রূপ সাগরের তীরে রূপমালার দেশ। সাগরের তীরের রূপমহলে রূপমালাদের প্রাসাদ। প্রাসাদ উদ্যান ফলফুল বৃক্ষরাজিতে ঘেরা। পুষ্পকাননে কত রকমের রঙবেঙের পুষ্পে সুশোভিত। রঙরেঙের প্রজাপতি আর মধুমক্ষিকাদের এ ফুল থেকে ও ফুলে উড়াউড়ি! পুষ্পকাননের মাঝে জলের ফোয়ারা। ফেয়ারা জলাধারে রঙিন মাছ সাঁতার কাটে। রূপমালার পিতা শিলাদিত্য ও মাতা ফুলমালা তাদের একমাত্র কন্যার সুখের জন্য পুষ্পকাননে কোন কিছুর ঘাটতি রাখেননি। দোলনা থেকে আরম্ভ করে নাগরদোল পর্যন্ত তৈরি করেছেন পুষ্পকাননে। রূপমালা এক পায়ে দু’পায়ে হাঁটতে শিখেই পুষ্পকাননে সেই যে লুকোচুরি খেলা শুরু করেছিল তা আজও তেমনি চলছে। রূপমালার সইদের! উজির কন্যা প্রিয়মতি,কোটাল কন্যা সুমতি আর নগরপাল কন্যা লীলাময়ী সবচেয়ে প্রিয় সখী রূপমালার।

সাগরের ওপারে বসন্ততিলক রাজার দেশ। বসন্ততিলক রাজার দেশ চির বসন্তের দেশ। বজ্রবাহন চির বসন্তের দেশের রাজকুমার। চির বসন্তের দেশের সবাই শুধুমাত্র গান বাজনায় মশগুল থাকে। রাজা বসন্ততিলক ও রাণী ঐশ্বর্যবতী তাদের একমাত্র ছেলেকে গান বাজনায় ওস্তাদ করার জন্যে দেশের সজ্ঞীতের বড় বড় ওস্তাদ দিয়ে তালিম দিয়েছেন। সব সময় গান বাজনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে বজ্রবাহনের মোটেই ভাল লাগে না। তার ইচ্ছে হয় পক্ষীরাজ ঘোড়া ছুটিয়ে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে কিংবা সাগরের বুকে সপ্তডিঙা ভাসিয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে যেতে। কিন্তু উপায় তো নেই!

বজ্রবাহনের বিয়ের বয়স হওয়ায় বসন্ততিলক ও রাণী ঐশ্বর্যবতী বড়ই চিন্তিত। রাজারাণীর ইচ্ছে অন্য একটা চির বসন্তের দেশের রাজকন্যার সঙ্গে বজ্রবাহনের বিয়ে দেওয়ার। বজ্রবাহনে মাতা রাণী ঐশ্বর্যবতী হিরক সাগর কূলের চির বসন্তের দেশের ঐশ্বর্যরাজ্যের রাজকুমারী। রাজকুমার বজ্রবাহনের বিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য কোন এক চির বসন্তের দেশের রাজকুমারীর খোঁজে রাজা বসন্ততিলক দেশ দেশান্তরে ঘটক পাঠালেন। এদিকে বজ্রবাহন তার মাতাকে জানিয়ে দিলেন, চিরবসন্তের কোন দেশের কোন রাজকুমারীকে বিয়ে করার ইচ্ছে তার নেই। দেশে যদি নানা ঋতুর বৈচিত্র্যই না থাকে তবে চির বসন্তের কোন মূল্য আছে! আঁধার না থাকলে আলোর মূল্য কেউই বুঝতো না। এ খবর রাজকুমারের বাবা বসন্ততিলকের কানে যেতে তিনি তো ছেলের উপর রেগে অগ্নিশর্মা হলেন। বাবার উগ্রমূর্তি দেখে বজ্রবাহন তো বড় ভাবনায় পড়ল। অনেক চিন্তা ভাবনা করে সে বুঝলে, বাবাকে শান্ত করে নিজের মনোবাসনা পূরণ করতে হলে রাজ বিদুষক বুদ্ধিলোচনের শ্মরণাপন্ন হতে হবে। তা করতে হবে অতি সংগোপনে।

