বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আবির্ভূত বাংলা ভাষার একজন শক্তিশালী আধুনিক কবি জয় গোস্বামী! তিনি এমন একজন কবি যিনি বাংলা কবিতায় একাধারে ধ্রুপদী বা মূল ধারার লেখক-পাঠকদেরও যেমন মন জয় করছেন। অপরদিকে জনপ্রিয় ধারার সাধারণ পাঠকদেরও কাছেও তিনি সমান প্রিয়।সাহিত্য সমালোচকদের কাছে কবি জয় গোস্বামী বাংলা ভাষার উত্তর-জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবি হিসাবে পরিগণিত। তাঁর কবিতা চমৎকার চিত্রকল্পে, উপমা এবং উৎপ্রেক্ষায় ঋদ্ধ। কবিতা লেখার প্রথম পর্বে দারিদ্র আর অসুস্থতার সঙ্গে অনিশ্চিত জীবনে লড়াই করবার সময়কালে তিনি লিখেছিলেন-
‘আলেয়ার হৃদ’(১৯৮১),’উন্মাদের পাঠক্রম’(১৯৮৬), ‘ভুতুম ভগবান’(১৯৮৮)এর মতো কাব্যগ্রন্থ!এই কাব্যগ্রন্থগুলি এক ঘোরের প্রবাহে আমাদের ঠেলে দেয়।যে বিষণ্ণতায় আত্মবিকাশ সংকুচিত, বিধ্বস্ত; যে অপূর্ণতায় আমরা বিড়ম্বিত, নঞর্থক বেদনায় ভারাক্রান্ত—জয় গোস্বামী সেখানেই এক ঝলক অমৃতধারা পাঠাতে পারেন। পার্থিবের কদর্য কলুষ বিপন্নতা থেকে প্রাণের উচ্ছ্বাসে আমরা ভিজে যাই। কখনো স্বপ্ন ও বাস্তবের সঙ্ঘারামে প্রবেশ করে মোহময় করে তোলেন আমাদের।
এক স্বাক্ষাৎকারে কবি জয় গোস্বামী বলেছিলেন- ‘ আমার জীবনে যখন যা ঘটেছে, তখন তা আমি আমার কবিতার মধ্যে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছি। আমি যে চেষ্টা করেছি সেটা বলবো না, সেটা খানিক আপনা-আপনি হয়ে গেছে। আর আমার জীবনে যা ঘটেছে, আমি যে শুধু সেই কথাটি লিখেছি, তা নয়; আমার আত্মজীবনীর অংশের মধ্যে আছে আমার বন্ধু-বান্ধবদের জীবন, আমার প্রতিবেশীর জীবন, আমার পড়শীর জীবন, আমার দেশের জীবন এই সবই আমার নিজের জীবনের অন্তর্গত হয়ে থেকেছে। এভাবেই এসব থেকে কবিতা এসেছে।’
‘দেবীকে স্নানের ঘরে ন্যাংটো দেখে
তিন দিন চোখের পাতা এক করিনি
বলো ভাই ধন্য হরি শ্মশানঘাটে
পেট ফেটে বাচ্চা দিল ধাই হরিণী
বাচ্চা দিল, বাচ্চা আমি, বাচ্চা শিশু,
বেরোলাম গর্ভ থেকে মাত্র আজিই
তার আগে ছিলাম নীচে তিরিশ বছর
এখন ভাবছো সবাই গর্ভে আছি?
না রে ভাই, গর্ভ কোথায়-স্নানের ঘরে
দেখেছি দেবী আমার ন্যাংটোপুটো
ঘি মেখে চান করাব ছাদের নিচে
ছাদ কই মাথার ওপর মস্ত ফুটো’
(দুগ্ধপোষ্য)
জয় গোস্বামী ১৯৫৪ সালে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি বলেন, ‘আমি জন্ম নিয়েছি মায়ের মৃত্যুর পর। ১৯৮৪ সালে।’ এ কথা যে আক্ষরিক অর্থেই সত্য তার ছাপ পাওয়া যায় ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ কাব্যগ্রন্থে।
‘আমরা যেদিন আগুনের নদী থেকে
তুলে আনলাম আর ভেসে যাওয়া দেহ
মার সারা গা জ্বলছে,বোন তোর মনে আছে
প্রতিবেশীদের চোখে ছিল সন্দেহ?—
সেই রাত্রেই পালিয়েছি গ্রাম ছেড়ে
কাঁধে মা-র দেহ,উপরে জ্বলছে চাঁদ
পথে পড়েছিল বিষাক্ত জলাভূমি
পথে পড়েছিল চুন লবণের খাদ—
যে-দেশে এলাম মরা গাছ চারিদিকে
ডাল থেকে ঝোলে মৃত পশুদের ছাল
পৃথিবীর শেষ নদীর কিনারে এসে
নামিয়েছি আজ জননীর কঙ্কাল—’
(সৎকার গাথা)
উন্মাদের পাঠক্রম’ এ প্রধানতঃ সময়ের অস্থিরতা। তীব্র আবেগ তীব্র উত্তাপ। কোন্ মায়ের অস্থি না পুড়িয়ে রেখে যাওয়া হবে গাছের কোঠরে?
“আমরা শিখি নি। পরে যারা আছে, তারা
তারা শিখবে না এর ঠিক ব্যবহার”? …. এরপর ‘শিক্ষা ’।

