আমি যখন তিন বছরের, দবির সাহেব আমাকে দত্তক নেন। আমার গরীব পিতা মাতা মাত্র দশ হাজার টাকার বিনিময়ে আমাকে বিক্রি করেন। এমনটিই শুনেছি।
আমি লোপা। ধীরে ধীরে দবির সাহেবের পরিবারে বেড়ে উঠি।

লোপা মেয়েটি খুব শান্ত। তবে দুরন্তপনারও শেষ ছিল না। মাঝে মাঝেই লোপাকে খুঁজে পাওয়া যেত না। আজ এ বাড়ি তো কাল ও বাড়ি। নয়ত কোন মাঠে। এভাবেই ঘুরে বেড়াতো। লোপা বেড়ে উঠতে উঠতে নানা রকম ভাবে জেনেছে যে ও মেয়ে। অনেক কিছুই যেন ওর জন্য বারণ। যা ইচ্ছে খাওয়া, যা ইচ্ছে চাওয়া কোন কিছুই ওর জন্য নয়। দবির সাহেব যা চাইত তাই ওকে করতে হত। দবির সাহেবের স্ত্রী মতিয়া বানু। মতিয়া বানু ওকে দিয়ে অনেক কাজ করিয়ে নিতেন আর প্রায়ই উপোস রাখতেন। দুরন্তপনার কারণে এমন অনেক দিন ওকে উপোস থাকতে হয়েছে।

দবির সাহেবের সন্তান না থাকার কারণেই লোপাকে দত্তক নেয়া। কিন্তু সকল সময়ই দায়িত্ব থেকে সরে গেছে। কখন লোপার কি লাগবে কোন কিছুতে কখনোই দবির সাহেব কিম্বা মতিয়া ভ্রুক্ষেপ করে নি।

একদিন পাশের বাড়ির লোকমান চাচা বলে, মেয়েটাকে স্কুলে কেন দিচ্ছ না? কথাটা শুনে দবির সাহেব লোপাকে একটা স্কুলে ভর্তি করান। মেয়েটি মানে লোপা কয়েক দিনেই তার যোগ্যতার প্রমাণ দেয়, যে ও লেখাপড়ায় ভালো।

মতিয়া শেখাতো, আমি তোর মা আর উনি বাবা। লোপা মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতো, বোঝার চেষ্টা করতো। মা—-বাবা—-।
কিন্তু ডাকতো না। মতিয়া বলেন, তুই কি আমাদের মা-বাবা বলে মানিস না? লাঠি দিয়ে পেটাতো। লোপা বলত মা—বাবা–।
মতিয়া বলত কোন ঘরের মেয়ে এনেছি? হাড় জ্বালানি মেয়ে। আমার হাড় মাংস জ্বালিয়ে খেল। এর মধ্যে মতিয়া গর্ভবতী হয়। একটি ভাই হয় লোপার। যেন একটি পরিবার। খুশিতে ধরে না। কিন্তু কেউ জানে না এর ভিতরের বোবা কান্না।

লোপা বড় হয়। এখানে সেখানে নানা জায়গা থেকে মানুষ ছিঃছিঃ করে। কেমন মেয়ে? কেউ গায়ে হাত দেয় কেউ ওড়না ধরে টানে। লোপা ভাইটিকে নিয়ে মক্তবে যায়। ধর্ম শিখে, নামাজ কালাম শিখে। দবিরের কোন কিছুতে যেন মন নেই। মক্তবের হুজুররা দবিরকে ডেকে বোঝায়। নামাজের দিকে আসতে বলে। প্রথমটায় দবির গা করে না। পরে নিজেই আল্লাহ্‌-র রাস্তায় মনঃ নিবেশ করে।
নিয়মিত মসজিদে যায়, রোজা রাখে। ধীরে ধীরে সমাজের সামনে একটা মুখোশের মত তৈরী হয়। দবির যে চাকরি করে তাতে সে ঘুষ খায় না। নিজেকে খুব সৎ লোক মনে করে। নিজের মনে নিজেই গোমড়ায়।
দুই পয়সা রোজগারের দেমাগ। নিজের মেয়ে না হওয়ায় বড় হয়ে উঠার পর থেকেই দবিরের নজর পড়ে লোপার উপর। যখনি চোখে পড়ে খেই খেই করে উঠে মতিয়া। বলে, তোকে লাত্থি দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিব।

বাবার আদর আর মায়ের স্নেহ সেই ভাবে কখনোই পায় নি লোপা। তাই তার বুঝতেও বাকি থাকে না কিছু। মাঝে মাঝে জানতে চায় মতিয়ার কাছে, আমি কি তোমাগো মাইয়া? মতিয়া আরও খেই খেই করে উঠে। হায় হায় হায় মাইয়ার লাইগ্যা এত কিছু করি, খাওয়াই, পিন্দাই, মাইয়া এইডা কেমুন কথা কয়। পাড়ার মানুষকে জানান দেয় নিজের মাইয়া।

