যাঁরা নিভৃতে সাহিত্য সাধনা করে চলেছেন শহর থেকে বহু যোজন দূরে, পাঠক যাঁদের নামই জানল না, তাঁদের মধ্যেই অন্যতম হলেন ফজলুল হক। সম্প্রতি তাঁর গল্প উপন্যাস কবিতা পাঠ করতে গিয়ে আমার বিস্ময়ের অবধি নেই। মুসলিম সমাজের ধর্মান্ধ ভণ্ডামিকে তথা আচারসর্বস্বতাকে তিনি যেমন যুক্তির আলোকে খণ্ডন করতে চেয়েছেন, তেমনি সর্বব্যাপী মানবিকতার জাগরণের বার্তাও পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। বহু সাহিত্যিককেই এই পথে পা রাখতে দেখা গেছে, কিন্তু ফজলুল হক যুগ ও সময়ের নিরিখে কীভাবে এই সমাজের বিবর্তন ঘটে চলেছে তার মননশীল পর্যালোচনা করেছেন। সেদিক থেকেও তাঁর গভীর নিরীক্ষা ঐতিহাসিক এবং বিজ্ঞানীর ভূমিকা পালন করেছে। একদিকে ধর্মাদর্শ এবং অপরদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন বিশ্বাস দুইই এই সম্প্রদায়ের মেরুদন্ড ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে । সেই স্থলে শিক্ষা, যুক্তি ও মননের প্রয়োজনীয়তা কতখানি তা তিনি স্পষ্ট করেছেন। লেখার সাবলীলতা, সংকেতময়তা এবং কাব্যিক প্রয়োগ সবেতেই তাঁকে ব্যতিক্রমী বলে মনে হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে এই সৃষ্টিক্ষেত্রে তিনি বিরাজ করলেও তাঁর অনুচ্চ স্বর কেউ শুনতে পায়নি, সম্মান তো দূরের কথা। সুতরাং তাঁর কথা আজ বলতেই হল।

বাংলা কথাসাহিত্যে বীরভূমের রাঙামাটি কতখানি ঊর্বর তা সম্পূর্ণরূপে জানতে হলে লেখক এই ফজলুল হককে পড়তেই হবে। ব্যক্তিজীবনে তিনি যেমন বিতর্কিত, তেমনি সাহিত্যজীবনেও বিতর্কের অবকাশ এনে দিয়েছেন। সমাজের প্রচলিত আচারসর্বস্ব ধর্মকে তিনি তোয়াক্কা করেননি। বরং ধর্মকে মানবিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তিনি সমাজ থেকে নির্বাসিত। আবার হৃদয়ের টানে রীনা কবিরাজকে সঙ্গিনী করে দাম্পত্যজীবন অতিবাহিত করেছেন। সেদিক থেকেও তাঁকে সমাজশাসনের রুদ্রমূর্তির সম্মুখীন হতে হয়েছে। সাহিত্যই তাঁর কাছে একটা চ্যালেঞ্জ স্বরূপ। সমস্ত প্রশ্নের জবাব দিতেই এবং সামাজিক অবক্ষয় ও মানবিকতার সমূহ অন্তরায়কে এর মাধ্যমেই তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন। একটা সুগঠিত মানবসমাজের প্রবক্তা হিসেবেই তিনি সমাজ ও রাষ্ট্রচৈতন্যের জাগরণ নিয়ে আসতে চান। তাই প্রতিটি উপন্যাস ও গল্পের মধ্যে মননধর্মিতার সঙ্গে মানবসত্যের চিরন্তন আবেদনকে বৈপ্লবিক অনুজ্ঞায় পর্যবেসিত করেছেন। তাই তাঁর রচনায় আদিম প্রবৃত্তির প্রকাশ যেমন ঘটেছে, তেমনি দ্বান্দ্বিক ক্ষতবিক্ষত বিবেক দংশনেরও পরিচয় আছে। অস্কার ওয়াইল্ডের মতো তিনিও বিশ্বাস করেন : “Everything in the world is about sex except sex, Sex is about power.”

ফজলুল হক (জন্ম ১৩৫৮ বঙ্গাব্দ) পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার ইলামবাজার থানার নৃপতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতার নাম হাজি মহম্মদ ইসা মোল্লা, মায়ের নাম তসলিমা বিবি।স্কুলজীবন থেকেই লেখালেখি শুরু। এতে তিনি এতই আসক্ত হয়ে পড়েন যে পড়াশুনো অসমাপ্ত রেখেই লেখালেখি নিয়ে সময় কাটাতে থাকেন। ১৩৮০ বঙ্গাব্দে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত “প্রবাসী” পত্রিকার শ্রাবণ সংখ্যায় লিখে ফেলেন একটি ছোটগল্প “বিপ্রলব্ধ”। সেই থেকেই পথহাঁটা শুরু। ১৯৭৮ তে “তমসুক” নামে একটি পত্রিকাও রীনা কবিরাজসহ সম্পাদনা করেন। ১৯৮৬ পর্যন্ত অনিয়মিতভাবে চলে পত্রিকাটি। ২০০২ থেকে প্রকাশিত হয় “কবিতা এবং কবিতা” নামে ত্রৈমাসিক পত্রিকাটি। “চণ্ডীদাস”কে বিশেষ মাসিক সংখ্যা হিসেবেও সম্পাদনা করতে থাকেন ২০১০ থেকে।