‘শিক্ষা নাও শিক্ষা এই উন্মাদের পাঠক্রম
খুলে দিলাম আজ থেকে ছাত্রদের সংখ্যা কম
খাদ্য হীন মাংসভুক, সূক্ষ্ম কাজ কামড়ে খাও
এই দিলাম অন্ধকার চিৎকারের মাংসহাড়
উন্মাদের মাংসহাড় খাচ্ছি খাই লাগছে বেশ
নাকের জল চোখের জল, মাতৃবুক ভগ্নিবুক
খাচ্ছি খাই লাগছে বেশ জ্বলছে ভোগ রোগজ্বালা রোগ নিবুক
শান্তি জল দিচ্ছে কে? তোমার দেশ আমার দেশ
ছাল সমেত মুন্ডাকেশ বিদেয় হও এক্ষুনি
নইলে শিক ঢুকিয়ে দিক গরম শিক দিক চোখে
শিক্ষা ঠিক হচ্ছে তো?’
(শিক্ষা)
ভয়ংকর উন্মাদ এক পাঠক্রমের সামনে পাঠককে দাঁড় করানো। এইভাবে ক্রমশঃ এগোন জয় গোস্বামী। আর যত এগোন তত পাঠক সময়ের স্রোতে অকূল সমুদ্রে ভাসতে থাকে, বিস্ময়ে হাবুডুবু খেতে থাকে।

‘হ্যাঁ আমিও মড়া তোমরা যা ভাবছো তা ভুল
মরলাম যখন, ওরা জ্বালাজ্যান্ত কাঠ
মুখে দিল ভরে, ওরে গুহ্যে দিল শূল
দুইমুখে আরম্ভিল গুরুবাণী পাঠ

গুরু সত্য চেখে বিশ্ব বড় মিষ্টি লাগে
ছন্দে লিখি সাদা কথা, ভুর্জে লিখি নাম
বক্ষে এত বল ছিল জানতাম না আগে
তিষ্ঠ বলি মুহূর্তকে, সূর্যে বলি ‘থাম!’-

কী ঘুম কে ঘুম আমি জানতে চাই শেষ
কী ডিমে ছিলাম কোন চক্ষুর তারায়
এক সপ্ত দুই সপ্ত তারাসপ্তকেশ
জানতে জানতে জানতে জ্ঞান দিগন্তে হারায়

