ষড় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। গ্রীস্ম বর্যা শরৎ হেমন্ত শীত ও বসন্ত এই ছয়টি ঋতু নিয়েই আমাদের বাংলাদেশ। এখানে এক একটি ঋতুর বৈচিত্র একেক রকম। জীবনের যেমনি অধ্যায় রয়েছে ঠিক প্রকৃতিতেও তেমনি অধ্যায় রয়েছে। বর্ষা ঋতুর পরেই আসে শরৎ ঋতু। মানব জীবনের সবচেয়ে শান্ত ও ব্যালেন্সডময় সময় যেমনি হচ্ছে পৌঢ়ত্ব ঠিক ঋতুর জীবনেও শরৎ তেমনি একটা সুশান্ত ঋতু। এই সময় প্রায়শ মেঘহীন আকাশ থাকে যেখানে ঘর্মাপ্লুততা থাকেনা বললেই চলে। শুভ্র মেঘ আকাশের এই দিক থেকে ওদিকে উড়ে বেড়ায়। মাঝে মাঝে চাঁদের উপর দিয়ে যেন সেই মেঘেরা ছুটিয়ে বেড়ায় দুরন্ত বালক বালিকার ন্যায়। চাঁদের কিরণে কিন্তু মেঘের সৌন্দর্য আরো আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের চোখে। তাইতো সাদা সাদা মেঘকে নিয়ে পৃথিবীর অসংখ্য কবি ও গীতিকার লিখেছেন অসংখ্য ছড়া কবিতা ও গানহ। এই ঋতুর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে গাঢ় বেগুনি। পুরো প্রকৃতিকে এই সময় আনকোরা নতুন বলে মনে হয় যেমন ঘর্মাপ্লুত শরীর স্বচ্ছ জলে ডুব দিলে শরীরের সমস্ত আবর্জনা ধুয়ে মুছে যায় আর শরীরকে অতি আকর্ষণীয় দেখা যায়। ঠিক তেমনিভাবে প্রকৃতির ঋতু বর্রষার ভারী বর্ষণে মাঠ ঘাট মেঠো পথ সবই কাদায় পিচ্ছিল হয়ে যায়। হাটঁতে মানুষ হোচট খায়। তীব্র বর্ষণে ছাতা মাথায় দিয়ে বের হতে হয় আর এই সব কিন্তু পেরিয়ে শরৎ আলাদা সৌন্দর্য নিয়ে হাজির হয় আভাদের মাঝে। এই সময় সাধারণত বৃষ্টি কম হয়। বৃষ্টি হলেও অতি দ্রুত চলার পথ গুলবাগিচার পথ শুকিয়ে যায় কি যেন একটা আবেগে মন বরে যায়। শরৎ এর এই সময় পানির তথা বৃষ্টির বর্ষণ কম থাকে বলে হাঁট বাজারে সতেজ জীবন্ত মাছ ওঠে, বিবিনন্ন ধরণের শাক সব্জি বাজারে প্রচুর ওঠে।বিশেষকরে শাপলার ছড়াছড়ি দেখা যায় দাম কম কিন্তু পুষ্টিগুণে ভরপুর। পাকতে থাকে তাল যা খুবই সুস্বাদু শরৎ এর এই ফল। তালে রস দিয়ে বিভিন্ন ধরণের পিটা বানানো হয় খেতে দারুণ স্বাদ আর পুষ্টিগুণতোআছেই। বরা ফেলে কৈ মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করতে আনে। পুই শাখসহ নানান শাখের সমারোহ পরিলক্ষিত হয় ও হচ্ছে এই সময়। ছোট শিশু কিশোর ছেলেমেয়েরা এই সময় খেলাধুলা করে থাকে বাড়ির আঙ্গিনায়। স্বচ্ছ জলে হংসমিথুন সাঁতার কাটে ভালোবাসার উচ্ছ্বাসে আবার ঠোঁট দিয়ে খুঁজে বেড়ায় খাদ্য পানির নিচে। মাঝে মাঝে তাদের ডাকের সুর ধ্বণিতে উপচিয়ে পড়ে পুকুরের চারিপাশ। একটা আনন্দঘন চিত্রের অবতারণা হয় যা প্রকৃতিকে সৌন্দর্যমন্ডিত করে তোলে। ছোট ছোট নৌকো নিয়ে গ্রামের কৃষক শ্রেণিরা তাদের গোরুর জন্য ঘাস তুলে নিয়ে আনে মাঝে মাঝে ঐ নৌকো দিয়ে তারা মাছও ধরে। বিস্তীর্ণ জলাভূমিতে তখন অন্যরকম এক আনন্দের চিত্র উপস্থাপিত হয়ে মানুষের মনে ও প্রাণে আনন্দের হিল্লোল বয়ে বেড়ায়। শরৎতের এই ক্ষণে দিনের বেলায় প্রচন্ড রোদ থাকে।রোদের তীব্রতায় শরীরে ঘাম ঝরে আর প্রকৃতিও জুবুথুবু হয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকে যেন শেলকো নেত্রে দেখছে সুন্দরের নানানহ্ রুপ।