ফজলুল হক মূলত গল্প লিখতেই বেশি ভালবাসেন। তবে নাজিম আফরোজ ছদ্মনামে বেশ কিছু কবিতাও লিখেছেন। ইতিমধ্যে কবিতাগুলি “জাদুকথা” কাব্যগ্রন্থে স্থান পেয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য গল্প ও উপন্যাসগুলির নাম হল : “এক চিলতে খোলা আকাশ”,“জাদুবাক্স”, “নিসর্গের রূপকথা”, “ছায়াবৈরী”, “গন্ধমূষিক”, “ছায়ানিলয়”, “মৃতরাত্রি পুরাণ”,“সাদারুমাল”, “বিলাপের জান্নাত”, “কারিকুরি”, “শিকড়ের টান”, “যোগফল শূন্য”, “মিথ্যুক”, “গোরের গোলাম”, “গন্ধ”, “চারপাশে ঘন অন্ধকার”, “আঁকা থাকে দুটি ঠোঁট”, “নাই বা মনে রাখলে”, “নিজের ভিতর সে নিজে”, “টাওয়ার”, “ভিতরের ছবি”, “মিস্টার বুড়ি এ্যান্ড মিসেস বুড়ো”, “নীল দহন”, “ব্যারণের লাভা”, “চ্যারেট ডট্ কম্” ইত্যাদি । আরও অজস্র গল্প বহু পত্র পত্রিকার ছড়িয়ে আছে। ইতিমধ্যে “রচনা সংগ্রহ”ও প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি রচনাতেই ব্যক্তিহৃদয়ের দহন, সময়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। কোথাও রূপকের আশ্রয়ে ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপ ছুঁড়ে দিয়েছেন। কোথাও বা পীড়ন ও শোষণ বঞ্চনার ছবি। “জাদুবাক্স” উপন্যাসটিতে জাদুবাক্স বলা হয়েছে আধুনিক সভ্যতার সবচেয়ে বিস্ময়কর অবদান কম্পিউটারকেই। মানুষের মনন জগতেও এই কম্পিউটার কীভাবে আলোড়ন তুলেছে এবং একজন অশীতিপর বৃদ্ধের জীবনেও, তারই সূক্ষ্ম বিন্যাসে এক মানবিক জাগরণের কাহিনি। সেখানে ধর্মভিরু এক বৃদ্ধ হাজি সাহেবের কম্পিউটার শিক্ষার সাথে পরিচয় একটা নতুন বিশ্বের সূচনা করেছে। তার দ্বারা কোরান অনূদিত হয়ে কম্পিউটারে কম্পোজ করা হয়েছে। তেমনি এই বৃদ্ধের নাতনি ডাক্তারি পড়তে গিয়ে এক ভিন্ন সম্প্রদায়ের ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে বাঁধা পড়েছে। তাদের হাতেই নতুন কম্পিউটারের উদ্বোধন। বেশ ইংগিতপূর্ণ একটি মেসেজ তিনি সমাজকে দিতে চেয়েছেন।

“নিসর্গের রূপকথা”তেও প্রেমের দ্বন্দ্ব, টানাপোড়েন, শোকবিহ্বল অবস্থাতেও কীরকম কামের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে, সেই বাস্তব কাহিনির সঙ্গে সমাজের নিম্নস্তরের মানুষের জীবনযাত্রা, তাদের মননচেতনা খুবই নিখুঁত ভাবে বর্ণনা করেছেন।প্রেমের থেকে শরীরই বেশি অগ্রসর হতে পারে লেখকের এই প্রতীতি ঘটেছে। তবে সেইসব ঝোপড়াবাসী তুচ্ছ মানুষের অন্তরেও বিবেকের জ্যোতি এখনও টিম টিম করে জ্বলছে, লেখক তা আশ্চর্য কৌশলে দেখিয়ে দিয়েছেন। গরিব মানুষ, গৃহহারা হলেও মানবিকশূন্য নয়।

সমাজে ভণ্ডামি, ধর্মের নামে গোঁড়ামি এসবকেই আক্রমণ করেছেন প্রতিটি ছোটগল্পে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানবিকতার জয় ঘোষণা এইসব গল্পের মর্মমূলে বিরাজ করেছে। “ছায়াবৈরী” একটু ভিন্নধারার উপন্যাস। দুজন নায়কের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই। প্রথম যৌবনে সুন্দরী নাদিরাকে না পাওয়ার বেদনা ভুলতে পারেনি ইসমাইল। এর প্রতিশোধ নিতে প্রেমিক দিলখুশের সঙ্গে তার বিয়েও হতে দেয়নি। কিন্তু সময়ের কাছে সেও পরাজিত। নাদিরা তার বিবাহিত জীবনে সুখ পায়নি। বিধবা হয়ে এসে রাজনীতিতে প্রবেশ করেছে। এদিকে দিলখুশও স্ত্রী বিয়োগের পর বহু ভাঙন অতিক্রম করে তার কাছাকাছি এসেছে। আবার ইসমাইলের সন্দেহের শিকার সে। কিন্তু তা যে ঠিক নয় তা বুঝতে পেরেছে আরতি মুখোপাধ্যায়কে দিলখুশের বিয়ে করার পর। তখন সমাজ বিচ্যুত দিলখুশকে অন্যভাবে শাস্তি দিতে চেয়েছে। সেটাও সম্ভব হয়নি। এমনকী তার মৃত্যুর পর দেহদান করার কারণে সব পরিকল্পনাই ভেস্তে গেছে ইসমাইলের। লেখক মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে এক নির্বাক আততির পর্যায়ে পাঠককে নিয়ে যেতে পেরেছেন। ইসমাইল নিজেই নিজের বৈরী হয়ে উঠেছে শেষ পর্যন্ত।চেতনা প্রবাহ আত্মচারী মগ্নতায় বেশ জটিল মনে হতে পারে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে ব্যক্তি অস্মিতার টানাপোড়েন কতখানি বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে মথিত তা বোঝা যায়। দেশ কাল পাত্র এই উপন্যাসটিতে একটা আবহ তৈরি করে দেয়, যা লেখকের ব্যক্তিজীবনের রৌদ্রছায়ার সংকল হয়ে উঠেছে।

