পুরানো মার্কশিট

স্কুলছুটির ঘন্টা পড়লে ছুটতে ছুটতে বাড়ী
পেঁয়াজ লঙ্কা মুড়ি, জল ঢেলে নাকে মুখে গুঁজে
আবার ছুট, খেলার মাঠ
লেসিঙ্গেলের ফুটবল জামানায়
আমাদের কৈশোর-বিকাল ঘেমে নেয়ে উঠত।
তুলসীমঞ্চে মায়ের সন্ধা-শাঁক বাজলে
উঠোনে মাদুর পেতে হ্যারিকেন আলোতে পড়তে বসতাম।
কি পড়তাম,ক’টা অংক হোল,ট্রানশ্লেসন পেরেছি কিনা-
কেউ কোনদিন জিজ্ঞেস করে নি।
এভাবে লাফাতে লাফাতে
যেদিন হালকা ফিরোজা রঙের মার্কশিট
মায়ের হাতে দিয়ে প্রণাম করতাম,
মায়ের চোখ ছলছল করে উঠত।
অলক্ষ্যে এক দু ফোঁটা মার্কশিটে পড়লে
মা আঁচল দিয়ে মুছে দিতেন,
আঁচলের ময়লা ধরে তা চিরকালীন হয়ে যেত।

আজ,সম্বর্ধনার জোয়ারে কত বাঁধানো শংসাপত্র!
সোনালী রূপালী মোড়কে বাহারী মেমেন্টো!
সেলফ উপচে পড়ে।
পুট্টি করা মসৃন দেওয়ালে সে সব মুহুর্তরা নির্বিকার।
নির্জন অবসরে শংসাপত্রের সাধু উচ্চারণ পড়ি
কিন্তু কোথাও মায়ের চোখের জল ও আঁচলের গন্ধ ভরা
স্কুল মার্কশিটের ঋজুত্ব খুঁজে পাই না।
সব ম্যাড়ম্যাড়ে ন্যুব্জ,সারি সারি টাঙানো মুহুর্তেরা অনাথ,
কারো বুকে তপ্তাশ্রুর চিহ্ন লেখা নেই।
……………………………………………

বোধিবৃক্ষের তলায়

মৃত্যু যখন মৃত্যু চেনায় এমনই হয়
এক পৃথিবীর সব জীবনই ভিন্ন নয়
এক করোনার যুদ্ধে নেমে বুঝতে পারি
সাম্যবাদের তত্ত্বকথা মিথ্যে নয়।

চীনে আগুন? ভাববো কেন? অনেক দুরে।
ছুটছে যখন ইউরোপের দোরে দোরে
তখনো চুপ, ভাবনাখানি এমন যেন,
গ্রীষ্ম তাপে ঝলসে যাবে, থাকতে দূরে।

এখন যখন ঘর পুড়ছে খেয়াল করি
সব পাখিদের একটাই রব একটি তরী
এক মন্ত্রে জল ছিটিয়ে আগুন নেভাই
ধন সম্পদ? থাক বা না থাক, সব ভিখারি।

মৃত্যু যখন বন্ধ ঘরের দুয়ার জাগে
রাজা প্রজা এক উনুনে অন্ন মাগে
হাত ধরেছি জাতি ধর্ম নির্বিশেষে
রং না দেখে মানুষ খুঁজি সবার আগে।

বোধিবৃক্ষের এমন ছায়ায় অসার অহং
বহিরঙ্গের সাজ পোশাকে মিথ্যে ভড়ং
কর্ম শুধু আঁক টেনে যায় বালির চরে
নিঃস্ব বোধের এক আসনে তোমায় স্মরণ।
……………………………………………

যদ্যপি

গুমোট আকাশ,বাতাস ভারি,অবিশ্বাসী শ্বাস
নষ্ট বাতাস মৃত্যু ছড়ায় আফিং দেশের বিষ
আকাশ জুড়ে কালো মেঘের ছায়ায় সর্বনাশ
বিশ্ব জোড়া আইসোলেশন, মৃত্যু অহর্নিশ।

অনেক স্বপ্নে চাঁদের মাটি, মঙ্গলে ছুঁইছুঁই
ল্যাবের মধ্যে বিস্ফোরণে খুঁজছি ঈশ্বর
জয় এনেছি ক্লোনিং করে মানুষ করবই
এমন সময় হঠাৎ উদয় বেয়াড়া নচ্ছার।

এন্টিডটে বাগ মানেনা লক ডাউন নির্ভর
রক্তবীজের বংশ বৃদ্ধি সরল নিয়ম নয়
গুণোত্তরে বাড়তে থাকা কোভিড ভয়ংকর
এমন অস্ত্র অশ্বত্থামার,–আছে কি সংশয়?

