ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে পাড়ার ক্লাবের মাঠে নাটক দেখতে যেতাম। সেখানে নাটক শুরুর আগে কবিতা পাঠ হতো। আর ফি বছর ক্লাব থেকে পত্রিকা বের হতো। সেখানে বড়দের গল্প, প্রবন্ধ, কবিতা, ছড়া থাকতো। যে বছর পত্রিকা বের হতো না, সে বছর দেয়ালিকা বের হতো। সুন্দর হাতের লেখায় আলপনা আঁকা বড় আর্ট পেপারে ছোটগল্প, কবিতা, ছড়া, কৌতুক লেখা হতো। আমি গভীর আগ্রহভরে দেখতাম। বাবা পত্রিকা বাসায় নিয়ে এলে আমি গোপনে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে বইয়ের নিচ থেকে বের করে তা পড়তাম। বেশির ভাগই বুঝতাম না, তবে যেবার আমি এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, সেবার মহল্লার এক বড় ভাই জাহিদ খানকে আমার কবিতার খাতাটা দেখানোর জন্য নিয়ে গেলাম। তিনি রংপুর বেতারের গীতিকার ছিলেন, এছাড়া তিনি কবিতা লিখতেন এবং সাংবাদিকতা করতেন। জাহিদ ভাই আমার কবিতার খাতা হাতে নিয়ে প্রথমেই আমার মুখের দিকে তীর্যকভাবে তাকালেন। তখনই আমার মুখ শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতর দুরু দুরু কাঁপন তো ছিলোই। তিনি কবিতার খাতা খুলেই দু’একটি পাতা উল্টে-পাল্টে দেখে একটি কবিতাতে নিবিষ্ট মনোযোগ দিয়ে এক টানে দু’ লাইন কেটে দিয়ে বললেন-এসব লিখেছো কেন? কবে থেকে লেখো?
আমি বললাম-আমার প্রতিটি লেখার উপরের দিকে তারিখ দেয়া আছে। তিনি পুরো খাতা দেখলেন, যতোই গভীরে যেতে থাকলেন, ততোই আমার প্রতি তার স্নেহ যেন একটু একটু করে বাড়তে লাগলো বলে মনে হলো। কিছু সংশোধন করে দিলেন।

জাহিদ ভায়ের কাছে থেকে ফিরে আমি বুঝতে পারলাম, আমার লেখা কিছু একটা হয়তো হয়েছে। কারণ, ঐ শহরের যে ক’জন নাম করা কবি ছিলেন, যাদের লেখা সংবাদপত্রে বা ম্যাগাজিনে ছাপা হতো, তাদের মধ্যে তিনিও যে একজন। এরপর কলেজে ভর্তি হলাম। ব্যাস মাথার মধ্যে চেপে বসলো দেয়ালিকা করার। এক বড় ভায়ের স্মরণাপন্ন হলাম, তিনি খুব ভালো আলপনা আঁকতে পারতেন। তার কাছ থেকে আলপনা এঁকে নিলাম। তারপর সুন্দর হাতের লেখা যার, তার কাছে লেখাগুলো নিয়ে হাজির হলাম। সেটা ছিল ১৯৭৮ সাল। দেয়ালিকার সম্পাদক হিসেবে নিচে বড় বড় হরফে নিল কালিতে আমার নাম লেখা হলো। অনেক কবিতা নিয়ে বাছাই করে কবিতাগুলো দেয়া হলো। আমার কবিতাটির শিরোনাম ছিলো ‘হে ফলবতি নারী’। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে ফিরে সেই দেয়াল পত্রিকার কাছে যেতাম আর ‘হে ফলবতি নারী’ পড়ে আসতাম। মেয়েদের কমনরুমের পাশেই স্ট্যান্ড বানিয়ে দেয়ালের সাথে খাড়া করে রাখাতে মেয়েরা সবাই ভিড় জমাতে থাকলো। পরদিন থেকেই আমার কদর খানিক বেড়ে গেলো। অনেকেই কবি বলে ডাকা শুরু করলো। সবেমাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। নিজের মধ্যে একটা পুলকিত ভাব অনুভূত হতে থাকলো। সেই আমার প্রথম সম্পাদিত দেয়াল পত্রিকা। সেখান থেকেই শুরু। পরবর্তীতে বিভিন্ন দিবসে সাহিত্য পত্রিকা বের করতাম। এগুলো ছিলো ভিন্ন নামে এক একটা এক এক বার। তারপর ভিন্ন নামে আরেকটি। কিন্তু প্রকৃত লিটলম্যাগের ধ্যান ধারণা নিয়ে পাকাপোক্তভাবে শুরু করেছিলাম ‘নোঙর’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা।

