চোখের বানে বিদ্ধ করিস নে। কেরে তুই ছুড়ি?
পাহাড় থে এয়েছি। দেখা করিস শালবনের ধারে।
কেনে? তোর সাথে দেখা কেনে করবো?
জানি না। আসতে বইলেছি, আসিস।
কুসমি দৌড়াতে দৌড়াতে চলে যায়। অঞ্জন কুসমির চলে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে আর বলে, কেনে যাব? কেনে যাব? সকাল থেকে বিকেল অব্দি বনে বাদাড়ে ঘুরে ঘুরে বাড়ি ফেরে। দুটো ভাতের দলা মুখে দিয়ে আবার ছোটে। মনে পড়ে কুসমির কথা। সে যেতে বলেছে।
মা পেছন থেকে ডাকতে থাকে। আয় বাবা, ভাতটা শেষ করে যা। বেলা যে পড়ে গেল। কোন সকালে খেয়ে বেড়িয়েছিস।
কোন কথা কি অঞ্জনের কানে যায়? সোজা ছুটতে থাকে। তাকে যে শালবনের ধারে যেতে হবে। কুসমি অঞ্জনের জন্য অপেক্ষা করে আছে শালবনের ধারে। ছোট ছোট টিলার মাঝপথ দিয়ে বয়ে চলেছে পানির নালা। সেখানে পা ডুবিয়ে বসে থাকে কিছুক্ষন।
এই তুই এলি? সইন্ধ্যে যে হতে চললো।
হ্যাঁ আমার বৈয়েই গেছে।
তবে এইলি কেনে?
বারে তুই যে বললি? তাই এলুম।
তবে আমার কাছে এসে বোস। কুসমির খোঁপায় বেতফলের মালা, আর গোঁজা জবার ফুল। কুসমির খোঁপা থেকে বেতফল ছিড়ে ছিড়ে খায় অঞ্জন। কুসমি আঁচল থেকে আরও কিছু বেতফল বের করে দেয় অঞ্জনকে।
এই নে। এই ফল তোর কাছে ভালা লাগে?
হ্যাঁ খুব।
আমি তোকে তাইলে কাইলকেও এই ফল এইনে দেবো। তুই আমাকে কি দিবি। অঞ্জন যেন ভাবনায় পড়ে যায়। তাইতো আমি কি দেব? দৌড়ে গিয়ে বুনোফুল এনে কুসমির পায়ের মলের সাথে বেঁধে দেয়।
ওরা দুজনে হাত ধরে শালবনের ধারে এপথ ওপথ ঘুরে বেড়ায়। রাত্রি হতে চলল। এবার যে ফিরতে হবে। অবুঝ দুটি মন বুঝতে চায় না। তবে অঞ্জনের মায়ের কথা মনে পড়ে। বলে,
মায়ের মন পুইড়ছে আমার জন্য। যাই রে!
ঠিক আছে। মায়ের কথা মনে পইড়ছে? তাহলে তুই চইলে যা। যাহ্।
এক দৌড়ে ছুটে পালায় অঞ্জন। কুসমি সে পথে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নিজের গৃহে ফেরে। সারা রাত অঞ্জনের ঘুম হয় না। শুধু কুসমির কথাই মনে পড়ে। মা এসে ঘরের বাতি নিভিয়ে দিয়ে যায়। রাত গভীর হলে অঞ্জন… অঞ্জনও ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে যেন রূপকথার এক রাজ্য ভেসে ওঠে। সেখানে অঞ্জনই রাজা, মহারাজা। আর সবাই ওর অধীনস্ত মন্ত্রী, সেপাই আর পাইক পেয়াদা। যেন সমগ্র রাজ্য ওরই শাসনে চলে। একে এটা বলছে, ওকে ওটা বলছে। কিন্তু ওর কোন রানী নেই। তাই মন্ত্রীকে ও রানী খুঁজে আনতে বলছে। হুকুম জারী করেছে সবার মধ্যে। যেখান থেকে পারো আমার জন্য রানী নিয়ে এসো।
ভোর হতেই তো ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। হাই তুলতে তুলতে ঘর থেকে বের হয়ে এসে মা মা বলে ডাকতে থাকে।
মা কৈ গেলি মা? আমার যে খিদে পেইয়িছে। কুন খাইনে গেইলি। খাবার দিবি নে?
