নির্ভর করে

ছাদের তারে অন্তর্বাস মুখ লুকিয়ে ঝুলে থাকা বা প্রকাশ্য রোদে থাকার উপর অনেক কিছুই নির্ভর করে ডালিয়াদি। রাত জাগা নক্ষত্রেরা কিছুতেই যে চোখ রাখতে পারবে না রোদের চোখে। স্নানঘরের মায়া মোহ কমে এলে বেড়ে যায় চুলের জট, ছাড়াতে ছাড়াতে বিকেলের মুখ চায়ের চুমুকে চুমু ভেবে যদি আঁতকে ওঠো জিভ পোড়া গন্ধে জ্বলে উঠবেই প্রতিবেশী জানলার উৎসুক আলো…

বিছানায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অভ্যেসের দাগ, বেঁকে যাওয়া সিলিং ফ্যানের ফুরিয়ে আসছে হাওয়া
জ্বরহীন জিভের তলায় নিশ্চল পারদের ওঠা নামা। এই এককেও মাপা যায় না জীবন। জানলার শিক ছুঁয়ে ভোর তোমাকে কি ভাবে ছোঁয় তার উপরে আংশিক কিছু নির্ভর করে ডালিয়াদি।
পাপড়ি খোলা ফুলের ঠোঁটে মৌমাছি চুমু দিতেও পারে, তা না হলে ফুল কি ভুলে যাবে ফুটতে?

পর্দায় জানলার চোখ ঢেকে একাকী বাঁচার নাম বিরহ নাও হতে পারে, নাও পেতে পারো রাধাসুখ। মালার ধারপাতে যতই গোনো ঈশ্বর, ঈশ্বরের বাগানে প্রেমিকার অভাব তৈরি করা সহজ কথা?

মেহেদী বাগানের সুবলদা, ফুল বাগানের মালি। ওই যে, তোমাকে ফুল দিয়েছিলো তোমার মামাতুতো বোনের বাসরে। সে কি প্রেমিক ছিল না বলো? প্রেমিক ছিলো না কাগজ দিতে আসা রোগা পাতলা অমলদা? মাস শেষে অবহেলায় দেওয়া চা পানে পর্দার ফাঁকে লুকিয়ে দেখেছে কতবার!

‘প্রেম আসেনি জীবনে’ স্ট্যাটাসে ভরিয়ে তুলছো বেলা, সেঁদিয়ে যাচ্ছো ভুল ঠিকানার খামে! অনেক কিছুই নির্ভর করে নিরুদ্দেশ হওয়ার আগে দরজায় তালা ঝুলিয়ে যাওয়া ও না যাওয়ার উপর।

তালায় মানুষ ফিরে আসার ইচ্ছে গুজে রাখে…
……………………………………………

নীল স্নান

ফুলদি, ডালিয়া আর ঋতু
তিন সই হৈ হৈ নেমেছে সমুদ্রে,
সমুদ্র থৈ থৈ নীল বাদামী ঢেউ
দুলেছে এক প্রাণ ফুলদি, ডালিয়া, ঋজু
বালুতটে লিখে গেছে কোনো এক নাম
ফেরার ঠিকানা প্রতিটি অক্ষরের ঠোঁটে গুঁজে রাখা আবেগ । যাতে সব ধুয়ে না যায় মনে মনে তুলে দিচ্ছি পাঁচিল
ঠিকানা মুছে দেওয়া ঢেউ তুমি অপেক্ষা কর, বালির উড়িয়ে দেওয়া সামুদ্রিক বাতাস তুমিও অপেক্ষায় থাক…
না সমুদ্র, আমি ওদের কেও নই
এক জ্যোৎস্নায় কারো কুড়িয়ে পাওয়া… ঠিকানাহীন চিঠির অক্ষরের মতোই ঠিকানাহীন, তাই তো ঠিকানাকে মনে পথ ফিরে আসার পথ
ঢেউ তুমি বরং দেখো ওদের
সমুদ্র মানুষকে দেয় নীল স্নান
ওরা সমুদ্রকে স্নান করিয়ে দিচ্ছে কেমন জ্যোৎস্না জলে
আমার সাধ্য নেই কোন ঠিকানায় পৌঁছে যাওয়ার স্বরে নিঃশব্দ ডাকি
সাঁতারের ভিতর কাঁদছে কি ওরা
ধুয়ে নিচ্ছে আজন্মের গোধূলি আলো
এ যেন এক যুবকের তিন যুবতী প্রেম…
বা, তিন যুবতীর এক যুবক প্রেম
কথায় কথায় কোথায় ভেসে যাচ্ছে
ফুলদি, ডালিয়া, ঋতু
বালুতটে গেঁথে যাচ্ছে পা যেন ভিতর থেকে সমাধির স্বরে ডাকছে কেউ, আয়-
ওরা না ফেরা অবধি ঢেউ, সামুদ্রিক বাতাস আর আমার সমাধি
অপেক্ষা কর মুছে দিওনা ঠিকানা
ভরসা রাখো একটু অনন্ত স্নানের…
……………………………………………