‘নোঙর’ পত্রিকাতে উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জুলফিকার মতিন, অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী, কবি ওমর আলী, কবি প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ প্রমুখ। সে একটা নেশার মতো ছিলো। নেশা এ কারণেই বলছি যে, হাতে টাকা নেই, তাতে কি, বেতনের টাকা নিয়ে যেতাম পত্রিকা ছাপানোর সময়। ঈশ্বরদী থেকে ট্রেনে চেপে রাজশাহীতে যেয়ে পত্রিকা ছাপানোর কাজ করতে হতো। বেতনের টাকা ফুরিয়ে গেলে আমার ব্যাংকে একটা অল্প টাকার স্থায়ী আমানত ছিলো। সেটা ব্যাংকে দায়বদ্ধ রেখে সেখান থেকে লোন নিয়ে পত্রিকা বের করতাম। এটা অবশ্য বউ জানতো না। জানতো আমার ঘনিষ্ঠ দু’জন বন্ধু, যারা পত্রিকার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলো।

বর্তমানে ‘এবং মানুষ’ নামে একটি সাহিত্য বিষয়ক ছোটকাগজ সম্পাদনা করছি। যার আটটি সংখ্যা ইতোমধ্যে পাঠকের হাতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। জানি না ভালো-মন্দ কি করতে পেরেছি। তবে এতে আমি নবীন-প্রবীণদের মিলন মেলার একটি প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কতদূর এগোতে পারবো তা সময়ই বলে দেবে। তবুও মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, হোক না কিছুটা পথ সাথিদের সাথে চলা, আর চলার আনন্দ ভাগাভাগি করা। সুখ-দুঃখে শরিক হয়ে এ আন্দোলনে নিজেকে একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে মনে করে কাজটিতে হাত দিয়েছি। সকলের সহযোগিতা পাচ্ছি, এটাই তো সবচে বড় পাওয়া। একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে এর চেয়ে ঢের বেশি কখনো আকাক্সক্ষা করিনি। একজন সাহিত্যকর্মী হিসেবে মনে করি কিছুটা হলেও লেখক হিসেবে আমারও যে দায়বদ্ধতা রয়েছে, তা থেকেই কাজটি করছি। কাজটি করছি কোনো নিরপেক্ষতার ভান করে নয়। আমি নিজেকে নিরপেক্ষ কখনো মনে করি না। আমি পক্ষপাতে দুষ্ট, আর সেটা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে, প্রগতির পক্ষে, আর ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে। আপনি আমাকে পছন্দ করলে করবেন, না করলে না করবেন। আমি আমার নীতি আদর্শ থেকে একচুলও নড়বো না। আপনার পছন্দ না হলে আমার পত্রিকায় লেখা দেবেন না। এই কমিটমেন্ট নিয়েই কাজ করতে চাই, কিছুটা হলেও সাহিত্যকর্মীদের সেবক হিসেবে তাদের কাতারে থাকতে চাই।

লিটলম্যাগ কেন করি? নাম ফুটানোর জন্য? নাকি নিজের লেখা ছাপানোর জন্য? নাকি বাতিক থেকে? দায়বদ্ধতা থেকে? শেষাংশটার কারণেই পত্রিকা বের করা হতো। বাতিক না থাকলে বা কোন ধরনের কমিটমেন্ট বা দায়বদ্ধতা না থাকলে এ ধরনের কাজ করা যায় না। শুধু শুধু নাম জাহির করার জন্য কেউ লিটলম্যাগ করেছে কিনা তা আমার জানা নেই। আবার এটা করে লাভ করার জন্য বা জীবিকা নির্বাহের জন্য করেছেন, সফল হয়েছেন এর নজির নিকট অতীতে নজরে পড়ে না। লিটলম্যাগ করার ঝোঁক বেশি থাকে ছাত্রাবস্থায়। যাদের মননে প্রগতির বীজ অঙ্কুরিত হয়, চেতনায় আঘাত করে দেশ, জাতি, সমাজকে নিয়ে খানিক ভাববার খোরাক খুঁজে পায়, তারাই লিটলম্যাগ করতে আসে। তারা আসে দায়িত্ব নিয়ে, এক ধরনের লিটলম্যাগ সম্পাদক আছেন, যাদের চিন্তায় থাকে নতুন লেখকদের, প্রথাবিরোধী লেখকদের তুলে ধরবার তাগিদ থেকে পত্রিকা বের করার। সংবাদপত্রের সাহিত্য সম্পাদকরা যা পারেন না, একজন লিটলম্যাগ সম্পাদক তা করে থাকেন। সাহিত্য সম্পাদককে অনেক বিষয়ে জবাবদিহি করতে হয়। পাশাপাশি লিটলম্যাগ সম্পাদককে এ সব যাঁতাকলে পড়তে হয় না। ফলে, স্বাধীনভাবে তার কাজ করার শক্তি ভেতর থেকে উত্থিত হয়। তাই তারা খুঁজে বের করেন তরুণ লেখকদের সৃষ্টি করার মানসে। অনেক লিটলম্যাগ সম্পাদকরা আজকের প্রতিষ্ঠিত অনেক লেখককে প্রোমোট করে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