ওর মা বনে গিয়েছিল লাকড়ি কুড়িয়ে আনতে। চলে এসেছে। কেনে রে এত খাই খাই কিসের? তরে যে কাইলকে এত পিছন থেইকে ডাইকলাম তুই তো শুইনলি না। খেলি ও না। এখন কেনে ডাইতেছিস? যাহ্ আজ তরে খাতি দিব না।
দিবি নে? খাতি দিবি নে?
তুই মুখটা ধুয়ে এসে এইখেনে চুপটি করে বোস। গরম ভাত রেইধেছি। আমি নিয়ে আইসতেছি।
অঞ্জন দৌড়ে পানির ধারে গিয়ে মুখ ধুয়ে আসে। তার আগে গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে ইসিটাও করে। এরপর ঘরে এসে বসলে মা গরম ভাত দেয়। মরিচ পোড়া আর আলুভর্তা দিয়ে। ছেলেরে বলে, আইজ মাছ ধরে আনিস। আলুভর্তার সাথে একটু ঘি নে। খেইতে অনেক ভালো লাগবে। একটা ঘি এর কৌটা থেকে চামচ দিয়ে একটু ঘি বের করে দেয়। খাওয়া শেষ হলে, অঞ্জনের মা ওকে বলে, তোকে কাজ কইরতে হবে। আমার যে আর চলে না। আমি রাইনবো বাড়বো…… জঙ্গল থেকে তো কাঠ আর পাতা কুড়াই আইনতে পারিস। ফসলের কামে হাত দিতে পারিস। আমি আর একা কত কইরবো। অঞ্জন কিছুই বলে না।
কি রে কিছুই বইলছিস নে?
অঞ্জন উঠে চলে যায়। ভাবে, ঠিকই তো। মা ঠিকই বইলেছে। কাজ কইরতে হবে। জঙ্গলে একটা গাছের উপরে বসে থাকে অঞ্জন। আবার কুসমি আসে।
তুই গাছের আগায় কি কইরছিস?
পাতার বাঁশী বানাইচ্ছি।
আমারে দিবি?
দিব। বলেই গাছ থেকে লাফ দিয়ে নামে। তারপর আবার দুইজনে হারিয়ে যায় জঙ্গলের মাঝে। ওদের এই দুরন্তপনা জঙ্গলে কাঠ কাটতে আসা কেউ কেউ দেখে। কেউ আড়ালে বলে,
দেইখছ কি সাহস?
হ দেইখছি। এক্কেবারে সৃষ্টিছাড়া। কাজে কর্মে মন নেই। বাপটাও মইরেছে।
আর ও? কাবিলের মাইয়ে না? আমাদের দেইখেও লজ্জা পেল না।
থাক না। নিজের কাজে মইন দাও দেখি।
সেই ভালো ওইসব ছন্নছাড়া কাজ কাম দেইখে লাভ নেই।
অঞ্জন আর কুসমি আবার জঙ্গলের ধারে বসে থাকে। এ যেন অবুঝ দুটি কিশোর মনের নিষ্পাপ প্রেম। এভাবে ওদের প্রায়ই দেখা হতে থাকে। কুসমি প্রায়ই বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বনের সব পশুপাখির সঙ্গে সখ্য গড়েছে। বাদরগুলো ওর সঙ্গে খেলা করে। ওর ঘারে চড়ে জলের ধারে বসে থাকে। কুসমির বাবা বনের কাঠুরিয়া। মেয়ের এরকম দস্যিপনায় বাবার তেমন কিছু আসে যায় না। এই এতটুকু মেয়ে। থাক না ও নিজের মত। তবে বাবার নজর এড়ায় না। যুবক এক কাঠুরিয়া প্রায়ই কুসমির দিকে বদ নজর দেয়। তাই কাঠুরিয়া বাবা মেয়েকে সাবধান করে। বড় হয়েছিস। এভাবে ঘুইরে বেড়াস না মা।
মেয়ে বলে, কেইনে বাবা? কি হয়েছে?
