[আফসার নিজাম আপাদমস্তক কবি। কবিতা তার ভাব প্রকাশের মাধ্যম। তবে বেশকিছু ছড়া নির্মাণ করেছেন। যা আমাদের চিন্তাজগতে কিছুটা হলেও কম্পন তৈরি করেছে। এছাড়া তিনি গল্প, প্রবন্ধ, গীতিকবিতা ও চিত্রনাট্য রচনা করেছেন। জীবনের সিংহভাগ সময় ব্যয় করেছেন সাহিত্যসেবায়, সাহিত্যিকদের সেবায়। সাংস্কৃতিক অঙ্গণে এমন একজন মানুষ বিরল। সরল ও সাদা মনের মানুষ তিনি। তার সাক্ষাৎকার গ্রহণ করতে পেরে আমরা আনন্দিত। আগামীতে তাকে নিয়ে আমাদের আরো আয়োজন থাকবে। –আহমেদ খায়ের]

আহমেদ খায়ের : আসসালামু আলাইকুম, কেমন আছেন।
আফসার নিজাম : ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ। ভালো আল্লাহর অশেষ রহমতে খোশ আছি।

আহমেদ খায়ের : ছড়া কি এবং কেনো?
আফসার নিজাম : ছড়া মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত ছন্দবদ্ধ কথামালা। প্রাচীন যুগে মানুষ তার ভাব বিনিময়ের মাধ্যম হিশেবে ছড়াকেই অবলম্বন করতেন। মানুষ যখন গদ্যসাহিত্য শুরু করে তখন এই ছন্দবদ্ধ ফর্মটি একটি নির্দিষ্ট গন্ডির ভেতরে আবদ্ধ হয়। আমরা যাকে স্বরবৃত্ত বলে চিহ্নিত করি। তারপর মানুষ এই ছন্দবন্ধতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কেউ কেউ ছন্দে ছন্দে কথা বলে। এটি মানুষের আদি প্রবৃত্তি। মানুষ যখন ছন্দ হারিয়ে ফেলে তখন সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে আমরা পাগল বলে উপহাস করি। কারণ সে
জীবনের ছন্দ থেকে অনেকটাই দূরে অবস্থান করছে। তাই আমাদের জীবনে ছন্দ প্রয়োজন। মানুষ যখন হাঁটে তখন সে একটি নির্দিষ্ট ছন্দে হাঁটাচলা করে। যখন তার পায়ের ছন্দ পরিহার করে প্রথম পা ফেলে ৬ ইঞ্চি পর পরবর্তী পা ৮ ইঞ্চি পর তারপর ৭ ইঞ্চি পর তখন সে হাঁটতে পারবে না। পরে যাবে। তার সামনে এগুনো সম্ভব হবে না।

আহমেদ খায়ের : আপনি কেনো ছড়া লেখেন!
আফসার নিজাম : আমি তো ছড়া লিখি না। আমি লিখতে জানি না। আমাকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নেয়। আমার ভেতরে একটি ভাব উদ্ভব হয়। সেই ভাবটি যখন প্রবল হয়, তখনে সে বের হয়ে আসে। একটি উদাহরণ দিলে বুঝতে সহজ হবে। একটি বেলুনে যখন আপনি হাওয়া দেবেন এক সময় সে প্রবল শক্তি নিয়ে ফেটে বের হয়ে আসে। বেলুনটি হলো আমি এর ভেতরে যে হাওয়া তা হলো ভাব। ভাবটি যখন প্রবল হয়ে ওঠে তখনে সে বের হয়ে আসে তখনই হয়ে যায় সে ছড়া বা কবিতা বা গল্প বা উপন্যাস। আপনি যে নামেই তাকে ডাকেন সে হলো আপনার সৃজনক্রিয়া।

আহমেদ খায়ের : আমাদের সমাজে ছড়ার প্রভাব কি।
আফসার নিজাম : প্রথমে আমাদের বুঝতে হবে লেখক কি সমাজের লোক। সমাজের সাথে তার সম্পর্ক কতোটুকু। যে লেখক সমাজের সাথে যতো সম্পৃক্ত তার লেখা সমাজে ততোটুকু প্রভাব বিস্তার করে। কারণ সে সমাজে কাজ করতে গিয়ে সমাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়। সমাজের সাথে বোঝাপড়াটি তার হয়ে যায়। তখন যদি লেখক সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু লিখে তখন সমাজে তার প্রতিফলন হয়।

