রমজান মাস কুরআন নাজিলের মাস, শবে কদর কুরআন নাজিলের রাত। এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার জাবালে নূর, তথা হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের সরদার হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে বিশ্ব নবী হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এর প্রতি মহাগ্রন্থ আলকুরআন অবতীর্ণ হয়।
কুরআন মাজীদে ‘কদর’ নামে স্বতন্ত্র একটি সূরা রয়েছে। মহান আল্লাহ তা‘আলা এ সূরার মাধ্যমে শবে কদর বা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব অল্প কথায় বুঝিয়ে দিয়েছেন।
আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ এর ফারসি হলো শবে কদর। অর্থ সম্মানিত মর্যাদাপূর্ণ ও মহিমান্বিত, সম্ভাবনাময়, ভাগ্যনির্ধারণী রজনী।
মুহাদ্দিস ইবনে আবি হাতেম র. তাফসিরের ইমাম মুজাহিদ র. থেকে বর্ণনা করেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন সাহাবায়ে কেরামে বৈঠকে বনি ইসরাইলের এক মুজাহিদের কথা উল্লেখ করেন। ওই মুজাহিদ এক হাজার মাস নিরবচ্ছিন্নভাবে আল্লাহ তা‘আলার সাধনায় লিপ্ত ছিলেন। এ কথা শুনে সাহাবায়ে কেরামের আফসোস হয় যে, এক হাজার মাস অর্থাৎ ৮৩ বছর ৪ মাস তো এ যুগের অনেকে জীবনও পায় না! তাই হযরত মুসা আলাইহিস সালামের উম্মত বনি ইসরাইলের মতো এত অধিক সাওয়াব লাভের অবকাশও উম্মতে মুহাম্মদীর নেই। সাহাবায়ে কেরামের এ আফসোস-অনুশোচনাকালে হযরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন মাজীদের সূরা কদর নিয়ে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে আগমন করেন।
‘‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন নাজিল করেছি মাহাত্ম্যপূর্ণ রজনীতে। আপনি কি জানেন মহিমাময় রাত্রি কী? মহিমান্বিত নিশি সহস্র মাস অপেক্ষা শ্রেয়। সে রাত্রিতে ফেরেশতাগণ রুহুল কুদুস হজরত জিবরাঈল আলাইহিস সালাম সমভিব্যাহারে অবতরণ করেন; তাঁদের প্রভু মহান আল্লাহর নির্দেশ ও অনুমতিক্রমে, সব বিষয়ে শান্তির বার্তা নিয়ে। এই শান্তির ধারা চলতে থাকে উষা উদয় পর্যন্ত।’’ [সূরা কদর : ১-৫]
বর্তমান পৃথিবীর মানুষ গড়ে মাত্র ৫৫ বছর হায়াত পায় (বাংলাদেশে ৭০-৭৫ বছর) বলে এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে। এককভাবে দেখা গেলে প্রতীয়মান হয় যে, আশি বছরের অধিক হায়াত অনেকের ভাগ্যেই এখন আর জোটে না। সে মতে হিসেব করলে দেখা যাবে, ৮০ বছর কেউ হায়াত পেলে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা হিসেবে তার হায়াতের ৪০ বছর রাত থাকে, জাগ্রত মাত্র ৪০ বছর। এ ৪০ বছর হিসেব করলে দেখা যাবে যারা নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন, তারা প্রতি ওয়াক্ত নামাজের জন্য সর্বোচ্চ ১৫ মিনিট সময় ব্যয় করেন। সে হিসেবে দৈনিক মাত্র সোয়া এক ঘণ্টা সময় মানুষ ইবাদাতে কাটায়।
এ হিসেব মতে, সার্বসাকুল্যে দেখা যাবে ৮০ বছরের জীবদ্দশায় মাত্র ১ থেকে দেড় বছর ইবাদাতে কাটানো হয়। অথচ শুধু শবে কদরে এক রাতে ইবাদাতের মাধ্যমে একাধারে ৮৩ বছর ৪ মাস ইবাদাতের ফজিলাত পাওয়া যায়।
সাহাবি হজরত আবু হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সাওয়াবের নিয়তে কদরের রাতে ইবাদাত করবে; তার অতীতের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’’ [বুখারী, ঈমান অধ্যায় : ৩৪]