বহুমুখী ও জটিল মানব চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রসায়নে গড়ে উঠেছে “ছায়ানিলয়”(২০১৯) উপন্যাসটি। সত্তর দশকের অস্থির রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে বামপন্থী ও নকশাল আন্দোলনের প্রভাব, মধ্যবিত্ত গৃহস্থের সংকটময় জীবন-জীবিকা, পার্টির বোলচাল করা একশ্রেণির যুবকের উদ্ভব ঘটে। উচ্চবিত্তের জমি-জায়গা, ধন-সম্পদ, মাঠের ফসল, পুকুরের মাছ, গাছের ফল, বাগানের গাছ লুঠপাট করার রেওয়াজ শুরু হয়। এমন কাজে তাদের বাধা দিতে গেলে খতমের তালিকায় তাদের নামও তোলা হয়। খতম করে তারপর লাশও গায়েব করা হতে থাকে।

সাধারণ মানুষের বিবাহ-প্রেম, বিচ্ছেদ-মিমাংসা, আচার-অনুষ্ঠান, ডাক্তার-হাসপাতাল-চিকিৎসা, চাষ-বাস-ঘরবাড়ি করতে গেলেও তাদের অনুমতির প্রয়োজন হয়। সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে ক্যাডার বাহিনী। মিটিং মিছিল করা থেকে শুরু করে পার্টি অফিস, চাঁদা কালেকশন প্রভৃতির প্রচলন করে। তাদেরই ছত্রছায়ায় শ্রমিক, দিনমজুর, চক্রান্তকারী, দালাল ও লেঠেলরাও আশ্রয় পায়। গৃহস্থের জমি, জায়গা, পুকুর খাস ঘোষণা করে বর্গাপাট্টা বিলি করা হয়। কোথাও জোর করে দখল নেওয়া হয়।

এই পটভূমিতে বীরভূম জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের বাসিন্দা বিখ্যাত কাজি পরিবারকে কেন্দ্র করেই গ্রন্থটি রচিত হয়। জমিদার কাজি হোসেন পরিবারের কর্তা। তাঁর আভিজাত্য, চালচলন, কথাবার্তায় সেই সময়ের পরিচয় ফুটে উঠেছে। তাঁরই বড়ো ছেলে মেধাবী ছাত্র মিহিলালের উত্থানকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তিগত সংঘাত এবং তিনজন মহিলার সঙ্গে তার প্রেমের বহু বিচিত্র গতি তা খুব তাৎপর্যপূর্ণভাবে এই গ্রন্থটিতে বিশ্লেষিত হয়েছে।

কাজি হোসেন জমি-জিরেত ভাগ-বাঁটোয়ারার হাত থেকে রক্ষার জন্য এক প্রকার জোর করেই বোন আসফিয়ার মেয়ে আফরিন হীরার সঙ্গে বিয়ে দেন। এই বিয়ের আগে মিহিলালের প্রথম প্রেম হয় সহপাঠী মলির সঙ্গে। সুন্দরী, বুদ্ধিমতি মলির চিঠি পড়ে তার প্রেমে পড়ে সে। কিন্তু পরীক্ষার পর গ্রামে এসে বাল্যকালের সাথি চাঁদনিহারাকে দেখেই আর স্থির থাকতে পারে না। তাকেই কথা দিয়ে ফেলে। দুজনে গোপনে গোপনে মিলিত হতে থাকে।

কিন্তু চাঁদনিহারাকে পারিবারিক ও রাজনৈতিক চক্রান্তের শিকার হতে হয়। রাতের অন্ধকারে তার মামাতো ভাই লালনের সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিয়ে শ্বশুর ঘর পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের আগে চাঁদনিহারা মিহিলালের কাছে সন্তান ভিক্ষা নেয়। পেটে সন্তান নিয়ে অন্য পুরুষকে মুসলিম সমাজের শরিয়ত অনুযায়ী বিয়ে কবুল করা যায় না। তাই লালনকে সব কথা জানায়। পার্টিকর্মী লালন শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। দীর্ঘদিন দম্পতি হিসেবে থাকলেও কোনও সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।

পেটের সন্তানটি প্রসব হলে পূর্বনির্ধারিত তার নাম রাখা হয় অন্তর। দারিদ্র্যের সংসারে লালনও একদিন রহস্যময়ভাবে উধাও হয়ে যায় যা খুন হিসেবেই ইঙ্গিত করা হয়েছে। বৃদ্ধা শাশুড়ি ও অন্তরকে নিয়ে চাঁদনিহারা লড়াই করতে থাকে। এক সময় তার পিতা-মাতাও মারা যায়। একমাত্র ভাইকে জেলে বন্দি করে রাখে আত্মীয়রা। তার শরীরেও দেখা দেয় মারণ রোগ ক্যান্সার।

