ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণের জন্মদিন ৫ সেপ্টেম্বর হল শিক্ষক দিবস। তাঁরই ইচ্ছানুসারে শিক্ষকদের সম্মান জানানোর জন্য ‘শিক্ষক দিবস’ হিসাবে দিনটি উদযাপন করা হয়। এই ৫ সেপ্টেম্বরকে ঘিরে আজ একটা গল্প বলবো, আমার জীবনের গল্প।

আমি মাত্র কুড়ি বছর বয়সে জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসাবে খুব গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে যোগদান করি। সেই গহমী শিখর বাসিনী বালিকা বিদ্যালয়ে দেখি ছাত্রীরা খুব সহজ, সরল, বিনীত, ভদ্র কিন্তু বেশ কিছু ছাত্রী পড়াশোনায় একটু অনগ্রসর। তাদের আমি জীবনবিজ্ঞান নমুনা, চার্ট, মডেল দিয়ে বোঝাতে লাগলাম। তারা নিজেরাই চার্ট, মডেল আমার কাছ থেকে শিখে নিয়ে তৈরী করতে লাগল। গ্রামে তো প্রচুর গাছপালা, প্রচুর নমুনা ওরা সংগ্রহ করতে উৎসাহী হত এবং নমুনা, চার্ট, মডেলের সাহায্যে পড়াশোনায় খুব সাফল্য লাভ করলাম। বেশির ভাগ ছাত্রীই খুব ভাল ফল করতে লাগল। কিন্তু একদম যারা অনগ্রসর তারা তখনও ঠিকমত পাঠদান আয়ত্ব করতে পারছিল না; তাদের নিষ্ক্রিয়তায় আমি নিরাশ না হয়ে উঠে পড়ে লাগলাম। একটা নতুন পন্থায় পড়িয়ে বেশ সাফল্য পেলাম। সেই অভিনব পন্থাটি হল, ছড়া ও কবিতার সাহায্যে জীবনবিজ্ঞান বোঝানো। এবার দেখলাম তারা বেশ সক্রিয় হয়ে পাঠ শুনতে লাগল। এইভাবে আমি যখন একশো শতাংশ ছাত্রীকেই সক্রিয় করে আমার বিষয়ে মাধ্যমিকে ভীষণ ভালো ফল পেলাম তখন আমি অবসর সময়ে বিজ্ঞানের কবিতা-ছড়াগুলি সুর দিয়ে গান করে ওদের শিখিয়ে বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে ও অন্যান্য বিদ্যালয়েও ঐভাবে পাঠদান করতে লাগলাম। এমনকি ছাত্রীদের নিয়ে আমি একটি শ্রুতিনির্ভর ক্যাসেটও তৈরী করলাম স্টুডিওতে গিয়ে নিজ ব্যয়ে। অন্যান্য স্কুলেও ঐ ক্যাসেট ও টেপরেকর্ডার নিয়ে যখন পাঠদান করতাম তখন দেখতাম অন্যান্য স্কুলের ছাত্রছাত্রীরাও খুব মনযোগ দিয়ে আমার পাঠদান শুনছে। ক্রমে আমি বিজ্ঞান, কুসংস্কার, দূষণ, নানারূপ ব্যাধি সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য নৃত্যনাট্য, নাটক, গীতি আলেখ্য করে বিভিন্ন জনবহুল জায়গায় প্রদর্শন করতে লাগলাম ছাত্রীদের সহযোগিতায়। এইরূপ ত্রিশ বছর ধরে অবিরত জনসাধারণ ও ছাত্রছাত্রীকে কবিতা ছড়া, নাচ, গান, নাটক, আবৃত্তি, গল্পের মাধ্যমে বিজ্ঞান সচেতন করা, রোগ ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করা ও কুসংস্কার দূরীকরণ এবং ভেষজ উদ্যান নির্মাণ ও ভেষজ উদ্ভিদ সম্বন্ধে নানা প্রদর্শনী ও ভেষজ গাছের উপকারিতা নিয়ে কাজ করার জন্য ঠিক এই ৫ই সেপ্টেম্বর, ২০০৪ সালে আমি তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি ডঃ আব্দুল কালাম মহাশয়ের কাছ থেকে রাষ্ট্রপতি পুরষ্কার লাভ করি জাতীয় শিক্ষিকা হিসাবে। উনি সেইদিন উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন আরও কাজ করতে। তাই এখন আমি কবিতাগুলি ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দিচ্ছি। কিছু শিক্ষাকেন্দ্রও আমার শিক্ষামূলক ভিডিওগুলি তাদের ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে প্রচারিত করছে। এই বিষয়ে বই লিখেছি, প্রকাশ করেছি ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ে বই পাঠিয়ে দিয়েছি।

পরিশেষে বলি এই “শিক্ষক দিবস” দিনটি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমি এই দিনেই সেই রূপালী চুলের ছোটোখাটো চেহারার বিজ্ঞানসাধক রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আব্দুল কালামের হাত থেকে পুরষ্কার গ্রহণ করার সৌভাগ্য অর্জন করি। আমি যেন আমার ভেষজ উদ্ভিদের ওপর কাজ, এই অভিনব পদ্ধতিতে পাঠদান ও জনসাধারণকে ঐ পদ্ধতিতেই সচেতন করার কাজ গুলি করে যেতে পারি। শুধু বিজ্ঞান নয় আমি এখন বিভিন্ন মহাপুরুষদের জীবনী নিয়েও কবিতা লিখে বই প্রকাশ করেছি। সেই কবিতাগুলিও ছবি দিয়ে ভিডিও করে ছাত্রছাত্রীদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছি। বিজ্ঞানের গল্পের বইও প্রকাশ করে গল্পের ছলে বিজ্ঞানের গভীর তথ্যগুলি ছাত্রছাত্রীদের মস্তিস্কের মধ্যে বিনা ক্লেশে ঢুকিয়ে দেবার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি অবিরত। বিজ্ঞানী রাষ্ট্রপতির অনুপ্রেরণা আমার মনে অবিরত কাজ করার ইচ্ছা জাগায়। রাষ্ট্রপতি এ. পি.জে. আব্দুল কালাম এবং ভারতের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণকে জানাই শ্রদ্ধা ও প্রণাম।