ঈশ্বরহীন বারান্দায়

ভুল ভালবাসাগুলো খুবলে খেতে চায়
তাল শাঁসের গভীরে আঙ্গুল ডুবিয়ে…

ঈশ্বরহীন বারান্দায়
স্তনের অমৃতে দুফোঁটা মাখিয়ে নাও বিষ মৃত্যু আঁকা শিখুক তুলিরা আগ্রাসী রঙে
নিজেরই ঠোঁটে

ভীতু যুবকের প্রেম প্রস্তাবে ছিল
অক্ষরহীন সাদা পাতা
তার ফসিল খুঁজে বের করো, পড়ো

শীত শেষের বাগানে কারা চেঁচাচ্ছে?
উৎসব হাঁটছে মিছিলে রোজ রোজ

দাঁতে ছিঁড়ছে কেউ
হু হু পরকীয়া বাতাসে
হাড় থেকে মাংস, মাংস থেকে হাড়…
……………………………………………

একতারা

কত কত ভাঙ্গা খেলনা কিনে নিয়ে যায়
নানা মুখের ফেরিওয়ালা সকাল দুপুর। কেউ নেয়না শুধু ছেঁড়া তারের একতারা
বাতাস কেটে কেটে
বের করে আনা সুর
ছিঁড়ে গেছে একতারা আজ
ফুলেদের শোক গানে…

রাতের ফুটো ফুটো আকাশ আয়নারোদ
অন্ধকার বেয়ে নামতে পারেনা, একবুক ভালবাসাগুলো কাঁপে ঠান্ডা জলে জলে

কুয়াশার দেয়ালে দেয়ালে ধাক্কা খায়
ফিরে ফিরে আসে অবচেতনের উচ্চারণ
দুলে দুলে ওঠে মাটি আর মুদ্রাগুলো…

খুব মনে পড়েছে আজ থেকে থেকে
রোগা চোখ সর্বস্ব এক সহপাঠীর কথা, কী অনায়াসে আঁকলো ব্ল্যাকবোর্ডে জুড়ে মস্ত এক একতারা;
‘ভালোবাসা’ লিখলো ‘তার’ ধরে সোজা…
……………………………………………

প্রলাপ লিখি

একবার শোনো আমার কথা,
একবার শুনেই দেখো না-
এই যে তোমার কথাগুলো

মাথা নামিয়ে নয়, অহংকারে নয়
দেবতার পায়ে ফুল ছোঁয়াও
সেভাবেও নয়, মুখ ধুয়ে যেভাবে মুখ আয়নায় রাখো, রাখো টেবিলের মাঝে

ভীড়ের পিছন নয়, কৌতুহল রাখো
সামনে, সেখানে কথার ওজন কম
বুক পকেটে রেখে ফিরতে পাড়বে বাড়ি

খুঁত খুঁজতে খুঁজতে নিখুঁতের সন্ধান, না,
বরং প্রশয়ে বাড়ুক পাথরের খাঁজে দু’পাতার গাছ, শিকড়ে রাখো দু’ফোঁটা
তোমার নির্জনতার নিজস্ব গান…

ছিঁড়তে ছিঁড়তে মুখোশে ভরে যাবে
সমস্ত নদী, সমস্ত চার দেয়াল, ছাদ…
পা রাখবে কোথায় দাঁতের কামড়ে?

