রমাদান হলো আত্মশুদ্ধির মাস, ধৈর্যের মাস, সহানুভূতির মাস, কাম-ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎকর্য নামক ষড়রিপু বশীভূত করার মাস। রমাদান রহমতের মাস, মাহফিরাতের মাস, দোযখ থেকে নাজাতের মাস। রমাদান প্রতি বছর আসে পাপ-পঙ্কিলতায় জর্জরিত মানব জাতিকে সীমাহীন রহমতের ছায়ায় চির শান্তির আবাস জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিতে।
এই সে মাস, যে মাসে নাযিল হয়েছে পবিত্র কুরআন, যে মাসে মুমিনের রিযিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়, যে মাসে প্রত্যেকটি ফরয ইবাদাতের সওয়াব অন্য মাসের চেয়ে সত্তরগুন বৃদ্ধি করা হয়, যে মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ পাকের তরফ থেকে মাগফিরাত দানের কথা ঘোষণা করা হয়, যে মাসে কবরের আজাব বন্ধ করে রাখা হয়।
শাবান মাসের বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম আকাশে একফালি বাঁকা চাঁদ উদিত হওয়ার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের মুসলমানদের দ্বারে ফিরে আসে মহিমান্বিত এ মাস রমাদান। হিজরি বছরের নবম মাস রমাদান বা মাহে রমাদান। সারা পৃথিবীর মুসলিম সম্প্রদায় এ মাসকে পেয়ে বেশ আনন্দিত ও আশান্বিত হয়। কারণ এ মাসের ফযিলাতের মাধ্যমে তামাম পৃথিবীর মুসলিম সম্প্রদায় মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে থাকেন।
রমাদানই একমাত্র মাস, যার নাম উল্লেখ করে কুরআনে বলা হয়েছে, “রমাদান মাস, ইহাতেই কুরআন মাজীদ নাযিল করা হয়েছে।” [সূরা বাকারা : ১৮৫]
রহমত, বরকত আর নাজাতের সওগাত নিয়ে এটি ধনী-গরীব, ছোট-বড়, আরব-অনারব সবার কাছে ফিরে আসে। এ মাসে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে মুমিন মুসলমানরা তাদের ঈমানি চেতনা জাগ্রত করে এবং আত্মশুদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে আল্লাহর নিবেদিত বান্দা হওয়ার মহান সুযোগ লাভ করে।
পবিত্র রমাদানের ফযিলাত প্রত্যেক মুসলমানের জন্য নিয়ামাতসরূপ। ইসলামের পাঁচটি রোকনের মধ্যে সিয়াম পালন তৃতীয় স্তম্ভ। পবিত্র রমাদান মাসে সিয়াম পালন করা ফরয করা হয়েছে। ইবাদাত পালনের মধ্যেই মানুষের সর্বাধিক ত্যাগ-সংযম, ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতার প্রমাণ মেলে এবং শারীরিক-মানসিক ও নৈতিকতাসহ সবক্ষেত্রে পবিত্র রমাদানের রহমাত, নিয়ামাত ও সাওয়াব অর্জন হয়।
পবিত্র সিয়াম সাধনার মাস রমাদান। বিশ্বের সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমানের কাছে এ মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। পার্থিব লোভ-লালসামুক্ত থাকা, ত্যাগ-সহিষ্ণুতার সাধনা করা এবং মানবিক মূল্যবোধে তৈরি হওয়ার প্রশিক্ষণে এ মাসের গুরুত্ব অপরিসীম।
মানবিক জীবনকে সুন্দর ও পারলৌকিক মুক্তির নিশ্চয়তা দেয় রমাদানের সিয়াম সাধনা। পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সৌহার্দ্যবোধের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধির মহান শিক্ষা অনুশীলনে পবিত্র রমাদানের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সত্য-অসত্য, পাপ-পূণ্য এবং ভালো-মন্দের যথার্থ উপলব্দির মাধ্যমে মানব জীবনকে মহীয়ান ও সফল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যেই রমাদানের আগমন। এ মাসের ত্যাগ ও সংযমের মহান শিক্ষা আমাদের জন্য রহমত ও বরকতের পাল্লা ভারী করে। অন্যদিকে সমাজ জীবনে সাম্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রমাদানের গুরুত্ব অপরিসীম। তারাবি আদায়, ইফতার, সেহরি, দান-খয়রাত, যাকাত-ফিতরা আদায়, লাইলাতুল ক্বদর, ঈদ উদযাপনের মাধ্যমে ধনী-গরীবের মধ্যকার ভেদাভেদ ভুলে মুসলমান জাতি মহান এ মাসে একাত্ম্য হয়।