তরুণ বয়সে আজকের প্রতিষ্ঠিত কবি লেখকরা এধরনের পরিবেশ না পেলে তারা অনেকেই কতদূর এগুতে পারতেন তা বলা দুষ্কর। কারণ, অনেকেই হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে হারিয়ে যেতেন। অনেকেই যে এ ধরনের সিঁড়ি না পেয়ে হারিয়ে যাননি তা কি আমরা হলফ করে বলতে পারি। লিটলম্যাগ করতে যেতে নানামুখি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি পড়তে হয়। প্রধান বিষয়টি সামনে এসে দাঁড়ায় পত্রিকা বের করার রসদ। অর্থের যোগান ধার দেনা করে, বন্ধুদের কাছে হাত পেতে বা নিজেদের পকেট খালি না করে কি এটা করা সম্ভব! কারণ, লিটলম্যাগ প্রকাশ পাওয়ার পর তার বিক্রি করা টাকায় ধার দেনা শোধ হবার চিন্তা কেউ করতেই পারে না। তাহলে সহজ কথায় কি দাঁড়ালো? নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো ছাড়া আর কি! ঐ যে বললাম, বাতিক আর তার সাথে চিন্তার স্ফুরণ, সমাজ নিয়ে ভাবনার খোরাক থেকে। কেবলই চেতনায় আঘাত হানে, ভেতরে ভেতরে সংকল্প সৃষ্টি হয়, আর নিজের অজান্তেই মনের ভেতরের লুকানো বাসনা জেগে ওঠা, এ ছাড়া আর কি!

লিটলম্যাগ বলতে আসলে আমরা কী বুঝে থাকি? লিটলম্যাগ বা যাকে আমরা বাংলায় বলি ছোটকাগজ, সেই ছোটকাগজ কি কারণে ছোট? আর কোন সঙ্গায় ছোট? এর মাত্রা মাপক কোন যন্ত্র আছে কি? ছোটকাগজ বলা হচ্ছে এর আকার আকৃতির কারণে না কি অবজ্ঞা-অবহেলার কারণে, বা বোধশক্তির কারণে তাও ভাববার খোরাক যোগায়।

বাংলা কবিতায় লিটলম্যাগের প্রসঙ্গ এলেই সর্বাগ্রে আমরা বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার কথা স্মরণে আনি। আবার অনেকে এ ‘কবিতা’ পত্রিকাটিকে লিটলম্যাগ মানতে চাননি। এটিকে একটা উৎকৃষ্টমানের সাহিত্য পত্রিকা বলেছেন। কিন্তু লিটলম্যাগ যে সমস্ত কমিটমেন্ট দাবি করে তা তাতে নাকি ছিল না। এ ধরনের বিস্তর আলোচনা হতেই পারে। ‘কবিতা’ পত্রিকাটি একটি উন্নমানের সাহিত্য পত্রিকা হিসাবে দীর্ঘদিন টিকে ছিলো। লিটলম্যাগকে কেবলমাত্র লেখার জন্যই না, একে একটি আন্দোলন হিসাবেও ধরা হয় যা এক শ্রেণির বোদ্ধা পাঠকরা এ কথাই বিশ্বাস করে থাকেন। আবার আমরা যদি কবি শঙ্খ ঘোষের ভাষায় লিটলম্যাগ এর স্থায়িত্বকালকে বিচার করতে যাই, তবে তিনি কি বলেছেন দেখি। তাঁর ভাষায়: ‘এক দশকেই সঙ্ঘ ভেঙে যায়। দশক যায় দশক আসে। সঙ্ঘ ভাঙে সঙ্ঘ গড়ে।’ এই ভাঙা-গড়ার মাঝেই নতুন নতুন লিটলম্যাগ জানান দেয়, আসে যায়, কেউ কেউ চেতনায় গেঁথে থাকে অনেকদিন ধরে। কাজের কাজ যে কিছুই হয় না তা কিন্তু নয়। অনেকেই আমৃত্যু লিটলম্যাগ সম্পাদনা করেছেন, বৈরাগ্য জীবন যাপন করেছেন। নিজের সাথে প্রতিনিয়ত জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন।