কারো মতে জৈব অস্ত্র, পররাস্ট্র নীতি,
ধনতন্ত্রের বাড়বাড়ন্তে ছোট্ট বেয়াদপি
ধ্বস নেমেছে শেয়ার বাজার বেহাল অর্থনীতি
‘মন কি বাত’এ আশার বাণী শুনছি যদ্যপি।
……………………………………………

স্বপ্ন থাকুক মা শালিকের

জ্যোৎস্না ধোয়া সাধের সৌধ তৃপ্তিমাখা সুখে
এ সুখ মানায় মা শালিকের, আমিতো মাত্র অছি
অন্ধকারে যখন কাঁদো, অনন্যোপায় শোকে
কারণ কি তার? খুব কি বুঝি শ্রমিক মৌমাছি?

কোথায় কি, কোন্ ব্যঞ্জন কি তার মশলাপাতি
কোন্ অনুপান কার আহ্লাদ, কোন্ তালা কি চাবি
এসব রাখো নখ-আয়নায়, গৃহস্থালির বাতি
জ্বালতে হলে জ্বালিয়ে দিচ্ছ নিজের মতো সবই।

শিকড় গেড়ে সাত মহলা উঠোন ভরা মায়া
আঁধার রাতে গোপন ধূপে জোনাকি দীপ জ্বেলে
যে ঘর বানাও বালির চরে পড়ে কি তার ছায়া
বোঝানো দায় চোরা কুঠুরির পর্দাখানি ঠেলে।

অগত্যা, হাত গুটিয়ে রেখে গোড়ায় জল ঢালি
গর্ভকেশর পুষ্ট হলে তোমার গোলায় রাখি
বুঝতে দিই না ভাগচাষী না পরার্থপর মালী
সপ্ন থাকুক মা শালিকের আমি পুরুষ পাখি।
……………………………………………

কষ্ট কথা

হয়তো সেদিন ঠিক করিনি খামে ভরে
ভাঙা কথার টুকরো কাগজ বইয়ের মাঝে,
তাড়াহুড়োর ছলচাতুরী, ইতি বলে
স্ল্যাশ দিয়েছি নাম লিখিনি ইচ্ছে করে।

অনেক কথা ইচ্ছে নদীর ঝর্না আঁকে
এখন যতো সহজ সরল ম্যাসেজ লিপি
এমন সুযোগ তার ছিল না জ্যোৎস্না যখন
দুয়ার রাতে মন কেমনের ফন্দি আঁটে ।

সে কি সে দিন বইয়ের উপর মুখ লুকিয়ে
থমকে ছিল ছায়ার মতো অন্ধকারে
গভীর থেকে গভীরতর যত্ন অসুখ
আকাশ যখন কাজল মেঘের ঘোমটা দিয়ে।

দিন ফুরাল, খুচরো পাপের কাঁটা গলায়
অজানা তার মর্মবাণী, কষ্ট, নাকি
গোপন সুখের ইচ্ছে কথা কুডিয়েছিল
টুকরো কাগজ? সেই সেদিনের কষ্ট কথায়।
……………………………………………

হাহাকার

অনেক অশুচি নিয়ে আছি,
তবু রোজ শুচিতাকে ফেরি করি
এ এক মগ্ন জলাশয়
সব পাঁক গভীরে ঢেকে কাকচক্ষু পুণ্যতোয়া
শান্তিজল ছিটিয়ে মন্ত্রোচ্চারণ- ওম্ শান্তি,ওম্ শান্তি।

কাব্যে গীতে বর্ণময় উচ্ছ্বাসে
স্মারকে সূচীপত্রে ধর্মাসনে অঢেল শুচিস্তব
তবু গঙ্গা মজে যায়,আলোর ঠিকানা খুঁজি
অলিন্দের তরল প্রবাহে।

শুদ্ধ হই তিথিস্নানে চন্দনের গন্ধ মাখি
পট্টবস্ত্রে- ওম্ নমঃ বিষ্ণু, বলে মন্ত্রশুদ্ধি করি
অতঃপর হোমের আগুন দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠলে
বিশ্বাস জানলো বিশুদ্ধ ঘৃত
অন্তরাত্মা হাহাকার করে উঠল।
……………………………………………

সর্বংসহা

আলোর এতো উচ্ছৃঙ্খলতা !
মাঝে মাঝে মনে হয় অন্ধকারে ডুব দি।
আঁধার ই সর্বংসহা, নমহস্তুতে।
কোলাহল থমকে দাঁড়ায় ক্লান্তির বিষন্ন দরজায়
মঞ্চের তরল আখ্যান অর্থহীন
রাজ্য-রাজধানী,জয়-পরাজয় ডুবে গেলে
নেমে আসে অন্ধকার কুরুক্ষেত্র মাঠে।
স্বপ্ন এসে ঢেউ তুলে রাত্রির কুয়াশায়।