রমাদান মুমিন মুসলমানের কাছে মেহমানসরূপ আগমন করে। মেহমানের প্রতি ইজ্জত ও তাজিম একটি জরুরি বিষয়। রমাদানের আগমন থেকে শাওয়ালের চাঁদ উদিত হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি সেকেন্ড, প্রতিটি মুহূর্ত রহমত ও বরকতম-িত। প্রতি বছরের ন্যায় এবারও পবিত্র রমাদানুল মুবারক আমাদের মাঝে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের বার্তা নিয়ে হাজির। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদান মাস পাওয়ার জন্য প্রত্যেক বছর রজব মাস অর্থাৎ রমাদানের দুই মাস পূর্ব হতে আল্লাহর কাছে দু‘আ করতেন। সেই পবিত্র সুমহান মাসটিকে আমরা হৃদয়ের সব উষ্ণতা দিয়ে জানাই স্বাগতম। আহলান সাহলান মাহে রমাদান।
রমাদান ও সিয়ামের মাহাত্ম্য

রমাদানের মাহাত্ম্য
১. এ মাসে সিয়াম পালন করা ফরয করা হয়েছে : কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, “সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে। ” [সূরা আলবাকারাহ : ১৮৫]।
২. রমাদান কুরআন অবতীর্ণের মাস : এ মাসেই বিশ্ব মানবতার মুক্তির সনদ, চিরন্তন, শাশ্বত, সার্বজনীন জীবন বিধান, কল্যাণ ও সফলতার একমাত্র চাবিকাঠি কুরআনুল কারীম অবতরণ করা হয়। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “এই রমাদান মাসেই কুরআন নাযিল করা হয়েছিল।” [সূরা আল্-বাকারাহ : ১৮৫]
৩. রমাদানের মধ্যেই রয়েছে হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ‘লাইলাতুল কদর’ : পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে “লাইলাতুল কদর’ (মহিমান্বিত রজনী) সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাত্রিতেই ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, সেই রজনী ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত।” [সূরা কাদর : ৩-৫]
৪. পুণ্যের প্রতিদান বহুগুণে বর্ধন করে দেওয়া হয় : সালমান ফারসি রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, “রাসূল (সা.) বলেন, যে রমাদান মাসে নফল ইবাদত আদায় করবে অন্য মাসের ফরয ইবাদতের সমতুল্য সওয়াব পাবে এবং যে ব্যক্তি রমাদান মাসে একটি ফরয আদায় করবে সে অন্য মাসের সত্তরটি ফরয আদায় করার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে।” [মিশকাত : ১/১৭৩]
৫. রমাদান মাসে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন রমাদান আসে তখন জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় আর জাহ্ন্নাামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের আবদ্ধ করা হয়।” [সহীহ মুসলিম : ২৫৪৭]
৬. এ রমাদাান মাসে লাইলাতুল কদরের রাত রয়েছে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস হতে উত্তম। যে এর কল্যাণ হতে বঞ্চিত হল, সে বঞ্চিত হল (মহা কল্যাণ হতে)।” [সুনান তিরমিযি : ৬৮৩]
৭. এ মাসে দু‘আ কবুল হয় : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রমাদানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তা‘আলা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলিমের দু‘আ কবূল করা হয়।” [সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব : ১০০২]।
সিয়ামের মাহাত্ম্য
১. সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশ্কের চেয়েও উত্তম : আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যার হাতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন সে সত্তার শপথ করে বলছি, সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহ তা‘আলার কাছে মিশকের ঘ্রাণের চেয়েও প্রিয় হয়ে যায়।” [মুসনাদ আহমাদ :৭৪৮৫, সহীহ]