এই সময় ছাতিয়ানি গাছে গাছে রঙ ছোঁয়া ফুল ফুটে। রাতের আলোয় কি আঁধারে তারই সুবাস ছড়িয়ে পড়ে দিক বিদিক।সেই লোবান সুবাসে দু:খাকাতুর বিরহক্লিষ্ট মন জি’য়ে ওঠে নানন্দনিক আশা ভালোবাসার আশ্বাসে। মনটা অল্পক্ষণের জন্য হলেও স্নিগ্ধতার আবরণে ঢেকে যায়। গ্রামের আঁকা বাঁকা মেঠো পথগুলো শুকিয়ে যায় আর তাদের বুক দিয়ে মানুষ অভয়ার্তে এইদিক ঐদিক ছুটে যায়। একটা মিষ্টি সুশান্ত সময় যেন বহমান থাকে উল্লাসের স্রোতে নিজদেরকে ভাসিয়ে দেয় মানুষের আহত মন। এই সময় রাতের বেলায় মাটির গর্তে থেকে আনন্দে ঝিঁঝিপোকারাও গান গায়, জোনাকির পাখায় ভর করে আলো’র প্রপাত নামে রাতের আঁধারে। জোনাকির আলোয়ে রাতের পথিক পথ খুঁজে নেয় নির্ভীক সাহসে। প্রকৃতির বৃক্ষলতা সবই যেন বর্ষার ভারী বর্ষণের আঘাত থেকে সস্থির পেয়ে প্রতিটি শাখির পত্র শাখায় শাখায় আহ্লাদের সুর পরিলক্ষিত হয়। বৃক্ষরাজির ফুল ফল অনাবিল পুলক চিত্তে নেচে ওঠে সৌন্দর্যের ধারায় নিজেরা যেন অবগাহন করে দিব্যি চলার প্রয়াসী হয় যা মানব হৃদ সাম্রাজ্যে অবলোকন হয়ে থাকে। এই সময় আবার রাতের বেলায় কিছু কিছু শীত অনুভব হয় কেননা এই ঋতুতে শীতের জন্ম হয় বলে কথিত আছে। কথাটা আসলেও সঠিক। আমরা সত্যি তা ভালোভাবে অনুভব করে আসছি ও করছি। রাতের গভীরে গায়ে হালকা পাতলা কাঁথা দিতে হয় এমনকি দিয়েই থাকি। একেকটি সময়ের আভাস একেকটি সময় দিয়ে থাকে যা আমাদের জীবন ক্ষেত্রেও তারই চিত্র দেখার সুপ্রয়াসী হয়ে থাকি। কবি গীতিকার শিল্পী লেখকরা এই সময়কে ধারণ করে তাঁদের কলমের তুলিতে আঁচড়িয়ে নেন হাজারো শব্দমালা কখনও কবাতায় ছড়ায় প্রবন্ধে গল্পে উপন্যাসে নাটকে। তাঁদের সুদৃষ্টিতে অনাবাদী জমিন আবাদ হয়ে ওঠে আর সেইখানে সোনা ফলতে শুরু করে যেন। নদী ও সাগরের পাড়ে এই সময় অসংখ্য কাশফুল ফুটতে দেখা যায়। শান্ত বাতাসে তারা হেলে দুলে এইদিক ঐদিক ঢুলে পড়ে আবার দাঁড়ায় আবার দোলে।সেই দৃশ্য দেখে অশান্ত মনের জমিনে স্নেহ মমতা ও ভালোবাসার বর্ণালী সুবাস গ্রহণ করে পরিতৃপ্ত হয়।কাশ ফুল সারল্যতার প্রতীক স্বচ্ছ মনের প্রতীক এখানে হিংসা চলে যায় স্নেহ ও আদরের বন্ধনে। মানুষ প্রকৃতির এই ধারা সত্যিই অসাধারণ যদি এই শুভ্র সাদা কাশফুল দেখে শিক্ষা নেয়া হয় মানুষের।

শরৎএর এই বর্ণালী রঙে সমস্ত প্রকৃতিতে একটা শৈথিল্য আমেজ পড়ে যারই কারণে গোধূলি লগ্ন অত্যন্ত মনকাড়া রঙের ছড়াছড়ি দেখা যায়। সমস্থ গুল্ম লতা পাতায় একটা মিষ্টি মিষ্টি ভাব থাকে স্বপ্নাক্লিষ্ট মন শান্তনার ঢেউয়ে ঢেউয়ে দোল খায়। ঠোঁট রাঙা পাখিরা এইদিক ঐদিক উড়োউড়ি করে বেড়ায়। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে বাঁশ ঝাড় এক আনন্দগন পরিবেশ সৃষ্টি করে। মনে হয় গানের সুরকার তাদের কন্ঠ থেকে সুর নিয়ে সার্থক গানের সুর করে করে অডিও ভিডিও করে মানুষকে শোনায় আর সেই সুর শুনে মানুষ আবেগ আপ্লুত হয় ও হারিয়ে যায় সানন্দের মহাক্ষণটে। শুধু কি তাই?রাত্রি শেষে যখন ভোর হয় শিশিরের ছড়াছড়ি দেখা যায় পত্র পল্লবের উপর ঘাসের ডগার উপরে আর সূর্যের কিরণে যেন ঝিকমিক করে ওঠে। ভোরের হাওয়ার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় শীতের আগমনি বার্তা। মোটকথা শরৎ ঋতু প্রকৃতি ও মানুষের জীবনে এক অপূর্ব সৌন্দর্যের অধ্যায় অবতারণা করে আর জীবন ও প্রকৃতিকে নব রুপে রুপায়িত করে স্নিগ্ধতার সাম্রাজ্যে নিয়ে যায়।