হজরত আয়িশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, “হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি যদি লাইলাতুল কদর সম্পর্কে জানতে পারি, তাহলে আমি ওই রাতে আল্লাহর কাছে কী দু‘আ করব?’ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘‘তুমি বলবে, “আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন, তুহিব্বুল আফওয়া; ফাফু আন্নি।’’ “হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করা পছন্দ করেন; সুতরাং আমাকে ক্ষমা করে দিন। ” [সুনান আততিরমিযী : ৩৫১৩]

মহিমান্বিত এ রজনীটি স্থানান্তরশীল। অর্থাৎ প্রতি বৎসর একই তারিখে বা একই রজনীতে তা হয় না এবং শুধুমাত্র ২৭ তারিখেই এ রাতটি আসবে তা নির্ধারিত নয়। আল্লাহর হিকমত ও তার ইচ্ছায় কোনো বছর তা ২৫ তারিখে, কোনো বছর ২৩ তারিখে, কোনো বছর ২১ তারিখে, আবার কোনো বছর ২৯ তারিখেও হয়ে থাকে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর সন্ধান করো।’’ [বুখারী : ২০১৭] এ রাতগুলো হলো ২১,২৩, ২৫,২৭ ও ২৯। আরবিতে দিনের আগে রাত গণনা করা হয়। অর্থাৎ ২০,২২, ২৪,২৬ ও ২৮ রমজান দিবাগত রাতসমূহ। মুফাসসিরিনে কিরাম বলেন, আরবিতে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয়ে ৯টি হরফ বা বর্ণ রয়েছে; আর সূরা কদরে ‘লাইলাতুল কদর’ শব্দদ্বয় তিন তিনবার রয়েছে; ৯ কে ৩ দিয়ে গুণ করলে বা ৯ কে ৩ বার যোগ করলে ২৭ হয়, তাই ২৭ রমজানের রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। [তাফসিরে মাজহারি]
আলেম ওলামাদের মতে, শবে কদরের রাত গভীর অন্ধকারে ছেয়ে যাবে না। এ রাত নাতিশীতোষ্ণ হবে। অর্থাৎ গরম বা শীতের তীব্রতা থাকবে না। মৃদুমন্দ বাতাস প্রবাহিত হতে থাকবে।
শবে কদরের রাতে ইবাদাত করে মানুষ অপেক্ষাকৃত অধিক তৃপ্তিবোধ করবে। কোনো ঈমানদার ব্যক্তিকে আল্লাহ তা‘আলা স্বপ্নে হয়তো জানিয়েও দিতে পারেন। ওই রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে।
সকালে হালকা আলোকরশ্মিসহ সূর্যোদয় হবে। দেখতে পূর্ণিমার চাঁদের মতো হবে।” [বুখারি, হাদিস নং: ২০২১ ; মুসলিম, হাদিস নং : ৭৬২]
শবে কদরের ইবাদাতের মধ্যে রয়েছে- নফল নামাজ আদায় করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, জিকির-আজকার করা, তাসবিহ-তাহলিল পাঠ করা, দরূদ শরিফ বেশি পরিমাণে পড়া, দান-সদাকাহ করা, তাওবা ও ইস্তিগফার করা ইত্যাদি। প্রতিটি মুসলমানের উচিত এ রাতে কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করে নিজ পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নেয়া। কারণ, নবী কারীম স. বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের মতো পুণ্যময় মাস পেয়েও তার পাপরাশি ক্ষমা করিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়, তার ধ্বংস অনিবার্য।”
এক কথায় পবিত্র লাইলাতুল কদরের রাতের সব ইবাদাতই আল্লাহ তা‘আলা কবুল করেন। আর এ রাতের সব ইবাদাতই ফজিলতপূর্ণ।
তাই আল্লাহর ক্ষমা ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি লাভে লাইলাতুল কদরের উদ্দেশ্যে রমজানের বেজোড় রাতগুলো জেগে উল্লিখিত ইবাদাত-বন্দেগির মাধ্যমে অতিবাহিত করা জরুরি।
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে লাইলাতুল কদরে ইবাদাত-বন্দেগি করে তাঁর নৈকট্য হাসিলের তাওফিক দান করুন। আমীন।