এসবই রাত্রি কথা, রাত্রে কী না হয়
কী না বলে উন্মাদেরা, কী না করে লোভী
বিশ্বাস যাবে না বাবা, বলি ভয় ভয়
বামন হলেও চাঁদ ধরে কিন্তু কবি!’
(চন্দ্রাহত)
কবি জয় গোস্বামী তাঁর ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলি বিষয়ে বলেছেন,‘উন্মাদের পাঠক্রম’ নামে আমার একটি কবিতার বই আছে, যে বইটি আমি পুরোটাই ‘মানস লিখন পদ্ধতি’ অনুসরণ করে লিখেছিলাম! ‘মানস লিখন পদ্ধতি’ নামটা আমার নয়! বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা ও আমার জীবন’ প্রবন্ধে এই শব্দটির ব্যবহার পেয়েছি! সেই প্রবন্ধ থেকে কথাটা আমার জীবনের মধ্যে প্রবেশ করেছে! ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ বইটা লেখার সময় আমি ও আমার ভাই খুবই আর্থিক অনটনের মধ্যে বাস করছিলাম! আমার স্কুল শিক্ষিকা মা হঠাৎ মারা গেলেন একদিন! তার দু’মাসের মধ্যে আমরা ঘোরতর অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়লাম! আমাদের তখন দু-তিনটি গরু ছিল! সেই গরুর দুধ বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে দিয়ে আসতে হতো আমাকে! ঝোলার মধ্যে ঘুটে ভরেও পড়শীদের ঘরে পৌঁছে দিতাম! বিচালি কিনে আনতে হতো ভ্যান রিকশায় বসে!গরুদের জাবনা দিতে হতো!সময় কোথায় যে বসে একটু লিখব? তখন মাথায় মাথায় তৈরি হতো কবিতা! একটা কবিতা সম্পূর্ণ হয়ে গেলেই তৎক্ষণাৎ সে লেখা কাগজে লিপিবদ্ধ করব সে অবকাশ ছিল না! হয়তো চার-পাঁচটি কবিতা মনের মধ্যে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি এক সপ্তাহ! মনে মনেই শব্দ অদল-বদল করছি! তারপর হঠাৎ একদিন কিছুটা সময় পেয়ে হয়তো দুপুরে একসঙ্গে চার পাঁচটি কবিতা লিপিবদ্ধ করলাম! এভাবেই ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ বইটি লেখা!
‘মা সমুদ্র, ভেসে আছি, ও মমতাময় অম্লধারা নগ্নে তোর
ভেসে আছি যেন সূর্যকাল থেকে, তুলেছ বিপুল স্তম্ভজল উঠে যাই
লাঠি লাঠি উঠে যাই, দন্ড দন্ড,উঠে যাই!মেঘ থেকে ধরি ইলেকট্রিক খাই খাই ইলেকট্রিক, কী আস্বাদ হাহা স্বাদ অহো সহোদরা
আমি ওয়াক তুলছি আমি গলা থেকে বুক থেকে আপ্রাণ ঢেলে দিচ্ছি এই বিদ্যুৎ বিদ্যুৎ দ্রাক্ষা ঝলসিত রুপোলি তরল কী গরম!-
আমি কবিখ্যাতি চাই না, প্রীতি ও শুভেচ্ছা চাই না, না সমুদ্র চাই না তোকে ও কেবল এই মাকে চাই, কেবল এই ভাইকে চাই, বাবা যেন না মরে শৈশবে, যেন এর চেয়ে সুস্থ দেহ নিয়ে
নিজের খাবার নিজেই উপার্জন করে নিতে পারি’
(চিৎসাঁতার)
কবি জয় গোস্বামীর ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে কবি শঙ্খ ঘোষ মন্তব্য করেছেন: “… ১৯৮৬ সালে তার ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ আমাদের সামনে এসে পৌঁছল এক বিস্ফোরণের মতো।”
‘লাগ ভেলকি লাগ ভেলকি শ্বশুরবাড়ি যাবা?
লাগ ভেলকি লাগ ভেলকি লেড়কি বোকা-হাবা
ভাগ লেড়কি ভাগ লেড়কি শশুরঘর থেকে
জাগ লেড়কি আগ লেড়কি কেরোসিনের চিতা-

তবু পৃথিবীতে জন্মেছ,এই বিস্ময়ভরা ধরণী
তুমি কি কখনো প্রণয়গন্ধবনে আনন্দ করোনি
শরীরে অরণি রাখো নি কখনো? তবে অনুতাপ ছেড়ে দাও শোনো
মাঝগঙ্গায় যে পারে ডোবাতে, চাও সেই খোলা তরণী!’
(কবন্ধবিবাহ)
সাদা, উড়ন্ত নিশান যাকে অনেকে ‘উন্মাদের পাঠক্রম’ বলে জানে, সে তাকে রাত জাগাতে জাগাতে, ভুল ভালোবাসার ঝুটো গয়না গড়াতে গড়াতে, স্বহত্যাপ্রবণ দিন পেরোতে পেরোতে এক এল-ডোরাডোর দিকে নিয়ে যায়!