কেইমনে তরে আমি বোঝাবো। তুই বড় হয়েছিস। গায়ে গতরে বেইড়ে উঠেছিস। তুই কি কিছু বুঝিস না? লোকে তোইর দিকে বদ নজর দেয়।
কুসমি হাসে। আর তার হাসি বনের বাতাসের সাথে মিলিয়ে যায়। পাতায় পাতায় হিল্লোল তোলে।
বাবা বলে, আজ তোর মা থাকলে তোরে বুঝাতো। আমি তোরে কেইমনে বোঝাবো। তোরে কেমন করে আইটকে রাখবো। দুশ্চিন্তায় আমার ঘুম আইসে না।
এত দুশ্চিন্তা কিসের রে বাপ? আমি তোর সাহসী মাইয়া। বনেই জন্ম। বনে ঘুইরব নাতো কৈ ঘুরবো? বনের পাখি, বনের গাছ, আর বাদর বনবিড়াল, সব আমার সাথি। আর ঐ অঞ্জন! সেও। অঞ্জনের কথা বলে একটু থেমে যায়। কি যেন? বুকের মধ্যে কেমন করে উঠে।
বাবা বলে, তুই যা ইচ্ছে হয় কর। আমি তোরে কিছু বইলতে পারবো না। আমার সেই সাইদ্ধি নেই। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, সাইবধানে চলিস। তুই বড় হইয়েছিস।
আবার খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে কুসমি।
অঞ্জনকে দেখে আবার ছুট দেয়। আবার জলের ধারে যায়। জলের ধারে বসতেই যেন একটা সাপ কুসমির পায়ের উপরে উঠে আসে। অঞ্জন দেখতে পেয়ে সেটাকে ঝ্যাটকা মেরে ফেলে দেয় জলে। এবার যেন দুজনে ভয় পেয়েছে। ভয়ে কুসমির বুক ধরফর করে উঠে। দুজনেই জলের ধার থেকে উঠে আসে। আর কুসমি বলে, আজ আর থাইকবো না। চইলে যাই।
অঞ্জন বলে, ঠিক আছে তুই চইলে যা। এই বলে অঞ্জন দৌড় দেয়। কুসমিও।
নিজের ঘরে এসে শুয়ে থাকে কুসমি। তারপর ভাত চড়ায়। ডাল আর সবব্জি দিয়ে সেদ্ধ করে। তাই বসে বসে খায়। ওর বাবা এখনো ফেরে নি। অপেক্ষা করে। আজ কেমন সন্ধ্যা নেমে এসেছে। ঘরের পাশ দিয়ে কে যেন হেটে যায়। কুসমি আওয়াজ পায়। জোরে চেঁচিয়ে ওঠে।
এই কে? কেরে এইখেনে? জানালা খুলে দেখার চেষ্টা করে। কাউরে তো দেইখতে পাচ্ছিনে। কে?
কোন আওয়াজ আসে না। শুধু হেঁটে যাওয়ার শব্দ। কুসমি বুকে থুথু দেয়। এরপর আবার বিছানায় এসে শুয়ে থাকে। এখনো বাবা আসে না। ঘুমিয়েও পড়ে।
বেশ খানিক্ষন পরে কাঠুরিয়া আসে। দরজায় ধাক্কা দেয়।
কুসমি ধরফর করে ওঠে। বাপ এইয়েছিস?
হ রে মা। দরজাটা খোল।
হাই তুলতে তুলতে বলে, এই আমি দরজা খুইলতেছি।
কুসমি দরজা খুলে দেয়। কাঠুরিয়া ঘরে আসে। এত দেরি আইজ কেনে কইরলি?
কেনে? তোর ডর লাইগেছে?
ডর? কিসের ডর?
কাঠুরিয়া হাসে। নে আমারে কিছু খাইতে দে। আমি হাত পাওটা ধুইয়ে আসি।
আইস বাবা। আমি দিইচ্ছি।
কাঠুরিয়া ঘরের বাইরে হাত পা ধুতে যায়। আর কুসমি ভাত আর ডাল সব্জি সেদ্ধ বেড়ে রাখে। কাঠুরিয়া হাত পা মুখ মুছে এসে বসে। এক দলা ভাত মুখে পুরে বলে,খুব স্বাদ হইয়েছে। আমার মায়ের হাতের রান্না অমৃত।
কুসমি চুপ করে থাকে। কাঠুরিয়া ভাবে, মেয়ের হয়ত মন ফিরেছে। বুঝতে শিখেছে। চকির উপর বিছানা করা। কুসমি ওখানে গিয়ে শুয়ে পড়ে। আর কাঠুরিয়া মাটিতে পাটি পেরে কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে পড়ে।
