‘কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা মনে মনে…’

রবিঠাকুরের এই সুরের সাথে হারিয়েছি বহুবার। কখনো কল্পনার জগতে বাহারি রঙের প্রজাপতির নরম মখমলের পাখায় ভর করে হাওয়ায় ভেসেছি তো কখনো বা বাস্তবে হারিয়েছি। হারিয়েছি, কখনো একান্ত নিভৃতে প্রিয়জনের হাত ধরে আবার কখনও বা সদলবলে হৈ হৈ রব তুলে। ভ্রমণ আমার নেশা। ধরতে গেলে প্যাশন বৈকি।

আলহামদুলিল্লাহ! ঘুরাঘুরি করা মোটামুটি মন্দ হয় না। কখনও ঐতিহ্যময় কলকাতার ব্যস্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে মাটির মটকায় রাখা গরম চায়ের ধোঁয়ায় ডুবেছি। কান পেতে শুনেছি ভিক্টারিয়া মেমোরিয়ালের গুরু গম্ভীর গাম্ভীর্যতাকে। প্রিয় লেখক শংকরের বইয়ের পাতায় পড়ে নেওয়া সেই কল্পনার কলকাতাকে যে কতবার ছুঁয়ে দিয়েছি। উড়ে গেছি কখনও গড়ের মাঠের খাঁ খাঁ শূণ্যতার মাঝে তো কখনও কফি হাউসে গুনগুনিয়েছি মান্না দের সেই গানের সুর। নাখোদা মসজিদের রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে মনে মনে অনুভব করেছি কালের আবর্তে হারিয়ে ফেলা পূর্বপুরুষদের মিলিয়ে যাওয়া পদধ্বনির শব্দ।

পাড়ি দিয়েছি সম্রাট শাহজাহান আর সম্রাজ্ঞী মমতাজ বেগমের সপ্তাশ্চর্যের সেই শ্বেত শুভ্র অমর অপার্থিব প্রেম কে ছুঁয়ে দেখতে। ভারত বর্ষের অগ্নিঝড়া স্বাধীনতার শিহরণে শিহরিত হয়েছি দিল্লীর সেই রেড ফোর্ট প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে। কানে ভেসে এসেছে চৌকস মোগল সেনাদের তেজী ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ। রাজস্থানের ধূধূ বালুময় বুকে মরুর জাহাজ উটের পিঠে সওয়ার হয়েছি। কখনও গোলাপি শহর জয়পুরের আবির গায়ে মেখে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছি।

কাশ্মীরের জান্নাতি সৌন্দর্যে উদ্বেলিত হয়েছি, হয়েছি আপ্লুত। রহস্য প্রদেশ সিকিমের পাহাড়ি রহস্যে ডুব দিয়েছি। অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি ভূটানের প্রেমে মজেছি অনায়সেই। আরও কত কত কাহিনী যে এমন রয়েছে স্মৃতির পাতাকে সমৃদ্ধ করে নিতে! অশান্ত প্রশান্ত মহাসাগর বক্ষে মৎস কন্যার মত ভেসে বেড়িয়েছি প্রিয় মানুষটার সঙ্গে। আবিষ্কার অনুভব করেছি এই অতল সুগভীর জলরাশির লুকায়িত রহস্য রোমান্চ। জল দস্যুদের ভয়ে কেঁপে উঠেছি রেড সী-তে ভেসে বেড়ানোর সময়কার নিকষ অন্ধকারে ডুবে যাওয়া রাতগুলিতে। এই হাঁকিয়ে বেড়িয়েছি শ্বেতাঙ্গ সাহেবদের দেশ। তো কখনও অবাক হয়েছি সভ্য জাতির দেশ সিঙ্গাপুরের বাডপার্কের নানা দেশের নানারকমের পাখির সমারোহে সাজিয়ে তোলা ভিন্নজগতের মাধুর্য দেখে।

যাই হোক। অনেক কিছু বলা হয়ে গেল।মূল কথা থেকে সরে যাচ্ছি। আসলে, আজ আর অন্য কোন দেশের স্তুতি গাইতে নয়। আজ এসেছি রূপসী বাংলাদেশের এক আশ্চর্যজনক জায়গার কথা শোনাতে। হ্যাঁ। আজ শুধু বলব আমার প্রিয় জন্মভূমির রূপের কথা। সে এক আশ্চর্য রূপকথা!