লিটলম্যাগ শব্দটির সাথে আরো একটি শব্দ জড়িত। সেই শব্দটি হলো আন্দোলন। কী সামাজিক আন্দোলন কী শিল্প-সাহিত্যের আন্দোলন। সামাজিক আন্দোলনের প্রেক্ষিতেও লিটলম্যাগ আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে। কারণ, সামাজিক আন্দোলনগুলোও কখনো কখনো সাহিত্যের স্্েরাতধারায় প্রবাহিত হয়। সামাজিক আন্দোলনগুলো লেখকদের কাছে টানে, তাদের বলে দিতে হয় না কি করতে হবে। লিটলম্যাগ এর প্রধান কাজই হচ্ছে নতুনের কেতন উড়ানো। আর তাদের তুলে আনা, সমাজের অলি-গলি থেকে সাহিত্যকর্মীরা বেরিয়ে এসে প্রথার বিরুদ্ধে নতুন ধরনের ষ্ট্যান্ড নেয়া; কর্পোরেট বাণিজ্যের যাঁতাকল থেকে বেরিয়ে এসে স্বাধীন মত প্রকাশের প্লাটফর্ম তৈরি করে। বাস্তবে হয়েছেও তাই। লিটলম্যাগগুলো ঝরে যেতে পারে, আর্থিক দৈন্যতার করাল গ্রাসে কিংবা কর্পোরেট বাণিজ্যের সাথে প্রতিযোগিতার দৌড়ে তাকে কচ্ছপ গতিতে দৌড় দিতে হয়, তার পরেও বলবো লিটলম্যাগকর্মীরা ভেঙ্গে গেলেও মচকায় না। যার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে কি স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে, কিংবা দেশের ভেতরের অন্যায়ের প্রতিবাদে কিংবা বর্হিবিশ্বে কোন আগ্রাসী শক্তির অন্যায় পদক্ষেপের প্রতিবাদে, এই লিটলম্যাগ কর্মীরা পিছপা হয়নি। তারা এসব ছোটকাগজে প্রথমে মিউ মিউ করে বললেও আসল সময়ে প্রবল প্রতিবাদে উদ্দীপ্ত হয়েছে। তারা প্রয়োজনে রাজপথে নামতে পিছপা হয় নাই। আবার এক শ্রেণির বিপথগামী তরুণকে লিটলম্যাগে সম্পৃক্ত করে তাদের সঠিক পথের দিক নির্দেশনাও এসব মিটলম্যাগকর্মীদের মাধ্যমে দেয়া সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি এসেছে আদর্শিক চিন্তা-চেতনার স্ফুরণ বিকাশ করাতে লিটলম্যাগ হাতিয়ার হয়ে কাজ করেছে। যা পাওে না কোন কর্পোরেট বাণিজ্যিক কাগজের সাহিত্য সম্পাদক। তাকে অনেক দায়বদ্ধতার নাগপাশে আবদ্ধ থাকতে হয়। তাকে কেবলই নিছক সাহিত্য ভাবনা নিয়ে কাজ করতে হয়। মালিকের দেয়া নির্দেশনা মোতাবেক গোষ্ঠির বা বলয়ের ভেতরের লোকদের নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে কাজের কাজটি কাজীকে দিয়ে বেশিরভাগ সময় করানো যায় না। তার পরে পাতায় জায়গার অপ্রতুলতার দোহাই তো রয়েছেই। সব মিলিয়ে বলতে গেলে লিটলম্যাগকর্মীরা স্বাধীনভাবে মত ও পথের দিশা দেখাতে পারে। তার পত্রিকায় যে কোন ধরনের লেখা বা মতামত প্রতিফলন করানো যায়। লিটলম্যাগ মফস্বলের অবহেলিত লেখককে তুলে আনতে পারে অবলীলায় এবং তারা সে কাজটি নিপুণভাবে করে যাচ্ছে। যা কোন দৈনিকের সাহিত্য পাতার জন্য প্রয়োজন পড়ে না। বা তারা সে কাজটি করবার জন্য বস্তুত প্রস্তুতও নয়।

লিটলম্যাগ সম্পাদকদের নানাজনের নানান রকম চিন্তার খোরাক রয়েছে। কিন্তু সেই চিন্তার খোরাকগুলো প্রকৃত বিচারে আমরা যদি এক কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসতে পারি। আবার অনেক ক্ষেত্রে চিন্তার বিষয়গত দিক মিলেও যায়, ফলে সামগ্রিক চিন্তাগুলো প্রগতিশীল চিন্তার কেন্দ্র বিন্দুতে সামিল হয়। সেই সব চিন্তা চেতনার ফলাফলে আশির দশকে এবং নব্বই এর দশকে অনেক কাগজ বেরিয়েছে। মাঝে আবার বেশ অনেক দিন তাদের মুখ দেখা যায়নি। বলতে গেলে ভাটা পড়েছিল। সুখের বিষয় হলো আবার তাদের মধ্যে অনেককেই গা ঝাড়া দিয়ে খাড়া হতে দেখা যাচ্ছে। এ ছাড়া নতুন নতুন ভাবনা নিয়ে এ প্রজন্মের তরুণরাও কাগজ করছেন। এটি যেমন আনন্দের বিষয় পাশাপাশি গৌরব করবার মতোও বটে। লিটলম্যাগ আন্দোলন এগিয়ে যাক। রাজধানীর গ-ি পেরিয়ে জেলা-উপজেলায় লিটলম্যাগ ছড়িয়ে পড়–ক। প্রতি জেলা-উপজেলায় লিটলম্যাগ কর্ণার গড়ে তোলা হোক এ দাবি আমরা করতেই পারি।

চলতি বছর যশোর শহরের প্রাচ্যসংঘ প্রাঙ্গণে গত ১৭-১৮ মার্চ পঞ্চম জাতীয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা-২০১৭ অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সারা দেশ থেকে লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজ পত্রিকা সম্পাদক ও পত্রিকা সংশ্লিষ্টদের এক মিলন মেলা, প্রাণের মেলায় পরিণত হয়েছিল। লেখক-পাঠক-সম্পাদক মিলে এক অনাবিল আনন্দের অবগাহনে দু’দিন কাটিয়েছে সাহিত্যকর্মীরা। কোন রকম সরকারি পৃষ্ঠপোষকা ছাড়াই নিজ উদ্যোগে একদল লিটলম্যাগকর্মী সাহসী উচ্চারণে উদ্দীপ্ত ছিল। তারা তাদের প্রাণের তাগিদ থেকে দূর-দূরান্ত পাড়ি দিয়ে শিল্প-সাহিত্যের শহর যশোরে সমবেত হয়। এখানে মূল আয়োজক হিসেবে ছিলো প্রাচ্যসংঘের কর্ণধার কবি সংগঠক বেনজিন খান। সেই সাথে মেলা উদযাপন কমিটির আহবায়ক অনিকেত শামীমসহ একঝাক লিটলম্যাগকর্মী এবারের মেলাকে সফল করে তোলার জন্য আন্তরিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করে।

