মহানবী (সাঃ)-এর সীরাতের আলোকে ব্যবসা বাণিজ্য
আবুল কাসেম হায়দার

যে জীবন মানুষকে অভিভুত করে। যে জীবন বিধাতার নিকট আত্মসমর্পণের একটি যৌক্তিক ও হার্দিক পরিচয় বহন করে এবং যে জীবন সকল মানবের কল্যাণে সর্বসময়ের জন্য নিয়োজিত সেই জীবনের একটি মনোজ্ঞ আলেখ্য আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)।
আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) সম্পর্কে বাংলা ভাষায় যে অসংখ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে, তার মধ্যে কবি গোলাম মোস্তফা রচিত ‘বিশ্বনবী’ অত্যন্ত সুপাঠ্য। কবি গোলাম মোস্তফার বিশ্বনবী রচনার অনেক বছর পরে সৈয়দ আলী আহসান ১৯৯৪ সালে ‘মহানবী’ নামে একটি গবেষণামূলক, তথ্যবহুল গ্রন্থ জাতিকে উপহার দেন। তাছাড়া মহানবী (সাঃ)-এর উপর বিভিন্ন ভাষায় লিখিত অজ¯্র গ্রন্থ বিভিন্ন গুণী লেখক বাংলায় অনুবাদ করেন।
বিশ্বনবী গ্রন্থের ‘প্রতিশ্রুত পয়গম্বর’ শীর্ষক নিবন্ধে কবি গোলাম মোস্তফা উল্লেখ করেনÑ
“হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রতিশ্রুত পয়গম্ব (চৎড়সরংবফ ঢ়ৎড়ঢ়যবঃ) অর্থাৎ আল্লাহ যে তাঁকে দুনিয়ায় পাঠাবেন, একথা পূর্বে নির্ধারিত হইয়াছিল। প্রত্যেক শিল্পবস্তুই প্রথমে শিল্পীর ধ্যানে জন্ম লাভ করে, তার অনেক পরে বাহিরে প্রকাশ পায়। হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) সম্পর্কে একথা সত্য। তিনি ছিলেন সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু।
বিভিন্ন প্রাচীন কিতাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘লাওলা খালাক্বা মুহাম্মাদান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসলামা লামা খালাক্বতাল আফলাকা’- মুহাম্ম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসলামকে সৃষ্টি করা না হলে পৃথিবীর কোন কিছুই আল্লাহ্ সৃষ্টি করতেন না।
আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে। আমিনা মাতা তখন তাঁর পিতৃব্যের গৃহে ছিলেন। যখন হযরতের পিতা আব্দুল্লাহর বয়স মাত্র কুড়ি বছর তখন তাঁর সঙ্গে বণি যোহরা গোত্রের আমিনার বিবাহ হয়। বিবাহের কিছুদিন পর বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আব্দুল্লাহ সিরিয়া গমন করেন। প্রত্যাবর্তনের পথে মদীনায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি আর সুস্থ হননি। মদীনা শরীফে তাঁর মৃত্যু ঘটে। এ সময় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) মাতা আমিনার গর্ভে।
মাতা হযরতের জন্মের শুভ সংবাদ তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের নিকট পাঠান। মুত্তালিব নবজাত শিশুকে বক্ষে ধারণ করে কাবা শরীফে আসেন এবং নবজাতকের জন্য আল্লাহ পাকের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ) জন্ম ৮ জুন, ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে ১২ই রবিউল আউয়াল, সোমবার। মতান্তরে ৮ ও ৯ রবিউল আয়াল (আসাহ্হুস্সিয়ার, সীরাতে ইবনে হিশাম)। তাঁর নাম রাখা হয় মুহাম্মদ এবং আহমদ। মুহাম্মদ শব্দের অর্থ হলো ‘পরম প্রশংসিত’ এবং আহমদ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘পরম প্রশংসাকারী’। পবিত্র কোরআনে উভয় নামের উল্লেখ রয়েছে। সুরা আল ফাত্হর ২৯ নং আয়াতে বলা হয়েছে : “মুহম্মদ হচ্ছেন আল্লাহর বাণীবাহক রাসূল এবং যারা তার সঙ্গে আছে তাঁরা (সাহাবায়ে কেরাম) কাফির বা অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে শক্তিমান। বিশ্বাসীগণ নিজেদের মধ্যে করুনাদ্রব এবং সহানুভুতিশীল। সূরা আল সাফ এর ৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
“এবং স্মরণ কর মরিয়ম তনয় ঈসাকে যিনি বলেছিলেন, হে বণি ইসরাঈলগণ, আমি আল্লাহর রাসুল, আমাকে প্রেরণ করা হয়েছে আমার পূর্বে যে সত্য প্রবর্তিত হয়েছিল তাকে সমর্থন করার জন্য এবং আমি শুভ সংবাদ দিতে এসেছি, আমার পরবর্তীতে যিনি আল্লাহর রাসুল হিসেবে আসবেন তার সম্পর্কে, তার নাম হবে আহমদ।”
রসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ৪০ বছর বযসে নবুয়ত লাভ করেন। হেরা গুহায় তিনি ধ্যানরত অবস্থায় ছিলেন। এ সময় হযরত জিব্রাঈল (আঃ) এলেন প্রথম ‘ওহী’ তথা ঐশী বার্তা নিয়ে। জিব্রাঈল (আঃ) মুহাম্মদ (সাঃ) কে বললেন, ‘বলনু ইকরা’। পাঠ করুন। মুহাম্মাদ (সাঃ) বললেন : ‘আমি পড়তে জানি না।’ ফেরেশতা পুনরায় তাঁহাকে বলিলেন : ‘পাঠ কররুন’। মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও বললেন : ‘আমি পড়তে জানি না।’ জিব্রাঈল (আঃ) তখন মুহাম্মদ (সাঃ)কে আলিঙ্গন করিলেন। এইভাব তিন বার আলিঙ্গনের পর মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মুখ থেকে উচ্চারিত হলো :
“ইক্বরা বিস্মি রাব্বিকালাøযী খলাক্ব। “পাঠ কর তোমার সেই প্রভুর নামে, যিনি সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছেন। যিনি এক বিন্দু রক্ত থেকে মানুষকে সৃষ্টি করিয়াছেন, পাঠ কর তোমার সেই মহিমাময় প্রভুর নামে, যিনি কলমের সাহায্যে জ্ঞান শিক্ষা দিয়াছেন, যিনি মানুষকে অনুগ্রহ করে অজ্ঞাতপূর্ব জ্ঞান দান করেছেন।”

মহান আল্লাহতায়ালার বাণী যে ভাষায় এবং উচ্চারণে মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ)এর নিকট এসেছিল আজও তা একই ভাষায়, একই উপস্থাপনা এবং সুষমায় বিদ্যমান রয়েছে। এর ফলে এর তাৎপর্যের কোনও পরিবর্তন ঘটেনি। ইসলামের অলৌকিকতা এখানেই যে কোরআন শরীফের বাণী সর্বকালের সকল সময়ের জন্য আধুনিক, প্রাত্যহিক এবং প্রাসঙ্গিক। এই প্রাসঙ্গিকতাকে ব্যাখ্যা করে গিয়েছিলেন মহানবী তাঁর আচার আচরণ, জীবন যাপন, কর্ম ব্যবস্থাপনা এবং সুচিন্তিত ও পরিশীলিত নির্দেশনা দ্বারা। তাই তাঁর জীবনের নানা অনুষঙ্গ নিয়ে পৃথিবীতে ব্যপক আলোচনা হয়েছে, তিনি সব সময় বিপুল মানুষের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাঁর জীবন কথা নিয়ে বহু গবেষণা হয়েছে, নানারূপ তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা হয়েছে, ঐতিহাসিক সত্য নির্ধারণের চেষ্টা হয়েছে, বিশ্লেষণ হয়েছে এবং অভিভূত মানুষের বিনয় প্রকাশ ঘটেছে। এ ধারা কখনও শেষ হবে না। চলতে থাকবে যতদিন বিশ্ব থাকবে।

ব্যবসা বাণিজ্যঃ
এই নিবন্ধে মহানবী মুহাম্মাদ (সাঃ)৬৩ বছরের জীবনের সুবিশাল সীরাত বা জীবন চরিত থেকে একটি ক্ষুদ্র বিষয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো ইনশাল্লাহ। সেটি হলো ব্যবসা বাণিজ্যের একটা অংশ বিশেষ। ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয় নবুয়তের পূর্বে ও পরে রসুল করিম (সাঃ) ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিরূপ ছিল, কিভাবে তিনি ব্যবসা বাণিজ্য করেছেন, কি কি নিয়মকে ব্যবসার ক্ষেত্র গুরুত্ব দিয়েছেন, আল্লাহ পাক তার পবিত্র মহাগ্রন্থে ব্যবসা সম্পর্কে কি বলেছেন, আর রসুলে করিম (সাঃ) ব্যবসা নিয়ে কি কি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন তা প্রবন্ধের মূল বিষয়।
দাদা আব্দুল মুত্তালিবের ধন সম্পদের পরিমাণ জীবনের শেষের দিকে কমতে থাকে। মুত্তালিব মৃত্যুকালে যে সম্পদ রেখে গিয়েছিলেন সে তেমন বেশি ছিল না। ছেলেদের মধ্যে সম্পদের বন্টনের পর আবু তালিব সামান্য সম্পদ লাভ করেন। এদিকে বালক মুহাম্মাদ (সাঃ) এর রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্ব নেন চাচা আবু তালিব। রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) চাচার মেষ পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মক্কার নিকটবর্তী পাহাড়ের পাদদেশে মুহাম্মাদ (সাঃ) ছাগল ও মেষ চড়াতেন। কখনও কখনও চাচা আবু তালেব তাকে নিয়ে দূরে পথে যেতেন।
যখন হযরতের বয়স মাত্র নয় বছর তখন চাচা আবু তালেব তাকে নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে সিরিয়া গমন করে। এটাই রসুলের জীবনে প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। সিরিয়া ভ্রমণ রসুলের জীবনে অনেক বড় ঘটনা। বিচিত্র অভিজ্ঞতা, নানা বিষয়ে জ্ঞান ও সৃষ্টি সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য তাঁর হৃদয়ে স্থান করে নেয়। আবু তালেবের কাফেলা সিরিয়ার এক প্রসিদ্ধ বাণিজ্য কেন্দ্র বসরা নামক স্থানে তাঁবু খাটায়। ঐ তাঁবুর নিকট ছিল একটি খ্রিস্টানদের মট। সেখানে ‘বহিরা’ নামক একজন জ্ঞানী পাদ্রী ছিলেন। সেই পাদ্রী ইহুদী ধর্মগ্রন্থ ‘তাওরাত’ এবং খ্রিস্টান ধর্ম গ্রন্থ ‘ইঞ্জীল’ থেকে শেষ নবীর লক্ষণ ও পরিচয় সম্পর্কে সম্যকভাবে জ্ঞাত ছিলেন। পাদ্রী ‘বহিরা’ আধ্যাত্মিক জ্ঞানে সমৃদ্ধ থাকার কারণে বুঝতে পারলেন আবু তালিবের সফর সঙ্গী হিসাবে বালক মুহাম্মাদ (সাঃ) সর্বশেষ নবী। তাই পাদ্রী আবু তালেবকে কসম দিয়ে বললেন, “এই বালককে যত সত্বর সম্ভব সাবধানে দেশে পৌছে দিতে যতœবান হোন।”
আবু তালিব দ্রুত সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরলেন। বালক মুহাম্মাদ (সাঃ) কে মক্কায় পাঠিয়ে দিলেন। এটাই মুহাম্মাদ (সাঃ) জীবনের প্রথম ব্যবসায়িক সফর, এ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান লাভ।
যৌবনে উপনীত হয়ে তিনি ব্যবসাকে জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। একজন ব্যবসায়ীর প্রধান গুণ হচ্ছে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসেবে মহানবী (সাঃ) তাঁর সমকালের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত ছিলেন।
ব্যবসা ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, আরব দেশেও ছিল। ব্যবসায় তাঁর সঙ্গে যাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তারাও তাঁর নানাবিধ সদগুণের প্রশংসা করেছে।
ব্যবসার ক্ষেত্রে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়ে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন সকলের নিকট আস্থাভাজন এবং প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র বিশ বছর।
আরব দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জ্ঞান গরিমায় অনেক সময় রমণীরা পুরুষের সমান ছিল। এ রকম একজন রমণী ছিলেন বিবি খাদিজা। সে সময় চর্তুদিকে সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য মুহাম্মাদ (সাঃ) এর খুব সুনাম ছিল। তিনি ছিলেন আল আমীন তথা দল মত নির্বিশেষে সবার কাছে অবিসংবাদিত বিশ্বস্ত রক্ষক। বিবি খাদিজা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে তাঁর ব্যবসায় নিযুক্ত করলেন এবং সিরিয়ায় পণ্য সামগ্রী নিয়ে যাবার জন্য মুহাম্মাদ (সাঃ) নিযুক্ত করলেন। এইভাবে রসুলে করিম (সাঃ) নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে ব্যবসা সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন।
নবুয়ত লাভের পর মুহাম্মাদ (সাঃ) পুরোদমে ইসলাম প্রচারে নিজকে নিয়োজিত করলেন। এরপর ব্যক্তিগত ব্যবসা-বাণিজ্যে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি। ইসলাম প্রচারের সর্বশক্তি নিয়োগের পর আল্লাহ পাকের নির্দেশে মদিনা রাষ্ট্র কায়েমের মাধ্যমে ইসলামের প্রথম ছোট্ট মডেল উপহার বিশ্ববাসীর নিকট রাখলেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন রসুল কারীম (সাঃ) এর মাধ্যমে পবিত্র কোরআনকে ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে জীবনের সকল বিষয়ে মানব জাতির জন্য শিক্ষনীয় ও অনুকরণীয় করে প্রতিষ্ঠিত করলেন।
পবিত্র কোরআনে ব্যবসা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ক্রয় বিক্রয় ব্যবসা-বাণিজ্য হালাল করিয়াছেন, কিন্তু সুদ ও সুদভিত্তিক যাবতীয় কারবার হারাম বলিয়া ঘোষণা করিয়াছেন। (সুরা বাক্বারা: ২৭৫)
অর্থ উপার্জনের মধ্যে সবচেয়ে সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। অন্যান্য সকল উপায় অপেক্ষা ব্যবসা বাণিজ্য শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। তাই পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ব্যবসা বাণিজ্য সম্পর্কে অনেক উৎসাহ প্রদান করেছেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :
“নামাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড় আল্লাহর অনুগ্রহ তথা ধন সম্পদ অনুসন্ধান কর।” (সূরা জুমু‘আ: ১০)
আল্লাহ নামাজ কায়েম করতে বলেছেন এবং নামাজ শেষে মসজিদে বসে না থেকে নিজের উপার্জনের জন্য কাজে ব্যস্ত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্পদ নিয়ে অনুসন্ধান, গবেষণা করতে বলেছেন। সম্পদ আহরণ করতে বলেছেন। সম্পদ উপার্জন করার তাগিদ দিয়েছেন। নামাজ পড়ে ঘরে বসে থাকতে বলেননি। তাই সকল নবী রসূলগণ আল্লাহ নির্দেশ অনুযাযী উপার্জনের জন্য ব্যবসাকে উপার্জনের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছেন। (তিজারত ও মা‘ঈশাত)
আমাদের প্রিয় নবী (সাঃ) নবুয়তের পূর্ব থেকে ব্যবসাকে জীবিকা উপার্জনের প্রধান মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করেছেন এবং আমাদেরকে এভাবে জীবিকার মাধ্যম গ্রহণের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনে দিক নির্দেশনা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে মানব জাতির জন্য এক অনুকরণীয় আদর্শ রেখে গিয়েছেন।
আমাদের প্রিয় নবী করিম (সাঃ) মানবজাতিকে ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য বিশেষ উৎসাহ প্রদানের পাশাপাশি সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও ন্যায়পন্থী ব্যবসায়ীদের বিশেষ মর্যাদার কথা তিনি উল্লেখ করেছেন :
“সত্যবাদী, ন্যায়পন্থী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী আম্বিয়া, সিদ্দীক ও শহীদ প্রভৃতি মহান ব্যক্তিগণ সমান মর্যাদায় অভিষিক্ত হইবেন।” (আবূদাউদ, তিরমিযী ২য় খন্ড)।
ইসলামে ব্যবসা বাণিজ্যকে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কাজ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসা অতি উত্তম ইবাদত হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একজন সত্যবাদী, ন্যায়-পন্থী বিশ্বস্ত ও সৎ ব্যবসায়ীকে শহীদ, আম্বিয়া কিরাম (আঃ) এবং সিদ্দিকীনদের কাতারে শামিল করেছে। এরচেয়ে মর্যাদার আর কি হতে পারে। কিন্তু আমাদের সমাজে, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে ব্যবসায়ীদের কি নমুনা আমরা দেখতে পাচ্ছি! আমাদের প্রিয় নবী, অন্যান্য নবী, আম্বিয়া (আঃ) নিজেদের উপার্জনের কী দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন, তা কি আমরা একাবরও ভেবে দেখছি।
ব্যবসার সব চেয়ে উত্তম বিষয় হচ্ছে প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করা। সততার সঙ্গে ব্যবসা করা। সময়, কাজ, ইত্যাদিতে নিয়মানুবর্তিতা রক্ষা করা। আধুনিক ব্যবসায় আর্থিক সরাসরি লেনদেন ছাড়াও চুক্তিপত্রের মাধ্যমে তথা এলসির মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। নবীজী (সাঃ) এর সময় এলসি না থাকলেও তাদের মুখের কথা, মৌখিক প্রতিশ্রুতিই ছিল এলসি থেকে বিশ্বস্ত মাধ্যম। একজন ব্যবসায়ীর প্রধান গুণ হচ্ছে প্রতিশ্রুতি পূরণ করা এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা। নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে একজন সৎ ব্যবসায়ী হিসাবে মহানবী (সাঃ) তাঁর সময়কালের এক সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত ছিলেন। তিনি অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে তাঁর কর্তব্য সম্পাদন করতেন। মানুষ তাঁর উপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করতে পারতো। সুনানে আবু দাউদ শরীফে বর্ণিত আছে যে, আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই আল হামসা (রাঃ) বলেন, রাসুল (সাঃ) এর নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে তিনি রাসুল (সাঃ) এর সাথে ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু কাজ করছিলেন। দানের কিছু অংশ দেয়া হয়েছিল এবং কিছু অংশ বাকি ছিল। ইবনে উবাইআল হামসা (রাঃ) রাসুল (সাঃ) -কে বললেন, “আপনি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন আমি বাকি টাকা পরে নিয়ে আসছি। ঘটনা চক্রে ইবনে ওবাই আল হামসা (রাঃ) এ প্রতিশ্রুতির কথা ভুলে যান। তিন দিনের দিন হঠাৎ তাঁর মনে পড়ল এবং তিনি বাকি টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুত স্থানে উপস্থিত হয়ে রাসুলে (সাঃ)কে সেখানে দেখতে পেলেন। ইবনে ওবাই আল হামসা (রাঃ) রাসুল (সাঃ) এর মধ্যে কোন বিরক্তির ভাব দেখলেন না। তিনি শুধু বললেন, ‘তুমি আমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছো, আজ তিন দিন যাবত আমি এখানে তোমার অপেক্ষায় বসি আছি।’
দেখুন কেমন দৃষ্টান্ত মহানবী (সাঃ) আমাদের জন্য ব্যবসার ক্ষেত্রে স্থাপন করে অনুকরণের জন্য রেখে গিয়েছেন। আমরা কি তাই করছি! আমরা কি মহানবীর ব্যবসায়িক জীবন থেকে নিজের জীবনে শিক্ষা গ্রহণ করছি! কেউ কেউ হয়তো কিছু কিছু করছি। কিন্তু অধিাকংশ ব্যবসায়ী তা করছি না। এটি অন্যায়। এই অভ্যাস আমাদের আগে ত্যাগ করতে হবে। কোরআন ও হাদীসের আলোকে ব্যবসায়ী হিসাবে নাজাত পেতে হলে আমাদের উল্লিখিত চরিত্রের অধিকারী হতে হবে। তবেই মুক্তি মিলবে।

সুদ ও ব্যবসা :
স্যার জেমস স্টুয়ার্ট এর মতে, অর্থনীতি এমন এক শাস্ত্র যা এক ব্যক্তি সমাজের একজন হওয়ার দিক দিয়ে কিরূপ দূরদৃষ্টি ও মিতব্যায়িতার সাথে নিজ ঘরের যাবতীয় প্রয়োজন পূর্ণ করতে পারে তা আমাদেরকে বলে দেয়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মার্শাল বলেন, অর্থনীতি মানুষের জীবনের সাধারণ কার্যাবলীর পর্যালোচনা মাত্র।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ কেয়ার্নক্রম-এর মতে, সমাজের সাধারণ মানুষের সর্ববিধ প্রয়োজন অনুসারে পণ্যের উৎপাদন, উৎপন্ন পণ্যের সুবিচারপূর্ণ বন্টন এবং উৎপাদনের উপায় ও এর সঠিক বন্টনের ন্যায়নীতি সম্পন্ন প্রণালী নির্ধারণ করাই হচ্ছে অর্থনীতির কাজ।
ইসলামী অর্থনীতির সংজ্ঞা এর চেয়ে ভিন্নতর এবং সর্ব দিক থেকে পূর্ণাঙ্গ। মাওলানা হিফযুর রহমান (র:) বলেন, শরীয়তের পরিভাষায় যে বিদ্যা বা জ্ঞানের মাধ্যমে এমন সব উপায় সম্বন্ধে জ্ঞাত হওয়া যায় যার দ্বারা ধন সমৃদ্ধ আহরণ ও ব্যয়ের উপযুক্ত ও সঠিক পন্থা এবং বিনষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ নির্দেশ করা হয়, তাকে ইসলামী অর্থনীতি বলা হয়। (ইসলামী ইকতিসাদী নিযাম)
সুরা বাক্বারার ২৭৫ নং আয়াতে আল্লাহ বলছেন, “আল্লাহ তায়ালা ক্রয় বিক্রয় ব্যবসা বাণিজ্য হালাল করিয়াছেন কিন্তু সুদ ও সুদভিত্তিক যাবতীয় কারবার হারাম করেছেন।
আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন, “মুসলমানগণ, তোমরা অন্যায়ভাবে অসদুপায়ে পরস্পর পরস্পরের ধন সম্পদ ভক্ষণ করিও না। তোমাদের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে ব্যবসা বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থের আদান প্রদান কর।” (সূরা নিসা: ২৯)
মহানবী (সাঃ) সুদ সম্পর্কে যে পবিত্র হাদীস বর্ণনা করেছেন, তা হচ্ছেÑ
“হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুদদাতা, সুদগ্রহীতা, সুদের চুক্তিপত্রের লেখক ও সাক্ষী সকলের উপর অভিসম্পাত করেছেন এবং বলেছেন, এরা সকলে সমান অধিকারী (সহীহ বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী)
ইসলাম সুদকে নিষিদ্ধ করেছে ঠিক, কিন্তু এর বিকল্প ব্যবস্থার বিধানও দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন স্থানে সুদমুক্ত হালাল উপার্জনের প্রতি নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা সব ধরনের অবৈধ উপায়ে উপার্জনের পথ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা:) থেকে বর্ণিত, একবার হযরত বেলাল (রাঃ) নবী করীম (সাঃ) এর নিকট ‘বর্নী’ (এক ধরনের) খুর্মা নিয়ে আসলেন। নবী করীম (সাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, এ ধরনের খুর্মা তুমি কোথায় থেকে পেলে? তিনি বললেন, আমার কাছে দুই সা (প্রায় আট কেজি) মন্দ খেজুর ছিল, আমি তা এই এক সা (প্রায় চার কেজি) খেজুরের বিনিময়ে বিক্রি করেছি। এটা শুনে রসুলে কারীম (সাঃ) (একাধিকবার) বললেন, আহ! এতো সুদী লেনদেন হয়েছে। আহ! এতো সুদী লেনদেন হয়েছে। এমন লেনদেন আর করো না। অধিক মন্দ খেজুর টাকার বিনিময়ে বিক্রি করবে, তারপর সে টাকায় উত্তম খেজুর ক্রয় করবে (বুখারী, মুসলিম)
এখানে মহানবী (সাঃ) সুদী লেনদেনকে চিহ্নিত করে তা হালাল লেনদেনে রূপান্তরের পদ্ধতি সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দিয়েছেন।
ইসলামে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে কোরআন পাকের পরে রাসুল (সাঃ) কর্তৃক নানা হাদীস বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। নবুয়তের পূর্বে ও পরে মহানবী (সাঃ) নিজ জীবনের কর্মকা- দিয়ে দেখিয়েছেন কিভাবে লেনদেন করতে হবে, কিভাবে পণ্য বিনিময় করতে হবে, কিভাবে বান্দার হক যথাযথভাবে পালন করতে হবে। মদীনা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহানবী (সাঃ) ব্যবসা-বাণিজ্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ সারা বিশ্বের মানুষের জন্য নমুনা স্থাপন করে গিয়েছেন। তা আজও আমাদের সকলের জন্য শিক্ষণীয় অনুকরণীয়।
ধন সম্পদ সঞ্চিত করে রাখা এবং তা অধিক জনকল্যাণের কাজে নিয়োগ না করা ইসলামী অর্থনীতির দৃষ্টিতে মারাত্মক অপরাধ। ইসলামী সমাজের অর্থ সম্পদ কোন ক্রমেই এক হস্তে বা একটি গোষ্ঠীর মুষ্ঠিতে পুঞ্জীভুত হয়ে অব্যবস্থায় পড়ে থাকিতে পারে না। এমন কি, কোন ইয়াতীম শিশুর কোন নগদ অর্থ থাকলে তাও যে কোন লাভজনক কাজে বিনিয়োগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নবী করিম (সাঃ) ইরশাদ করেছেন:
“সাবধান, তোমাদের কেউ ইয়াতীমের সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত হলে এবং তাদের নগদ অর্থ থাকলে তা অবশ্যই ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করবে। সেটা অলস ফেলিয়া রাখবে না। অন্যথায় বাৎসরিক যাকাত ও সাদকাহ তার মূলধন নিঃশেষ করে ফেলবে।” (ইবনে মাজাহ)
পবিত্র কোরআনে এ সম্পর্কে চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করা হয়েছে :
“ইসলামী সমাজের ধন সম্পদ যেন কেবল ধনীদের মধ্যেই কুক্ষিগত ও পুঞ্জীভুত হইয়া থাকিতে না পারে।” (সূরা হাশর:৭)

ব্যবসায়ে ন্যায় নীতি :
ইসলামী অর্থনীতিতে একচেটিয়া ব্যবসায় প্রথা সাধারণভাবে সমর্থন করে না। পণ্য দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়ের ব্যাপারে কোনরূপ ধোঁকা প্রতারণা বা শঠতা প্রশ্রয় দেওয়াকেও ইসলামী অর্থনীতি কখনই বরদাশত করে না। যে সব পন্থায় পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ে লোকদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ বা মনোমালিণ্য সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অথবা যাতে এক পক্ষের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ইসলামে সেই ধরনের ব্যবসাকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
পণ্য দ্রব্য ক্রয় বিক্রয়ের ব্যাপারে সঠিক পরিমাণ না করাÑক্রেতাকে ওজনে কম দেয়া কিংবা নিজ হাতে বেশি ওজন করে রেখে দেয়া ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :
“যাহারা ওজনে কম দেয়Ñ পরের জিনিস ওজন করে নিলে তখন পুরোপুরি গ্রহণ করে, কিন্তু অপরকে যখন ওজন করে দেয়, তখন তার পরিমাণ কম দেয়Ñ এরা নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হবে।” (সূরা মুতাফফীন: ১-৪)
এই ‘ধ্বংস’ কেবল পারলৌকিই নয়, ইহকালীনও বটে এবং কেবল নৈতিকই নয়, নিজের এবং জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এসব অনৈতিকতা মারাত্মক ধ্বংসের কারণ হয়ে উঠে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন :
“পণ্য দ্রব্যের ওজন পূর্ণ কর, ওজন কম দানকারী হইও না। সঠিক দাঁড়িপাল্লায় ওজন কর, লোকদিগকে পরিমাণে কম বা নিকৃষ্ট ও দোষযুক্ত দ্রব্য দিও না, এটা উত্তম ও এর পরিণাম শুভ।” (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩৫)
পণ্য মওজুদ সম্পর্কে ব্যবসা বাণিজ্যে ইসলামী শরীয়া সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। অসাধু ব্যবসায়ীগণ অধিক লাভের আশায় খাদ্যদ্রব্যসহ যে কোন পণ্য অধিক ক্রয় করে দীর্ঘদিন মওজুত রাখে। তাতে পণ্যের স্বল্পতা সৃষ্টি হয়। পণ্যের মুল্য বেড়ে যায়। সাধারণ মানুষ কষ্টে পড়ে। এই কাজ অত্যন্ত অন্যায়। ইসলামের দৃষ্টিতে এই ধরণের কাজ করা নিষেধ। নবী করীম (সাঃ) বলেছেন : “পণ্যদ্রব্য মজুদ করে অধিক মূল্যে বিক্রয়কারী নিঃসন্দেহে অপরাধী।” (ইবনে মাজাহ)
হযরত ওমর (রাঃ) বর্ণনা করেছেন : “যে ব্যক্তি অতিরিক্ত চড়া দামের আশায় চল্লিশ দিন যাবত খাদ্যদ্রব্য বিক্রয় না করিয়া আটকাইয়া রাখিবে, আল্লাহর সঙ্গে তাহার সহিত আল্লাহর সম্পর্ক ছিন্ন হইয়া যাইবে।” (আল হিদায়াহ” ৩য় খন্ড)

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য :
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে আজ সুদের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে কিভাবে সুদ বর্জিত ব্যবসা করতে হবে তা প্রিয় নবীজী (সাঃ) আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন। পরবর্তীতে সাহাবায়ে কেরাম ও খোলাফায়ে রাশেদীন তার ব্যাপক বিস্তার ও বাস্তবায়ন করে আমাদের জন্য অনেক বড় মডেল স্থাপন করে গেছেন।
বর্তমান বিশ্বে খবঃঃবৎ ড়ভ ঈৎবফরঃ -এর মাধ্যমে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পণ্য ক্রয় বিক্রয় হয়। তা ইসলাম সম্মত উপায়ে করা সম্ভব। ইসলামী অর্থনীতি বিশ্বব্যাপী চালু করতে হলে আন্তর্জাতিক মুদ্রার প্রচলন করতে হবে। এক দেশের মুদ্রার মান অন্য দেশের মুদ্রার মানের সমান হতে হবে। কেবল ক্রেডিট এক্সচেঞ্জই সুদ হয় না। নগদ আদান প্রদানের সময়ও যে ‘বাট্টা’ প্রথার আদান প্রদান হয় তা মূলত সুদই দিয়ে থাকে।
এ ক্ষেত্রে মহানবী (সাঃ) -এর এই বাণীটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় :
“একটি স্বর্ণ মুদ্রাকে দুইটি স্বর্ণমুদ্রার বিনিময়ে এবং একটি ধাতব মুদ্রাকে দুইটি ধাতব মুদ্রার বিনিময়ে ক্রয় বিক্রয় করিও না।” (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
অন্য একটি হাদীসে বলা হয়েছে : “স্বর্ণ মুদ্রা স্বর্ণ মুদ্রার সঙ্গে এবং ধাতব মুদ্রা ধাতব মুদ্রার সঙ্গে বিনিময় করা যেতে পারে, কিন্তু তাতে কোন ধরনের কম বেশি করা যাবে না।” (সুনানে নাসায়ী)
বিশ্ব নবীর এই চির সত্য বাণীর ভিত্তিতে দুনিয়ার সকল রাষ্ট্র যদি নিজ নিজ স্বর্ণ বা রৌপ্য কিংবা মুদ্রার ওজন মান বিনিময় মান সমান করে নিতো এবং ‘বাট্টা’ দেয়া নেওয়ার প্রথা চিরতরে বন্ধ করে দিতো, তাহলে বিশ্ব অর্থ সমাজে নানাবিধ ধ্বংসাতœক অবস্থায় পতিত হওয়া থেকে রক্ষা পেতো, ব্যবসা বাণিজ্য বৈধ হতো, প্রাচুর্য ও দরিদ্রের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করা সম্ভব হতো। অনুরূপভাবে একটি সাম্যে পূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথও অনেকখানি উন্মুক্ত ও সুগম হতো।