মিহিলালের সুখের দাম্পত্যজীবনেও অন্ধকার নেমে আসে। রূপবতী হীরার অভিমান তাকে দূরে ঠেলে দেয়। দুটি সন্তান নিয়ে সে কাজিবাড়িতেই থেকে যায়। রাজনৈতিক চক্রান্তে তাদের অধিকাংশ জমি, পুকুর ও বাগান দখল হয়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে অভাব দেখা দেয়। সংসারে উদাসীন মিহিলালকে পিতার রোষে পড়তে হয়। মনখারাপ করে সে চলে যায় মামাবাড়ি। সেইখানে দেখা হয়ে যায় প্রথম প্রেমিকা ডাক্তার হয়ে আসা মলির সঙ্গে।

পুরোনো সব স্মৃতি জেগে ওঠে। সেইখানেই তার কাছে শোনে চাঁদনিহারার কথা। তার শেষ দেখা আর হয় না। দেখা হয় মৃত অবস্থায় হাসপাতালে। মরার আগে দিয়ে যায় তারই দেওয়া পানবাটা আর একটা সোনার আংটি আর তার ঔরসের সন্তান অন্তরকে। বড়ো করুণ সেই দৃশ্য। মিহিলাল, মলি ও অন্তর একটা লাশকে ঘিরে নির্বাক ভবিষ্যৎ শূন্যতার দিকে চেয়ে থাকে।

বহুমুখী ও জটিল মানব চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক রসায়নে গ্রাম্য সমাজ, রাজনীতি, ঈশ্বর বিশ্বাস ও শরিয়ত এবং প্রেম ও যৌনতার অভিঘাত খুব বাস্তবসম্মতভাবে তুলে ধরেছেন। “ছায়ানিলয়” নামটিতে নায়ক- নায়িকাদের স্বপ্নবাড়ির স্বপ্ন জড়িয়ে ছিল। লেখক বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে : “আমাকে নিয়ে সংসার করবে। সুন্দর সংসার সে যেখানেই হোক।

বলত, ছোট্ট ঘর, মাটির দেয়াল, খড়ের চাল, উঠোনে একটি বকুল গাছ। সারাদিন উঠোন জুড়ে ছায়া থাকবে।…. বাসাটির নাম দেবে `ছায়ানিলয়’ ।” এই ছায়ানিলয় তো মিহিলাল চাঁদনিহারা ও হীরার বুকের মাঝেও দেখতে পেয়েছে। মলির মনেও এই ছায়ানিলয় এর উপস্থিতি। কখনও তাদের বড়ো পুকুরটির দুই তীরে ছায়া সুনিবিড় গাছপালা আর পাখপাখালির বসবাসকেও ছায়ানিলয় বলে উল্লেখ করেছে।

গ্রাম্য পটভূমিতে নানা বিশ্বাস ও সংস্কার, পরকীয়াসক্ত দাম্পত্যজীবন, স্থূল রসিকতা, নিষ্ঠুরতা, জ্বিন ও ভূতে পাওয়া নারীপুরুষ, মৌলবিদের কুমারী নারী আসক্তি, আদর আপ্যায়ন, গালিগালাজ, মুসলিম সমাজের নানা উৎসব, আদব কায়দা, মৃতদেহের বর্ণনা, আবেগপ্রবণতা, প্রেমের ভাষা, প্রার্থনা কাহিনি ও উপকাহিনিগুলিকে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তুলেছেন।

গ্রন্থটি যেন একটা আঞ্চলিক মহাকাব্য আর একটি পরিবারই তার কেন্দ্রবিন্দু। বারবারা এল ফ্রেড্রিসনের কথায় বলতে হয় : “Love is that micro-moment of warmth and connection that you share with another living being.”. তাদের প্রেমের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র উষ্ণতার মুহূর্তগুলিও আমাদের হৃদয়ে সঞ্চারিত হয়। প্রচলিত আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার, বিশ্লেষণ, আবহাওয়া ও বিচিত্র ধারার মানুষের জীবনবোধ একজন নিখুঁত শিল্পীর মতোই স্পষ্ট ও চিরন্তন করে তুলেছেন।

সত্তর দশকের মানুষের জীবনযাত্রার মান, প্রেম নিবেদন, পারিবারিক জীবনের ছবি, তাদের স্বপ্ন ও হতাশা, মুসলিম সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক উপন্যাসটির বিষয়। নায়ক মিহিলাল এবং মলি, চাঁদনিহারা ও হীরা নামে তিনজন নায়িকার অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রতিমুহূর্তে ক্ষতবিক্ষত হওয়ার হাহাকার উপলব্ধি করা যায়। গদ্যশিল্পী হিসেবে ফজলুল হকের মুন্সিয়ানাও প্রশ্নাতীত। বিশেষ করে সরল বাক্য ব্যবহারেও তিনি গভীর ব্যঞ্জনা দিতে পেরেছেন।

স্ববৃত্তীয় নারী-পুরুষের আদিম প্রবাহ দেখা যায় “মৃতরাত্রিপুরাণ”(২০১৯) এক ভিন্নস্বরের উপন্যাসটিতে। প্রচলিত ধারায় যে ঘটনাবহুল কাহিনি ও চরিত্রের সংঘাত দেখা যায়, এখানে তা সম্পূর্ণরূপে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সাম্প্রতিক কালের নারী-পুরুষের যৌনতা ও প্রেমের সম্পর্ককে তুলে আনা হয়েছে।

