২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ ভোর ৪ টা। শহুরে নাগরিক পাখি কাকেরও তখনো ঘুম ভাঙ্গেনি। আমি ও আমার রুমমেট ইব্রাহিম ঘুম থেকে উঠে কাপড়ের ব্যাগ নিয়ে চলে গিয়েছিলাম তিতুমীর হলের আর এক বন্ধু জাহিদের কাছে। খু্ব ভোরেই আমাদের যত্নবান দায়িত্বশীল স্যাররা চলে এসেছিলেন ক্যাম্পাসে, সবকিছু গোছগাছের ব্যাপার ছিল। আমরা স্যারদের যথাসম্ভব সাহায্য করে হলের পুকুরেই গোসল করে রেডি হয়ে নিলাম। সব বন্ধুরা ক্যাম্পাসে চলে আসছিল ৮.৩০ নাগাত। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ক্যাম্পাসের গাড়ি করে খুলনা লঞ্চঘাট পর্যন্ত। তারপর তিন তলার বিরাট লঞ্চে করে স্বপ্নের সুন্দরবন! আমি একটু বেশীই এক্সাইটেড ছিলাম। কারণ এটা আমার প্রথম সুন্দরবন ভ্রমন ও দ্বিতীয় শিক্ষাসফর। প্রথম গিয়েছিলাম ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াকালীন শিল্পী এস এম সুলতানের বাড়ি। এতটা বছর পর এই অনার্স ২য় বর্ষে এসে সহপাঠী বন্ধু আর প্রাণের স্যারদের সাথে ভ্রমণ…

সত্যিই লিখতে বসে সেদিনের মত উত্তেজিত হয়ে যাচ্ছি। আমরা লঞ্চঘাটে পৌঁছলাম প্রায় দশটার দিকে। গাড়ি থেকে নেমেই আমরা ২য় বর্ষের সবাই ফটোসেশনের প্রথম পর্ব সেরে নিলাম। তারপর স্যাররা আমাদের নাম ডেকে ডেকে টি-শার্ট দিলেন আর আমরা সেটা নিয়ে লঞ্চে প্রবেশ করলাম। আমরা (আমি আর ইব্রাহিম; দুজনেই ডিপার্টমেন্টের ১নং দুষ্ট ) অবশ্য আগেই চুরি করে লঞ্চের ভিতরে ঢুকে কোথায় কি আছে দেখে নিয়েছিলাম। সবার লঞ্চে উঠার পর্ব শেষ হলে টি-শার্ট গায়ে দিয়ে চলল ২য় বারের মত ফটোসেশন।

ও হ্যাঁ ইতিমধ্যেই আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন খুলনা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জনাব মোঃ সফিউল্লাহ সাহেব।
তাঁর আরও একটি পরিচয় হলো তিনি আমাদের কলেজের অর্থনীতি বিভাগেরই একাধারে ছাত্র ও শিক্ষক ছিলেন, ফলে আমরা তাঁকে পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হয়েছিলাম। আমাদের লঞ্চ ছেড়ে দিল সুন্দরবনের উদ্দেশ্যে সকাল এগারটায়। গন্তব্য হাড়বাড়িয়া ও করমজল।

শান্ত রুপসা নদীর স্থির জল কেটে কেটে আমাদের লঞ্চ ছুটে চলছে। আর সাথে চলছে আমাদের মজা আর মজা। কত্ত মজা করেছি সেদিন তার ইয়াত্তা নেই। কে বাদ পড়েছে আমাদের দুই দুষ্টু মজারুর কাছ থেকে? লঞ্চের কেবিনের কাঁচের ছোট্র জানালা খুলে কেবিনে ঢুকে দখল করেছিলাম সবচেয়ে ভালো রুমটা। লঞ্চের সামনে চলছিল বড় ভাইয়া আপুদের গানের আসর সেখানে কিছুক্ষণ মজা করেছি একসাথে গান করে। কখনোবা নিচতলায় স্যারদের সাথে মধুর আলাপ ও ফটোসেশন। কখনো সহপাঠীদের সাথে ইচচ্ছামত বাদরামি…

আমাদের তিনতলার এক কেবিনে চলছিল ছেলেদের তাসের আড্ডা আমাদের কি আর খেলার দিকে মন! যতটা পারা যায় বাদরামি করেছিলাম সেদিন। ও হ্যাঁ একটা মজার ঘটনা মনে পড়ে গেল আমরা সবাই-ই সাথে করে ব্যাগ নিয়ে গিয়েছিলাম তবে আমাদের দুই বন্ধুর ব্যাপারটা ছিল আলাদা। আমরা সাথে করে অতিরিক্ত টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার নিয়ে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে ঐখানে যাওয়ার পর গোসল করব। তো আমাদের পিকনিকের নির্ধারিত টি-শার্টটি আমার গায়ে বড় হয়ে গিয়েছিল তাই আমি ওটা খুলে শুধুমাত্র একটা হাফ স্লিভস টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার টা পরে ছিলাম গলায় টাইয়ের মত করে গামছাও বেধেছিলাম। ওদিকে আমরা কৌশলে ভালো কেবিনটা দখল করায় বড় ভাইয়ারা আমাদের উপর ক্ষেপে গিয়ে আমার ব্যাগ থেকে আমার পরে যাওয়া শার্ট, প্যান্ট আর পিকনিকের সেই টি-শার্ট টা চুরি করে লুকিয়ে রাখেন।

অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তার আর হদিশ মেলে না। স্যারদের বলেও কোন লাভ হয় না। অগ্যতা ঐ পরনের পোষাকেই সারাটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। সকালের নাস্তা লঞ্চে উঠেই পেয়েছিলাম। লঞ্চ চলছে জলরাশি কেটে কেটে সাতক্ষীরা রুটে দুই পাশ মৃদুমন্দ গতিতে পিছনে ফেলে। দুরের দালান গুলো ক্রমেই ছোট থেকে আস্তে আস্তে বড় হয়। আবার পিছনে মিলিয়ে যায়। লঞ্চের নিচ তলায় চলছে ছোট্ট অনুষ্ঠান। সুন্দরবন সম্পর্কিত বিভিন্ন জ্ঞান মুলক কথা শোনা হল বড় ভাইয়াদের কাছ থেকে।

আমাদের মোহাম্মদ আলী স্যার, ড. মোঃ শাহীন আহমদ স্যার, এরশাদ স্যার, ফারিয়ান স্যারসহ অনেকেই তাদের পূর্ববর্তী সুন্দরবন ভ্রমণের কাহিনী বললেন। সবচেয়ে ভালো লাগল জনাব সফিউল্লাহ সাহেবের কথাগুলো। তাঁর চাকুরী জীবনের রোমান্সকর ঘটনা আমাদের শোনালেন। শোনালেন বনদস্যুদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে বীরত্বের কথা। আমরা সুন্দরবন সম্পর্কে যথেষ্ট সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছিলাম তাঁর কাছে। অনুষ্ঠানে নৃত্য,কবিতাবৃতি,একক অভিনয় গুলো খুবই সুন্দর হয়েছিল। দুপুরের দিকে আমরা করমজল পৌঁছলাম।

আমাদেরকে কমলা আর আপেল দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হল। সবাই এখানে হরিণ, কুমির দেখতে আর ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে গেল। আমরা বরাবরই একটু আলাদা। ছয় সাত জন বন্ধু মিলে দল ছাড়া হয়ে গেলাম। বনের ভিতর মুক্ত মনে স্যারদের কড়া নির্দেশ আর কানে নিলাম না। আগেই বলা উচিৎ ছিল এই পিকনিক নিয়ে আমি এতই এক্সাইটেড ছিলাম যে পিকনিকের ক’দিন আগেই একটা ক্যামেরা যোগাড় করেছিলাম। তো ক্যামেরা নিয়ে চলে গেলাম পুকুরের ঝোপের মধ্যে যেখানে ইয়া বড় এক কুমির দাড়িয়ে। একেবারে পানির কাছাকাছি গিয়ে ছবি তুললাম কুমিরের সাথে।

ছয় সাত জন বনের কাঁদাপানি আর শ্বাসমূল ভেঙ্গে ছুটে গেলাম বনের গভীরে ঠিক বেয়ার গ্রিলসের মত। ইচ্ছে ভ্রমণের পূর্ণতা পাওয়া। বাঘ তো এদিকে নেই আগেই আগেই জেনেছি। তবু যদি দু একটা হরিণ বা বানরের দেখা মেলে। মজার বিষয় হলো হরিণ দেখিনি তবে হরিণের পায়ের ছাপ আর বিষ্ঠা দেখেছি। ছবিও তুলেছি ইচ্ছা মত। কখনো ক্যামেরা গাছে ঝুলিয়ে রেখে সবাই একসাথে কখনো নিজেরা গাছে উঠে বানর হয়ে। বনের ভিতর দিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমরা আবার স্যারদের দলে ভিড়ে গেলাম।

করমজল ওয়াচ টাউয়ার উঠলাম। উপর থেকে সুন্দরবনের সৌন্দর্য অবলোকন করলাম। পালা করে সব স্যারদের সাথে ছবি উঠালাম। তারপর আরো কিছুক্ষণ বনের ভিতর হাটলাম। হাটতে হাটতেই টের পেলাম প্রচণ্ড খিদে পেয়েছে। স্যারদের বলে সবাই মিলে চলে এলাম লঞ্চে। রান্নার ব্যবস্থা হয়েছিল লঞ্চেই। মুরগীর রোস্ট, খাসির রোস্ট আর ডাল দিয়ে চলল দুপুরের খানাপিনা। উফফ কি যে মজা করলাম খাবার সময়! বেলা গড়িয়ে গেলে লঞ্চ ছাড়ল হাড়বাড়িয়ার দিকে।

কি অপরুপ দৃশ্য! সবুজ বন এসে মিশেছে নদীতে। পড়ন্ত বিকেলের সোনালী আলোয় বড় মায়াময় দেখাচ্ছিল সুন্দরবনকে। এই সুন্দরের অবয়বে নিজেকে ফ্রেমবন্দী করতে ভুলিনি কেউই। বেলা গড়ায় আমাদের লঞ্চ যায় হাড়বাড়িয়ার দিকে। একসময় লঞ্চের চালক আঙ্কেল বললেন ফিরতে হবে না হলে খুলনা ফিরতে অনেক রাত হবে। কি আর করা সুন্দরবনের অবারিত সৌন্দর্য দেখতে দেখতে পিছনের পথে এগুতে লাগলাম। সন্ধ্যায় লঞ্চের ভিতর চলল আমাদের নাচ গানের আসর। খুব মজা করেছি সেদিন। রাত এগারটার দিকে খুলনা লঞ্চ ঘাটে আমাদের লঞ্চ ভিড়ল। ও হ্যাঁ আমার সেই হারানো টি-শার্ট আর প্যান্ট কিন্তু এক বড় ভাইয়ের ব্যাগেই পেয়েছিলাম।

কি উপভোগ্যই না ছিল সেই সুন্দরবন ভ্রমণ। চোখ বুজলেই চোখের সামনে ভেসে উঠে সেই ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। যদি সুযোগ আসে বারবারই গ্রহণ করব সুন্দরবন ভ্রমনের দাওয়াত।