“তোমরা যেই হও, এসো, এসো
পথচারী, প্রার্থনাকারী, চলে যেতে আগ্রহী
যেই হও, তোমরা এসো।
আমাদের আশ্রয় হতাশার সরাইখানা নয়
এসো, যদিও তুমি শতবার ভঙ্গ করেছো
নিজের প্রতিজ্ঞা
তবুও এসো, আবার চলে এসো।”

সত্যের অনুসন্ধানীদের উদ্দেশ্যে হযরত জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) আহ্বান উপরে উল্লিখিত কবিতায় খুবই সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। জালালুদ্দীন রুমি (রঃ) ইসলামের ইতিহাসে একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সুফী কবি হিসেবে স্বীকৃত, যিনি ১২০৭ সাল থেকে ১২৭৩ সাল পর্যন্ত জীবিত থেকে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে যা দিয়ে গেছেন, তার প্রতিটি ধর্মের আধ্যাত্মিক চেতনার অনুসারীদের আকৃষ্ট করেছে শত শত বছর ধরে।
‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি সম্পাদনা ও পুনঃলিখনের কাজ করেছেন প্রফেসর এ জে আরবেরী Prof A.J Arberry এবং এই বইটি ইংরেজীতে প্রকাশিত হয় ১৯৬১ সালে। আর এই গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ করেছেন আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। প্রকাশ করেছে ঢাকা থেকে ‘লেখালেখি’ ২০১০ সালে। রুমীর ছবি দিয়ে চমৎকার সুসদৃশ প্রচ্ছদ পাঠক্রমে সব সময় বেশ আকর্ষণ করে। ২৪৬ পৃষ্ঠায় লিখিত ‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি সুফী সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
রুমীর সংলাপের মূল পান্ডুলিপির সঙ্গে বর্তমান অনুদিত গ্রন্থের তুলনা করলে প্রথমে যে পরিবর্তনটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে তা হচ্ছে সাধারণ যে বাণীগুলো যেমন আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন এবং তাকে শান্তি দিন, বিশেষত: কোন দরবেশ বা কোন নবীর নাম উল্লেখ করার পর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রুমীর সমসাময়িককালে তাদের নামের সাথে এ ধরনের উচ্চারণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য স্বাভাবিক ছিল এবং এখনো বিশ্বের কিছু কিছু অংশে তা আচরিত।

রুমীর সংলাপের মূল পান্ডুলিপির সঙ্গে বর্তমান অনুদিত গ্রন্থের তুলনা করলে প্রথমে যে পরিবর্তনটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হবে তা হচ্ছে সাধারণ যে বাণীগুলোযেমন আল্লাহ শান্তি বর্ষণ করুন এবং তাকে শান্তি দিন, বিশেষত: কোন দরবেশ বা কোন নবীর নাম উল্লেখ করার পর ব্যবহার করা হয়েছে, যা রুমীর সমসাময়িককালে তাদের নামের সাথে এ ধরনের উচ্চারণ শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য স্বাভাবিক ছিল এবং এখনো বিশ্বের কিছু কিছু অংশে তা আচরিত।
এছাড়া রুমী অনেক স্থানে কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেছেন এবং আলোচনার সময়ে প্রায় আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। রুমীর শ্রোতারাও যেহেতু ভালভাবে কোরআন জানতেন, অতএব, এ ধরনের উদ্ধৃতি সুপরিচিত ছিল এবং প্রসঙ্গক্রমে ব্যক্তিগত বিষয়গুলো উঠে আসতো। কিন্তু বহু পাঠকের কাছেই এই গ্রন্থ তেমন পরিচিত নয়।
