সাহিত্যের বীজতলা লিটিল ম্যাগাজিনের অবদান সর্বকালেই বিশ্ববন্দিত। খুব কম লেখকই আছেন যাঁরা লিটল ম্যাগাজিনে লিখেননি। কিন্তু অধিকাংশ লেখকেরই লিটিল ম্যাগাজিন থেকে উত্থান ঘটেছে। বিশেষ করে বাংলা সাহিত্যের কবি-লেখকরা তাঁদের প্রথম লেখাটি লিটিল ম্যাগাজিনেই লিখেছেন।
ছোট থেকেই এই লিটিল ম্যাগাজিনেরই প্রতি আমার দুর্নিবার আকর্ষণ। আজও এই লিটিল মাগাজিনে ভালো লেখাটি প্রকাশিত হলে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হই।

কী এই লিটিল ম্যাগাজিন?

গৌরবহীন, প্রত্যাশাহীন নির্মোহ স্বার্থহীন এক সাহিত্যমাধ্যম। শুধু সাহিত্যকে ভালোবেসেই কঠোর কঠিন আত্মত্যাগের সাধনায় যে পথপরিক্রমার ব্রত নিয়ে ম্যাগাজিনগুলির প্রকাশ ঘটে চলে—তার সঙ্গে অন্যকোনো মাধ্যমের তুলনা হয় না।
নব্বই দশকের প্রায় প্রথম থেকেই আজ অবদি যে লিটিল মাগাজিনে আমি ধারাবাহিকভাবে লিখে চলেছি তার নাম ‘দৌড়’, সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাস। প্রায় ছাত্রাবস্থা থেকেই এই ম্যাগাজিনে আমার গদ্য লেখার হাতেখড়ি। এই ম্যাগাজিনের উদ্যোগেই আমার দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়: ‘কোথায় পা রাখি’ এবং ‘বৃষ্টিতরু’ যার জন্য আমাকে এক পয়সাও খরচ দিতে হয় না। সম্পাদক মধুমঙ্গল বিশ্বাসের কতখানি আন্তরিকতা ছিল তা বলে বোঝানো যাবে না। বীরভূমের একটি প্রান্তিক গ্রাম থেকে তাঁর বাড়িতে কলকাতায় ছুটে যেতাম। রাত্রিযাপনও করতে হতো। আবার বাড়ি ফেরার সময় তিনি সব ব্যবস্থাও করে দিতেন। পশ্চিম মেদিনীপুরের আর একটি পত্রিকায় দীর্ঘদিন গদ্য লিখেছি, পত্রিকাটির নাম ‘কুবাই’। সম্পাদক জিতেন্দ্রনাথ হাটুই প্রতিটি সংখ্যা খুব যত্ন করে পাঠাতেন। আর একটা পত্রিকা অজিতকুমার কুণ্ডুর সম্পাদনায় ‘কলতান’ নামে হুগলি থেকে প্রকাশিত হতো। সেখানেও প্রতিটি সংখ্যায় গদ্য লিখতাম। হুগলির আর একটি অন্যতম পত্রিকা ‘সুপত্র’ সম্পাদনা করেন ড. অমিতাভ মুখোপাধ্যায়। এখানেও প্রচুর গদ্য লিখেছি কেবল সম্পাদকের আন্তরিক আহ্বানে। দুর্গাপুরের তপন রায় সম্পাদিত ‘আলোর পাখি’ পত্রিকার কথাটি কখনও ভুলতে পারবো না। বারাসাত থেকে অতনু মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হতো ‘কপোতাক্ষ’; দীর্ঘদিন এই পত্রিকায় গুচ্ছ গুচ্ছ লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ২০০৪ সালে আমার একটি ছোট্ট কাব্য ‘বিষাদের লেখা কবিতা’ এই কপোতাক্ষ উদ্যোগ নিয়ে প্রকাশ করে। কৃষ্ণ সৎপথীর সম্পাদনায় ঝাড়গ্রাম থেকে প্রকাশিত ‘মেঠোপথ’ পত্রিকায় বহু প্রবন্ধ লিখেছি। পশুপতি মিশ্রের সম্পাদনায় ‘সুবর্ণরেখা’ও ঝাড়গ্রাম থেকেই প্রকাশিত হতো। আমার প্রথম জীবনে বহু লেখা প্রকাশ করেন। একবার আমার অসুস্থতার সময় চিকিৎসা করানোর জন্য কিছু অর্থও প্রেরণ করেন। শ্রদ্ধেয় এই সম্পাদকগণ দেখিয়ে দিয়েছেন কতখানি ত্যাগ ও ভালোবাসা থাকলে লিটিল ম্যাগাজিন করা যায়। আমার বন্ধু স্থানীয় প্রিয়জন আরও বহু আছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: সুবর্ণ রায়, দেবাশিস সাহা, প্রবীর দাস, চারুচন্দ্র রায়, ফজলুল হক, সুনীল মাজি, শুভঙ্কর দাস, সৌরভ ভূঁইয়া, নন্দিতা ব্যানার্জি এবং আরও বহু । এঁদের পত্রিকায় এখনও লিখে চলেছি। যাঁরা এখনও দৃষ্টান্ত হিসেবে বাংলা সাহিত্যের সৃষ্টি ক্ষেত্রকে উর্বর করে তুলছেন সমস্ত স্বার্থ বিসর্জন দিয়েই নিছক সাহিত্যসেবায়।

প্রথম লিখতে আসা তরুণ-তরুণীর সৃষ্টিকে মর্যাদা দেওয়ার যখন কেউ থাকে না, তখন এই ম্যাগাজিনগুলিই সর্বপ্রথম এগিয়ে আসে। প্রথম লেখা প্রকাশের মাধ্যমে সৃষ্টিসন্তানের আনন্দ দান করে। এই আনন্দ কী কম আনন্দ? সন্তানের পিতা হওয়ার আনন্দ। সাহিত্যরস আস্বাদন এমন একটি আনন্দদায়ক উপলব্ধি তা ভাষায় প্রকাশ করে বোঝানো অসম্ভব। কখনও কখনও মনে হয়েছে বিশ্বস্রষ্টার এই জগৎ সৃষ্টিও এক মহান সাহিত্য সৃষ্টি।
যার আকাশ-বাতাস, নক্ষত্রমণ্ডল-গ্রহরাজি, উদ্ভিজ্জ এবং প্রাণীকুল সবকিছুই এক একটা ছন্দময় স্তবক। স্তবকে স্তবকে পংক্তি বিন্যাস এবং বিস্ময়কর আলোড়ন বিরাজ করছে। আমাদের সাহিত্যের প্রয়াসও এরই ক্ষুদ্র সংস্করণ মাত্র। তাই এই আনন্দ মহান স্রষ্টার আনন্দের মতোই ভাষাহীন তীব্র অলৌকিক বোধসম্পন্ন। লিটিল ম্যাগাজিনগুলি তাদের অস্থি দিয়ে যে নাও তৈরি করে, এবং সেই নাও-ই আনন্দের রসের সমুদ্রে ভাসিয়ে নিয়ে যায় আমাদের। সুতরাং লিটিল ম্যাগাজিনগুলির কাছে আমরা আজীবন ঋণী একথা বলেই আমাদের দায় শেষ করতে পারি না। আমাদের সংস্কৃতি, আমাদের জীবন অন্বেষা, আমাদের জীবনযাপন, আমাদের দার্শনিকবোধ, আমাদের চৈতন্যজাগরণ সবকিছুরই বাহক হয়ে ওঠে এই লিটিল ম্যাগাজিন।আমাদের ঔদার্য, সহানুভূতি, প্রেম ও মৈত্রীর শিক্ষাও দিতে পারে এই লিটিল ম্যাগাজিনগুলি। আমরা ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎএর দিকে যাত্রা শুরু করতে পারি এরই প্রেরণাতে।

কারা করেন লিটিল ম্যাগাজিন?