আহমেদ খায়ের : বাংলা ছড়ার ইতিহাস এবঙ বিভিন্ন যুগে সফল ছড়াকারদেও ব্যাপারে কিছু বলুন।
আফসার নিজাম : যেদিন আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকেই ছড়ার ইতিহাস শুরু। আল্লাহ যখন আদম আ.কে সৃষ্টি করেছেন। তার মুখে ভাষা দিয়েছেন। আল্লাহকে স্মরণ করার জন্য। আদম আ. ছড়ার মাধ্যমেই সৃষ্টিকর্তার প্রশংসা করেছেন। বাংলা ভাষায় ছড়াটি ভিন্ন রকম। তার লিখিত রূপ হওয়ার আগেই ভাবরূপটির জন্ম হয়েছে। মানুষের স্মৃতির ভিতরে সে বসবাস করেছে। মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছে সেই ছন্দের ছড়া। এটাই মূলত ছড়ার ইতিহাস। যুগে যুগে সফল ছড়াকারকে এমন প্রশ্নের উত্তর হয় যে ছড়াকারের নাম আমি জানি না সেই হলো সফল ছড়াকার। কারণ তাদের ছন্দের ঝংকারে আমার দাদা দুলেছে, বাবা দুলেছে, আমি দুলেছি আমার ছেলেও দুলছে। অতএব সফল ছড়াকারদের সম্পর্কে আমার সালাম।

আহমেদ খায়ের : আপনি কার ছড়া পছন্দ করেন।
আফসার নিজাম : আমি ছড়া পেলেই পড়ি। পড়ায় আমার অরুচি নেই। ছড়াটি ভালো লাগলে তার আরো ছড়া পড়ি। ভালো না লাগলে ওখানেই শেষ করে দিই। এটাই আমার রুচি। ব্যক্তি বিশেষ ছড়া পছন্দের কিছু নেই। কারণ একজন লেখকের সকল লেখাই সেরা হয় তেমন কোনো ইতিহাস নেই। এই ইতিহাস একমাত্র আল্লাহর। তার সকল সৃষ্টিই শ্রেষ্ঠ। মানুষে যে সকল বিষয় সৃজন করে তা শুধু স্রষ্টার সৃষ্টির প্রতিফলন যাকে ডিকন্সন্ট্রাকশন বলা যায়। অতএব আমি আমার মনের মতো সকল লেখাই পাঠ করি এবং তাদেরই পছন্দ করি।

আহমেদ খায়ের : কিশোর পত্রিকাগুলো এবঙ অন্যান্য ক্ষেত্রে ছড়ার সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন কি?
আফসার নিজাম : একটি সমাজে একটি রাষ্ট্রে যখন কবি থেকে ছড়াকারের সংখ্যা বেশি হয় তখন বুঝতে হবে সেই সমাজ অচিরেই দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ চিন্তার যে সামগ্রিক দিক আছে সেখানে ছড়া অনুপুস্থিত থাকে। সে শুধু সমাজের উপরিভাগে বিচরণ করে। ছড়া এখনো আমাদের সামগ্রিক চিন্তাকে ধারণ করতে পারেনি। পারবে বলেও আশা করা যায় না। আমাদের সমাজে, রাষ্ট্রে এখন ছড়াকারদের জয়জয়কার। এটা আশার কথা নয়। তবে কিশোর পত্রিকা এ বিষয়গুলো মূল্যায়ন করছে। সেখানে ঠিকই করছে। শিশু-কিশোররা কল্পনার জগতে বসবাস করে। কিশোররা যখন বোধসম্পন্ন হয় তখন ভাবের জগতে বিচরণ করবে। ভাবের জগতের প্রাথমিক সিঁড়ি ছড়া। ছড়া সে অবস্থানেই থাকুক এটাই আশা করি।

আহমেদ খায়ের : এখন কি ধরনের ছড়া লিখা উচিৎ?
আফসার নিজাম : কি ধরনের ছড়া লিখা উচিৎ সেটা লেখকই নির্ধারণ করবে। কোনো সময়ই ফর্ম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো বিষয়। লেখক যতোটা শক্তিশালী তার বিষয়গুলোও ততো শক্তিশালী। বিষয়টিকে সে যতোটা অনুধাবন করবে সে ততোটা ফুটিয়ে তুলবে। মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসবে। মানুষের কথাগুলো সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হবে।

আহমেদ খায়ের
সম্পাদক, শীতলক্ষ্যা
প্রথম সংখ্যা, ডিসেম্বর ২০১৮