রুমী তার চিন্তা, চেতনা এই গ্রন্থে অত্যন্ত সুন্দরভাবে পাঠকের জন্য বিশেষ করে তাঁর অনুসারীদের জন্য বর্ণনা করেছেন। এমনকি রুমী আজও আমাদের মৌলিক ধ্যান ধারণার অনেক কিছুকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং আমরা তা কোনভাবে বুঝতে পারি না। বিশেষ করে আমরা যদি সতর্ক না হই। কালের বিবেচনায় উত্তীর্ণ নয় অথবা সেকালের বিবেচনা করে কোন ধ্যান-ধারণাকে ভুল করে প্রত্যাখ্যান করা অত্যন্ত সহজ। অথবা যেগুলো অতি প্রচলিত মনে হয় অথবা খোঁড়া অভিমত মনে হয় সেসব সম্পর্কেও একই বক্তব্য প্রযোজ্য এখানেআমাদেরকে রুমীর উপনীত উপসংহারের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, কারণ একই ভুল করার কারণে তিনি আমাদেরকেও সনাক্ত করবেন।
যেমন রুমীর সংলাপ গ্রন্থের দ্বাদশ সংলাপে রুমী প্রশ্ন করেছেন কোন দরবেশ, যিনি আল্লাহর গোপন রত্ন (আধ্যাত্মিক ঐশ্বর্য) পরে বেড়াচ্ছেন, তিনি যদি কাউকে আঘাত করে তার নাক, চোয়াল ভেঙ্গে দেন, তাহলে সেক্ষেত্রে ভুলটা কার? রুমী দাবি করেন যে, ভুল দরবেশের। ‘যেহেতু দরবেশ আল্লাহর প্রেমে মত্ত, সেক্ষেত্রে তার কোন কাজ প্রকারান্তরে আল্লাহর কাজ। কিন্তু আল্লাহ ভুল করতে পারেন, এমনটি হতে পারে না।’
নিজের কাজের জন্য যে কেউ আল্লাহকে দোষারোপ করতে পারে, কিন্তু রুমীর কথাগুলো পাঠ করে দেখা যায় যে তিনি কখনো সহিষ্ণুতাকে প্রশ্রয় দেয়ার মতো কিছু বলেননি। তিনি বলেছেন, কিভাবে কোন কাজ সঠিক বা ভুল হতে পারে। ভাল বা মন্দ হতে পারে। ভুল বা সঠিক সম্পর্কে আমাদের সাংস্কৃতিক ধারনার গভীরে দৃষ্টি দিতে বলেছেন তিনি। যার মধ্যে নিহিত আছে আল্লাহ ইচ্ছার যথার্থ কারণ।
আলোচ্য গ্রন্থে রুমী বলেন, “এই সমগ্র পৃথিবী একটি বাড়ি ছাড়া আর কিছু নয়। আমরা যদি এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে যাই অথবা এক কোনা থেকে আরেক কোণায় যাই, তাহলে কি আমরা একই বাড়িতে বাস করি না? কিন্তু দরবেশেরা আল্লাহর রত্ন ধারণ করেছেন, তারা এই বাড়ি ছেড়ে আরও দূরে চলে গেছেন। মহানবী মুহাম্মদ সা. বলেন, ইসলামের সূচনা আগন্তুক হিসাবে এবং যেভাবে শুরু হয়েছিল অনুরূপ আগন্তকের মতোই ফিরে যাবে।”
এভাবেই রুমীর কথাগুলোও সময়োত্তীর্ণ হয়ে আসে এবং আমাদেরকে বলে, “তুমি কি এটা গ্রহণ করতে পার যে আল্লাহর সত্যিকার একজন প্রেমিক আল্লাহর কর্তৃত্বের অধিকারী? তুমি দেখতে পার, তারা যারা বহন করে সে কারণেই তারা সব সময় এই পৃথিবীতে আগন্তুক হিসাবে থাকে?” তাহলে কে সময়োত্তীর্ণ? অবশ্যই এমন যে কেউ যিনি তাদের সময়ের সংস্কৃতি দ্বারা আবদ্ধ। এমন যে কেউ বড় কিছু দ্বারা আলোড়িত।
আমরা যদি দেখতে পাই যে এখানে কি ঘটেছে, তাহলে আমরা দেখবো রুমী অপরীক্ষিত বিতৃষ্ণা ও অপছন্দগুলোকে ব্যবহার করেই আমাদেরকে শিক্ষা দেন। রুমীর কিছু গভীর ভাব সম্বলিত কবিতাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে এ ধরনের কন্টকের কারণে, যার ফলে তিনি পয়ত্রিশতম সংলাপে বলেছেন, “আল্লাহ মতে চমৎকারভাবে তাদের উপর সীলমোহর লাগিয়েছেন, যারা শ্রবণ করে, কিন্তু কিছু বুঝে না। তারা যুক্তিতর্ক করে, কিন্তু কিছুই শেখে না। আল্লাহ কত মহৎ ও উদার। আল্লাহর ক্রোধও বিশাল, এমনকি তিনি যে সীলমোহর করে রাখেন তাও মহৎ।”