প্রচলিত ও প্রথাগত ধারার বাইরে নতুন কিছু তৈরি করার মানসে ছোটকাগজের জন্ম। ছোটকাগজ কিন্তু আসলে ছোট কিছু নয়, এর ব্যাপ্তি বিশাল, আর এটির ধারণ ক্ষমতাও অনেক বেশি। বাণিজ্যিক কাগজের সাথে ছোটকাগজের রয়েছে যোজন যোজন দূরত্ব। বণিজ্যিক কাগজের যেখানে রয়েছে মত প্রকাশের সীমাব্ধতা, সেখানে ছোটকাগজ অনেকটা বেপরোয়া। বাধাহীন নতুনদের লেখার খোলা তলোয়ার স্বরূপ কাজ করে। ছোটকাগজ বা লিটল ম্যাগাজিনের আন্দোলন মূলত প্রচলিত ধ্যান ধারণার বাহক ‘প্রতিষ্ঠান’-এর পাঁচিলকে ভেঙে নতুনকে আহবান, নতুন সৃষ্টি, নতুনে অবগাহন। আবার নতুনকে ভেঙে আরেক নতুনে প্রত্যাগমন। লিটল ম্যাগাজিন সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে মতবিনিময়, চিন্তার আদান-প্রদান, প্রকাশনার সংকট ইত্যাদি নিয়ে এ মেলায় বিস্তর আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে বলে আয়োজকরা জানান। এছাড়া লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা মিলিত হতে চায় একটি পরিসরে, পরস্পরকে চেনাজানার জন্যে, এবং পাঠককে জানানোর জন্য যে, এই আমরাই গড়ে তুলেছি আজ এবং আগামীর সাহিত্যের নন্দন; আমরাই প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যের পাশাপাশি আমাদের বিকল্প সৃষ্টির আয়োজন মেলে ধরতে চাই। মেকি সাহিত্য-কারবারীদের ভিড়ে আমরা হারিয়ে যাইনি; আমরা আমাদের হট্টগোলকে ডুবতে দিইনি। এখানেই এ মেলার স্বার্থকতা রয়েছে। রয়েছে অনিবার্য স্বকীয়তা। মেলা স্বার্থক হয়েছে বলে অংশগ্রহণকারীরা জানান।

‘আমরা ভাঙি গড়বো বলে’ এ স্লোগানকে ধারণ করে এবার ৭৫টি লিটলম্যাগ মেলায় অংশগ্রহণ করে। তাদের স্টল বরাদ্দ দেয়া হয়। অংশগ্রহণ করা লিটল ম্যাগাজিনগুলো হলো: অমিত্রাক্ষর, অনুবাদ, অর্বাক, অনুভূতি, আড়াইলেন, ঈক্ষণ, একবিংশ, উঠোন, এক ফর্মা, এবং মানুষ, কবি, কবিতাকুঞ্জ, কবিতাচর্চা, কাশপাতা, কাশবন, কালের ধ্বনি, কিংশুক, খড়িমাটি, খেয়া, গল্পকথা, চর্যাপদ, চিরকুট, চিহ্ন, চৌকাঠ, চাক, চালচিত্র, চৈতন্য, ছায়া, দাঁড়কাক, দৃষ্টি, দোআঁশ, দ্যোতনা, দোলন, দোয়াশ, ধাবমান, ধানসিড়ি, নন্দন, নদী, নিমকাল, পর্ব, পড়শি, প্রাচ্য, পোস্টকার্ড, বইয়ের জগৎ, বিরাঙ, বাঁকড়ার আলো, বাংলালিপি, বেগবতি, বৈঠা, ভিন্নচোখ, মোহনা, মেঘ, রোহাদহ, লোক, লাটাই, লিরিক, শব্দ, শঙ্খচিল, শাহবাগ, সময়ের ছড়া, স্বপ্নকুড়ি, সাম্প্রতিক, হারপুন, হাইফেন, হস্তাক্ষর, ও লিটলম্যাগ প্রাঙ্গণ। এছাড়া ভারত থেকে আগত পত্রিকাগুলো হচ্ছে, একা এবং কয়েকজন, ঐহিক, কবিতা ক্যাম্পাস, কারুভাষ, ও মুখাবয়ব।