‘শরীর, চাই শরীর, চাই জন্মজলধাতু
স্পার্ম লিটল স্পার্ম, ওয়ান লিটল ব্রেভ স্পার্ম
বিপদ ফেটে রাস্তা দিল পুণ্যবান পথ
রাত্রিরেখা শেষ হয়েছে পূর্বে চলো নদী
পিছন থেকে উঠছে আলো হালকা লাল ধোঁয়া
পিতার মুখ ধুয়ে যাচ্ছে রাত্রিশেষ জলে
মা আর আমি এসেছিলাম ভাই তখনো হয়নি
জন্মতারা ভরণী ছিল পর্বতের কোণে
শুস্কমেঘে লুকিয়ে ছিল কুপিত মঙ্গল
এখন তার রক্ত উঠে লগ্ন ভেদ করে
উঠুক, আমি ভয় করিনা পূর্বে চলো নদী’
(জাতক)
কবি জয় গোস্বামী বিশ্বাস করেন একজন কবি যে কবিতা রচনা করেন তা নেহাত লেখালেখা খেলা নয়! কবিতা তাঁর মাথা তোলবার, বেঁচে ওঠার, ভালোবাসবার অনন্য অবলম্বন! তিনি মানেন স্বপ্নের মত কবিতাতেও সমস্তই সম্ভব! তবু কবিতার জগৎ শুধু স্বপ্নের জগৎ নয়, কবিতা কবির বিশাল আত্মজীবনী! এক একটি কবিতা তো জীবনের এক একটি পৃষ্ঠা! অবচেতনের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে একই কবিতা একাধিকবার লেখা নয়, প্রতিটি কবিতায় তিনি স্বতন্ত্র জয়! বিষয়ে, ভঙ্গিতে শব্দে, নৈঃশব্দ্যে, ছন্দে, ছন্দহীনতায় কবি জয় গোস্বামীর কবিতা যেন এক সৃষ্টিমগ্ন সার্থক কবির রূপান্তরের চলচ্ছবি!

‘সমুদ্র চুরমার নিচে শতলক্ষ ঢেউ বিস্ফোরক
চূড়ান্ত পতন আসছে আরো কাছে আরো কাছে তারাচক্র বিরুদ্ধে আমার কিন্তু হে পতন আমি অপেক্ষা করবো না অতদিন আমি রক্তক্ষয়রত থাকব না মাংসের দলা গলগ্রহ মায়ের সংসারে তার আগেই
আমি শেষ বেছে নেব শেষ আমায় বেছে নিক
তিলে তিলে তা হতে দেব না!’
(পতন)

‘বিগত সহস্র-এক জীবনের কথা কিছু মনে করতে পারছিনা গৌতম, তুমি শ্মশানে আমার বন্ধু ছিলে একবার তুমি বৃষ্টিতে আমার দেহ
ফেলে রেখে পালাও নি সজ্ঞানে আমি তোমাকে জানাতে চাই আজ
আমার জ্বলন্ত মাথা জেগে ওঠে ঊর্ধ্বাকাশে আমার জীবিত মাথা
দেহহীন পড়ে থাকে চিরকাল প্রান্তরের শেষে শুধু বিস্ফারিত চোখ
লক্ষ করে রাত্রিদের অন্ধ জলাভূমি থেকে চন্দ্রকরোটির নিচে কালো
মোষের কঙ্কালগুলি ডানা মেলে উঠেছে আকাশে….’
(রাত্রি,18 জুন)

‘শৃঙ্গী না শঙ্খিনী তুমি কি মানুষ নও?
দেখি হাত দিয়ে দেখি- এ কী এত উষ্ণ!
কী গরম কী গরম, আনন্দে হে চরম
একাকার হয়ে যায় দিন-রাত-রজনী
নয়দ্বার ফেটে পড়ে মাথায় নিত্য করে
ছ-জন্ম ন-জন্ম নয় ছয় জননী…’
(প্রণয়গীতি)
জয় গোস্বামীর কবিতা আসলে আমাদের রোজনামচা। আমরা যা দেখছি চারপাশে তার জ্বলন্ত প্রতিফলন ।নিজের পরিবার স্বামী-স্ত্রী-সন্তানের এই কর্মব্যস্ততাও কবিতায় আয়না হয়ে উঠে আসে। কবিতা মানে যে কেবল শব্দের বিন্যাস- সমবায় নয়, নয় কিছু অনাবশ্যক মেধার দেখনদারী সেটা জয় গোস্বামী প্রমাণ করেছেন ।অসাধারণ পর্যবেক্ষণ নিয়ে প্রতিভার সর্বব্যাপী চিরন্তনতায় সবকিছুকেই ধারণ করে তিনি তত্ত্বে দর্শনে লিরিকে ক্লাসিকে মহাজীবনের স্রোতকেই চিনিয়ে দেন।এই কারনেই তাঁর কবিতা ছড়িয়ে পড়েছে দিক থেকে দিগন্তে। কবিতাকে জনারণ্যে মিলিয়েছেন তিনি,এখানেই তাঁর সার্থকতা ।