ভোর বেলা কুসমি ওঠার আগেই কাঠুরিয়া চলে যায়। মুখে পানি দিয়ে কুসমি চিড়া গুড় বের করে খেয়ে নেয়। এবং আবার বনে বাদাড়ে বেরিয়ে পড়ে। আজ আর অঞ্জন আসে নি। ওর মা ওকে কাজ করতে বলেছে। বাড়ির ধারে ফসল ফলায় ওর মা। সেই কাজ করতে লেগেছে। আজ আর কুসমির কথা ওর মনেই পড়ে নি। কিন্তু কুসমি ওর জন্য জলের ধারেই বসে থাকে। সেই সাপটা আজ আবার জলের মধ্যে মাথা তুলছে। কুসমি চেয়ে চেয়ে দেখছে। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন এসে কুসমিকে এক ঝাপটায় জড়িয়ে ধরে। মুখ চেপে ধরে। তারপর কি হয় কুসমি আর জানে না। কুসমির উপরে কতক্ষন অত্যাচার চলে কেউ টা জানে না। কুসমির পা বেয়ে রক্ত গড়িয়ে জলে পড়ে। জলের রঙ লাল হয়ে যায়। জ্ঞান হারায় কুসমি। আর সেই জানোয়ারটা তৃপ্তির সুখে উঠে বসে। জল থেকে সাপটা উঠে আসে আর সজোরে কামড় দেয় জানোয়ারটার পায়ে। জানোয়ারের বাচ্চাটা চিৎকার করতে করতে পালিয়ে চলে যায়। অন্য দুইজন কাঠুরিয়া যখন ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলো তখন অজ্ঞান কুসমিকে চোখে পড়ে। ছুটে আসে। এই অবস্থায় দেখতে পেয়ে যেন দিগবিদিক শুন্য হয়ে যায়। শিগগিরি ওকে কোলে তুলে নিয়ে ওর বাবার কাছে যায়। কেউ একজন জানোয়ারটাকে খোঁড়াতে খোঁড়াতে যেতে দেখেছিল। তৎক্ষণাৎ বুঝতে পারে। কুসমির বাবা হায়হায় করে উঠে। কি হোল! কি হোল! একি হোল!
সব কাঠুরিয়া একত্র হয়। কুসমিকে নিজেদের সাদ্ধ অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়। বনে জঙ্গলে তো আর ডাক্তার নেই। নিজেরা যা জানে তাই করে। ওদের কবিরাজের খোঁজে যায়। কিন্তু কুসমি আর কথা বলে না। মেয়ের নিথর দেহটা দেখে কাঠুরিয়ার বুক হাহাকার করে উঠে। একি হইলো! ঐ বদটা আমার মেয়েরে মাইরে ফেললো। কুসমি কথা বল! কুসমি কথা বল!
কুসমি আর কথা বলে না। কবিরাজ আসতে আসতেই কুসমির নিথর দেহটা কোলে তুলে নেয় কাঠুরিয়া। ওদের জঙ্গলের নিয়ম অনুযায়ী কুসমির দেহটাকে কাঠ দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হবে।
কি এক অন্তরের টানে অঞ্জন ছুটে আসে। খুঁজতে খুঁজতে চলে আসে। কুসমিকে মাটিতে শুইয়ে রেখে কাঠুরিয়া কাঠ কাটছে। অঞ্জন কিছুই বুঝতে পারে না। কাঠুরিয়া অঞ্জনকে একবার দেখে। তারপর বলে, তোদের দুইটি মনের সরলতা আর পবিত্রতা শেষ হয়ে গেল। আর পাইরলেম না মেয়েরে রক্ষা কইরতে।
অঞ্জন বুঝতে পারে না। কুসমির শাড়ি রক্তে ভেজা। পায়ের মলে লেগে আছে রক্ত। ওর কিশোর মন হুহু করে ওঠে। এ কোন কুসমি? ভীত, শঙ্কিত রঞ্জন একেবারে স্তব্ধ হয়ে যায়। কুসমির চুলগুলো ছড়ানো।
এই কুসমি এই কুসমি, তোর চুলে খোঁপা কৈ? আর খোঁপায় বেইতফলের মালা কৈ? আমারে বেইতফল দিবি নে?
কিছুক্ষনের মধ্যে কুসমির দেহটাকে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। জলন্ত আগুনের দিকে কেবল ফেলফেল করে তাকিয়ে থাকে অঞ্জন।
আজ কি হয়ে গেল তা বোঝার কোন ক্ষমতাই নেই অঞ্জনের। কেবল স্বপ্নের কথা মনে হয়। ও যেন আজ রাজা। রানীর খোঁজ করতে সকল মন্ত্রী, সেপাই আর পাইক পেয়াদাদের হুকুম জারী করেছে। আর চোখের সামনে জ্বলন্ত আগুন।