যে সময়টার কথা বলছিলাম, সেটা ছিল ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাস। পৌষের এক হিম সকালে বাড়ির বাইরে সাজানো এক চিলতে ছোট্ট সবুজের ওপর বিন্দু বিন্দু জমে থাকা শিশির বিন্দু গুলি সূর্যের সোনালি কিরণের পরশে তখন নিজেদের বিচ্ছুরণ ঘটাতে ব্যস্ত। সেই সৌন্দর্যে চোখ বুলিয়ে নিতে নিতে একহাতে গরম চায়ের কাপ আর একহাতে ধরে থাকা খবরের কাগজটি সবে মেলব মেলব করছি তো তখুনি ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রীণে ভেসে উঠেছে আমাদের সবার প্রিয় ভ্রমণ রসিক দুলাভাইয়ের নাম। ফোনটা কানে তুলে নিতেই যে প্রস্তাবটি পেলাম সেই মুহুর্তে সেইটার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না সত্যি। দুদিনের ছোট্ট ট্যুর।গন্তব্য সিলেট।চৌদ্দ তারিখ ভোরে যাত্রা শুরু। ঢাকায় ফিরে আসা সতের তারিখ। আরো দুটা ফ্যামিলি যাবে সাথে। টুকটাক আরো দু চারটি কথা সেড়ে নিয়ে লোভনীয় প্রস্তাবটি ভেবে দেখার কথা বলে ফোন যখন রাখলাম ততক্ষণে উত্তেজনায় আমার ভেতরে কাঁপাকাঁপি আরাম্ভ হয়ে গিয়েছে। বাচ্চাদের স্কুলও বন্ধ।হাতে অখন্ড অবসর। তাহলে আর দেরী কিসের? আমার সাহেব আর আমি তাই ঝটপট রাজি হয়ে গেলাম।

পরিকল্পনানুযায়ী, নির্ধারিত দিনেই কাকডাকা ভোর বেলাতে পাতলা কুয়াশার ধোঁয়াশাকে ভ্রমণ সঙ্গী করে নেই। আর সেই সাথে শীতের সূঁচ কাঁটার ভয় উপেক্ষা করে আমরা সিলেট অভিমুখে যাত্রা শুরু করে দেই। গল্প, গুজব, গান, আনন্দ উল্লাসের মধ্য দিয়েই সময় কেটে গেল বেশ। সবুজ শহর সিলেটে পৌঁছেও গেলাম একসময়। পথিমধ্যে কোন এক রেস্তোরায় বসে বাঁশের পেয়ালার মাঝে গরম চায়ে চুমুক দিয়ে যে তৃপ্তিটা পেয়েছিলাম তা আজও ভুলি নি সত্যি।

আমরা প্রথম দিনে ঘুরলাম বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য জায়গা। তার মধ্যে ছিল বিছানাকান্দি আর রাতারগুল বন। বিছানাকান্দি নিয়ে আমি এখানে তেমন কিছু বলব না। আগের বার সিলেটে এসেও এই জায়গা দেখেছি। আমার আগ্রহ ছিল দ্বিতীয় স্থানটির প্রতি।

আমি মূলত উদগ্রীব ছিলাম রাতারগুল ভ্রমণের জন্য। এই জায়গাটি নিয়ে অনেক সৌন্দর্য বন্দনা শুনেছি। গুগলের চাকায় সওয়ার হয়ে কল্পনায় এখানে ঘুরেছি কত! বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম্প ফরেস্ট এই রাতারগুল। একে বলা হয় বাংলাদেশের আমাজন। আমাজন দেখবার সৌভাগ্য কখনও হবে কিনা জানি না। তবে আমার মনে হয় রাতারগুলের রাজসিক আবেদন আমাজনের থেকে কোন অংশে বৈ কম হবে না।