যাকাত ব্যবস্থা :
ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি যাকাত ব্যবস্থা। যাকাত কায়েমের মাধ্যমে ধনী দরিদ্রের বৈষম্য যেমন দূর করা সম্ভব তেমনি পণ্য উৎপাদন ও বিপণনের জন্য সহায়ক। পবিত্র কোরআনে যাকাত সম্পর্কে বেশ তাগাদা দেয়া হয়েছে। নামাজ কায়েমের সঙ্গে সঙ্গে যাকাত আদায়কে বাধ্যতামূলক করা হযেছে। আল্লাহ বলছেন-
“তোমরা নামাজ কায়েম কর যাকাত আদায় কর এবং রুকুকারীদের সাথে কর।” (সূরা বাক্বারা: ৪৩)
বস্তুত যাকাত আদায় করা ইসলাম ধর্মের মূল স্তম্ভের অন্যতম একটি। তাই পবিত্র কোরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে-
যারা স্বর্ণ রূপা পঞ্জীভূত করে রাখে এবং আল্লাহর রাস্তায় (যাকাত আদায়ের মাধ্যমে) ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠিন শাস্তির দু:সংবাদ দিন। সেদিন জাহান্নামের আগুন তাতে উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের কপাল, পার্শ্বদেশ ও পেছন দিক দিয়ে দাগ দেয়া হবে এবং বলা হবে, এটা তার পরিণাম যা তোমরা নিজেদের জন্য পঞ্জীভূত করে রেখেছিলে। সুতরাং তোমরা যা পঞ্জুভূত করেছিলে তার স্বাদ আস্বাদন কর” (সূরা তাওবা: ৩৪-৩৫)
আল্লাহ তাআলা যাকাতের ব্যাপারে এমন বলিষ্ঠভাবে উল্লেখ করেছেন যে, যে যাকাত আদায় না করবে সে মুশরিক না কাফির হয়ে মরবে তা আমার জানার বিষয় নয়। সুরা সেজদায় বলা হয়েছে : “যারা যাকাত দেয় না এবং পরকালকে অস্বীকার করে, তাহারা কাফির।” (হামীম সিজদাহ্: ৭)
তাই যাকাত আদায় রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে মহানবী (সাঃ) এবং পরবর্তী খলিফাগণ বিশ্বের মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন তরে তা সকলের জন্য অনুকরণীয় করে রেখে গিয়েছেন।

শেষ কথা :
আমাদের দেশে সুদকে বর্জন করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে শরীয়াহর ভিত্তিতে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যবসা বাণিজ্য শরীয়াহ্ মোতাবেক পরিচালিত করার জন্য ইসলামী ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অবদান রেখে চলেছে। এর পাশাপাশি সুদভিত্তিক ব্যাংকিংও চালু রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকিং করার জন্য সংসদ কর্তৃক আইন তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নির্দেশের বলে দেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা দেশে চলমান হয়। অবশ্যই দ্রুত সংসদ কর্তৃক আইন প্রনয়নের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকিংকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ স্বীকৃতির প্রয়োজন রয়েছে। ইসলামী অর্থনীতির একটি আংশিক কার্যক্রম এই সকল ইসলামী ব্যাংকসমূহ করার চেষ্টা করছে। তাতে প্রকৃত ইসলামী মূল্যবোধের সার্বিক কার্যক্রম ইসলামী ব্যাংকগুলোতে পরিচালিত হচ্ছে না। এমনকি এই সকল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান যাকাত আদায় পর্যন্ত করতে পারে না। তাদের মতে যাকাত ব্যক্তিগতভাবে গ্রাহককে আদায় করার নিয়ম চালু রয়েছে। তাতে দেখা যায় সম্পদের প্রকৃত যাকাত দেশে আদায় হয় না। সরকার আইনের মাধ্যমে তার অগ্রিম কর আদায় করছে।
কিন্তু আইন প্রনয়নের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহ ইসলামের ফরজ বিধান যাকাত আদায় করার সুযোগ পেতে পারে। তখন এই যাকাত দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভুমিকা রাখবে। দারিদ্র্যদূরীকরণ ও ধনী দরিদ্রের দুরত্ব হ্রাসের জন্য এ বিধান খুবই জরুরি। এখন ব্যাংকসমূহ অর্থ উর্পাজন করছে। কিন্তু সমাজকে খুব বেশি কিছু দিতে পারছে না।
সমাজ ধনি দরিদ্র থাকবে। এইটি আল্লাহরর সৃষ্টি। তবে সেটার ব্যবধান খুব বেশি হবে না। একজন শত কোটির মালিক আরেকজন হাজার বা লাখ টাকারও না এধরনরে অর্থ ব্যবস্থা ইসলাম সমর্থন করে না। ধনী দরিদ্র নিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। কিন্তু সমাজে, রাষ্ট্রে ন্যায্যতা থাকবে, প্রত্যেকের হক আদায় হবে, এটি ইসলামী অর্থনীতির মূল কথা।
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআন মাজীদের সুরা যুখরুখে বলেনÑ
“আমি তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করি তাদের পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নীত করি যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে।” (সূরা যুখরুফ: ৩২)
আসলে ধন সম্পত্তির পরিমাণের এই কম বেশি মানব সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক আদান প্রদানের মূল কারণ। এটা না থাকলে, কোন সমাজই গড়ে উঠতে পারে না। মানুষের পক্ষে সামাজিক জীবন যাপন রক্ষা করাও কখনো সম্ভব হবে না।

অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য ব্যবসা বাণিজ্য করতে হবে। তবে তা হালাল পন্থায় করতে হবে, হারাম পদ্ধতিতে করা যাবে না। তাই রসুলে করিম (সাঃ) ইরশাদ করেন :
“কিয়ামতের দিন ব্যবসায়ীদেরকে পাপী হিসাবে উঠানো হবে। অবশ্য যারা পরহেজগারী, ন্যায় নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে ব্যবসা করেছে, তাদের কথা ভিন্ন।” (সুনানে ইবনে মাজাহ্)
……………………………………………

সুন্নার দাবী ও হাল
মুন্সি আব্দুল কাদির

সুন্নার কথা কই চিন্তায়
এভাবেই রাত আর দিন যায়
ভাবনায় দুনিয়ার প্রাপ্তি
সবখানে দুনিয়ার গুন গায়।

সুবিধা দেখে বলি সুন্না
ওরে, মন মরা কেন বল মুন্না
রবিউল আউয়ালে মিষ্টি
মিলাদের শেষে খুব মজা পায়।

সুন্নার দেখা নেই শরীলে
মিল্লাতে রাসুল বলি মরিলে
বেদাতের সয়লাব কত বয়
রাসুলের কথা এলে ভেংচায়।

কবিতার কত বই জড়ানো
আরো কত বই ঘরে ছড়ানো
কোরআন ও সুন্নার দেখা নেই
সিরাতের বই কিরে ঘরে পায়।

আলেমের মাঝে কেন এক ভাব
ওয়াজেও গীবতের সয়লাব
রাসুলের সুন্নার বারোটা
সওয়াবের ছালা সব পুড়ে যায়।

সাধারণ আছি বড় বিপাকে
সরলের পথে নাকি সে ডাকে
ভেদাভেদ উঠে কেন তুঙ্গে
হিংসা অহমে আরে ভুলে যায়।

সারে তিন হাতে আগে সুন্না
প্রয়োজন ছাড়া নহে গুন্না
সুবিধার ভাবনারা দূরে যাক
রাসুলের পথে তোরা সবে আয়।
……………………………………………

লাখো কোটি দুরুদ সালাম
মেজু আহমেদ খান

তখন ছিলেন একা তিনি
সম্পূর্ণরুপেই একা;
ভাল্লাগেনি কোন কিছু তাঁর
সখা শূণ্যতা জাগলো বুকে আর
তখনই মনের সুখে, লা- আশেক্বি চোখে
সৃষ্টি করে প্রেমাষ্পদে পেলেন স্বত্তা সুখ।

এইতো প্রেমের শুরু,
প্রেমাষ্পদে সাজিয়ে নিলেন কুল জাহানের গুরু।
আহা কুন বলাতেই ‘কুন’
নূরের ছটায় উঠলো হেসে কামলিওয়ালার গুণ।

উঠলে হেসে আকাশ বাতাস জমিন বৃক্ষরাজি
আহাদে মীম, মীমের লাগি রূপের বাহার আজি।

লাখো কোটি দুরুদ সালাম জানাই তোমার ‘পর
ওই কদমে কোরবানী হোক মেজুর এ অন্তর।
……………………………………………

ঈদে মিলাদুন্নবী
মিয়া মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ

সমগ্র বিশ্ব জাহান গাহিয়া উঠল গান
একই সুর একই তান আহলান সাহলান
আব্দুল্লাহ’র কুটিরে উদিত হলো নূরের রবি
তামাম জাহান বলে আজ ঈদে মিলাদুন্নবী!

তামাম জাহান উঠলো হেঁসে খুশির বারতায়
আরবী সিন্ধুর হিল্লোলে ঊর্মির কল্লোলে কী শোনা যায়?
এসছে কে? হেসেছে কে? গাহি তার গান
তিনি মুমিনের জান, তিনি মোদে ঈমান!

আকাশ বাতাস যেন আজ দিশেহারা
খুশিতে আজ ধরনী হয়েছে সারা
দ্যুলোকে ভূলোকে নূরের ঝলকে
আসিল নূরে মুজাচ্ছাম, হাসির পুলকে!
……………………………………………

নাতে রাসুল
অ আ আবীর আকাশ

দোজাহানের বাদশা তুমি মুহাম্মদ রাসুল
মুসলমানের চোখের মনি পরানের বুলবুল
যার উচিলায় চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ধাম
প্রাণ জুড়িয়ে যায়রে আমার মুখে নিলে নাম

সৃষ্টি কুলের শ্রেষ্ঠ তিনি মুহাম্মদ রাসুল
মুসলমানের দিন রজনী পরানের বুলবুল।

যে নামের আগমনে আঠারো হাজার মাখলুকাত
দিনে সূর্য রাতে চন্দ্র যার নামেতে বাজিমাত
মোহাম্মদ সাল্লেআলা যার ঘামেতে গোলাপ ফুল
সৃষ্টি কুলের শ্রেষ্ঠ তিনি মুহাম্মদ রাসুল।

কঠিন হাশরের দিনে যার নামেতে পেরেশান
দাও গো নবী সুপারিশে মুশকিল করো আসান
উম্মতি উম্মতি বলে ভেজাতেন মাটির ধূল
সৃষ্টি কুলের শ্রেষ্ঠ তিনি মুহাম্মদ রাসুল
……………………………………………

নবী-প্রেম
মনিরুজ্জামান প্রমউখ

নয় আর- বারো রবিউল আউয়াল নিয়ে-
দ্বন্দ্ব নয় ।
নবী’র জীবন-মৃত্যু দুই’ই
মুসলিমে’র অপার সবিনয় ।
মোহাম্মদ প্রেম পার করে, দেবে-
সকল অ-সার বিনিময় ।

শ্রেষ্ঠ আসনে’র মহিমান্বিত চরিত্র
যার- নীড়-ধারা ।
ভালোবাসা’র লক্ষ-কোটি, কোটি-নিযুত
অ-গণিত মনে’র সারা ।

দায়াত ও বি-দায়াতে’র মান-দণ্ডে মেতো-না,
মুসলিম জাহান ।
নবী-প্রেম উত্তম প্রেম, শুধু-
দায়রা’র বে-দ্বীন হইও-না,
মিলবে আহ্সান ।

শান্ত, শান্তি’র নিরব অবগাহন-
ইহ্ ও পর-কালে’র দস্তুর ।
উশৃঙ্খলে নেই-
আনন্দ, প্রেম, যতন, শ্রদ্ধা- সু-মধুর ।

নবী’র উম্মত আমি, তুমি,
আমরা- সবাই যখন ।
সুখে’র সারা-ধন আমাদের চার-পাশ
নিবিড় সারাক্ষণ ।

আকাশ, বাতাস, জল, ভূমি,
তারা-নক্ষত্র যার- প্রেমে’র বৃত্ত ।
মায়া-ময় হরিণী’র চোখেও সমান তার-
চিরন্তনে’র ইতি-স্বত্ব ।

এসো- প্রাণে’র মুসলিম ভাই-বোন
জাগো- সত্য ধ্যানে’র মতোন ।
নবী-প্রেমে বাদ পরো-না,
আছো যতো- ইসলামে’র
ভাই-বন্ধু-স্বজন, শত্রু-নিন্দ-কু-জন ।।
……………………………………………

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মদিন বা ঈদ ই মিলাদুন্নবীঃ আমাদের সংস্কৃতি
আহমদ চৌধুরী

আল্লাহর প্রেম, ভালোবাসা ও নৈকট্য অর্জনের একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে প্রিয় নবী সা. এর প্রতি শর্তহীন আনুগত্য এবং আবেগপূর্ণ হৃদয়ের টান। দুনিয়ার সমস্থ কিছুর ভালোবাসাকে পরিত্যাগ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রেম ভালোবাসাকে হৃদয়ে স্থান দেওয়া। কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে, ” হে নবী! আপনি বলুন। তোমাদের নিকট যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের ভাই, তোমাদের পত্নী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের অর্জিত ধন-দৌলত, তোমাদের ব্যবসা যা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় করো এবং তোমাদের বাসস্থান – যাকে তোমরা পছন্দ করো, আল্লাহ, তাঁর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে অপেক্ষা করো আল্লাহর বিধান আসা পর্যন্ত। এটা ফাসেকী কাজ। আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হেদায়েত দান করেন না। ” (তাওবা ২৪)
হাদীসে এসেছে, আনাস রা. থেকে বর্ণিত — রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, “কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা-মাতা, সন্তান-সন্ততি ও অন্যান্য সকল লোক হতে অধিক প্রিয় হই।”
আল্লাহকে ভালোবাসার নমুনা কি? কি করলে অন্তরে ফুটে ওঠবে আল্লাহর প্রতি প্রেম ভালোবাসা? সে কোন প্রেম, যে প্রেম গড়লে আল্লাহর নৈকট্য লাভে ধন্য হবো? এর-ও উত্তর দিয়েছেন রাব্বে কারীম! নির্দেশ এসেছে, “হে নবী! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমাকে অনুসরণ করো। এতে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। “
বক্ষমান আয়াতে রাব্বে কারীম নির্দেশ করেছেন, আমার ভালোবাসা পেতে হলে আমার রাসূলকে ভালোবাসো। তাঁর প্রতিটি কাজ, প্রতিটি কথা, প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি মুহুর্ত, এককথায় প্রতিটি বিষয় অনুসরণ অনুকরণের মধ্যেই তোমাদের সফলতা। তিনিই তোমাদের উন্নতি ও অগ্রগতির একমাত্র চাবি।
মহাগ্রন্থ আল-কোরআনের এসব নির্দেশ এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পবিত্র সাহাচর্য পেয়ে গঠিত হয়েছিল একদল সৌভাগ্যবান জাতি-গোস্টি, পৃথিবী যাদের চেনে সাহাবী হিসেবে। তাদের মান মর্যাদা এতো এতো বেশি যে, যাদের শানে সয়ং আল্লাহ ইরশাদ করেছেন, “আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। ” মহানবী ঘোষণা করেছেন, আমার সাহাবীগণ আকাশের নক্ষত্রতুল্য। যে কেউ তাঁদের কাউকে অনুসরণ করবে, সে সঠিক পথ প্রাপ্ত হবে। “
এই আলোকে আমরা যদি বিশ্ববাসীকে ছোট্ট একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিই-পারবেন কি ছোট্ট সেই চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় এর চেয়ে উত্তম কোনো কিছু হাজির করতে? আমাদের মধ্যে কে আছে এমন যার মর্যাদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আদনা থেকে আদনা নিম্ন থেকে নিম্নতম মুক্ত দাস সাহাবী বা সাহাবীয়ার এক গোছা কাটা চুল অথবা জুতার সমান আছে? মহানবী সা. এর সাহাবীদের একদম অপ্রয়োজনীয় বস্তু হলেও এগুলোর মর্যাদা ও গুরুত্ব সারা বিশ্বের মুসলমানদের দৃষ্টিতে যা হবে তা পৃথিবীর যেকোনো সাবেক বা বর্তমান রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, রাজা-বাদশা, বৈজ্ঞানিক, শিল্পপতি, সেনাপতি, বিচারক, শিল্পী, সাহিত্যিক, দানবীর, সমাজ সেবক অপেক্ষা হাজার লক্ষ গুণ বেশি। এর দ্বারা আমরা এরূপ বস্তুর গুরুত্ব বুঝাচ্ছি না বরং ঐ সমস্ত মহামানবদের স্মৃতির প্রতি কতোটুকু আবেগ, অনুভূতি ও শ্রদ্ধা বিশ্ব মুসলমানদের আছে এগুলো তাঁর কিঞ্চিৎ আলোচনা। বিশ্বমানবতার মূর্ত প্রতীক মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাচর্যের এ এক যুগান্তকারী নমুনা! এ কোন সম্মোহনী শক্তি যাঁর পদস্পর্শে আতরাফ আশরাফ হয়ে যায়। এমনকি তাঁর ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় কোনো বস্তু পর্যন্ত দুনিয়ার রাজা-বাদশাকে পর্যন্ত অতিক্রম করে ফেলে!
তাইতো বিশ্ববিখ্যাত নেপোলিয়ন বলেছেন,
O men! of the world if you want to get leasting peach you go to Madina you go to Madina!
“হে দুনিয়ার মানুষ! যদি তোমরা চিরস্থায়ী শান্তি পেতে চাও, তবে তোমরা মদীনায় যাও! মদীনায় যাও!”

নেপোলিয়ন দুনিয়ায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অতাশ্চর্য কার্যসিদ্ধি দেখে এমন উচ্চারণ করেছিলেন। আরবের প্রাচীন কবি আস’আদ ইবনে কারব আল হিমায়রী মহানবী জন্মের সাতশো বছর পূর্বে নবীজীর শানে কবিতা লিখে নবীজীর প্রতি ঈমান এনেছেন।একাত্ববাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি তাঁর সবকিছু দিয়ে পাশে থাকার ওয়াদা করেছেন। সাহাবী হওয়ার অঙ্গীকার করেছেন, পড়ুন সেই ঈমান দীপ্ত কবিতা-
”যে আসেনি এখনো আমি তাঁর জেনে গেছি নাম
সে যে আহমদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
হে প্রভু! আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তোমার রাসূল
আসবেন তিনি ধরাতলে জানি নিশ্চিত নির্ভুল!
হায়! আমার আয়ু যদি হয়ে সীমাহীন,
যদি বেঁচে থাকি তিনি আসবেন যেদিন;
তবে দাঁড়াবোই তার পাশে, বাড়াবো এ হাত-
বন্ধু সাহাবী হবো- আনতে প্রভাত! “

এরকম আরো কতো কবি, দার্শনিক, পাদ্রী ও ইহুদি আলিম রাসূল জন্মের শতো শতো বছর পূর্বে আরো কতো শতো শতো ভবিষ্যত বাণী করেছেন তা বর্ণনাতীত।

আজকের অশান্ত পৃথিবীতে মানুষের জীবনধারা এক জটিল অনাদর্শের ভাবাবেগে তাড়িত। তার অতীত বর্তমানকে নির্দেশ দিতে ভুল করে, ভুল করে বর্তমান ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলতে। জীবনের চারপাশে এ বিভীষিকাময় নৈরাশা আর হাহাকার ছাড়া আর কিছুই নেই। বাস্তব জীবন সংগ্রামে মানুষ তার সুকুমার বৃত্তি গুলো ভুলে কেবলই স্থুল দৈহিক ও জৈবিক প্রেরণার ক্রীড়নক হয়ে পড়েছে। মানুষের বিদ্বেষ, হিংসা, জিঘাংসা ও জিজীবিষা এমন চরমে পৌছেছে যে, জীবনে অবিশ্বাস অস্বস্তি ও নৈরাশ্যই একমাত্র সত্য বলে দেখা দিয়েছে। কোথাও স্বস্তি নেই, শান্তি নেই, মানুষ বুঝেও অশান্তির বেড়াজালে পা দিয়ে বিপদ থেকে বিপদান্তরে, শঙ্কা থেকে শঙ্কান্তরে, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে। জীবন যেন এখন অসহনীয় এক সংগ্রাম। এ থেকে উত্তরণের পথ কেউ খুঁজে পাচ্ছি না। কারণ আমরা নবীর আদর্শ থেকে অনেক দূরে সরে আসছি। মিলাদুন্নবীর প্রকৃত শিক্ষা আমরা নিচ্ছি না। অতচ আল্লাহ বলেছেন, “তোমাদের শিক্ষার জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম চরিত্রগুণ, তাঁর আদর্শ ও চরিত্রগুণ গ্রহণ করতে পারলেই তোমাদের মুক্তি অবধারিত”। এই অবধারিত মুক্তির বাণীকে অস্বীকার করে ইচ্ছে মতো ভোগ ও সাময়িক আনন্দের বানে ভেসে পাপ পূণ্যের বিচার না করে মানুষ স্রোতের মতো ঝুকে পড়ছে পশ্চিমা নাস্তিক্যবাদের দিকে। কিন্তু মুক্তি সেখানে নেই। একমাত্র নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনাদর্শের মাঝেই লুক্কায়িত সেই কাংখিত অবধারিত মুক্তি। রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে নিয়ে গৃহস্থালি পরিচালনা পর্যন্ত নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাতে কলমে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। নবীজীর মুক্তাখচিত বাণী, “যে স্ত্রী স্বামী গৃহের শৃংখলা বজায় রাখার জন্য কোনো বস্তু যথাস্থানে রাখে, তার জন্য তাকে একটা পূণ্য দান করা হয়, একটি পাপ স্খলন করা হয়, আল্লাহর দরবারে একটি স্তর দান করা হয়। মন দিয়ে খেয়াল করে দেখুন কতো প্রেমময় আমাদের নবী! কতো সুন্দর আমাদের ধর্ম!
আমরা বিভিন্ন ব্যক্তি ও ঘটনার গুরুত্ব উপলব্ধি করে অনেক দিবস পালিত করি। ঐসব দিবসে সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক সংগঠন, এনজিও প্রতিষ্ঠান স্ব স্ব উদ্যোগে দিবসের তাৎপর্য মানুষের সামনে তুলে ধরে, যার ফলে শত শত বছর পরেও আমরা এসব দিবস ;ব্যক্তির কীর্তি, মর্যাদা, তাঁদের আলোকিত জীবন সম্পর্কে জানতে পারি, হৃদয়ে ধারণ করতে পারি তাই এসব দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন করা আমাদের জন্য পেছনের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার দ্বার উন্মোচন করে। ইহা নিঃসন্দেহে উত্তম কাজ।
১২ ই রবিউল আউয়াল ঈদ ই মিলাদুন্নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা নবীজীর শুভ জন্মদিন। অশান্ত এ বসুন্ধরায় শান্তির জোয়ার বইয়ে দিতে এই দিবস যথাযথ মর্যাদায় পালন করা আমাদের অবশ্য কর্তব্য। ঘরে ঘরে এ দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরা উম্মত হিসেবে আমাদের দায়িত্ব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর জীবনাদর্শ নিয়ে যত আলোচনা হবে। তাঁকে নিয়ে যত সেমিনার, সিম্পোজিয়াম হবে তত রাসূলকে জানার আগ্রহ বাড়বে। রাসূলকে যত বেশি জানা হবে সত্য স্বপ্ন নিয়ে মানুষের মনে তত বাঁচার অঙ্গীকার যোগাবে। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী উলামা মাশায়েখগণ অত্যন্ত আবেগ নিয়ে ঈদ ই মিলাদুন্নবী পালন করে থাকেন। যা বিক্ষুব্ধ পৃথিবীকে শান্তির সমিরণে অবারিত তৃপ্তি জোগায়। এখানেও বাংলাদেশের কিছু লেবাসী ইসলামের ধ্বজাধারীরা বিদ’আত খুঁজেন। তারা এ মহান অনুগ্রহের মাসে সিরাতুন্নবী পালন করেন। মিলাদুন্নবীর র‍্যালী ও জশনে জুলুসকে বাঁকা চোখে দেখেন। শিরনী ও তাবার্রুক বিতরণকে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করেন যা সত্যিসত্যিই বেদনাদায়ক। আমি বলি ; আপনারা সারা বছর সিরাত আলোচনা করুন। কে বাঁধা দিচ্ছে? আমরাও সিরাত আলোচনা করি। ইহা অবশ্যই উত্তম কাজ। আমাদের মাঝে যখন মাহে রবিউল আউয়াল আসে, অনায়াসেই তখন চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই তমসাচ্ছন্ন যুগ। ঐতিহাসিকগণ যাকে বলেছেন অন্ধকার যুগ। আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগ। স্মৃতিপটে ভেসে উঠে আরব সম্প্রদায়, তাদের বর্বরোচিত বৈশিষ্ট্য, চরিত্র ও বেপরোয়া চলাফেরার দৃশ্য। স্বরণ হয় মানবিক জাহাজের ক্যাপ্টেন, সুস্পষ্ট সতর্ককারী! মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা. এর অতাশচর্য জন্মের সময়ের অলৌকিক সব ঘটনা। স্বরণ হয় তাঁর অবর্ণনীয় ত্যাগ ও তিতিক্ষার সুমহান গল্প। তখন মুমীনের হৃদয়ে জমে থাকা প্রেমের তরঙ্গমালা উথলে ওঠে। প্রেম-মহব্বতের জোয়ার বয়ে যায়। রাসূল সা. এর জীবনাদর্শ নিয়ে বেশি বেশি চর্চা হয়। ঘরে ঘরে দুরুদের আওয়াজ জারি হয়। বিশেষ করে ১২ ই রবিউল আউয়ালে মসজিদে মসজিদে, পাড়ায় পাড়ায় এবং বাড়িঘরে যেভাবে মিলাদের অনুষ্ঠান করা হয় তা অবশ্যই উম্মতের সৌভাগ্যের লক্ষ্মণ।
জন্মভূমি বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ। অতচ রাষ্ট্রীয়ভাবে আমাদের দেশে এই মহান দিবসকে তার প্রাপ্য মর্যাদা দেয়া হয় না। জাতীয়ভাবে অনেকটা দায়সারা গোছের ভাব নিয়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী একটি করে বাণী প্রসব করে মানুষের কল্যাণ কামনা করেন। সরকারী ছুটি ঘোষিত হয়। স্কুল কলেজ, মাদ্রাসা বন্ধ থাকে। এটাই জাতীয়ভাবে দেয়া মর্যাদার সবটুকু। সংস্কৃতিমন্ত্রণালয় ও ধর্মমন্ত্রণালয় কোনো উদ্যোগ নেয় না। ইসলামী ফাউন্ডেশনও উল্লেখযোগ্য তেমন ভূৃমিকা নিতে নারাজ। দুঃখজনক হলেও সত্য আমাদের দেশে অখ্যাত-কুখ্যাত অনেক কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীদের জন্মদিবস নিয়ে চেতনা বিতরণ করতে করতে এই মন্ত্রণালয় কাহিল হয়ে পড়ে। অতচ ঈদ ই মিলাদুন্নবী বা নবী দিবসের মর্যাদা কোনো কবি, সাহিত্যিক, রাজনৈতিক, শিক্ষাবিদ ও সংস্কৃতিকর্মীদের সাথে তুলনা করাও যায় না। কারণ তাঁর মর্যাদার তুলনা পৃথিবীর কারো সাথে চলে না। তিঁনি বেনিয়াজ। বে মিছাল। আল্লাহর পরে তাঁর স্থান! এ প্রসঙ্গে আধ্যান্তিক জগতের সম্রাট মুজাদ্দিদে জামান আল্লামা ফুলতলি র. তাঁর বিখ্যাত নালায়ে কলন্দর কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার দুটি লাইন প্রণিধানযোগ্য- তিনি বলেছেন,
“আহাদ ও আহমদের মাঝে এইতো ফারাক ভাই
মীম রয়েছে আহমদে আর আহাদে সেই মীমটি নাই। “মীমের প্রার্থক্য হামদ ও নাতের একটি পারিভাষিক খোলস। এটা আধ্যান্তিক জগতের অত্যন্ত গভীর কথা। সুতরাং আমাদের স্বার্থে। পৃথিবীকে স্থিতিশীল রাখতে। মানুষের প্রতি মানুষের প্রেম জাগাতে সর্বোপরি পৃথিবীকে সুন্দর বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে মহানবী সা. এর জন্মদিবসকে সকলের মাঝে শ্রদ্ধা, স্বরণ এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের মধ্য দিয়ে পালন করা উচিত। রাষ্ট্র এই দিনকে কেন্দ্র করে সপ্তাহব্যাপী রেডিও, টিভিতে তাঁর জীবনালোচনার আয়োজন করতে পারে। স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা বন্ধ না দিয়ে নূন্যতম সপ্তাহব্যাপী সিরাতপাঠের উৎসব করা যেতে পারে। কবিতা, রচনা ও উপস্থিত বক্তৃতার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদে অন্তত তিন দিনের সিরাত আলোচনা ও বিষয়ভিত্তিক বই মেলার আয়োজন করা। রাষ্ট্রীয়ভাবে একটি পুরষ্কার প্রবর্তন করা যেতে পারে যা প্রতিবছর এই দিনে বিতরণ করা হবে। যারা সারাবছর মানব কল্যাণে যুগোত্তীর্ণ ভূমিকা রাখছেন তাঁদের মধ্য থেকে বাছাই বিশ্লেষণ করে অন্তত তিনজনকে এই সম্মানজনক পুরষ্কারে ভূষিত করা হবে। চাইলে প্রতি জেলা পরিষদের মাধ্যমে প্রতি জেলায় জেলায়ও করা যায়।

আমাদের দেশে নানা প্রকারের সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র আছে এগুলোর মধ্যে নবীর জীবন চর্চাধর্মী তেমন ব্যাপক ভিত্তিক কোনো সংগঠন নেই। আমাদের উচিত তাঁকে ঘিরে নানারকম সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলা। এসবের মাধ্যমে নবীচরিত নিয়ে আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ম্যাগাজিন, পুস্তক, স্মারক ও পত্রিকা প্রকাশ করতে পারি। প্রতিবছর প্রতি জেলা-উপজেলায় তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচিত গ্রন্থমেলার আয়োজন করতে পারি। ওডিও, ভিডিও ও ক্যাসেট সরবরাহ করতে পারি। শিশু কিশোরদের মধ্যে কবিতা রচনা সিরাতপাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারি।

নিজ দেশ তথা পৃথিবীতে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দিতে আমাদেরকে এই মহামানবের আদর্শের কাছে ফিরে যেতে হবে। তাঁকে আমাদের বারবার স্বরণ করতে হবে। কারণ, পৃথিবীর অন্যকোনো মত ও পথে এতো যুগান্তকারী বৈপ্লবিক আদর্শ নেই।জর্জ বার্নাড-শ এর ভাষায় —“পুরো বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মের সম্প্রদায় আদর্শ ও মতবাদ সম্পন্ন মানব জাতীকে যদি ঐক্যবদ্ধ করে একনায়কের শাসনাধীন আনা হতো তবে একমাত্র মহানবী সা. ই সর্বাপেক্ষা সুযোগ্য নেতা রূপে তাদেরকে শান্তি ও সমৃদ্ধির পথে পরিচালিত করতে পারতেন। “
মাইকেল এইচ হার্ট আরো সুন্দর করে বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি অশান্তির বিশ্বে শান্তি আনতে হলে সমগ্র বিশ্বের একক ক্ষমতা আদর্শ রাষ্ট্রনায়ক মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে অর্পণ করলেই তা শুধু সম্ভব।”
আপনি জীবনে অনেক কিছুই পড়ে থাকবেন। আরও অনেক পড়বেন এবং পড়তেই হবে। কেননা জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করতে পাঠের কোনো বিকল্প নেই। সেই পাঠের ভেতর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে মহানবী হযরত মোহাম্মদ সা. কে এবং সেটা আপনার আমার পরবর্তী প্রজন্মের সুন্দর জীবন বিনির্মাণের স্বার্থে।
আল্লাহ, রাব্বুল আ’লামিন।
রাসূলুল্লাহ, রাহমাতুল্লিল আ’লামিন।
আল্লাহ, জগতসমূহের পালনকর্তা।
রাসূলুল্লাহ, জগতসমূহের আশীর্বাদ।
ইরশাদ হচ্ছে, “হে নবী! আমি আপনাকে সৃষ্টি না করলে একদানা বালুকণাও সৃষ্টি করতাম না। “
পৃথিবীর সত্যাশ্রয়ী সকল ঐতিহাসিকগণ একমত যে, মহানবীর আগমণে পৃথিবী তার হারানো ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। তিঁনি এসেছিলেন বলেই জগতবাসী নতুন জীবন পেয়েছে। তাই মানবজাতির ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ মর্যাদা ও বিরল সম্মান পাবার যোগ্য এই দিন, যেই দিন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মর্ত্যের এ পৃথিবীতে শুভাগমণ করে সমস্ত জগতবাসীকে ধন্য করেছিলেন __
যুগের পর যুগ, দিবসের পর দিবস চিরন্তন মর্যাদা পাবার অধিকারী এই দিন। ধর্ম-বর্ণ সকল জাতি গোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে সম্মানের দাবীদার এই দিন। বাস্তবতার বিচারেও অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর সংগত কারণেই রাসূল সা. এর শুভাগমণের দিন। ঈদ ই মিলাদুন্নবীর দিন সর্বদিক দিয়ে বিশ্ববাসীর কাছে প্রিয় হওয়ার যোগ্যতম। কারণ, সয়ং আল্লাহতা’য়ালা ঘোষণা করেছেন, “তাঁর আগমণের কল্যাণেই পৃথিবীর সৃষ্টি “। মানুষ ফিরে পেয়েছে মানুষের মর্যাদা।
আল্লামা ফতেহ আলী রহ. তাঁর দেওয়ানে ওয়াইসীতে কী চমৎকার গেয়েছেন,
“ওয়াইসীয়া! আয দ্বীন ও ঈমান ইনকাদর তানিম ওয়া বাস
দ্বীনে মা এশক মুহাম্মদ সা. হুব্বে উঁ ঈমানে মা।”