২. সিয়াম পালনকারীর জন্য রয়েছে দু’টি বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টো বিশেষ আনন্দ মুহূর্ত রয়েছে : একটি হল ইফতারের সময়, আর দ্বিতীয়টি হল তার রবের সাথে সাক্ষাতের সময়।” [সহীহ মুসলিম :২৭৬৩]
৩. সিয়াম পালনকারীর পূর্বেকার গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয় : আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমাদানে সিয়াম পালন করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। [সহীবুখারী : ৩৮ সহীহ মুসলিম : ১৮১৭]
৪. সিয়াম কিয়ামাতের দিন সুপারিশ করবে : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সিয়াম ও কুরআন কিয়ামাতের দিন মানুষের জন্য এভাবে সুপারিশ করবে যে, সিয়াম বলবে হে আমার রব, আমি দিনের বেলায় তাকে (এ সিয়াম পালনকারীকে) পানাহার ও যৌনতা থেকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর। অনুরূপভাবে কুরআন বলবে, হে আমার রব, আমাকে অধ্যয়নরত থাকায় রাতের ঘুম থেকে আমি তাকে বিরত রেখেছি। তাই তার ব্যাপারে তুমি আমার সুপারিশ কবূল কর। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর উভয়ের সুপারিশই কবূল করা হবে।” [সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব:১৪২৯]
৫. আল্লাহ স্বয়ং নিজে সিয়ামের প্রতিদান দেবেন : আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মানুষের প্রতিটি ভাল কাজ নিজের জন্য হয়ে থাকে, কিন্তু সিয়াম শুধুমাত্র আমার জন্য, অতএব আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। [সহীহ বুখারী:১৯০৪]

আমাদের করণীয়
১. সর্বোত্তম পন্থায় সিয়াম পালন করা : রমাদান মাসের প্রধান করণীয় ও দায়িত্ব হল : যথার্থভাবে এবং সর্বোত্তম পন্থায় সিয়াম পালন করা। এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে: “তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের সিয়াম পালন করবে।” [সূরা আল্বাকারাহ : ১৮৫]
২. দৃষ্টিকে সংযত রাখা : কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, “তোমরা নির্লজ্জতা-অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না, তা প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য।” [সূরা আল্আনআম : ১৫১]
৩. সংযতবাক হওয়া : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি সিয়াম পালন করে, সে যেন তখন অশ্লীল কাজ ও শোরগোল থেকে বিরত থাকে। সিয়াম পালন অবস্থায় কেউ যদি তার সাথে গালাগালি ও মারামারি করতে আসে সে যেন বলে, আমি সিয়ামপালনবকারী।” [সহীহ মুসলিম : ১১৫১]

৪. কর্ণ সংযম : কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে: “নিশ্চয়ই কান, চক্ষু ও অন্তঃকরণ এদের প্রত্যেকটিই জিজ্ঞাসিত হবে।”[ সূরা বনী ইসরাঈল : ৩৬]
৫. সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গকে ইসলাম-নিষিদ্ধ কর্ম থেকে সংযত রাখা : মানব দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রতঙ্গকে নিষিদ্ধ কর্ম থেকে সংযত রাখতে হবে। যেমন লজ্জাস্থানকে সংরক্ষণ করা সর্বপ্রকার অশ্লীলতা থেকে। কুরআনে এটিকে সফল ম’ুমিনদের একটি বিশেষ গুণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, “আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত করে।” [সূরা আলমুমিনুন : ৫]
৬. পরিমিত আহার-নিদ্রা : অতিভোজন তথা পার্থিব ভোগ-বিলাসের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ কাফিরদের বৈশিষ্ট্য। এ সত্যের প্রতিই কুরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে, “আর যারা কুফরী করে তারা ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে এবং জন্তু-জানোয়ারের মত উদর পূর্তি করে; আর জাহান্নামই তাদের নিবাস।” [সূরা মুহাম্মাদ : ১২]