লিটিল ম্যাগাজিনের যাঁরা সম্পাদক হন তাঁরা তো লেখকের থেকেও অনেক গুণ বেশি মানবিক বোধসম্পন্ন আত্মত্যাগী পরম কৃচ্ছ্রসাধক। নিজের সুনামের জন্য পত্রিকা করেন না, অন্যের প্রতিভাকে লালন করার জন্যই পত্রিকা করেন। অন্যের লেখাকে যত্নসহকারে প্রকাশ করেই তাঁর আনন্দ। সুতরাং তাঁর আত্মস্বার্থ কিছু নেই, একজন প্রকৃত লেখককে সযতনে তুলে ধরাই তাঁর একমাত্র কাজ। আর এই কাজটি সততার সঙ্গে করতে গিয়ে তাঁকে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। নিজ রোজগারের অর্থ যেমন ব্যয় করতে হয়, তেমনি সংসারে সচ্ছলতাও থাকে না। অনেক সময়ই প্রেসের ধারদেনাতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। এমনকী আত্মহত্যাও করতে হয়। কয়েকজন লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদককে দেখেছি, সারাদিন প্রায়ই অনাহারে-অর্ধাহারে শুকনো মুড়ি চিবিয়ে, লাল চা পান করে, বিড়ি টেনে ধোঁয়া উড়িয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে।
তাঁর শ্রমের সমস্ত অর্থ পত্রিকার কাজে ব্যয় করতে। বিরল হলেও এরকম সম্পাদকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কবি-লেখকদের তিনি এতই ভালোবাসেন যে নিজের প্রণিপাত ঘটিয়ে তাঁদের কাব্য সংকলনও বের করেন। হয়তো তাঁদের অবদানের কারণেই সেইসব কবি-লেখকরা ক্রমান্বয়ে সমৃদ্ধির সোপানে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠেন। তখন পাঠক আর সেই সম্পাদকের কথা মনে রাখেন না, শুধু কবি-লেখককেই চোখের সামনে দেখতে পান।
কিন্তু একজন সফল কবি-লেখকের আড়ালে একজন জীর্ণ আত্মত্যাগী মহাসাধক সম্পাদকের অবদান থেকেই যায়। অন্ধকার গলিতে অথবা ভাঙাচোরা চায়ের দোকানে বসে তিনি পত্রিকার পরিকল্পনা করতেন, নিজের জীবনকে এবং সংসারকে তাচ্ছিল্য করে পত্রিকার সৌজন্যে তাঁর যৌবন ও ক্ষমতাকে ঢেলে দিতেন— সেই সম্পাদকের মুখটি আর কেউ স্মরণে আনেন না। এঁদের কথা কেউ কখনও লিখেও যান না।
শুধু কালের ইতিহাসে আশ্চর্য ধূলি-ধূসরতায় ঢাকা পড়ে যায়। টোল পড়া মুখ, আকাটা দাড়ি,আইরনবিহীন আধময়লা জামা কাপড়, পায়ের ছেঁড়া চপ্পল দেখে সাময়িকভাবে অসভ্য অমার্জিত মনে হতে পারে। কিন্তু আসলে এঁরাই প্রকৃত সফল কোনো সাহিত্যিকের আশ্রয়দাতা এবং জনক তুল্য। অতীত থেকে বর্তমান ইতিহাসের ধারায় এরকম সম্পাদকেরই দেখা পাওয়া যাবে এবং এঁরাই প্রকৃত সম্পাদক।

কয়েকটি লিটিল ম্যাগাজিন