সম্মেলন উদযাপন পর্ষদে অনিকেত শামীমকে আহবায়ক, শহিদুল আলমকে যুগ্ম আহবায়ক, বেনজিন খানকে সদস্য-সচিব, শাহিন লতিফকে সমন্বয়ক এবং সরকার আশরাফ, চিনু কবির, পুলক হাসান, আহমাদ মাযহার, আযাদ নোমান, শেখ ফিরোজ আহমদ, রাজা সহিদুল আসলাম, বদরুল হায়দার, শিহাব শাহরিয়ার, শরীফ শাহরিয়ার, মজিদ মাহমুদ, ইয়াজদানী কোরায়শী, মফিজ ইমাম মিলন, হাসান মাহমুদ, আমিনুর রহমান সুলতান, রনজিত কুমার, হেনরী স্বপন, কামরুল বাহার আরিফ, পাবলো শাহি, রওশন ঝুনু, শিবলী মোকতাদির, খলিল মজিদ, আমীর খসরু স্বপন, মুহম্মদ মুহসিন, অনিন্দ্য জসীম, শাফি সমুদ্র, আলী ইউসুফ, অনন্ত সুজন, কাজল কানন, মাহমুদ শাওন, সজল আহমেদ, আলী আফজাল খান, সোহেল মাজহার, আমিরুল বাসার, মনিরুল মনির, আমিনুল রানা, দ্রাবিড় সৈকত, তিথি আফরোজ, সুদীপ্ত সাইদ, মাহফুজ পাঠক, আনজুম সানি, রনি অধিকারী, শামীম হোসেন, রবিউল আলম, ইসলাম রফিক, সুপান্থ মল্লিক, ফরহাদ নাইয়া, কিংশুক ভট্টাচার্য, জাহিদ সোহাগ, বীরেন মুখার্জী, তন্ময় সান্যাল, নাজিব ওয়াদুদ, আনোয়ার কামাল, ইমরান মাহফুজ, জিয়ারুল হোসেন, দিপংকর রায়, সৈয়দ শিশির, লতিফ জোয়ার্দার, সালেহীন বিপ্লব, আবুল কামাল আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান মুস্তাক, প্রত্যয় হামিদ, মামুন সারওয়ার ও কুতুব হিলালীকে সদস্য করে মেলা উদযাপন পর্ষদ গঠন করা হয়। এছাড়াও আটটি উপ-পর্ষদ গঠন করা হয়।

২০১৭ সালের ১৭ মার্চ সকালে লিটলম্যাগ সম্পাদক ও লিটলম্যাগকর্মীরা তাদের প্রাণের দাবি সম্বলিত স্লোগান দিয়ে শোভাযাত্রাসহ যশোর শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, প্রথম জাতীয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০০৭ সালের ৬-৮ ডিসেম্বর ঢাকায় আজিজ সুপার মার্কেট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। সেবার মেলায় মোট ২১টি লিটল ম্যাগাজিন অংশগ্রহণ করে। দ্বিতীয় জাতীয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০০৮ সালের ১৮-২০ ডিসেম্বর ঢাকায় আজিজ সুপার মার্কেট প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়। সেবার মেলায় মোট ২৬টি লিটল ম্যাগাজিন অংশগ্রহণ করে। তৃতীয় জাতীয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০০৯ সালের ১০-১২ ডিসেম্বর ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের আঙিনায় অনুষ্ঠিত হয়। সেবার মেলায় মোট ৪৭টি লিটল ম্যাগাজিন অংশগ্রহণ করে। চতুর্থ জাতীয় লিটল ম্যাগাজিন মেলা ২০১১ সালের ৬-৮ জানুয়ারি জাতীয় গণগ্রন্থাগার শাহবাগ, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৪৬টি লিটল ম্যাগাজিন অংশগ্রহণ করে।

মেলায় প্রতিবারই একজন লিটলম্যাগকর্মীকে সম্মাননা দেয়া হয়। এবার পঞ্চম লিটল ম্যাগাজিন মেলায় গাইবান্ধা থেকে প্রকাশিত ‘শব্দ’ পত্রিকার সম্পাদক কবি সরোজ দেবকে সম্মাননা দেয়া হয়। এবারের মেলায় বিভিন্ন অধিবেশনে লিটলম্যাগকর্মীরা ছোটকাগজ আন্দোলনকে আরো শক্তিশালী করার জন্য প্রতিবছর লিটলম্যাগ মেলার আয়োজন করার উপর গুরুত্বারোপ করেন। তাদের লেখার উপরে নানা রকম প্রতিবদ্ধকতার সৃষ্টি হয়। মুক্তচিন্তার, মুক্তমনা মানুষদের উপর মৌলবাদীগোষ্ঠী কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ায় নিন্দা জানানো হয়। লিটলম্যাগ আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য প্রয়োজনে জেলায় জেলায় লিটলম্যাগ মেলা করার উপর জোর দাবি জানানো হয়। সেই সাথে আরো নতুন নতুন ছোটকাগজের উদ্ভব হোক এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন উদ্যোক্তারা।