লেখক উত্তম পুরুষে কাহিনির গভীরে জীবন্তিকা নামে এক রমণীর দাম্পত্যজীবনের শূন্যতা থেকে শরীরী চাহিদার উদ্দামতাকে অপরিসীম আত্মক্ষরণের মগ্নতায় নিভৃত সংলাপে বিন্যস্ত করেছেন।

প্রথম জীবনে জীবন্তিকা যমজ সন্তান হিসেবে জন্মগ্রহণ করে বলে তার ভাইকে পিতা-মাতা নিজেদের কাছে রেখে তাকে লালন পালনের দায়িত্ব দেয় অন্য আর এক দম্পতিকে। বড়ো হয়ে সে জানতে পেরে পুনরায় ফিরে আসে।

কিন্তু নিজ মাতা-পিতার কাছেও অবহেলা অনুভব করে তার ভাই ও দিদির তুলনায়। তার প্রতি বাবা-মায়ের স্নেহের কৃপণতা থেকেই তার মানসিকতা দৃঢ় ও জেদি হতে শুরু করে।

প্রথম যৌবনে একজনের সঙ্গে ঘর ছাড়ে, কিন্তু সেখানেও প্রত্যাখ্যাত হয়। ইতিমধ্যে ফেসবুকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় অন্তিক নামে এক যুবকের। সে ভালো চাকরি করে, উচ্চ শিক্ষিত, সব জেনে শুনেই জীবন্তিকাকে বিয়ে করে। জীবন্তিকা মনে করে এই বিয়ে দয়ার নয়, অধিকারের।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সে বুঝতে পারে সেই দাম্পত্যজীবনও মহাশূন্যতায় ভরা। অন্তিকের কর্মব্যস্ততা ও দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে তার জীবনে হাহাকার নিঃসঙ্গতা নেমে আসে। তখন ফোনেই আলাপ লেখকের কাছে সে সবকিছুর সমাধান চায়। এই বদ্ধ জীবন থেকে সে মুক্তি চায়। আর এই মুক্তির জন্য একটা চাকরি দরকার।

লেখক ও তাঁর সঙ্গী শুভ্রা তাদের বিচ্ছেদ হওয়ার মুখে দাম্পত্যজীবন নিয়ে বহু কাউন্সেলিং করেও তাকে মানসিকভাবে সুস্থ করে তুলতে পারেন না। এক বছর সময় দিয়ে পুনর্গঠনের চেষ্টা করেন। অবশেষে লেখকের পরামর্শে তাদের দাম্পত্যজীবন জোড়া লাগে একটা অদৃশ্য দূরত্ব বজায় রেখেই। লেখকই জীবন্তিকার আদর্শ পুরুষ। বয়সের ভারে লেখক অনেকটাই ক্লান্ত বলে কখনও কখনও নিজেকে পিতার আসনে বসান। কিন্তু এহ বাহ্য, শেষ পর্যন্ত শারীরিক সম্পর্কেই ধরা দেন। অক্ষমতা কাটিয়ে যে অনাবিল সুখ দেওয়া যায় তা উপলব্ধি করেন।

এই কাহিনিই কাব্যিক ও মননশীল ভাষায় আশ্চর্য উচ্চতায় প্রকাশ করেছেন। জীবন্তিকাকে দেখেই তাঁর মনে হয়েছে : “এ মেয়ের শরীরে গাঁথা আছে বিচিত্র গল্পকথা, অন্যরকম গান।” (পৃষ্ঠা ২১)

অন্তিক সম্পর্কে তাঁর মনে হয়েছে : “যৌনতায় অদক্ষ ওই অসহ্য লোকটার প্রতি আমার করুণা ছাড়া আর কী থাকে।” (পৃষ্ঠা ২২)

যৌনতার আশ্চর্য মাদকতা এক নৈঃশাব্দ্যিক স্রোতে যেন আত্মরসায়নের ধ্বনি তুলেছে। সেক্স ডিপ্রেশান কতখানি মারাত্মক এবং নারীর পুরুষ নির্বাচনে বয়সও যে বাধা নয় তা খুব সহজেই বোঝা যায় : “সময়ের ব্যবধান এই মেয়েটি কখনও মানে না।” (পৃষ্ঠা ৪১)

প্রথা ভাঙার ও সাহসী হয়ে উঠার এই অনিরুদ্ধ মেয়েটি লেখকের কৌতূহল জাগ্রত করে। অন্য যেকোনও পছন্দের পুরুষের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণ বোঝাতে সে বলে : “দেহ আমার কাছে অতি সাধারণ। তার পরিচর্যার জন্যে যা যা দরকার তা দিতে হবে। তার জন্যে ঘটা করে এমন বিয়ের দরকার নেই। মনের মতো একজন মানুষ চাই যার কাছে আনন্দ পাব।”(পৃষ্ঠা ৫৫)

সুতরাং সম্পর্ক ভাঙাগড়াও স্বাভাবিক ব্যাপার। বর্তমানে অবস্থান করেও ভবিষ্যতের যাত্রায় ধাবিত তার ক্রিয়াগুলি ভাবনাবৃত্তে যে স্ট্রিম অফ কনসিয়াসনেসে সম্পন্ন হয়েছে তা অনুভববেদ্য প্রখরতায় বিস্ময়কর । সে বলে : “আমি নিজের মতো বাঁচতে চাই।” (পৃষ্ঠা ৬৯)