হে ওয়াইসী! এতটুক জানি এবং তাই যথেষ্ট যে, আমাদের দ্বীন হলো মুহাম্মদ সা. এর এশক ও তাঁর প্রতি প্রেমই হচ্ছে আমাদের ঈমান।
আমাদের বেহেশতী ফুল শিশুমনে এই চিত্র এঁকে দিতে হবে, আমরা কোন নবীর উম্মত। তাদের জানতে হবে আমরা সেই নবীর উম্মত। চাঁদ সেতারা, আকাশ জমিন যার খেদমত করার জন্য সদা উদগ্রীব। জীন ফেরেশতারা যাঁর পদসেবা করে জীবনকে স্বার্থক করার জন্য সদা প্রতিক্ষায় ও দন্ডায়মান ছিলো, ফেরেশতা কূলের সরদার জীবরিল আমীন যাঁর সাক্ষাতে এসে বেয়াদবীর ভয়ে শত সতর্কতা অবলম্বন করতেন, যাঁকে মেঘমালা ছায়া দিয়ে রৌদ্র থেকে আড়াল করে রাখত, বৃক্ষ যার নির্দেশে স্থানান্তরিত হয়ে যেত, চন্দ্র যাঁর আঙ্গুলি ইশারায় দ্বিখণ্ডিত হয়েছিল, যাঁর উম্মত হওয়ার জন্য কতো নবী আলাইহি ওয়াসাল্লামগণ আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানিয়েছিলেন, যাঁর মর্যাদার বর্ণনা কোনো জবান দিতে পারে না, কোনো কলম লিখতে সক্ষম নয়, সেই শেষ এবং শ্রেষ্ঠ নবীর উম্মত আমরা। আজকের মুসলমান জাতি। পরিতাপের বিষয়, আমরাই নবী সা. এর প্রতি সবচেয়ে বেশি উদাসীন! লেখার কলেবর বৃদ্ধি না করে ছোট্ট একটি গল্প দিয়ে আজকের লেখার ইতি টানছি।
স্বপ্নে সয়ং রাসূলে আকরাম সা.এর কাছে ইসলামে দীক্ষিত হয়েছিলেন ড. ইসলামুল হক। তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিল, মুসলিম উম্মাহর জন্য কিছু বলুন। তিনি এর জবাবে বলেছিলেন, ইঞ্জিল শরীফে আছে, একদিন সকাল বেলা হযরত ঈসা (আ.) তাঁর কিছু অনুসারীর সাথে মিলিত হওয়ার মানসে গলীল হ্রদের পানির উপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, এ আশ্চর্যজনক দৃশ্য লক্ষ্য করে তাঁর অনুসারীরা বললেন, হুজুর, আমরাও কি এমনিভাবে পানির উপর দিয়ে হেঁটে যেতে পারবো? ঈসা জবাব দিলেন, পারবে। তবে শর্ত হচ্ছে, শুধুমাত্র আমার দিকেই দৃষ্টি নিবন্ধ রাখতে হবে। দৃষ্টি এদিক সেদিক হলেই ডুবে যাবে। তারা ঈসা আ.এর প্রতি দৃষ্টি নিবন্ধ রেখে পানির উপর দিয়ে অগ্রসর হতে লাগলো। কিছুদূর অগ্রসর পর তাদের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হলো। ভাবলো, সত্যিসত্যিই কি আমরা পানির উপর দিয়ে যাচ্ছি না কি মাটির উপর দিয়ে। সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার পর তারা দৃষ্টি ঈসা আ. এর দিক থেকে একটু সরিয়ে পায়ের দিকে নিলো, তখনই তারা হ্রদের পানিতে তলিয়ে গেলো। ড. ইসলামুল হক বলেন, এ সংসারসমুদ্র পাড়ি দেওয়ার জন্য আখেরী নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আমাদের জন্য এ নির্দেশ দিয়ে গেছেন যে, একমাত্র তাঁর পবিত্র পদচিহ্ন অনুসরণ করেই অগ্রসর হতে হবে। দৃষ্টি যদি সেখান থেকে একটু এদিক সেদিক সরে যায়, ঈসা নবীর উম্মতের মতো আমরাও দুনিয়ার অথৈ সাগরে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

পরিশেষে ফারসি কবিতার বাংলা কাব্যানুবাদ থেকে রাসূল প্রশস্তি মূলক কবিতার চরণ দিয়ে শেষ করছি _
“যে পা চলে তোমার পথে পূণ্যবান সে পা
তোমার মিলন নায় যে চড়ে ধন্য তাহার না
যে চোখ দেখে তোমার ছবি সে চোখ নাচে সুখে
যে মুখ গাহে তোমার গীতি ফুল ঝরে সেই মুখে।”
……………………………………………

মুক্তির দূত
আজমাইন নিজাম

আরবের বুক ছিল আঁধারে ভরা
কলুষিত ছিল এই বসুন্ধরা
পাপাচারে ডুবে ছিল মানবজাতি
মূর্তির পূজা নিয়ে যত মাতামাতি।

মানবতাহীন ছিল মানুষের মন
যুদ্ধের ঘন্টা বাজে যখন তখন
শান্তি ছিল না এই পৃথিবীর বুকে
মজলুম জনতা মরে ধুঁকে ধুঁকে।

মুক্তির দূত হয়ে এলো মহানবী
মরুর আকাশে যেন আলোর রবি
ধরনীর বুকে এলো জান্নাতি নূর
তার পরশে হল অমানিশা দূর।

পাপী তাপি খুঁজে পেল সত্যের পথ
ভীরু অসহায় বুকে পেল হিম্মৎ
মানুষের কল্যাণে তার যত কাজ
সুখের ছোঁয়া পেল জাহেলী সমাজ।

তাঁর মত দরদী ছিল না তো কেউ
উদার হৃদয় জুড়ে সাহসের ঢেউ
শত্রুর তরে ছিল ক্ষমার নীতি
আনলো সবার মনে সুখ সম্প্রীতি।

মানুষের মুখে মুখে নাম আল আমিন
তৃপ্তির ঢেউয়ে ভাসে মরুর জমিন
বিশ্বাসী মোমিনের সংগ্রামী দিল
শহীদি তামন্নায় খুঁজে মঞ্জিল।

তাঁর মতে তাঁর পথে চলে যদি সব
দিকে দিকে শুরু হবে আলো উৎসব
পৃথিবী আবার হবে সুখের ভূবন
মানুষ সবাই হবে সবার আপন।

সব ভুলে চলে এসো তাঁর পথে হাঁটি
তাঁর নূরে এ জীবন হবে পরিপাটি
দুনিয়া ও আখেরাতে শান্তির জন্য
রাসূলের পথ ছাড়া পথ নেই অন্য।
……………………………………………

সমাজ সেবক মহানবী
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

ইসলাম মানবতার ধর্ম, মানবসেবার ধর্ম। ইসলামের দৃষ্টিতে বিশ্বের সকল ধর্মের, সকল বর্ণের ও সকল জাতি-গোষ্ঠীর মানুষ এক আদমের সন্তান এবং তারা সকলে মূলত এক জাতি। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল ঘোষণা করেছেন :

‘হে মানুষ, আমি তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি আর তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি। যাতে তোমরা পরস্পর পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাকওয়া সম্পন্ন।নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, তিনি সকল বিষয়ে অবহিত।’-[আল হুজরাত : ১৩]

আমাদের আদি পিতা হজরত আদম আলাইহিস সালাম ও মা হজরত হাওয়া আলাইহিস সালাম হতে আমাদের মানবকূলের বংশ বিস্তৃত। সে হিসেবে আমরা প্রত্যেক মানুষ পরস্পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে জড়িত। আমরা নিজেদেরকে যতই জাতি, ধর্ম, বর্ণ, বংশ, গোত্রে ভাগ করি না কেন; আমরা কেউ পর নই, পৃথক নই, বিচ্ছিন্ন নই। বরং আমরা মানুষ হিসেবে সবাই সমান। কারণ আমরা সকলেই একই আদি পিতা-মাতার সন্তান। আমাদের যা কিছুই লৌকিক পরিচয় বা বৈশিষ্ট রয়েছে এসবই বৈচিত্রের জন্য, পরস্পরকে চেনার জন্য। শান্তির ধর্ম ইসলাম মানুষের এই দেশ-কাল-ঐতিহ্য ভিত্তিক বৈচিত্র ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে, সম্মান করে; কিন্তু এসব স্বাতন্ত্র বৈশিষ্ট্য কে কেন্দ্র করে মানুষে মানুষে বিভক্তি, বিদ্বেষ, দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে কখনও সমর্থন করে না।

মহানবীর জীবন মিশন নিয়ে যদি আমরা চিন্ত করি, তাহলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হবে যে, মহানবীর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ ছিল সারা বিশ্বের মানব সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা বা মানবতার কল্যাণ করা। তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বজাহানের জন্য আল্লাহর রহমত। আল্লাহ বলেন-

“আর আমি তো তোমাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।”-[আল আম্বিয়া : ১০৭]

আল্লাহর নবী জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব মানুষকেই ভালোবাসতেন, সবাইকেই তিনি আপন করে নিতেন, সবার জন্যই তিনি দোয়া করতেন; এমনকি নিজের শত্রুর জন্যও দোয়া করতেন, তাদেরও কল্যাণ কামনা করতেন। যে বুড়ি প্রতিদিন মহানবীর চলার পথে কাঁটা বিছিয়ে রাখতো তিনি তারও খোঁজ নিতেন, সেবা করতেন। যে তায়েফবাসী রাসূলুল্লাহ মেরে রক্তাক্ত করেছিল তাদের জন্যও তিনি বদদোয়া করতে রাজি হননি।

শুধু যে নবী হওয়ার কারণেই তিনি মানুষকে ভালোবাসতেন তা নয়। আল্লাহর রাসূল শৈশব-কৈশোর কাল থেকেই ছিলেন অত্যন্ত কোমল স্বভাবের, নরম মনের মানুষ। তিনি যখন তার দুধ মা হালিমার দুধ পান করতেন, তখন তার দুধ ভাইয়ের কথা ভুলে যেতেন না। আরবের জাহেলি সমাজে গরীব, অসহায়, নিরীহ মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে ব্যথিত করতো। তাই তরুণ বয়সেই অসহায় মানুষের সেবা করার জন্য তার বন্ধুদের নিয়ে ‘‘হিলফুল ফুযুল’’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন।

আসলে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর রাসূলের জীবনাদর্শের মাধ্যমে আমাদেরকে এই শিক্ষা দিচ্ছেন যে, সমাজ সেবা করার জন্য প্রথম শর্ত হলো মানুষকে ভালোবাসতে পারার যোগ্যতা অর্জন করা। মানুষের প্রতি যদি সহানুভূতি না থাকে তাহলে সমাজসেবা করা সম্ভব হয় না। দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণ কামনা করাই ছিল মহানবীর মিশন।

আর মহানবীর অবর্তমানে মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব হলো মহানবীর এই মিশনকে এগিয়ে নেই। মুসলিম উম্মাহর মিশনও তাই মানবতার কল্যাণ। আর মিশন মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনই ঠিক করে দিয়েছেন। এই মিশনারী দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার মধ্যেই রয়েছে মুসলিম উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও সম্মান। আল্লাহর রাসূলে সময়ে মুসলিম উম্মাহ এই দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেই আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাদেরকে দিয়েছিলেন শ্রেষ্ঠত্বের সনদ। পবিত্র কালামে মজিদে ঘোষণা করা হয়েছে-
‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানব জাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদেরকে আবির্ভূত করা হয়েছে।

  • সূরা আল ইমরান, আয়াত ১১০

মানব সেবায় ইসলাম এতো উৎসাহ দিয়েছে যে, রাস্তায় চলার পথে মানুষের জন্য কষ্টদায়ক সামান্য পাথর সরিয়ে ফেলাকেও মহৎ কাজ হিসেব গণ্য করা হয়েছে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘ইমানের ৭২টি শাখা রয়েছে। এগুলোর মধ্যে একটি হলো রাস্তা থেকে কোনো কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া।’ (মুসলিম শরিফ)।

মানুষের জন্যে যার মনে কোনো দয়া নেই আল্লাহ তায়ালার রহমতও তার ওপর নেই। হাদিস শরীফে এসেছে- ‘যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শন করে না আল্লাহও তার প্রতি রহমত করেন না।’ (তিরমিযী শরীফ)।

আল্লাহ তায়ালা সূরা বাকারার ২৬১ নম্বর আয়াতে বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মতো, যা উৎপন্ন করল সাতটি শিষ, প্রতিটি শিষে রয়েছে ১০০ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান, তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ গরীব, দুঃখী, অসহায়, সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের নিয়ে কাজ করলে একটি সমাজ সুন্দর হয়ে ওঠে। হজরত জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে কখনো কোনো সাহায্য প্রার্থীকে না বলেননি।

এ কারণেই মুসলিম সমাজের শক্তি ও ঐক্যের মূলমন্ত্রই হচ্ছে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। যেখানে একে অন্যের বিপদে-আপদে এগিয়ে আসা, সাহায্য-সহযোগিতা করা, গরীব-অসহায় মানুষকে সহযোগিতা করা পবিত্র ধর্মীয় দায়িত্ব বলে গণ্য করা হয়।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে ছাড় দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে যায়।’ (মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজি)।

বিদায় হজে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘আজকের এ মহান ইয়ামুন্নাহারের দিনে, এ পবিত্র জিলহজ মাসে এ পবিত্র হেরেম শরিফে তোমাদের তথা প্রতিটি মুসলমানের জান, মাল, সম্পত্তি, ইজ্জত, শরীরের চামড়া যেভাবে হারাম ও সুরক্ষিত, ঠিক তেমনিভাবে সব দিন, সব মাস ও সর্ব স্থানে হারাম ও সুরক্ষিত বলে গণ্য হবে। খবরদার! তোমরা আমার অবর্তমানে পুনরায় কাফেরদের ন্যায় পরস্পর মারামারি, কাটাকাটিতে লিপ্ত হবে না।’ (বুখারি শরিফ)।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আল্লাহর ইবাদত কর, দরিদ্রকে খাদ্য দান কর এবং উচ্চ শব্দে সালাম কর। নিরাপত্তা সহকারে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ এই ছিল মহানবী (সা.) এর শিক্ষা। মহানবী আমাদের ভোগ বিলাস ত্যাগ করে অন্যের সাহায্যে নিজেকে নিয়োজিত করার জন্যে উৎসাহ দিয়েছেন। অসহায়কে সাহায্য করাকে নবীজি (সা.) জিহাদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে; তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর সমতুল্য।’ (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা তিনি আরো বলেন, ‘এবং সে ওই সালাত আদায়কারীর ন্যায় যার ক্লান্তি নেই এবং ওই সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যার সিয়ামে বিরত নেই।’ (সহিহ বোখারি,সহিহ মুসলিম)।

হজরত আবু হুরায়রা ( রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা বলবেন, ‘হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করোনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রতিপালক। আপনিতো বিশ্বপালনকর্তা কীভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কী জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কী জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে।’ ‘হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি।?’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কী জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাওনি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে তবে আজ তা প্রাপ্ত হতে।?’ ‘হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাওনি।’ বান্দা বলবে, ‘হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামীন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?’ তিনি বলবেন, ‘তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে তুমি পান করাওনি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।’ (মুসলিম : ৬৭২১; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭৩৬)

সমাজ সেবা সদকায়ে জারিয়া :

সদকায়ে জারিয়া হল এমন নেক আমল, যা জীবদ্দশায় করে গেলে মৃত্যুর পরও সওয়াব ও উপকারিতার ধারা অব্যাহত থাকে। ‘সদকা’ শব্দের অর্থ দান করা। আর ‘জারিয়া’ অর্থ অব্যাহত। অর্থাৎ আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে এমন দাতব্য, শিক্ষা বিস্তার কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজ চালু করে যাওয়া যা ব্যক্তির মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে।

সদকায়ে জারিয়ার গুরুত্ব :

আমরা যত ইবাদত-বন্দেগী করি তার কতটা শুদ্ধ বা ত্রুটিমু্ক্তভাবে করতে পারি? এই যে পবিত্র রমজান মাস আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিল আমরা কতটা এই মাসের হক আদায় করতে পেরেছি? কতটা সময় আমরা আল্লাহকে স্মরণ করেছি আর কতটা সময় মোবাইল, গেম, বিনোদনের মধ্য দিয়ে কাটিয়েছি? যে রমজান ছিল পবিত্র কুরআন মজিদ নাযিলের মাস, সেই পবিত্র কুরআনকে আমরা কতটা অন্তরে ধারণ করতে পেরেছি? কুরআন মজিদকে আমরা কতটুকু বুঝতে পেরেছি? আমাদের দেশে তারাবীর নামাজে যেভাবে ‍কুরআন তেলাওয়াত করা হয় তা আমাদের হৃদয়ে কতটা রেখাপাত করতে পারে? আল্লাহর রাসূল বলেছেন, যারা মিথ্যা কথা আর অন্যায় কাজ থেকে বিরত হতে পারলো না তাদের পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই। পবিত্র এই মাস ছিল আত্মসংযম ও আত্মিক উন্নতির এবং আল্লাহকে ভয় করে চলার এক নিরবিচ্ছিন্ন প্রশিক্ষণের মাস, যাতে আমরা বাকি এগারোটি মাসও আল্লাহকে ভয় করে চলতে পারি; কিন্তু আমরা এই প্রশিক্ষণ কতটুকু নিয়েছি, রমজানের তাৎপর্য উপলব্ধি করে এর হক আদায় করে আমরা কতটা সিয়াম সাধনা করতে পেরেছি? যদি পারতাম তাহলে এই পবিত্র মাসে কেন দ্রব্যমূল্য হু হু করে বৃদ্ধি পায়? এই পবিত্র মাসে যথাযথভাবে যাকাত আদায় ও দান-সদকার অনেক ফযিলতের কথা বলা হয়েছে।যাকাত তো ফরজ ইবাদত। আমরা কি যথাযথভাবে হিসাব করে সঠিকভাবে যাকাত আদায় করি? এভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে আমাদের প্রতিটি ইবাদতের মধ্যেই অনেক ত্রুটি, গাফলতি, অপূর্ণতা থেকে যায় এবং এই ত্রুটিপূর্ণ আমল নিয়েই আমরা আমাদের ত্রিশ/পয়ত্রিম বছরের কর্মজীবনের অবসান ঘটিয়ে কবরে পৌঁছে যাই। পরকালের অনন্ত জীবনে আমাদের এই স্বল্প সময়ের ত্রুটিপূর্ণ ও মানহীন আমল নিয়ে আমরা কতটা পার পাবো সেটাই চিন্তার বিষয়।

বলাবাহুল্য সৃষ্টিকর্তা মানুষের এই দুর্বলতার কথা ভাল করেই জানেন। আর সেকারণেই মানুষের এই আমলের ঘাটতি পূরণের জন্যই ইসলামে সদকায়ে জারিয়ার বিধান দেয়া হয়েছে। সদকায়ে জারিয়ার এই আমলের কল্যাণে একদিকে যেমন ৭২ বছরের গড় আয়ুর মানুষ মৃত্যুর পরও আরও শত শত বছর নেক আমলের সুযোগ লাভ করে তার ব্যক্তিগত আমলের রেকর্ডকে সমৃদ্ধ করতে পারে, তেমনি সামষ্টিকভাবে মানবতার কল্যাণও নিশ্চিত হয়।

সুতরাং আমাদের উচিত সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় মানুষের বিপদে এগিয়ে আসা, গরীব, অসহায় মানুষকে সাহায্য করা, মানব কল্যাণে অবদান রাখা। তাহলে একদিকে যেমন মানব সমাজে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হবে, অন্যদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভও সহজ হবে। #
ahussainbd72@gmail.com
……………………………………………

এলেন নবী সা.
মহিউদ্দিন বিন জুবায়েদ

এলেন নবি প্রিয় রাসূল
মরুভূমির বুকে
আঁধার ঘেরা পৃথিবীটা
কেউ ছিলনা সুখে।

সরল পথের দিশা পেলো
পথ ভোলা সব লোকে
আঁধার কেটে নেমে এলো
আশার আলো চোখে।

দলাদলি রেষারেষির
বাতি গেলো নিভে
সুখি সমাজ কায়েম হলো
সৃষ্টি সেরা জীবে।
……………………………………………

নবী দ্বীনের ছবি
রানা জামান

নবী আমার দ্বীনের ছবি
অন্ধকারে আলো
নবীর আসার পূর্বে বিশ্ব
ছিলো অগোছালো

শান্তির বাণী নিয়ে এলেন
আমার বিশ্বনবী
সৃষ্টিকর্তা হাতে দিলেন
কোরান নামে রবি

কোরান সোজা পথের বিধান
মানে না যে জাতি
ওসব আছে স্বেচ্ছাচারে
যেনো মত্ত হাতি

ওরাই নবীর কুৎসা রটায়
নিজেদের দোষ ঢাকতে
মহান আল্লাহ করবে বিচার
দোষগুলো দিন পাকতে।
……………………………………………

শবে মে’রাজ
সৈয়দ নাজমুল আহসান

(নবী সা. এর উধ্বাকাশ গমন প্রসংগে)

উর্ধ্বলোকে রাসুল(স.) কে করাতে গমন
ধরায় হয়েছিল বোরাকের আগমন।
গভীর রজনি ঘুমে মগ্ন সৃজনি
ঠিক তখনি-
হারাম থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস শেষে
আকাশ থেকে আরো উর্ধ্বাকাশে
সিদরাতুল মুন্তাহা থেকে রবের পাশে
স্ব-শরীরে শবে মে’রাজের রাতে
স্ব-স্থানে ফিরেছিলেন প্রাতে।
অলৌকিক ছিল সব ঘটনা
ব্যর্থ হয়েছিল নিন্দুকের সব রটনা।
এমন অলৌকিক রাত-
পৃথিবীতে আসেনিকো আগে
স্রষ্টার ডাকে স্রষ্টার সাথে
করিতে সৃষ্টির সাক্ষাৎ।
নবী মুহাম্মদ বোরাকে চড়ে
জিব্রাইলকে সাথে করে
কা’বা থেকে গেলেন মসজিদ আকসা
পড়ালেন নামায হয়ে নবীদের বাদশা।
তারপর পৃথিবীর সীমানা ছেড়ে
প্রিয় বোরাক উঠলো আকাশ ফেড়ে
আকাশে আকাশে নবীদের সকাশে
হলো সালাম বিনিময় সাক্ষাতের অবশেষে
শবে মে’রাজ-
নবী মুহাম্মদ পেয়ে আল্লাহর দিদার
হলেন দু’জাহানের রাজ
সালাম নবীজী তোমায় আজ।।
……………………………………………

শ্রেষ্ঠ নবী
মির্জা গোলাম সারোয়ার পিপিএম

সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ নবী
রাসুল মোহাম্মদ,
তাঁর ইশারায় খণ্ডিত হয়
নীল আকাশের চাঁদ।
সালাম দিতে যায় সবাই
সোনার মদিনায়,
নববীতে আছেন শুয়ে
অনেক নিরালায়।
রাসুলের জন্য কাঁদি শুধু
তবু দেখা পাইনা,
হাশর দিনে সুপারিশ ছাড়া
আর কিছু চাইনা।
রওজায় যেয়ে বলে সবাই
মনের যত কথা,
দিতে পেরে দরুদ সালাম
হারিয়ে যায় ব্যথা।
প্রিয় নবী রাসুল মোদের
মদীনার বুলবুল,
নবুয়তের পর ছিলেন তিনি
দাওয়াতে মশগুল।
……………………………………………

অনুপম_দিশা
আর. কে. শাব্বীর আহমদ

রাসূল তোমায় দেখিনি
দেখেছি অনুপম দিশা
মানবপ্রেমে দিয়েছো জীবন
দ্বিধাহীন দিবা-নিশা।।

কুরআনের উপমা মেলে
তোমার জীবনময়
তোমার ছোঁয়ায় সোনা হলো
বর্বর যতো বিশ্বময়
তোমার অমর মহান বাণী
মেটায় মনের আশা।।

তায়েফের ময়দানে রক্ত দিলে
ওগো রাসূল দয়াময়
অভিশাপ দাওনি তুমি
ধন্য হলে জগতময়
তোমার ক্ষমার বাণী শুনি
অমলিন প্রেমে মিশা।।

নির্বাসিত হলে তুমি
আপন ভুবন থেকে
কাফিরেরা চেনেনি তোমায়
নিদারুন ঘৃণা মেখে
মদীনায় গড়ে কুরআনি রাজ
ছড়ালে প্রেমের ভাষা।।
……………………………………………

চিত্তে যেন জাগে শিহরণ
তমসুর হোসেন

যখন প্রবল খরাক্লান্ত বিষাদময় দূঃসহ বিবর্ণ দিনগুলো
আমার ব্যথিত জীবনকে নিদারুণ বিষণ্নতায় ভরে তুলবে
বিরুদ্ধ মতাদর্শের অগণিত ক্রুদ্ধ ভাড়াটে গাড়ল গোঁয়ার
আঘাতের পর আঘাতে হেনে আমাকে করবে ক্ষতবিক্ষত
তখন নিগুঢ় রাতের মায়াময় স্বপ্নের কোমল সুরভি ঢেলে
আমাকে কর অদম্য বলীয়ান, হে মহান রাসুল আমার।

বার্ধ্যক্যের নিসঙ্গ দিনের অসংখ্য অনিশেষ কষ্টের ঘূণপোকা
দেহের প্রতিটি কোষে যখন ঢালবে অসহনীয় জড়তার বিষ
সমাজ স্বজন সুহৃদ পরম বান্ধব থেকে হারিয়ে যাব চিরতরে
ক্ষীণ চন্দ্রিমার অস্বচ্ছ জ্যোতির মতো ঘোলাটে ঝাপসা চোখে
দিনশেষের গোধূলিতে দেখব অমানিশার বীভৎস অন্ধকার
প্রেমময় সাহচর্য দিয়ে আমাকে সহাস্য সজীব রেখ হে রাসুল।

কবরের প্রগাঢ় তমসার নিথর নির্জন সংকীর্ণ বন্দিখানায়
আমি যেন তোমাকে অতি সহজেই চিনে ফেলতে পারি
পুলসিরাত আর জাহন্নমের কষ্টকর অগ্নিময় মহাদূর্গম পথে
হয়ো রাহাবার, কাওসারের শরবত জোটে যেন আমার নসিবে
তোমার সাফায়াতের স্নিগ্ধ পরশে চিত্তে যেন জাগে শিহরণ
সব সংকটে সীমাহীন আনন্দ উল্লাসে তুমি হয়ো অন্তরঙ্গ সাথি।
……………………………………………

আবুল খায়ের বুলবুল
তুমি এসে আলোকিত করলে ধরা

পৃথিবী ছিলো তখন আঁধারে ভরা
তুমি এসে আলোকিত করলে ধরা।
নিষ্ঠুর অমানুষের হৃদয়ে মমতা এনে
সুমানুষ হলো যে তোমাকে নেতা মেনে
তুমি রহমতাল্লিল আলামিন তুমি রাসূলে আলা
তোমার নামে হয় দুরুদ পড়া।।

পৃথিবীতে ছিলোনা যে কোন সুবিচার
তুমি এসে দেখালে শুধু ন্যায়বিচার
কত অত্যাচার নির্যাতন সহেছ তুমি
তবুও অভিশাপ দাওনি কাওকে তুমি
ওহুদের যুদ্ধে দন্ত হয়েছে হারা
তুমি এসে আলোকিত করলে ধরা।
তুমি রহমতাল্লিল আলামিন, তুমি রাসূলে আলা
তোমার নামে হয় দুরুদ পড়া।।

কত হত্যাকারীকে তুমি দিয়েছ ছেড়ে
তরবারী নিয়ে যারা এসেছে তেড়ে
ক্ষমা আর ভালোবাসায় মন ভরালে
কৌশলে কাবা ঘর থেকে মূর্তি সরালে
তুমি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল, পৃথিবীর সেরা
তুমি এসে আলোকিত করলে ধরা।
তুমি রহমতাল্লিল আলামিন, তুমি রাসূলে আলা
তোমার নামে হয় দরুদ পড়া।।
……………………………………………

প্রিয় রাসূলকে
তৈমুর খান

সব কথা তো তোমারই কথা
সব আকাশে তুমি
ঈমানবৃক্ষের ফুলগুলি সব
ফুটছে আলো চুমি।

যে পথ দিয়ে গেছো
সেই পথই তো পথ
যা কিছু সব তাঁরই ইচ্ছা
নেই কোনো সংঘাত।

রোজ নত হই তোমার সন্নিধানে
চেয়ে থাকি ওই আরশ ছায়ার পানে
ইসমে আজম পাই যদি পাই
রোজ হাশরের ময়দানে।

নূরের জ্যোতি পথ দেখাবে
পার করবে পুলসেরাত
তুমি রাসূল তুমিই প্রেম
শুধু তোমারই শাফায়াত।
……………………………………………

বিশ্ব নবী
শাহজাহান মোহাম্মদ

জন্মের আগে হারিয়ে পিতা
এতিম বিশ্ব নবী
ধাত্রীমাতা পেয়ে শিশু
দেখেন সুখের ছবি।

ধাত্রীমাতার দুগ্ধ পিয়ে
ধীরে ধীরে বাড়েন
শান্তির বাণী ছড়িয়ে দিয়ে
সবার দৃষ্টি কাড়েন।

মুগ্ধ সবাই তাঁর গুণেতে
নয় তো মিথ্যা বলা
সত্য কথা ন্যায়নিষ্ঠায়
সরল পথে চলা।

বিচার দিনের সুপারিশ তাঁর
অনুসারীর জন্য
তাঁর উম্মত হতে পেরে
জীবন হলো ধন্য।
……………………………………………

সীরাত ও প্রাচ্যবাদ : একটি পর্যালোচনা
কাজী একরাম

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, ক্রুসেড বাহিনী কর্তৃক মুসলিম দুনিয়ার উপর ভয়াবহ আক্রমণ পরিচালনের পিছনে কারণ বা প্রনোদনা ছিল দু’টি।

এক হলো ‘ধর্মীয় ঈর্ষাপরায়ণতা, গৌড়ামি ও অন্ধত্ব।’ যার কারণে গীর্জার পুরোহিতদল উত্তেজিত হয়ে ইউরোপের জনসাধারণের মধ্যে মুসলমানদের বিরুদ্ধে চরম ঘৃণা ও ক্ষোভের সঞ্চার করতে থাকে। খ্রিস্টান জাতিকে তারা এ বলে ঐক্যবদ্ধ ও উত্তেজিত করে যে, কাফিরদের (মুসলমানদের) অধীন থেকে খ্রিস্টান ভূমি অর্থাৎ ফিলিস্তিন ও বায়তুল মুকাদ্দাসকে মুক্ত করা তাদের প্রথম কর্তব্য। সুতরাং ক্রুসেড বাহিনীর মধ্যে অধিকাংশই ধর্মীয় উন্মাদনা ও গোঁড়ামির শিকার হয়ে যুদ্ধ ময়দানে ঝাপিয়ে পড়ে, আন্তরিকতা ও চরম বিশ্বাস নিয়ে। কিন্তু ময়দানে তারা পেয়েছে মৃত্যু, ধ্বংস, হত্যা, রক্তপাত এবং আঘাতের পর আঘাত।

দ্বিতীয় কারণ ছিল ‘রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ বা সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব।’ ইউরোপের শাসকবর্গ ইসলামী রাষ্ট্রসমূহ এবং বিশেষ করে সিরিয়া ও এর পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র সম্পর্কে শুনতে পায় যে, সেখানে ধন-সম্পদ, শিল্প-কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, সবুজ শ্যামল ও উর্বর ভূমির ফসল উপর্যুপরি বিদ্যমান, যা ছিল তখনকার ইউরোপে অকল্পনীয়। এমনিভাবে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহে শান্তি-শৃঙ্খলা, জীবনের নিরাপত্তা ও উচ্চতর সভ্যতা-সংস্কৃতি সংক্রান্ত এমন সব কাহিনী তারা শোনে, যা তারা কখনো স্বপ্নেও দেখে নাই। সুতরাং ইউরোপীয় শাসকবর্গ ‘যীশু খ্রিস্টের’ নাম করে তাদের সৈন্যবাহিনী মুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও মুসলমানদের ধন-সম্ভার লুটে নেয়ার চরম লালসা, অর্থাৎ সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব। কিন্তু শেষতক মহান আল্লাহর ইচ্ছারই জয় হলো। দু’শতাব্দীর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ক্রুসেড বাহিনীকে বিদেয় নিতে হলো পরাজিত ও লাঞ্ছিত হয়ে।

ইসলামী দুনিয়ার উপর সামরিক দিক থেকে পরাজয়ের পর এ কথা নিঃসন্দেহে তারা বুঝে নিয়েছিল যে, ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে সম্মুখযুদ্ধের পরিবর্তে তাদের বিশ্বাস, শিক্ষা, সভ্যতা ও সংস্কৃতি এবং ইতিহাস পর্যালোচনা করে তাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতির উপর নীরব হামলাই ব্যাপক কার্যকর ও ফলপ্রসু হবে। এই বিবেচনাবোধ থেকেই পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের বিভিন্ন দল অদ্যাবধি ইসলাম, ইসলামের নবীর সীরাত এবং মুসলমানদের ইতিহাস, সভ্যতা-সংস্কৃতিকে কলংকিত করার অপচেষ্টায় রত। এতে নিয়োজিত বিশেষ গোষ্ঠী হলো ওরিয়েন্টালিস্ট বা প্রাচ্যবিদ। যারা প্রাচ্যজ্ঞানের চর্চা ও অনুশীলনের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানে প্রধানত ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের পিছনে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছে। অবশ্য তাদের মধ্যে এমনও অনেক আছে, যারা তাদের জ্ঞান-গবেষণায় ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করে। সত্যের কাছে নিজের দায়বদ্ধতা বজায় রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। তবুও বলতেই হয় যে, প্রথমোক্তদের দলই ভারী।

দুই.
হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন ইসলামের মৌলসত্তা; যার মাধ্যম হয়ে কুরআন এবং সুন্নাহর অবয়বে ইসলাম মুসলমানদের নিকট এসেছে। খৃষ্টান পাদ্রী, ধর্মপ্রচারক মিশনারী এবং বিশেষত অমুসলিম পণ্ডিত প্রাচ্যবিদশ্রেণী একারণে মুহাম্মদ সা. এর পবিত্র সত্তা এবং সীরাতের উপর আক্রমণ করেছে সবচেয়ে বেশি। যাতে করে দীনে ইসলামের মূল উৎস-সত্তার প্রতি মুসলিমজাতি সংশয়, অনাস্থা ও অবিশ্বাসের শিকার হয়ে পড়ে। যেহেতু মানুষ স্বভাবতই ধর্মগুরুর ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাঁর অনুসরণ করে থাকে, তাই তারা ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে নিজেদের যাবতীয় ঘৃণ্য আচরণ ও বুদ্ধিবৃত্তিক আক্রমণের প্রধানতম শিকারে পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছে!

খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের আবির্ভাব ঘটে। এরপর অল্প সময়, মাত্র ২৩ বছরের জীবনসীমায় হযরত মুহাম্মদ সা. যে অবিস্মরনীয় সাফল্য লাভ করেছেন, তা যে কোনো বিচারে অনন্য সাধারণ অর্জন। হাজার বছরের ব্যবধানে তাঁর আদর্শের স্থায়িত্ব ও বিশ্বসভ্যতায় তাঁর দুর্দমনীয় প্রভাব, যুগোপযোগীতায় তাঁর সমাধান, আধুনিকতায় তাঁর ব্যাখ্যা, বিজ্ঞানে তাঁর অর্জন, প্রজ্ঞায় তাঁর অধিকার, হৃদয়ে হৃদয়ে তাঁর আসন–কোনটাই ম্লান হয়ে যায়নি। কী মহিমা ছিল তাঁর জীবনে, কিভাবে তিনি এত শক্তিশালী, কেন তিনি আজও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে, তা চলমান গবেষণার বিষয়। বিশ্বব্যাপী তাঁকে নিয়ে যে উৎসাহ ও আলোচনা, তার ধারেকাছেও নেই অন্য কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব।

মুহাম্মদ সা. এর জীবনী ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে প্রতিষ্ঠিত। তিনি এমনই একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর তুলনা বস্তুনিরপেক্ষ ইতিহাসের বিচারে বলা যেতে পারে একক। তাঁর জীবনের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ঘটনাগুলোও বিশুদ্ধভাবে সংরক্ষিত হয়েছে। এ পর্যন্ত অন্য কোনো মনীষীর জীবনী এত সতর্কতা ও বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি, আর হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। তাঁর জীবনী সংগ্রহের পর্যায়ে হাজার হাজার সাহাবায়ে কেরামের জীবনীও অনেকটা বিশুদ্ধভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অধিক সংখ্যক মানুষের বিশুদ্ধ জীবনী সংগৃহীত হওয়ার ঘটনা আর নেই। ইসলামী জ্ঞানকলায় জীবনীশাস্ত্র তথা “আসমাউস রিজাল” শীর্ষক বিজ্ঞান মুসলমানরাই প্রতিষ্ঠিত করে, যার ফলে বর্তমানে ৫ লক্ষেরও বেশী মানুষের জীবনী জানা যায়। বিশিষ্ট ইসলামী স্কলার আল্লামা শিবলি নুমানি লিখেছেন : “কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের এই গর্বের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না যে, তারা স্বীয় পয়গাম্বরের জীবনী ও ঘটনার এক একটি অক্ষর এমন ভক্তি ও গুরুত্বের সাথে সংরক্ষণ করে রেখেছে যে, কোনো মনীষীর জীবনী আজ পর্যন্ত এমন পূর্ণাঙ্গ এবং সতর্কতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ হয়নি, আর না ভবিষ্যতে সম্ভব হবে। এর চেয়ে অধিক আর কি আশ্চর্যের বিষয় হতে পারে যে, রাসুলুল্লাহ এর কর্ম ও বাণীর পর্যালোচনা ও গবেষণার উদ্দেশ্যে তাঁকে দর্শনকারী এবং তাঁর সাথে সাক্ষাৎকারীর মধ্য হতে প্রায় তেরো হাজার লোকের নাম ও জীবনী লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।” এই আশ্চর্যের বিস্মিত অভিব্যক্তি শুনতে পাই ইসলামের কঠোর সমালোচক বিখ্যাত প্রাচ্যবিদ স্প্রেংগারের ভাষায়- “এমন কোনো সম্প্রদায় হয় নাই, এখনো নাই যারা তাদের (মুসলিমদের) মতো বারোটি শতাব্দী যাবৎ প্রত্যেক জ্ঞানী ব্যক্তির জীবনী লিপিবদ্ধ করেছে। যদি মুসলিমগণের রচিত জীবন- চরিতমূলক গ্রন্থগুলো সংগ্রহ করা হয়, আমরা খুব সম্ভব অর্ধ মিলিয়ন কৃতি পুরুষের জীবনবৃত্তান্ত লাভ করব।”

তিন.
পৃথিবীর সব প্রান্তেই কোন-না-কোনভাবে মুহাম্মদ সা. এর জীবন ও শিক্ষা এবং মুসলিম সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রভাব বিস্তৃত হয়েছে। ইসলাম সম্পর্কে চর্চা ও গবেষণা হয়েছে নানাভাবে। বিশেষত রাসূল সা. কে নিয়ে রচিত হয়েছে অজস্র গ্রন্থরাজি। এর মধ্যে যেমন গুণগানধর্মী ইতিবাচক গ্রন্থ রয়েছে, তেমনি তাঁকে বিরোধিতা ও সমালোচনা করেও লেখা হয়েছে অসংখ্য নেতিবাচক গ্রন্থ। আবার তাঁকে নিয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে রচিত অপপ্রচারমূলক ও নেতিবাচক গ্রন্থের জবাবে রচিত হয়েছে অনবদ্য এবং কালজয়ী সব রচনা। উপমহাদেশের প্রেক্ষাপটে বলা যায়, এখানে বস্তুনিষ্ঠ সীরাত রচনার ধারা সূচিত হয়েছে খ্রিস্টান পণ্ডিত ও মিশনারীদের বিভ্রান্তিমূলক রচনার জবাবের প্রণোদনা থেকেই। ভারতীয় উপমহাদেশে এক্ষেত্রে সর্বপ্রধান যিনি এগিয়ে আসেন, তিনি হলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮ খ্রি.)। ইংরেজ লেখকদের অসাধুতার জবাবে স্যার সৈয়দ আহমদ রচনা করেন Essays on life of muhamet গ্রন্থটি। শুধু ভারতেই নয়, গোটা মুসলিম দুনিয়ায় স্যার সৈয়্যদের এই উদ্যোগ ছিল সর্বপ্রথম। উর্দু ভাষায় তাঁর বিশালায়তন ‘খুতবাতে আহমদিয়া’ এদেশীয় ভাষায় প্রথম প্রতিবাদমূলক সীরাত গ্রন্থ। ভারতে খ্রিস্টান মিশনারীমহল উনিশ শতকে ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে প্রচুর বিভ্রান্তিমূলক প্রচারপুস্তিকা লিখে প্রচার করে। এদের অন্যতম ছিলেন পাদ্রী ফান্ডার। ফান্ডার হিন্দুস্তানের সেরা আলেম ও মুসলিম স্কলারদের প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ করতেন। ‘মিজানুল হক’ নামে একটি বই লেখেন এবং তার বদ্ধমূল ধারণা, এই বইয়ের জবাব দেওয়ার মত সামর্থ্য মুসলমানদের নেই! তারই উপযুক্ত জবাব হয়ে হাজির হন আল্লামা রহমতুল্লাহ কিরানভি রহ. (১৮১৮-১৮৯১ খ্রি.)। তিনি ফান্ডারকে সর্বধর্মের মানুষের বিশাল জনসমক্ষে এক ঐতিহাসিক বিতর্কে পরাজিত করেন। ফান্ডার এতে এতটাই অপমানবোধ করেন যে, ভারতবর্ষ ছেড়ে তিনি পালিয়ে বিলেত চলে যান। ঐতিহাসিক এই বিতর্কটি রজব ১২৭০ হি. মোতাবেক ১০ ই এপ্রিল ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে আগ্রাস্থ আকবরাবাদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিরানভি রহ. এরপর এ বিষয়ে ‘ইজহারুল হক’ নামে আরবি ভাষায় একটি প্রামাণ্য গ্রন্থ রচনা করেন। চারখণ্ডের এই অসামান্য গ্রন্থে তিনি ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর বিরুদ্ধে মিশনারি কর্তৃক আরোপিত সকল অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণ করেন। একইসাথে বাইবেলের অসংখ্য স্থানে যে পরিবর্তন ও বিকৃতি ঘটেছে, তার প্রমাণ উপস্থাপন করেন। বস্তুত কিরানভির এই গ্রন্থটির প্রকাশ খ্রিস্টান দুনিয়ার প্রতি ছিল এক বড় দুঃসংবাদ। লন্ডন টাইমসের গ্রন্থটি সম্পর্কে মন্তব্য ছিল–‘এ গ্রন্থের প্রকাশনা ও প্রচারণা অব্যাহত থাকলে বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্মের অগ্রগতি রুদ্ধ হয়ে যাবে।’

চার.
হযরত মুহাম্মদ সা. এর জীবন, কর্ম এবং ঐতিহাসিক সাফল্যের মূল্যায়ন নিয়ে বিশ্বব্যাপী লেখালেখির যে বিষয়-বৈচিত্র পরিলক্ষিত হয়, তার অন্যতম ক্ষেত্র পাশ্চাত্য দুনিয়া। ইউরোপের অধিকাংশ প্রভাবশালী ভাষায় বহু দশক ধরে মুহাম্মদ সা. -এর জীবনী ও আদর্শ চর্চার বিষয়টি মানুষের সামনে এসেছে। নানা উদ্দেশ্য, নানা দৃষ্টিকোণ থেকে সীরাত বা নবীজীবনী চর্চার এই প্রেক্ষাপট তৈরী হয়েছে। ইসলামকে হেয় এবং মহানবীর অনুপম চরিত্রে কালিমা প্রক্ষেপনের উদ্দেশ্য নিয়ে পাশ্চাত্যে প্রথমে নবীজীবনী চর্চার যে ধারার সূচনা হয়, তা যেমন একটি কলংকময় অধ্যায়, তেমনি এ হীন প্রচেষ্টার ফলশ্রুতিতে পাশ্চাত্যে তো বটেই, প্রাচ্যেরও অনেক ভাষায় কালজয়ী সীরাত গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বলা যায়, আধুনিককালে সমৃদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ ও উন্নত গবেষণালব্ধ সীরাত গ্রন্থের যে রেনেসাস, তা শুরু হয়েছিল তথাকথিত প্রাচ্যবিদদের সীরাত চর্চার অসাধুতার রেশ ধরেই। বস্তুত, অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এ যাত্রা শুরু হয়েছে এবং ঘটনাক্রমে তা শাপেবর হয়েছে।

প্রাচ্যে এবং পাশ্চাত্যে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসে রাসূল সা. এর বিস্তারিত জীবনী রচনা ছাড়াও, স্বতন্ত্রভাবে সীরাতে রাসূলের উপর যত গ্রন্থ রচিত হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত হয়ে চলছে, তার সীমা পরিসীমার পূর্ণাঙ্গ হদিস পাওয়া এবং তার যথাযথ পরিসংখ্যান তুলে ধরা সম্ভব নয়। সাইয়েদ সোলায়মান নদভী তাঁর বিখ্যাত বক্তৃতাগ্রন্থ ‘খুতবাতে মাদরাস’-এ লিখেছেন, আজ থেকে এক শতাব্দীরও অধিককাল পূর্বে দামেশকের ‘আল মুকতাবিস’ পত্রিকায় একটি পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়। তাতে বলা হয় এ পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন ভাষায় হযরত মুহাম্মদ সা. এর সম্পর্কে ১৩’শ পুস্তক লিখিত হয়েছে। তারপর থেকে এ যাবৎ যত সংখ্যক গ্রন্থ রচিত হয়েছে, সেগুলিকেও শামিল করা হলে এ সংখ্যা কোথায় গিয়ে থামবে, তা বলাই বাহুল্য।

ইসলামের বিশ্বজয়ী বিস্তারে এবং মুসলিম শক্তির অভ্যুত্থানে খ্রিস্টান ইউরোপ যে ভীতি ও বিদ্বেষ তখন জন্ম নিয়েছিল, তার ফলে সংঘটিত হয় দীর্ঘস্থায়ী ক্রুসেড-যুদ্ধ, যা ছিল অন্ধ খ্রিস্টীয় মৌলবাদের ফলশ্রুতি, যা ইতোপূর্বে আলোচিত হয়েছে। নিজেদের তৈরি যুদ্ধে নিজেদের সম্মিলিত পরাজয়ের ফলে খ্রিষ্টানদের মুসলিম বিদ্বেষ আরও জঘন্য রূপ লাভ করে। দ্বন্দ্ব-যুদ্ধে পরাজিত লড়াকু যেভাবে প্রতিপক্ষের প্রতি খিস্তি এবং কানে কামড় বসাতে দ্বিধা করে না, তেমনি খ্রিস্টান বিশ্ব মুসলিমদের ইতিহাস এবং ইসলামের প্রকৃত পরিচয়ের উপর ইচ্ছাকৃত আবর্জনা নিক্ষেপে বদ্ধপরিকর হয়। বেশ পরিকল্পনা নিয়েই তারা ইসলামের ইতিহাস ও মহানবী সা. এর নিষ্কলুষ চরিত্রে কালিমা লেপনের কার্যক্রম হাতে নেয়। এই কারণে, মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে যত বিদ্বেষমূলক রচনা প্রকাশিত হয়েছে, তার অধিকাংশই ইউরোপে হয়েছে।

এপ্রসঙ্গে ফরাসী প্রাচ্যবিদ এমিল দরমেঁগেম, ইংরেজি এমেল ডারমিংহাম লিখেছেন, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার (ক্রুসেড) সাথে সাথে উভয় সম্প্রদায়ের মতবিরোধ ও বিদ্বেষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে। দিন দিন তা বেড়েই চলে। পশ্চিমা জগত তাদের জামার আঁচল দ্বারা বায়ু সঞ্চার করে তা আরো বাড়িয়ে তোলে। কোনো প্রকার তথ্যানুসন্ধান ছাড়াই খ্রিস্টজগত ইসলামের বিরুদ্ধে জঘন্য বিষোদগারে সীমা ছাড়িয়ে যায়। খ্রিস্টান কবিরাও এতে যোগ দেয়। তারা চরম ধৃষ্ঠতা প্রদর্শন করে মুহাম্মদ সা. কে লুণ্ঠনকারী, দস্যুদলের সর্দার, কপট, ইন্দ্রীয় পূজারী, লোভী ও যাদুকর প্রভৃতি অমার্জনীয় শব্দ ব্যবহারেও কুণ্ঠিত হয়নি।

ফরাসি পণ্ডিত হেনরী ডি কাস্ট্রী মধ্যযুগের ইউরোপে ইসলাম, ইসলামের নবী মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে ভয়ংকর অজ্ঞতা ও বিদ্বেষচর্চার বিবরণ দিচ্ছেন এভাবে- “মধ্যযুগে ইসলাম সম্পর্কে ইউরোপে যত কাহিনী ও গীত প্রচলিত ছিল, সে সব দেখে-শুনে মুসলমানরা আমাদের সম্পর্কে কী মন্তব্য করবে, তা বুঝে উঠতে পারছি না। মুসলমানদের ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতাপ্রসূত এসব কাহিনী এবং গীতসমূহ হিংসা ও বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। ইসলাম সম্পর্কে যত ভুল বোঝাবুঝি ও বিরূপ মনোভাব আজতক বিরাজমান আছে, তার মূলেও এসব ভুল তথ্য কার্যকরী রয়েছে। প্রত্যেক খ্রিস্টান কবিই মুসলমানদেরকে পৌত্তলিক ও প্রতিমাপূজারী মনে করতেন এবং ক্রমপর্যায় অনুসারে তাদের তিন খোদা আছে বলে মনে করতেন। তিন খোদার একটি হলো- মাহুম, মাকুমেত বা মহামেত, দুই, উপলিন, তিন- টুরগাম্যান। তাদের ধারণা ছিল, মুহাম্মদ সা. নিজের খোদায়ী দাবির উপরই তার প্রচারিত ধর্মের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। সবচাইতে আশ্চর্যজনক কথা হচ্ছে এই যে, যে মুহাম্মদ মূর্তিপূজার চরম বিরোধী ও শত্রু ছিলেন এবং যিনি পৌত্তলিকতা তথা মূর্তি পূজাকে ‘আকবারুল কাবায়ের’ বা কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সর্বাধিক গুরুতর গুনাহ বলে ঘোষণা করলেন, তাঁর সম্পর্কে এরূপ ধারণা পোষণ করা হতো যে, তিনি তাঁর নিজের মূর্তিকে পূজা করার জন্য সকলকে আহ্বান জানাতেন। এর চাইতে বড় মিথ্যাচার আর কী হতে পারে?”

পাঁচ.
ইসলাম ও ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে পশ্চিমামানস এমন অজ্ঞতা, বৈরিতা আর বিদ্বেষ ভাবাপন্নতাকে আশ্রয় করেই গড়ে উঠেছে। বর্তমানেও আমরা দেখি, অধিকাংশ পশ্চিমা নাগরিক ইসলাম ও মহানবী সা. এর প্রকৃত পরিচয় সম্পর্কে সাধারণত অজ্ঞ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তাদের যা শেখানো হয়েছে, যা বুঝানো হয়েছে, তার প্রভাববলয় থেকে তারা আজও বেরিয়ে আসতে পারছে না। প্রশ্ন হচ্ছে, পর্যাপ্ত তথ্যের উপস্থিতি, চিন্তা ও মতের স্বাধীনতা এবং উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অনীহার অবস্থা এখনও বজায় রয়েছে সেখানে। মিশরীয় পণ্ডিত ড. আব্দুর রহমান আযযাম (১৮৯৩-১৯৭৬ খ্রি.) এর কার্যকারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন। তিনি তাঁর “আর-রিসালাহ আল-খালিদাহ” গ্রন্থে লিখেছেন, আমাদের কাছে ঐতিহাসিক তথ্যের যথেষ্ট সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পাশ্চাত্য জগৎ মুহাম্মদ সা. ও ইসলাম সম্পর্কে এত কম জানে বা বুঝে যে, সম্ভবত অন্য কোনো নবী এবং তাঁর ধর্মের বেলায় তা প্রযোজ্য নয়। আজকের পাশ্চাত্য জগতে চিন্তার স্বাধীনতার ক্ষেত্রে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর ঐতিহ্য। এছাড়াও রয়েছে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, মানবীয় জীবন ধারার সর্বক্ষেত্রে সীমাহীন জ্ঞানের ভান্ডার। অথচ একজন নবী ও মানুষের নেতা হিসেবে মানব ইতিহাসের বিপুল প্রভাব বিস্তারকারী হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে আলেকজান্ডার বা সীজারের তুলনায় তারা অনেক কম জানেন। অথচ আলেকজান্ডার এবং সীজারের প্রভাব ইসলাম বা মুহাম্মদ সা.-এর তুলনায় নিতান্তই কম। বর্তমান দুনিয়ায় জানা এবং বোঝার জন্যে এতো আগ্রহ ও কৌতুহল থাকা সত্ত্বেও ইসলাম সম্পর্কে এই অনীহার কারণ কী? এ প্রসঙ্গে ড. আযযামের মতে, দু’টি কৈফিয়ত বিবেচ্য হতে পারে। প্রথম কৈফিয়তটি প্রখ্যাত সুইডিশ পন্ডিত টর আঁদ্রের লেখা থেকে জানা যায়। তিনি তাঁর ‘মুহাম্মদ দি ম্যান এ্যান্ড হিজ ফেইথ’ গ্রন্থে লিখেছেন– কারণটা সম্ভবত একটি প্রবাদের মাধ্যমে পরিষ্কার হয়েউঠবে “আত্মীয়েরা পরম্পরকে অন্য সবার চাইতে কম বোঝে।” একজন খ্রিষ্টান ইসলামে এমন অনেক কিছু দেখেন, যা তাকে তার নিজের ধর্মের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু তা উপস্থাপিত হয়েছে অত্যন্ত বিকৃতরূপে। এখানে তিনি এমন কতগুলো ধারণা এবং বিশ্বাস সম্পর্কিত বিবরণ পান যা তার নিজের ধর্মের সাথে স্পষ্টরূপে সম্পর্কযুক্ত। তা সত্ত্বেও সেগুলো আশ্চর্যজনকভাবে ভিন্ন পথ বেয়ে চলে। ইসলাম আমাদের কাছে এত সুপরিচিত যে, আমরা অত্যন্ত অসতর্ক ও উদাসীনতার সাথে তাকে এড়িয়ে চলে যাই এবং এতে করে আমরা এমন একটা বিষয়কে উপেক্ষা করি যা আমরা জানি এবং খুব ভাল করেই জানি। তথাপি ইসলাম আমাদের কাছে যথেষ্ট পরিচিত নয়। আমরা প্রকৃতই এর অনন্যতা এবং মর্ম উপলব্ধি করতে পারি না। কি কারণে ইসলাম ধর্মীয়জগতে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে এবং অতি সঙ্গত কারণে এখনো সে স্থানটি জুড়ে রয়েছে। সম্পূর্ণ নতুন এবং অপরিচিত ধর্মকে যেন আমরা সহজেই বুঝতে পারি যেমন ভারত ও চীনের ধর্মসমূহ। আরব দেশের নবী ও তাঁর কিতাবকে বুঝতে হলে প্রয়োজন আরো গভীর অন্তর্দৃষ্টি এবং আধ্যাত্মিক স্বাধীনতা। দ্বিতীয় কৈফিয়তটা দিয়েছন উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ। তাঁর ‘ইসলাম ইন মর্ডান হিস্ট্রি’ (১৯৫৭) গ্রন্থে। ইতিপূর্বে আমরা এ বিষয়ে আলোকপাত করে এসেছি। স্মিথ উক্ত গ্রন্থে (পৃষ্ঠা ১০৯) লিখেছেন, ইতিহাসের গতিধারায় ইসলামের সাথে পাশ্চাত্য ও অন্যান্য সভ্যতার সম্পর্ক শুরু থেকেই বিপরীতধর্মী হিসেবে গড়ে উঠেছে। তেরশ বছর ধরে ইউরোপ ইসলামকে প্রায়শ শত্রু এবং তার নিজের জন্যে হুমকি হিসেবে জেনে এসেছে; তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই যে, পৃথিবীর অন্য ধর্মীয় নেতার তুলনায় পাশ্চাত্যের সংবাদ মাধ্যমগুলো মুহাম্মদ সা.-কে নগণ্য স্থান দিয়েছে এবং পৃথিবীর অন্যান্য ধর্মের তুলনায় পাশ্চাত্যে ইসলাম কমই গুরুত্ব পেয়েছে।

ছয়.
প্রথম দিকের প্রাচ্যবিদরা যেভাবে উম্মুক্তভাবে ইসলাম ও মুহাম্মদ সা. এর নিন্দা-সমালোচনা করতে ব্যস্ত ও অভ্যস্ত ছিলো, আধুনিক যুগে তাতে অনেকটা পরিবর্তন আসে। এসময় দেখা যায় এমন লেখক এবং গবেষকদের আবির্ভাব ঘটেছে প্রাচ্যবাদের এলাকায়, যারা তাদের পূর্বসূরীদের কর্মধারা ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এমনকি তাদেরকে নিয়ে করেছেন তীব্র সমালোচনাও। কয়েকটি দৃষ্টান্ত দেখুন:

ভ্যাটিকানের ‘নন খ্রিশ্চিয়ান এ্যাফেয়ার্স’ দপ্তর দ্বিতীয় ভ্যাটিকান কাউন্সিলের পর একটি তথ্যমূলক পুস্তিকা প্রকাশ করে। এর নাম হচ্ছে ‘মুসলিম-খ্রিস্টান আলাপ আলোচনার দিক নির্দেশিকা।’ প্রকাশক অ্যানকোরা, রোম। ১৯৭০ সালে ফরাসী ভাষায় এর তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এই পুস্তকে ইসলাম সম্পর্কে খ্রিস্টানদের প্রতি অতীত থেকে প্রাপ্ত যাবতীয় বাতিল ধারণা ও কুসংস্কার এবং বিদ্বেষপ্রসূত বিকৃত মতামত পরিহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। ভ্যাটিকান প্রচারিত এই দলীলে স্বীকার করা হয় যে, এই পর্যায়ে আমাদের অবশ্যই একটা দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষত এই পর্যায়ে আমরা একটা বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করেছি। আর তা হলো, ইসলাম সম্পর্কে আমাদের মনের মধ্যে এক চিরাচরিত বিবেচনা আমরা জিইয়ে রেখেছি এবং ইসলাম সম্পর্কে যখন-তখন যেন-তেন প্রকারে সেই বিভ্রান্তিকর মতামত প্রকাশ করেও চলেছি। আমাদের উচিত হবে, অন্তরের ভেতর ইসলাম সম্পর্কে এ রকম কোনো ধারণা পোষণ না করা এবং সে ধারণা যাতে এরকম সহজিয়া ও একতরফা না হয়, সেদিকে আবশ্যিক দৃষ্টি রাখা …ইসলাম সম্পর্কে সেই পুরাতন ভাবধারা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ব্যাপারে সবার আগে খ্রিস্টানদেরই এগিয়ে আসতে হবে।… স্বীকার করতেই হবে যে, অতীতে ইসলামের প্রতি অন্যায় করা হয়েছে, আর এই অন্যায়ের জন্য দায়ী হলো পাশ্চাত্য জগৎ, বিশেষত তার খ্রিস্টীয় শিক্ষাব্যবস্থা।’ ফরাসী প্রাচ্যবিদ ডারমিংহাম তো নাম উল্লেখ পূর্বক স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “এটা সত্যিই দুঃখজনক যে, কিছু সংখ্যক প্রাচ্যবিদ সমালোচনার ক্ষেত্রে সীমালংঘন করেছেন। যেমন মারগোলিয়াথ, নওলডেকী, স্প্রেংগার, ডোজী, কায়তানী, মাসীন, গোল্ডজিহার, গোল্ড ফরোয়া প্রমুখ । তাদের গ্রন্থসমূহ মূলত নেতিবাচক। তারা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে থাকেন তাও মূলত নেতিবাচক। অথচ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে কোনো জীবনী রচনা সম্ভব নয়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, পাদ্রী ল্যামানসের মতো একজন উঁচু মাপের প্রাচ্যবিদও ধর্মীয় গোড়ামী ও অন্যায় পক্ষপাতিত্ব থেকে মুক্ত থাকতে পারেন নি। তিনি তার উন্নতমানের গবেষণা পুস্তকসমূহ ইসলাম বিদ্বেষ ও ইসলামের নবীর প্রতি বিদ্বেষের দ্বারা কলংকিত করেছেন।”

এ্যনমেরী শিমেল লিখেছেন- “এ সত্যকে অকপটে স্বীকার করতে হয় যে, মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইউরোপের বিতর্কিত বই-পুস্তক, প্রবন্ধ -নিবন্ধ এবং সাহিত্য সমালোচনাতে হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শ ও চরিত্রকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে তুলে ধরা হয়েছে। তাঁকে এবং তার মিশনকে ইনসাফের সাথে তুলে ধরতে অমুসলিম বিশ্বের কয়েক শতাব্দি লেগেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন পদ্ধতি বুঝতে শুধু এই অপচিন্তা ধারাই অমুসলিম জ্ঞানপিপাসু এবং মনীষীদের কি অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছে।”

দি পার্মানেন্ট এলিমেন্ট ইন রিলিজিওন গ্রন্থে বিশপ বয়েড কার্পেন্টার মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে তাদের চিরায়ত অবস্থান ও মনোভাবের পরিবর্তনের দিকে ইঙ্গিত দিয়ে লিখেছেন–“হযরত মুহাম্মদ সা. এর বিষয়ে অপপ্রচারের যে ঘৃণ্য চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তার ফলে অসংখ্য লোক তাঁর বিষয়ে বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছে। তাদের ধারণায় তিনি এমন মারাত্মক ঘৃণ্য ব্যক্তি, যত প্রকারের অন্যায় আছে, সবই তার বিষয়ে ফিট হতে পারে। তবে আক্রোশের ধেয়ে আসা কালবৈশাখীর কালোমেঘ দূর হয়ে আকাশ স্বচ্ছ হয়ে গেছে। এজন্য আমরা ইসলামের প্রচারককে আলোকচ্ছটার মধ্যে দেখছি।

সাত.
আধুনিক কালের প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ও বক্তব্যের মধ্যে একতরফা সমালোচনা ও কুৎসারটনার বদলে মুহাম্মদ সা. এর প্রশংসা ও তাঁর সম্পর্কে ইতিবাচকতার নিদর্শন প্রত্যক্ষ্য করা যায়। তাদের এই ইতিবাচক মুল্যায়নের হাত ধরে অনেকসময় নবীজীবনের নানা দিক ও বিষয় ফুটে উঠেছে অত্যন্ত চমৎকারভাবে এবং তা এতটাই যে, যে কেউ তাতে মুগ্ধ হবে এবং ইসলামের নবীর প্রতি সশ্রদ্ধ সম্মান প্রদর্শন করতে বাধ্য হবে। কিন্তু, একইসাথে এটাও স্বীকার্য সত্য যে, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের বিচারে পূর্ববর্তীদের থেকে তারা বদলে গেছেন এমনটা বলা যায় না। বরং বদল হয়েছে কেবল তাদের বাহ্যিক খোলস। সুন্দর সুন্দর বাক্যের আড়ালে, চাতুর্যময় ভাষাভঙ্গিতে তারা এমন সব ‘অমৃত বিষ’ ছড়িয়ে দেয়, যা সরল চোখে ধরা পড়তে চায় না, ফলত পাঠক আরও বেশি বিভ্রান্তির শিকার হয়! এ প্রসঙ্গে আবুল হাসান আলী নদভীর বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, ‘সাধারণত এশ্রেণীর প্রাচ্যবিদরা তাদের রচনায় বিষের পরিমাণ পরিমিত মাত্রায় রাখেন। এ থেকে কম যাতে না হয়, খেয়াল রাখেন। আবার এত বেশি যেনো না হয় যা পাঠকের মনে ঘৃণা, বিরক্তি ও সন্দেহ সৃষ্টি করবে৷ এমতাবস্থায় তাদের রচনাবলী খুবই বিপজ্জনক বলে প্রমাণিত। একজন মধ্যম পর্যায়ের শিক্ষিত লোকের জন্যে এই বিষের প্রভাব থেকে মুক্তি পাওয়া দুষ্কর হয়ে যায়। এবং বলতে গেলে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।’

এবার দেখুন এই সত্যের কিছু নমুনা:

(১) Half Hours with Muhammad গ্রন্থে আর্থার এন উলাস্টন লিখেছেন, ‘আরবের পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদেশে হাজার হাজার মানুষ বশ্যতা স্বীকার করতো। তাঁর আনুগত্য প্রদর্শনে তারা সদাপ্রস্তুত থাকতো। কোটি কোটি অনুসারীর অন্তরে তার স্মরণ সদাজাগ্রত।’

(২) এডওয়ার্ড এ ফ্রীম্যান তার ‘The History and Conquest of the Saracenes’ গ্রন্থে (পৃ. ৩৬) লিখেছেন, ‘হযরত মুহাম্মদ সা. হলেন সংবিধান রচনাকারী ‘আরবীয়’ এক মহান ব্যক্তি। তৎকালে বিশ্বব্যাপী বিপ্লব ঘটান এবং পরবর্তী সমস্ত যুগে প্রভাব বিস্তার করা তাঁর ভাগ্যে লিখে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগতভাবে কোনো বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হওয়ার দাবি করতেন না। তাঁর আচার -ব্যবহার সদা মুগ্ধকর এবং সাম্যের বাস্তব চিত্র হতো। বিপদে সাহায্যকারী কল্যাণকামীদেরকে তিনি কখনো মন থেকে ভুলতে দেননি। তাঁর কোনো রাজমুকুট বা শাহী দাপট ছিল না। তাঁর কোনো শাহী দরবার ছিল না। এমনকি কোনো রাজমহলও তাঁর ছিল না। আরবের এই মহান নেতা ছোট্ট এক কুঠুরীতে থাকতেন। আর একদম সাধারণ মানের খানা খেতেন, যা অসহায় দরিদ্র মুসলমানদের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব হতো। যার আঙুলের ইশারায় সবাই উঠতে বসতে সদা প্রস্তুত থাকতো, সেই মহান নেতা নিজের জুতা নিজেই সেলাই করতেন এবং নিজস্ব পশুগুলোর দুধ নিজেই দোহন করতেন।’

(৩) C. Snouk Hurgronje Mohammedanism গ্রন্থে (পৃ. ১৩) লিখেছেন : ‘অন্ধকারে হাবুডুবু খাওয়া ‘নিজ জাতিকে’ আলোয় আনতে এবং তাদের মধ্যে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সফল হবেন এ বিষয়ে তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল।’

উদাহরণগুলোয় খেয়াল করুন, মুহাম্মদ সা. এর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন প্রাচ্যবিদগণ। কিন্তু প্রশংসা করতে গিয়ে তারা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সা. কে ‘আরবের পয়গম্বর’ বা ‘আরবীয় নবী’, ‘নিজ জাতির পয়গম্বর’ প্রভৃতি অভিধা দিয়ে অভিহিত করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে এতে তেমন কোনো বিপত্তিবোধ হয় না। এমনকি কারও সরল মন এমনও ভাবতে পারে যে, ভৌগোলিক বিচারে এমনটা বলা হয়েছে। কিন্তু, সত্য হচ্ছে যে, সত্য আসলে ততটুকু নয়। এর মধ্য দিয়ে তারা প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতে বলতে চাচ্ছে যে, মুহাম্মদ একজন সফল সংস্কারক মাত্র, আর যদি নবী হনও, তবে সেটা একান্তই আরবজাতির জন্য। আরববাসী ছাড়া বাকি দুনিয়ার পক্ষে তাঁর রিসালাত ও নবুওয়ত বিস্তৃত নয়, স্বীকারযোগ্য নয়!