কয়েকটি লিটিল ম্যাগাজিনের কথা স্মরণে আসছে যেগুলির সম্পাদকগণ সর্বকালের সকল মানুষের কাছেই শ্রদ্ধার যোগ্য। তাঁদের ত্যাগ ও সাহিত্যের প্রতি কতখানি নিবেদিত প্রাণ তা বোঝা যায়। যে সময় আমরা লেখা শুরু করব ঠিক তার প্রাকমুহূর্তেই এই পত্রিকাগুলির কথা শুনতাম। এগুলির মধ্যে অন্যতম হলো ‘রৌরব’ পত্রিকা। সম্পাদক ছিলেন শুভ চট্টোপাধ্যায়। সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজসহ সৈয়দ কওসর জামাল,সৈয়দ আনোয়ার আলম,সৈয়দ মতীন হায়দার,জমিল সৈয়দ ,সৈয়দ হাসমত জালাল এবং সৈয়দ সুশোভন রফি,তপন সৈয়দ ও সৈয়দ হুমায়ুন রানা এই পত্রিকায় লিখতেন। এই পত্রিকাতেই পরবর্তী কালের বিখ্যাত সাহিত্যিক আবুল বাশারও লিখতেন। আরও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য লেখক ছিলেন: নারায়ণ ঘোষ, তাপস ঘোষ, সমীরণ ঘোষ, শান্তিময় চট্টোপাধ্যায় এবং সম্পাদক নিজে। সত্তর দশকে মুর্শিদাবাদের ‘কল্লোল’ হিসেবে পত্রিকাটি সুনাম অর্জন করেছিল। এই সময়ে আর একটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকা উৎপল গুপ্তের ‘সময়’। ‘কান্দী বান্ধব’ ও ‘জঙ্গিপুর সংবাদ’ আরও দুটি উল্লেখযোগ্য পত্রিকাও লেখকদের অবলম্বন ছিল।এছাড়াও নারায়ণ ঘোষ ও তাপস ঘোষের সম্পাদনায় ‘নরকের তাপ’, মণীশ ঘটকের সম্পাদনায় ‘বর্তিকা’, রাজেন উপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘অনম’, সমীরণ ঘোষের সম্পাদনায় ‘স্বয়ম্বর’, অচিন্ত্য বসুর সম্পাদনায় ‘তমোঘ্ন’ ইত্যাদি। এই সমস্ত পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে লিখেছেন সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ, আবুল বাশার, দীপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, গুণময় মান্না, অজিত বাইরি, সৈয়দ খালেদ নৌমান, সমীরণ ঘোষ, উৎপল গুপ্ত, বিজয়কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, পুলকেন্দু সিংহ, শক্তিনাথ ঝা, সৌমেন্দ্রকুমার গুপ্ত, নীহারুল ইসলাম, প্রকাশ দাসবিশ্বাস প্রমুখ। দীর্ঘদিন ধরেই প্রকাশিত হয়েছে আবুল কালামের সম্পাদনায় মুর্শিদাবাদের খড়গ্রাম থেকে ‘পূর্বাভাস’ পত্রিকা। তাঁদের ভ্রাম্যমান সাহিত্য অনুষ্ঠান তরুণ লেখকদের ভীষণ উৎসাহ যুগিয়েছে। নবীউল ইসলামের সম্পাদনায় ‘প্রদর্শিকা’ পত্রিকাটিও গ্রাম বাংলার তরুণ সাহিত্যিকদের খুব আপনজন ছিল। লালগোলা থেকে জয়নূল আবেদিনের সম্পাদনায় ‘রঙধনু’ সাহিত্য সেবায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। পরবর্তী সময়ে এবাদুল হকের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘আবার এসেছি ফিরে’। বহু বিদগ্ধ লেখক এই পত্রিকার পাতায় আত্মপ্রকাশ করেন। কান্দীর পুলকেন্দু সিংহ রায় এবং অপরেশ চট্টোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘অঙ্গাঙ্গী’ পত্রিকা। এর প্রতিটি সংখ্যাই পাঠক এবং লেখকদের কাছে সমীহ আদায় করে নেয়।শুধু মুর্শিদাবাদ জেলার একটি সময়ের একটি অংশের কথা উল্লেখ করলাম মাত্র । তাতেই বোঝা যাচ্ছে লিটিল ম্যাগাজিন বেশকিছু স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিককে তুলে আনতে পেরেছে।