৭. সালাতুত তারাবীহ পড়া : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব হাসিলের আশায় রমাদানে কিয়ামু রমাদান (সালাতুত তারাবীহ) আদায় করবে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’’ [সহীহ আলবুখারী : ২০০৯]
৮. বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি কুরআনের একটি হরফ পাঠ করে, তাকে একটি নেকি প্রদান করা হয়। প্রতিটি নেকি দশটি নেকির সমান। আমি বলি না যে, আলিফ-লাম-মীম একটি হরফ। বরং আলিফ একটি হরফ, লাম একটি হরফ এবং মীম একটি হরফ।” [সুনান আততিরমিযি : ২৯১০, সহীহ] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদান ব্যতীত কোন মাসে এত বেশি তিলাওয়াত করতেন না। আয়েশা রাদি আল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘“রমাদান ব্যতীত অন্য কোনো রাত্রিতে আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করতে, কিংবা ভোর অবধি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস সিয়াম পালন করে কাটিয়ে দিতে দেখিনি।” [সহীহ মুসলিম : ১৭৭৩]
৯. কল্যাণকর কাজ বেশি বেশি করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ মাসের প্রত্যেক রাতে একজন ঘোষণাকারী এ বলে আহ্বান করতে থাকে যে, হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী তুমি আরো অগ্রসর হও! হে অসৎ কাজের পথিক, তোমরা অন্যায় পথে চলা বন্ধ কর। (তুমি কি জান?) এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তা‘আলা কত লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন।” [সুনান আততিরমিযী : ৬৮৪,সহীহ]
১০. বেশি বেশি দান-সদাকাহ করা : আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদি আল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাদানে তাঁর এ দানশীলতা আরো বেড়ে যেত।” [সহীহ আলবুখারী : ১৯০২]
১১. সামর্থ্য থাকলে উমরা পালন করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “রমাদান মাসে উমরা করা আমার সাথে হাজ্জ আদায় করার সমতুল্য।” [সহীহ আলবুখারী : ১৮৬৩]
১২. ইতিকাফ করা : আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক রমাদানেই শেষ দশ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমাদানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন বিশ দিন।” [সহীহ আলবুখারী : ২০৪৪]। দশ দিন ইতিকাফ করা সুন্নাত।
১৩. লাইলাতুল কদর তালাশ করা : কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, ““কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।” [সূরা কদর : ৪] “ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সময়ের তুলনায় রমাদানের শেষ দশ দিনে অধিক হারে পরিশ্রম করতেন।” [সহীহ মুসলিম : ১১৭৫]
১৪. বেশি বেশি দু‘আ ও কান্নাকাটি করা : “রমাদানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তা‘আলা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলিমের দু‘আ কবূল করা হয়।” [সহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব : ১০০২]
১৫. তাওবা ও ইস্তিগফার করা : কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা কর, খাটি তাওবা; আশা করা যায়, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মোচন করবেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশে নহরসমূহ প্রবাহিত।” [সূরা আততাহরীম : ৮]
১৬. বেশি বেশি আল্লাহর যিকির করা : স্রষ্টার স্মৃতিকে সকল অবস্থায় মনে-প্রাণে স্মরণ রাখার নামই যিকির। স্রষ্টার সান্নিধ্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের ক্ষেত্রে যিকির এমন একটি সক্রিয় উপায় যা র্সর্বাবস্থায় ছোট-বড়, ধনী-নির্ধন, নর-নারী, আবাল-বৃদ্ধা-বনিতা সকল পর্যায়ের মানুষের জন্য অবারিত। যিকিরের মাধ্যমেই মানুষ স্রষ্টা প্রেমের পরাগ মেখে নিজেকে সুরভিত করে নিতে পারে। কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, “তোমরা তাদের মত হয়ো না যারা আল্লাহকে ভুলে গিয়েছে; ফলে আল্লাহ তাদেরকে আত্মবিস্মৃত করে দিয়েছেন।” [ সূরা আল্-হাশর : ১৯]