দুদিনব্যাপী লিটল ম্যাগাজিন মেলায় মোট আটটি অধিবেশনে লিটলম্যাগ সম্পাদকরা তাদের প্রাণের আবেদন, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদকদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাসহ বেশ কয়েকটি অধিবেশন প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয় আলোচনা দর্শক শ্রোতাদের মুগ্ধ করে রাখে। এসব অধিবেশনগুলোর মধ্যে প্রথমদিন আযাদ নোমানের সভাপতিত্বে মুক্ত আলোচনা পর্বে ‘ছোটকাগজ সম্পাদকদের আপন কথা’-এতে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন, বদরুল হায়দার, মনিরুল মনির, দ্রাবিড় সৈকত, আনোয়ার কামাল, মাহফুজ পাঠক ও মানসী কির্তনীয়া। সেমিনার : ‘ছোটকাগজের ব্যাপ্তি মোটেই ছোট কিছু নয়’ এখানে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন, হেনরী স্বপন। মফিজ ইমাম মিলন এর সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন, শরিফ শাহরিয়ার, ইয়াজদানী কোরাইশী, ইসলাম রফিক ও সঞ্জীব পুরোহিত। ২য় মুক্ত আলোচনা পর্বে ‘লেখক তৈরিতে ছোটকাগজের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, অনন্ত সুজন, কুতুব হিলালী, রনি অধিকারী, কাজল কানন ও ইমরান মাহফুজ। সন্ধ্যায় মজিদ মাহমুদের সভাপতিত্বে কবিতা পাঠের আসরে অর্ধশত কবি তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন। ২য় দিনে মুক্ত আলোচনা পর্বে ‘ছোটকাগজ সম্পাদনা, প্রকাশনা ও বিপণন’ শিরোনামে আহমাদ মাযহার এর সভাপতিত্বে মূল আলোচক ছিলেন, অনিকেত শামীম। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, অনন্ত সুজন, আলীম হায়দার ও দ্রাবিড় সৈকত। শেষ আলোচনা পর্বটি ছিল ‘ছোটকাগজ, পুঁজিবাদের গোলকধাঁধা বনাম ফেসবুক’। শহিদুর আলমের সভাপতিত্বে আলোচক ছিলেন, সৈকত হাবিব, আলী ইউসুফ, আহমাদ মাযহার, ইয়াজদানী কোরায়শী, শিবলী মোকতাদির ও খসরু পারভেজ।

লিটলম্যাগের গোড়ার কথা:
আমরা যারা লিটলম্যাগ নিয়ে এতো ভাবনার খোরাক জোগাই আসলে সেই লিঠলম্যগের গোড়ার কথাটাও জানা প্রয়োজন। যতদূর জানা যায়, ১৭৩১ খ্রিষ্টাব্দে এডওয়ার্ড কেভ সম্পাদিত ‘জ্যান্টলম্যানস ম্যাগাজিন’ প্রকাশের পর পরই ম্যাগাজিন শব্দটি বেশ প্রচলিত আকারে সাড়া পায়। পত্রিকার আকার বা সীমাবদ্ধতার কারণেই হয়তো ‘লিটল’ (তুলনামূলকভাবে ছোট, ক্ষুদ্র নয়) বোঝানোর সুবিধার্থে পুরো ইউরোপে এভাবেই এর চলন হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। লিটন ম্যাগাজিন এর প্রচার প্রসার বিংশ শতাব্দীর গোড়াতে শুরু হলেও বোস্টন থেকে ১৮৪০ সালে ল্যাল্ফ ওয়ালডো এমারসন ও মার্গারেট ফুলার সম্পাদিত ‘দি ডায়াল’ পত্রিকাটিই লিটলম্যাগ গবেষকদের কাছে প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলা ভাষাভাষীদের কাছে অনেক উল্লেখযোগ্য ছোটকাগজ সমহিমায় উজ্জ্বলতা ছড়িয়েছে। তরুণদের উৎসাহিত করেছে, লেখক তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। বাংলা সাহিত্যের প্রতিথযশা লেখকরা একসময় এইসব ছোটকাগজে লিখেছেন। পরবর্তীতে তাঁরা নিজ নিজ স্বকীয়তায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন। অনেক প্রবীণ লেখককে অকপটে স্বীকারোক্তি করতে শুনি যে জীবনের প্রথম লেখাগুলো ছোটকাগজের মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়েছে। কাজেই ছোট কাগজ আদপে ছোট নয়। তাকে ছোট বা ফেলনা করে দেখবার সুযোগ নেই।