লেখকের সঙ্গে তার যৌনসম্পর্ক এবং আদিমতম শরীরী উল্লাসে মিশে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার বলে মনে হবে। লেখক বলেছেন : “নারীর সঞ্চিত যৌন অঙ্গে আদিম গন্ধে শ্বাস নেওয়া কোনও মতেই অশ্লীল নয়। (পৃষ্ঠা ৭৯)

গ্রন্থটিতে কোথাও এই সম্পর্ককে অবৈধ বা অশ্লীল বলে মনে হয়নি। সবই ন্যাচারাল এবং অমোঘ হয়ে উঠেছে। আমেরিকান নাট্যকার ও লেখক জিম্মি দীন (Jimmy Dean) বলেছিলেন : “ Love is an ice cream sundae, with all the marvelous coverings. Sex is the cherry on top.” এই রোমান্সের বাতাবরণে বয়স ও বৈধ অবৈধের তোয়াক্কা না করে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। বিয়ে অর্থে জীবন্তিকা লেখককে প্রশ্ন করেছে : “পুরুষেরা কি কেবল আমার যোনির নিরাপত্তারক্ষী?” (পৃষ্ঠা ৮৭)

লেখকও অবশেষে নিজেকে আবিষ্কার করেছেন : “পুরুষ যে ভোগী সেই ভোগের সাথে আমিও মিলে মিশে একাকার সেটা প্রমাণ হয়ে যায়।” (পৃষ্ঠা ৮৫)

“মৃতরাত্রিপুরাণ” যেন সেই রাত্রিরই আদিম প্রবাহ যা প্রত্যেকে বহন করে নিয়ে চলেছে। এর উক্তিপ্রত্যুক্তি, ভাষাব্যঞ্জনা, ক্রিয়াবিক্রিয়ায়, বিভিন্ন পর্বের নামকরণে বেশ কাব্যিক তাৎপর্য আছে। বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে আর একজন মানবচরিত্রের প্রত্ন অনুসন্ধানী “সেকালের কলিকাতার যৌনাচার” গ্রন্থের লেখক মানস ভান্ডারীকে। এই গ্রন্থের বিষয়ের সঙ্গে অনেকটাই মিল পাওয়া যায় বইকি!

ফজলুল হক নাজিম আফরোজ ছদ্মনামে মূলত শূন্য দশকেই কবিতা লিখতেও শুরু করেন। গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হিসেবে তাঁর খ্যাতি থাকলেও কবি হিসেবে তাঁকে চিনেছি ‘জাদুকথা'(২০১০) কাব্য গ্রন্থটি প্রকাশের পর। কিন্তু ততদিনে নাজিম আফরোজ প্রিয় কবির তালিকায় ছাড়পত্র পেয়ে গেছেন। তাঁর কাবিতাগুলিতে এক অসাধারণ আলো পড়েছে, যাতে কবি আত্ম-উৎসের পথে বারবার হেঁটেছেন আত্মমগ্ন যাত্রায়। নিজের মধ্যেই অনন্ত রূপের বিস্ময় আর প্রবৃত্তির জাগরণকেই জাদুকথা বলেছেন। এই জাদু মূলত আদি-উৎসের মধ্যেই নিহিত। সেইখান থেকেই সংবাদ আসে কবির অনুভূতিলোকে, স্নায়ুর কোষে কোষে। তাই কবিকে বলতে শুনি ‘চিঠি আসে, চিঠি আসে…’। এই চিঠি আসার শেষ নেই। এ চিঠি অনন্ত চিঠি, যে চিঠি রবীন্দ্রনাথের ‘ডাকঘর’ নাটকে রাজার চিঠি হিসেবেই অমলের কাছে আসার কথা ছিল। আমরা প্রত্যেকেই এই চিঠির জন্য পথ চেয়ে থাকি।

কবিতা কে লেখে? কবিতা লেখেন এক সত্তা, আমাদের পার্থিব জীবনের আড়ালে যে বসবাস করে। চেনা জগতের ভিড়েও সে অচেনা। সে রূপ পেতে চায়, আবার রূপকেও পেতে চায়। ভালোবাসতে চায়, আবার ভালোবাসাও হতে চায়। আসলে সে কী যে চায় কেউই জানে না। কখনও যৌনতত্ত্ব, কখনও সমাজতত্ত্ব মনে হয় তার ভাষাকে। তার দেখা ছবিকে মনে হয়, এ তো বাস্তব, আমরা প্রতিদিন দেখি; আবার কখনও কখনও মনে হয়, না, একেবারে মিল নেই বাস্তবের সঙ্গে। নিজেকে মাঝে মাঝে বলতে হয়:

“চোখ বন্ধ করে হাঁটো দেখি
এবার চোখ খুলে হাঁটো দেখি
কথা বলো, কিন্তু সেই কথা কেউ যেন না শুনতে পায়
আলো জ্বালো, কিন্তু আলো যেন আঁধার রঙের হয়—
সন্ধ্যেবেলায়ও ভোর হোক দেখি…”

—এসব যাকে বলছি কবিতা সে-ই লেখে। তাঁর ক্রিয়া মুক্ত, পিপাসা অসীম। তাঁর বাস্তবতা জাদু। তাঁর উচ্চারণ বাতাসময়। তাঁর মুখ বর্ণময় আকাশ। তাঁর পথ পৃথিবীময়। তাঁর ভালোবাসা নারীময়। তাঁর দিন-রাত্রি আবহমানকাল।