১৭. সঠিক সময়ে সেহরী ও ইফতার করা এবং অন্যকে করানো : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দ্বীন বিজয়ী হবে, যে যাবৎ মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কারণ, ইহুদি-নাসারা তা বিলম্বে করে।”। [সুনান আবু দাউদ : ২৩৫৫] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমাদের ও আহলে কিতাবিদের সিয়ামের মাঝে পার্থক্য হল সাহরী গ্রহণ।”[সহীহ মুসলিম : ২৬০৪]
১৮. হারাম কাজ ও কবিরা গুনাহ পরিহার করা : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মুর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার সিয়াম পালন কেবল পানাহার বর্জন আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” [সহীহ বুখারী : ৬০৫৭]
১৯. রমাদানকে স্বাগত জানানো : আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন রমাদানের চাঁদ দেখতেন, তখন তিনি বলতেন, “হে আল্লাহ আপনি একে আমাদের ওপর বরকত, ঈমানের সাথে এবং সুস্থতা ও ইসলামের সাথে উদিত করুন, তোমার এবং আমার রব হলেন আল্লাহ।” [তিরমীযী : ৩৪৫১, শায়খ আলবানী সহীহ বলেছেন। মুসনাদ আহমাদ : ১৩৯৭। সহীহ ইবন হিব্বান : ৮৮৮]
২০. আল্লাহর সাহায্য চাওয়া : রমাদান মাসে সঠিকভাবে সিয়াম পালন করার জন্যে প্রতিটি মুসলিমের উচিত আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। আলকুরআনে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমি আমার রাসূলগণ এবং মুমিনদের দুনিয়া ও আখিরাতে সাহায্য করবো।” [সূরা মুমিন : ৫১]
২১. যাকাত দেওয়া : পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ঘোষণা করেছেন, ‘তাদের (সম্পদশালীদের) ধনসম্পদে রয়েছে অভাবগ্রস্ত ও বঞ্চিতের হক।’’ [সুরা আল-জারিআত : ১৯]

যাকাত দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সময়ের বাধ্যবাধকতা না থাকলেও রমাদান মাসই যাকাত আদায়ের সর্বোত্তম সময়।

রমাদান ও সিয়াম পালন আমাদের জীবনে বয়ে আনতে পারে অপরিসীম কল্যাণ। রমাদান ও সিয়ামের উদ্দেশ্যাবলী অর্জন করতে পারলে আমাদের জীবন হয়ে উঠবে সুন্দর, পূত-পবিত্র ও মহিমান্বিত। রমাদান ও সিয়াম থেকে যথার্থ কল্যাণ পেতে হলে, আমাদেরকে ব্যক্তিগত ও সামাজিকভাবে সিয়ামের যথার্থ অনুশীলন করতে হবে। রমাদানের পবিত্রতা বিরোধী সমস্ত অপতৎপরতা বন্ধ করতে হবে। মানুষের প্রতি বিশেষ করে সমাজের অসচ্ছল-অভাবী মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল-দয়ার্দ্র হতে হবে। সমাজে ও রাষ্ট্রে দ্বীনি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। সর্বত্র পাপ ও দু®কৃতির বদলে পূর্ণ ও খোদাভীতির পরিবেশ তৈরি করতে হবে। শোষণ ও নির্যাতনমূলক সমস্ত কার্যক্রম যেমন- দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ভেজাল প্রদান, ধোকা-প্রতারণা, মুনাফাখোরী ইত্যাদি বন্ধ করতে হবে। রমাদানে বিভিন্ন প্রকার অপচয় বন্ধ করে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অভাবী শ্রেণীকে দিতে হবে। সমস্ত মুসলমানদের মধ্যে রমাদানের শিক্ষা ও ভাবধারার প্রসার ঘটানো এবং সবাইকে সিয়ামের যথার্থ আনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। রমাদানের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগানোর জন্য সচেষ্ট হতে হবে। এ সকল কাজ করতে পারলেই এবারের রমাদানের সিয়াম আমাদেরকে দান করবে অফুরন্ত নিয়ামাত। এ নিয়ামাত লাভে আমরা ধন্য হবো। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে রমাদানের সিয়াম পালন করার তাওফিক দান করুন। আমীন!