বাংলা সাহিত্যে কিছু উল্লেখযোগ্য ছোটকাগজ:
বাংলা সাহিত্যে প্রমথ চৌধুরী সম্পাদিত ‘সবুজপত্র’-কে বাংলা প্রথম ছোটকাগজ হিসেবে ধরা যেতে পারে। এর আগে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন নামে যে ছোট কাগজটি করেছিলেন সেটিকে ধরা হলেও মূলত প্রমথ চৌধুরীর ‘সবুজপত্র’ ছিল প্রথাবিরোধী কাগজ যা লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে। পরবর্তীতে ১৯২৩ সালের কল্লোল, ১৯২৪ সারের শনিবারের চিঠি ১৯২৬ সালে সওগাত, ১৯২৭ সালে শিখা, কালি কলম, প্রগতি, ১৯৩১ সালে পরিচয়, ১৯৩২ সালে পূর্বাশা, প্রভৃতি কোলকাতা থেকে বের হয়েছে। তবে, বুদ্ধদেব বসু ও অজিত কুমার দত্ত সম্পাদিত প্রগতি পত্রিকাটি ঢাকা থেকে এবং সঞ্জয় ভট্টাচার্য সম্পাদিত পূর্বাশা পত্রিকাটি কুমিল্লা থেকে বের হতো। এরপরে ফজল শাহাবুদ্দিন সম্পাদিত ‘কবিকন্ঠ’, সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’, ফজলে লোহানী সম্পাদিত ‘অগত্যা’ (১৯৪৯), মাহবুব-উল আলম চৌধুরী ও সুচরিতা চৌধুরী সম্পাদিত ‘সীমান্ত’ (১৯৪৭), এনামুল হক সম্পাদিত ‘উত্তরণ’ (১৯৫৮)। এছাড়াও তৎপরবর্তীতে উল্লেখযোগ্য কিছু পত্রিকা হচ্ছে, ‘কণ্ঠস্বর’(১৯৬৫), ‘বক্তব্য’(১৯৬৫), ‘সপ্তক’ (১৯৬২), ‘স্বাক্ষর’ (১৯৬৩), ‘সাম্প্রতিক’ (১৯৬৪), ‘নাগরিক’ (১৯৬৪), স্যাড জেনারেশন’ (১৯৬৩), ‘প্রতিধ্বনি’ (১৯৬৪), ‘না’ (১৯৬৭), ‘বিপ্রতীক’ (১৯৬৭), ‘অরণি’ (১৯৭৬), ‘অ্যালবাম’ (১৯৭৬), ‘অনুকাল’ (১৯৭৬), ‘নন্দন’ (১৯৮২), ‘নিসর্গ’ (১৯৮৫), ‘গা-ীব’ (১৯৮৭), ‘অনুভূতি’ (১৯৯৪), ‘একবিংশ’ (১৯৮৫), ‘চর্যাপদ’ (১৯৮৭), ‘চালচিত্র’(১৯৮৮), ‘দ্রষ্টব্য’ ‘নোঙর’ (১৯৯১), ‘দৃষ্টি’ (১৯৯৪), ‘মেঘ’(১৯৯৫), ‘সুন্দরম’ (১৯৯৬), ইত্যাদি।

বর্তমান সময়ের কিছু উল্লেখযোগ্য ছোটকাগজ:
পরবর্তীতে পলিমাটি, কালস্রোত’, বহুব্রীহি, কবি, অলক্ত, অধুনা, অতলান্তিক, কাক, কাদামাটি, উচ্চারণ, রূপম, কবিতাপত্র, কিছুধ্বনি, উল্লেখযোগ্য। এসব পত্রিকার অনেকগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। কোন কোনটি বছরে একটি-দুটি সংখ্যা করে বের হয়ে থাকে। তাছাড়া বর্তমানে বেশ কিছু লিটলম্যাগ সাহিত্যকর্মীদের কাছে সমাদৃত হয়েছে। এ সব পত্রিকা ঘিরে ভালো কিছু কাজ হচ্ছে বলে লেখক-পাঠকের সাথে আলাপকালে জানা যায়। পত্রিকাগুলো হচ্ছে, ‘অনুভূতি’, ‘অরণি’, ঈক্ষণ, একবিংশ, এবং মানুষ, অ্যালবাম, কবিতাপত্র, করাতকল, কাশবন, কালের ধ্বনি, খড়িমাটি, গা-ীব, ঘুংঘুর, চর্যাপদ, চারবাক, চালচিত্র, চিরকুট, ছায়া, তরী, তৃতীয় চোখ, ত্রিনদী, দেশলাই, দৃষ্টি, ধমনি, পরাগ, প্রতিকথা, বাঁক, মৃদঙ্গ, লোক, শব্দগুচ্ছ, হাইফেন ইত্যাদি ছাড়াও আরো অনেক ছোটকাগজ রয়েছে, যা প্রকৃত ছোটকাগজের মাত্রা মেপে বের করার পক্ষে সবসময় দৃঢ় অবস্থানে থাকেন।

পরিশেষে এ কথা নিদ্ধিধায় বলা যায় যে, ছোটকাগজ নিয়মিত বের করার লক্ষ্যে যে পরিমাণ লেখা বা আর্থিক সংস্থানের প্রয়োজন, তা না পাওয়ায় অনেক কাগজ সময় মতো প্রকাশ করতে পারছে না। আবার একটা ইগো কাজ করে যে, আমরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী। কাজেই প্রতিষ্ঠানের কাছে বিজ্ঞাপনের জন্য ধর্ণা দিয়ে নিজেদের ইমেজ ক্ষুন্ন করতে চান না, ছোটকাগজের এমন সম্পাদকও রয়েছেন। তারপরেও ছোটকাগজগুলো অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে নতুন একটি সংখ্যার আত্মপ্রকাশ ঘটছে, এটাই বা মন্দ কি। এখান থেকে আগামীতে দেশ বরেণ্য লেখকরা বেরিয়ে আসবে এ প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি। ছোটকাগজ আন্দোলন দেশময় ছড়িয়ে পড়ুক। মেধা ও মুক্তচিন্তার চর্চার বিকাশ ঘটুক এ প্রত্যাশা রইল।