মুখে কিছু বলতে পারে না লোপা। এ কেমন কথা? নিজের মনের ভিতরে বাবা মায়ের ছবি প্রায়ই কল্পনা করে, আঁকে। এদের সঙ্গে তো কোন মিল নেই। মক্তবের পাঠ শেষ করে লোপা। মতিয়া বিয়ে দিতে চায়। কিন্তু দবির রাজী হয় না। বলে, কয়টা দিন যাক। অরে কাজে লাগাও। তোমার শরীরটা ভালো না। দিন দিন শরীর ভেঙ্গে পড়ছে। ওকে কাজ করতে দাও। তুমি বিস্রাম করো। এই কথা শুনে মতিয়া খুশি হয়। স্বামীর প্রতি ভক্তি যেন আরও বাড়ে। এমনিতে স্বামীর কথায় চলে। যা বলে সেভাবে মেনে চলে। দবির বলে, আখেরাতের চিন্তা করো। নিয়মিত নামাজ পড়। আল্লাহ্‌ আল্লাহ্‌ করো। আল্লাহ্‌ নিশ্চই আমাদের ভালো করবে। মতিয়া বলে, কিন্তু আপদ তো বিদায় হইতেছে না।
চিন্তা করিও না। সব হবে। তুমি খালি আল্লাহ-র উপর ভরসা রাখো।

লোপাকেও বলে, তোর অন্তরে শয়তান বাসা বান্দছে, নামাজ পড় ঠিক মত। লোপা বলে, আব্বা আমিতো নামাজ পড়ি। দবীর বলে, না না হইবো না। আরও বেশি পড়তে হইবো নিয়ম কইরা।
মতিয়াকে ডেকে বলে, মাইয়া ডাঙ্গর হইছে। এখনি তো দরকার। মতিয়া বলে, কি কও তুমি? আমি কই কি বিয়া দিয়া দেও। স্বামীর চরিত্রের দোষ আছে সে কথা যেন মতিয়া স্বীকার করতে চায় না। বারবার বলে, বিয়া দিয়া দাও।
একদিন লোপাকে ডেকে বলে, শোন তুই তো আমাগো নিজেগো মাইয়া না। তরে কই বিয়া দিমু, কেমনে দিমু? তুই চইলা যাইতে পারস না?

লোপা মনে মনে ভাবে, আমি যদি চইলা যাই ছাড়া পামু?
তারপর বলে, তোমরা যদি আমার বাপ মা না হইয়া থাকো তাইলে আমার বাপ মায়ের সন্ধান দেও। মতিয়া বলে, আমরা জানি না তোর বাপ মা কই। আমাগো এইহেনে থাকলে আমাগো কথা মত চলবি। তারপর কিভাবে দশ হাজার টাকায় কিনে এনেছিল তার ইতিহাস বলে।
বিশ্বাস হয় লোপার। হয়ত তাই! নইলে এই অবস্থা হবে কেন? কেন সে বাবা মা থাকতেও এতিম হোল। কুল কিনারা পায় না। আজ সে সতের বছরের। বিয়ের বয়স হইছে। কিভাবে নিজেকে অন্য সবার কাছ থেকেও লুকাবে?

মতিয়া মনে মনে বলে, ঘর বর দেখুম তোর লাইগ্যা? যে চুলায় ইচ্ছা সেই চুলায় যাইয়া মর!
এরপর একদিন আবার টাকার বিনিময়ে বিক্রি করে লোপাকে। যেভাবে টাকা দিয়ে কিনেছিল একবার। আর বলতে থাকে, এই টাকা দিয়া তরে কিনছিলাম। অনেক টাকা খরচা হইছে পালতে। তাও নিজের কইরা পাই নাই। এইবার তর পথ দেইখা ল! তর বিয়া দিলাম।

টাকা নিয়ে বিক্রি করে দবির বলছে, বিয়ে দিল। লোপার মাথা কাজ করে না। এরা কারা? কোথায় নিয়ে যাবে? শুধু দেখে লোকটি ড্যাবড্যাব করে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। লোপা একবার শুধু মতিয়াকে বলে, আম্মা! আমার কি সর্বনাশ করলেন?
মতিয়া বলে, কোন সর্বনাশ করি নাই। লোকটি এসে লোপার হাত ধরে। আরও কয়েকজন লোক ছিল। যে লোকটি লোপার হাত ধরে তার নাম ইলিয়াস। সে একজনকে উদ্যেশ্য করে বলে, বাবা আমি এই মেয়েরে সাক্ষর কইরা বিয়ে করবো।

লোকগুলো একজন আরেকজনের দিকে তাকায়। লোপা শুধু নিথর হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরাও যে খুব অচেনা। কোথায় যাবে এখন?

এই লোকটি হাত ধরে আছে।