ফজলুল হকের নাজিম আফরোজ সত্তা যে কবিতা লিখে আসছে তা মূলত কবিতার প্রচলিত রীতি নীতি ছাড়াই এক ধরনের স্বয়ংক্রিয় আত্মযাপন। নিজেকে নিজের কাছে মুক্ত করার প্রয়াস:

“রোদ অবিশ্বাস্য নতুন মানচিত্রে ছায়া ফেলে
বিস্তারিত ছায়াশিল্পে অজানা উৎক্ষেপণ
সমস্ত চেতনা জুড়ে সবুজ পাতার অন্যপৃথিবী
দমকা হাওয়ার জাদুতরঙ্গে ভেসে চলি
মৌনপাতাবাহারের লিপিময় অক্ষরে
অক্ষর বিন্যাসে সৌরশূন্য নিকট মনে হয়
ছায়াপথ ঘিরে সমগ্র নক্ষত্রমণ্ডলী
কুয়াশা শূন্যের আস্তরণ ছুঁতে পারি

তখন আমাদের হাহাকারগুলি
অর্থহীন কথাকল্পে জাদুপৃথিবী
বৃষ্টি প্ররোচনায় স্তব্ধ হয়ে যায়”

এই মুক্তি নিসর্গ-আকাশ-উদ্ভিজ্জ থেকে সৌর শূন্য মহাকালের নক্ষত্রলোকে ধাবমান। পার্থিব হাহাকারের সেখানে স্থান নেই, কারণ সেগুলি অর্থহীন কথাকল্পে জাদুপৃথিবীতে বৃষ্টির প্ররোচনায় স্তব্ধ হয়ে যায়। এগুলি জাদুবাস্তবতার প্রলাপ বহন করলেও আসলে তা ‘There is plenty of mystery in poetry without making it mystical.’ কথাটি বলেছেন মিডলটন মার তাঁর ‘Pure poetry’ প্রবন্ধে। এখানেও কথাটি সত্য। নাজিম আফরোজ সত্তা প্রচলিত নিঃসঙ্গতা থেকে বহুদূরে। তাঁর দুঃখজর্জর দাহ ও দৈন্য নেই। প্রেমের জন্য যৌনবিরহ নেই। নগ্নবাস্তবের ক্লেদক্লিন্ন হাহাকার তাঁকে স্পর্শ করেনি। আবার আবেগের কলসিও রসধারা ঢালেনি। তাঁর অভিনব যন্ত্রণার এক শূন্য পরিধি, যা বৃহত্তর কালের দরোজা খুঁজে ফিরেছে, কিন্তু পথের আবিষ্কার হয়নি। রহস্যময়তার আলোছায়া খেলা করেছে। একেই তিনি কখনও ‘জাদুখেলা’, কখনও ‘জাদুচিত্রনাট্য’, কখনও ‘জাদুররহস্য’ বলেছেন। ‘জাদু’ কথাটি মানুষের সৃষ্টি, জাদুও মানুষেরই তৈরি করা রহস্য, ধাঁধা। কিন্তু কবির ‘জাদুকথায়’ যে জাদু সৃষ্টি হয়েছে তার একটা স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতি আছে, যা প্রকৃতিমোচনের মতো প্রাগৈতিহাসিক কালের ধারা থেকে প্রবহমান। মানুষ তাকে খণ্ডিত করতে পারে না। কবিও লিখেছেন সেই উপলব্ধি:

“পুরনো ধুলোর গন্ধে মৃত্যু ছুঁতে গিয়ে জ্যান্ত হয়ে উঠি
কীভাবে সময়কে জব্দ করা যায় সময়ের ভিতর
কীভাবে ধরা যায় ভাষাপ্রকল্পে অতীতের সৌন্দর্য নির্মাণ
বিস্মৃতি নিংড়ে স্বপ্নের পৃষ্ঠাগুলি থেকে তুলে নিই
কাঠের সিঁড়ি, সিঁড়ি থেকে উঠে আসা পায়ের পাতা
নির্জন মেঘের মাথায় হাত রেখে বৃষ্টিকুঁড়ি পরি
জাদু বাতাসে বেরিয়ে পড়ে বর্ণমালার আকাশ
শব্দ উড়ে, ছলকে পড়ে পলকহীন জ্যোৎস্না।”