কিন্তু সীলমোহর প্রকৃতপক্ষে সীলমোহর ছাড়া অবস্থার তুলনায় কখনো কিছু নয়। কারণ, এর মহিমা- বর্ণনাতীত ব্যাপার।
একইভাবে রুমী যখন ইসলামের উল্লেখ করেছেন, তখন তিনি আসলেই পথের কথা বলেছেন। বর্তমানে মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে আগের থেকে স্থিরকৃত যে ধারণা বিদ্যমান রুমী সেভাবে ইসলাম প্রসঙ্গে আলোচনা করেননি। তিনি আধ্যাত্মিক পথ ও ধর্মীয় ঐতিহ্য বোঝাতে ইসলামকে প্রয়োগ করেছেন। রুমী যাবোঝাতে চেয়েছেন তা উপলব্ধি করা সব সময় সহজ নয়, ঠিক রুমী নবী ও আল্লাহর কণ্ঠ হিসেবে মুহাম্মদের উল্লেখ করেছে, তাকে খুব সহজে প্রচলিত বিশ্বাস হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, যা বাহিরের আলখেল্লা মাত্র, আসলে রুমী যা বলেছেন। এটি শুধূ এই ধরনের অন্ধত্ব যা তিনি তার সত্তর নম্বর সংলাপে উল্লেখ করেছেন, “যেখানে কোন পুরুষ নারী বড় একটি তালা লাগায়, সেখানে যেমন মুল্যবান কিছু আছে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সাপ যেমন গুপ্তধন পাহারা দেয়, মানুষের কদর্মতা বিচার করে না, বরং তাদের সম্পদের গুরুত্ব বিচার করে।”
রুমীর সবচেয়ে বিখ্যাত কাজ, তার ছয় খন্ড বিশিষ্ট কাব্য মসনবী। অন্য কথায় ‘ফিহি মা ফিহি’ মসনবীর অর্থের ব্যাখ্যা, যা উপলব্ধির চাবিকাঠি। দুটি কাজই একটি আরেকটির সমান্তরাল। যাতে রয়েছে অনেক বিষয় ও কাহিনী, যা একটির সাথে আরেকটি জড়িত। এটি যদি সত্য হয় তাহলে অত্যন্ত বিস্ময়ের ব্যাপার যে ‘রুমীর সংলাপ’ অধিক মনোযোগ আকৃষ্ট করেনি। এটি গ্রন্থের নামের একটি হলেও কোনভাবেই অতি গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর এক পর্যায়ে ‘ফিহি মা ফিহি’ আমাদেরকে বলে দেয় আমরা যাতে এর যা গুরুত্ব তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব না দেই। এটিকে উচ্চ ধর্মীয় বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদিত করা হয়নি, অথবা বিশেষ কোন কর্তৃত্বের কথাও বলা হয়নি। রুমী শুধু চেয়েছেন যাতে আমরা দেখি যে এর মাঝে আসলে কি রয়েছে, তিনি চেয়েছেন আমরা যাতে আবেগের দিক থেকে সৎ থাকি এবং অবয়ব দ্বারা বিমোহিত না হই। অন্য কথায় ফুলদানির সৌন্দর্য্যে খুব বেশি আকৃষ্ট হয়ো না, এটি শুধু মাত্র গোলাপকে ধারণ করার জন্য। একই সময় ‘ফিহি’ আল্লাহকেও উল্লেখ করে। অতএব, আল্লাহ হচ্ছেন যিনি আল্লাহ। এটি মুসলমানেরা সব সময় কালিমা তাইয়্যেবাহ উচ্চারণ করে যাকে ‘আল্লাহ ছাড়া কোন রব নেই, তার অনুরূপ। অন্য কথায়, রুমী প্রশ্ন করেন, “এর চেয়ে আর বেশী কি বলার আছে?” সকল শব্দ, সকল কাহিনী এবং ব্যাখ্যায় এর চেয়ে বেশি কিছু বলা হয়নি। বাস্তবতার বড় বাস্তবতা আর কিছু নেই। আল্লাহ আছেন, বাস্তবতাও আছে। ‘ফিহিকে মা ফিহি’তে ব্যাখ্যা করা কঠিন, শব্দ দিয়ে প্রকাশ সম্ভব নয়।
‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থে অনুবাদক ভূমিকায় অতি সুন্দরভাবে মূল গ্রন্থের বিষয় সম্পর্কে পাঠকের জন্য অতি চমৎকারভাবে বলেছেন, “রুমী শুধুমাত্র শিক্ষণীয় কাহিনী বর্ণনা করেননি অথবা তার দার্শনিক ও ধর্মীয় উপলব্ধিকে তুলে ধরেননি, বরং তার ব্যবহৃত শব্দাবলী যে মর্ম বোঝাতে চেয়েছে তাই তুলে ধরেছেন। সুফীরা যেমন প্রায়ই বলে থাকেন, বাহিরে থেকে এই বিষয়গুলো উপলব্ধি করা যায় না, বরং ভিতর থেকে আবিষ্কার করতে হয়। সন্দেহ নেই যে এ ধরনের বক্তব্য মতানৈক্য সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদেরকে রুমীর নিজস্ব সংলাপের প্রতি লক্ষ্য করতে হবে এ ব্যাপারে তার মতামত জানার জন্য। রুমী তাদেরকে বারবার সমালোচনা করেছেন, যারা বাইরে থেকে কোন কিছুকে দেখে এবং অন্তর্নিহিত সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়।
এটাই সম্ভাব্য যে রুমীর সংলাপ শুধুমাত্র তাদের ক্ষেত্রেই আবেদন রাখবে, যারা তার শব্দ যথার্থভাবে বুঝতে চেষ্টা করবে। কিন্তু পাঠক যদি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে তার কবিতা পাঠ করতে চান তাহলে তারা নিজেদের জীবনের সাথে রুমীর সম্পর্ক খুঁজে পাবেন এবং প্রেমের পথের সাথে তার মাদকতাময় ঘনিষ্ঠতার সন্ধান লাভ করবেন।”
‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থের প্রতিটি পাতায় পাতায় রুমীর জ্ঞানের গভীরতার পরিপূর্ণ বর্ণনা বিরাজমান। সকল মানুষ সহজ মনে, সহজ অর্থে রুমীর সংলাপর বিষয় উপলব্ধি করা কঠিন। তাই পাঠকে রুমীর চিন্তার গভীরতায় প্রবেশ করতে হবে। বুঝতে হবে। পড়ে পড়ে চিন্তা করতে হবে।
রুমীর সংলাপ গ্রন্থের চৌষটিতে যে বক্তব্য দিয়ে হযরত মাওলানা জালালুদ্দীন রুমী (রঃ) পাঠকের উদ্দেশ্যে বলেন তা তোলে ধরে রুমীর সংলাপ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করছি। রুমী বলেন, “এ পৃথিবীতে গবেষণা ও পরীক্ষা নিরীক্ষা করে লব্ধ প্রতিটি বিজ্ঞানই দেহ বিষয়ক বিজ্ঞান। মৃত্যুর দ্বারা অতিক্রম করে অর্জিত যে বিজ্ঞান সেটি হচ্ছে আত্মার বিজ্ঞান। ‘আমি আল্লাহ’ এই বিজ্ঞান সম্পর্কে জানা হচ্ছে দেহের বিজ্ঞান। কিন্তু ‘আল্লাহ হওয়া’ হচ্ছে আত্মার বিজ্ঞান। প্রদীপের আলো ও আগুন দেখা দেহের বিজ্ঞান, আর সেই প্রদীপের শিখার প্রজ্বলিত হওয়া আত্মার বিজ্ঞান। যা কিছু অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জিত হয় তা আত্মার বিজ্ঞান, আর যা কিছু জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে অর্জিত তা দেহের বিজ্ঞান।”
অপরূপ ভাষা শৌলে সমৃদ্ধ ‘রুমীর সংলাপ’ গ্রন্থটি বাংলা ভাষাবাসীদের জন্য একটি অসাধারণ অনুবাদ গ্রন্থ। যা সব সময় হৃদয়কে আন্দোলিত করে, মোহিত করে। যেমন রুমী তার সংলাপ একাত্তরে বলেন, “ডানাসহ পাখি এবং আল্লাহর প্রেমিকদের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, পাখি সব সময় একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উড়ে যায়। আর আল্লাহর প্রেমিকেরা তাদের আকাক্সক্ষা বা ইচ্ছার ডানায় ভর করে উড়ে যায সকল দিকে।”