বিছানাকান্দির শীতল জলে পা ভিজিয়ে যখন রাতারগুলের জন্য এগুচ্ছিলাম ততক্ষণে সূর্য মধ্য গগণে ঢলে পড়েছে। আমাদের দুধেল সাদা মাইক্রটা তেজসিক ক্ষীপ্ত অশ্বের মত যেন গন্তব্য স্থলের দিকে ছুটে যাচ্ছিল। পুরো পথটা আমরা বেশ আনন্দ উল্লাসে পার করে নিচ্ছিলাম। পথের চারপাশে কেবলই সবুজ আর সবুজ। সাজানো গোছানো পরিপাটি শহর সিলেট। অনিন্দ্য এর রূপ আর অতুলনীয় এখানকার অতিথিপরায়ণ মানুষগুলি।

এবার রাতারগুল সম্পর্কে একটু বলি। একে বলা হয় সিলেটের সুন্দরবন। এটি সিলেট জেলা শহর থেকে ২৬ কিমি দূরে গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। এর বিস্মৃতি ৩০,৩২৫ একর জায়গা জুড়ে। এই বিশাল আয়তনের ৫০৪ একর জায়গা জুড়ে বন আর অবশিষ্টাংশকে পূর্ণতা দিয়েছে ছোট বড় সব জাদুকরী জলাশয়।

আমাদের গাড়ি মূলত খাদিম চা বাগান ও খাদিম জাতীয় উদ্যানের ভেতরের রাস্তা দিয়ে রাতারগুলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। রাস্তায় এর ওর কাছ থেকে লোকেশান বুঝতে বুঝতে অবশেষে গাড়ি শ্রীঙ্গি ব্রীজের নাগাল ছুয়ে দিল।

আমরা নেমে পড়তেই পৌষের পড়ন্ত বিকেলের হিমেল বাতাস চোখমুখে পরশ বুলিয়ে দিল। আশেপাশে কি নিস্তব্ধতা। কেবল থেকে থেকে পাখির ডাক শোনা যাচ্ছিল। কিছুদূর পায়ে হেঁটে এগুতেই পাই জরাজীর্ণ ছাপড়া দোকান। হ্যাজাকের মলিন আলোয় কেমন আলোছায়ার আবহ তৈরী করে নিয়েছিল সেই খানে। স্টোভের ওপর বসানো কেতলিতে ফুটতে থাকা চায়ের লিকারের মন মাতানো সুবাস চায়ের তেষ্টাকে উশকে দিল খুব। বেলা গড়িয়েছিল অনেক। দিনমণি স্মিত হাসি নিয়ে পশ্চিমাকাশের রাস্তা মাপার প্রস্তুতি নিতে শুরু করবে করবে ভাব। তাই চায়ের লোভ সংবরন করে নিয়ে দ্রুত পা চালালাম সকলে। ছোট বড় টিলা। লাফিয়ে ডিঙিয়ে চলতে চলতে আচমকা প্রবেশ করি ঘন সবুজের রাজ্যে।

হেঁটে যাচ্ছিলাম পাটি বা মূর্তা বনের বুক চিড়ে। আমাদের অনেকের বাসাতে শীতল পাটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। ষোল আনা শৌখিন বাঙালিয়ানা প্রকাশ করতে এর কোন জুড়ি নেই আসলে। প্রতি বছর বৈশাখী মেলা থেকে একটা শীতলপাটি কেনার খুব ইচ্ছে কাজ করে মনের মাঝে। এত কথা বলার কারণ হলো, সেই জাদুর পাটির বুননে ব্যবহার হয় এই মূর্তাগাছ। যার আরেক নাম রাতা। আর এই রাতা গাছের নামানুসারে এই বনের নাম “রাতারগুল” বন।