অতীতকে ধরেই বেঁচে ওঠে বর্তমানের জীবন্ত সভ্যতা। সময়কে তো বেঁধে রাখা যায় না, অথচ সময়কে ধরার প্রয়াস চলতেই থাকে। জন্ম-জন্মান্তরে শুধু এই সময়ই ঘুরপাক খায়। অতীত অভিজ্ঞতার পর্বগুলি মুদ্রিত হতে চায় ভাষাপ্রকল্পে। কিন্তু যে উত্থান রচিত হয়, মনুষ্যসভ্যতায় তা বড় নশ্বর ও নড়বড়ে; কবিতাকেই বলেছেন ‘কাঠের সিঁড়ি’। পায়ের পাতা গতিময়তার প্রতীক। ‘বৃষ্টিকুঁড়ি’ মানে প্রকৃতির আদিম প্রবৃত্তিতেই অবগাহন। তারপর ‘জাদুবাতাস’ কণ্ঠস্বরের ব্যাপ্তি। ‘বর্ণমালার আকাশ’ তো অসীম অনন্ত মুগ্ধমুখের প্রতিচ্ছবি। কবিতা সেখান থেকেই, অর্থাৎ মহাকালের অনন্তলোকের সৃষ্টিচৈতন্যের রহস্যকে ‘পলকহীন জ্যোৎস্না’য় চিত্রিত করার সাধনা। অনুল্লেখ্য কবিতার পরবর্তী অংশে আয়নায় প্রস্ফুটিত শ্যাম্পু ওড়ানো চুলের বিন্যাস, রমণীয় কাঁধের চড়াই, জিভের বিপজ্জনক স্পন্দন এবং ঠোঁটের হা-হা মানবীয় প্রবৃত্তিরই টুকরো টুকরো পরিচয় যা শেষপর্যন্ত জাদুবাক্সে আশ্রিত দূরাকাশের প্রত্যাগমন। সুতরাং ‘জাদু’ কথাটি কখনোই পায়রাকে মানুষ করা, কিংবা মানুষকে পায়রা করা নয়; তা শুধু plenty of mystery… কবিতায় বোধের শূন্যতাকে রহস্য দিয়েই পূর্ণ করে দেন, সেটাই কবির ‘মায়া-পৃথিবী’:

“এই শূন্যতার অন্তহীন পীড়িত শোক!
নিপুণ স্পর্শকাতরতায় নিজেকে বন্দী করি,
জেগে থাকে স্বপ্নজাগতিক মায়া-পৃথিবী!”

এই শোক আত্মযন্ত্রণার সহজিয়া অনুভূতি, সেখানে আত্মরতির প্রতিস্থাপনে মায়াপৃথিবীর স্বপ্নজাগতিক ক্রিয়ার রশ্মি পড়ে আলোকিত হতে চায়। তাই পরবর্তী অংশে কবিকে উদিত করে দেয়—সূর্য উদয়ের আকাশ রং, দিনরাত্রির ভাঙন চিত্র, বিবর্ণ অন্ধকার। মানুষে মানুষে ব্যবধান বেড়ে যায়। মনের দরোজা খুঁজতে খুঁজতে যুগ-যুগান্তর ঘোরে প্রাচীন দেহ, আদিম জ্বরের দাহ নিয়ে ‘আকারে বিকারে’ তার সংসার। ‘আকারে’ কথাটিতে প্রকাশিত আয়তনে অর্থাৎ আত্মার সীমানায়, অর্থাৎ দেহগত রূপে। কবি এসবের মধ্যেও তাঁর সৃষ্টি ও আত্মপ্রকাশের ব্যাপ্তির রহস্যে আবৃত এবং সংবেদী জীবনপরিধির বিস্তারে চলে গেছেন প্রাগৈতিহাসিক পথের দূর অনির্ণেয় সময়ে। নিজের বিস্তারও দেখতে পান এভাবে:

“আমার আঁকাবাঁকা অস্তিত্ব, যা ঈশ্বর বিশ্বাস দেয়
আনন্দ ও যন্ত্রণার সংঘর্ষ বাঁধে, যার মুখোমুখি হয়ে
যে-কোনো ঋতুর রং বদলে দেয়, কে আমি তখন!”

—কে আমি তখন? প্রশ্নটির উত্তরে ফজলুল বা নাজিম আফরোজ কাউকেই পাওয়া যায় না। যাকে পাওয়া যায় সে ‘সে’ নয়, সহস্র শতাব্দী ধরে যে সত্তা অবিরাম চক্কর দিচ্ছে সভ্যতাময়, অসীমে তার কী সব ছেঁড়া কথা লেখা থাকে। আদিম নক্ষত্র পুরুষের কাছে যে আত্মসমর্পণ করে মহাশূন্যের ভেতর। তখন সব সর্বনাম লুপ্ত হয়ে সে সর্বময় হয়ে ওঠে।

জাদু কবির এই নিরবধি বিবমিষা যা অনবরত পথ অন্বেষণ করতে শেখায় আত্মরতির জগতের। পার্থিব দৈন্যের স্পর্ধায় কখনও স্তব্ধতা আসে না। সময়ের স্রোতে ভেসে যেতে যেতে সময়কে আঁকড়ে ধরেও তবু বিপরীতে তার রোদবসন খোলে না। রক্ত-ঘাম-পুতুল চিৎকারে তার মগ্নতাও ভঙ্গ হয় না। পাখি অথবা শিকারি পাখি, বসন্ত অথবা বিকেলে তাকে ডাক দিয়ে যায়, কিন্তু শাশ্বত ধ্রুবতার বিমোচন ঘটে না। শুধু দার্শনিক প্রত্যয়ে চিঠি আসে। এই চিঠি সমূহ উৎসকেন্দ্রের আমাদের মুক্তির চিঠি। কবিতার ভাষা ও ভাবে, দার্শনিক ভাবনায় সর্বদা এক ভিন্নতা লক্ষ করি। খুব অল্প দিনেই তিনি এই কারণেই আমার দশদিগন্তের অন্যতম নক্ষত্র হয়ে উঠেছেন। বাংলা সাহিত্যের পাঠকের কাছে নিজেকে সর্বতোভাবে মেলে ধরার প্রয়াসও তাঁর নেই। ‘কবিতা এবং কবিতা’ পত্রিকা সম্পাদনা এবং রাঙামাটির পথের ধুলোয় বাউল সাধকদের সঙ্গে জীবন কাটানোতেই তাঁর আগ্রহ।