জন্মস্থান হিসেবে প্রত্যেকেই কোন- না-কোন এলাকার সাথে সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু তাই বলে মুহাম্মদ সা. কে ‘আরবীয় নবী’ কিংবা ‘আরবজাতির নবী’ ইত্যাদি বলে অভিহিত করার কোনো সুযোগ নেই। কারণ, কুরআন মুহাম্মদ সা. কে শুধু রাসূল বা নবি বলে ক্ষান্ত দেয়নি, বরং ‘রাহমাতুল লিল আলামীন’ তথা সার্বজনীনতা ও আন্তর্জাতিকতার পদবি প্রদান করে সমগ্র বিশ্বমানবতার জন্য প্রেরিত হিসেবে ঘোষণা করেছে। কুরআন বলেছে, তাঁর রিসালাত ও নবুওয়ত বিশ্বব্যাপী এবং কিয়ামত অবধি চিরস্থায়ী। তাঁর রিসালাতের উপমা পুবাকাশে উদয়মান আলো-ঝলমল সূর্যের ন্যায়, যা তার উদয়স্থলে স্থির হয়ে থাকে না, বরং সর্বপ্লাবী আলো নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র পৃথিবীর সর্বত্রে। আধুনিক সময়ের শিক্ষিত মুসলমানদের মধ্যেও অনেকটা অসতেচনভাবে, ‘রাসূলে আরাবী’, ‘আরবীয় নবী’ কিংবা ‘মুহাম্মদে আরাবী’ ইত্যাদি প্রজাতের শব্দ-পদের ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়, যা নিঃসন্দেহে প্রাচ্যবিদদের প্রভাবের ফলশ্রুতি।

আরেকটি উদাহরণ লক্ষ্য করুন, জন. জে. পল “স্টাডিজ ইন মোহাম্মেডানিজম” এ লিখেছেন, ‘দুনিয়ার আজব হলো, এক দরিদ্র ব্যক্তি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে যান। তিনি অখ্যাত এবং দরিদ্র ছিলেন। তিনি তরতর করে সফলতার সিঁড়ি বেয়ে সবার শীর্ষে পৌঁছে যান। তিনি হন পয়গম্বর, ধর্মীয়নেতা এবং বাদশাহ। তিনি এমন এক ধর্মের প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে এবং চিরদিন থাকবে।’

এখানে জন. জে. পল মুহাম্মদ সা. কে ইসলাম ধর্মের ‘প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন। অথচ এ আখ্যা আদৌ যথাযথ নয়। কেননা, অন্যান্য নবি -রাসূলগণের ন্যায় মুহাম্মদও (সা.) ছিলেন একজন রাসূল। যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী বা প্রত্যাদেশ লাভ করে গোমরাহির অন্ধকারে নিমজ্জিত মানবতাকে হেদায়েতের শ্বেতশুভ্র আলোক বিতরণ করেছেন। সে হিসেবে একদিকে তিনি যেমন আল্লাহর ওহিপ্রাপ্ত রাসূল, তেমনি আল্লাহর অনুগত বান্দা হিসেবে খোদ ইসলামের অনুসারীও বটে। কুরআ ও হাদীসে তাঁকে বান্দা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে বহুবার। এ হিসেবে মুহাম্মদ সা. ইসলামের অনুসারী প্রথম মুসলিম এবং ইসলামের প্রচারক মাত্র, কোনোভাবেই নতুন ধর্ম কিংবা মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা বা পত্তনকারী তিনি নন।

আট.
ইউরোপের লেখক-সাহিত্যিক-গবেষকগণ যেমন মুক্তকণ্ঠে মহানবী সা. এর বিমল ব্যক্তিত্ব, সফলতা ও অবদানের কথা স্বীকার করেন, তেমনি বিভিন্ন কৌশলে অস্বীকার করার পাল্লা যে আরো ভারী, তা সহজেই অনুমেয়। পুরো পাশ্চাত্যের সকলে না হোক, অন্তত অর্ধেক মানুষ যদি ইসলাম ও ইসলামের নবীর সঠিক ইতিহাস ও সত্যিকার রূপ জানতে পারতো, তাহলে তাদের সাথে ইসলাম ও মুসলিম জাহানের সম্পর্ক কখনো আজকের মতো হতো না। মহানবী সা. এর বিশ্বজনীনতা এবং ইসলামের প্রকৃত স্বরূপকে পাশ্চাত্যের সচেতন মহল নানা উপায়ও কৌশলে তাদের জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে। পাশ্চাত্যের লেখকদের মধ্যে যারা মহানবী সা. এর জীবন ও কর্ম নিয়ে কাজ করছেন এবং করেছেন, তাদের কাছে এ বিষয়টি অজানা নয়। তাই কেউ কেউ নিজের সততা ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে সত্যকে অকপটে স্বীকার করেছেন। মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে সাহসী মন্তব্য করেছেন। টামস কার্লাইল তার ‘হিরোজ এন্ড হিরো ওরশিপ’ গ্রন্থের বিশেষ শিরোনাম ‘দি হিরো এজ প্রফেট’-এ হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে লিখেছেন– The word of such a man is a voice direct from nature’s own heart man do and must listen to that as to nothing else. All else is wind in comparison.

অর্থাৎ “এরূপ মহাপুরুষের বাণী প্রকৃতির হৃদয় থেকে সরাসরি উৎসারিত। মানব সমাজের এইসব বাণী শোনা এবং অনুসরণ করা ব্যতীত আর কিছুই করার নেই। এগুলোর সাথে তুলনা করলে অন্যগুলো শুধু বায়বীয় পদ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে।”

হিস্ট্রি অফ টারকস্ এর ফরাসি লেখক ও ইতিহাসবেত্তা লা মার্টিন সংক্ষেপে হযরত মুহাম্মদ এর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে লিখেছেন : “দার্শনিক, বাগ্মী, ধর্মপ্রবর্তক, সেনা নায়ক, আইন প্রণেতা, ভাবের বিজয়কর্তা, যুক্তিসঙ্গত ধর্ম মতের প্রবর্তক ও প্রতিমাবিহীন ধর্মপদ্ধতির সংস্থাপক, কুড়িটি পার্থিব সাম্রাজ্য ও একটি ধর্মরাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ সা . এর দিকে তাকিয়ে দেখ। যেদিক থেকে মানুষের মহত্বের মান নির্ধারণ করা যায়, সেই দিক থেকে আমরা প্রশ্ন রাখতে পারি তাঁর চেয়ে মহান ব্যক্তি আর কে হতে পারে? লেখক লা মার্টিন তার প্রশ্নের মাঝেই মূলত উত্তর রেখেছিলেন, “না, তাঁর চেয়ে মহান ব্যক্তি আর কেউ হতে পারে না।”

মার্টিন অগ্রসর হয়ে আরো লিখেছেন : “উদ্দেশ্যের মহত্ত , উপায় উপকরণের ক্ষুদ্রতা এবং বিস্ময়কর ফলাফল—এই তিনটি বৈশিষ্ট্য দ্বারা যদি মানবীয় প্রতিভার বিচার করা হয়, তবে আধুনিক ইতিহাসে মুহাম্মদের সমতুল্য মহামানব আর কে আছেন? অধিকাংশ খ্যাতিমান ব্যক্তিবর্গ শুধুমাত্র সেনাবাহিনী গঠন করেছেন, আইন সৃষ্টি করেছেন এবং সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। তারা যদি কিছু প্রতিষ্ঠা করেই থাকেন, তা পার্থিব ক্ষমতার নামান্তর মাত্র যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের চোখের সামনেই ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এই মহান পুরুষ কেবল সৈন্য বাহিনীই পরিচালনা করেন নি, আইনই প্রদান করেন নি, রাজত্ব প্রতিষ্ঠাই করেন নি, জনগণকে সংগঠিতই করেন নি এবং কেবল সাম্রাজ্যই প্রতিষ্ঠা করেন নি বরং সেই সঙ্গে সেই সময়কার পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ কিংবা তারও বেশী জনঅধ্যুষিত এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষের পরিবর্তন সাধন করেছেন, বহু দেবতার হাত থেকে তাদেরকে উদ্ধার করেছেন, ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা, চিন্তা – ভাবনা ও বিশ্বাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনয়ন করেছেন এবং আত্মার বিকাশ ঘটিয়েছেন। একটি কিতাবের ভিত্তিতে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি রূহানী জাতীয়তা, যা প্রতিটি ভাষাভাষী ও গোত্রের মানুষকে এক ঐক্য বন্ধনে আবদ্ধ করেছে। সেই কিতাবের প্রতিটি হরফ পরিণত হয়েছে আইনে।” ⠀

১৯৭৪ সালের ১৫ জুলাই -এ প্রকাশিত ‘টাইম ম্যাগাজিনে আমেরিকার প্রখ্যাত মনঃসমীক্ষক জুলে ম্যাসারম্যান তাঁর ‘হোয়ার আর দি লীডারস’ প্রবন্ধে ইতিহাসের বিভিন্ন মহৎ ব্যক্তিদের জীবনী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে প্রবন্ধের উপসংহারে উল্লেখ করেছেন, Perhaps the greatest leader of all times was Muhammad. “বোধ হয় সর্বকালের জন্য মুহাম্মদ সা. ছিলেন সবচেয়ে মহান নেতা।” সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, নিজে একজন ইহুদী হওয়া সত্ত্বেও ম্যাসারম্যান তাঁর নবী হযরত মুসা আ. কে দ্বিতীয়স্থানে রেখেছেন। তাঁর বিচারে যীশু (ঈসা আ.) এবং বুদ্ধের স্থান অনেক নীচে।

আমেরিকার জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ইতিহাসবেত্তা এবং গণিতশাস্ত্রবিদ মাইকেল এইচ হার্ট ৫৭২ পৃষ্ঠার ‘দি হানড্রেড’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন। হযরত আদম আ. থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যত মানুষ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্য থেকে ইতিহাসের ১০০ জন মহান প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নির্বাচন করে হার্ট গ্রন্থটি রচনা করেন। উক্ত বইয়ে তিনি হযরত মুহাম্মদ সা. কে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। এবং বিস্ময়করভাবে হার্ট তাঁর নবী যীশুকে তার বইয়ে তৃতীয়স্থানে স্থাপন করেছেন! এবং হার্ট তার রচনার উপসংহার টেনেছেন এই বলে–

“বর্তমান অশান্ত বিশৃঙ্খল ও দ্বন্দ্বমুখর আধুনিক বিশ্বে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর আদর্শকে অনুসরণ করা হলে বিশ্বে শান্তি ও একটি অপরাধমুক্ত সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে সম্ভব।”

নয়.
বাস্তবতা হচ্ছে, উপরোক্ত মনীষীগণ সহ এভাবে আরও অসংখ্য অমুসলিম মনীষী ও পণ্ডিতবর্গ হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে যে অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন, যে উচ্ছসিত ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন, তা বিবৃত করে শেষ করা যাবে না। তাদের মধ্যে কেউ বলেছেন, “তিনি ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মহান ব্যক্তি।” কেউ বলেছেন, “মুহাম্মাদ লক্ষ জনের মধ্যে একজন। ” আবার কেউ বলেছেন, “ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ধর্মপ্রচারকদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবচেয়ে সফলকাম। বোধহয় তার মতো পৃথিবীতে আর কেউ জন্মাবে না।” নি:সন্দেহে এই সব উক্তি হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে সর্বতোভাবে সত্য। কিন্তু অমুসলমানদের দ্বারা এই সব ভক্তিকথন ও শ্রদ্ধা নিবেদন মুসলমানদের জন্য একধরণের সংশয় তৈরি করে। তা হলো, এত সুন্দর সুন্দর উক্তির মাধ্যমে শ্রদ্ধা বা ভক্তি দেখানোর পরও কেন তারা হযরত মুহাম্মদের সা. অনুসারী হলেন না, কেন তারা ইসলাম গ্রহণ করলেন না? এর নেপথ্যে রহস্য কি? প্রখ্যাত মুসলিম স্কলার আহমদ দিদাত (১৯১৮-২০০৫ খ্রি.) সেই কারণ ও রহস্যের সন্ধান করেছেন। তিনি তাঁর ‘আল কুরআন দ্যা আল্টিম্যাট মিরাকল’ গ্রন্থে লিখেছেন– প্রথম প্রথম আমি মনে করেছি এইসব অমুসলমানরা ভণ্ড বা কপট। কিন্তু আমার বিচারে ভুল ছিল। কুরআন সম্পর্কে বর্তমানে নতুন নতুন বিস্ময়কর তথ্য আবিষ্কারের পর এইসব বিখ্যাত অমুসলমান লেখক, দার্শনিক ও ঐতিহাসিকদের সম্পর্কে আমার মত বদলাতে বাধ্য হয়েছি। একথা সত্য যে, তাঁরা হযরত মুহাম্মদ সা. কে তাদের অনেক নবীর চেয়ে উচ্চে স্থান দিয়েছেন। কিন্তু তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। কারণ, তারা মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন, ইসলাম ধর্ম মুহাম্মদের তৈরি এবং কুরআনের রচয়িতা হচ্ছেন হযরত মুহাম্মদ সা.। ঐসব বিখ্যাত লেখকরা অনেকে সন্দেহজনক বা দ্ব্যার্থক উদ্দেশ্যে বলেছেন যে, ইসলাম মুহাম্মদের ধর্ম। আবার কেউবা চতুরভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পবিত্র কুরআন মুহাম্মদের রচনা। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে তারা বিচার করেছেন যে, মুহাম্মদ সা. ছিলেন ইতিহাসের একজন প্রতিভাশালী ও প্রভাবশালী মানুষ।

আহমদ দিদাত অতঃপর বর্তমান যুগের অন্যতম প্রশংসাকারী হিসেবে খ্যাত মাইকেল এইচ হার্টের উদাহরণ টেনে বলেন –ইসলাম ধর্ম গ্রহণ না করার কারণ হিসেবে মিঃ হার্ট বোধহয় তার অবচেতন মনের একটি অভিব্যক্তি গ্রন্থের ৩৯ পৃষ্ঠায় প্রকাশ করে ফেলেছেন। আর তা হলো, … “এর পরেও তিনি ছিলেন মুসলমানদের পবিত্র ধর্ম গ্রন্থ কুরআনের রচয়িতা। এটা মোহাম্মদের অন্তদৃষ্টির কতকগুলো বাণী, যা তিনি আল্লাহর নিকট থেকে প্রাপ্ত হয়েছেন বলে বিশ্বাস করতেন।” এখানে হার্ট কথিত ‘কুরআনের রচয়িতা’ , টমাস কার্লাইল এর ‘এইরূপ মানুষের বাণী’ এবং রেভারেন্ড আর. বসওয়ার্থ স্মিথের লেখা, ‘তবুও তিনি একটি গ্রন্থের রচয়িতা’ ইত্যাদি কথাগুলি লক্ষ্য করলে সহজেই বোঝা যাবে, তাদের ইসলাম গ্রহণ না করার কারণ। ড. আব্দুর রহমান আযযামের একটি অভিজ্ঞতার বিবরণে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে সামনে আসে। তিনি বলেন, ‘ত্রিশ বছর আগে লন্ডন স্কুল অব স্টাডিজের তৎকালীন ডীন স্যার ডিনিসন রসকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, মুহাম্মদ সা.- এর সরলতা ও বিশ্বস্ততায় আস্থা পোষণ করেন কিনা। তিনি বলেন, আমি এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে, তিনি মিথ্যা বলেননি বা প্রতারণা করেন নি। তিনি সরল ও সত্যবাদী ছিলেন। আমি তাঁকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কি বিশ্বাস করেন যে, তিনি আল্লাহর নবী ছিলেন? এর উত্তরে তিনি বললেন, ‘সেটা আলাদা ব্যাপার।’ বলা বাহুল্য, হযরত মুহাম্মদ সা. সম্পর্কে এটাই ছিল আসল ব্যাপার!

দশ.
হযরত মুহাম্মদ সা. যে শেষ নবী হয়ে জগতের বুকে আবির্ভূত হবেন তা কেবল কুরআন মাজীদই নয়, বরং পূর্ববর্তী সকল ধর্মগ্রন্থের মাঝে তাঁর নবুওয়তের পূর্বাভাস প্রদান করা হয়েছে। ধর্মগ্রন্থসমূহের বহুসংখ্যক জায়গায় মুহাম্মদি রিসালাতের সাক্ষ্য ও স্বীকৃতির ভুরি ভুরি উদাহরণ বিদ্যমান। কল্কি পুরাণ হিন্দুদের অন্যতম ধর্মগ্রন্থ। কল্কি পুরাণের ভবিষ্যৎ বাণীতে হযরত মুহাম্মদ সা. এর আবির্ভাব ও তাঁর জীবনের কতিপয় ঘটনার উল্লেখ করা হয়। লক্ষ্য করুন কল্কিপুরাণের নিম্নোক্ত ভাষ্যটি :

‘বিষ্ণু ভগত, ও ‘সুমতির’ ঔরসে ‘জগত গুরু’ জন্মগ্রহণ করবেন। ১২ ই বৈশাখ, সোমবার সূর্য উঠার দু’ঘন্টা পর তাঁর আবির্ভাব ঘটবে। জন্মের পূর্বে তাঁর পিতা মারা যাবেন এবং পরে তার মাও ইহধাম ত্যাগ করবেন। ‘সলমাল’ দীপের রাজনন্দিনীর সাথে ‘জগত গুরুর বিবাহ হবে। বিবাহ অনুষ্ঠানে তার চাচা ও তিন ভাই উপস্থিত থাকবেন। ‘পরস রাম’ এক গুহায় তাকে শিক্ষা দেবেন। সলমাল দীপ থেকে ‘সামবালা’ এসে যখন তিনি প্রচার কাজ শুরু করবেন, তখন তার আত্মীয়-স্বজন তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়াবে। নিপীড়ন-নির্যাতন তাকে উত্তর পাহাড়ে যেতে বাধ্য করবে। কিন্তু কিছুদিন পর তিনি তলোয়ার হাতে ‘সামবালা’ শহরে ফিরবেন এবং সমগ্র দেশ জয় করবেন। ‘জগত গুরু’ ঘোড়ায় চড়ে পৃথিবী ও সাতস্বর্গ ঘুরবেন।”

এভাবে যীশুখ্রিস্ট তাঁর উম্মতকে মুহাম্মদ সা. এর আগমনের যে পূর্বাভাস দিয়ে গেছেন, কুরআনে তা হুবহু এরকম এসেছে “আমি আমার পরে তোমাদেরকে এক মহান রাসূল আবির্ভাব হওয়ার সুসংবাদ দিয়ে যাচ্ছি। তার নাম হবে আহমদ।” (সূরা সফ : ৬) ইঞ্জিলের ভাষা এ বিষয়ে নিম্নরূপ : “ইয়াহইয়া তার বিষয়ে জোর গলায় স্বাক্ষী দিয়ে বললেন, “উনিই সেই লোক যার বিষয়ে আমি বলে ছিলাম। যিনি আমার পরে আসছেন। তিনি আমার চেয়ে মহান। কারণ, তিনি আমার অনেক আগে থেকেই আছেন।” (ইউহান্না, পৃ. ১৪৫ অনুচ্ছেদ, ১৫)

এভাবে গৌতম বুদ্ধ জীবনের শেষ মুহুর্তে বলেছিলেন, যখন তাঁর একনিষ্ট সহচর নন্দা তাঁকে জিজ্ঞেস করছিল, “গুরুজি! আপনার পর পৃথিবীবাসীকে কে ধর্ম শিক্ষা দেবে?” তাঁর প্রত্যুত্তরে বুদ্ধ বলেছিলেন , “নন্দা! আমিই পৃথিবীর প্রথম বুদ্ধ নই; আর আমি শেষ বুদ্ধও না। আমার পর আরেকজন আসবেন পবিত্র, স্বচ্ছ অন্তরধারী, কার্যক্ষেত্রে তীক্ষ্ণ বুদ্ধির অধিকারী, কল্যাণকর, বিশ্বের সব বিষয়ের জ্ঞানী, অতুলনীয়! যেসব বাস্তব সত্য তুলে ধরি, তিনিও তাই প্রকাশ করবেন। আমার মত তিনিও পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভেজাল একটি ধর্মীয় নীতি প্রচার করবেন। তখন নন্দা বললেন, “আমরা তাঁকে কীভাবে চিনব?” জবাবে গুরুর বললেন, তাঁর নাম হবে ‘মিত্রিয়া’। ১৬ অক্টোবর, ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত এলাহাবাদের প্রসিদ্ধ ইংরেজি পত্রিকা ‘লিডার এর সাত নম্বর পৃষ্ঠার তিন নম্বর কলামে একজন বৌদ্ধের লেখা একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। উক্ত বৌদ্ধ লেখক গৌতম বুদ্ধ কথিত ‘মিত্রিয়া’ শব্দের অনুবাদ করেছেন, “তাঁর নাম হবে রহমত।” যেমনটা কুরআনের আম্বিয়া সূরায় (আয়াত: ১০৭) মুহাম্মদ সা. কে রহমতরূপে আখ্যায়িত করা হয়েছে– ‘এবং আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত স্বরূপই প্রেরণ করেছি।’

বস্তুত, ইসলামের মহান পয়গম্বর হযরত মুহাম্মদ সা. এর আশীর্বাদপূর্ণ আবির্ভাব সম্পর্কে বহুভাবে বহু ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল পূর্ববতী ধর্মগ্রন্থগুলিতে এবং তিনি আবির্ভূত হবার পরেও বহু স্পষ্ট নিদর্শন (মুজেজা) প্রদর্শন করেছেন। আসলে তার গোটা জীবনটাই শুরু থেকে শেষ অবধি ছিল বিরাট এক মুজেজা। সকল প্রকার প্রতিবন্ধকতা ও চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে তিনি সংগ্রাম করেছেন এবং জয়ী হয়েছেন। কোনো মানুষের নিকট থেকে কোনপ্রকার শিক্ষা গ্রহণ না করেও তিনি জগতকে দান করে গেছেন সর্বোত্তম জ্ঞান। যে সকল হৃদয় ছিল পাষাণের মত কঠিন তাঁর সংস্পর্শে এসে সেগুলি হয়েছে দ্রবীভূত; এবং যেসব হৃদয় ছিল দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী, তিনি সেগুলিকে করেছেন সবল ও সম্পূর্ণ। বোধশক্তিসম্পন্ন মানুষ মাত্রই তাঁর প্রতিটি কথায় ও কাজে আল্লাহর কুদরতের ক্রিয়াশীলতা দেখতে পেতেন। এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করতেন।

এগার.
প্রাচ্যবিদরা বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ভাষায় মুহাম্মদ সা. এর জীবন চরিত নিয়ে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে চলছেন। আরবি ভাষা না জানার ফলে কিংবা মুসলিম লেখকদের রচনার মাধ্যমে ইসলাম সম্বন্ধে জানার সুযোগ না পাওয়ায় মানুষ তাদের বইগুলি পড়েই ইসলাম সম্পর্কে নানাবিধ ধারণা ও জ্ঞান লাভ করে থাকে, সঙ্গতকারণেই যা হয় অসম্পূর্ণ এবং ত্রুটিপূর্ণ। আদতে প্রাচ্যবিদদের কলমে উপস্থাপিত ইসলামের যে প্রতিচ্ছবি, তাতে ইসলামের স্বরূপ-সত্য কমই থাকে। ফলশ্রুতিতে কুরআন, হাদিস, সীরাত, ইসলামের ইতিহাস, শিক্ষা-সংস্কৃতি এবং মুসলিমদের জীবনাচার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া জন্ম নেয় একজন পাঠকের ভেতর। এর ফলে ক্ষতি হয় দ্বিবিধ। একদিকে অমুসলিমরা যেমন ইসলামের প্রকৃত পরিচয় লাভ করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অপরদিকে ইসলাম সম্পর্কে জানাশোনাহীন তথাকথিত আধুনিক শিক্ষিত মুসলিমদের মধ্যেও সৃষ্টি হচ্ছে নানারকম সংশয় ও সংকট।

প্রাচ্যবিদদের ইসলামবিষয়ক রচনা-গবেষণার মারফত তাদের বিভ্রান্তিকর চিন্তা-ধারার যে বিষাক্ত প্রভাব ইতোমধ্যেই মুসলিম বিশ্বে এবং আধুনিক শিক্ষিত মুসলিম মানসে ছড়িয়ে পড়েছে, এর উপযুক্ত মোকাবিলায় সচেতন মুসলিম আলেম ও চিন্তকগণ নানা নির্দেশনা ও প্রস্তাবনা পেশ করে আসছেন। উম্মুল কুরা ইউনিভার্সিটি’র বিশিষ্ট প্রাচ্যবাদ-গবেষক ড. আমাল উবাইদ সুবাইতি তাঁর “আসসীরাতুন নববিয়্যাহ ফী কিতাবাতিল মুসতাশরিকীন আল বিরিতানিয়্যীন” গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে আমাদের কর্তব্য-করনীয় প্রস্তাব করে লিখেছেন, প্রাচ্যবিদদের সীরাতচর্চায় আমরা বিন্দুমাত্র ভরসা রাখব না। বিশেষত সিলেবাস, পাঠ্যক্রম এবং সংস্কৃতিমূলক কার্যক্রমগুলোতে তাদের সীরাত বিষয়ক গবেষণাসমূহকে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত না করা সমীচীন। কারণ, এসব রচনা রাসূল সা. এর মর্যাদাহানি, অসুস্থ ভাবনা-চিন্তা আর মিথ্যাচারে ভরপুর। সুবাইতির মতে, সাধারণ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিভিন্ন সেমিনার আয়োজন করা জরুরি, যেখানে প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মধারা নিয়ে পর্যালোচনা হবে, গবেষণার ভিত্তিতে তাদের বক্তব্য ও চিন্তার যথাযথ খণ্ডন হবে, কুরআন ও সীরাতশাস্ত্র এবং হাদীস সম্পর্কে তাদের জ্ঞান-পাপ ও সেসব বিষয়ে তাদের নানামাত্রিক অপব্যবহার ও অপব্যাখ্যার হাল-হাকিকত স্পষ্ট করা হবে। সমর্থ হলে শরীয়াহ এবং সীরাত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বিতর্ক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবেন। এসব বিতর্ক অনুষ্ঠানে অ্যাকাডেমিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক পদ্ধতির অনুসরণ করা হবে। শরিয়তের উসূল ও নীতিমালা এবং কুরআন-সুন্নাহর সূত্রধারার আলোকে আলোচনা হবে।

বরাত :
১. ইসলামী শরিয়াহ ও সুন্নাহ, ড. মুসতফা আস- সিবায়ী, এ. এম. এম. সিরাজুল ইসলাম অনূদিত, ইফাবা, ২০০৪।
২. ইসলামী বিশ্বকোষ, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, সীরাত শব্দ দ্রষ্টব্য ।
৩. ইস্তিশরাক আওর মাগরিবী মুস্তাশরিকিন আওর মুসলমান মুসান্নিফীন, আবুল হাসান আলী নদভী, মাজলিসে তাহকীকাত ও এশায়াতে ইসলাম, লৌখনো।
৪. বৃটিশ প্রাচ্যবিদদের সীরাতচর্চা, ড. আমাল উবাইদ সুবাইতি, আদনান মাসউদ অনূদিত, ২০২১, শিবলী প্রকাশনী।
৫. সীরাতে রাসূল সা. রচনায় প্রাচ্য বিশেষজ্ঞগণ, ড. আ ছ ম তরিকুল ইসলাম, প্রবন্ধ, সীরাত স্মরণীকা, ইফাবা, ১৪১৯ হি.।
৬. প্রাচ্যবিদদের দাঁতের দাগ, মুসা আল হাফিজ, মাকতাবাতুল আযহার, ২০১৫।
৭. পয়গামে মুহাম্মাদী, সোলাইমান নদভী, আবদুল মান্নান তালিব অনূদিত, ইফাবা, ১৯৯২।
৮. ইসলামের আহবান, প্রবন্ধ : আর-রিসালাহ আল-খালিদাহ, ড. আব্দুর রহমান আযযাম, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন।
৯. পাশ্চাত্য মনীষীদের দৃষ্টিতে রাসূলে আকরাম, শহীদুস সালাম কাসেমী অনূদিত, মদীনা পাবলিকেশন্স, ২০০৬।
১০. অলৌকিক কিতাব আল কুরআন, আহমদ দিদাত, এ কে মুহাম্মাদ আলী অনূদিত, রিসার্চ একাডেমী ফর কুরআন এন্ড সাইন্স, আহসান পাবলিকেশন্স, ২০০৫।
১১. বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একশ মনীষীর জীবনী, মাইকেল এইচ হার্ট, সম্পাদনা, এস এম শুভ্রত, হিমু প্রকাশন ২০০৫।
১২. বিশ্বনবী আগমনের পূর্বাভাস, মোহাম্মদ আবুল কাসেম ভূঁইয়া, ইফাবা, ২০১৬।
১৩. বিশ্ব সাহিত্যে বিশ্বনবী, মুহাম্মদ নুরুল আমীন, অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্স, ২০০৫।
১৪. আননাবিয়্যুল খাতিম, লেখক মানাজিরে আহসান গিলানী।
১৫. মাজাল্লাহ আল ওয়াকিয়াহ, প্রবন্ধ, মুসতাশরিকীন আওর তাহকীকাতে ইসলামী, আব্দুল কুদ্দুস হাশেমী, করাচি, সংখ্যা ১০, ২০১৩।
১৬. দি চয়েস, আহমদ দিদাত, আখতারুল আলম অনূদিত, জ্ঞানকোষ প্রকাশনী, ২০০৯।
……………………………………………