মূর্তা বনের মাঝে দুপাশে সবুজের সাড়ি রেখে যখন মাঝ রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম মনের মাঝে তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি খেলা করছিল। ঘন সবুজের ফাঁক ফোঁকড় দিয়ে কৌতুহলী শিশু দৃষ্টির মতই সূর্যরশ্মিরা সব থেকে থেকে উঁকি ঝুঁকি মারছিল। লম্বা লম্বা অতিকায় গাছগুলো কেমন আদিমতার নীরব স্বাক্ষী দিয়ে যাচ্ছিল অবিরত। হঠাৎ ছন্দ পতন ঘটাচ্ছিল কোন এক পাখির ডাক, নিস্তব্ধতা ভেঙে দেওয়া ঝিঁঝিঁ পোকার একমনা সুর, পায়ের নীচে পড়ে থাকা শুকনো পাতার মর্মর ধ্বনি। কেবল মনে হচ্ছিল কল্পনা আর বাস্তবতা এখানে মিল খুঁজে নেবার প্রচেষ্টায় মগ্ন। আশ্চর্য! নিস্তবদ্ধতারও যে নিজস্ব ভাষা রয়েছে তা আজ বুঝলাম। নির্জনতার পিঠে চেপে আমার মনের যত না বলা কথাগুলি জঙ্গলের মাঝে স্তবদ্ধতা বৃত্ত বলয়ে পাঁক খেতে থাকল। আমাদের কারও মুখে কোন কথা ছিল না। আসলে বলার মত কেউ কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না একদমও। কানে কেবল বেজে যাচ্ছিল নিজের নি:শ্বাসের শব্দ আর পত্র পল্লবের মর্মর ধ্বনি। চারপাশের এই শূণ্যতার মাঝেও জীবনের অনন্য এক পূর্ণতা খুঁজে পাচ্ছিলাম। এমন রোমান্চের স্বাদ নিতে নিতে একসময় নিজেদের আবিষ্কার করলাম স্বচ্ছ জলাধারের সামনে।

স্থির জলের ওপর কলাপাতার মত ভেসে রয়েছে কতগুলি নৌকা। আমার মনে হল যেন ক্যানভাসে আঁকা কোন ছবি। সৃষ্টিকর্তা তাঁর তুলির স্পর্শে কি নিপুণ এক আলেখ্য এঁকে নিয়েছেন এই গহীন জনমানবহীন প্রান্তরে। এবার নৌকা ভাড়া করা হল। এই নৌকাগুলি দিয়ে এখন বনের ভেতর প্রবেশ করার পালা। দামদর করে নিয়ে ঝটপট দুটো নৌকায় সবাই মিলে উঠে পড়লাম। আবারও মন ভাবনার রাজ্যে ভেসে যায়। রবিঠাকুরের সেই ‘সোনার তরী’ যেন আমাদেরকে ভাসিয়ে নেয় সেই সুদূর ভারতের কোল ঘেঁষে ঘুমিয়ে থাকা মায়াকন্যা মেঘালয়ের অভিমানী অশ্রুধারার স্রোতে ।যে স্রোতবহা তার আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে গোয়াইন নদীর বুকে।বহতা নদী পরম যত্নে তার উচ্ছ্বল শাখার জলে চাঙ্গোরী খালের পাদদেশ ছুঁয়ে প্লাবিত করেছে এই রাতারগুল বনকে।

আমাদের নৌকার মাঝি দ্রুত বৈঠা বাইছিল। বৈঠার সাথে মায়াবী জলের স্পর্শে পানিতে এক অদ্ভুত সুর মূর্ছনার সৃষ্টি করছিল। আমি কান পেতে তা শুনতে থাকি।বেলা বেশ পড়ে গিয়েছিল। বাতাসে শীতের হিমেল কোমল স্পর্শ। সূর্যরশ্মি এখন কোমল ভাবে ইত:স্তত এখানে সেখানে ছুটতে চাইছিল যেন। আমাদের ভাসিয়ে নেওয়া ময়ুরপঙ্খি আরও গভীরে প্রবেশ করল। দুই ধারে সবুজ বৃক্ষ রাজি কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে। তারা যেন মাথা নুয়ে অভিবাদন জানাচ্ছিল তাদের খেয়ালে হারিয়ে যেতে। স্ফটিকার স্বচ্ছ জলে পড়েছে তাদের সবুজ প্রতিবিম্ব। একি জাদুর কোন আয়না! চোখে যেন রূপকথার আবেশ নেমে এসেছে। আমি সবুজ জল ছবির খেলা দেখতে থাকি। রঙতুলির আগাতে লেগে থাকা রঙ কাগজে ছুঁইয়ে নেওয়ার মতই এখানেও পানিতে লেপ্টে থাকা গাছের সবুজ প্রতিবিম্বটাও কেমন ছড়িয়ে পড়ে সেই জাদুকরী নীরের মাঝে। স্নিগ্ধ জলের সেই স্নিগ্ধতা যেন অন্জলির মত দুহাত পেতে গ্রহণ করে নিচ্ছিল দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপার শান্ত প্রকৃতি। পানির সেই বুনো সুঘ্রাণটা নাকে এসে লাগে হঠাৎ। কি এক অস্থির করা মাদকতা। ক্রমে জঙ্গল আরও ঘন হয়ে যায়। রবি কিরণের এখানে প্রবেশ করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। বিরাটার প্রাচীণ বৃক্ষরাজি তাদের সৌষ্ঠব বৃক্ষমূল সবুজাভ জলরাশির মাঝে ছড়িয়ে নিয়েছে সর্বত্র। মাঝে মাঝে নৌকা থেকে হাত বাড়িয়ে তাদের স্পর্শ করলাম। কি দারুণ অনুভূতি!