অভিজ্ঞতার কথা

আমি বীরভূম জেলার যে প্রান্তিক এলাকায় বসবাস করি এবং যেসব লিটিল ম্যাগাজিনের দ্বারা লালিত পালিত হই সেগুলির কথাও স্মরণযোগ্য। নব্বই দশক থেকেই ‘ডানা’ পত্রিকাটি তখন প্রকাশিত হচ্ছে। সম্পাদনা করছেন সত্যসাধন চট্টোপাধ্যায়। গ্রামগঞ্জের বহু লেখক-কবি সেই পত্রিকায় লিখছেন। আমি নতুন হলেও এই পত্রিকায় দীর্ঘ কবিতা এবং গদ্য লেখার প্রথম সুযোগ পাই। বীরভূম জেলার স্বনামধন্য কবি কবিরুল ইসলাম, সমরেশ মণ্ডল, প্রত্নতত্ত্ব সন্ধানী শঙ্করলাল রায়, অর্ণব মজুমদার সকলেই লিখছেন। রামপুরহাটের আর একটি পত্রিকা ‘অনুভূমি’ সত্তর দশক থেকেই প্রকাশিত হচ্ছে মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনায়। সেখানেও শুধু বীরভূম কেন বাংলা ভাষার সমস্ত দিকপাল লেখকেরাই নানা সময়ে লিখছেন। উত্তর বীরভূমের মুরারই থেকে প্রকাশিত ‘বীরভূম প্রান্তিক’ সত্তর দশকের আর একটি নামকরা পত্রিকা। বীরভূমের সর্বজনবিদিত উল্লেখযোগ্য কথা সাহিত্যিক আবদুর রাকিব, শচীন বন্দ্যোপাধ্যায়, আদিত্য মুখোপাধ্যায়, সুনীলসাগর দত্ত (সম্পাদক), কুদ্দুস আলি, নাসির ওয়াদেন এবং অবশ্যই কবিরুল ইসলাম এবং সমরেশ মণ্ডলের গৌরবময় উত্থান আমরা লক্ষ করছি। এছাড়া বীরভূমের মানসলোক, কয়লাকুঠি, চরৈবেতি, গিরিমৃত্তিকা, কাঞ্চিদেশ, চণ্ডীদাস, কবিতা এবং কবিতা প্রভৃতি পত্রিকায় নানা সময়ে শক্তিশালী লেখক ফজলুল হক, অনুপম দত্ত, একরাম আলি, দেবকুমার দত্ত, জয়ন্ত চক্রবর্তী, লিয়াকত আলির মতো ব্যক্তিত্বরা লিখেছেন এবং নিজেদের তুলে ধরেছেন। বোলপুর শান্তিনিকেতন থেকে ‘একলব্য’, ‘১৪০০’ ও ‘কবিতায়ন’, ‘আজকের কবিতা’ সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। সাঁইথিয়ার ‘রানার’এবং সিউড়ির ‘সৃজন কথা’ পত্রিকা দুটিও উল্লেখযোগ্য।
আরও বহু পত্রিকার নানা সময়ে উত্থান পতন ঘটেছে। সেইসব পত্রিকার সম্পাদকদের খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তাঁদের জীবনযাপন কত অনাড়ম্বর বাহুল্যবর্জিত তাতে মনে দাগও কেটেছে। ফলে সাহিত্যের প্রতি একটা মমতা বা ভালোবাসা আপনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। লিটিল ম্যাগাজিন যে একটা বিদ্রোহ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তা বলাই বাহুল্য। অনেক সময় মনে হয়েছে নিজেকে পুড়িয়ে অন্যকে আলো দেখিয়ে পথ চলতে সাহায্য করার মতো। তাই আজও সেইসব সম্পাদকদের কথা স্মরণ করি আর ভেসে ওঠে ওইসব দীপ্ত মুখগুলি।