যেমন চিন্তা তেমন ভাবনা। পরদিন সকালেই রাজকুমার বজ্রবাহন একাই রাজ বিদুষক বুদ্ধিলোচনের বাড়ির উদ্দেশ্যে হেঁটেই রওনা দিল। রাজবাড়ি থেকে রাজ বিদুষক বুদ্ধিলোচনের বাড়ি যেতে তেপান্তরের বন পেরোতে হয়। রাজকুমার তেপান্তরের বনের মাঝামাঝি গেলে বনের ভেতর থেকে দুটো অপূর্ব সুন্দরী মেয়ে বের হয়ে আসতে দেখে তিনি তো হতবাক! রাজকুমার ভাবল, তেপান্তরের বনে পরীর মতো দেখতে দুটো সুন্দরী মেয়ে কোথা থেকে আসবে,এরা পরী না হয়ে পারে না! কী আশ্চর্য্! মেয়ে দুটো তার পথ আগলে দাঁড়ায়ে বলল, ‘তোমাকেই তো খুঁজতেই আমরা বেরিয়েছি, আমরা তোমার মনবাসনা পূরণ করবো।’পরীর মতো চেহারার মেয়ে দুটোর কথা শুনে রাজকুমার বলল,‘তোমরা আমার মনবাসনার কথা জানলে কেমন করে , তোমাদের পরিচয়ই বা কী!’
‘আমরা রূপমালার পুষ্পকাননের ফুল ফুটাই, কোকিল ডাকাই। আমরা রূপমালার সখী। আমাদের সঙ্গে এসো তোমাকে রূপমালার দেশে নিয়ে যাই।’রাজকুমার বজ্রবাহনকে ইতস্তত করে মুখ নিচু করে থাকতে দেখে তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, ‘চোখ তোল গো রাজার কুমার।’
বজ্রবাহন চোখ তুলে ওদের দিকে তাকিয়ে তো অবাক। মনে মনে বলল, এরা তো দেখছি ফুলকুমারী, চারদিকের গাছে গাছে এত ফুল কোথা থেকে এলো।
‘এবার বিশ্বাস হলো তো আমরা কে, কুমার বাহাদুর ?’
বজ্রবাহনের নাকে এক এক সময় এক এক রকমের সুগন্ধ এসে লাগছে। মহুয়া , স্বর্ণ চাপা, আর অজানা এক ফুলের উগ্র গন্ধের মাদকতায় বজ্রবাহন মেয়ে দুটো কোলের উপর এলিয়ে পড়ে যেন ঘুমিয়ে পড়ল।

এক সময় রাজকুমার বজ্রবাহন চোখ খুললেন। তার কিছুই মনে পড়ছে না। তিনি ভাবলেন, আমি কোথায় শুয়ে আছি। কীভাবে আমি ফুলের ঘরে ফুলের বিছানায় এলাম। একে একে সব কথা বজ্রবাহনের মনে পড়তে লাগল। তিনি ভাবলেন, ওই পরী দুটোরই কাজ এটা। তবে তাদের তো কোথায়ও দেখছি না।
‘আমরা এসে গেছি, তুমি তো আমাদেরকে দেথতে চাইছিলে, তাই না?’ তাদের কথা শুনে রাজকুমার অবাকের পর অবাক। তার মনটা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। তবে কী এরা ডাইনীটাইনী হবে! মনের কথা ওরা কেমন ঠিক পাচ্ছে এটাই বিস্ময়ের ব্যাপার।
‘ না , না আমরা ডাইনীটাইনী নই। আমরা রাজকুমারীর সখী তাতো আমরা তোমাকে আগেই বলেছি।’
‘তবে আমি এখন কি রূপমালা দেশে, এটা কি চির বসন্তের দেশ?’
‘না গো না এটা ঋতুচক্রের দেশ। তবে আমরা ইচ্ছে করলে রূপমালার দেশকে চির বসন্তের দেশ বানিয়ে দিতে পারি, আবার ইচ্ছে বর্ষা, শরৎ কিংবা শীতের দেশও বানিয়ে দিতে পারি।’
‘তোমাদের তো বেজায় ক্ষমতা!’ওদের কথা শেষ হতে না হতেই রাজকুমার জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল বাইরে রিমঝিম বৃষ্টি পড়ছে।
‘ সত্যি সত্যি তোমাদের অদ্ভুত ক্ষমতা! এমন দেশের রাজকুমারীকে খুঁজছি। আর বাবা মা খুঁজছেন চির বসন্তের
রাজকুমারী!’ ‘ আমরা সব কিছু জানি গো। ঘটক গিরিধারী ঘটক পুষ্পকাননের চির বসন্ত দেখে গিয়ে তোমার বাবা মাকে রাজা বসন্ততিলকে নিশ্চয়ই রূপমালার দেশের কথা বলেছে। এবার তুমি ফিরে গিয়ে রূপমালার দেশের রাজকুমারী রূপমালাকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেলে ঠকবে না কিন্তু।’তাদের কথা শুনে বজ্রবাহনের মনে ইচ্ছে জাগল, এক পলকের জন্য রূপমালাকে দেখতে পারলে- মনের ভাবনা মনেই আছে ! বজ্রমোহন হঠাৎ করে দেখল তেপান্তরের মাঠে আগের মতো দাঁড়িয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে তার সব কথা ভেসে উঠল। এবার খুশি মনে রাজবাড়ির দিকে ফিরে চলল। এবার রাজকুমার ব্রজবাহন গিরিধারী ঘটকের কথায় রাজি হয়ে ভাবলেন বাবা মা’র ইচ্ছেও পূরণ হল, আবার আমার বাসনাও মিটল।