হঠাৎ জলের মাঝে টুপ করে ডুব দিতে দেখলাম রসিক পানকৌড়িকে। গাছের ডালে ফিঙে পাখির রাজকীয় দোল খাবার দৃশ্য চোখে পড়ল অনেকবার। গাছের ডালে লেজ উঠিয়ে লাফিয়ে চলা চন্চল কাঠবেড়ালির লম্ফঝম্পও নজর এড়াল না। এরমাঝে নৌকা একজায়গায় ভিড়ল।সামনে দৈত্যাকার ওয়াচ টাওয়ার। ওপরে বিস্মৃত আকাশটাকে যেন নির্দয় সৈনিকের মত ফুঁড়ে দিয়েছে। বিশাল দানোর মত যেন গোটা বনটাকে নজরবন্দী করে রেখেছে। মনে হচ্ছিল যেন ছেলেবেলায় বইতে পড়া গ্যালিভার আমাদের সামনে উপস্থিত হয়েছে।

সেই টাওয়ারের চূড়ায় দাঁড়িয়ে শেষ বিকেলের পড়ন্ত আলোতে প্রাণভরে অবলোকন করে নিলাম সেই “জল ও জঙ্গলের” অপূর্ব সৌন্দর্যগাঁথা। ধীরে আকাশের ললাটে লাগল চন্দনের ছোঁয়া। স্বর্ণালু সেই আলো তার নরম আদুরে আবেশ ছড়াল চারপাশে। আর কিছুক্ষনের মাঝেই চারপাশের প্রকৃতি পাতলা অন্ধকারের চাদর গায়ে জড়ানোর প্রস্তুতি শুরু করে দিবে তাই আমরাও যাত্রার ইতি টেনে নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।

পানির জলতরঙ্গ শুনতে শুনতে যখন ফিরছিলাম ভাসমান সবুজের মাথায় তখন আঁধার জমাট বাঁধতে শুরু করে দিবে দিবে। সূর্যের আলো এখন একদম স্মিত। রহস্যময়ী তার রহস্য লুকিয়ে নিচ্ছিল ধীরে ধীরে। প্রাণভরে নি:শ্বাস নেই। মনোরোম সন্ধ্যা আচমকা উদ্বেলিত হয় মাঝির দরাজ গলার সুরে। মুগ্ধ আমরা। চুপচাপ ভেসে যাই সেই সুরের মূর্ছনায়।

কি সুন্দর আমার দেশ! আমার প্রিয় মাতৃভূমি। আমার বাংলাদেশ।হঠাৎ মনে হল পরের দিন ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বিজয় দিবসের সেই লাল সবুজের আলিঙ্গন সহসাই দেখতে পেলাম চোখের সামনে। আকাশের বুকে অদৃশ্য সুঁতোয় ঝুলে থাকা রক্তিম লাল সূর্যটা ধীরে ধীরে তখন হারাচ্ছিল ঘন সবুজের আড়ালে। স্বাধীনতা সত্যি ই এত… সুন্দর হয়? আমি আবারও বিমুগ্ধ! বিমোহিত! মনের অজান্তে ই আনমনে গুনগুনিয়ে সুর তুলে নেই কন্ঠে-
“তুমি মিশেছ মোর দেহের সনে
তুমি মিলেছ মোর প্রাণে মনে
তোমার ঐ শ্যামল বরণ কোমল মূর্তি
মর্মে গাঁথা…”