একফালি রোদ মাখো ভিজে চুলে
আর অনীহা বেঁধে রাখো নত চোখে
আগুনের পরমায়ু জানতে বসে থাকো
শশ্মানের শোকহীন উত্তাপে পাথর

প্রত্যেকটি জন্ম যেমন ছিঁড়ে যায় না
প্রত্যেকটি মৃত্যুও অতৃপ্ত হয় না
প্রত্যেকটি দিন এক দৃশ্য মাত্র, মূহুর্তরাও
……………………………………………

উন্মাদের শ্লোক

পাথরের নীচে যদি একবার
মাথা রাখে কবি
নিশান ওড়ে নিশান ওড়ে, শিকড়
মাটি ভেদ করে নেমে যায়
পাতালে
তুলে আনে
পাললিক বইয়ের শ্লোক
ফিরে ফিরে আসে নষ্ট পাতাদের জন্ম
ভুল বনভূমি

ঈশ্বর কি চান অন্য কোনো
ঈশ্বরের অস্তিত্ব পাথরের বুকে
জন্ম নিক নতুন পাথর মহিমা

পাথরের পা নেই হাত নেই, তাই
পাথরে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন
ঈশ্বরসম কবি সূর্যাস্তের আলোয়…
……………………………………………

ডুব সাঁতার

যেন ঘোরানো সিঁড়ির ঘূর্ণি
দ্রুত নামতে গিয়ে
পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে পা
এতো গভীরে থাকে কেউ ?
নামতে নামতে এক জীবন

বাতাস যেন মৃদু হচ্ছে ক্রমে
কার উপস্থিতির গন্ধ ভাসে?
আবছায়া অন্ধগলির মধ্যে
আঙুলের স্পর্শে ঘন ঘন
বিদ্যুতের মতো দৃশ্য জ্বলে-নেভে

রক্তের ভিতরে ছুটন্ত ঘোড়ার খুর
লুকানো সুমুদ্রে অসময়ের স্নানে
সাঁতার শেখানোর ছলে
ডুবিয়ে দিলে ভাসিয়ে দিলে
নদীর নামের স্রোতস্বিনী মেয়ে…
……………………………………………

ভিটেমাটি

কত কাল হলো, সময় অসময়
আমি তার ভিজে আঁচলে মুছে নিতাম
ক্লান্তির পাললিক স্তর, দহনের ছাই…

বর্ষার আদর দেওয়ালে দেওয়ালে
ভাঙাচুরা, খসে পড়া প্লাস্টার মুখ ঢাকে
শ্যাওলার সবুজ নরম চাদরে…

ঘরের ভিতরে দু’ ফাঁক হওয়া মেঝে
দ্বিধাহীন, জেগে উঠেছে মাটির পুষ্ট বুক
নামে মায়াবী শিকড়ের কচি ঠোঁট…

আড়ালে কী কোথাও জন্মেছে
অনাকাঙ্ক্ষিত চারাগাছ, উপড়ে ফেলি তার শিকড়ের প্রতিশোধ স্পৃহা…

ভিটেমাটি ছেড়ে খিদে-তেষ্টায় আমি
মেঘ পাড়ার বসতি হতে চেয়ে নিরুদ্দেশ হয়েছিলাম কোন এক ভোরে…
……………………………………………

তরঙ্গ

আমি জানি, তোমরা কেউ খুঁজবে না
কেউ-
আমার হারিয়ে যাওয়াটাকে…

যাদের দুপুরের খাবারে ছিলাম, রাতে
তারা
বিকালের মাঠে একজোটে কতবার
টেনে নামিয়েছি অর্ধেক আকাশ তোমরাও

তরঙ্গ ছোটে তরঙ্গের পিছনে আর
তার পিছনেও আর একটা…
সমস্ত কিছুই এত দ্রুত, পথ জুড়ে
পড়ে নেই একটাও পলাশ, গাছটাও নেই
প্রতিদিনের পথে

টের পাবেনা কেউ
আমার হারিয়ে যাওয়াটাকে
খুঁজবে না কেউ…
……………………………………………

ভুল

অপারগ চোখ, লক্ষ্যে স্থির হতে
শরীরের অসর্তক চিহ্নের আঁচে
সর্পিল গলি আলোছায়া, নির্বোধে
পেরেক গাঁথে একাকী আগর গাছে

আতর নেশা অন্ধকারে সেদ্ধ হয়
বাতাসে সুগন্ধি ফুল ওড়ে সংবাদে
এপাড়া ওপাড়া সর্বনাশা পথিক ভয়
দূরবীনে চোখ বিকালের ভেজা ছাদে

শ্যাওলায় দেয়ালে যোগ চিহ্ন আঁকে
আদ্যাক্ষরে যুবকের প্রেমজ আঙুল
সময় ঠিক হাওয়ার মুখে ফেলে রাখে
চুপিচুপি নীল খামের যাবতীয় ভুল…