কোরআন প্রচার: মহানবীর জীবনের অন্যতম প্রধান মিশন
মুহাম্মদ আবুল হুসাইন

নবী-রাসূলদের বিশেষত্ব এখানে যে, তাদের কাছে আল্লাহর কালাম প্রেরিত হ’ত যা সাধারণ মানুষের কাছে হ’ত না। আল্লাহ বলেছেন :
‘হে মুহাম্মাদ (সঃ), বলে দাও, আমি তোমাদের মতই একজন সাধারণ মানুষ মাত্র। তবে (পার্থক্য এই যে,) আমার কাছে অহী অবতীর্ণ হয়।’ -[কাহাফ : ১১০]
নবী-রাসূলদের কাজ ছিল এই অহী বা আল্লাহর বাণীকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ কারণে আল কোরআনে নবী-রাসূলদেরকে আল কোরআনে বাণীবাহক বা বার্তাবাহকও বলা হয়েছে। আল্লাহর বাণী, তাঁর হুকুম, বিধান বা পথ-নির্দেশ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া বা আল্লাহর কালামের শিক্ষাকে মানুষের সমাজে প্রচার করাই ছিল নবী-রাসূলদের কাজ। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এরও প্রথম ও প্রধান কাজ ছিল আল্লাহর কালাম আল কোরআনকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া এবং কোরআনের শিক্ষার দিকে মানুষকে আহবান জানানো।
মূলত আল্লাহর দিকে আহবান করা বলতে কিন্তু আল্লাহর কালামের দিকে, আল্লাহর হুকুম-আহকাম ও তাঁর হেদায়াতের দিকে মানুষকে আহবান করাকেই বুঝায়। তাই মহানবীর জীবনের অন্যতম প্রধান মিশন ছিল আল কোরআনের প্রচার করা, আল্লাহর কালামকে যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন :
‘হে রাসূল! তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তোমার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যথাযথভাবে প্রচার কর। যদি তা না কর, তাহলে তো তুমি আল্লাহর রিসালাতকে পৌঁছালে না।’ -[আল মায়েদা : ৬৭]
‘হে চাদর আবৃত্ত শয্যাগ্রহণকারী, ওঠো, সাবধান কর, আর তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর। -[মুদ্দাস্সির : ১-৩]
মহানবীর এই মিশন সম্পর্কে বলতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন আরো বলেছেন :
‘তিনিই উম্মিদের মধ্য থেকে একজনকে রাসূল রূপে প্রেরণ করেছেন; যে তাদেরকে তাঁর আয়াত আবৃত্তি করে শোনায়, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও কৌশল শিক্ষা দেয়। ইতিপূর্বে তো এরা ঘোর বিভ্রান্তির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।’-[জুমু’আ : ২]
‘তাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়ে আল্লাহ মোমেনদের প্রতি অবশ্য অনুগ্রহ করেছেন। সে তাঁর (আল্লাহর) আয়াত তাদের নিকট আবৃত্তি করে শোনায়, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করে এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেয়। এর পূর্বে তো তারা সুস্পষ্ট গোমরাহির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল।’-[আলে ইমরান : ১৬৪]
‘(বল) আর এ কোরআন আমার প্রতি নাযিল করা হয়েছে, যেন এর দ্বারা তোমাদেরকে এবং যাদের কাছে এটি পৌঁছবে তাদের সবাইকে সাবধান করে দিতে পারি।’-[আনআ’ম : ১৯]
‘প্রচার করাই রাসূলের কর্তব্য। তোমরা যা প্রকাশ কর এবং গোপন কর সে সম্পর্কে আল্লাহ জানেন।’Ñ[আল মায়েদা : ৯৯]
‘কত মহান তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফোরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) নাযিল করেছেন, যাতে সে বিশ্ববাসীর জন্য সতর্ককারী হতে পারে।’-[ ফোরকান : ১]
‘এ কিতাব আমি অবতীর্ণ করেছি, এটি বরকতপূর্ণ। এতএব তোমরা এর অনুসরণ কর এবং নিষিদ্ধ সীমা পরিহার করে চল। তবেই তোমরা রহমত প্রাপ্ত হবে।’-[আল আনআম : ১৫৫]
‘(হে নবী!) এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন বুদ্ধিমান লোকেরা একে গভীর ভাবে অধ্যয়ন ও চিন্তা-ভাবনা করে।’ -[আস সোয়াদ : ২৯]
‘তোমাদের কিছু লোক নিরক্ষর। তারা মিথ্যা আকাক্সক্ষা ছাড়া আল্লাহর কিতাবের কিছুই জানে না। তাদের কাছে কল্পনা ছাড়া কিছু নেই।’ -[আল বাকারা : ৭৮]
‘আমি তোমার প্রতি আমার জিকির (আল কোরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে লোকদের সামনে ঐসব বিষয় বর্ণনা করতে পারো, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। যেন তারা চিন্তা-ভাবনা করতে পারে।’
এমনিভাবে পবিত্র কোরআন মজিদের আরো অসংখ্য আয়াত উদ্ধৃত করা যায়, যাতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোরআন প্রচার করা, মানুষের কাছে আল্লাহর কালাম পৌঁছে দেয়া, তাদেরকে কোরআন মজিদ তেলাওয়াত করে শোনানো, এর বিষয়বস্তু ও শিক্ষা তাদেরকে বুঝিয়ে দেয়া, এর আলোকে মানুষকে কর্ম-কৌশল ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে তোলা, কোরআনের শিক্ষার আলোকে মানুষের মধ্যে বিরাজমান অশিক্ষা, কুশিক্ষা ও গোমরাহি দূর করা এবং তাদেরকে সতর্ক ও সচেতন করে তোলা ছিল আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) নবুয়তী দায়িত্ব।
ঈমানদারদের উদ্দেশ্যেও দায়ী ইলাল্লাহর কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার উৎসাহ দিয়ে আল্লাহ বলেছেন :
‘তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে মানুষকে আহবান করে, সৎ কাজ করে আর ঘোষণা করে যে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।’-[হা-মীম-আস্সাজদা : ৩৩]
আল্লাহর নবী এবং সাহাবায়ে কেরাম তাই নিজেদের জীবনে কোরআন প্রচারের এ কাজকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিয়েছিলেন। কারণ আল্লাহর কালাম আল কোরআন হল আল্লাহর নৈকট্য ও হেদায়াতের সেই ফল্গুধারা, সেই সিরাতুল মুস্তাক্বিম; সূরা ফাতিহার মুনাজাতের মাধ্যমে আমরা প্রতিনিয়তই যার প্রার্থনা করে থাকি।
প্রতি ওয়াক্ত নামাজের প্রতি রাকায়াতেই আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে থাকি -‘আমাদেরকে সহজ-সঠিক পথে পরিচালিত কর। সে সব লোকের পথ যাদেরকে তুমি পুরুষ্কৃত করেছো; তাদের পথ নয়, যারা পথভ্রষ্ট ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
বস্তুত, আল ফাতিহার প্রার্থনার জবাবই হচ্ছে সমগ্র আল কোরআন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনই আমাদেরকে এ প্রার্থনা শিখিয়ে দিয়েছেন এবং আবার তিনিই আমাদেরকে আমাদের প্রার্থীত সিরাতুল মুস্তাক্বিম পথের দিশা দিয়ে ধন্য করেছেন।
আবার আল কোরআনের এই ঐশী হেদায়াত মূলত সেই শাশ্বত পথ; যে পথের সুসংবাদ আল্লাহ তায়ালা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময় দিয়েছিলেন।
আদিপিতা হযরত আদম (আঃ)-কে বেহেশত থেকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময় আল্লাহ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছিলেন, যুগে যুগে তাঁর পক্ষ থেকে নবী-রাসূলদের মাধ্যমে মানুষের কাছে ঐশী পথ-নির্দেশ বা জীবন বিধান পাঠানো হবে। যারা সেই হেদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের জন্য ভয় ও বিপদের কোন কারণ থাকবে না।
কিন্তু যারা আল্লাহর দেয়া সেই জীবন-বিধানের বিরোধিতা করবে, তারাই হবে বিভ্রান্ত ও ব্যর্থ। তাদের জন্য রয়েছে বিপর্যয় ধ্বংস। পবিত্র কালামে মজিদে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ প্রসঙ্গটি উল্লেখ করেছেন এভাবে :
‘তোমরা সবাই এখান থেকে নেমে যাও। এরপর আমার পক্ষ থেকে যে জীবন-বিধান তোমাদের নিকট পৌঁছানো হবে; যারা সে বিধান মেনে চলবে তাদের জন্য কোন ভয় ও চিন্তার কোন কারণ থাকবে না। আর যারা সে বিধান গ্রহণ করতে অস্বীকার করবে এবং আমার বাণী ও আদেশ-নিষেধকে মিথ্যা গণ্য করবে, তারা নিশ্চয় জাহান্নামী হবে এবং তারা সেখানে চিবদিন থাকবে।’ -[আল বাকারা : ৩৮-৩৯]
সুতরাং আল্লাহর কালাম আল কোরআনই হল মুক্তির একমাত্র পথ। আল্লাহর দেয়া হেদায়াতই তাঁর নৈকট্য বা খোদাপ্রাপ্তির যথার্থ সিরাতুল মুস্তাক্বিম। আল্লাহর নৈকট্য অন্বেষণ বা ওসিলা তালাশ করতে হলে আমাদেরকে তাই কোরআনের পথের দিকেই ফিরে আসতে হবে।
কারণ এ পথই ঈমানের পথ, এ পথই হেদায়াতের পথ। এ পথই নির্ভেজাল জ্ঞান ও সত্যের পথ। কোন বুযুর্গ ও কোন বাবার পাও ধরা এ পথের বিকল্প হতে পারে না। আল্লাহ কথার চেয়ে কোন মানুষের কথাকে বড় মনে করলে কেবল শয়তানের সান্নিধ্যই লাভ হতে পারে, কিন্তু আল্লাহর নৈকট্য ও হেদায়াত তাতে কখনো লাভ হতে পারে না।
যারা মনে করে আল্লাহর হুকুমের কাছে আত্মসমর্পন না করে কোন পীর-মাশায়েখ বা তথাকথিত বুযুর্গ ব্যক্তিদের পা ধরে পরে থাকলেই নাযাত পাওয়া যাবে তারা মূলত ঐসব ব্যক্তিদেরকেই খোদার আসনে বসিয়ে দেয়। কারণ কোন মানুষ কখনো অপর মানুষের প্রভু হুকুমকর্তা হতে পারে না, নিরংকুশ আনুগত্য বা গোলামী দাবী করতে পারে না। যারা এসব করে তারা পরিষ্কার শিরক ও পৌত্তলিকতার মধ্যে নিমজ্জিত। কারণ এসব কর্মকা- তাওহীদের শাশ্বত আদর্শ ও ঈমানী চেতনার পরিপন্থী। যারা এসব কাজে লিপ্ত তারা পরিষ্কার বিভ্রান্তি ও ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।
সূরা আসরে পরিষ্কার করে বলে দেয়া হয়েছে যে, দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা বা কামিয়াবী নির্ভর করছে চারটি জিনিসের উপর। ১. ঈমান, ২. আল্লাহর হুকুম পালন বা নেক আমল, ৩. হকের দাওয়াত বা ইসলামের প্রচার এবং ৪. সবর বা ধৈর্য ও সহনশীলতার নীতি। বলা হয়েছে সত্যের এ চারটি মূলনীতি থেকে যারা বিচ্যূত হয়েছে তারাই ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। অতীতে যারা এ পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছিল তারা যেমন ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত ছিল; বর্তমানেও যারা ঈমানদারী, আল্লাহর হুকুম পালন এবং সহনশীলতার নীতি হকের দাওয়াতের পথ থেকে বিচ্যূত হয়েছে তারাও সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ও ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত এবং ভবিষ্যতেও যা এ পথ থেকে বিচ্যূত হবে ও তারাও ক্ষতির মধ্যেই নিমজ্জিত থাকবে। আর এ ক্ষতি হল দুনিয়া ও আখেরাতেরই চরম ক্ষতি।
বস্তুত, পৃথিবীতে আল্লাহর কালামই হচ্ছে পরম সত্য ও নিরংকুশ জ্ঞানের উৎস। কোন ধরনের বিভ্রান্তি, ভুল চিন্তা, ভুল মত, কোন ধরনের অসম্পূর্ণতা ও অসঙ্গতি এতে নেই। সামান্য সন্দেহ-সংশয় বা অনুমান নির্ভর কোন কথাও এতে বলা হয়নি। মিথ্যা ও বিভ্রান্তি থেকে আল্লাহর কালাম সর্বতোভাবে মুক্ত ও পবিত্র।
এ প্রসঙ্গে আল কোরআনে আল্লাহ চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেছেন :
‘যারা জ্ঞানবান মানুষ, তারা তোমার প্রতি তোমার প্রভুর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এ গ্রন্থ সম্পর্কে মনে করে যে, এ গ্রন্থই হচ্ছে সত্য, এটি মানুষকে পরাক্রান্ত ও প্রশংসিত প্রভুর দিকেই নিয়ে যায়।’ -[সাবা : ৬]
বস্তুত, আল কোরআনের সাথে কোন মানুষের কথা তুলনীয় হতে পারে না। কারণ আল্লাহ তায়ালাই বলে দিচ্ছেন এভাবে :
‘হে মুহাম্মাদ! বলে দাও, যিনি আসমান ও জমিনের সকল রহস্য জানেন এ কিতাব তিনিই নাযিল করেছেন। তিনি ক্ষমাশীল, মেহেরবান।’ -[ফুরকান : ৬]
‘নিশ্চিতরূপে এ এক সুদৃঢ় ও সুরক্ষিত কিতাব। মিথ্যা না এর সামনে থেকে আসতে পারে আর না পেছন থেকে। এ এক প্রাজ্ঞ ও প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। -[হা-মীম-আস সিজদাহ : ৪১]
‘এ কিতাবে কোন কথাই সন্দেহের ভিত্তিতে বলা হয়নি।’ -[বাকারা : ২]
বস্তুত, আল্লাহর কালাম বা তাঁর প্রত্যাদেশ ও হুকুমের চেয়ে পৃথিবীর কোন মানুষের কথা, মতবাদ অথবা নির্দেশ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। সেই ব্যক্তি যত বড় প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর কর্তৃপক্ষ হোন না কেন। এমনকি তিনি যদি কোন ধর্মীয় নেতা বা কর্তৃপক্ষও হন তাহলেও তার বয়ান বা বাণীকে আল্লাহর কালামের উর্ধে স্থান দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ আল্লাহর বাণীর চেয়ে বান্দার বাণী বা বয়ানকে গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ নেই; তা তিনি যত বড় নেতা, যত বড় পীর বা বুযুর্গই হোন না কেন। ইসলাম ধর্ম মতে সকল ধরনের পবিত্রতা ও প্রশংসা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। কারণ কেবলমাত্র তিনিই এর যোগ্য, অন্য কেউ নয়। এটিই আল কোরআনে বর্ণিত তাওহীদ বা একত্ববাদের মূলকথা। ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা সর্বাবস্থায় ঈমানের এ চেতনাকে লালন করেন এবং এ থেকে তারা কখনো বিচ্যূত হন না।
আল্লাহর কালাম থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্য কিছু বিভ্রান্ত অথচ লেবাসধারী লোক আল কোরআন সম্পর্কে মানুষকে অহেতুক আতংকিত করে তুলছে। তারা একে অত্যন্ত জটিল অস্পৃশ্য গ্রন্থ বলে বর্ণনা করে এ গ্রন্থোর অর্থ জানা থেকে লোকদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করে। যেমনটি করতো কুরাইশ মুশরিকেরা। তারা কোরআন সম্পর্কে নানা অপপ্রচার করে বেড়াতো যাতে লোকেরা কোরআন না শোনে। কারণ কোরআন শুনলেই লোকেরা কোরআনের কথায় আকৃষ্ট হতো।
এক সময় খ্রিস্টান পাদ্রী-পুরোহিতরা ধর্মগ্রন্থ পাঠ থেকে লোকদেরকে বিরত রাখতো। হিন্দু-ব্রাহ্মণগণও এ কাজটি করতো। তারা বাংলা ভাষায় ধর্মীয় গ্রন্থের অনুবাদকে নিষিদ্ধ করেছিলো। যারা মাতৃভাষায় ধর্মগ্রন্থ অনুবাদ করার চেষ্টা করতো তাদেরকে রৌরব নরকের ভয় দেখানো হত। এসবেরই উদ্দেশ্য ছিল ঐশী আদর্শের পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া মতকে প্রাধান্য দেয়া। আল্লাহর কথার চেয়ে নিজেদের কথাকে প্রাধান্য দিতে গিয়েই কোরআনের কথাকে অত্যন্ত কঠিন, জটিল ও বোধগম্যহীন বলে বর্ণনা করে এর অর্থ জানা থেকে লোকদেরকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ আল কোরআন হচ্ছে বিশ্বের সকল মানুষের জন্যই আল্লাহ প্রদত্ত এক সুস্পষ্ট হেদায়াত বা পথ-নির্দেশ। আল্লাহ বলেন :
‘নিঃসন্দেহে এ কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে, যা একেবারেই সহজ-সরল।’ -[বনি ইসরাইল : ৯]
পবিত্র কুরআন সম্পর্কে এসব বৈরী প্রচারণা এবং জ্ঞানার্জনের প্রতি নিস্পৃহতার কারণে আমাদের সমাজে কোরআনের শিক্ষা জানার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখা যায় না, কোরআন পড়া হয় শুধু তেলাওয়াতের উদ্দেশ্যে। অথচ যে কোন গ্রন্থ পড়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে সেই গ্রন্থে যা বলা হয়েছে তাকে জানার চেষ্টা করা।
আমরা যদি কোন গ্রন্থের শিক্ষাকে নিজেদের জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করি তাহলে সে গ্রন্থের শিক্ষা জানার জন্যই আমরা তা পড়ে থাকি। গ্রন্থটি যদি এমন ভাষায় লিখিত হয়, যা আমরা জানি না, তাহলে আমরা গ্রন্থটির শিক্ষাকে অত্যন্ত জরুরী মনে করার কারণেই তার অনুবাদ জানার চেষ্টা করি।
কারণ অর্থ না জানলে গ্রন্থাকার কী বলতে চান তা আমরা কীভাবে বুঝব? আর কোন একটি বই পড়ে তা থেকে কোন কিছু জানতে ও বুঝতে যদি আমরা নাই পারি তাহলে সে গ্রন্থ পড়াকে আমরা অর্থহীন বলে থাকি। কোন সুস্থ ব্যক্তিই নিশ্চয়ই এমন আচরণ করেন না।
অর্থাৎ কেউ যদি নিয়মিতভাবে এমন একটি বই পড়ে যে বইটির ভাষা সে জানে না, গ্রন্থটি সে খুবই শুদ্ধ করে পড়তে পারে কিন্তু তার অর্থ কিছুই জানে না এবং জানার চেষ্টাও করে না অথচ সেই ব্যক্তি দাবী করে যে সে ঐ গ্রন্থের লেখককে খুবই ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে আর একই ভাবে তার গ্রন্থটিকেও সে তার জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করে; তাহলে ঐ ব্যক্তির এহেন আচরণে আমরা নিশ্চয়ই সন্দিহান হয়ে পড়ব যে, সে আসলে সুস্থ আছে কিনা!
অথবা তার এ সব আচরণকে আমরা পাগলামি ও হাস্যকর যে মনে করব তাতে কোন সন্দেহ থাকতে পারে না। আর এই উদ্ভট ও হাস্যকর আচরণের মাধ্যমে ঐ গ্রন্থ ও গ্রন্থ-প্রণেতার প্রতি পাঠকের শ্রদ্ধা, ভালোবাসার দাবীও যে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে তাও নিশ্চয়ই আমরা চিন্তা করে দেখতে চাইব।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে মহাগ্রন্থ আল কোরআনের সাথে কিন্তু আমরা প্রতিনিয়ত এ ধরণের উদ্ভট ও হাস্যকর আচরণই করে যাচ্ছি। আরবদের কাছে আল কোরআন তো কোন দুর্বোদ্ধ গ্রন্থ নয়। তারা তো কোরআন তেলাওয়াত করে এর অর্থ সহজেই বুঝতে পারতেন। যার কারণে আল্লাহর রাসূল তাদেরকে বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াতের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং এর জন্য অশেষ সওয়াব প্রাপ্তির কথা বলেছেন। কারণ, বেশি বেশি করে কোরআন তেলাওয়াত করার কারণে কোরআনের শিক্ষা তাদের হৃদয়পটে গাথা হয়ে যেত। আর ইসলামী জিন্দেগী যাপনের জন্য এর অপরিহার্য প্রয়োজনও ছিল।
কিন্তু আমরা যারা আরবী ভাষা জানি না তারা যদি কোরআনের অর্থ জানার চেষ্টা না করে শুধু তেলাওয়াত করি তাহলে আমাদের কোরআন পড়ার হক কতটুকু আদায় হবে তা কি ভেবে দেখা উচিত নয়? আল্লাহ আমাদেরকে কোরআন পড়ার যে নির্দেশ দিয়েছেন তা কি কোরআনের শিক্ষাকে জানা ও বুঝার জন্য নয়? আমরা যদি কোরআনের শিক্ষাকে না জানি তাহলে কোরআন থেকে হেদায়াত নেয়া আমাদের পক্ষে কীভাবে সম্ভব হবে?
পবিত্র কোরআনের শিক্ষাকে জানা ও বুঝার কারণে দ্বীনের যে ধরনের বুঝ, যে ধরনের ঈমান ও উপলব্ধি তৈরি হওয়া সম্ভব তা কি অর্থ না জেনে তেলাওয়াতের মাধ্যমে, আল্লাহর বড়ত্ব ও মাহাত্ম সম্পর্কে বেখবর থাকার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব?
মোটেই সম্ভব নয়। কারণ স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনই এ প্রসঙ্গে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন যে, জ্ঞানী আর মূর্খের উপলব্ধি সমান নয়। আর জ্ঞানীরাই আল্লাহকে সবচেয়ে বেশি ভয় করে, তারাই হেদায়াত থেকে বেশি উপকৃত হয়ে থাকে। আল্লাহ বলেন :
‘এটা কি করে সম্ভব হতে পারে যে, যে ব্যক্তি তোমার আল্লাহর এই কিতাবকে, যা তিনি তোমার প্রতি নাযিল করেছেন, সত্য বলে জানে আর যে ব্যক্তি এ মহাসত্য সম্পর্কে অজ্ঞ-অন্ধ তারা দুজনই সমান হতে পারে? উপদেশ তো বুদ্ধিমান লোকেরাই কবুল করে থাকে।’ -[রা’দ : ২০]
গুবহানাল্লাহ! কী দুর্ভাগ্য আমাদের! আল কোরআনের এমন সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও আজ আমরা উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করেছি! আল্লাহর কথার চেয়ে আজ আমরা তথাকথিত বুযুর্গদের কথাকেই যেন বেশি প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। আল্লাহ বলছেন জানো, জানতে চেষ্টা কর! আর বুযুর্গ রূপী আযাযিল ওয়াসওয়াসা দিয়ে বলছে খবরদার, কোরআনের অর্থ জানার চেষ্টা ক’রো না, শুধু তেলাওয়াত কর, শুধু তেলাওয়াত…!
মহাগ্রন্থ আল কোরআন এসেছে কি শুধু না বুঝে তেলাওয়াতের জন্য? কিন্তু কোরআন যিনি পাঠিয়েছেন সেই পরওয়ার দিগার এ সম্পর্কে বলছেন
‘এ কিতাব আমি অবতীর্ণ করেছি, এটি বরকতপূর্ণ। এতএব তোমরা এর অনুসরণ কর এবং নিষিদ্ধ সীমা পরিহার করে চল। তবেই তোমরা রহমত প্রাপ্ত হবে।’-[আল আনআম : ১৫৫]
‘(হে নবী!) এটি একটি বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাযিল করেছি, যেন বুদ্ধিমান লোকেরা একে গভীর ভাবে অধ্যয়ন ও চিন্তা-ভাবনা করে।’ -[আস সোয়াদ : ২৯]
‘তোমাদের কিছু লোক নিরক্ষর। তারা মিথ্যা আকাক্সক্ষা ছাড়া আল্লাহর কিতাবের কিছুই জানে না। তাদের কাছে কল্পনা ছাড়া কিছু নেই।’ -[আল বাকারা : ৭৮]
‘আমি তোমার প্রতি আমার জিকির (আল কোরআন) অবতীর্ণ করেছি, যাতে লোকদের সামনে ঐসব বিষয় বর্ণনা করতে পারো, যা তাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হয়েছে। যেন তারা চিন্তা-ভাবনা করতে পারে।’
আল্লাহ আমাদের মাফ করুন। আমরা প্রতিদিন, প্রতি ওয়াক্তে অত্যন্ত তাযিমের সাথে কোরআন তেলাওয়াত করি কিন্তু ভুলে একবারও আমাদের জানতে ইচ্ছে করে না এই পবিত্র বাণী গুলোতে আল্লাহ কী বলেছেন। আর ঠিক এ কারণেই নিরক্ষর লোকদের মতই আমরা আল্লাহর দ্বীন সম্পর্কে আন্দাজ-অনুমান, ধারণা-কল্পনা নির্ভর আকিদা-বিশ্বাস লালন করছি আর মিথ্যা আকাক্সক্ষার আশ্রয় নিয়ে অজ্ঞতা ও মূর্খতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি।
মানসিক এই বৈকল্যের কারণেই আজ আমাদের চিন্তা-চেতনাও হয়ে গেছে পঙ্গু ও নি¯প্রাণ। এ কারণেই আমাদের ঈমান আজ চেতনাহীন। আল্লাহর কালাম আজ ভুলুণ্ঠিত। আল্লাহর হুকুম আজ বিজয়ী বেশে নেই। আল্লাহর হুকুম আজ মানুষের হুকুমের অধীন। আল্লাহর আইন আজ সর্বোচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত নয়, ভুলুণ্ঠিত। আল্লাহর আইন আজ মানুষের আইনের অধীন। কোরআন এসেছে শাসন করার জন্য, শাসিত হওয়ার জন্য নয়। অথচ এ সম্পর্কে আজ আমাদের কোন চেতনাই নেই। আমাদের অন্তর আজ এতটাই মরে গেছে যে, এই কঠিন অন্তরের মধ্যে বোমা মারলেও যেন আর সম্বিত ফিরে আসবে না। অথচ আল্লাহ বলছেন:
‘আমরা যদি এই কোরআন কোন পাহাড়ের উপরও নাযিল করতাম, তাহলেও তুমি দেখতে যে সে পাহাড় আল্লাহর ভয়ে কেমন বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে! এই দৃষ্টান্ত গুলো আমরা এ জন্য দেই, যেন লোকেরা নিজেদের অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে।’-[আল হাশর : ২১]
আমাদের অন্তর ইহুদীদের মত এত কঠিন ও অভিশপ্ত হয়ে উঠল কীভাবে?
আল্লাহ বলছেন এই পবিত্র কালামকে যদি তিনি মানুষের উপর নাযিল না করে কোন নি¯প্রাণ পাহাড়ের উপরও নাযিল করতেন, তাহলে এই মহা নেয়ামতপূর্ণ কোরআনের ব্যাপারে দায়িত্বানুভূতি ও জবাবদিহির ভয়ে নি¯প্রাণ পাহাড়ও ক্রন্দন করে উঠতো, আল্লাহর ভয়ে বিদীর্ণ হয়ে গলে গলে পড়তো।
অথচ আকল সম্পন্ন মানুষ তথা সৃষ্টির সেরা মানুষ হওয়া সত্তেও, আল্লাহর খলিফার পরিচয় ধারণ করা সত্তেও মহাগ্রন্থ আল কোরআনের প্রতি আজ আমাদের যেন কোন দায়বদ্ধতা নেই, কোন দায়িত্বানুভূতি নেই।
এসবই ইহুদীদের এবং পতন যুগের জাতি সমূহের লক্ষণ। কোন জাতির অধঃপতন যখন ঘনিয়ে আসতো, তখন সে জাতির কায়েমী স্বার্থবাদী ধর্মীয় গোষ্ঠী সমূহ আল্লাহর কালাম থেকে লোকদেরকে দূরে রাখার জন্য বিভিন্ন ভাবে ফন্দি-ফিকির করত। যার কারণে সে জাতির জীবন-প্রণালীর সাথে আল্লাহর কালামের আর কোন যোগসূত্র থাকতো না এবং এক সময় আল্লাহ তাঁর কালামকে ঐ অভিশপ্ত জাতির কাছ থেকে উঠিয়ে নিতেন। সমাজ ও রাষ্ট্রে যথাযথ প্রয়োগ না থাকার কারণে আল্লাহর কালাম এক সময়ে সে সব জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে এবং নানামুখি বিকৃতি ও অবহেলার শিকার হয়ে অবশেষে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়।
কিন্তু আল কোরআন আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের সর্বশেষ কালাম হওয়ায় এটি কখনো বিকৃত ও বিলুপ্ত হবে না। কারণ সর্বশেষ কিতাব হওয়ার কারণে রাহমানির রাহিম নিজেই একে হেফাযতের দায়িত্ব নিয়েছেন। যার কারণে আরবী ভাষা না জানা সত্তেও যে কোন অনারব এ মহাগ্রন্থটি অর্থ না বুঝে শুধু তেলাওয়াতের মাধ্যমেও অশেষ ফায়েয ও তৃপ্তি লাভ করে থাকেন, যা পৃথিবীর আর কোন গ্রন্থ পাঠে সম্ভব হয় না।
অর্থ না জেনে দুনিয়ার আর কোন গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠাও কেউ ক্লান্তিহীন ভাবে পাঠ করতে সক্ষম নয়। কারণ কাজটি অর্থহীন হওয়ার কারণে অশেষ বিরক্তি ও ক্লান্তি তাকে ঘিরে ধরবে। কিন্তু মহাগ্রন্থ আল কোরআনই এমন একটি ব্যতিক্রমধর্মী গ্রন্থ যার শাব্দিক অর্থ না জানা সত্বেও লক্ষ কোটি মানুষ পরম আবেগ, আনন্দ ও তৃপ্তির সাথে প্রতিদিন তেলাওয়াত করছে এবং আধ্যাত্মিক ভাবে অশেষ উপকৃত হচ্ছে।
এটি মূলত বরকতপূর্ণ এই ঐশীগ্রন্থের একটি মোজেজা, নতুবা শুধুমাত্র তেলাওয়াত করে সওয়াব কামাইয়ের জন্যই এ মহাগ্রন্থটি অবতীর্ণ হয়নি।
বরং আল কোরআন এসেছে মানুষের জীবন ও সমাজ-সভ্যতার মধ্য থেকে সকল ধরনের কুফরিকে বাতিল করে দিয়ে তার স্থলে হককে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, মূর্খতা ও জাহেলিয়াতের অন্ধকার ভেদ করে জ্ঞানের মশাল প্রজ্জ্বোলিত করার জন্য। অজ্ঞতা ও নৈরাজ্যের ধ্বংসস্তুপের উপর সভ্যতার প্রাসাদ নির্মাণের জন্য। ইসলাম জীবনমুখি ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন বিধান। মূর্খতা ও বৈরাগ্যবাদের সাথে ইসলামের দূরতম সম্পর্কও নেই।
সুতরাং আজ সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার, সময় এসেছে চিন্তা-গবেষণা ও বিবেক-বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর। কারণ যারা জ্ঞান-বিমুখ, যারা আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে ভাবে না, চিন্তা-গবেষণা করে না, যারা কুপম-ুক, যারা তাদের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগাতে উৎসাহী নয় তাদের সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন মহাগ্রন্থ আল কোরআনে বলেছেন :
‘এ কথা একান্তই সত্য যে, বহু-সংখ্যক জ্বিন ও মানুষ এমন আছে, যাদেরকে আমরা জাহান্নামের জন্যই সৃষ্টি করেছি। তাদের অন্তর আছে কিন্তু তারা তার সাহায্যে চিন্তা-ভাবনা করে না; তাদের চোখ আছে কিন্তু তা দিয়ে তারা দেখে না; তাদের শ্রবনশক্তি আছে, কিন্তু তা দিয়ে তারা শোনে না। তারা আসলে জন্তু-জানোয়ারের মত; বরং তার চেয়েও বেশি বিভ্রান্ত। এরা চরম গাফলতির মধ্যে নিমগ্ন।’ – [আল-আরাফ : ১৭৯]
‘হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং আদেশ শোনার পর তা অমান্য করো না। তাদের মত হয়ে যেয়ো না, যারা বলে, আমরা শুনলাম; কিন্তু আসলে তারা শোনে না। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহর নিকট নিকৃষ্টতম পশু, বধির ও বোবা হচ্ছে সেসব মানুষ, যারা নিজেদের বিবেক ও বুদ্ধিকে কাজে লাগায় না। আল্লাহর যদি জানতেন যে, তাদের মধ্যে কোন ধরনের কল্যাণ রয়েছে, তাহলে তিনি অবশ্যই তাদেরকে শোনার তওফিক দিতেন। তিনি যদি তাদেরকে শুনতে দিতেন, তবে তারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে চলে যেতো।’ -[আনফাল : ২০-২৩]

