংযম ও আত্মগঠনের মাস রমযান যে মাস আমাদের ঈমানী চেতনাকে নবায়ন করতে, আমালের ঘাটতিকে পরিপূর্ণ রুপ দিতে। হাক্কুলল্লাহ ও হাক্কুল ইবাদকে পুষিয়ে দিতে সুযোগ সৃষ্টি করেছে।কারণ এই মাসের প্রস্তুতির জন্যে রাসূল সঃ দু মাস আগে থেকে দুআ করতেন ” আল্লাহুমা বারিকলানা ফি রাজাবা ও শাবান ও বাল্লিগনা রামাযান” সাহাবায়ে কেরামগণ রমযানে কিয়ামুল লাইল অতিবাহিত করতেন অনেকের পা ফুলে যেত।

দ্বীনের কথায় আসি নামায পড়া শুরু করেছেন। আরো অনেক কিছু করার পরিকল্পনা ইতিমধ্যে হাতে নিয়েছেন। ভাবছেন কোয়ারেন্টাইন কে কুরআন টাইম হিসেবে কাজে লাগাবেন। কুরআন শরিফটা একবার খতম দেই।ছোট ভাই ভাবছে অনেকবার খতম দিলাম একবারও তো তাফসির পড়ে দেখলাম না ওখানে কি আছে? যেটা একবার অর্থসহ তাফসির পড়ি দেখি না। হাতে তো যথেষ্ট সময় পেলাম একটু মেহনত করি। দেখাদেখি চাচা ভাবছে মুই তো কুরআন শরিফ পড়তে পারি না বসেই তো আছি। হায়াতের বাজেটও কতদিন আছে জানি না অনেক কিছুই করলাম এটাতে করা হলো না। যদি ছবক শুরু করি কিছু তো পারব অযথা মিস করতে যাবো কেন। নামাযে যে ক’টা সূরা পড়া লাগে ওগুলো তো হেফয করতে পারি। পাশের লোক বলছে হয়তো পড়ার সেই সুযোগটা আমার হবে না। অনেকে তো কুরআন পড়ে সুন্দর সুমধুর কন্ঠে তেলাওয়াত করে শুনতে তো পারি। হ্রদয়টা প্রশান্তিতে ভরে যাবে। সারাবছর অনেক ডাকাডাকির পর ফজর নামায পড়ি তাহাজ্জুদ তো পড়া হয় না এখন সেহেরী খেতে উঠবো একটু আগে উঠলেই তো তাহাজ্জুদটা পড়া যায়। তাছাড়া রমযানের কিয়ামুল লাইলের বিশেষ মর্যাদার কথা শুনেছি কাজটা কিন্তু মন্দ না সময়টা বিনিয়োগ করা যাবে মহান প্রভূর সান্নিধ্যে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি নামায রোযার মতো অনেক গূরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাসআলা মাসায়েল এখনো জানি না। কেউ জিঙ্গাস করলেও বলতে পারি না আমাদের প্রিয় হুজুরটাও কিন্তু রমযান উপলক্ষে বাড়ি এসেছে। তাছাড়া এখনতো তথ্যপ্রযুক্তির যোগ গুগলে সার্চ দিলে উত্তর মিলে। কিছুটা সময় ওখানে ব্যয় করতে পারি। প্রত্যেক মানুষের জীবনে আইডল মডেল বলতে কিছু থাকে। আপনার আইডল যদি মুসলমান হিসাবে রাসূল সঃ, সাহাবায়ে কেরামগণ হয়ে থাকে তাহলে উনাদের জীবনদর্শন, চরিত কেমন ছিল জানতে ইচ্ছে করে না? রমযানের সময়টাকে মোক্ষম সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাতে পারেন। হয়তো জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর ওখানে পেয়ে যাবেন। আপনার চাওয়া পাওয়ার এতো বৈপরিত্য, দুঃখ, ক্লান্তিতে মনটা অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। দুনিয়ার সমাধান আপনার মনটা প্রশান্তি পাচ্ছে না। আল্লাহর রাসূলের বাস্তব জীবনিতে পেয়ে যাবেন। সারাবছর একা খায়। বিশেষ দাওয়াত ছাড়া একসাথে খাওয়ার সুযোগ তো হয় না।