অধ্যাপক ডক্টর সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.) শিক্ষা সংস্কারের জন্য আজীবন কঠোর পরিশ্রম করে গেছেন। বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন একটি শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ওয়ার্ল্ড সেন্টার ফর ইসলামিক এডুকেশনের মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় মনীষীদের সাথে তিনি চিন্তার আদান-প্রদান করেছেন। অভিজ্ঞতার নির্যাস ও অর্জিত সবটুকু সম্পদ দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় দারুল ইহসান প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৮৯ সালে। এর সরকারি অনুমোদন নেন ১৯৯৩ সালে। নিজের স্বপ্নের শিক্ষানীতির বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলেছেন সেখানে, যা তার জীবিত অবস্থাতে মানুষ গড়ার একটি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা পাদপীঠে পরিণত হয়েছিল। সৈয়দ আলী আশরাফ ইনস্টিটিউট অব হায়ার ইসলামিক লার্নিং ধর্মবিজ্ঞান বা দ্বীনি বিজ্ঞান অনুষদ। এ থেকেই দারুল ইহসানের সূচনা। দ্বীনি বিজ্ঞান অনুষদের অধীনে ‘ইসলামিক স্টাডিজ’ এবং দাওয়ার কোর্স, সময় ও থিসিস আমাদের দেশীয় এমএ থেকে ছিল উচ্চমানের। শিক্ষাদানের ভাষা ছিল আরবি। ফলে এখানকার ছাত্ররা আরবিতে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তিশালী হতো। এই অনুষদের শিক্ষাক্রম আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় স্বীকৃতি দিয়েছিল।
অধ্যাপক ডক্টর সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.)এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বাংলাদেশের সাবেক দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ম বিজ্ঞান অনুষদের ১৯৯০ থেকে ২০১০ ইং সাল পর্যন্ত ডীন ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মিশরের আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সুপণ্ডিত, আলিম এবং আল্লাহ ওয়ালা ব্যক্তিত্ব শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী। তিনি ডক্টর সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.)এর শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে প্রাণপণ চেষ্টা করে গেছেন। শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী তাঁর ধর্ম ও বিজ্ঞান সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থা প্রবন্ধে লিখেছেন “বিগত দুই দশকে বিখ্যাত এ মনীষী অধ্যাপক ডক্টর সৈয়দ আলী আশরাফ অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছেন। এ জাতির কল্যাণে, উম্মতে মুহাম্মাদীর জন্যে তিনি সারাটি জীবন ব্যয় করেছেন। ইউরোপ, দক্ষিণপূর্ব এশিয়া, আরব ও বাংলাদেশসহ ইসলামের কল্যাণময় আদর্শ ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য জীবনের মায়া, পারিবারিক ব্যস্ততা, অর্থের মোহ ত্যাগ করে বিশ্বজাহানের প্রভূ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই ভূমিকা রেখে গেছেন। তিনি এমন কিছু বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে চেয়েছিলেন যারা দাওয়াতের এ আমানতকে রক্ষা করতে পারবে। তাঁর দর্শন ও দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয় আমানত স্বরূপ। আসলে এ ধরনের মহান ব্যক্তিত্ব আর ফিরে আসবে না। তাই আমাদের উচিত তাঁর দর্শন তাঁর অবর্তমানে রক্ষা করা। তবেই তিনি শারীরিকভাবে মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর দর্শনের মাধ্যমে তিনি জীবিত থাকবেন।”
শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী বাংলাদেশে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইসলামের দাওয়াতী আলোচনা করে সকলের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছিলেন।
তিনি তাঁর শিক্ষার্থীদের ইয়া ওয়ালাদী বলে ডাকতেন। দরদমাখা নসিহত করতেন। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তব্য ছিলো ‘‘তোমরা যারা দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ধর্মবিজ্ঞান অনুষদ থেকে অধ্যয়ন শেষ করে বের হতে যাচ্ছো তাদের মধ্যে আমি দেখতে পাই আমার যৌবন, আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আমার দীর্ঘ জীবনের কর্মময় দিনগুলির প্রতিফলন। শুধু তাই নয়, তোমরা জাতির আশার আলো ও কাণ্ডারী। আজ তোমরা ছাত্র, আগামীতে তোমরা নেতৃত্ব দিবে, চিন্তাবিদ হবে। তোমরা যদি সর্বদায় জ্ঞানের চর্চা করো, দেশ তোমাদের দ্বারা উন্নত হবে। অন্যথায় উন্নতির গতিধারা থমকে যাবে, চরম দুর্দশা ও গ্লানি আবার ঘিরে ধরবে গোটা জাতিকে। সুতরাং তোমরা প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাও অতীতকালের আলেমদের ঋত সম্মান ও প্রতিপত্তি ফিরিয়ে আনতে। অধ্যবসায়ী হও এবং দ্বীনের জন্য জীবনকে কুরবান করো।”

শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী স্যার ছিলেন অত্যন্ত অমায়িক। তাঁর সম্পর্কে মুহাম্মাদ নিয়াজ মাহমুদ লিখেন-
“ডীন যে মোদের সাফতি স্যার খুবই উদার মন
ধনি-গরিব, ছোট-বড় সবাই তাঁর আপন।
যাদু মাখা বক্তৃতা তাঁর আরবি কাকে বলে
মোনাজাতের ধরণ দেখে হৃদয় যায় গলে।”
তাঁর যাদু মাখা আরবি বক্তৃতা, মোনাজাত, ক্লাসে পাঠের পূর্বে নিজ হাতে চা-বিস্কুট দিয়ে ছাত্রদের আপ্যায়ন, অতঃপর ইয়া ওয়ালাদী বলে পাঠদান এসকল গুণাবলি অন্য কোনো শিক্ষকের মাঝে পাওয়া বিরল।