‘এদের মধ্যে বহু লোকই তোমার কথা শোনে। কিন্তু তুমি কি বধিরদের শোনাবে তারা না বুঝতে চাইলেও? তাদের মধ্যে বহু লোক তোমাকে দেখে, কিন্তু তুমি কি সেসব অন্ধদের পথ দেখাবে, তারা দেখতে না চাইলেও? আসল কথা হল, আল্লাহ লোকদের উপর জুলুম করেন না, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের উপর জুলুম করে। -[ইউনুস : ৪২-৪৪]
‘তারা না কারো কথা শুনতে পারতো আর না তাদের নিজেদের বুদ্ধিতে কিছু আসতো। এরা সেই লোক, যারা নিজেরাই নিজেদের ক্ষতিগ্রস্ত করেছে আর তারা যা রচনা করেছিল, তার সব কিছুই তাদেও কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। অনিবার্যভাবে তারাই পরকালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’-[হূদ : ২০-২২]
পবিত্র কোরআনই ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ) ও তাঁর সাহাবীদের দাওয়াতী তৎপরতা বা গণসংযোগমূলক কাজের প্রধান হাতিয়ার। কারণ কোরআন শুধু যে সত্যের দলিল তাই নয়, কোরআন ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে মহানবীর জন্য একটি বিরাট মোজেজা। এ প্রসঙ্গে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত একটি হাদীসে মহানবী (সঃ) বলেছেন, ‘এমন কোন নবী ছিলেন না যাকে কোন মোজেজা প্রদান করা হয়নি, যা দেখে লোকেরা ঈমান আনতো। কিন্তু আমার মোজেজা হলো অহী (কোরআন), যা আল্লাহ আমার প্রতি নাযিল করেছেন। সুতরাং আমি আশা করি কেয়ামতের দিন তাদের অনুসারীদের তুলনায় আমার উম্মতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হবে।’ -[বুখারী]।
বস্তুত কোরআনের ভাষায় রয়েছে এমন এক সম্মোহনী শক্তি এবং এর বাণীতে রয়েছে মানুষের বিবেক ও চিন্তার জন্য এমন খোরাক যা কঠিন প্রাণ আরব-বেদুইনদের মনকেও বিগলিত না করে পারেনি।
হযরত ওমরের মত কঠিন ও কঠোর স্বভাবের মানুষও; যিনি আল্লাহর রাসূলকে হত্যা করার জন্য উদ্যত সঙ্গীন নিয়ে রওনা হয়েছিলেন, তিনিও তো বশ মেনেছিলেন মূলত আল্লাহর কালাম আল কোরআনের বাণী শুনেই। এ কারণেই আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাহাবীদের দাওয়াতী কাজের প্রধান উপকরণ ছিল আল কোরআন। কোরআন প্রচারের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে আল্লাহর নবী বলেছেন :
‘একটি আয়াত হলেও তা আমার পক্ষ থেকে প্রচার কর।’ -[বুখারী]
বিদায় হজ্জের ভাষণেও মহানবী আল্লাহর কালামের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন- ‘আমি তোমাদের কাছে একটি জিনিস রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি তা দৃঢ়ভাবে আকড়ে ধর তাহলে কখনো পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাব।’
দ্বীনের দাওয়াতে কোরআনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার কারণ কী? কারণ, আল কোরআনই দ্বীনের আসল ভিত্তি এবং দ্বীনী জ্ঞান ও হেদায়েতের মূল উৎস। হেদায়েতের পথে উম্মতের টিকে থাকাও মূলত নির্ভর করে আল কোরআনের সাথে তাদের গভীর সম্পর্কের উপর। উম্মতের রক্ষাকবচও হচ্ছে মূলত আল্লাহর কালাম আল কোরআন। মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের মূল সূত্রই হচ্ছে এই কোরআন। মানব জাতির উত্থান-পতনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেও দেখা যাবে, কোন জাতির উত্থান-পতন নির্ভর করতো মূলত আল্লাহর কালামের সাথে তারা কী ব্যবহার করতো তার উপর।
আল্লাহর কালাম চিরদিনই ছিল মানব জাতির জন্য সৌভাগ্যের পরশ-পাথর। যে জাতি আল্লাহর কালামকে বুকে ধারণ করেছে, আল্লাহর কালামকে তাদের জীবনে সর্বোচ্চ স্থান ও সম্মান দিয়েছে, বিনিময়ে আল্লাহহও তাদেরকে পৃথিবীতে গৌরবান্বিত করেছেন, সম্মান দিয়েছেন।
আর পূববর্তী জাতি সমূহের অধঃপতনের মূল কারণই এই ছিল যে, তারা আল্লাহর কালাম থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। আল্লাহর কালামের পরিবর্তে তারা নিজেদের মনগড়া ধারণা-বিশ্বাস, পীর, আলেম ও বুযুর্গ ব্যক্তিদেরকেই হেদায়েতের উৎস বানিয়েছিল। আল্লাহর কালামের পরিবর্তে নিজেদের কথাকেই বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে পূর্ববর্তী কিতাবধারীগণ আল্লাহর কিতাবকে বিকৃত পর্যন্ত করে ফেলেছিল।
ইহুদি আলেমদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তারা আল্লাহর নামে মিথ্যা অপবাদ দিত। অর্থাৎ নিজেদের মনগড়া কথা তারা আল্লাহর নামে চালিয়ে দিত। তারা এটি করতে পারতো এজন্য যে, সমাজের মানুষের মধ্যে আল্লাহর কালামের যথার্থ কোন চর্চা ছিল না।
ধর্মীয় নেতারা নানান বাহানায় আল্লাহর কালামের চর্চার পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া কাহিনী ও মতবাদ চর্চার উপরই বেশি গুরুত্ব দিতেন। আর লোকেরাও আল্লাহর কালামকে পাশকাটিয়ে ধর্মীয় নেতা, বুযুর্গ ব্যক্তিদের বয়ানের দিকেই বেশি ঝুকে পড়েছিল।
যার কারণে ইহদি আলেম সহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আল্লাহর নামে আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে ও মনগড়া কথা বলা একটা রীতিতে পরিণত হয়েছিল। পবিত্র কোরআনে ইহুদিদের এ বদ অভ্যাসের কঠোর নিন্দা করা হয়েছে। আল্লাহ বলেছেন :
‘এর পরও যারা নিজেদের মনগড়া কথা আল্লাহর উপর আরোপ করে, প্রকৃতপক্ষে তারাই জালিম।’-[আলে ইমরান : ৯৪]
এ কারণেই, আল্লাহর রাসূল ও তাঁর সাহাবীগণ আল কোরআনের প্রচারকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। আল্লাহর রাসূল বেশিরভাগ সময়ই সরাসরি কোরআন শুনিয়েই মানুষকে দাওয়াত দিতেন। সাহাবীগণও তাই করতেন। তাঁদের মধ্যে কোরআনের চর্চা এত বেশি ছিল যে, একজনের সাথে আরেক জনের দেখা হলে তাঁরা পরস্পরকে কোরআনের কোন অংশ না শুনিয়ে কোন কথা বলতেন না।
পূর্ববর্তী কিতাবধারীরা দ্বীনকে বিকৃত করে, এর উপর নিজেদের যেসব মনগড়া ধ্যান-ধারণা আরোপ করেছে এবং পবিত্র কালামের যেসব শিক্ষাকে তারা গোপন করেছিল সেসব শিক্ষাকে প্রকাশ করে দেয়া, আল্লাহর দেয়া যেসব হালালকে তারা হারাম এবং হারামকে হালাল করেছিল সেসব বিকৃতিকে পরিশুদ্ধ করাও ছিল মহাগ্রন্থ আল কোরআনের আগমণের অন্যতম লক্ষ।
এ কারণেও কোরআনের পয়গাম মানুষের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছে দেয়া ছিল মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নবুয়তী মিশনের অন্যমত দায়িত্ব। এ প্রসঙ্গে আহলে কিতাবীদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ পাক বলেছেন :
‘হে আহলি কিতাবীগণ! তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এসেছে। কিতাবের যেসব বিষয় তোমরা গোপন করতে সে তার মধ্য থেকে অনেক বিষয় প্রকাশ করে দেয় এবং অনেক বিষয় মাফ করে দেয়। তোমাদের কাছে একটি জ্যোতি ও সুস্পষ্ট কিতাব এসেছে। এরদ্বারা আল্লাহ যারা তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে তাদেরকে নিরাপত্তার পথ প্রদর্শন করেন এবং তাদেরকে স্বীয় নির্দেশে অন্ধকার থেকে আলোকের দিকে নিয়ে আসেন এবং সরল পথে পরিচালিত করেন। -[আল মায়েদা : ১৫-১৬]
কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতীতের বিভ্রান্ত, জালেম, ফাসেক ও অভিশপ্তদের জাতি সমূহের মত আমাদের মধ্যেও আজ আল্লাহর কালামের চর্চা ও প্রচার-প্রসার কমে গেছে এবং আমাদের দ্বীনদার লোকদের মধ্যে আল্লাহর কালামের পরিবর্তে নিজেদের মনগড়া কথা ও ধারণা-বিশ্বাসকে প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নিজেদের জীবন থেকে আল কোরআনের শিক্ষাকে বিদায় করে দিয়ে আজ আমরা অভিশপ্ত ইহদী-নাসারাদের পদাংক অনুসরণ করছি। আমাদের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ-সংস্কৃতি, রাজনীতি, অর্থনীতি আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য সকল ক্ষেত্রেই আমরা পাশ্চাত্যের আদর্শকে অনুসরণ করে চলেছি।
পাশ্চাত্যের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আমরা আল কোরআনের শিক্ষাকে জানার চেষ্টা না করে শুধু তেলাওয়াত করছি, আর জীবনের সর্বক্ষেত্র থেকে কোরআনের বিধানকে বিদায় করে দিয়ে পাশ্চাত্যের মর্জি মত চলছি।
পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ করতে যেয়ে আমরা তোতা পাখির মত তাদের শিখানো বুলি আবৃত্তি করে বলছি ‘ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা।’ এই আপ্তবাক্যকে আল্লাহর নির্দেশের চেয়েও বেশি মর্যাদা দিয়ে শুধু রাজনীতি নয় সমাজ-সংস্কৃতির সর্ব পর্যায়ে আল কোরআনের প্রবেশাধিকারকে নিষিদ্ধ করতে এবং সত্য গোপন করতে আমাদের দেশের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ, আমাদের শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, আমাদের প্রচার মাধ্যম এমনকি দ্বীনের তথাকথিত মেহনতকারীরাও উঠে পড়ে লেগেছেন।
অথচ আল কোরআন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। আল্লাহ বলেছেন :
‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহকে সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন (জীবনব্যবস্থা) মনোনীত করলাম।-[আল মায়েদা :৩]
এই পূর্ণাঙ্গ দ্বীনের অনুসরণ করার নির্দেশই দিয়েছেন আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন :
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণরূপে ইসলামে দাখিল হও আর শয়তানের পদাংক অনুসরণ ক‘রো না; নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য দুশমন।’-[বাকারা : ২০৮]
রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মহাগ্রন্থ আল কোরআনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। নামাজ-রোজার মত আল্লাহর এসব হুকুম পালন করা এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আল্লাহর আনুগত্য, তাঁর দাসত্ব ও গোলামী করাই হচ্ছে ঈমানের অনিবার্য দাবী। কিন্তু রাজনীতি সহ সমাজ-সংস্কৃতির সর্বস্তর থেকে ইসলাকে নির্বাসিত করা সত্যকে গোপন করারই নামান্তর এবং এটি ইহুদীদেরই অন্যতম বৈশিষ্ট।
নিজেদের স্বেচ্ছাচারীতাকে বজায় রাখার জন্য আল্লাহর কালামের কিছু মানা এবং কিছু না মানার কারণে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ইহুদীদের তীব্র সমালোচনা এবং করেছেন এবং এসব কর্মকা-ের বিরুদ্ধে কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন।
যারা ইসলামকে খ-িত ও সংকীর্ণরূপে তুলে ধরে; স্বার্থের বশবর্তী হয়ে কিংবা মূখতা বশত যারা আল কোরআনের কোন আদর্শকে, আল্লাহর নূরকে তথা সত্যকে গোপন করে তাহলে তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অভিশাপ আর আখেরাতে রয়েছে কঠিন আযাব :
‘তাহলে কি তোমরা আল্লাহর কিতাবের একাংশ বিশ্বাস কর আর অপর অংশকে কর অবিশ্বাস? জেনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যারাই এ ধরনের আচরণ করবে তাদের জন্য রয়েছে পার্থিব জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান আর পরকালের জীবনে কঠিন আযাব। তোমরা যা কিছুই কর আল্লাহ সে সম্পর্কে বেখবর নন।’ -[আল-বাকারা : ৮৫]
‘নিশ্চয়ই কিতাবের মধ্যে মানুষের হেদায়েতের জন্য যেসব বিস্তারিত পথনির্দেশ ও তথ্য আমি নাযিল করেছি সেসবকে যারা গোপন করে, সেসব লোকের প্রতিই রয়েছে আল্লাহর অভিশাপ এবং অভিশাপ বর্ষণকারীদেরও অভিশাপ।’ -[বাকারা : ১৫৯]
‘এসব আহলি কিতাবদেরকে সেসব ওয়াদাও স্মরণ করিয়ে দাও, যা আল্লাহ তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন। তা এই যে, তোমাদেরকে কিতাবের শিক্ষা লোকদের মধ্যে প্রচার করতে হবে, তা গোপন করতে পারবে না। কিন্তু তারা কিতাবকে পিছনে ফেলে রেখেছে এবং সামান্য মূল্যে তাকে বিক্রয় করেছে। তারা এই যা কিছু করছে তা কতই না খারাপ কাজ!’ -[আলে ইমরান : ১৮৭]
সুতরাং, আজ বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের যে বিপর্যয়, যে জিল্লতি ও অপমান চেপে বসেছে তা কি আল্লাহর কালামের সাথে আমাদের দুর্বব্যবহার এবং সত্যকে গোপন করার পরিণাম নয়?
……………………………………………

নবি মোলাকাতে
আনোয়ার আল ফারুক

দেখাদেখি লেখালেখি সবখানে তুমি
লেখে দিছি এই নামে হৃদয়ের ভুমি,
তুমি ছাড়া হয়’না যে কোন লেখালেখি
সবখানে মন চোখে তোমাকেই দেখি,
রব প্রিয় নবি তুমি আলোকের সাকি।।

পথপথে হেঁটেহেঁটে তোমাকেই ভাবি
এই বুঝা এই ভাবা ঈমানের দাবি,
দেখে যাই লেখে যাই কবিতার সুরে
লেখালেখি মাখামাখি হয় নুর নূরে,
কবিতায় গানে গানে নূর ছবি আঁকি।।

ফুলফুলে পৃথিবীটা হাসে এই নামে
প্রেমময় চিঠি লেখে গোলাপের খামে,
দরুদের কাসিদায় গাঁথি বিনি মালা
এই গানে এই সুরে মিটে মন জ্বালা।।

লেখালেখি দেখেদেখি আজ তুমিময়
এই প্রেম ভালোবাসা হৃদে শুধু বয়,
কবিতার রঙতুলি তোমাকেই খোঁজে
তাই আমি প্রেমগাঁথা লেখি রোজরোজে,
প্রিয় নবি মোলাকাতে কাঁদে দুটো আঁখি।।
……………………………………………

নবীর দিদার
কবির কাঞ্চন

খোদার পরে নবীর কথা
জপি ভাবি লিখি
নবীর দেয়া শিক্ষা নিয়ে
মানুষ হতে শিখি।

নবীর ভালোবাসা ছাড়া
চাই না কিছু আর
ভীষণ রকম ইচ্ছে করে
নবীকে দেখবার।

রহম করো ও দয়াময়
মরে যাবার আগে
একবার হলেও নবীর দিদার
দিও আমার ভাগে।

নবীর দেখা পেলে আমার
সবই পাওয়া হবে
আমার মতো সুখি তখন
রবে কে আর ভবে।
……………………………………………

ফোটালেন শত ফুল
ফরিদ সাইদ

পাপাচার অনাচার
ঘোচাতে দুর্গতি
নবীকে (সাঃ) পাঠালেন
আরশের অধিপতি !

মানুষের কল্যাণে
আসমানি আহবানে
নানারঙ সুবাতাস
ছড়ালেন সবখানে !

ভ্রান্তির পথে যারা
ভেঙে দেন যত ভুল
ভালোবাসা বিনয়ে
ফোটালেন শত ফুল !
……………………………………………

সমাজকল্যাণে নবী মুহাম্মদ সা. এর ভূমিকা
মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন

মানবজাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর আগমন ।জীবন ব্যবস্থার মহান আদর্শ শিক্ষক ও মডেল হিসেবে অবিস্মরণীয়।মহানবী (সা.) মানবজাতির জন্য মহান আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ প্রেরিত পুরুষ। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁকে সর্বোত্তম শিক্ষক ও আদর্শ মানব হিসেবে প্রেরণ করেছেন। তিনি এ জীবন ব্যবস্থা প্রচার করেছেন, শিক্ষাদান করেছেন, নিজে এর অনুসরণ ও প্রয়োগ করে নমুনা স্থাপন করেছেন। সমগ্র মানবজাতির জন্য শান্তি, কল্যাণ, নিরাপত্তা ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একমাত্র অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় আদর্শ রেখে গেছেন যা কেয়ামত পর্যন্ত চিরভাস্বর ও অমলিন থাকবে। এক্ষেত্রে আল্লাহ রাববুল আলামীন কুরআনে ঘোষণা করেছেন- ‘‘হে নবী আপনি নীতি-নৈতিকতা ও উত্তম চরিত্রের সর্বোচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত’’। আর মানবজাতিকে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ রাববুল আলামীন বলেছেন- ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর আদর্শ তোমাদের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ।’ (সুরা আহজাব, আয়াত : ২১)।
রাসূল (সাঃ) তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সর্বযুগের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একটি সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। স্বাধীন ও উন্মুক্ত পরিবেশে যে ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেন তা-ই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত। সমাজকল্যাণে মহানবী (সা) কর্তৃক গৃহীত কিছু ভূমিকা তুলে ধরার চেষ্টা।
সমাজকল্যাণে মহানবী (সা) এর প্রধান কর্মসূচি ছিল নৈতিক ও কল্যাণমূখী শিক্ষার বিস্তার । শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) যে যুগে আবির্ভূত হয়েছিলেন সে যুগ ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন। ইসলামের ইতিহাসের পরিভাষায় এ যুগকে অজ্ঞতার যুগ বলা হয়ে থাকে। রাসূল (সা.) শিক্ষাদানের মাধ্যমে অজ্ঞতাকে দূরীভূত করেন। তিনি জ্ঞানার্জন করাকে বাধ্যতামূলক করেন। কারণ বিদ্বান বা জ্ঞানীরাই সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, এমনকি রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবনে সুখ-শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। নৈতিক ও কল্যাণমূখী শিক্ষার মাধ্যমে একটি চরিত্রবান জাতি উপহার দিয়েছিলেন বিশ্বনবী মুহাম্মদ (সা)।
রাসূল (সা) একটি সুন্দর ভারসাম্য অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়ন করে গেছেন। তিনি রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক প্রশাসনিক উন্নয়ন তথা ধনী দরিদ্র বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে একটি উৎপাদনমুখী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম করে গেছেন। আর সুদমুক্ত সমাজ গড়তে সুদ প্রথা বিলুপ্ত করেন। সুদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় আজকের বিশ্বে বিরাজ করছে অস্থিরতা, ধনী-গরীবের মধ্যে আকাশ-পাতাল বৈষম্য, হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদি। রাসুল (সা) সুদ দেয়া, নেয়া এমনকি সুদের দলিল লেখক ও সাক্ষীকে অভিশপ্ত বলে ঘোষণা দিলেন। তিনি আরো বলেন, সুদের ৭০ টিরও বেশি গুণাহ আছে। তার মধ্যে নিম্নেরটি হল নিজের মায়ের সাথে জিনা করা।
রাসূলে পাক (সা) সমাজে যাকাতভিত্তিক অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন।অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধানে সমাজে যাকাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। আজকের সমাজের অর্থনৈতিক মেকানিজম হল যাকাত ব্যবস্থা চালু করা। রাসূল (সা.) বলেছেন- নিশ্চয় আল্লাহ সাদাকাহ ফরজ করেছেন, যা ধনীদের কাছ থেকে আদায় করে দারিদ্র্যদের মধ্যে বণ্টন করা হবে।যাকাত আদায় ও বটনের মাধ্যমে আয় বৈষম্য দূর হয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ অভাব-দারিদ্র মুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়েছিল।
সমাজে নবী করীম (সা) শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। কেননা শ্রমিকরা তাদের শ্রমের মাধ্যমে সমাজে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তাই রাসুল সাঃ এর নীতি ছিল মনিব ও শ্রমিকের সম্পর্ক হবে ভাইয়ের সম্পর্ক। এখানে শ্রেণী সংঘাত, শ্রেণী সংগ্রাম কিংবা শ্রেণী বিদ্বেষের কোন সুযোগ নেই।শ্রমিকদের অধিকারকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করে তাদের গায়ের ঘাম শুকানোর পূর্বেই ন্যায্য পাওনা আদায় করে দেয়ার নির্দেশ দিয়ে রাসূল (সা.) শ্রমজীবিদের অধিকারকে নিশ্চিত করেছেন। শ্রমিকের মজুরির ক্ষেত্রে মহানবী (সা.) এমন পরিমাণ ভাতা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন যদ্বারা সে নিজে ও তার পরিবারের ভরণ-পোষণ করা চলে। মহানবী (সা.) বলেন: মজুর ও শ্রমিকের খাদ্য ও বস্ত্র দিতে হবে মালিকের তথা রাষ্ট্রের।
সমাজকল্যাণের জন্য সুষম ব্যবসায় নীতি প্রণয়ন করেন। ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যে সততা অবলম্বন করতে এবং সর্বপ্রকার ধোঁকাবাজি ও প্রতারণা থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছে। সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য ঘোষণা করা হয়েছে সুসংবাদ। অসৎ ব্যবসায়ীদের জন্য দুঃসংবাদ। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যবসায়ী (কিয়ামতের দিন) নবী, সত্যবাদী ও শহীদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১২৫২; সুনানে দারেমি, হাদিস : ২৫৩৯)
মহানবী (সা.) আরও ইরশাদ করেছেন, “যেসব ব্যবসায়ী আল্লাহকে ভয় করে এবং ব্যবসায় সততা ও সত্যবাদিতা অবলম্বন করে তারা ব্যতীত কিয়ামতের দিন অন্য ব্যবসায়ীরা পাপিষ্ঠ রূপে উত্থিত হবে।” (তিরমিজি, হাদিস : ১২১০; ইবনু মাজাহ, হাদিস : ২১৪৬)। এক হাদিসে রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়, কোন উপার্জন সর্বোত্তম? তিনি বলেন, ‘নিজ হাতে কাজ করা এবং নিষ্ঠাপূর্ণ বেচাকেনা।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৭২৬৫; মিশকাত, হাদিস : ২৭৮৩)। কাতাদা (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি সততা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে ব্যবসা করে, তার জন্য ব্যবসা আল্লাহর পক্ষ থেকে রিজিক ও হালালকৃত একটি বিষয়। (আস-সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকি, হাদিস : ৫/৪৩২)
মূল্যবৃদ্ধির আশায় প্রয়োজনীয় দ্রব্য মজুদ রাখাকে তিনি নিষিদ্ধ করেছেন। ইহার বিরুদ্ধে রাসূল (সা.) ঘোষণা করেছিলেন- মহানবী (সা.) আরো ঘোষণা করেছেন, ‘যে ব্যক্তি বাজারে পণ্যের অভাবের সময় পণ্য মজুদ করে রাখে সে বড় পাপী’ (মুসলিম)।
মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আমদানিকারক রিজিকপ্রাপ্ত হয়, আর মজুদদার হয় অভিশপ্ত।’ আরো বলা হয়েছে, ‘বিভ্রান্ত লোকই শুধু মজুদদারী করে’ (ইবনে মাজা)। নবী করিম (সা.) মজুদদারকে কঠোর শাস্তি প্রদানের কথা ঘোষণা করেছেন, ‘যে মুসলিম সম্প্রদায়ের খাদ্যদ্রব্য চল্লিশ দিন যাবত মজুদ করে রাখবে আল্লাহ তাকে দূরারোগ্য ব্যাধি ও দারিদ্র্য দিয়ে শাস্তি দিবেন’ (ইবনে মাজা)।
মুনাফালোভী অসৎ ব্যবসায়ী মজুদদারদের সঙ্গে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক নেই। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘যে ব্যক্তি চল্লিশ রাত পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্য মজুদ করবে তার সঙ্গে আল্লাহর কোনো সম্পর্ক থাকবে না।’ নবীজি আরো বলেছেন, ‘মূল্যবৃদ্ধির উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি চল্লিশ দিন পর্যন্ত খাদ্যশস্য মজুদ রাখে, সে ব্যক্তি আল্লাহর দায়িত্ব থেকে মুক্ত এবং আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট’ (মিশকাত)।
পণ্যের ত্রুটি প্রকাশ করার গুরুত্ব দিয়ে রাসুল সাঃ বলেছেনঃ‘‘যে ব্যক্তি দোষযুক্ত পণ্য বিক্রির সময় দোষ প্রকাশ করে না ফেরেস্তারা তার উপর অভিশাপ দিতে থাকে।
ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা না করার জন্য সতর্ক করে দিয়ে রাসুল সাঃ বলেছেনঃযে ব্যক্তি (বেচা-কেনায়) ধোঁকা দিবে সে আমাদের দলভুক্ত নয়!
এমনিতেই মিথ্যা শপথ করা মারাত্মক গুণাহের কাজ। তার ওপর ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এর নিষেধাজ্ঞা আরো বেশি। কারণ ব্যবসা-বাণিজ্যে অন্যের হক সংশ্লিষ্ট থাকে। হযরত আবু যর (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) ইরশাদ করেন, তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহতায়ালা কেয়ামতের দিবসে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না। তাদেরকে মার্জনা করবেন না। তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল তারা কারা? তারা তো বড় বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তারা হলো অনুগ্রহ করার পর তা প্রকাশকারী, টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী, মিথ্যা শপথের মাধ্যমে পণ্য বিক্রয়কারী। অতঃপর রাসূল (সা.) এই আয়াত পড়েন। (মুসলিম শরিফ, মেশকাত শরিফ ২৪৩)। অপর এক হাদিসে রাসূল (সা.) বলেন, “যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা দ্বারা কারও হক নষ্ট করে সে নিজের জন্য জাহান্নামের শাস্তি অবধারিত করে নেয়। তার জন্য জান্নাত হারাম হয়ে যায়। বর্ণনাকারী আরজ করলেন, যদি বিষয়টি সামান্য পরিমাণে হয় তবুও? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, তা গাছের একটি তাজা গাছের ডালই হোক না কেন।”
ব্যবসার ক্ষেত্রে সত্য শপথ থেকেও বিরত থাকা উচিত। রাসূল (সা.) বলেন, শপথ পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করে ঠিক, কিন্তু তা ব্যবসার বরকত নষ্ট করে দেয়। অপর বর্ণনায় আছে ‘তোমরা বেচাকেনার ক্ষেত্রে অধিক শপথ থেকে বিরত থাক, কেননা তা পণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি করলেও বরকত নষ্ট করে দেয়।’ (মুসলিম শরিফ, মেশকাত শরিফ ২৪৩)
সমাজকল্যাণে মহানবী (সা) এর অন্যতম কর্মসূচী হচ্ছে দুর্নীতি প্রতিরোধ। সমাজ থেকে দুর্নীতি উচ্ছেদে জবাবদিহিতা ও নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এ জঘণ্য অপরাধ থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার ব্যাপারে রাসুল সাঃ এর নীতি ছিল অতুলণীয়। তিনি পরকালিন শাস্তির ভয় দেখিয়ে মানুষদের দুর্নীতি থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করেছেন।ঘুষের লেনদেন করে কাজ করিয়ে নেয়া বা দেয়ার ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী করেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত রসূল (স.) বলেন, ঘুষ দাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়ই জাহান্নামে যাবে (তাবারাণী)। হযরত ইবনে ওমর (রা.) বর্ণিত অন্য হাদীসে আছে যে, ঘুষদাতা ও ঘুষ গ্রহীতা উভয়কেই রসূল (স.) লানত করেছেন (আবু দাউদ)। হযরত ছাওবান (রা.) হতে বর্ণিত আছে যে, রসূল (স.) ঘুষ দাতা ও গ্রহীতা এবং ঘুষের দালাল সকলের ওপর লানত করেছেন (আহমদ তাবারানী)।
সমাজকল্যাণে মহানবী (সা) কর্তৃক আরেকটি কর্মসূচী হচ্ছে মদ ও জুয়া নিষিদ্ধকরণ। মদ ও জুয়া সমাজের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়। এটা পরীক্ষিত যে, মদ-জুয়া স্ত্রী-সন্তান, আত্মীয়স্বজন, পাড়া-পড়শীর মধ্যে সম্পর্কের ভীত নষ্ট করে দেয়। মদ ও জুয়া মানুষকে কাণ্ডজ্ঞানহীন করে তোলে। মানুষকে ব্যক্তিত্বহীন হতে বাধ্য করে। মদ ও জুয়ার কারণে আর্থিকভাবে দেউলিয়ায় পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজে এমন নজির অসংখ্য। আল কোরআনে ইরশদ হয়েছে, ‘(হে রাসুল সা.) লোকেরা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, উভয়ের মধ্যে আছে মহা পাপ এবং মানুষের জন্য উপকারও; কিন্তু এগুলোর পাপ উপকার অপেক্ষা অধিক।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ২১৯)। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘ওহে মুমিনগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, প্রতিমা ও ভাগ্য নির্ণায়ক তীর হচ্ছে ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কারসাজি। সুতরাং তোমরা এসব বর্জন কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার (মায়িদা ৯০)।
আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ, ‘নিশ্চয় শয়তান মদ ও জুয়ার দ্বারা তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে বিরত রাখতে চায়; তবু কি তোমরা নিবৃত্ত হবে না (মায়িদা ৯১)।
মদ ও জুয়া সম্পর্কিত আল্লাহ পাকের দেয়া বিধানকে কঠোরভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে রাসুল সাঃ তৎকালীন সময়ে ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ বিনির্মাণে সহায়ক হন। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন , ‘নেশা জাতীয় যে কোনো দ্রব্যই মাদক। আর যাবতীয় মাদকই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে মাদক সেবন করে, অতঃপর নেশাগ্রস্ত অবস্থায় মারা যায় এবং সে তওবা না করে, আখিরাতে সে মদপান করা থেকে বঞ্চিত হবে (মুসলিম :২০০৩)।
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের কিছু নিদর্শন হলো ইলম লোপ পাবে, অজ্ঞানতার প্রসার ঘটবে, মদ্যপান ও মাদকের বিস্তার ঘটবে, ব্যভিচার ছড়িয়ে পড়বে।’ (বুখারি শরিফ, প্রথম খণ্ড, হাদিস: ৮০)।
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মাদক ও নেশা পান করো না। কেননা, এটা সব অপকর্ম ও অশ্নীলতার মূল (ইবনু মাজাহ, ৩৩৭১)।’
সমাজকল্যাণে মহানবী (সা) এর অন্যতম কর্মসূচির মধ্যে সন্ত্রাস দমন ও প্রতিরোধের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সর্বপ্রথম বিশ্ববাসীকে সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ উপহার দিয়েছেন। ইসলাম কখনোই হত্যা, নৈরাজ্য সৃষ্টি, সহিংসতা ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দেয় না। রাসূল (সা) ইরশাদ করেছেন, “কবীরা গোনাহসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বড় গোনাহ হলো আল্লাহর সঙ্গে কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা কথা বলা।” [বুখারি : ৬৮৭১, মুসলিম : ৮৮]
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, একদল ভিন্ন মতের ওপর দিনের পর দিন অস্ত্রাঘাত কিংবা নির্যাতিত করে যাচ্ছে। এমনকি বিনা দোষে দিনের কারাগারে বন্দী রাখা হচ্ছে। অথচ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমাদের (মুসলমানদের) ওপর অস্ত্র উঠাবে, সে আমাদের (ধর্মের) দলভুক্ত না।’ (বুখারি, হাদিস : ৬৮৪৪)
অন্য হাদিসে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর কাছে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়া কোনো মুসলমানের হত্যার চেয়েও অধিক সহনীয়।’ (নাসায়ি শরিফ, হাদিস : ৩৯৯২)
চারিত্রিক সংশোধনের মাধ্যমে সন্ত্রাস নামক সামাজিক ব্যাধি থেকে মুক্ত করার জন্য রাসুল সাঃ এর নীতি ছিল অসাধারণ।সন্তানদের চরিত্র গঠনে মাতাপিতাকেই বেশি দায়িত্ব দিয়েছেন।মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের সন্তানদের সাথে সম্মানবোধের মাধ্যমে আচরণ কর এবং তাদেরকে আদব ও মূল্যবোধ শেখাও।’
সমাজে তাঁর শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ ছিল অনন্য। যুদ্ধ-বিগ্রহ, কলহ-বিবাদ, রক্তপাত, অরাজকতা দূরীভূত করে শান্তিপূর্ণ একটি কল্যাণমূলক আদর্শ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধভাবে সুপথে রাখা ও কল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত রাখার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলেন হিলফুল ফুযুল নামক একটি সংগঠন। যা বিশ্ববাসীর জন্য অনন্য শিক্ষা।
……………………………………………

সাহিত্যানুরাগী রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম
আবদুস সালাম

কুরআন শরীফ মানব জাতির কল্যাণে এক অতুলনীয় দিকনির্দেশনা। মানব জাতিকে অপসাহিত‍্য, অপসংস্কৃতির অন্ধকার থেকে আলোর দিকে ফেরাতে মহান আল্লাহ তায়ালা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলেছেন_হে রসুলুল্লাহ !( আপনার কাছে আমি এমন এক গ্রন্থ পাঠিয়েছি যা দ্বারা আপনি মানবজাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনতে পারবেন।) সূরা ইব্রাহীম

বিশেষতঃ কুরআন শরীফ আসার আগে পর্যন্ত আরবের সাহিত্য ছিল কবিতা নির্ভর। আরবদের কবিকূল বাদশা থেকে আরম্ভ করে সাধারণ মানুষের মনোরঞ্জন করতো অশ্লীলতা , যৌনতা ভরা কাব্য গাথা । তারা ,সুরাপান , অহংকার উচ্ছৃঙ্খলতা ইন্দ্রিয় পরায়নতা প্রভৃতির বর্ণনা প্রদান করতেন সুচতুর ভাবে। সমাজের উচ্ছৃঙ্খল নারীদের নৃত্য গীত উপভোগ করতেন,আর উদ্ভ্রান্তের মতো ঘুরে বেড়াতেন।

ইসলাম যখন প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে তখন কুরআন শরীফে নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম কে উদ্দেশ্য করে মহান আল্লাহ তায়ালা বললেন_(আপনি কি দেখেন না,ওরা বিভ্রান্ত হয়ে প্রত‍্যেক উপত্যকায় ঘুরে বেড়ায় এবং এমন সব কথা বলে যা তারা করে না, বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে।)_সুরা আশ শোয়ারা

মুশরিক কবিগণ এই ধরনের কবিতা, গান করতেন। সমাজের বখাটে , শয়তান, সুরাপায়ী যারা তারাই তাদের অনুসরণ করতো। তাদের কবিতা, গান সমাজের কোনো উপকারে আসতো না বরং সমাজ কে অধঃপতনের দিকে ঠেলে দিতো। এদিকে ইসলাম সমগ্র মানব জাতিকে সুস্থ, সুন্দর ও কল‍্যানময় জীবন যাপনে উৎসাহিত করে। জীবনের অন‍্যান‍্য ক্ষেত্রের মতোই সাহিত্যের ক্ষেত্রে ও ইসলাম সুস্থ, পরিচ্ছন্ন সুন্দর,বিকাশধর্মী প্রবণতা কে সমর্থন করে।(নুন,ওয়াল কলামে ওয়ামা ইয়াসত্বুরূনা__শপথ কলমের আর সেই বিষয়ে যা তারা লিখে)সূরা কলম । মানুষ তার মনের আবেগ ইচ্ছা ও চিন্তার রূপরেখা কে পরিশীলিত ও পরিমার্জন করে যা আমাদের উপহার দেয় তাই হলো সাহিত্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর সাথে থাকা সাহাবীগণ তখন কবিকূলের প্রতি বিরূপ হতে শুরু করলেন। কিন্তু তারা যেসব কবিগণের কাছে পরিমার্জিত সমাজ উন্নয়ন মূলক কবিতা শুনেছেন তারা ও আর কাছে আসতে সাহস করতো না ।নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাদের খোঁজ করলে এবং তারা সামনে এলো ও লজ্জায় মাথা নীচু করলো । নবী সাহেব তখন তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেন। তিনি বললেন প্রতিটি রচনা যদি কল‍্যানকর , এবং শালীন হয় তবে তা সাদরে গ্রহণযোগ্য।আর কুরুচিপূর্ণ , অশ্লীলতা থাকলে তার অবশ্যই বর্জনীয়।