অন্ধকার অনায়াসে পড়ি,
নক্ষত্রগুলো উজ্জ্বল
ছায়াপথ ধরে হেঁটে যাই জীবন অরণ্যে
ভাবনারা আলোর মতো সরল
পথ চিনে যাওয়া যায় অলি-গলি অধিক গভীর।
অন্ধকার,মোগলমারীর বিশ্বস্ত সিন্দুক
সময় অতিক্রম করে
সন্তর্পণে জমা রাখে কালজয়ী অক্ষরের পাতা

আলোর এতো উচ্ছৃঙ্খলতা !
মাঝে মাঝে মনে হয় আঁধারে দি।
অন্ধকার, সৃষ্টিমুখ
সুরের গভীর, আচ্ছন্ন করে থাক মগ্ন হৃদয়।
……………………………………………

চার মিনিটের পথ

পৃথিবীর বয়স ২৪×৬০
{—————– = —————–}
মানুষের বয়স ৪

গল্প গুলো স্মৃতির হলুদ পাতা
উড়তে জানে বৈশাখী ঝড় হাওয়ায়
নদীর চড়ায় জমতে থাকে পলি
মুক্তি চেয়ে বন্যা অপেক্ষায়।

জীবন মানে চার মিনিটের চলা
অষ্টপ্রহর ভূমার বয়স হোলে
কাল চিনে না নদীর স্রোতের ধারা
বুকের মধ্যে ছায়াটি কার দোলে?

বন্যা এসে আছড়ে পড়ে চড়ায়
পলি ধুয়ে জাগছে হলুদ পাতা
পাতায় লেখা আগুন ভরা দিন
কিশোরী সব লজ্জাশীলা লতা।

বিকেল হলে বকুল তলার মাঠে
ভিড় জমাত। তাদেরই কেউ কেউ
দিঘির জলে হঠাৎ দখিন হাওয়ায়
ছড়িয়ে দিত চক্রাকারে ঢেউ।

ছবির মতো গোলাপ ফুলের কুঁড়ি
ত্রস্ত হাতে লুকিয়ে রাখি কাছে
অনেক দিনের পুরানো সেই কথা
যে দিয়েছে তার কি মনে আছে?

চার মিনিটের মাত্র চলা পথে
বিকেল নামে হলুদ পাতার দেশে
ভিড় করা সব পাখিরা দেয় শিস
যেমন সানাই কন্যে বিদায় শেষে।
……………………………………………

নীলবড়ির শুভ্রতা

ঘুমজ্যোৎস্নায় আমাকে জাগিয়ে
হেঁটে যাচ্ছে নীলবড়ির শুভ্রতা
একদিন আ্যলার্ম ঘড়ি হয়ে বাজত,
পাঁচটা বেজে গেছে ,উঠে পড়
Early rising is a good habit.
আমি,তড়িঘড়ি উঠে শীত বিছানায়
কাঁথা মুড়ি দিয়ে মুখস্ত করতাম শিল্প বিপ্লব।

এখন অন্ধকার অলিগলি ভাঙাচোরা রাস্তায়
মাথার উপর ধ্রুব শুকতারা
নীলবড়ির স্নিগ্ধতা নিয়ে জ্বল-জ্বল করে।
অবাঞ্ছিত মশা মাছি, কলঙ্কিত ট্যাটু হয়ে বসবার আগে
স্নিগ্ধতায় ভ্রূকুটির ছায়া ফুটে ওঠে।
নিরাপদ দূরত্বে এগিয়ে চলে ভবিতব্যের আবেগ।

এখনো বাড়ীর বাইরে পা রাখলে
সস্নেহে কেউ বলে ওঠে, দুগ্গা-দুগ্গা।
আমি পেছনে তাকিয়ে দেখি,
ফটোফ্রেমে উজাগর নীলবড়ির শুভ্রতা
দাঁড়িয়ে আছে নক্ষত্র পুরুষ হয়ে।
……………………………………………

দীর্ঘশ্বাস

যে সব কথায় ডায়েরীর পাতা ভরা
পড়া হবে কিনা সে কথা বড্ড ফাঁকি
আগুন জ্বললে ছায়াপথ ধরে হাঁটা
মৃত জোনাকির জ্যোৎস্নার ছায়া আঁকি।

নীল পুকুরের জলে ভেজা মা’র গা
দুধের গন্ধে জন্মকে ফিরে পাওয়া
উনুনের পাশে ধান-শীষ রঙা পা
গোধূলির মেঘ প্রভাতের রঙে ছাওয়া। ।

নিয়তির জল কোন্ দিকে তোলে ঢেউ?
কার ছায়া ফেলে সমূহ সর্বনাশ
সে সব কথা লিখে রাখে কেউ কেউ
আমিতো আঁকি শুধুই দীর্ঘশ্বাস।

ভালো কি মন্দ অতীত বর্তমান
সে কথা বলার এখনো অনেক বাকি
ডায়েরীর পাতা জুড়ে থাক অভিমান
পড়া হবে কিনা সে কথা বড্ড ফাঁকি।