শুনেছি কাউকে ইফতার করালে সমান সওয়াব পাব সে যতটুকু সওয়াব পাব। আমি ঐ সওয়াব থেকে নিজেকে মাহরুম করবো কেন। আমি তো পারি একসাথে প্রতিবেশীদের সাথে ইফতারিতে শরিক হতে। পাশে দুয়েক গরিব প্রতিবেশি আছে দেখি যে কাঠফাটা রোদে ভ্যান চালাচ্ছে ঘাম বেয়ে বেয়ে পড়ছে কাপড়টা ভিজেই গেছে। ভাবলাম আমার খাওনের পরে পাঁচ শতেক টাকা হাতে থাকে যদি দিয়ে দেই। সে অন্তত পক্ষে কিছুটা স্বস্তি পাবে। কারণ এই মাসে সবচেয়ে দানের সওয়াব পাব। রমযানে এমন কতেক রোযাদার আছে তারা শুধু উপবাস থাকেন ইমানও ইহতেসাবের সাথে যথাযথ সাওম পালন হয়নি । রাসূল সঃ এরশাদ করেছেন, রোযা হচ্ছে ঢাল স্বরুপ, রোযাদার না খারাপ কথা বলবে, না ঝগড়া করবে,তার সাথে কেউ ঝগড়া করলে বলবে আমি রোযাদার -(বুখারী -১৯০৪) ঢাল যেমন যুদ্ধাকে তীর, ধনুক বল্লমের আঘাত থেকে রক্ষা করে রোযাদারকে ও রক্ষা করে গুনাহ থেকে। হযরত জাবের রঃ হুযুরে পাক সঃ এরশাদ করেছেন, পাঁচটি ব্যাপারে রোযাদারদের সতর্ক অবলম্বন করতে হবে। যেগুলো সাধারণত রোযাকে ধ্বংস করে দেয়, মিথ্যা কথা বলা, চোগলখুরি করা,পেছনে নিন্দা করা,মিথ্যা কসম করা,কামভাব নিয়ে দৃষ্টিপাত করা। রোযা কি হালাল থেকে উপবাস থাকার নাম? চোখের রোযা যাবতীয় যাহা নিন্দনীয় তার থেকে বিরত থাকতে হবে। রসনার রোযা যা দ্বারা এমন কিছু অনর্থক কথা মুখে আনবে না। কানের রোযা এমন কিছুই শুনবে না যা শোনলে গুনাহ হয়। অঙ্গপ্রত্যঙ্গের রোযা যা দিয়ে খারাপ কোন কর্ম সংগঠিত হয়।হালাল রিযক বলতে যা বুঝায় তার থেকে বিরত থাকতে হবে। যারা এ কুরআনা নাযিলের মাসকে বিশেষ গূরুত্বের সাথে পালন করবে। আল্লাহপাক তাদের স্পেশালিটির জন্যে রাইয়ান নামক একটি জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত রাখবেন। দেহ এ আত্মার নিয়ত্রণ সম্পর্কে আবুল হাসান আলী নদভী বলেছেন, দেহ ও আত্মার ভারসাম্য ব্যতিত মানবসমাজের পক্ষে খেলাফতের গূরু দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’। আমল করলেও চলে যাবে না করলেও চলে যাবে এই সিয়াম সাধনার মাস। রমযান থেকে কতটুকু শিক্ষাগ্রহণ করেছি, এখানে শুধু ধনীর নয় গরীবদেরও শিক্ষা আছে সে কতটুকু ধৈর্যশীল হয়েছে। কিছু গরীবদের জন্যে আপসোস! কত কষ্ট করে ভ্যান টানতে টানতে সমস্ত শরীর চুপসে গেছে ফরযিয়্যাতটা তার ভিতর নাই। সে একটু নিবেদিত হলে আদায় করতে পারে তার এ কষ্ট সওয়াবে রুপান্তরিত হয়ে যায়। ধনীদের হলো সে কতটুকু ত্যাগের মনমানসিকতা তৈরি করল। তার ধন ও মন ইসলামের জন্য কতটুকু নিবেদিত হতে পেরেছে। তাকওয়ার মাপকাঠিতে নির্ণয় করে আমাদের আ’মালসমূহ সাজাতে হবে। খুলুছিয়্যাত প্রাধান্য দিতে, রুয়িয়্যাত কে নয়।লাইলাতুল কদর কুরআনের কারণে এই দিনের এতো মর্যাদা সে দিনটি কি বারে হতে পারে আল্লাহতায়ালা ভালো জানেন।এই জন্যে খুঁজতে বলা হয়েছে যাতে পুরো রমযান ইবাদতে কাঠানো যায়। ইতেকাফ অত্যন্ত গূরুত্বপূর্ণ। হযরত আয়েশা র বলেছেন, রাসুল সঃ শেষ দশদিন এতেকাফ ছাড়া থাকতেন না। নিজেকে কুরআন ও মসজিদপ্রেমি তৈরি করবার দারুণ সুযোগ। যিকির ও দোয়া যেগুলো হাটঁতে, বসতে, কাজ করতে পড়া যায়, সুবহানআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ,লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আকবর, লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। আল্লাহপাকের ভয় নিজের ভিতর জাগ্রত করতে পারলে রোযার উদ্দেশ্য সফল হয়। ত্রিশটি রোযা রাখা তেমন কঠিন নয়,সফরে কিংবা অসুস্হ থাকলে রুখসত দেয়া হয়েছে। সবশেষে আল্লাহপাকের কাছে ফরিয়াদ এই রমাযান মাসকে কাজে লাগিয়ে যাতে নিজেকে পরিশুদ্ধ করতে পারি। আমিন