তিনি আরো বলেন ” কবিতা হলো অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে প্রকাশিত সুসামঞ্জস্য শব্দ ঝংকার। যে কবিতায় সত‍্যের অপলাপ হয় তাতে সমাজের কোন উপকার সাধিত করে না বরং তা ক্ষতিই করে ।এতে মানুষের কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না”। তিনি আরও বলেন” কবিতা হলো বাণী বিশেষ । অতএব এতে ভালো মন্দ দুটি দিকই থাকতে পারে”। ভালো কবিতা ও মন্দ কবিতা সম্পর্কে আরও বলেন” কোনো কোনো বর্ণনায় জাদু আছে আর কোনো কোনো বর্ণনায় আছে জ্ঞান”। আরও বলেন “মোমিন কবি তার তরবারি দিয়ে যেমন যুদ্ধ করে তেমনি তার বাক‍্য দিয়ে ও যুদ্ধ করে”।

কথিত আছে এক সময় মুশরিক কবিগণ মুসলমান দের কুৎসা , নিন্দা ভর্ৎসনা তে মসগুল ছিল ও তাদের বীর্য ও বীরত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মোমিনদের মনে ভয়ের সঞ্চার করছিল তখন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম কবিতার মাধ্যমে তাদের জবাব দেওয়ার কথা বলেন। তিনি এও বলেন “যারা জান ,মাল দিয়ে রসুল কে সাহায্য করছে তাদের কথা দ্বারা সাহায্য করতে বাধা কিসের”। যেমন এই কথা বলা তেমনি এক বিশিষ্ট সাহাবী হাসসান ইবনে সাবিত লাফিয়ে উঠে বলেন এই কাজের জন্য আমার জান ও মাল কুরবান। তিনি জোর দিয়ে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের নিকট বলেছিলেন “বসরা থেকে সানআর এর অলিতে গলিতে আমার কথা ঘোষিত হবে ইনশাআল্লাহ।”রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন তাঁকে বলেন_তুমি আবু বকর এর কাছে যাও, তিনি তোমাকে মুশরিকদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও, কালো অধ্যায় গুলো সম্পর্কে জানিয়ে দিবে । তুমি সেই কথা স্মরণ করে নিন্দা কাব্য রচনা করতে পারবে। জিব্রাইল আলাইহিস সালাম তোমার সঙ্গে আছেন। তিনি হাসসান কে তার কাজের পুরস্কারের কথা শুনিয়ে বলেছিলেন হে হাসসান । “আল্লাহর কাছে তোমার পুরস্কার রয়েছে জান্নাত।”রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হাসসান এর জন্য মদীনার মসজিদে একটা উঁচু মঞ্চ তৈরির ব‍্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।যার উপর দাঁড়িয়ে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম এর গৌরব গাথা আর মুশরিক দের নিন্দা গাথা আবৃত্তি করতেন। রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলতেন” যতদিন হাসসান রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর গৌরব গাথা রচনা করে যাবে ততদিন আল্লাহ তায়ালা তাকে জিব্রাইল মারফত সাহায্য করে যাবে।”

একদিন নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম মদীনা আসছেন। মদীনার বালিকারা কোরাস সঙ্গীত গেয়ে তাঁকে অভ‍্যার্থনা জানালে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব খুশি হন।

তিনি কল‍্যানকর কবিতা মন দিয়ে শুনতেন। একবার কবি ত্বয়াফার কবিতার কয়েকটি লাইন শুনে বিস্মিত হয়েছিলেন।বাঃ এতো একদম নবুয়তের কথা জানিবে অনেক কিছু ,কাল করিবে প্রকাশ

আনিবে সংবাদ সেই পাথরের,নাই যার আশ”।

উল্লেখ্য যে তিনি কবিতা যেমন মনোযোগ সহকারে শুনতেন তেমনি কবিতা শুনে মন্তব্য ও করতেন। এখানে একটা ঘটনা যা বর্ণনা করেছেন বিশিষ্ট সাহাবী শারীদ রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন একদিন আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিলো। তিনি আমাকে বললেন উমাইয়া ইবনে আবিস সালাতের কোনো কবিতা কি তোমার মনে আছে? আমি বললাম হ্যাঁ আছে। আমি এক এক করে একশো টি কবিতা শুনালাম। কবিতা শুনে রসুলুল্লাহ তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম মন্তব্য করেন উমাইয়া তো প্রায় মুসলমান হয়ে গিয়েছিল।

আর ও একটা ঘটনা কথা না বললেই নয়। মদীনা জুড়ে চলছে অনাবৃষ্টি, হাহাকার ।সবাই তটস্থ । অনেক মুশরিক লোক রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দোষ দিচ্ছেন।এই লোক টা আমাদের পূর্ব পুরুষের ধর্ম বাদ দিয়ে নতুন করে নতুন ধর্ম শেখাচ্ছেন।এর ফলে আমাদের এই দুর্দশা। আবার অনেক নব‍্যমুসলিম এটাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।এমন যখন অবস্থা তখন একদল সাহাবী নবী সাহেব কে বৃষ্টির জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাই তে বললেন। রসুলুল্লাহ তায়ালা আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করলেন ওমনি সারা মদীনা জুড়ে আল্লাহর রহমত ঝরে পড়তে লাগলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন কবি আবু তালেব এর লেখা কিছু কবিতার কথা স্মরণ করতে লাগলেন এবং সবাইকে বললেন এই সময় আবু তালেব বেঁচে থাকলে দেখে যেতে পারতেন তার কবিতা গুলো কতো কল‍্যানকর ছিল। হয়রত আলী রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বললেন আপনি কি এ কবিতা টির কথা বলছেন__” তার চেহারার শুভ্র দ‍্যূতি দ্বারা বৃষ্টি চাওয়া হয়।সে অনাথদের আশ্রয়স্থল, দুর্বল ও অসহায়ের রক্ষাকবচ।।

হাশেম বংশের লোকেরা তোমার নিকট আশ্রয় চাই, তারা তার কাছে অনুগ্রহের মাহাত্ম্যে ডুবে আছে।।”

আবু তালেব ছিলেন হাশেম বংশের লোক।

রসুলুল্লাহ তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো কখনো কবিতার শব্দ পরিবর্তন করতে বলতেন কবি কে। এক সাহাবী একদিন একটি কবিতা আবৃত্তি করছেন। কবিতাটি শুনে রসুলুল্লাহ বললেন এই লাইন টা পরিবর্তন করে এই শব্দগুলো যোগ করে আবৃত্তি করতে বললেন। কথা গুলো ছিল এই রকম“বার্ধক‍্য ও ইসলাম মানবকে মন্দ কাজ হতে বিরত রাখতে যথেষ্ট”। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম বলেন” ইসলাম ও বার্ধক্য মানব কে মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট”। সঙ্গে সঙ্গে তিনি এ লাইন টা পরিবর্তন করে নেন।। আরও একটি ঘটনা কবি কাআব ইবনে যুহায়ের ইসলাম গ্রহণ করার পর একটি কবিতা রচনা করেন এবং নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে শোনান। কবিতার লাইন টা ছিল এই রকম_”নিশ্চয় রসুলুল্লাহ ছিলেন এমন এক তরবারি,যা দ্বারা আলো পাওয়া যায় , তিনি আল্লাহর ধারালো তরবারি সমূহের মধ্যে অন্যতম কোষমুক্ত তরবারি “

রসুলুল্লাহ তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম ( তরবারি) শব্দের পরিবর্তন করে জ‍্যোতি (নূর )শব্দ টি বসিয়ে দিয়েছিলেন।যার অর্থ হয়েছিল নিশ্চয় নিশ্চয় রসুলুল্লাহ এমন এক জ‍্যোতি যার দ্বারা আলো লাভ করা যায়।

রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের কে কবিতা রচনার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং উৎসাহ প্রদান করেছেন। এমনি কি কখনো কখনো তিনি কাব‍্যিক ভঙ্গিতে কথাবার্তা বলতেও পছন্দ করতেন।

হযরত বারা ইবনে আযিব বর্ণনা করেন আমি আহযাবের যুদ্ধের দিন দেখেছি রসুলুল্লাহ তায়ালা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে সবার সাথে মাটি বয়ে আনছেন। সারা শরীর হয়ে গেছে ধূলাময়। এই অবস্থায় তিনি কাব‍্যিক ভঙ্গিতে বলেছেন __ বাক‍্যগুলো অনুবাদ করলে হয় এই রকম ” আল্লাহর কসম, তিনি যদি না থাকতেন সাথে

না থাকতাম সৎপথে ও সালাত,সাদকাতে।।
নাজিল করুন মোদের উপর শান্তি ও রহমত
শান্তির মোকাবেলায় মোদের করুন দৃঢ়পদ।।”

হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বলেন একদিন পরীখার যুদ্ধের প্রস্তুতিরদিন সকল আনসার ও মোহাজেরগণ মিলে শীতের সকালে পরীখা খনন করছিলেন। সেই সময় রসুলুল্লাহ তায়ালা সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম তাদের কষ্ট ও একনিষ্ঠতা দেখে বলেছিলেন __কথাগুলো এই রকম “আখেরাতের জীবন ছাড়া অন্য জীবন চাই

আনসার আর মোহাজেরদের রহমত কর তাই”।।

সূত্র ঃনেয়ামূল কুরআন
ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ঃ বিবিধ প্রবন্ধ
মোঃ কাশেম আলী ভূঁইয়া ঃ সাহাবীগণের কাব্য চর্চা
মুহাম্মদ মতিউর রহমান ঃ ইসলামী সাহিত্য
……………………………………………

মোহরে নবুয়াত
আসকর আলী ফকির

কী যে আনন্দ বহিছে পরানে
নবীজি এসেছে আজ মসজিদে,
ভাবিতেছে সবে জামাল দেখিয়া
নয়ন ভরিয়া নিবেন গো শোধে।
হায় একি বাণী শুনায় রাসূল
বসে মিম্বরে সবার তরে,
ইহলোক ছেড়ে দিয়াছেন নবী
পরলোক ঠাঁই তার অন্তরে।
শুনে সাহাবির দীল ভাঙ্গিল
বজ্র সমান আঘাত হানিয়া,
আজি হতে হায় কেমনে রইব
আঁধার লাগিছে এই যে দুনিয়া।
আবু বকরের হঠাত কান্না
আকাশ বাতাস বিরহী করিল,
সবাই কহিল থামো হে সাহাবি
কীসের লাগিয়া মন ভাঙ্গিল।
নবীজি ভাষণে দিল উপদেশ
নাহি যেন কেউ প্রভূ যায় ভুলি,
মানিয়া চলিও উম্মত গণ
আমার কউল কোরআন বুলি।
আবু বকর যে কাঁদিয়া চলিছে
শিশুর মতন ঝরনা ধারায়,
নবীজি দেখিয়া কহিল সভায়
থামো গো বন্ধু পরান পুড়ায়।
সকলের তরে কহিল নবীজি
শুধিতে চাহিগো ঋন শেষ বেলা,
স্মরণে আনিয়া কও আজ সবে
করিওনা বাণী কেউ অবহেলা।
সাহাবিরা চোখে চক্ষু রাখিয়া
কহিল হে নবী নাই কোন ঋন,
যাহা আছে প্রাণে আপনার দেয়া
আলোকিত ঐ স্বর্গের দ্বীন।
এক যে সাহাবী এক কোণ হতে
কহিল শুধান আপনার ঋন,
মারিয়াছেন গো আমার পিষ্ঠে
জোরসে চাবুক নবী একদিন।
আজ আমি চাই শুধিতে আঘাত
চাবুক দিয়েই এই মোর আশা,
শুনিয়া অবাক সকল সাহাবি
আক্কাস নাই তোর ভালোবাসা।
মার মার মার আমার পিঠেতে
পাতিয়া দিলাম মোর পিঠ খানি,
তবু তোর মন হতে মুছে ফেল
এক্ষুণি ভাই এ উচ্চারণী।
কৃপন পাষাণ হৃদয় বাঁধিয়া
আক্কাস রয় শপথে গো স্হির,
আঁখির জলেতে সাহাবীরা আজ
কাঁদিয়া কাঁদিয়া বিষে অস্থির।
মুচকি হাসিয়া নবীজি কহিল
নাই সংকোচ নাই কোন ভয়,
আক্কাস তুমি এবার কর হে
তোমার শপথ হিম্মতে জয়।
নির্জন গৃহে ডাকিলেন নবী
চাবুক মারিতে আক্কাস আয়,
সত্যি মারিবে কী আজ চাবুক
সাহাবীরা ভাবে নবীজির গায়।
আক্কাস ছুটে চাবুক হস্তে
হাসিয়া হাসিয়া হৃদে দোলা দিয়া,
আজি হবো চির ধন্য ধন্য
নবীর পিষ্ঠে চাবুক কষিয়া।
নীরব স্তদ্ধ দরবার খানি
হায় হায় রবে চলে কানাকানি,
নবীর সাহাবী আক্কাস আজ
পাষাণে রচিবে ইতিহাস খানি।
নবীজি দিলেন প্রথম খুলিয়া
তাহার দেহের প্রকাশ্য জামা,
ধন্য ধন্য আজি আক্কাস
মোহরে নবুয়াতে দিয়াগো চুমা।
হাসিল সকল বিরহী সাহাবী
নাচিয়া উঠিল নিখিল ধরণী,
তুমি আক্কাস চিরকাল রবে
মানুষের মাঝে অমর স্মরণী।
তুমি গো রচিলে নতুন করিয়া
আশেকী হৃদয় ভালোবাসা দিয়া,
আজিকে আমরা গর্বিত ভাই
মুসলিম জাতি তোমাকে যে নিয়া।
তুমি আজ ভাই সবারে শিখালে
আশেকের প্রেম এমনি গো হয়,
কোনকাল নাহি ঠকিবে পরান
আরশ কুরসি তার জয় জয়।
……………………………………………

নূর নবী
মুহাঃ লোকমান হোসেন

ওগো মোর নূর নবী শ্রেষ্ঠ মানবতার ছবি
তোমার তরে নিখিল জাহান কাঁদে যে আজ অবধি।।
ওগো মোর নূর নবী।

সারা জীবন ভরে নিজেকে উজাড় করে
আমাদের জন্য তুমি কাঁদিলে মায়া ভরে।।
ঐ হাশরের কঠিন দিনে হাউজে কাওছার নিয়ে
থাকবে তুমি মায়ার নবী।
ওগো মোর নূর নবী

উম্মতি ইয়া উম্মতি করূন সেই আকুতি
নসীব যেন হয় গো আমার মন যে কাঁদে দিবা-রাতি।।
অন্ধকার এই জীবনে তুমি যে আলোর বাতি
ওগো মোর নুর নবী।

ওগো মোর নূর নবী শ্রেষ্ঠ মানবতার ছবি
তোমার তরে নিখিল জাহান কাঁদে যে আজ অবধি।
ওগো মোর নূর নবী।
……………………………………………

তোমাকে বড়ো প্রয়োজন
আনোয়ারুল কাইয়ূম কা জ ল

কুল-কায়েনাতের শ্রেষ্ঠ নিয়ামত,
মানবতার মুক্তির দূত-সারোয়ারে দু’আলম।
ঘনঘোর অন্ধকারে অমানিশায় ভ্রান্তি-দ্বিধা-দ্বন্ধ-সংকট-সংশয় ও সঙ্গীন পথে-
হে পূর্ণমার চাঁদ;
তোমার আলোকরশ্মি বড়ো প্রয়োজন।
আধুনিকতার সাইক্লোন-সিডর-আইলা ও সাইমুম ঝড়ে,
এক বিংশশতাব্দীর যুগ সন্ধিক্ষণে জাহিলিয়াতের তিমিরে;
লেলিহান তান্ডবতায় লন্ড-ভন্ড নীতি-নৈতিকতা!
হে উসওয়াতুন হাসানা;
তোমার আদর্শের নমুনা বড়ো প্রয়োজন।
অনাথ ইয়াতীম দুস্থ অসহায় বিধবা মজলুমের হাহাকার,
ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে মানবাধিকার।
নিষ্পেষিত নির্যাতিতের আর্তনাদে কেঁদে উঠা ধরিত্রীর বুকে শান্তির নিশান উড়াতে-
হে সাইয়্যেদুল নাবিয়্যিন;
তোমার শ্যামল-শান্তিছায়া বড়ো প্রয়েজন।
ঘুনেধরা পরিবার পদস্খলিত সমাজ ভ্রান্তির বেড়াজালে আবদ্ধ বিবেক।
গভীর আধাঁর ও মিথ্যার সংক্রমনে নিপতিত গোটা পৃথিবী।
আহলে বাইত-উম্মাহাতুল মুমিনীনের শান্তি-সুখের প্রবাহমান ফলগুধারা গড়তে-
হে সাইয়্যিদুল মুরসালিন-প্রিয় নবীজি;
তোমার খেজুর পাতার হুজরাখানা আর তোমাকে বড় প্রয়োজন।

দুনিয়াব্যাপী জলোচ্ছ্বাস-সুনামী-আগ্নেগিরি-প্লেগ-করোনা মহামারীর সয়লাব
দুর্যোগ দুর্দিনের সে অসহায়ত্বের করুণ অনুররণ হতে
আলোর পথের নাজাতী কাফেলার জান্নাতী অভিযাত্রায়-
হে শেফালী ঝড়া ভোরের রবি-নুরনবী;
তোমার স্নিগ্ধ সৌরভ সুধা বড়ো প্রয়োজন।
বিভীষিকাময় পাপ-তাপ পংকিলতায় নিমজ্জমান অতলান্ত থেকে
হেরার দ্যুতির মর্মবাণী জ্বালিয়ে
আসমান-জমিনের রবের সার্বভৈামত্ব বিধান গড়তে –
হে রাহমাতুলল্লিল আলামীন;
তোমার মু’জেযার শক্তিমত্তা বড়ো প্রয়োজন ।
বদর-ওহুদ-খন্দক পেরিয়ে,খিলাফাত-সালতানাত আর পূণ্যভূমি-জেরুজালেম হারিয়ে,
শহীদি তাজা রাঙা খুনের স্রোতশ্বিনী ফোরাত তীরে বিষাদ কারবালা শেষে-
বহমান ঝর্ণাধারায় গজওয়াতুল হিন্দের শহীদিগায়ে
হে রিয়াদুল জান্নাহর-সাইয়্যেদুল মুরসালিন;
তোমার মহানুভব দিক-নির্দেশনা বড়ো প্রয়োজন।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব-নিপীড়িতের কল্যাণের দিশারি,
সিরাজুম মুনিরা, মোস্তফা চরিত,সিরাতুন্নবী,আর-রাহীকুল মাখকূমের মহানায়ক,
বিশ্বনবী মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লালাহুআলাইহি ওয়াসাল্লাম।
হে ইমামুল মুরসালিন;
মাশরিক-থেকে মাগরিবে-সারাবেলা তোমাকে বড়ো প্রয়োজন।
……………………………………………

হযরত মোহাম্মদ সা.
নূর মোহাম্মদ

মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
আমার নবী
তোমার নবী
শ্রেষ্ঠ নবী
বিশ্ব নবী
সব নবীদের শীর্ষ নবী
তাইতো তাকে মানে সবি।

মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
রূপের জ্যোতি
হিরার জ্যোতি
হুদার জ্যোতি
খোদার জ্যোতি
এই জগতে হেরার মতি
ত্রি ভূবনে সফল অতি।

মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
প্রীতির সেরা
স্মৃতির সেরা
রীতির সেরা
নীতির সেরা
হৃদয় ছিল কোরান ঘেরা
তাইতো তিনি সবার সেরা।

মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
ফুলের হাসি
ঊষার হাসি
মরুর হাসি
ধরার হাসি
পেয়েছে সে প্রভূর হাসি
তাইতো তাকে ভালোবাসি।

মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-
কামলি ওয়ালা
কাওসার ওয়ালা
জান্নাত ওয়ালা
আল্লাহ ওয়ালা
প্রভুর প্রিয় হাবিব ওয়ালা
তাইতো পড়ি দরূদ মালা।
……………………………………………

নবী মোহাম্মদ
হামিদা আনজুমান

ত্রিভুবনের আলোর বাতি
নবী মোহাম্মদ সহায় সাথি
তিনিই দেখান শক্তি সাহস
পেরিয়ে যেতে আঁধার রাতি।

ইসলামেরই ছায়াতলে
এলো সবাই দলে দলে
নবীর কোমল হৃদয় ভূমি
মানবতার কথা বলে।

মরুর বুকে ফোটা সে ফুল
দূর করে দেন অসুন্দর ভুল
আমরা নবীর দিদার পেতে
জিকিরেতে থাকি মশগুল।

আখেরী আর শ্রেষ্ঠ নবী
হাবিব তুমি আল্লাহর রবি
অন্তরেতে সদাই দেখি
আঁকা সেথায় তোমার ছবি।

আমার আপনার উম্মত যারা
সৌভাগ্যবান ধরায় তারা
রোজ হাশরে চাই গো পেতে
আপনার দিদার, শেষ ইশারা।
……………………………………………

মৃগনাভী ঘ্রাণ
জহির সাদাত

প্রেমের পদ্মরাজ হে, মরু বাগী ফুল
তোমার প্রেমে আমার পূর্ণ দুই কুল
আমার প্রেম বাগানে একটি ফুটা ফুল
হে রাসুল, হে রাসুল।
আমার হৃদয় ভরলে তুমি মৃগনাভী ঘ্রাণে
এমনই ছড়িয়েছো ধরার সকল প্রাণে।
ওয়ারছেতে ফুটা তুমি জাফরানী ফুল
এয়াকূতি আবরণে ঢাকলে দুই কুল।

ফটিক স্বচ্ছ চরিত্র তোমার যানজাবীলে ভরা
সানসাবীলে পূর্ণ তুমি হয়নি কভু খড়া
হে রাসুল কামলিওয়ালা রাহমাতুল্লিল আ’লামিন
তোমায় পেয়ে হল আমার পৃথিবী রঙিন।
……………………………………………
প্রিয়তম
মুস্তাফা ইসলাহী

এতিম নবী পান নি আহা! বাবার আদর মায়া বাপ হারিয়ে পেলেন তিনি মা আমেনার ছায়া।
মা ও দাদা চলে গেলে চাচা হলেন আপন কিন্তু তাঁকে ভাবতে শেখায় মক্কার জীবন যাপন।
মক্কাবাসী মগ্ন তখন ভয়াবহ পাপে কন্যা হলে কবর খুঁড়ে মারতো মাটির চাপে।
গোত্রে গোত্রে চলতো ঝগড়া, খুনাখুনি, দ্বন্দ্ব মানতো না এক রবের হুকুম, ভালোবাসতো মন্দ।
ব্যস্ত মানুষ মাদক-নারী-যুদ্ধ-জুয়া-সুদে দাস দাসীরা কঠিন জুলুম সইতো আঁখি মুদে।
জাহেলিয়ার যুগে তুমি দীপ্ত আশার আলো শান্তি এনে করলে দাফন মিথ্যা-আঁধার কালো।
কত জুলুম অত্যাচার আর কষ্ট করে করে ইনসাফপূর্ণ সুখের রাষ্ট্র তুললে তুমি গড়ে।
সবাই পেলো ন্যায় অধিকার, সরল পথের দিশা লাত মানাতের পতন হলো, কাটলো অমানিশা।
দুধে ধোয়া রূপের বরণ যাদুমায়া দেহ তোমার সাথে যায় না রূপে হুর-পরী-ফুল কেহ।
আচার গুণে নিষ্পাপ তুমি, পরিপূর্ণ জ্ঞানে ‘উসওয়াতুন হাসানা’ বলে সকলে নেয় মেনে।
হিংসা-ঘৃণা-অহম -মোহ ধরলো না ঐ তাঁকে শত্রুরা তাই আল আমিন আর সাদিক বলে ডাকে।
গোটা বিশে^র রহমত তুমি ধর্ম বর্ণ সবার পশুপাখি জীব-জানোয়ার গোলাপ-বেলি-জবার।
শুদ্ধতম শিক্ষক তুমি নির্ভুল তোমার শিক্ষা সে হয়েছে পরশ পাথর যে নিয়েছে দীক্ষা।
আবূ বকর, উমর ফারুক, উসমান, আলী হায়দার তোমার বাণী মেনে তাঁরা সফলতার পায় দ্বার।
প্রিয়তম বন্ধু তোমায় দেখার ইচ্ছে জাগে স্বপ্নে এসে দিয়ো দেখা গভীর অনুরাগে।
তোমাকে-ই ভালোবাসি সবার চেয়ে প্রিয় বিচারদিনে চাই শাফায়াত, কাউসার পানি, দিয়ো।
সকল রাসূল নবীর ইমাম দুজাহানের সরদার পরকালে তোমার পাশে জান্নাতে চাই ঘর-দ্বার।
তুমি আমার প্রিয়তম বন্ধু-রাসূল-নবী যখন তখন দুরুদ পড়ি আমি আশিক কবি
……………………………………………

মরুর ফুল
পাঞ্জেরী খন্দকার

সুরভিত হও সেই ফুলের সৌরভে,
যেই ফুল ফুটেছিল মরুর আরবে,
পাপের তিমিরে যখন ঢাকল সমাজ,
আনল নতুন ভোর নব অরুণ সাজ
নত হলো সৃষ্টি রবের সমীপে।

কেটে কেটে পড়ে যায় আঁধারের কাঁচ,
ভেঙে গেল খান খান কিসরার তাজ,
বিনা দোষে দেওয়া হত যাকে কবর,
সেই মেয়ে ফিরে পেল নিজ অধিকার,
অবারিত রহমত বইল ভবে।

পাষাণ ওমর হল সোনার মানুষ,
চুপসে গেল সব রঙিন ফানুস,
জালিম সকল হল শান্তি নায়ক,
মরু বেদুঈন হলো ধরার শাসক,
সুহাসিনী ভোর এল কুল মাখলুকে।

ফুলের পরাগ পুনঃ মাখলে গায়ে,
কাঁদাও সুরভিত যাবে হয়ে,
পরশ পাথর গায়ে ছুঁয়ে দিলে,
পাষানের বুকে সোনা উঠবে জ্বলে,
সোনালী জরিন জীবন পাবে সবে,
সুরভিত হও সেই ফুলের সৌরভে।
……………………………………………

পরশ পাথর
এরফান আলী এনাফ

তামাম জাহান দীপ্ত যাঁর আগমনে আলোকিত
যাঁর আগমনে হলো বিদূরিত সব আঁধিয়ার
অসহায় মজলুম পেলো সব কিছু অধিকার
আঁধার ধরা আলোয় ভেসে হলো যেন পুলকিত।
যাঁর আগমন পথ চেয়ে, নিপীড়িত মানবতা
হে-রাসুল(সা,) আলোকিত করে দিলে মরুর আকাশ
এ-বসুধা পেলো তার স্বর্ণ-যুগ সাম্যের আভাস
লুপ্ত হলো জাহেলী যুগের-পাশবিক বর্বরতা ।
কোরানের দীপ হাতে তুমি ঠায় পৃথিবীর তটে–
দাঁড়ালে হে-জ্যোতির্ময়ী পূন্যজ্যোতি সুষমাজোয়ারে
অন্তরাল আঁধারের বুক চিরে আলোর দুয়ারে
আদর্শ পরশ পেলো ধীরস্থির মানবিক পটে ।
অশান্ত ধরণী মাঝে বিছালে যে শান্তির চাদর
মৃত্তিকা হলো যে সোনা তুমি খাঁটি পরশ পাথর।।
……………………………………………

মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ স.
আনিছুল ইসলাম বিপ্লব

মু – মুসলিম উম্মাহর নয়নমণি রাসুল তুমি,
হা – হাজার শিক্ষা তোমার হাদিস পাইগো চুমি।
ম – মন মানে না তোমায় নিয়ে কোনোই ফান,
মা – মানবো না কেউ তোমায় ঘিরে অপমান।
দু – দু’জাহানের মালিক তোমায় বাসেন ভালো,
র – রহম করম দিল্ থেকে তাই দরদ ঢালো।
রা – রাহমাতুল্লিল্ আ’লামীন ওই নামেরই সাথে,
সু – সুখে দুঃখে তোমায় খুঁজি সকল দিবা-রাতে।
লু – লুকিয়ে রাখি কষ্টগুলো বুকের মাঝে সবে,
ল – লওগো সালাম প্রতিক্ষণে প্রতিটি উৎসবে।
লা – লা-ইলাহা’র পরেই দেখি নামটা মিশে আছে,
হ্ – হজ্ব ও উমরায় যাই ছুটে যাই তোমার কাছে।
……………………………………………

বিশ্বনবী
সুলাইমান মাহমুদ রাসেল

মরুর বুকে মহান পুরুষ দিগন্তময় মুহাম্মদ
মা আমিনা নাম রেখেছেন পুত্র প্রিয় আহমদ।
পিতহারা পুত্র এমন এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধন
তাঁর নামেতে খুশবু ছড়ায় পবিত্র হয় সমীরণ।
আল্লাহ তায়ালার হাবিব যিনি জন্ম ধরার বুকে
সারাজাহান আনন্দে মাত আগমনের সুখে।
নবুওয়াতির সংবাদে সব নবীর প্রেমে পড়ে
নবী বিনে কঠিন হবে রোজ হাশরের দিনে।
কি মায়াবী সুরত যে তার কত মধুর বাণী
পাক কুরআনে শুনি সেসব অল্পই তার জানি।
কন্ঠ এমন হয়নি কারো নেই জমিনে তাই,
মক্কাবাসী পাগল হল কোথায় তাকে পাই।
ঘরছাড়া হয় বাড়ি ছাড়ে শান্তি কিসে মিলে
প্রিয়নবীর সামনে এলে ঈমান জাগে দিলে।
তাঁর চেহারায় অপূর্ব রূপ চোখ জুড়িয়ে যায়,
এমন সুরত এই দুচোখে সুপ্ত মনের বাগিচায়
সারাটিক্ষণ প্রেম দিওয়ানা বিশ্বনবীর ভাবনায়।

সুলাইমান মাহমুদ রাসেল
রাজাপুর ঝালকাঠি।
……………………………………………

নবী মুহাম্মদ সা.
মোহাম্মদ ইমাদ উদ্দীন

বিশ্ব যখনি অজ্ঞতা, অনাচার
কত কুসংস্কারে নিমজ্জিত।
মানবতার মুক্তির বার্তা নিয়ে,
মা আমেনার কোলে তখনি
আগমন করেন নবী মুহাম্মদ (সা)।
সৃষ্টি যদি তাঁকে না করত খোদা তাআলা,
সৃষ্টিই না হয়ত এই বিশ্ব জাহান।
হলেন যিনি সৃষ্টি জগতের সেরা,
মানবতার মুক্তি ও শান্তি স্থাপনে
করে গেছেন বিরল দৃষ্টান্ত।
কে ধনী, কে গরীব?
কে হাবশী গোলাম, কে কুরাইশ?
নেই কোনো ভেদাভেদ।
এই মর্মে ঘোষণা দিলেন যিনি,
তিনিই নবী মুহাম্মদ (সা)।
……………………………………………

আশেকে রাসূল হয়রত মুহম্মদ সা.
পারভীন আকতার

প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ সা আমাদের,
শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ইহকাল আর পরকালের।

হযরত জিব্রাইলের (আঃ) ওহী শিক্ষাদানে,
কঠোর পরিশ্রমে আসীন তিনি উচ্চাসনে।

কষ্টের দেখা তাঁর জীবন প্রারম্ভকালে,
এতিম হয়েছেন সেই কখন শিশুকালে!

চরম দূর্দিনে কেঁদে বুক ভাসালেও,
কারো ক্ষতি করেননি ক্ষণকালেও।

মোহহীন নির্লোভ নিরহংকারী নেতা,
ধর্ম প্রতিষ্ঠায় ছিল সম্প্রীতি ও একতা।

ধর্ম প্রচারে শত কষ্ট যাতনা সইয়ে গেছেন,
কঠিন মসিবত সংকটে ধৈর্যধারণ করেছেন ।

শিশুকালেই আল আমিন উপাধি পেয়েছেন,
শ্রেষ্ঠত্বের মুকুটে সেরা আমানতকারী হয়েছেন।

খোদার স্বয়ং শিক্ষা দীক্ষায় তিনি বুঝেছেন,
সর্বক্ষণ অন্তরে মায়া ভালোবাসা পুষেছেন।

কেউ বলতে পারবে না জোর করেছেন,
ইসলাম পালনে বাধ্য কাউকে করেছেন।

আল্লাহর বাণীর মর্ম কথা শুনিয়েছেন,
দলে দলে লোক ইসলামে এসেছেন।

আমাদের নবী (সাঃ) প্রকৃত একজন ধার্মিক,
আমরা কেন হয়েছি আজ তবে বকধার্মিক?

ইসলাম শান্তির ধর্ম গবেষকরাও সদা বলেন,
পবিত্র কোরআন ও হাদীস মতে যদি চলেন।

প্রিয় নবী (সাঃ) দেখেছেন আরশে খোদাকে,
বেহেশত দোজখ দেখলেন নিজেই স্বচক্ষে।

শানে রাসূল (সাঃ) অতীব ধর্মপ্রাণ ছিলেন,
আল্লাহ আমাদের তাঁর উম্মত সৌভাগ্য দিলেন।

রাজপ্রাসাদে থাকা কেউ অনুকরণীয় নয়,
কুঁড়ে ঘরে তপস্যায় আল্লাহকে কর জয়।

ধর্মের হানাহানি যুদ্ধ-বিগ্রহ কখনোই কাম্য নয়,
প্রিয় নবীর (সাঃ) জৌলুশে এই কর প্রত্যয়।