আমাদের বাংলাদেশে অধিকাংশ ইসলামী দল সহীহ নিয়ত ও নেক উদ্দেশ্য নিয়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, এতে কোন সন্দেহ নাই। হয়তোবা পদ্ধতিগত দিক দিয়ে একটির সাথে অন্যটির কিছুটা পার্থক্য থাকার কারণে কারো কাছে কারোর পদ্ধতিগত বিষয়ে শুদ্ধ – অশুদ্ধের প্রশ্ন রয়েছে যা খুবিই স্বাভাবিক।
এদিকে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতিগত পার্থক্য থাকার কারণে আমরা কাউকে কাউকে ইহুদীর দালাল, আমেরিকার দালাল, ভারতের দালাল, কাদিয়ানীর দালাল বা ওয়াহাবী, লা-মাজহাবী, মাজারী এমনকি কাফের, ফাসেক বলে ফতোয়া দিতে কার্পণ্য করি না।
বাস্তবতা হলো একটি ইসলামী দলের সাথে অন্য ইসলামী দলের মতের ভিন্নতা খুবিই অল্প হলেও তাদের দ্বারা ইসলামের খেদমত, দ্বীন প্রতিষ্ঠার খেদমত কিন্তু স্বল্প নয়।
একটি পরিপূর্ণ ইসলামী বিপ্লব রচনার জন্য যেমনি প্রয়োজন একটি প্রশিক্ষিত জনশক্তির তেমনি প্রয়োজন দেশের সকল ইসলামী দলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা। শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী মনেপ্রাণে চাইতেন বাংলাদেশের আলেম-ওলামাকে ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে নিয়ে আসতে। অধ্যাপক ডক্টর সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.) জীবিত থাকা অবস্থায় তার তত্ত্বাবধানে মিশরের শাইখ বদরুদ্দীন ও শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী (রহ.) এর উপস্থিতিতে এবং তাদের প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় আলেমগণ হাত সম্প্রসারণ করে ঐক্য প্রচেষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা ওবায়দুল হক, পটিয়া মাদরাসার মুহতামিম মাওলানা হারুন ইসলামাবাদী, কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জব্বার ও খতমে নবুওয়াত আন্দোলনের নেতা মাওলানা নুরুল ইসলাম প্রমুখ।

বিগত কয়েক বছরে দেশে-বিদেশে ইসলামকে অপবাদে জর্জরিত করে বেশ কিছু বিষয় প্রকাশিত হতে দেখা গেছে। এমনকি বাংলাদেশের সমাজকেও সেই বিষবাষ্প বিষিয়ে তুলে। তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রতিটি বিষয় স্পষ্ট করে উপস্থাপন করার জন্য শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী কলম ধরতে বাধ্য হন। তিনি আরবী ভাষায় লিখেন বেশ কয়েকটি বই। তার মধ্য থেকে কয়েকটি বাংলায় অনুবাদ হয়েছে। তাঁর লিখিত বইগুলির অন্যতম ১. ড. সৈয়দ আলী আশরাফ রহ. এর দৃষ্টিতে শিক্ষার ইসলামীকরণ একটি পর্যালোচনা ২. দিরাসাতু ফিল ইখতিসাদিল ইসলাম ৩. মুসলিম নারী প্রসঙ্গ উল্রেখযোগ্য।

শাইখ মুহাম্মাদ সায়্যিদ সায়্যিদ আস-সাফতী (রহ.) বাংলাদেশের নারীদের নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। মুসলিম নারী প্রসঙ্গ বই-এ তিনি উত্তরাধিকার সম্পর্কে নারীর অধিকার সংক্রান্ত ইসলামী বিধান সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। এছাড়া তিনি মুসলিম সমাজের ভ্রান্ত ধারণা ও চর্চার সংস্কারমূলক আলোচনা তুলে ধরেছেন।
তিনি নিজ দেশ মিশর ও বাংলাদেশে ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবসময় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। দ্বীনি প্রতিষ্ঠান তথা মসজিদ, মাদরাসা প্রতিষ্ঠায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তিনি হাজারো আলেমের ওস্তাদ। তার অসংখ্য ছাত্র রয়েছে, যারা তাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ইসলামী তাহজীব-তমুদ্দুন প্রতিষ্ঠায় তিনি যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তা তাকে আজীবন স্মরণীয় করে রাখবে।
খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও পণ্ডিত হিসেবে তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয়। তিনি ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। এ মহান পুরুষ, আধ্যাত্মিক সাধক, আল্লাহর ওলী ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ইং নিজ দেশে বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মাওলা পাকের ডাকে সাড়া দিয়েছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
তাঁর ইন্তেকালে বিশ্ব একজন নিবেদিতপ্রাণ ও খ্যাতিমান আলেমকে হারালো, যাঁর অভাব সহজে পূরণ হবার নয়। মহান রাব্বুল আলামীন তার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন। তার নেক আমলগুলো কবুল করুন। তাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে উচ্চ মাকাম নসিব করুন। আমীন।