‘পদাতিক’ নামে একটি দেয়াল পত্রিকা সম্পাদনা করতেন শঙ্করলাল রায়। তাঁর একটা ছোট্ট শাখা-চুড়ি বিক্রির দোকান ছিল। সেইখানে গিয়ে ভাঙা বেঞ্চে বসতাম। সদ্য লেখা কবিতা নিয়ে। তিনি মনোযোগ দিয়ে পাঠ করে ছন্দপতনগুলি ধরিয়ে দিতেন। কবিতার ভালোমন্দ নিয়ে তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণ করতেন। বহু উদাহরণ দিতেন। কালিদাসের কাব্য থেকে উদ্ধৃতি তুলে মন্দাক্রান্তা ছন্দ বোঝাতেন। আর মাঝে মাঝে পাশে থাকা নারানের চায়ের দোকান থেকে লাল চা এনে দিতেন। চা খাওয়া হলে একটা লাল সুতোর বিড়ি বের করে বলতেন: ধরাও। বিড়ি টানতে টানতে অনেক কথা হতো। তিনি তাঁর মরমি হাত মাথায় রেখে আশীর্বাদও করতেন। সামান্য একটা দোকানে যা আয় হতো, তাতে সংসারই ঠিকমতো চলত না।
তবুও পাঁচ-ছয় কাপ চা খাইয়ে আরও খরচ করে ফেলতেন। পত্রিকায় ছবি এঁকে অলংকরণ করতেন। আমরা চেয়ে চেয়ে দেখতাম, লিটল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হতে গেলে কতখানি ত্যাগ ও ধৈর্য দরকার। তখন আমি, অনিমেষ মণ্ডল, শ্যামচাঁদ বাগদি, চাঁদ মহম্মদ, তুষার আহাসান সকলেই যেন তাঁর ছাত্র। আজ আর সেসব কল্পনাও করতে পারি না।
তেমনি ‘ডানা’ পত্রিকার দপ্তরেও সত্যসাধন চট্টোপাধ্যায় নতুন কবিতার নানা বাঁকগুলি তুলে ধরতেন। পত্রিকার জন্য ডাকযোগে আসা কবিতাগুলি পাঠ করতে বলতেন। আর সেসব থেকেই বিচার হতো কোনটি প্রকাশযোগ্য। এই ভাবেই সাহিত্যের বীজতলা আমাদের। লিটিল ম্যাগাজিন এই প্রবহমান স্রোতকে আজও তুলে ধরে আমাদের সংস্কৃতি যাত্রাকে অব্যাহত রেখেছে। আমরা ভুলে যেতে পারি না এর অবদানগুলি।
খুব সাম্প্রতিক সময়েও কয়েকটি লিটিল ম্যাগাজিনের উদ্যোগে এবং আন্তরিকতায় আমার কয়েকটি কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়েছে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য হল: বর্ধমান থেকে প্রকাশিত বার্ণিক প্রকাশন পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিয়ে ‘জ্যোৎস্নায় সারারাত খেলে হিরণ্য মাছেরা’ বইটি প্রকাশ করেছে। এবং ক্রমান্বয়ে অনেকগুলো বই প্রকাশ করে চলেছে। আর এইসব বইয়ের জন্য যথারীতি বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়ে আমাকে রয়্যালিটিও প্রদান করে। কবিমন পত্রিকার উদ্যোগে প্রকাশ করেছে ‘উন্মাদ বিকেলের জংশন’ কাব্যগ্রন্থটি। নন্দিতা বন্দ্যোপাধ্যায় পাণ্ডুলিপি চেয়ে নিয়ে নিজেই কাব্যটির প্রচ্ছদ এঁকে ভূমিকা লিখে খুব যত্নের সঙ্গে প্রকাশ করেছেন। বইটির প্রকাশ অনুষ্ঠান কাঁথি বইমেলায় তা আমার হাতে তুলেও দেন। শুধু বইই নয়, আমাকে এবং আমার গৃহকর্ত্রীর জন্য দুটি কাপড়ও তুলে দেন। এই মহানুভবতার স্পর্ধা যে লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদকেরাও দেখাতে পারেন তা ইতিহাস হয়ে রয়েছে আমার লেখার মধ্যে।